প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৪০
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
রিত্তিকা, জিয়া, জিয়ান, জিহাদ আর জেসমিন একসাথে ব্রেকফাস্ট করছে। বাড়ির দুই গৃহিণী এখনো রান্নাঘরে ব্যস্ত, আর দুই কর্তা নিজ ঘর থেকে এখনো নামেননি।
সবাই নাস্তার মাঝেই খোশগল্পে মেতে থাকলেও জিয়ান যেন আজ অন্য জগতে। সে চুপচাপ একমনে খেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মাঝে মাঝেই চোরের মতো আড়চোখে তাকাচ্ছে পাশেই বসা রিত্তিকার দিকে। জিয়ানের এই আড়চোখে তাকানো এড়লো না জিহাদের। চামচে কামড় দিয়ে মুখ চেপে হেসে জিহাদ বলে উঠলো,
— “বিগ ব্রো! একটু দয়া করে আমাদের দিকেও আড়চোখে তাকাও না! আমরা কোন জন্মে কী পাপ করেছিলাম যে নজর থেকে বঞ্চিত হব?”
জিয়ান খাওয়ার গতি একটুও কমালো না। জাস্ট এক পলক বরফশীতল চোখে জিহাদের দিকে তাকিয়ে ফের পরটায় কামড় দিল। সে ভালো করেই জানে, জিহাদের কথার উত্তর দেওয়া মানে নিজের মহামূল্যবান সকালটা নষ্ট করা।
পাশ থেকে জেসমিন এক গাল হেসে বলল,
— “তুই তো আর রিত্তিকা আপু না রে ! ভাইয়া তোর দিকে তাকালে তো সূর্য পশ্চিম দিকে উঠবে।”
— “আহা! একবারে খাঁটি কথা বলেছিস জেসমিন!”আমার দিকে তাকালে তো ব্যাপারটা কেমন রোমান্টিক থেকে হরর কমেডি হয়ে যাবে! ব্রো, শোনো, আড়চোখে তাকালে অত ফোকাস পাওয়া যায় না। তুমি সোজা হয়ে বসো, আমি দরকার হলে সিট ছেড়ে মাঝখান থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি, যাতে ভাবিকে দেখতে কোনো বাধা না আসে!”
জিয়ান এবার হাতের কাঁটাচামচটা প্লেটে একটু জোরেই শব্দ করে রাখল। চোখ দুটো বেশ বড় বড় আর গরম করে জিহাদের দিকে তাকাল। সেই এক চাউনিতেই জিহাদ একদম ভেজা বিড়াল! কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। জিয়ান আবার খেতেই জিহাদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এবার নিচু স্বরে বলল,
— “না মানে ভাই, মানলাম তোমার বউ, তুমি তো সারা জীবনই দেখবে। কিন্তু এই সকাল সকাল নাস্তার টেবিলে পরটার সাথে সাথে বউ গিলে খাওয়ার কী আছে, বুঝি না!”
এমন আজগুবি আর বেহায়াপূর্ণ কথা একমাত্র জিহাদের মাথা থেকেই বের হওয়া সম্ভব। জিয়ানের ধৈর্য এবার বাঁধ ভাঙল। গলার রগ ফুলিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
— “শাট ইউর মাউথ! তুই দেখেছিস আমি তাকিয়েছি? আজেবাজে বকা বন্ধ কর!”
— “অবিয়াসলি ব্রো! তুমি রিত্তিকা আপুর দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলে যেন—”
— “চুপ করবি ইডিয়ট, নাকি এখান থেকে তুলে আছাড় দেব?”
দুই ভাইয়ের এই তুলকালাম কান্ডের মাঝেই ভারী পদশব্দে খাবার ঘরে হাজির হলেন বাড়ির দুই কর্তা—আজমল কায়সার আর নওশাদ কায়সার। গম্ভীর মুখে দুইজন যার যার নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসলেন। মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের ভোল পাল্টে গেল।
রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা প্লেটে গরম পরটা আর ওমলেট এনে আজমল কায়সারের সামনে দিলেন রেনিয়া কায়সার। কিন্তু আজমল কায়সার খাবারের দিকে হাত না বাড়িয়ে সোজা ছোট ছেলে জিহাদের দিকে তাকালেন। গম্ভীর স্বরে বললেন,
— “বিজনেস কবে থেকে জয়েন করছিস জিহাদ? আমার কিন্তু দিন দিন বয়স বাড়ছে। আমি চাই এবার তুই তোর এই ছন্নছাড়া, ভবঘুরে জীবন থেকে বের হ। ব্যবসার হাল ধর। আমি আর তোর বড়চাচা কতদিনই বা টানব? জিয়ান একা একা ভার্সিটির প্রফেসরি আর অফিসের বিজনেস সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, আর তুই সারা শহর টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছিস!”
