Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৩

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৩

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৩
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

মাঝের একটা সপ্তাহ যেন পলকের মধ্যে কেটে গেল। এই সাতটা দিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়ামকে সাজানো হয়েছে রাজকীয় সাজে। আজ সেই বহুল প্রতিক্ষিত ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ। খেলা শুরু হবে ঠিক দুপুর ১২টায়। সকাল থেকেই পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে উৎসবের আমেজ।
​বেলা ঠিক ১১টা ১৫ মিনিটে রিত্তিকা স্টেডিয়ামে এসে পৌঁছাল। তার গায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল-সাদা জার্সি, চুলে শক্ত করে পনিটেল বাঁধা। ভেন্যুতে পা রাখতেই সে দেখল গ্যালারির অর্ধেকটা ইতিমধ্যে ভরে গেছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাদের দলকে সাপোর্ট করতে বিশাল ব্যানার নিয়ে হাজির হয়েছেন। আর কোর্টের একপাশে দাঁড়িয়ে নিজস্ব গম্ভীর মেজাজে ওয়ার্ম-আপ করছে প্রফেসর জিয়ান কায়সার। জিয়ানের পরনেও ম্যাচিং জার্সি, যা তার অ্যাথলেটিক বডি স্ট্রাকচারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

রিত্তিকা এসে তার দুই বান্ধবী আনিকা আর নিহারিকার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। মনের ভেতর একটু আধটু নার্ভাসনেস কাজ করলেও মুখে সে সাহসের আভাস ধরে রেখেছে। এমন সময় সেখানে এসে হাজির হলো জিয়া। সে রিত্তিকার পিঠ চাপড়ে বলল, “কোনো টেনশন করিস না রিত্তি, জাস্ট প্র্যাকটিসের মতো খেলবি।”
​দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা ১২টার কাছাকাছি চলে এল। খেলা শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। ঠিক তখনই জিয়ান গম্ভীর পায়ে রিত্তিকার দিকে এগিয়ে এল। তার চোখে এখন আর আগের সেই অবজ্ঞা নেই, বরং সেখানে এক ধরনের প্রফেশনাল স্পার্ক।
​জিয়ান রিত্তিকার সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “ম্যাচ শুরু হতে পাঁচ মিনিট বাকি, মিস পুকি পাই। নার্ভাসনেস থাকলে এখানেই ঝেড়ে ফেলো। আজ প্রতিপক্ষ কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ওরা সহজে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না। সো, গেট রেডি।”
রিত্তিকা জিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসল, “আমি তৈরি স্যার। আপনি শুধু নিজের দিকটা সামলান।”
রেফারির দীর্ঘ হুইসেলের সাথে সাথে জিয়ান ও রিত্তিকা কোর্টে গিয়ে দাঁড়াল। গ্যালারি থেকে সকল দর্শকের চিৎকারে পুরো স্টেডিয়াম তখন কাঁপছে—”জে-ইউ! জে-ইউ!” ওপাশ থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমর্থকরাও স্লোগান দিচ্ছে।

ম্যাচের শুরুতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লেয়াররা আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করল। বিশেষ করে তাদের স্ম্যাশগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। প্রথম কয়েক মিনিটে জিয়ান আর রিত্তিকার মধ্যে বোঝাপড়ার সামান্য ঘাটতি দেখা গেল। জিয়ান ব্যাক-কোর্টে দাঁড়িয়ে লং শট সামলাচ্ছিল, আর রিত্তিকা নেট-এর কাছে ফ্রন্ট-কোর্ট পাহারা দিচ্ছিল। প্রতিপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লেয়াররা চালাকি করে রিত্তিকার দিকে পরপর দুটো ড্রপ শট মারল, যা রিত্তিকা তোলার আগেই মাটিতে ড্রপ খেল।
​স্কোরবোর্ড চড়চড় করে তাদের পক্ষে বাড়তে লাগল। গ্যালারিতে তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উল্লাস। রিত্তিকা কিছুটা দমে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই জিয়ান ধীর পায়ে রিত্তিকার একদম পাশে এসে দাঁড়াল।
জিয়ান রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু ভরসা জাগানো গলায় বলল, “শোনো মিস পুকি, প্যানিক করার কিছু নেই। ওরা তোমার ফ্রন্ট-কোর্ট টার্গেট করছে। তুমি একটু পিছিয়ে পজিশন নাও, ড্রপগুলো আমি এসে কাভার করব। জাস্ট ট্রাস্ট মি।”

