প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৮
রাত্রি মনি
“বস, সমস্ত ডিভাইস ডিসকানেক্ট করে দেয়া হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, অ্যালার্ট সিগন্যাল—অল ক্লিয়ার। কিন্তু সবকিছু আমাদের তাড়াতাড়ি করতে হবে। টাইমস আপ। উই হ্যাভ জাস্ট থার্টি মিনিটস।”
জেইন তার কালো গ্লাভস পরা হাতের কব্জি সামান্য তুলে ঘড়ি দেখল। পারদের মতো ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ দুটো চোখ একবার করিডোরের বাকি সবার উপর বুলিয়ে নিল। সেই চোখের দৃষ্টিতে ছিল ইস্পাতের দৃঢ়তা, যা মুহূর্তের চাপা উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল।
“ওকে, ইউ গাইস ওয়েট আউটসাইড ইন দ্য কার। অ্যান্ড আমি ফিরে আসার সাথে সাথেই গাড়ি স্টার্ট করবে। আন্ডারস্টুড! ইয়াশ আর এলেনা, তোরা বাইরের দিকটায় লক্ষ্য রাখবি। কোনো কিছু অ্যাবনর্মাল দেখলে আমাকে সাথে সাথে অ্যালার্ট করবি।”
রাত তখন গাঢ়, যেন আকাশ তার সবটুকু রং শুষে নিয়েছে। ভোরের সূর্য ওঠার ঠিক কয়েক ঘণ্টা বাকি, আর এই কয়েক ঘণ্টা যেন রোমের উপকণ্ঠ অমানিশার আঁধারে ডুবে আছে।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই তিন তলা বিশিষ্ট কাঠামো—একটি অন্ধকার গোপন কুঠুরি। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে একটি পরিত্যক্ত, শতাব্দীর পুরোনো ভুতুড়ে বাড়ি মনে হবে, যেন সময়ের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র নেই। কিন্তু এই নীরব মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে আধুনিকতার চরম শিখর। ভেতরে সব উচ্চ মানসম্মত প্রযুক্তির ছোঁয়া, যা বহিরাবরণের জীর্ণতাকে উপহাস করে।
তিন তলার করিডোরে এখন স্তব্ধতা। ইয়াশ, এলেনা এবং তাদের চারজন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে, যেন পাথরের তৈরি মূর্তি। তাদের শরীর আবৃত বুলেট প্রুফ ফিটফাট কালো পোশাকে, যা আঁধারের সঙ্গে মিশে গেছে। মুখে কালো মাক্স, যা তাদের পরিচয় গোপন করেছে এবং তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসকে এক যান্ত্রিক ছন্দে ধরে রেখেছে। তাদের পোশাকে ও বেল্টে সজ্জিত স্নাইপার রাইফেল, অটোমেটিক অ্যাসল্ট বন্দুক, ছুরি, কাঁচি সহ আরও বিভিন্ন ধরনের নাম না জানা নীরব ঘাতক অস্ত্র। বাইরে পাহাড়ায়ও রয়েছে কয়েকজন গার্ড। সকলের মধ্যেই এক ধরনের চাপা উত্তেজনা।
তাদের লিডার এজে! এই প্রথম কোনো মিশনে এসে
এমন অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করছে। তার বুক অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। কিন্তু এটা ভয়ের কম্পন নয়; এটা এক ধরনের অজানা, বিদ্যুতায়িত উত্তেজনা। সামনে কী হতে যাচ্ছে, সে জানে না। হয়তো জীবনের কোনো নতুন মোড়।
সময় ফুরোচ্ছে। তাদের হ্যাকার লুকা, হাত নেড়ে জেইনের অনুমতি চাইল। জেইন শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। লুকা হ্যান্ডেল ঘোরানোর জন্য প্রস্তুত।করিডোরের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হচ্ছে, এমনকি তাদের হৃদস্পন্দনও যেন কানে বাজছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, লুকা ভারী, আধুনিক লক সিস্টেমের হ্যান্ডেলে চাপ দিল।
$$( \text{ক্যা-চ্যা-চ-অ্যাঁক} ) \rightarrow ( \text{বি-ই-ই-ই-ই-প} ) $$
একটি তীক্ষ্ণ ‘বিপ’ শব্দে খুলে গেল বিশাল আকৃতির, কাঁচ ও লোহার তৈরি, আধুনিক ডিজাইনের লক সিস্টেম করা দরজা। সেই শব্দ যেন নিস্তব্ধতার বুকে তীব্র আঘাত হানল। জেইনের হৃদস্পন্দন যেন সেই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। দরজাটি ধীরে ধীরে সরে গেল, ভেতরের অন্ধকারকে উন্মোচিত করে।
