প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৩
সাদিয়া সাদু
খান বাড়ির বড় ছেলে , দীর্ঘদিন পর বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সুবাদে । বাড়ির কর্তি জহুরা খান এক ওয়েল কাম ব্যাক পার্টির আয়োজন করছে । তার সাথে মনে মনে চেপে রেখেছে অন্য পরিকল্পনা। এই অনুষ্ঠান দিগন্তের নীকট অজানা । জহুরা খান নিজের মেয়ে দুটো আর নাতি নাতনিরের খবর পাঠিয়েছেন যত দ্রুত সম্ভব চলে আসতে । তার খবর পাঠানোর এক ঘন্টার পরেই খানা বাড়িতে হাজির হয় । জহুরা খানের বড় মেয়ে নাসিমা খান । তার ছেলে মেয়েকে নিয়েই হাজির হয় সেখানে। নাসিমা খান বাড়িতে ফেরেই মাকে জড়িয়ে ধরে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে পা বাড়ায় । সাথে নিয়ে চলে মেয়ে জিসাকেও।
দিগন্ত ঘরে ঘুমিয়ে আছে, আর বাইরে চলছে যুদ্ধের মতো আয়োজন।
মেইন গেট থেকেই তাক লেগে যায়। দুই পাশে সারি সারি গাঁদা, সাদা গোলাপ আর রজনীগন্ধার ঝাড়। গেটের মাথায় বড় করে লেখা “Welcome Home Digonto” — অক্ষরগুলোর ভেতর দিয়ে চলে গেছে নীল-সোনালি রঙিন এলইডি লাইটের লাইন। কারেন্ট গেলেও যেন অন্ধকার না হয়, তাই জেনারেটরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
উঠানের পুরোটা জুড়ে টানানো হয়েছে সাদা শামিয়ানা। শামিয়ানার ছাদ থেকে ঝুলছে কাচের ঝাড়বাতি আর ছোট ছোট ফেইরি লাইট। মনে হচ্ছে আকাশের তারা নেমে এসেছে। মেঝেতে বিছানো লাল-মেরুন কার্পেট। কার্পেটের দুই ধার দিয়ে কাঁচের বোলে রাখা হয়েছে ভাসমান গোলাপ আর গাঁদা ফুল। রাতে মোমবাতি জ্বালালে পানি আর ফুল মিলে জায়গাটা স্বপ্নের মতো লাগবে।
এক পাশে স্টেজ বানানো হয়েছে। স্টেজের ব্যাকগ্রাউন্ডে বড় LED স্ক্রিন। সেখানে দিগন্তের ছোটবেলার ছবি, স্কুলের ছবি, বিদেশের ছবি — সব একটার পর একটা ভাসছে। স্টেজের দুই পাশে দুইটা বড় ফুলের ভাস্কর্য — একটা রাজহাঁস, আরেকটা কলসি। পুরোটাই টাটকা সাদা লিলি আর অর্কিড দিয়ে বানানো।
বাড়ির দেয়াল, জানালা, সিঁড়ির রেলিং — কোথাও ফুল আর লাইট বাদ যায়নি। পুকুরপাড়ে লাগানো হয়েছে রঙিন কাগজের লণ্ঠন। বাতাসে লণ্ঠনগুলো দুলছে, পানিতে আলো পড়ে চিকচিক করছে। তার সাথে চলছে রন্ধনশালায় বিশ্বাল আয়োজন।
সন্ধ্যা ৭টায় দিগন্ত আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠে সাদা পাতলা টি শার্ট ধারা নিজের বলিষ্ঠ দেহখানা ঢেকে পা চালাল নিচে । সিঁড়িতে পা রাখতেই , চারপাশের সব লাইট একসাথে জ্বলে উঠলো। LED স্ক্রিনে ভেসে উঠলো “The King is Back”। ফুলের পাপড়ি ছিটাতে ছিটাতে চার বোন , তিন ভাই দৌড়ে এলো। মিতু-রিমির নাচ, জিসার ফুলের মালা, সুমির , আফনান , আরিয়ান, শান্ত “দিগন্ত ভাইয়া জিন্দাবাদ” স্লোগান — সব মিলিয়ে কান ঝালাপালা। দিগন্ত দুই অঙ্গুল দিয়ে কান ঝাড়া দিলো । নির্লিপ্ত চাহনিতে আশপাশ তাকালো , কিন্তু মুখ ফুটে কোনো শব্দ প্রয়োগ করলো না ।
জহুরা দিগন্তের কপালে চুমু খাই বলে।
” দাদু ভাঈ , তোমার জন্য তো দুবাই থেকে পোশাক আনানো হয়েছে সেইগুলো পড়ে নিচে আসো । ”
দিগন্ত এক পলক দূড়ে দাঁড়িয়ে থাকা , জারুলের দিকে তাকাল । সারা শরীরের অবস্থা বর্তমানে নাজেহাল । সারাদিন কাজ করতে করতে ক্লান্ত ,চোখ নিয়ে হাতে জুসের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আসে ।