​প্রফেসরের মুখে প্রথমবার কোনো কটু কথার বদলে এই ভরসাটুকু পেয়ে রিত্তিকার মনের সব ভয় এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল, “ওকে স্যার। লেটস ডু ইট।”
এরপরই শুরু হলো আসল ম্যাজিক। জিয়ান আর রিত্তিকা যেন দুটি আলাদা মানুষ রইল না, তারা হয়ে উঠল একটা নিখুঁত টিম। জিয়ানের ক্ষিপ্রতা আর রিত্তিকার টেকনিকের মেলবন্ধনে ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ঘুরে গেল।
​প্রতিপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্লেয়ার কোর্টের কোণা থেকে একটা সজোরে স্ম্যাশ মারল। জিয়ান বাজপাখির মতো ডাইভ দিয়ে সেই শাটল কর্কটি তুলে দিল কোর্টের মাঝখানে। প্রতিপক্ষ সেটা কোনোমতে রিটার্ন করতেই রিত্তিকা বাতাসে লাফিয়ে উঠল। তার হাতের র‍্যাকেটটি যেন বিদ্যুতের গতিতে বাতাসে ঘুরল। সপাং! একটা ডেডলি ডাউন-দ্য-লাইন স্ম্যাশ! শাটল কর্কটি বুলেট গতিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের কোর্টের লাইনে আছড়ে পড়ল। প্রতিপক্ষ প্লেয়ার নড়ার সুযোগও পেল না।
পুরো স্টেডিয়ামের দর্শকরা একসাথে গর্জে উঠল—”রিত্তিকা! রিত্তিকা!”
​জিয়ান রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে মুখে কিছু না বললেও আলতো করে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইশারায় বলল—ব্রিলিয়ান্ট!

​এরপর থেকে জিয়ান আর রিত্তিকা কোর্টে ত্রাস সৃষ্টি করল। জিয়ান যখন ব্যাক-কোর্ট থেকে একেকটা কামানের গোলার মতো স্ম্যাশ মারছিল, ওদিকে রিত্তিকা নেটের কাছে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে রিস্ট-ফ্লিক দিয়ে ড্রপ শট খেলছিল। প্রতিপক্ষ প্লেয়াররা বুঝতেই পারছিল না শট কোন দিকে যাবে। জিয়ান ও রিত্তিকার মধ্যে কোনো কথা হচ্ছিল না, কিন্তু তাদের চোখের ইশারা আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল নিখুঁত। জিয়ান যখনই ডানে সরছিল, রিত্তিকা চট করে বামের গ্যাপ কাভার করে নিচ্ছিল।
খেলার শেষ সময় যখন পঁচিশ মিনিট, তখন স্কোরবোর্ড টাই হয়ে গেল। এখন যে শেষ পয়েন্ট পাবে, সেই চ্যাম্পিয়ন। পুরো স্টেডিয়ামে তখন পিনপতন নীরবতা। সবার চোখ কোর্টের মাঝখানে।
​প্রতিপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লেয়ারটি সার্ভিস করল। জিয়ান সেটাকে আলতো করে পুশ করল। প্রতিপক্ষ সেটা লব করে জিয়ানের মাথার ওপর দিয়ে পাঠাতে চাইল। জিয়ান সেটা মারার জন্য লাফাতে চাইল, কিন্তু রিত্তিকা চট করে জিয়ানের চোখের ভাষা বুঝে চেঁচিয়ে বলল, “আই হ্যাভ ইট স্যার!”
​জিয়ান সাথে সাথে নিচু হয়ে গেল, আর রিত্তিকা জিয়ানের ওপর দিয়ে এক অসাধারণ হাই-জাম্প নিয়ে তার পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে আঘাত করল। একটা অবিশ্বাস্য ক্রশ-কোর্ট স্ম্যাশ! কর্কটি প্রতিপক্ষের নেট ছুঁয়ে সোজা মাটিতে পড়ে গেল।

​”গেম, সেট অ্যান্ড ম্যাচ ঢাকা ইউনিভার্সিটি!” রেফারির ঘোষণার সাথে সাথেই পুরো ইনডোর
স্টেডিয়াম যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।
​চারদিক থেকে নীল আর সাদা কনফেটি বাতাসে উড়তে লাগল। আনুশা, নিহারিকা, আনিকা আর জিয়া চিৎকার করতে করতে কোর্টে ছুটে এসে রিত্তিকাকে জড়িয়ে ধরল। পুরো গ্যালারি তখন রিত্তিকা আর জিয়ানের নামে মুখরিত।
​সবার উল্লাসের মাঝে রিত্তিকা একটু হাঁপাতে হাঁপাতে জিয়ানের দিকে তাকাল। জিয়ান তার চিরচেনা গম্ভীর রূপ ছেড়ে এবার রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে মনখোলা একটা হাসি দিল। সেই হাসিতে ছিল রিত্তিকার প্রতি চরম শ্রদ্ধা আর এক বুক মুগ্ধতা।
​জিয়ান ধীর পায়ে রিত্তিকার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আই অ্যাম সরি রিত্তি। এক সপ্তাহ আগে আমি ভুল ছিলাম। তোমার মতো পার্টনার পাওয়া যেকোনো প্লেয়ারের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। ওয়েল প্লেড!”