ভেতরের কক্ষটি ছিল প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকার, কেবল দূর থেকে আসা হালকা নীলাভ আলোয় করিডোরের মেঝেতে একটি চিকন ফালি তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, এক গহ্বর, যা সময়ের বাইরে অবস্থিত।
সবাই একবার একে অন্যের চোখের দিকে তাকাল—সেই মুখোশের আড়ালে থাকা চোখগুলো ইশারায় কিছু বুঝিয়ে দিল: সংকেত স্পষ্ট। তারপর তারা দ্রুত যে যার মতো নিজ নিজ পজিশনে চলে গেল, রাইফেলের সেফটি ক্যাচ অফ করার মৃদু শব্দে।
তারপর সেই মুহূর্তে… জেইন, তার বুলেট-প্রুফ বুটের মৃদু শব্দে, ধীরে ধীরে এক পা দু পা করে এগিয়ে গেল ভেতরের দিকে। ধীর কিন্তু সুনিশ্চিত।
সে যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ভেতরের সেই কালো অন্ধকার যেন তাকে গ্রাস করার জন্য মুখ বাড়াচ্ছে। করিডোরের সামান্য নীলাভ আলো তার কালো পোশাকে প্রতিফলিত হচ্ছে না, যেন তার উপস্থিতিই আলো শুষে নিচ্ছে।
প্রতিটি পদক্ষেপে তার হৃদস্পন্দন ততটাই প্রগাঢ় হচ্ছে: ধক… ধক… ধক…।সে সেই প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে, যেখানে অন্ধকার, এক অজানা গোপন সত্যকে ধারণ করে আছে।
আর মাত্র ২৯ মিনিট বাকি।
‘ফোঁস’ হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ, ধারালো শব্দ। যেন বাতাস চিরে কিছু একটা ছুটে এলো।
এলেনার সর্বদাই তীক্ষ্ম ধারালো ব্যাক্তি সত্তার অধিকারী। তার চোখ সবসময় আশেপাশের প্রতিটি গতিবিধির উপর সতর্ক থাকে। সে স্থির দাঁড়িয়ে চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। ইয়াশ সামনের দিকে এক পা বাড়িয়ে ভেতরের ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই, এলেনা তীক্ষ্ণ, হিসহিস করা গলায় নির্দেশ দিল,
“ডোন্ট মুভ!”
বিদ্যুতের গতির মতো একটা চোখা, ধারালো ছুরি ছিটকে এলো কোথা থেকে যেন! এটি ঠিক ইয়াশের কানের পাশ ঘেঁষে চলে গেল, কয়েক ইঞ্চি দূরত্বের জন্য সে বেঁচে গেল। ছুড়িটা করিডোরের দেয়ালে সশব্দে গেঁথে গেল, এখনও কাঁপছে।
ইয়াশ ভয়ে হা হয়ে, মূর্তির মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ অনুসরণ করল সেই ব্লেডকে, যা সামান্য হলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত করত।
এলেনা কোনো সময় নষ্ট করল না। ঝড়ের মতো দৌড়ে এসে লাফিয়ে পা দিয়ে নিচে ফেলে দিল ছুড়িটাকে। তার গতি ছিল অবিশ্বাস্য দ্রুত। সে নিচে ঝুঁকে বসে নিজের পায়ের জুতোর ফিতেটা টাইট করে বেঁধে ফেলল। তার চোখ ছিল ওপরের দিকে, সতর্ক এবং প্রস্তুত।
ইয়াশ এখনো সেভাবেই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এলেনা চোখের পলকে উঠে দাঁড়াল, ইয়াশের হাত ধরে তীব্র বেগে ছুট লাগালো,
“রান ফাস্ট!”
ঠিক তখনই পেছনের অন্ধকার করিডোর থেকে মিসাইলের মতো বুলেটের গুলি ছুটে আসতে লাগল—ট্র্যাক-ট্র্যাক-ট্র্যাক!
তাদের পিছন ধাওয়া করছে আট থেকে দশজন অস্ত্রধারী গার্ড। তাদের সকলের হাতেই রয়েছে বিশাল আকৃতির স্নাইপার রাইফেল এবং অ্যাসল্ট অস্ত্র। গুলির শব্দে করিডোরের প্লাস্টার খসে পড়তে লাগল।
এলেনা ইয়াশকে নিয়ে বাম দিকে মোড় নিল। গুলির শব্দ তাদের কানের পর্দা ভেদ করছে। ইয়াশ কোনোমতে শ্বাস টেনে এলেনার গতির সঙ্গে তাল মেলাচ্ছিল।
এলেনা তাকে নিয়ে ঢুকে পড়ল একটা গোডাউনের মতো দেখতে বিশাল রুমে।
রুমের মধ্যে সারি সারি, বিশাল কাঁচের শো-কেসে শুধু কাঁচের শিশি রাখা। প্রতিটি শিশির মধ্যে রয়েছে তরল, ঝলমলে কেমিক্যাল জাতীয় কিছু—বিপদজনক এবং বিস্ফোরক হতে পারে।
পিছনের দরজা দিয়ে গার্ডরা ভেতরে ঢোকার আগেই এলেনা ক্ষিপ্র হাতে একটি ভারী ধাতব রড দিয়ে দরজাটাকে ঠেকিয়ে দিল।ইয়াশ হাঁপাতে হাঁপাতে এলেনার দিকে তাকাল। তার চোখে বিভ্রান্তি,
“আমাদের কাছে তো রাইফেল আছে। আর আমরা সংখ্যায়ও কম নই। তাহলে আমরা হামলা না করে এভাবে পালাচ্ছি কেন? ফায়ারব্যাক করছি না কেন?”