দিগন্ত তার থেকে চোখ সরিয়ে দাদির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল।
_’ যেভাবে আছি এইভাবে যা করার করো । ‘
জহুরা লম্বা শ্বাস ফেলে । দীনা ও ছেলের পাশে উপস্থিত হয় । নিচু স্বরেই বলে ।
_’ তুই কি পাগল ? এতো স্বনামধন্য মানুষ উপস্থিত এইখানে আর তুই এই পোশাকে অনুষ্ঠানে এটেন্ট করবি ! তোকে ঘিরেই তো সব , সবার চোখ তোর উপরেই থাকবে । ‘
দিগন্ত মায়ের দিকে তাকায়।
_’ ইয়েস । যা করার এইভাবেই করো । শর্ট অন টাইম । ”
দীনা আর কথা বাড়ায় না ঘারত্যাড়া ছেলের সাথে কি -ই বা বলবে যা বলবে তাই করবে ।
জহুরা আর কত বাড়ায় না । নাতিকে নিয়ে সোজা স্টেজে চলে যায় । মাইক হাতে নিলেন। চারপাশে হাজারো মানুষ, বাড়ির সকল ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে । দিগন্তের বাবা নাসির উদ্দিন খান ও দাঁড়িয়ে আছে । জহুরা গলা পরিষ্কার করে বললেন,
জহুরা স্টেজের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। হাতে মাইক। চারপাশে হাজারো মানুষ, সামনে দিগন্ত ট্রাউজারের পকেটের দুই হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেজের LED লাইট দাদির সাদা চুলের উপর পড়ে ঝলমল করছে। দাদি একবার সবার দিকে তাকালেন, তারপর মাইকটা মুখের কাছে ধরলেন। গলাটা কাঁপছে, কিন্তু চোখে আগুন।
“আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আজ আমার খান বাড়ির জন্য অনেক বড় দিন। লং টাইম পর আমার নাতি দিগন্ত বিদেশ থেকে ফিরেছে। ছয় টা বছর আমি এই দিনটার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম ।”
দাদি একটু থামলেন। চোখ মুছলেন আঁচল দিয়ে।
“আমি আজকে এখানে দাঁড়িয়ে একটা অ্যানাউসমেন্ট দিতে চাই। আমার বয়স হয়েছে। আর পারি না। এই খান গ্রুপের সব বিজনেস সব দায়-দায়িত্ব আজ থেকে আমি আমার নাতি দিগন্তের হাতে তুলে দিলাম। আমার সকল সম্পত্তি. জমি, কলকারখানা, বাজার — all his responsibility now.” আপনাদের সাথে সকল চুক্তি , শেয়ার সকল কিছুর দেখবার আজ থেকে দিগন্ত খান করবে । এক কথায় , দিগন্ত খান আজ থেকে চৌধুরী গ্ৰুপের চেয়ারম্যান , আমি জহুরা খান আজ থেকে অবসরে গেলাম । ‘
স্টেজের নিচ থেকে হাততালি উঠলো। দিগন্ত চোখমুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। জিসা আর নাসিমার খুশি যেনো উপচে পড়ছে। সাথে নাসির উদ্দিন মায়ের সিদ্ধান্ত। কয়েকবার বিরবিরাল। ‘ এই ছেলে এই বয়সে আপনাকে স্ট্রোক না করালেই হবে । সকলের চোখে খুশি উপচে পড়লেও , একজনের চোখে ছিলো , রাগ , ঈর্ষান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে দিগন্তের দিকে ।
জহুরা খান পূণরায় আবারো বলে ।
_” আপনাদের এইখানে আনার সবচেয়ে বড় ঘোষনাটা এখন দিবো । আবার নাতনি জিসা শিকদারের সাথে , দিগন্ত খানের এনগেজমেন্ট হবে আজ । এই স্টেজে এই মুহূর্তে। ‘
চার বোন একসাথে “ওলে বাবা!” বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সুমি তো লাফ দিয়ে জিসার কোলে। ফুলের গন্ধ, লাইটের ঝলকানি আর হাজারো মানুষের হাততালির মাঝে খান বাড়িতে বেজে উঠলো নতুন খুশির সানাই। দিগন্তেল চাহনি নির্লিপ্ত ই । তার এসব এ কোনো হেলদুল নাই । সে চুপচাপ ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জারুল এর দিকে তাকিয়ে আছে ।
