প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৮
রাত্রি মনি
সূর্য তখন মাথার ঠিক ওপরে। মিলানের পুরনো ও আধুনিক ভবনের পাথরের দেয়ালে রোদ তার তীব্র ছোঁয়া দিয়ে ঝলমল করছে।
ভিয়া ফাতে-বেনেফ্রাতেল্লি
ইতালির মিলান শহরের একটি পুরনো শান্ত, মর্যাদাপূর্ণ, এবং প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। এর পাশে দাঁড়িয়ে আছে কুইস্তুরা দ্যি মিলানো—মিলান শহরের এই দাপুটে পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো Alfa Romeo। ইঞ্জিনটি কিছুক্ষণ আগে বন্ধ হলেও তার উত্তপ্ত ধাতব গন্ধ বাতাসে ভাসছে। সদর দরজায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে দুজন সশস্ত্র অফিসার, চোখে তাদের গাঢ় কালো রোদচশমা। মুখে অভিব্যক্তিহীন কাঠিন্য।
ভবনের ভেতরে গোয়েন্দা বিভাগের করিডোরগুলো বাইরের রোদের ঠিক বিপরীত—গুমোট এবং রহস্যে ঘেরা। কার্লোর ডেস্কে রাখা ফাইলের ওপর ঝুঁকে পড়ে বেনজি তার রিপোর্ট পেশ করছে। তার কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা।
“স্যার, আপনার আশঙ্কাই ঠিক হলো। ওটা কোনো সাধারণ সুচ ছিল না। ল্যাব রিপোর্ট কনফার্ম করেছে, এর অগ্রভাগে মেশানো ছিল বোটুলিনাম টক্সিন (Botulinum Toxin)।”
কার্লো তার চেয়ারে হেলান দিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে বেনজির দিকে তাকাল। বেনজি একনাগাড়ে বলে চলল,
“স্যার, এটি পৃথিবীর ইতিহাসে জানা সবচেয়ে শক্তিশালী বিষ। ক্লোসট্রিডিয়াম বটুলিনাম নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি এই টক্সিনের মাত্র ২ ন্যানোগ্রাম রক্তে মেশা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। এটি সরাসরি মানুষের নার্ভ সিস্টেমকে আক্রমণ করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেয়, যার ফলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শ্বাসরোধ হয়ে মানুষ মারা যায়। ভাবা যায় স্যার? মাত্র এক গ্রাম বিষ দিয়ে ১০ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলা সম্ভব!”
কার্লো এবার বিড়বিড় করে উঠল, কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল,
“মাই গুডনেস! এত ভয়াবহ মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে একজন সামান্য প্রত্যক্ষদর্শীকে মারার জন্য? ইটস রেয়ার… এই কিলার কেবল সাইকোপ্যাথ নয়, অত্যন্ত প্রভাবশালী কেউ।”
বেনজি এবার টেবিলের ওপর একটি প্লাস্টিক প্যাকেটে রাখা চিরকুট এগিয়ে দিল।
“স্যার, এটা সেই চিঠি যা পাথরের সাথে বেঁধে আয়নায় ছোড়া হয়েছিল। এতে যা লেখা আছে তা আমাদের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ।”
কার্লো চিরকুটটি হাতে নিল। রক্তবর্ণ কালিতে কাঁপা কাঁপা অথচ স্পষ্ট অক্ষরে লেখা:
“২৪ ঘণ্টা সময় আছে। যদি পারো, বাঁচাও মিস ওয়ার্ল্ড-কে!”