​রিত্তিকা জিয়ানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরল। জিয়ানের হাতের উষ্ণতা তার পুরো শরীরে এক
অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। সে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে সেই এক সপ্তাহ আগের মতো চতুর কিন্তু মিষ্টি করে হেসে বলল, “ধন্যবাদ স্যার। তবে ভুলে যাবেন না, ট্রফিটা কিন্তু আমাদের ভার্সিটিই পেয়েছে। আর আপনার মতো একজনের সাথে একই টিমে খেলাটা… আসলেই দারুণ ছিল!”
​বিকেলের আলো যখন স্টেডিয়ামের কাঁচের ছাদ গলে ওদের ওপর পড়ল, তখন ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জিয়ান আর রিত্তিকার এই জুটিটি শুধু ব্যাডমিন্টন কোর্টের চ্যাম্পিয়নই হলো।
​ভার্সিটির টুর্নামেন্টের ম্যাচ শেষ করে যখন রিত্তিকা বাড়ি ফিরলো, তখন তার পুরো মুখ থমথমে। ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে ধপ করে বসে পড়লো। ড্রয়িংরুমে তখন পরিবারের সবাই গল্প করছিল। রিত্তিকার অমন মেঘাচ্ছন্ন মুখ দেখে চারপাশের হাসিখুশি পরিবেশটা মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।
​ইফাত বোনের দিকে একটু এগিয়ে এসে চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলো, “কী রে রিত্তি, খেলা কেমন হলো? শেষ পর্যন্ত কোন দল জিতলো রে?”

​ভাইয়ার কথার পিঠেই রিদিতা আর রিহানও কৌতুহলী হয়ে একসঙ্গে ড্রয়িংরুমে ছুটে এলো। রিহান অধৈর্য হয়ে বললো, “হ্যাঁ রে, একটু খুলে বল তো! তোদের ভার্সিটি কি শেষমেশ ট্রফিটা ধরে রাখতে পারলো, নাকি হাতছাড়া হলো?”
​সবার এত শত প্রশ্নের পরও রিত্তিকার কোনো হেলদোল নেই। সে কারোর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, মাটির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বসে রইলো। যেন কত বড় একটা অঘটন ঘটে গেছে!
​মেয়ের এই অবস্থা দেখে শানজাদা ইসলাম বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি রিত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললেন, “কী হয়েছে রে রিত্তি মা? মুখটা ওমন অন্ধকার করে রেখেছিস কেন? তোদের ভার্সিটি কি হেরে গেছে? তুই কি নিজের সেরাটা দিয়ে ঠিকঠাক খেলতে পারিসনি?”
​ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে রিতু ইসলাম সেখানে এলেন। মেয়ের মলিন মুখ দেখে মায়ের মনটাও খারাপ হয়ে গেল।

তিনি রিত্তিকার পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আরে, মন খারাপ করিস না মা। খেলায় হার-জিত তো থাকবেই। এবার পারিসনি তো কী হয়েছে? পরেরবার আরও ভালো করে প্রস্তুতি নিবি, আরও ভালো করে চেষ্টা করবি। দেখবি, ইনশাআল্লাহ আগামীবার তোরাই জিতবি!”
​সবার এত এত সান্ত্বনা, আদর আর ভালোবাসা মাখানো কথা শোনার পরও রিত্তিকা আরও কিছুক্ষণ মুখটা গোমড়া করেই রাখলো। ঘরের ভেতর তখন পিনপতন নীরবতা। সবাই ভাবছে মেয়েটাকে কীভাবে একটু হাসানো যায়।
​ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে, সবাইকে চমকে দিয়ে বাতাসে দু’হাত ছুঁড়ে চিৎকার করে উঠলো রিত্তিকা— “আমরা জিতে গেছি! হুররেররর… আমাদের ভার্সিটি জিতে গেছে! আমি পেরেছি মা, আমি পেরেছি! ইয়েইইই!”