এলেনা শান্ত চোখে শো-কেস থেকে একটা কাঁচের শিশি বের করে নিল। সে সেটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নাড়াতে নাড়াতে, ঠান্ডা গলায় জবাব দিল,
“জাস্ট টু ডাইভার্ট দেম। যেন ওদের টার্গেট এজে’র ওপর নয়, আমাদের ওপর পরে। আর ‘এজে’ খুব সহজেই নিজের কাজটা শেষ করতে পারে।”
ভেতরের সেই অন্ধকার কক্ষের মাঝখানে, একমাত্র আলোর উৎসটুকু যেন জেইনের হাতের টর্চ। সেই আলো গিয়ে পড়েছে একটি সাদামাটা, বেডে বসা এক ভদ্রমহিলার উপর।
“ইম ম-ম-মমম… মাহ্!”
শব্দটা যেন জেইনের বুকের পাঁজর ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো—শক্ত, ইস্পাতের মতো মানুষটার কণ্ঠ থেকে। এ যেন এক গভীর ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ।
“ম-মাহ্….। আমার মা। আ-আমার….”
জেইনের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। তার ঠিক সামনে, বিশাল লোহার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে বসে আছেন ভদ্রমহিলা। সাদা, ঢিলেঢালা পেশেন্ট গাউন পরিহিতা, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও, তার মুখে বয়সের কোনো ভাঁজ নেই; বরং সেখানে যেন এক ধরনের আভিজাত্যের কোমল ছোঁয়া লেগে আছে।
জেইন গভীর চোখে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কক্ষের বাতাস যেন ভারী, সময় যেন এই মুহূর্তে এসে স্থির হয়ে গেছে। চারপাশের শুনশান নীরবতা এতটাই তীব্র যে, কেবল তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
ভদ্রমহিলা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেইনের মুখটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। এই মুখ তার পরিচিত নয়! এখানে থাকাকালীন আজ পর্যন্ত এমন মুখ তিনি দেখেননি। তবুও ভেতর থেকে কিছু একটা হৃদপিন্ডে সজোরে টান দিচ্ছে। তিনি ভাবলেন, হয়তো নতুন কোনো কাজের লোক বা ডাক্তার। কোনো কিছু বুঝতে না পেরে তিনি শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, যেন বোঝার চেষ্টা করছেন এই অস্বাভাবিক দৃশ্যের মানে কী।
জেইন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার হাঁটা ছিল দৃঢ়, কিন্তু শেষ কয়েক ধাপেই সেই দৃঢ়তা ভেঙে গেল। সে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো মহিলার ঠিক পায়ের কাছে—ঠিক যেন সেই ছোট্ট বাচ্চাটা, মায়ের কাছে বসে বায়না ধরছে।
মহিলাকে আমচকাই অবাক করে দিয়ে, জেইন তার মুখ গুঁজে দিল মহিলার হাঁটুতে। কালো মাস্ক ভেদ করে বেরিয়ে এলো এক কম্পিত, ভেজা কণ্ঠ। সে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ উঠলো—সেই কঠিন হৃদয়ের ব্যক্তি, যে কখনো চোখের জল ফেলেনি,
“মাহ্… মা… আমার মা। আম্…. মাহ্ কত খুঁজেছি তোমায়। আমার মা আমা….।”
মহিলা কেঁপে উঠলেন প্রথমে। হয়তো এত বছরের নির্বাসনে এমন স্নেহমাখা স্পর্শ পাননি। কিন্তু পরমুহূর্তেই যেন তার সহজাত মাতৃত্ব জেগে উঠল। পরম মমতায় তার হাত বুলিয়ে দিলেন জেইনের কঠিন মাথার ওপর। তার মৃদু, স্নেহময় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি কে বাবা? তুমি কি তোমার মাকে খুঁজছো? তোমার মা কি কোথাও হারিয়ে গেছে?”
