Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৩

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৩

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৩
বন্যা সিকদার

“ভাইয়া আ আ আ আমি আসলে…
রোহন তার কথা শেষ করতে না দিয়েই হু হু করে কেঁদে উঠল। নিজেকে আর স্বাভাবিক রাখতে পারছে না কোনো ভাবেই।
“আমি জানি তুই কোনোদিনও আমাকে ওভাবে ভালোবাসিসনি‚ এটাই বলবি তো? কিন্তু একটুখানি ভালোবাসলে তোর কী এমন ক্ষতি হতো‚ বল তো? না হয় এই অনাথ‚ এতিম ছেলেটার দিকে চেয়ে দয়া করেই সারাজীবন আমার হয়ে থেকে যেতি।
​রোহানে’র এই তীব্র আর্তনাদ বাতাসে মিলিয়ে গেল। আর মৌ নিস্পলক চোখে শুধু নিজের শৈশবের চেনা ভাইয়াটার এই ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাওয়া রূপ দেখতে লাগল। আজ বাপের বাড়ি ফেরার সব আনন্দ তার এক নিমেষে বিষাদে পরিণত হলো। মানুষটা আজও তার অপেক্ষায় ছিল।

​”রোহান ভাইয়া শোনো…
মৌ মৃদু কন্ঠ ডাকল কিন্তু রোহান যেন আজ কোনো যুক্তি শুনতে রাজি নয়। বরং সে আকুতি গলায় বলল‚ ​“ফুল‚ ফিরে আয় না আমার কাছে। আমি এখনো তোকে সম্পূর্ণ আপন করে নিতে রাজি। গড প্রমিজ‚ কখনো তোর অতীত নিয়ে একটা প্রশ্নও তুলবো না। সারাজীবন তোকে বুক দিয়ে ভালোবেসে আগলে রাখবো। আয় না ফুল‚ ফিরে আয় আমার কাছে।
​রোহানে’র এই বুকফাটা আকুতি শুনে মৌ ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে যাচ্ছে। সে এই মানুষটাকে কীভাবে বোঝাবে যে‚ সে জন্মাবধি তাকে শুধু নিজের আপন বড় ভাই ভেবে এসেছে। যাকে সে ভাই হিসেবে দেখেছে‚ তাকে কীভাবে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনা করবে? মৌ তার কাঁপা কাঁপা গলায় বুকভরা কষ্ট নিয়ে বলে‚

​”আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে রোহান ভাইয়া। প্লিজ‚ আমার এই সাজানো সংসারটা তুমি ভেঙে দিও না। আমি সত্যিই বড্ড ভালোবাসি আমার প্রফেসর সাহেবকে। তাকে ফেলে আমি কখনোই তোমার হতে পারব না‚ কোনোদিনও না।
​মৌ’য়ের মুখে এই কথা শুনে রোহান একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। সে শুকনো মুখে ফিসফিস করে‚ “তাহলে আমার মাঝে ঠিক কী কমতি ছিল যে আমাকে ভালোবাসতে পারলি না‚ ফুল? আমি কি সত্যিই তোর অযোগ্য ছিলাম? তোর সাথে কি আমাকে বড্ড বেশি বেমানান লাগত‚ বল?
​রোহানে’র এই অসহায় প্রশ্ন মেহেরের বুকটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি পেল না। নিজের অজান্তেই দু-চোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল তার। মৌ ততক্ষণে নিজের কান্নায় ভেঙে পড়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। সে যদি একবারের জন্যও জানত যে রোহান আজ এখানে ফিরে এসেছে‚ তবে সে কখনোই এই বাপের বাড়ি আসার বায়না করত না। ​সে ঝড়ের গতিতে নিজেদের রুমে এসে ঢুকল। রুমে ঢুকেই কোনো দিকে না তাকিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা উজানে’র চওড়া বুকে গিয়ে আছড়ে পড়ল এবং তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ​উজান নিজের পিচ্চি বউকে এভাবে ঝড়ের মতো এসে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখে বিচলিত হয়ে পড়ল উজান। সে অত্যন্ত উদগ্রীব ও চিন্তিত কণ্ঠে শুধাল‚