কার্লোর ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে চিরকুটটা টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে বলল,
“ইন্টারেস্টিং! খেলাটা এবার সত্যিকার অর্থে জমে উঠেছে বেনজি। কিলার আমাদের যতটা ধূর্ত ভেবেছিলাম, সে তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক। সে আমাদের সাথে ইঁদুর-বেড়াল গেম খেলছে। ও ভাবছে ওকে ধরা অসম্ভব।”
কার্লো তার হাতের পেনটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে ঘুরাতে জানালা দিয়ে বাইরের রোদে ঝলসানো মিলান শহরের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন শিকারি বাজের তীব্রতা।
“কিন্তু সে জানে না, কায়সার লোভেদ ওরফে কার্লো হারার জন্য খেলা শুরু করে না। এবার ওকে ওর নিজের চালেই মাত দেব।”
অন্ধকার বদ্ধ ঘরটি যেন কোনো দুঃস্বপ্নের প্রবেশদ্বার। মোটা পর্দার আড়ালে সূর্যও সেখানে হার মেনেছে। গুমোট বাতাসে অক্সিজেনের বড় অভাব, মনে হয় প্রতিটি ধূলিকণা কোনো এক বিভীষিকার সাক্ষী হয়ে থমকে আছে। নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়ালের ঘড়ির ‘টিক…টিক’ শব্দটা কোনো সুঁইয়ের মতো কানে বিঁধছে, যেন মৃত্যুর প্রতিটি মুহূর্তকে সযত্নে গুনে রাখছে কেউ।
দেয়ালজুড়ে সাদা-কালো পোস্টারের হিজিবিজি নকশা আর সংকেত। তার ঠিক মাঝখানে লাল টেপে আটকানো একটি বিশালাকার ছবি—রক্তের মতো লাল রঙের সেই টেপগুলো যেন ক্ষতচিহ্ন। ছবিতে এক যুবক দাঁড়িয়ে, পকেটে এক হাত গুঁজে। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আভিজাত্য আর শীতল ঔদ্ধত্য। সেই ছবির সামনেই মেঝেতে মাথা নত করে বসে আছে অলিভা। তার ব্লান্ট বব কাট চুলগুলো অবাধ্যভাবে মুখের ওপর এসে পড়েছে, আড়াল করতে চাইছে এক উন্মত্ত চেহারা।অলিভার ঠোঁট দুটো বিরামহীন নড়ছে। কোনো এক অশুভ মন্ত্রের মতো বিড়বিড় করছে সে। হাতে একটা চকচকে ছুরি, যার ধারালো ফলায় ঘরের ক্ষীণ আলো ঠিকরে পড়ছে। সদ্য শান দেওয়া সেই ধাতব পাতটি যেন নিজের তৃষ্ণা মেটানোর অপেক্ষায়।
সামনেই একটি পুরনো অ্যাকোরিয়াম। তাতে মাছ নেই, আছে টলটলে জলের সাথে মিশে থাকা কিছু অস্থির চূর্ণ। জলের রঙটা স্বচ্ছ নয়, বরং এক কালচে লাল আভা ধারণ করেছে। হঠাৎই একটা কাঁচের বল সশব্দে ভেঙে ফেলল অলিভা। সাথে সাথেই জ্বলে উঠল এক ফালি তীব্র আলো, যা উন্মোচিত করল এক বীভৎস দৃশ্য—অ্যাকোরিয়ামের ভেতরে একটি ছিন্ন মুণ্ডু! চোখ দুটো ড্যাবড্যাব করে খোলা, যেন মৃত্যুর পরেও সে প্রত্যক্ষ করছে অলিভার এই নারকীয় তাণ্ডব।সেই ভয়ংকর দৃশ্য অলিভার মনে কোনো বিকার ঘটাতে পারল না। সে ভাবলেশহীনভাবে ছুরির ফলাটা বারবার নিজের কনুই বরাবর টেনে দিচ্ছে। চামড়া ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসছে, কিন্তু তার মুখে ব্যথার লেশমাত্র নেই; বরং এক পৈশাচিক তৃপ্তি।
ঠিক এই মুহূর্তে কক্ষের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন আন্তোনিও। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই মানুষটির শরীর এখনো টানটান, আভিজাত্যে ভরপুর ছয় ফুট উচ্চতা আর পরিপাটি কালো সুট। লবণের মতো সাদা-কালো চুলের মিশ্রণ আর তীক্ষ্ণ চেহারায় তার ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। কিন্তু মেয়ের এই পৈশাচিক রূপ দেখে তার মতো ইস্পাত কঠিন মানুষও শিউরে উঠলেন।
“অলিভা! হোয়াট আর ইউ ডুইং? হোয়াই আর ইউ হার্টিং ইউয়োরসেল্ফ?”
অলিভা অত্যন্ত ধীরে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের মণি তখন আগুনের মতো জ্বলছে।
“যন্ত্রণা হচ্ছে ড্যাড! এই শরীরের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা! আমার মুক্তি চাই। আমার ওকে চাই ড্যাড, যেকোনো মূল্যে! ও শুধু আমার, একান্তই আমার। আমাদের মাঝে যে আসবে, আমি তাকে এই ছুরিতে গেঁথে ফেলব!”
