প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৮
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
__”আরে তেমন কিছুই না রে বাবা!” কথাটা বলেই জিয়া একটু হাসার চেষ্টা করল।
__”আচ্ছা, চলি রে জিয়া। ঘরে গিয়ে পড়তে বসতে হবে, নাহলে আবার তোর ওই গম্ভীর ভাই শুরু হয়ে যাবে। ওনার ওই লেকচার শোনার চেয়ে পড়াটাই মঙ্গল!”
জিয়া হেসে বলল, “আচ্ছা যা,
।”
রিত্তিকা দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে ফিরে এলো। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল জিয়ান অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে টেবিলে কিছু খাতা দেখছে। জিয়ানের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রিত্তিকা কিছুটা ইতস্তত করে এগিয়ে গেল।
__”স্যার, এটা কি আজকের টেস্টের খাতা দেখছেন?” রিত্তিকা গলাটা কিছুটা নরম করে জিজ্ঞেস করল।
জিয়ান খাতা থেকে চোখ না তুলেই সংক্ষেপে জবাব দিল,
__”হুম।”
রিত্তিকার তর সইছিল না। সে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, __”আমি কত পেয়েছি স্যার? একটু বলা যাবে?”
জিয়ান এবার খাতাগুলো গুছিয়ে রেখে রিত্তিকার দিকে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা রাশভারী চাউনি। __”কালকেই জানতে পারবে।”
__”কেন? আজকে বললে কী এমন ক্ষতি হবে! একটু বলুন না প্লিজ…” রিত্তিকা খানিকটা আবদারের সুরে বলল।
__”কালকে যখন বাকি স্টুডেন্টরা জানতে পারবে তারা কত পেয়েছে, ঠিক তখনই তুমিও জানতে পারবে। তার আগে নয়।” জিয়ানের কণ্ঠস্বর পাথরের মতো শক্ত।
রিত্তিকা আর সেখানে দাঁড়াল না। মনে মনে গজগজ করতে করতে উল্টো ঘুরে হেঁটে চলে এলো। মনে মনে বললো,
__’হুহ্! বললে মনে হয় ওনার জাত চলে যেত! পুরো খচ্ছর প্রফেসর একটা!’
পরদিন সকালে ভার্সিটির ক্লাস শেষ হতেই নিহারিকা, জিয়া আর রিত্তিকা এসে বসল ক্যাম্পাসের সেই পুরোনো, বিশাল বট গাছটার নিচে।
চারিদিকে তখন এক মায়াবী স্নিগ্ধ হাওয়া বইছে। দুপুরের চড়া রোদের মাঝেও এই বট গাছটার তলাটা যেন এক টুকরো স্বর্গ। গাছের পাতার ফাঁক গলে আসা সোনালী রোদের আলো-ছায়া খেলছিল ঘাসের ওপর। । চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে পাতার মর্মর শব্দ আর মৃদু বাতাসের হিল্লোল মনের সব ক্লান্তি এক নিমেষে জুড়িয়ে দিচ্ছিল।
গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে রিত্তিকা হঠাৎ বলে উঠল,
__ “চল, আইসক্রিম খেয়ে আসি।”
জিয়া কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে বলল,
_* “হুম চল, যা গরম পড়েছে! এই গরমে একটু ঠান্ডা আইসক্রিম পেলে সত্যি শান্তি লাগবে।”
তিনজন মিলে বট গাছের ছায়া ছেড়ে পিচঢালা তপ্ত রাস্তার ধারে এসে দাঁড়াল। এপারে একটা আইসক্রিমের দোকান আছে। কিন্তু নিহারিকা ওদিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে বলল,