জহুরা নাতির দিকে মাইক এগিয়ে দেয় ।
_’ কিছু বলো দাদুভাই ।’
_’ তুমিই বলো , আমি ঘুমাবো ।’
দিগন্ত আর দাঁড়ায় না । হনহনিয়ে চলে যায়। জহুরা কটমটিয়ে দিগন্তের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুটা হেঁসে সবাইকে পার্টি এনজয় করতে বলে ।
রাত ১১ টা
জিসার সাথে দিগন্তের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে । দিগন্ত আংটি না পড়ালেও জহুরা খান নিজের হাতে পড়িয়ে দিয়েছ । সে থেকে জিসার খুশি দেখে কে । হে নাচতে নাচতে চলে আসে রান্নাঘরে থাকা জারুল এর দিকে। হাতে স্বর্ণের আংটি টা দেখিয়ে টেনে টেনে বলে ।
_’ দেখ জিত আমারি হয়েছে । তোর সকল কিছু এখন আমার । তুই যে রাজপ্রাসাদে রাজরানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতি সে প্রসাদের রানী এখন আমি , আর তুই চাকরানি ।’
জারুল একটু হাসলো। কিছু বলতে যাবে তার আগেই দীনা ডেকে উঠলো । সে একটু হেঁসে বলে ।
_’ ঘুড়ি ওড়ার জন্য দিয়েছি , নাটাই আমার হাতে । যখন ইচ্ছে হবে সুতোটা টেনে ঘুরিটা কাছে নিয়ে আসবো , তখন তোমার কি হবে সোনা , চু চু । ‘
কিড়মিড়িয়ে তাকালো জিসা ।
_’ ঘুড়িটার সুতো আমি মাঝখানে কেটে ফেলতে জানি । ‘
জারুল হাতের ট্রে টা শক্ত করে ধরে বলে।
_’ আমার মেয়ের দিকে তাকালে চোখ উপড়ে ফেলবো আমি । মাইন্ড ইট । ‘
বলে আর দাঁড়ায় না হনহনিয়ে চলে যায় দীনা বেগমের ডাক অনুসরণ করে । পিছন থেকে জিসা চিৎকার করে উঠে ।
“যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা । ‘
‘ খালাম্মা ডেকেছেন? ‘
জারুল এর কথা দীনা উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলে
_’ দিগন্তের খাবারটা দিয়ে আয় তো , অনেক রাত হয়েছে আর নিচে আসবে না । আমার হাতেও কিছু কাজ আছে ।’
জারুল বড় বড় চোখে তাকায় । জমের গুহায় যেতে হবে ভাবতেই গা ঝিমঝিম করতে না ও করতে পারবে না ।সে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে না যায় দুই তলায় । হাত টকটক করে কাঁপছে । সে দরজায় পা রাখতেই ভেতর থেকে একটা শক্ত পোক্ত হাত টেনে ধরে । হুরমুরিয়ে পড়ে অজ্ঞতের শক্তপোক্ত বুকে । হাতে থাকা সিরামিকের ট্রে টা পড়ে ঝনঝনানিয়ে গুঁড়ো হয়ে যায় । দিগন্ত জারুল এর লতানো কোমড়টা শক্ত করে ধরে । হিসহিসিয়ে বলে ।
_” আমার বউ তুমি আমার সকল চাহিদা পুরণ করা তোমার দায়িত্ব। ‘
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২
জারুল ফাঁকা ঢোঁক গিলে । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে । দিগন্তের তপ্ত শ্বাস জারুলের ঘাড়ে আর কানে পড়ছে । তলপেট মুচড়ে দিয়ে উঠছে, পায়ের পাতা শিরশির করছে । জারুল শক্ত হতে চাইলেও পারে না নেতিয়ে পড়ে ।নিম্ন স্বরে বলে।
_” আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে । ‘
_’ তোমাকে আবারো স্মরণ করে দিচ্ছি সোনা আমি সাইন করিনি । সাইন করলে তোমাকে জাহান্নাম ঘুরিয়ে আনবো কি করে। চলো আদর করি । তুমি দিলে ব্যথা আমিও দেই চলো বিছানায়। ‘