তার গলার স্বর ক্রমশ নামতে থাকল এক ঘোর লাগা উচ্চারণে। বিড়বিড় করে সে কেবল একটি নামই জপতে লাগল,
“জেইন… জেইন… জেইন… হি ইজ মাইন।অনলি মাইন! আর কারোর না। আমি হতে দেব না।”
আন্তোনিও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। যে জেইন মাত্র কয়েক বছরে তার সাজানো সাম্রাজ্য তছনছ করে দিয়েছে, তার সমস্ত বেআইনি ব্যবসা আর ক্ষমতার দাপট কেড়ে নিয়ে তাকে কোণঠাসা করেছে—সেই জেইনের জন্যই আজ তার নিজের রক্ত, তার একমাত্র মেয়ে আজ উন্মাদিনী। ঘৃণায় আর অসহায়ত্বে আন্তোনিওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
ছেলেটাও হয়েছে একটা প্লে বয়। রোজ রোজ নাইট ক্লাবে যাওয়া, ক্যাসিনোর জুয়া, মদ, ড্রাগস আর একেক দিন একেক নতুন মেয়ে নিয়ে ফার্মহাউজে ফুর্তি করা যেন তার নিত্যদিনের নেশায় পরিণত হয়েছে।আন্তোনিও দীর্ঘশ্বাস ফেলেন; একদিকে শত্রুর জন্য পাগল মেয়ে, অন্যদিকে পতনোন্মুখ বখাটে ছেলে। তার দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা এই সাম্রাজ্য বুঝি এই দুই অপদার্থের হাতেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।ক্রোধ আর অসহায়ত্বে গর্জে উঠলেন আন্তোনিও,
“ওই জেইন আমার হাতের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে! আমার পাওয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে! আর তার জন্য এতটা পাগল তুমি? আর ইউ ইনসেন? ঐ ছেলেকে আমি নিজ হাতে শেষ করে ফেলব!”
বাবার কথা শেষ হতে না হতেই আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল অলিভা। তার চোখে তখন খুনের নেশা। পলক ফেলার আগেই হাতের ধারালো ছুরিটা নিজের গলার কাছে চেপে ধরল সে। ফলার তীক্ষ্ণ চাপে নরম চামড়া চিরে তড়তড়িয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
আন্তোনিও আঁতকে উঠলেন। তার শ্বাস যেন গলায় আটকে গেল। তিনি ভালো করেই জানেন, অলিভা শুধু তার মেয়ে নয়, সে একজন পুরোদস্তুর ‘সাইকো’। এই উন্মাদিনীকে রোখার সাধ্য কারোর নেই; প্রেমের নেশায় সে বাবা কি ভাই—কারোর পরোয়া করবে না। অলিভার চোখের কালো মণি দুটো স্থির হয়ে গেছে আন্তোনিওর ওপর। ভয়ে আর আতঙ্কে কাঁপাকাঁপা হাতে পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন আন্তোনিও।
“লিভ মি অলিভা। আই উইল ডাই!”
“দ্যান ডাই। আই উইল হ্যাভ নো রিগ্রেটস্। জেইন শুধু আমার। ওকে যে মারতে চাইবে তার হাড় কেটে টুকরো টুকরো করে কুকুরকে খাওয়াবো আমি।”
বিপদ বুঝে সুর পাল্টালেন আন্তোনিও। দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে বললেন,
“ছিঃ মা! আমি তো মজা করছিলাম। তোমার জেইনকে চাই তো? ঠিক আছে। আর কিছুদিন পরেই আসছে ‘লা নোত্তে দেল পুত্তো অস্কুরো’ (La Notte Del Putto Oscuro)— অর্থাৎ অন্ধকার চুক্তির রাত্রি। শহরের সব বড় বড় মাফিয়ারা সেদিন এক ছাদের নিচে জড়ো হবে। আর জেইন তো নিজেই সেই আসরের গডফাদার। সে আসবেই। আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে আমি ওর কাছে নিয়ে যাব।”
কথাটা শোনামাত্রই মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাত থেকে ছুরিটা ফেলে দিল অলিভা। ঝনঝন শব্দে মেঝেতে পড়ে গেল সেই মরণাস্ত্র। মুহূর্তেই তার উন্মাদের মতো ক্রোধ বদলে গেল শিশুদের মতো চঞ্চলতায়। সে দু’হাতে তালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, যেন এক কাঙ্ক্ষিত খেলনা পাওয়ার খবর পেয়েছে।এতক্ষণে আন্তোনিওর শরীরে প্রাণ ফিরে এল। গলার চিনচিনে ব্যথা হওয়া জায়গাটা রুমাল দিয়ে চেপে ধরলেন তিনি। রুমালটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। আর একটু দেরি হলে মেয়েটা সত্যি সত্যিই হয়তো সাবাড় করে দিত তাকে। কি ভয়ংকর!