​“পিচ্চি কী হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন এমন করে‚ বলো আমায়?
​মৌ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু উজানে’র শার্টের কলার খামচে ধরে অবুঝ বাচ্চার মতো কেঁদে চলল। উজান তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল। সে মৌ’য়ের গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আবার আকুল স্বরে বলল‚ ​“এই পিচ্চি, বলো না কী হয়েছে? কেউ কি কিছু বলেছে তোমায়? আমায় বলো।
​”আমি বাড়ি ফিরে যাবো প্রফেসর সাহেব। আমায় প্লিজ ও বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে চলুন। আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকব না। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে‚ খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।
​মৌ’য়ের এই কান্নাভেজা কণ্ঠের ব্যাকুল মিনতি শুনে উজানে’র নিজের বুকটাও এক তীব্র যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছে না‚ যে মেয়েটা বাপের বাড়ি আসার আনন্দে সকালে নাচানাচি করছিল‚ সে এখানে পা রাখতেই হঠাৎ এমন চলে যাওয়ার জন্য কেন ছটফট করছে? উজান আলতো করে মৌ’য়ের চিবুক ধরে মুখটা নিজের দিকে ওপরে তুলল।
​“পিচ্চি, কী হয়েছে তোমার? এমন করছ কেন? তুমি নিজেই তো বাপের বাড়ি আসার জন্য ঠিক কতটা এক্সাইটেড ছিলে‚ তাহলে এখন কেন এমন বলছ?

​”কিন্তু আমি এখন এখানে থাকতে চাই না।
মৌ উজানের বুকে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ডুকরে উঠল‚ “আপনি আমায় ভালোবাসেন তো? ভালোবাসেন তো আমায়? তাহলে চলুন‚ আমরা এখনই চলে যাই। আমার এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে প্লিজ চলুন।
​উজান মৌ’য়ের এই পাগলামি দেখে তাকে পরম মায়ায় নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে মিশিয়ে রাখল। তার কপালে ও মাথায় স্নেহের গভীর চুমু এঁকে দিয়ে অতি ধীর ও নরম গলায় বোঝাতে লাগল। ​“ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড‚ পিচ্চি। আমরা এইমাত্র ঢাকা থেকে এসে পৌঁছালাম। এখন যদি হুট করে কাউকে কিছু না বলে আমরা চলে যাই‚ তবে আব্বা-আম্মা মনে মনে অনেক কষ্ট পাবেন। আমার লক্ষ্মী বউটা নিশ্চয়ই এমন কিছু করবে না যাতে বড়রা কষ্ট পায়‚ তাই না? আমরা যাবো তো‚ জাস্ট আর কিছুদিন এখানে সবার সাথে থেকে তারপর চলে যাবো…প্রমিজ করছি তোমায়।

​মৌ আর কোনো কথা বলল না। সে নিজের মনের কথাগুলো মনেই চেপে রেখে উজানে’র চওড়া বুকের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল‚ “আপনাকে আমি কীভাবে বোঝাবো প্রফেসর সাহেব? আমি এখানে থাকলে যে আমার শৈশবের চেনা অন্য কোনো একটা মানুষ একবারে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে। আমি তো তাকেও কষ্ট দিতে চাই না। কেন এমন এক পরিস্থিতিতে আমায় ফেললে মাবুদ।
​মৌ’য়ের শরীরটা এখনো হালকা কাঁপছিল। সে কিছুক্ষণ উজানে’র দিকে নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরপায়ে নিজের জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল শাওয়ার নিতে। ​উজান বিছানায় দাঁড়িয়ে মৌ’য়ের এই আকস্মিক ও রহস্যময় পরিবর্তন দেখে মনে মনে ভীষণ অবাক হলো। তবে সে এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে আর বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমের বাইরে এসে তন্ময়’কে ডাকল এবং দুজনে মিলে নিজেদের মাঝে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে লাগল।

​মৌ শাওয়ার শেষ করে ফ্রেশ হয়ে রুমে ঢুকল। কিন্তু পুরো রুমে উজান নেই দেখে সে বেশ অবাক হলো। কারণ উজান এখানকার তেমন কিছুই চেনে না‚ চেনা কোনো মানুষও নেই তাহলে এই পড়ন্ত বিকেলে সে একা একা গেল কোথায়? মৌ নিজেই নিজের ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে কিছুটা ঠিক করে নিয়ে উজান’কে খুঁজতে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। ​নিচে নেমে নিজের মায়ের কাছে উজা’নের খোঁজ করেও কোনো হদিস মিলল না। বাধ্য হয়ে সে নিজেই ধীরপায়ে বাড়ির বাইরের উঠোনের সামনে এসে দাঁড়াল। ​চারপাশে তখন ধীরে ধীরে গোধূলির আলো মুছে সন্ধ্যা নামছে। ঠিক এই সময় বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রচণ্ড বিধ্বস্ত ও উস্কোখুস্কো অবস্থায় রোহন ভেতরে ঢুকল। মৌ তাকে দেখেই অস্বস্তি বোধ করল এবং দ্রুত তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে যেতে চাইল। কিন্তু রোহন তাকে সুযোগ দিল না‚ সে এক ঝটকায় এসে মৌ’য়ের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পথ আটকে দিল।