মহিলা মিষ্টি করে হাসলেন। শান্তনা দেয়ার মতো করে বললেন,
“চিন্তা করো না। তুমি তোমার মাকে খুব শীঘ্রই খুঁজে পাবে।”
জেইন ধীরে ধীরে মাথা তুলে চোখ কুঁচকে মুখটা দেখতে লাগল। সব যেন ঠিক আগের মতো—একটুও বদলায়নি। সে ধীর হাতে ছুঁয়ে দিল মহিলার গাল।
আর তখনই, সেই ইস্পাতের কঠিন চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
“আমাকেহ্… আমাকে ক্ষমা করে দাও মা। তোমার এই অবুঝ ছেলেকে তুমি ক্ষমা করে দাও। তোমাকে ভুল বুঝে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম আমি। নিজের হাতে তোমাকে…….।”
তার কথাগুলো যেন গলাতেই আটকে গেল। মনে হচ্ছে কেউ গলা চেপে ধরে রুদ্ধ করে দিয়েছে তার শ্বাস। এত তীব্র কষ্ট কেন হচ্ছে!
মহিলা তখনও কিছু বুঝতে পারছেন না। তিনি স্নেহ মাখা গলায় বললেন,
“এসব কী বলছো তুমি বাবা? কী ভুল? কিসের ক্ষমা? তুমি কি, না জেনে তোমার মাকে কষ্ট দিয়েছো? চিন্তা করো না, তোমার মা তোমাকে ঠিক ক্ষমা করে দেবেন। সন্তান যতই অন্যায় করুক, মায়ের কাছে সন্তান সর্বদা নিষ্পাপ। মায়েরা কখনো তার সাথে রাগ করে থাকতে পারে না। ঠিক ক্ষমা করে বুকে টেনে নেয়। দেখো, তোমার মাও তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আবার বুকেও জড়িয়ে নিবেন।”
হঠাৎ যেন মহিলা অন্য জগতে চলে গেলেন।
“এইতো, আমার আরু’কেই দেখো না। খুব দুষ্টু। সারাদিন শুধু ছোটাছুটি করে আর আমাকে হয়রান করায়। একটুও কথা শোনে না। ঠিক মতো খেতেও চায় না। মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়। কিন্তু পরে সব রাগ ভুলে আবার ওকে বুকে জড়িয়ে নিই আমি। ও যে আমারই অংশ।”
জেইনের চোখে আজ বাঁধ মানছে না। তার মুখোশের নিচের মুখ চোখের জলে মিশে একাকার। অন্যদিকে, নিজের বসের পাথরের ঢালের মতো কঠিন হৃদয়ের লিডারের চোখে জল! এভাবে অসহায়ভাবে ভেঙে পড়তে দেখে অবাকের শেষ চূড়ায় দাঁড়িয়ে লুকা। তার মনে হচ্ছে, সে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে। এই মানুষের চোখে এই প্রথম জল দেখছে সে। রিম চলে যাওয়ার পর হয়তো কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু কখনো এভাবে বাচ্চাদের মতো চোখের জল ফেলেননি।
এ যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। সম্পূর্ণ অকল্পনীয়।
কিন্তু পরক্ষণেই লুকার মুখে ফুটে উঠল এক গভীর প্রশান্তির হাসি। যেন কোনো পূর্ণ মিলনের দৃশ্য দেখছে সে—এক পবিত্র সম্পর্ক, যা কেবল সন্তান ও এক জন্মদাত্রী মায়ের মধ্যেই হয়ে থাকে।
মহিলার হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল, বিতৃষ্ণা নিয়ে বললেন,
“দেখো না বাবা, আমার আরু’টা কোথায় চলে গেছে। একটুও কথা শোনে না। তোমরা আমায় ওকে একটু খুঁজে এনে দেবে? এখানকার লোকগুলো না খুব বাজে। একদম ভালো না। ওরা আমাকে আমার আরুর কাছে যেতেই দেয় না। তুমি নিয়ে যাবে আমায়?”
জেইনের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো। তীব্র যন্ত্রণায় কেঁপে উঠলো ভেতরটা। সে চিৎকার করে বলতে পারছে না, ‘ মা আমি তোমার আরু। তোমার সেই ছোট্ট দুষ্টু আরু। তোমার ছেলে… তোহ… আমাকে একটু বুকে জড়িয়ে আদর করবে, মা? ঠিক যেমনটা সেই ছোট্ট বেলায় করতে!’