জিহাদের এতে বিন্দুমাত্র হেলদোল হলো না। সে অতি শান্তিতে ওমলেটের একটা বড় টুকরো মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে লাগল।
ছেলের ওপর স্বামীর এই ঝাড় দেখে রেনিয়া কায়সার আঁচল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “আহা, তুমি খালি ছেলেটার ওপর চড়াও হও কেন বলতো? জিহাদের কি এখনো বয়স হয়েছে যে ও এখনই ব্যবসার এত বড় চিন্তা মাথায় নেবে? ঘুরছে ঘুরুক না, বয়স হলে ঠিকই জিয়ানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দায়িত্ব বুঝে নেবে।”
আজমল কায়সার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে চড়া গলায় বললেন,
— “হ্যাঁ, তোমার ছেলে তো একদম কচি খুকি! দুদিন পর বিয়ে দিলে এক বাচ্চার বাপ হয়ে যাবে, তাও নাকি তার বয়স হয় নাই! ওনাকে দুধের বোতল কিনে দিই, নাকি বলো?”
আজমল কায়সারের কথায় টেবিলে যেন হাসির বিস্ফোরণ ঘটল! জেসমিন, জিয়া আর রিত্তিকা তো টেবিলের নিচে মুখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে শেষ। জিহাদ শুধু ওমলেট মুখে নিয়ে চোখ বড় বড় করে বাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
এবার বড়চাচা নওশাদ কায়সার মুচকি হেসে পরিবেশ হালকা করার জন্য বললেন,
— “আহা আজমল, ছোকরা মানুষ, ওর যখন ইচ্ছে হবে জয়েন করবে। এখন একটু ঘুরেফিরে নিক। ভাবছি এবার ওর একটা বিয়ে টা দিয়ে দিই। মাথায় যখন ঘাড়তেরা বউয়ের দায়িত্ব পড়বে, দেখবি পরদিনই টাই-সুট পরে সোজা অফিসে গিয়ে হাজির হয়েছে।”
আজমল কায়সার একটু নড়েচড়ে বসে বললেন,
— “ঠিকই বলেছো ভাইজান। এই মাথায় ছাঁত তলা না দিলে এর বাঁদরামো কমবে না। বউ এসে যখন ঠেলা দেখাবে, তখন বুঝবে।”
জিহাদ এতক্ষণ চুপ ছিল, এবার তড়িৎ গতিতে হাত ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল,
— “নেভার! ইম্পসিবল! আমি কোনো অফিসেও জয়েন করব না, আর কোনো মেয়েকে বিয়ে করে নিজের পায়ে কুড়ালও মারব না! তার চেয়ে আব্বু, তুমিই বরং আরেকটা বিয়ে করে নাও, তোমার বেশ শখ জাগছে মনে হচ্ছে!”
কথাটা শেষ হতেই টেবিলজুড়ে পিনপতন নীরবতা। রেনিয়া কায়সার চোখ দুটো গোল গোল করে স্বামীর দিকে ঘুরে তাকালেন। ঘরের আবহাওয়া এক সেকেন্ডে মোড় নিল ভয়ংকর ঝড়ের দিকে!
— “কী বললি জিহাদ? তুই তোর বাপের আরেকটা বিয়ে দিবি?”
জিহাদ ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
— “ইয়ে মানে… মা, আমি তো কিছু বলিনি! আব্বুই তো পরোক্ষভাবে শখ প্রকাশ করছিল…”
আজমল কায়সার চোখ কপালে তুলে বললেন,
— “অ্যাঁ! আমি কখন তোকে বললাম আমি বিয়ে করব? পাজি ছেলে, আমি তোর বিয়ের কথা বলছি, আমার না!”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই নওশাদ কায়সার টেবিলে চাপড় দিয়ে হেসে ফেলে বললেন,
— “ব্যস ব্যস! সবাই এবার থামো আর চুপচাপ খাও। আজমল, তুইও শান্ত হ।”
জিয়ান ততক্ষণে নিজের নাস্তা শেষ করে ঘড়ি দেখল। গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার খাওয়া শেষ।”
আজ ভার্সিটিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে। তার সাথে একই গাড়িতে যাবে জিয়া আর রিত্তিকা। জিয়ানের ওঠাই যেন সঙ্কেত—জিয়া আর রিত্তিকাও দ্রুত শেষ খাওয়া শেষ করে চলে আসলো।
দুপুর ১২টা। মাথার ওপর সূর্যটা যেন আগুন ঢালছে। ক্লাসের চাপ শেষ হতেই ক্যাস্পাসের সবুজ প্রাঙ্গণ জুড়েই শিক্ষার্থীদের আনাগোনা। কেউ দল বেঁধে গাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউবা ছুটছে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে চিল্ড কফি খেতে।
ক্যাম্পাসের বিশালাকার বটগাছটার নিচে বসে আছে জিয়া, নিহারিকা আর রিত্তিকা। বাতাসে হালকা পাতার শব্দ হলেও দুপুরের কড়া রোদ থেকে এই ছায়াটুকু যেন স্বর্গের মতো লাগছে।
নিহারিকা মুগ্ধ চোখে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে গাল লাল করে বলল,
— “জানিস রিত্তি, দিন দিন তুই কেমন যেন আরও বেশি সুন্দর হয়ে যাচ্ছিস! তোর ত্বকে একটা আলাদা গ্লো এসে গেছে।”
রিত্তিকা বলল,
— “নিহা! কই সুন্দর হলাম? যেমন ছিলাম তেমনই তো আছি, ধুলোবালি মেখে ভূত হয়ে আছি।”
পাশ থেকে জিয়া রিত্তিকার থুতনিতে হাত দিয়ে আলতো করে নাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— “না না, নিহা একদম ঠিক বলেছে। রিত্তি, তোকে কেমন যেন একদম অন্যরকম, ভীষণ মায়াবী লাগছে ইদানীং।”
রিত্তিকা দুটি সরু ভ্রু কুঁচকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
— “অন্যরকম মানে কেমন বলবি তো?”