​হুট করে রোহন’কে এভাবে সামনে চলে আসতে দেখে মৌ খানিকটা ঘাবড়ে গেল। সে ভয়ে ভয়ে তোঁতলাতে তোঁতলাতে বলল‚ “তু তু তুমি এখানে?
​“মানলাম তুই আমাকে ভালোবাসিস না‚ তাই বলে কি আমি তোর একটু কাছেও আসতে পারব না ফুল? এই নে‚ তোর ফেভারিট চকলেট।
​রোহন নিজের পকেট থেকে বেশ বড় একটা চকলেট মৌ’য়ের দিকে এগিয়ে দিল। মৌ প্রথমে কিছুতেই ওটা নিতে চাচ্ছিল না। কিন্তু রোহনে’র জোরাজুরি আর একগুঁয়ে দৃষ্টি দেখে সে বাধ্য হয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে বক্সটা নিজের মুঠোয় নিল। অত্যন্ত মিনমিন স্বরে বলল‚ “থ্যাংকস ভাইয়া।
​“থ্যাংকস ভাইয়া?
রোহনের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। “এতটা বদলে গেলি কীভাবে ফুল? তুই কি আগে কখনো আমার সাথে এমন ব্যবহার করতি?
​”আ আ আ আমি রুমে যাবো। প্লিজ আমাকে যেতে দাও।
​মৌ পুরো বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দ্রুত পা বাড়িয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু রোহান এক চুলও সরল না বরং পাহাড়ের মতো অটল হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। উজানে’র অনুপস্থিতিতে রোহনে’র এমন আচরণে এবার মৌ’য়ের মনে মনে বেশ রাগ হলো কিন্তু পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে সে মুখে কিছু বলল না। ঠিক তখনই রোহনে’র সেই চেনা আকুতি আবারও তার কানের কাছে ভেসে এলো।

​“এই এতিম ছেলেটাকে একটু ভালোবাসলি না‚ ফুল?
​মায়ার অবসান ও তীব্র ঘৃণা
​রোহনে’র মুখে আবারও সেই একই প্রশ্ন শুনে মৌ চমকে তার দিকে তাকাল। সে যতই এই মানুষটার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে‚ পরিস্থিতি ঠিক ততটাই তাকে রোহনে’র মুখোমুখি এনে দাঁড় করাচ্ছে। সে এক চরম অসহায় ও বিরক্ত দৃষ্টিতে রোহনের দিকে চেয়ে বলল‚
​”ভাইয়া তুমি সেই একই কথা কেন বারবার বলছ‚ বলো তো? তুমি খুব ভালো করেই জানো যে আমি এখন একজন বিবাহিত নারী‚ অন্য একজনের আমানত। তবুও তুমি কেন আমার সামনে বারবার এমন করছো? আমার সত্যি এসব শুনতে বিন্দুমাত্র ভালো লাগছে না। প্লিজ আমাকে রেহাই দাও তুমি।
​রোহন মৌ’য়ের চোখের দিকে চেয়ে এক অদ্ভুত ও অন্ধ ঘোরে বলে উঠল‚ “তাহলে তুই সব ছেড়েছুড়ে আমার হয়ে যা ফুল…শুধু আমার হয়ে যা।
​রোহনে’র মুখে এমন অনৈতিক দাবি শুনে মৌ’য়ের ভেতরের সব মায়া এক নিমেষে উবে গেল. তার বদলে চোখের কোণে উপচে পড়ল তীব্র ঘৃণা। যে মানুষটার জন্য কিছুক্ষণ আগেও তার মনের ভেতর এক আকাশ করুণা আর মায়া হচ্ছিল‚ এখন তার জন্য শুধু ঘৃণাই দানা বাঁধছে। নিজেকে বিবাহিতা জানার পরেও এই ছেলেটা বারবার একই নোংরা দাবি তুলছে কীভাবে। ​মৌ আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারল না। সে রাগ ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে তীব্র কণ্ঠে বলে উঠল।