__”এইপাশের দোকানটা তো বন্ধ রে রিত্তি!”
__”হ্যাঁ, তাই তো দেখছি,” রিত্তিকা একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, তোরা এখানে দাঁড়া। আমি ওই রাস্তার ওপাশের দোকানটা থেকে কিনে আনছি।”
জিয়া পেছন থেকে ডেকে বলল,
___ “আচ্ছা যা, একটু সাবধানে রাস্তাটা পার হস কিন্তু।”
রিত্তিকা দ্রুত রাস্তা পার হয়ে ওপাশ থেকে তিনটে আইসক্রিম কিনে নিয়ে আসছিল। ঠিক মাঝ রাস্তায় আসতেই আচমকা তার হাত থেকে ফোনটা ফসকে পিচঢালা রাস্তার ওপর পড়ে গেল।
__”ধুর!” বলে রিত্তিকা নিচু হয়ে ফোনটা তুলতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে একটা কালো গাড়ি তীব্র গতিতে হর্ন বাজাতে বাজাতে তার দিকেই আসছিল। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে স্ক্র্যাচ পড়ল কি না, তা দেখতে গিয়ে রিত্তিকা বুঝতেই পারেনি গাড়িটা কত কাছে চলে এসেছে।
যখন সে ফোনটা হাতে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গেল, তখনই তার চোখ পড়ল সামনে। তীব্র হেডলাইটের আলো আর গাড়ির কর্কশ ব্রেক কষার শব্দ! গাড়িটা একদম কাছে চলে এসেছে! ভয়ে রিত্তিকার হাত-পা অবশ হয়ে গেল, সে এক পা-ও নড়তে পারল না।
ঠিক তখনই, বাজ পড়ার মতো গতিতে কেউ একজন পেছন থেকে এসে রিত্তিকার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল!
মুহূর্তের মধ্যে রিত্তিকা আর সেই অচেনা লোকটা ছিটকে রাস্তার পাশে গিয়ে পড়ল। রিত্তিকার কনুই আর হাতের তালু রাস্তার শক্ত পাথরে ছিলে গেল। কিন্তু গাড়ির ধাক্কা থেকে বেঁচে গেলেও, তীব্র আতঙ্কে আর হার্টবিট বেড়ে যাওয়ায় রিত্তিকার চোখ দুটো বুজে এলো। সে ওখানেই অজ্ঞান হয়ে গেল।
লোকটা তাড়াহুড়ো করে উঠে বসে রিত্তিকার নেতিয়ে পড়া শরীরটা দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। সে রিত্তিকার গালে আলতো চাপ দিয়ে আকুল হয়ে ডাকতে লাগল,
___”বার্বি! ঠিক আছিস তুই? চোখ খোল পাখি… দেখ আমি এসে গেছি! প্লিজ বার্বি, চোখ খোল!”
কিন্তু রিত্তিকার কোনো সাড়াশব্দ নেই। লোকটা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে রিত্তিকাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।
ততক্ষণে নিহারিকা আর জিয়া চিৎকার করতে করতে রাস্তা পার হয়ে ছুটে এসেছে। লোকটার চোখে-মুখে তখন তীব্র আতঙ্ক। সে তাদের দেখে রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
__ “আপনারা কে?”
নিহারিকা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
__”আমরা ওর বন্ধু।”
__”চলুন, ওকে এখনই হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে!” লোকটা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের গাড়ির দিকে ছুটল।
হসপিটালে পৌঁছে লোকটা রিত্তিকাকে সোজা একটা কেবিনে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল। চিৎকার করে ডাকল,
___”নার্স! ইমিডিয়েটলি দেখুন ওর কী হয়েছে! জাস্ট
একটু আগে একটা বড় এক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিল!”
নার্স এসে দ্রুত রিত্তিকার পালস চেক করলেন এবং ক্ষত স্থানটা দেখলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
__”ভয়ের কিছু নেই। উনি আসলে অতিরিক্ত আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়েছেন। আর হাতটা একটু ছিলে গেছে। আমি ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি, কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে।”
__”ওকে, প্লিজ একটু সাবধানে করবেন,” লোকটা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে রিত্তিকার মাথার পাশে এসে বসল। তার চোখে তখনো গভীর উদ্বেগ। জিয়া আর নিহারিকা তখন কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।
জ্ঞান ফেরার পর রিত্তিকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো,
_-“আনু ভাইয়া! তুমি?!”