সে চোখের জল আড়াল করে, নিজের ভেতরের ঝড় সামলে নিতে বড় করে নিঃশ্বাস টেনে নিলো। কান্নায় তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে তবুও সে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বললো,
“হ্যাঁ, নিয়ে যাবো তো। তোমাকে তোমার আরুর কাছে নিয়ে যাবো। তুমি শুধু আমাদের সাথে চলো, আমরা তোমাকে তোমার আরুর কাছে নিয়ে যাবো।”
মহিলা ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন।
“কিন্তু আমাকে তো কোথাও যেতে দেয় না ঐ রাক্ষস’টা। আমাকে যদি তোমরা বাইরে নিয়ে যাও তাহলে আমার জন্য ও তোমাদেরকে সাজা দিবে। না না আমি কোথাও যাবো না।”
জেইন মহিলার কম্পিত হাত ধরলো, হাতে নিজের সবটুকু আশ্বাস ঢেলে দিয়ে বলল,
“কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। তুমি শুধু আমার সাথে চলো। আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে তোমার আরুর কাছে নিয়ে যাবো।”
“সত্যিই নিয়ে যাবে?”
“হ্যাঁ, যাবো।”
‘ঠাস!’
গোডাউন রুম তখন ঝাঁঝালো সাদা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। চারপাশের কেমিক্যাল তরলগুলি মিশে ঘন কুয়াশার মতো ঝাপসা পরিবেশ তৈরি করেছে, যা গার্ডদের দৃষ্টি প্রায় সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নিয়েছে।
ঠিক তখনই, ঝাপসা ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে একটি গার্ডকে এলেনার দিকে ছুটে আসতে দেখল ইয়াশ।
এক মুহূর্তও দেরি না করে, এলেনা তার হাতে থাকা একটি পুরো কেমিক্যালের শিশি সজোরে ভেঙে ফেলল ছুটে আসা গার্ডের কপালে। গার্ডটি বিকৃত যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
কিন্তু ততক্ষণে, অবশিষ্ট গার্ডগুলো ধোঁয়ার ভেতর থেকে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছে। তারা ধীরে ধীরে চারপাশে ঘিরে ধরেছে ইয়াশ ও এলেনাকে—তাদের হাতে উদ্যত স্নাইপার রাইফেল।
এলেনা আর ইয়াশ একে অপরের চোখে তাকালো।
তারপরই—বুম! অ্যাকশন!
ধোঁয়ার সুবিধা নিয়ে, দু’জনেই উল্টো দিকে তীব্র লাফে সরে গিয়ে, একইসঙ্গে দুটি ভিন্ন গার্ডকে নিচে ফেলে দিল। মাটিতে পড়ে গার্ডগুলো ওঠার চেষ্টা করতেই, ইয়াশ ক্ষিপ্র গতিতে এলেনাকে শূন্যে তুলে ধরে চারপাশে ঘোরাতে লাগল। এলেনার পায়ে ছিল তীক্ষ্ণ উঁচু YSL। সে সেই হিলগুলো ব্যবহার করে একের পর এক এলোমেলো, কিন্তু নির্মমভাবে আঘাত করতে লাগল গার্ডগুলোর শরীরে—কোমরে, মুখে, বুকে। আঘাতের তীব্রতায় গার্ডগুলোর রাইফেল ছিটকে দূরে পড়ল, আর তারা আহত অবস্থায় যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতে নিচে পড়ে রইলো।
ইয়াশ এলেনাকে নিচে নামিয়ে দিল। দু’জনেই হাঁপাচ্ছে। শরীর ঘেমেনেয়ে একাকার। এলেনা গভীর করে একটু নিঃশ্বাস নিয়ে ইয়াশের দিকে তাকালো।
ঠিক তখনই, এক অপ্রত্যাশিত বিপদ। তাদের পায়ের নিচে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা একজন গার্ড, যার মাথায় শিশি ভেঙেছিল এলেনা, সে শেষ চেষ্টা হিসেবে ইয়াশকে পেছন থেকে টেনে ধরার জন্য হাত বাড়ালো। সাথে সাথেই এলেনা ইয়াশকে তীব্র বেগে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। আচমকা এমন ঘটনায় ইয়াশ বুঝে উঠতে পারল না কিছুই।
পতন থেকে বাঁচার তাড়নায়, এলেনার ঠোঁট সোজা গিয়ে পড়ল ইয়াশের শুষ্ক ঠোঁটের ওপর। নিজের ঠোঁটের ওপর এলেনার ঠোঁটের তুলতুলে,স্পর্শ পেয়ে ইয়াশের চোখ দুটো বিস্ফারিত হলো। তার সমস্ত উত্তেজনা এক লহমায় স্থির হয়ে গেল।
এলেনা দ্রুত উঠে পড়ার চেষ্টা করতেই, ইয়াশ শক্ত হাতে তাকে আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল। সে এলেনার ঠোঁটে গভীর ভাবে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট।
এলেনা যেন বিস্ফোরিত ইয়াশের আচরণে! সে এই মুহূর্তে এমন স্পর্শের মোটেও জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। তার পায়ের নিচে তখনও রক্তাক্ত অবস্থায় আটকে রয়েছে সেই গার্ড, আর সেই সাথে বাইরে থেকে আক্রমণের হুমকি তো রয়েছেই।
এলেনার ছটফটানি বাড়তে লাগল। কিন্তু ইয়াশের হাতের বাঁধন দৃঢ়। তার ঠোঁটের স্পর্শ যেন সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে!