​রিত্তিকার এই আকস্মিক রূপবদল দেখে ঘরের সবাই তো পুরো হা হয়ে গেল! ইফাত তখন সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে দারুণ উৎসাহিত হয়ে বললো, “কী বলিস! সত্যিইই?!”
​রিত্তিকা তখন খিলখিল করে হেসে উঠে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, “হ্যাঁ রে ভাইয়া, একদম সত্যি! তোদের সবাইকে একটু সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এতক্ষণ হারের নাটক করছিলাম!”
​মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাড়ির থমথমে ভাব কেটে গিয়ে আনন্দের রোল পড়ে গেল।
​ইফাত তখন রিত্তিকার মাথায় হালকা একটা টোকা দিয়ে হেসে ফেলে বললো, “তুই পারিসও বটে রিত্তি! মুখটা এমন বাংলা পাঁচের মতো করে রেখেছিলি যে আমাদের তো বুকটাই কেঁপে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল তোরা বোধহয় আসলেই হেরে গেছিস!”
​রিত্তিকা ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হেসে বললো, “আরে, একটু মজা করছিলাম তোদের সাথে। তোরা যেভাবে সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিলি, আমার তো হেসেই খারাপ দশা!”
​ঠিক তখনই ঘরের পরিবেশ আরও আনন্দময় করে দিয়ে বাড়ির মেইন গেটের কলিংবেলটা বেজে উঠলো— ‘টুং টাং’।

​”আমি দেখছি কে এসেছে!”— বলেই রিত্তিকা ড্রয়িংরুম থেকে এক ছুটে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
​দরজাটা খুলতেই রিত্তিকার চোখ দুটো বিস্ময়ে আর আনন্দে চকচক করে উঠলো। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আর কেউ নন, স্বয়ং রিত্তিকার বাবা আরিশান ইসলাম! অফিসের কাজে বেশ কিছুদিন ধরে তিনি থাইল্যান্ডে ছিলেন।
​বাবাকে দেখা মাত্রই রিত্তিকা সমস্ত জমানো আবেগ নিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তারপর জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই একটু দূরত্ব বজায় করে, কৃত্রিম অভিমান আর নালিশের সুরে বলতে লাগলো, “কত দিন পর বাড়ি এলে বলো তো আব্বু? তোমার কি আমার কথা একটুও মনে পড়তো না? এতগুলো দিন পর কেউ বাড়ি ফেরে?”
​আরিশান ইসলাম মেয়ের গাল দুটো টেনে দিয়ে হেসেই আকুল হলেন। তিনি পরম স্নেহে বললেন, “তোর কথা আমার মনে পড়বে না, এটা কোনো কথা রে পাগলী? তোকে যে আমি কতটা মিস করেছি, সেটা শুধু আমিই জানি। আর শোন, শুধু শুধু তো আর দেরি করিনি কাজের জন্য দেরি হলো, তোর জন্য একটা দারুণ সারপ্রাইজ নিয়ে এসেছি।”
​রিত্তিকা চোখ বড় বড় করে উৎসাহ নিয়ে জানতে চাইলো, “কী সারপ্রাইজ? কী এনেছো আমার জন্য, বলো না আব্বু?”
​বাবা রহস্যের হাসি হেসে বাইরের দিকে ইশারা করে বললেন, “বাইরে দেখ একটা বড় বক্স রাখা আছে, ওটা গিয়ে নিজেই খুলে দেখ।”

“আচ্ছা, এখনই দেখছি!”— বলেই রিত্তিকা কৌতূহল সামলাতে না পেরে একছুটে বাইরে চলে গেল।
​বাইরে রাখা সুন্দর করে সাজানো বক্সটার সামনে গিয়ে রিত্তিকা যখন সাবধানে ঢাকনাটা খুললো, তার মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্য কোনো কথা বের হলো না। বক্সের ভেতরে বসে আছে তুলোর মতো নরম, ধবধবে সাদা রঙের একটা মিষ্টি পারশিয়ান বিড়াল! বিড়ালটি তার নীল রঙের গোল গোল চোখ দুটি মেলে রিত্তিকার দিকেই তাকিয়ে আছে।
​বিড়ালপ্রেমী রিত্তিকা তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে ডানা কাটা পাখির মতো নাচতে লাগলো। সে পরম আদরে বিড়ালটাকে কোলে তুলে নিলো। তারপর বিড়ালটাকে বুকে জড়িয়ে ধরেই ঘরের ভেতর এসে আবারও আরিশান ইসলামকে জড়িয়ে ধরলো।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১২

আর রিত্তিকা বললো, “আব্বু! তুমি শেষ পর্যন্ত একটা বিড়াল এনেছো আমার জন্য? ওহ মাই গড, কী সুন্দর আর কি কিউট বিড়ালটা! থ্যাংক ইউ সো মাচ আব্বু! তুমি পৃথিবীর সেরা বাবা!”
মেয়ের এই বাঁধভাঙা আনন্দ দেখে আরিশান ইসলামের দীর্ঘ সফরের সব ক্লান্তি যেন এক নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। পুরো পরিবারে তখন আনন্দের এক নতুন হাওয়া বইছে।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here