ছেলেটা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,
__”এই! আমার নাম কিন্তু আহনাফ। ঠিক করে নাম ধরে ডাক!”
রিত্তিকা তার ছিলে যাওয়া হাতের ব্যথা ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠল,
__”সে যাই হোক, আনু তো আনুই!”
আহনাফের মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। সে রিত্তিকার কপালে আলতো টোকা দিয়ে বলল,
__ “তোর কি কোনো আক্কেল নেই বার্বি? রাস্তা কীভাবে পার হচ্ছিস তুই? মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেউ ফোন তোলে?”
রিত্তিকা একটু অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, __”ফোনটা হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল তো, তাই দেখিনি যে ওপাশ থেকে গাড়ি আসছে।”
__”যদি আজ কিছু হয়ে যেত? তাহলে কী হতো?” আহনাফের কণ্ঠে তখনো ভয়ের রেশ।
__”কীভাবে হতো? তুমি তো ছিলে, বাঁচিয়ে নিলে!” রিত্তিকা মিষ্টি করে হাসল।
__”যদি আমি সময়মতো না আসতাম?”
__”তাহলে মরে যেতাম!” রিত্তিকা সহজভাবে বলল।
আহনাফ এবার সত্যিই রেগে গিয়ে হাত তুলল
__, “একটা থাপ্পড় মারব বেয়াদব! খুব বাড় বেড়েছে তোর, তাই না? মুখে মুখে তর্ক করিস!”
রিত্তিকা আহনাফের হাতটা ধরে বলল,
__ “আচ্ছা বাবা সরি, বাদ দাও তো! তুমি কবে আসলে আর এখানে কীভাবে?”
আহনাফ এবার একটু হেসে রিত্তিকার মাথায় হাত রাখল।
__”তোদের ভার্সিটির নতুন প্রফেসরের দায়িত্ব নিয়ে আজই জয়েন করতে এসেছি আমি।”
রিত্তিকার চোখ জোড়া এবার বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল।
__”সিরিয়াসলি?!”
__”হুম।”
পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন প্রায় হেলে পড়েছে। তপ্ত দুপুরের রেশ কেটে গিয়ে চারপাশের প্রকৃতিতে নেমে এসেছে এক শান্ত, বিষণ্ণ গোধূলির আলো। হসপিটালের চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে শেষ বিকালের আবির রাঙা রোদ এসে পড়ছিল আহনাফের গাড়ির উইন্ডশিল্ডে। এক অদ্ভুত নীরবতা যেন চারপাশটাকে গ্রাস করে নিয়েছে।
আহনাফ নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে রিত্তিকা আর জিয়াকে নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। সারাটা রাস্তা রিত্তিকা ব্যথার কথা ভুলে আহনাফের সাথে গল্প করছে।
গাড়ি এসে থামতেই জিয়া প্রথমে নেমে রিত্তিকার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। রিত্তিকা গাড়ি থেকে নেমে আহনাফের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৭
___”আনু ভাইয়া, ভেতরে এসো। একবারে রাতের খাবার খেয়ে যেও,” রিত্তিকা বেশ আন্তরিকতার সাথেই ভেতরে আসার অনুরোধ করল।
আহনাফ গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে জানলা দিয়ে একটু হাসল। মাথা নেড়ে বলল,
__ “আজ আর নয় রে বার্বি। অন্য দিন আসবো।কিছু কাজ আছে।
___”উফ্! কাজের বাহানা আর গেল না তোমার! আচ্ছা ঠিক আছে, সাবধানে যেও,” রিত্তিকা কিছুটা মুখ গোঁজ করে বলল।
__”নিজের খেয়াল রাখিস। আর হাতটায় ঠিকমতো ওষুধ দিস,” আহনাফ রিত্তিকাকে বিদায় জানিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়িটা ধীরগতিতে গলির মোড় পার হয়ে গেল।