‘ঢিস!’
হঠাৎ বুলেটের তীক্ষ্ণ শব্দ। আরও একজন গার্ড পেছন থেকে আক্রমণ করতে এলো।
এলেনার ঈগল পাখির মতো তীক্ষ্ণ কানে সেই শব্দ পৌঁছে গেল। সে ঝড়ের গতিতে ইয়াশের বাহুবন্ধনে থেকেই কোমর থেকে স্নাইপার রাইফেল বের করে, পেছনে না ঘুরেই, কেবল শব্দের উৎস ধরে নিশানা ছুড়ে দিল।
গার্ডটি বুক ভেদ হওয়া অবস্থায় লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
অন্যদিকে, ইয়াশ যেন সব ভুলে বসেছে। সে কোথায় আছে, কী করছে—কিছুই তার মাথায় নেই। সে শুধু মেতে আছে এলেনার মিষ্টি ঠোঁটের স্বাদে। এলেনা বিরক্ত হলো। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ‘কুট্টুস” করে ছোট্ট একটা কামড় বসিয়ে দিল ইয়াশের ঠোঁটে। যন্ত্রণায় লাফিয়ে উঠল ইয়াশ। তার ঠোঁট থেকে বাঁধন ছুটে গেল।
এলেনা দ্রুত উঠে দাঁড়াল। রক্তমাখা ঠোঁট মুছে, স্নাইপার তুলে বাইরে থেকে আক্রমণ করতে আসা প্রত্যেকটা গার্ডের শরীরে ক্ষিপ্র গতিতে ফায়ার করে দিল। সবাই এখন মেঝেতে পড়ে রয়েছে।গোডাউন এখন মৃতদেহের স্তূপ আর বিষাক্ত ধোঁয়ার এক রণক্ষেত্র।
চারপাশে কেমিক্যালের শিশি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ঝাঁঝালো ধোঁয়া উঠে গেছে। ঘন কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে আসছে চারপাশ।
নইয়াশ তখনও হা হয়ে আছে, হতভম্ব।এলেনা তার হাত ধরে টেনে তুলল। সে কঠিন, শ্বাসরুদ্ধকর স্বরে কম্যান্ডার করলো,
“রান ফাস্ট! ব্লাস্ট হবে উই ডোন্ট হ্যাভ এনি টাইম।”
তারা দুজনে দৌড়ে বেরিয়ে আসতেই—বুমম!
পিছন থেকে আসা বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে পুরো গোডাউনটা আগুনে ঝলসে উঠল।
রোমের উপকণ্ঠ তখনো ঘন অন্ধকারে ডুবে। বাইরে, কালো রংয়ের এসইউভি গাড়ির ভেতরে সবার মাঝে চাপা আতঙ্ক। ইয়াশ, এলেনা, মার্কো, লুকা এবং তাদের অবশিষ্ট গার্ডরা গাড়িতে অপেক্ষা করছে। তাদের মাঝে শুইয়ে রাখা হয়েছে সেই মহিলাকে, যিনি ঘুমের ওষুধের প্রভাবে এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সকলের মুখেই চিন্তার ছাপ, প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক শতাব্দীর সমান দীর্ঘ।তাদের চোখ স্থির হয়ে আছে সেই তিন তলা কাঠামোর প্রধান দরজার দিকে।
**সময় আর মাত্র পাঁচ সেকেন্ড, এরপরেই চিরতরে লক হয়ে যাবে মেইন ডোর—**ভেতরের সবকিছুকে গ্রাস করে নেবে এক দুর্ভেদ্য অন্ধকার।
সবার বুক ভয়ে দুরুদুরু কাঁপছে। কপালের ঘাম মিশে যাচ্ছে কালো মাস্কের সঙ্গে।
ভেতরে, সেই অন্ধকার গোপন কুঠুরি। কক্ষটি এখন রহস্যময়ী আবহে ঢাকা। জেইন দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মাঝখানে। তার হাত থেকে কালো গ্লাভস খোলা।
টেবিলে রাখা একটি পুরোনো ডায়েরি। জেইন ডায়েরির পাতার কোণে একটি ছোট্ট চিরকুট দ্রুত রেখে দিল।জালানা দিয়ে ঘরের একমাত্র উজ্জ্বল আলোটি এসে পড়েছে তার চোখে। সেই আলোয় তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক রহস্যময়ী বাঁকা হাসি।
ঠিক তখনই বেজে উঠল তীব্র সাইরেন। এক মোহনীয়, যান্ত্রিক নারীসুলভ কণ্ঠস্বর পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো,
“Dear Sir. There is only five seconds left, after which the main door lock will be closed. Time is starting now…”
1…
সাইরেন বাজার সাথে সাথেই গাড়ির ভেতরে সবার মধ্যে ছড়িয়ে গেল চরম উত্তেজনা। লুকা এবং মার্কো একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে—তাদের লিডার কি সময়মতো বের হতে পারবেন? নাকি চিরতরে সেই অন্ধকারে আটকা পড়বেন?