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
বিলাসবহুল সোফায় অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে পা তুলে বসে আছে এজে। তার পরনে কালো শার্টের ওপর ‘স্টুয়ার্ট হিউজ ডায়মন্ড এডিকশন’-এর নিখুঁত ব্ল্যাক স্যুট, যা তার ব্যক্তিত্বে এক অশুভ আভিজাত্য যোগ করেছে। কপাল অবধি নেমে আসা সিল্কি চুলগুলো মিডেল পার্ট কাটিংয়ে অত্যন্ত পরিপাটি—বোঝাই যাচ্ছে কোনো দক্ষ কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় এই নতুন লুক তৈরি করা। এক হাত চোয়ালে রাখা, যেখানে কবজিতে থাকা ব্র্যান্ড নিউ রোলেক্স ঘড়িটি আলোর প্রতিফলনে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। অন্য হাতটি সোফার পাশে এলিয়ে রাখা। তার পাথরের মতো নিথর মুখে অভিব্যক্তির কোনো রেশ নেই, যা তাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
তার ঠিক সামনেই আইপ্যাড হাতে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এলেনা। আঁটসাঁট ব্ল্যাক বডিকন স্যুট ড্রেসে তাকে পেশাদার এবং তীক্ষ্ণ দেখাচ্ছে; বাদামি চুলগুলো মাথার ওপরে উঁচু করে পনিটেইল করা। পাশেই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাত্তেও, যার পরনে কালো প্যান্টের সঙ্গে ইন করা কালো শার্ট।
ঘরজুড়ে এক থমথমে নীরবতা।
“একটা সামান্য হার্ড ড্রাইভ উদ্ধার করতে পারলে না? ওয়াজ ইট অ্যা বিগ জব?”
নিস্তব্ধতা ভেঙে শান্ত অথচ বরফশীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল এজে।কথাগুলো ধীরস্থিরভাবে বের হলেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা তীক্ষ্ণতা সামনের মানুষগুলোর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এলেনা মাথা নিচু করে নিশ্চুপ রইল; হয়তো এই প্রশ্ন করা হবে সেই কথা সে আগে থেকেই জানত। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাত্তেও ত্বরিত বলে উঠল,
“আমরা সমস্ত মাল উদ্ধার করে এনেছি। আগামীকাল ডিলারের কাছে ওগুলো পৌঁছে যাবে। প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের মালামাল আছে ওখানে।”
শুনে এজের ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর স্বরে পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক? ওই সামান্য মাল নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা আছে? আই জাস্ট ওয়ান্ট টু নো, হার্ড ড্রাইভটা কোথায়?”
মাত্তেও কিছুটা কুঁকড়ে গিয়ে উত্তর দিল,
“হার্ড ড্রাইভ সান্দ্রের কাছে ছিল না। ওটা ওর বসের জিম্মায় আছে।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। এজের কণ্ঠ এবার আরও গম্ভীর,
“হু ইজ হি?”
“আলেস্সান্দ্রো!”