​”প্লিজ এবার অন্তত থামো ভাইয়া। তুমি কি ভুলে যাচ্ছো প্রফেসর সাহেব তোমার নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড? আর তুমি আজ বন্ধুবৎসল ভাই হয়ে নিজের সেই কলিজার বন্ধুর ভালোবাসাকেই এভাবে কেড়ে নিতে চাইছো? তোমার নিজের বিবেকে একটুও বাধছে না।
​রোহান যেই কিছু একটা বলতে যাবে‚ ঠিক তখনই পেছন থেকে এক গাম্ভীর্যপূর্ণ পুরুষালি কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো।
​“এই ভরসন্ধ্যা বেলা উঠোনে দাঁড়িয়ে কী করছো পিচ্চি?
​উজান’কে দেখতে পেয়েই মৌ’য়ের চোখে-মুখে যেন প্রাণ ফিরে এলো। সে এক গাল মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে রোহনে’র দিক থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে সোজা গিয়ে উজানে’র চওড়া বুকে আছড়ে পড়ল। উজানও পরম যত্নে তাকে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিল।
​পেছন থেকে রোহান অত্যন্ত রক্তিম ও হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাদের এই নিবিড়তার দিকে। তার বুকের ভেতরটা ঈর্ষা ও তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল। নিজের ভালোবাসার মানুষকে‚ নিজেরই প্রাণের বন্ধু উজানে’র বাহুলগ্না অবস্থায় কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছিল না সে। সে নিজের হাতের মুঠো শক্ত করে ধরে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল‚ ​“না‚ আমার বিবেকে একটুও বাধছে না রে ফুল। তোকে নিজের করে পাওয়ার জন্য রোহান তালুকদার সব করতে পারে। দরকার হলে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড উজান’কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতেও সে এক পা পিছু হটবে না। রোহান তালুকদারকে এখনো তুই চিনতে পারিসনি ফুল‚ সে বাইরে থেকে যতটা শান্ত‚ ভেতর থেকে ঠিক ততটাই ভয়ংকর।

​“কী রে রোহান? এভাবে চুপ করে আছিস কেন? কিছু বলছিস না যে?
হঠাৎ উজানে’র কণ্ঠস্বর পেয়ে রোহানে’র ঘোর কাটল। ​রোহান মুহূর্তের মধ্যে নিজের কঠিন মুখের ওপর এক মেকি হাসির প্রলেপ লাগিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় আওড়াল‚ “দোস্ত তুই কিন্তু আসলেই অনেক লাকি! দেখ‚ আমার মিষ্টি ফুলকে…আই মিন আমার এই ছোট বোনটার মতো মৌ’কে তুই নিজের করে পেয়েছিস। তবে হ্যাঁ‚ একটু সাবধানে থাকিস কিন্তু। আজকাল চারদিকে তো শকুনের অভাব নেই‚ কখন কে কার শখের জিনিসে নজর দেয় বলা তো যায় না।
​উজান নিজের দুই ভ্রু কুঁচকে কিছু সময় রোহনে’র দিকে তাকিয়ে রইল। রোহনে’র এই দ্ব্যর্থবোধক কথার ভেতরের আসল গভীরতা উজান ঠিক বুঝতে পারল না। তবে সে আলতো হেসে আত্মবিশ্বাসের সুরে জবাব দিল।

​“শকুনি বা শেয়াল যেই থাকুক না কেন‚ আমার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে যে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে। তাকে জ্যান্ত কবর দিতে উজান চৌধুরীর বুক একটুও কাঁপবে না। বাই দ্য ওয়ে‚ এবার ভেতরে চল।
​রোহন আগে আগে ভেতরে চলে গেল এবং উজান ও মৌ তার পিছু পিছু বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। হাঁটার মাঝেই হুট করে উজান মৌ’য়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চমকে উঠল। সে থমকে দাঁড়িয়ে মৌ’য়ের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ চিন্তিত স্বরে বলল‚ “পিচ্চি তোমার গা এত গরম কেন? জ্বর এসেছে নাকি? শরীর খুব খারাপ লাগছে তোমার?
​মৌ নিজের ভেতরের মানসিক ঝড় ও অসুস্থতা উজানে’র সামনে প্রকাশ করতে চাইল না। সে জোর করে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল‚ “না না এমনি। আপনি চলুন তো। ইফাত ভাই‚ মেহু সবাই দাদির রুমে আমাদের জন্য ওয়েট করছে। কিন্তু তন্ময় ভাই কোথায়? মাগরিবের আজান তো দিয়ে দিল‚ এই সন্ধ্যাবেলা সে একা একা কোথায় গেল?