2…
ধীরে ধীরে ভারী ধাতব লোহার গেটটি উপর থেকে নিচের দিকে নামতে শুরু করল। নিচে নামার যান্ত্রিক শব্দটা যেন তাদের হৃদস্পন্দনের চেয়েও বেশি জোরে বাজছে।
3…
গেটের ফাঁক ক্রমশ ছোট হচ্ছে। সামান্যতম ফাঁকটুকুও যেন এখন আলোকবর্ষের সমান দূরত্ব। সবার ধিকি ধিকি বুক কাঁপছে। এলেনার চোখ তীক্ষ্ণ, ইয়াশের নিঃশ্বাস দ্রুত।
4…
কপালের ঘাম বেয়ে নামছে। গেট প্রায় বন্ধ! আর কোনো আশা নেই! শেষ মুহূর্তের আতঙ্কে সবাই চোখ বন্ধ করে নিল।
5…
‘সুইইপ’!!!! থেমে গেল সাইরেন।
একটি ধারালো, ভারী শব্দে প্রধান দরজা বন্ধ হয়ে গেল। চমকে চোখ খুলে ফেলল সকলে।
তাদের ঠিক সামনে, গাড়ির হেডলাইট ও রাস্তার আবছা আলোয় উদ্ভাসিত—দাঁড়িয়ে আছে জেইন! তার কালো পোশাকের ভাঁজে লেগে আছে ধুলো। সে সেগুলো ঝাড়তেই ব্যস্ত। এ অবস্থাতেও তার চলনে রয়েছে এক ধরনের গাম্ভীর্যপূর্ণ অ্যাটিটিউড।
সবার মুখেই ফুটে উঠল জিতে যাওয়ার বিজয়ী হাসি। এক সেকেন্ড আগেও যে আতঙ্ক তাদের গ্রাস করেছিল, তা এখন আনন্দে রূপান্তরিত।
দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে…
যখন সাইরেন ‘৪’ থেকে ‘৫’-এ পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত, জেইন তখনো স্থির দাঁড়িয়ে ছিল।
5…
শব্দটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই, তুফানের গতিতে, চোখের পলকে দৌড়ে এলো জেইন, মেঝের উপর দিয়ে পা ভাঁজ করে মাথা নিচু করে স্লিপ করল। ঠিক সেই ক্ষুদ্রতম ফাঁক দিয়ে, যেন এক অদৃশ্য ছায়া হয়ে, বেরিয়ে পড়ল সে!
আর গেটটি বন্ধ হলো শূন্যে।
“ফাইনালি মিশন কমপ্লিট।”
ইয়াশ হাঁফ ছেড়ে শান্তিতে বলল।
স্পেশালি ডিজাইন করা কালো, ছয় সিটের এসইউভি! বুলেট গতিতে রোমের শহরতলী ছেড়ে হাইওয়ের দিকে ছুটছে। ভেতরটা উষ্ণ হলেও পরিবেশটা শীতল, ভারী।
প্রথম সারিতে, এলেনা অত্যন্ত দক্ষ হাতে ড্রাইভ করছে। তার মুখভঙ্গিতে একধরনের কাঠিন্য ভাব। চোখ স্থির সামনের রাস্তায়, যেন তার মাথায় হাজারো হিসাব চলছে।
দ্বিতীয় সারিতে জেইন। পাশে তন্দ্রারত সেই মহিলা। জেইন তার বাহুতে খুব সাবধানে তাকে আগলে রেখেছে, যেমনটা বাবা তার সবচেয়ে মূল্যবান রাজকন্যাকে আগলে রাখে।
জেইন হাতটা উঁচু করে এক পলক ঘড়ির দিকে তাকাল। ভোর চারটা। বাইরে তখনো ঘন কালো অন্ধকার।ভোরের আলো ফোটেনি।
সে এক মুহূর্ত ভাবলো – হয়তো তার ফায়ারফ্লাই এখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। সে যখন ফিরে যাবে, তখন কেমন রিঅ্যাকশন হবে মেয়েটার? প্রথমে হয়তো একটু অভিমান করবে, তারপর আবার দূরে থাকতে না পেরে নিজেই কাছে টেনে নিবে। জেইনের ঠোঁটে হালকা মুচকি হাসি ফুটে উঠল।সেই হাসি আবার দ্রুত মিলিয়ে গেল। সে পেছনে হাত বাড়িয়ে ইশারা করলো,
“ওখানকার কী খবর? কোনো আপডেট? মাত্তেয়োর সাথে লাস্ট কন্টাক্ট কখন হয়েছিল?”