জিয়া রিত্তিকার কানে কানে ফিসফিস করে দুষ্টুমির সুরে বলল,
— “বেশ সুন্দর রে! আসলে তুই তো এখন ‘ম্যারেড ওমেন’, সারাদিন জিয়ান ভাইয়ার অত ভালোবাসা আর রোমান্স পেলে রূপ তো দ্বিগুণ বাড়বেই, বল?”
— “ধুর! ফাজিল দুটো!” সে দাঁড়িয়ে পড়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বলল, “তোদের সাথে থাকাই দায়! চল, ক্লাসে চল, টাইম হয়ে গেছে।”
তিনজন হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল প্রশাসনিক ভবনের দিকের ঢালু রাস্তা ধরে। গল্পে মশগুল থাকায় রিত্তিকা খেয়ালই করেনি রাস্তার ঠিক মাঝখানে পিচ ঢালাইয়ের মধ্য থেকে একটা ভাঙা ইটের টুকরো বের হয়ে আছে।
হঠাৎ করেই ইটের সাথে সজোরে হোঁচট খেয়ে ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল রিত্তিকা! তার হাতের বই-খাতাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাফেটেরিয়ার মোড় ঘুরছিল জিয়ান। রিত্তিকাকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখেই জিয়ানের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার শান্ত, গম্ভীর অবয়ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল ভীতি আর ব্যাকুলতায়!
কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, লম্বা লম্বা পায়ে প্রায় দৌড়ে জিয়ান চলে এলো রিত্তিকার কাছে। সে ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রিত্তিকার ঠিক সামনাসামনি। তার লম্বা, শক্ত হাত দুটো দিয়ে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরল রিত্তিকার সুকোমল পা-টা। ইটের তীক্ষ্ণ কোণার আঘাতে পায়ের গোড়ালির ওপরের চামড়া খানিকটা ছিলে গিয়ে রক্ত জমে উঠেছে। ব্যথায় রিত্তিকার নিষ্পাপ চোখ দুটো থেকে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
জিয়ান নিজের হাত দিয়ে সেই ক্ষত স্পর্শ করতেই শিউরে উঠল রিত্তিকা। জিয়ানের কন্ঠস্বর উদ্বেগে কাঁপছে,
— “খুব কষ্ট হচ্ছে, রিশা? খুব ব্যথা লাগছে?”
সে শুধু জলভরা চোখে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
জিয়ান আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। রিত্তিকার সম্মতি বা পারিপার্শ্বিকতার কথা চিন্তা করার মতো মানসিক অবস্থায় সে তখন ছিল না। এক নিমেষে সে ডান হাতটা রিত্তিকার হাঁটুর নিচে আর বাঁ হাতটা পিঠের পেছনে দিয়ে রিত্তিকাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে নিল!
চারপাশের পরিবেশটা যেন এক সেকেন্ডে থমকে গেল।
ক্যাম্পাসের শত শত শিক্ষার্থী, যারা এতক্ষণ হেঁটে যাচ্ছিল বা আড্ডা দিচ্ছিল, তারা সবাই একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল! চোখ কপালে তুলে সবাই তাকিয়ে আছে এই দৃশ্যটার দিকে। ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে কঠোর, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং রাশভারী প্রফেসর জিয়ান কায়সার—যাকে সবাই বাঘের মতো ভয় পায়—সে আজ প্রকাশ্যে একজন সাধারণ স্টুডেন্টকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটছে! পুরো ক্যাম্পাস যেন নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে গেল। গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো মুহুর্তের মধ্যে।
জিয়ান সেসবের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে, দ্রুত পায়ে পার্কিংয়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ব্যাকুল কণ্ঠে রিত্তিকার কানের কাছে বলল,
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৯
__”জিয়ান হাঁটতে হাঁটতে বললো, বেশি ব্যথা পেয়েছো রিশা। খুব কষ্ট হচ্ছে। একুনি হসপিটালে পৌঁছে যাবো আমরা। ডোন্ট ক্রাই রিশা। আর এসব হিল কখনো পড়বে না স্লিপার পড়বে এখন থেকে “!
রিত্তিকা জিয়ানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে তার শার্ট শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইল। পুরো ভার্সিটি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে।