​“আসবে একটু পরেই। ও আমাদের সবার জন্য গরম গরম সিঙ্গারা আর পুরি আনতে বাজারে গিয়েছে। চলো এবার।
​এরপর আর তাদের মাঝে কোনো কথা হলো না। মৌ সোজা দাদির রুমের দিকে চলে গেল। আর উজান ফ্রেশ হওয়ার জন্য নিজেদের রুমে ঢুকল। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ পর সেও গিয়ে হাজির হলো দাদির রুমে। ​রুমে গিয়ে দেখল সবাই বিছানায় গোল হয়ে বেশ জমিয়ে বসে আছে। ইফাত বরাবরের মতোই মেহের’কে একদম নিজের গা ঘেঁষে বসিয়ে রেখেছে। মৌ তার দাদি রোকেয়া বেগমের কোলে মাথা রেখে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। আর রোহন মৌ’য়ের বেশ কিছুটা কাছে বসে আছে‚ তার ঠিক পাশেই তন্ময়। ​রোহন’কে মৌ’য়ের এত কাছাকাছি বসতে দেখে উজানে’র ভেতরের অধিকারবোধ চট করে জেগে উঠল‚ তার রাগে মেজাজটা শক্ত হয়ে গেল। তবে নিজের সেই ঈর্ষা বাইরে প্রকাশ না করে সে অত্যন্ত চতুরতার সাথে গিয়ে সরাসরি মৌ ও রোহনে’র ঠিক মাঝখানটাতে বসে পড়ল। বসেই সে এক হেঁচকা টানে মৌ’কে দাদির কোল থেকে সরিয়ে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। তারপর মৌ’য়ের দাদির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে উঠল।

​“সরি সুইটহার্ট! উজান চৌধুরী তার ওয়াইফিকে কারও সাথে শেয়ার করতে পারবে না‚ এমনকি আপনার সাথেও নয়। ওকে বুকে আগলে রাখার জন্য উজান চৌধুরী একাই একশ। সো আপনি একটু সোজা হয়ে বসুন তো.
​রোকেয়া বেগম মুখের পান চিবুতে চিবুতে উজানে’র এমন পাগলামি দেখে হেসে উঠলেন। তার দুই আদুরে নাতনি যে উজান আর ইফাতে’র মতো ছেলেদের মাথার মুকুট হয়ে আছে‚ তা দেখে বুড়ো মানুষের মনটা শান্তিতে ভরে উঠল। ​আড্ডার মাঝেই উজান হঠাৎ রোহনে’র দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো‚
“আচ্ছা রোহান এবার তুই বিয়ে করবি কবে বল তো? তোর সেই মনের মানুষের নামটা এবার তো প্রকাশ কর ভাই। এবার না হয় তোর বিয়েটা খেয়েই আমরা একেবারে দলবল নিয়ে ঢাকায় ফিরব‚ কী বলিস তোরা?
​বন্ধুর কথায় তাল মিলিয়ে তন্ময়ও মুখরোচক ভঙ্গিতে বলে উঠল‚ “একদম ঠিক বলেছিস উজান। তুই বিয়ে করলি‚ ইফাতও বিয়ে করে ফেলল‚ এখন রোহানও একটা বিয়ে করে ফেলুক না। ও বিয়ে করলে না হয় আমি ওর শালীকে পটিয়ে ডিরেক্ট বিয়ে করে একবারে বাসায় ফিরব‚ কী বলিস তোরা?
​তন্ময়ের এই রসালো রসিকতায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল। কিন্তু ঠিক তখনই রোহনে’র একটিমাত্র বাক্য পুরো রুমের হাসির রেশকে এক সেকেন্ডে স্তব্ধ করে দিল।

​“আমার বাগানের ফুল যে অন্য বাগানে ঘর বেঁধেছে।
​“হোয়াটটট। তোর ভালোবাসার ফুলের অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গিয়েছে? আর তুই সেটা আমাদের এখন বলছিস? তুই তো মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসতিস‚ তবে তুই তাকে আটকালি না কেন?
​রোহন এবার সরাসরি মৌ’য়ের চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ ও শক্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গম্ভীর গলায় বলল‚ “আগে যদি জানতাম আমার চোখের আড়ালে আমার সেই ভালোবাসার ফুল অন্য কারও ঘরণী হয়ে যাবে‚ তবে কি আর আমি ওমন করে বিদেশের মাটিতে মুখ বুজে পড়ে থাকতাম? আমি তো দেশে ফিরে এসেই এই নির্মম সত্যটা জানতে পারলাম।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪২

​“তো এখন কী করবি? ওই মেয়েটাকে ভুলে যাবি? —উজান উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
​“যাকে নিজের বাগানের একমাত্র ফুল করতে চেয়েছি‚ তাকে আমি ভুলি কীভাবে বল তো?
রোহনে’র গলায় এক চরম জেদ ও হিংস্রতা ফুটে উঠল। ​উজান কপাল কুঁচকে আবার প্রশ্ন করল‚ “তাহলে মেয়েটির স্বামী? তার কী হবে?
​রোহন চোখের পলক না ফেলে ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিল। “শুট করে দেবো। ফুল অনলি…..

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here