পেছন থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে জেইনের ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল আকস্মিকভাবে। তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই শীতল, বিপজ্জনক হয়ে উঠল,
“কথা বলছিস না কেন? স্কাউন*ন্ড্রেল!!!”
তৃতীয় সারিতে মার্কো ও লুকা থমকে গেল। লুকা জড়ানো গলায় বলল,
“না, মানে ভাই…”
“ফা*ক!! কী মানে মানে করছিস তোরা!!!! যা বলার সোজাসুজি বল!”
লুকা ভয়ে গলা শুকিয়ে ঢোক গিলল।
“আসলে মাত্তেও কোনো আপডেট পাঠায়নি। আর…”
“আর কি???…. আপডেট পাঠায়নি মানেহ্???? আমি ওকে বলেছি আমাকে যেন প্রতিটা সেকেন্ডের আপডেট পাঠানো হয়! তাহলে পাঠালো না কেন?????”
জেইন ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করলো,
“ও তো কখনো কাজে এমন অবহেলা করে না…”
জেইনের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হচ্ছে।
“পুরোটা… পরিষ্কার.. করে.. বল। নয়তো তোরা বাড়ি ঠিকি যাবি , কিন্তু সেটা ছিন্নভিন্ন লাশ হয়ে। এরপর হাউজের সামনে পড়ে থাকবে তোদের সেই র*ক্তা*ক্ত ক্ষ*তবি*ক্ষত লাশ!”
মার্কো ও লুকা—কারো মুখেই কোনো শব্দ বের হলো না। নীরব আতঙ্ক পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল।লুকা ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ট্যাবলেটা এগিয়ে দিল জেইনের হাতে।জেইন ট্যাবের দিকে চোখ রাখতেই সেই চোখ যেন জলন্ত লাভার মতো হিংস্র আগুনে জ্বলে উঠলো। ষাঁড়ের মতো ‘ফোঁস ফোঁস’ করে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল সে। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
ট্যাবের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে: আটটি এমার্জেন্সি নোটিফিকেশন! রেড অ্যালার্ট সহ!
সে ট্যাবটাকে সজোরে আছড়ে ফেলল গাড়ির মেঝেতে। সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ক্ষুধার্ত হিংস্র সিংহের মতো গর্জন করে উঠল জেইন,
“Fu*ck!!!!…. আআআআআ…… Fu*ck!!!!! আটটা এমার্জেন্সি নোটিফিকেশন, With রেড অ্যালার্ট! অথচ আমাকে কেউ জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না।”
দুহাতে মাথার চুল মুঠোয় ধরে টানতে লাগলো জেইন,
“আআআআআআআআহ্!!!!!!!”
তার চিৎকারে গাড়ি সহ সকলেই কেঁপে উঠলো। ইয়াশ আর এলেনার শরীরও শক্ত হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ সবার।
“তিন ঘণ্টা আগের মেসেজ আমাকে এখন দেখানো হচ্ছে!!! ইউ গাইস আর সাচ আ ব*স্টার্ডস!!!!! যদি আমার ফায়ারফ্লাইয়ের কোনো কিছু হয়, আই সোয়্যার, তোদের কাউকে ছাড়ব না আমি। কবরস্থানে শুইয়ে রাখব, একেকটাকে।”
লুকা শুষ্ক ঢোক গিলে কম্পিত কণ্ঠে বলল,
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৭
“আসলে বস, সবাই তো মিশনে সম্পূর্ণ ফোকাস করছিল, তাই ওখানকার আপডেট নেওয়া হয়নি। সিগন্যালও সাইলেন্ট মোডে ছিল। আর ট্যাবটাও গাড়িতে পড়ে ছিল। তাই….. আমার এইমাত্রই ম্যাসেজ দেখলাম…”
জেইন আর কোনো যুক্তি শুনতে রাজি নয়। তার চোখ এখন লাল টকটকে।
“Fu*ck! Fu*ck!!!!! Fu*ck!!!!!… শিট দিস ফা*ক ম্যান। আই’ম, 100% ড্যামন শিউর, হাউজের ভেতরে বাইরের কেউ ঢুকে পড়েছে। এন্ড কিছু তো একটা অবশ্যই হয়েছে, তা না হলে মাত্তেও এখনো কোনো আপডেট করলো না কেন? ফার্স্ট তোদের ম্যামের লোকেশন ট্রেস কর, এক্ষুনি!”