নামটা শুনে এজে আবারো সেই বিদ্রূপাত্মক হাসিতে ঠোঁট বাঁকালো। বিড়বিড় করে নামটি উচ্চারণ করল সে,
“আলেস্সান্দ্রো………”
খানিকটা সময় নিয়ে সে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। চোখের দৃষ্টি আরও গভীর করে শান্ত গলায় বলল,
“আই থিঙ্ক আই নো হিম।”
ইতালি, রোম
রোমের উপকণ্ঠে জনমানবহীন এক প্রান্তর। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন দুর্গ, যার ধূসর দেয়ালগুলো ইতিহাসের সাক্ষী হয়েও আজ এক ভয়ংকর রহস্য বুকে চেপে আছে। বাইরে থেকে একে পরিত্যক্ত মনে হলেও, দুর্গের জঠরে চলছে এমন এক নিষিদ্ধ বিজ্ঞান চর্চা, যা প্রকৃতির নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।
ভারী ধাতব দরজার ওপাশে বাতাসের ফিসফিসানি নয়, বরং শোনা যায় যান্ত্রিক গুঞ্জন। কম্পিউটারের অন্ধকার পর্দায় অবিরাম ছুটে চলছে সবুজ কোডের রেখা। মাঝে মাঝে লাল অ্যালার্ম লাইটের তীব্র আভা পুরো ঘরটাকে রক্তিম করে তুলছে, যেন জানান দিচ্ছে—এখানে যা ঘটছে, তা পৃথিবীর চোখে এক মহাপাপ।
দোতলার বিশাল কাঁচের জানালার সামনে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘদেহী যুবক। ছয় ফুটেরও বেশি উচ্চতা, পরনে কুচকুচে কালো অ্যাপ্রোন আর তার নিচে আগুনের মতো লাল টাই। চোখের সরু ফ্রেমের ধূসর চশমার ওপাশে এক জোড়া চোখ, যাতে কোনো আবেগ নেই—আছে শুধু হিমশীতল শূন্যতা। যেন মৃত্যু আর জীবন তার কাছে শুধুই কেমিক্যাল ফর্মুলা।
পেছন থেকে একজন বিজ্ঞানী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে থমকে দাঁড়ালেন। মাথা নিচু করে নীরবতা পালন করতেই যুবকটি ধীরলয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল, কিন্তু তাতে মিশে আছে দম্ভ,
“জীবন হলো একমাত্র উপাদান, যা নিয়ে সৃষ্টিকর্তা আর আমার মধ্যে চলছে এক নীরব যুদ্ধ। আর এই মুহূর্তে, আমি তাকে পরাজিত করার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি।”
মাথা তুলে চাইল বিজ্ঞানী। এরপর ধরফর করা বুক নিয়ে ধীর গলায় বলল,
“স্যার শেষ পরীক্ষায় হৃদস্পন্দন ফিরেছিল ঠিকই। কিন্তু সাবজেক্টের আচরণ অস্বাভাবিক ছিল।”
লোকটার ঠোঁটে হালকা হাসি। চোখে নিঃসঙ্গ এক উন্মাদনা।
“অস্বাভাবিক? মৃত্যু থেকে ফিরে কেউ যদি স্বাভাবিক থাকে তাহলে তো বিজ্ঞান ব্যর্থ। আমাদের কাজই তো অস্বাভাবিক জিনিস সম্ভব করে তোলা।”
লোকটা এগিয়ে গেল একটি কাঁচের ঘরের সামনে। যার ভেতরে দেখা যাচ্ছে এক নিঃস্পন্দ দেহ। শরীরের শত শত তার ও যন্ত্রপাতি জড়ানো। সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে,
“পৃথিবী বলবে আমি পাগল, কারণ আমি মৃত্যুকে প্রশ্ন করেছি। তারা বলবে আমি অপরাধী, কারণ আমি প্রকৃতির শৃঙ্খলা ভেঙ্গেছি। কিন্তু তারা জানে না আমি কেবল অবাস্তব কে বাস্তব করতে চেয়েছি।”
“স্যার এই প্রজেক্টের কারণে ১৭ জন স্বেচ্ছাসেবকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই ছিল সাধারণ মানুষ। তারা নিজেরাও জানত না কি হচ্ছে তাদের শরীরে!”
এক মুহূর্তের জন্য কক্ষের তাপমাত্রা যেন আরও কমে গেল। সেই শান্ত ও শীতল চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং সেখানে খেলা করছে এক পৈশাচিক গর্ব।
“তারা ছিল তুচ্ছ। ইতিহাস কাউকে মনে রাখে না, যারা কিছু করেনি।
আমার পরীক্ষায় যারা প্রাণ হারিয়েছে তারা প্রথম শহীদ।তাদের রক্ত দিয়েই লেখা হবে আগামীর মহাকাব্য, যেখানে মৃত্যু থাকবে ঠিকই, কিন্তু তার ওপর খোদাই করা থাকবে আমার নাম—আলেস্সান্দ্রো!”
বাইরে তখন মেঘের গর্জন। রোমের আকাশে এক ঝলক বিদ্যুতের আলো ঠিকরে পড়ল আলেস্সান্দ্রোর মুখে। জানালার কাঁচ থরথর করে কেঁপে উঠল।
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৭
“এই শহরে কেউ সুখী নয়। সবাই হারিয়েছে কিছু না কিছু । আর আমিই সেই ত্রাণকর্তা, যে মানুষের হারানো জিনিস ফিরিয়ে দেবে। যে কোনো মূল্যে!”
বজ্রপাতের তীব্র আলোয় দেখা গেল তার চোখ যেখানে তখনও সেই একই শীতল নির্ভীক উন্মাদনা।…….
