প্রিয় প্রণয়িনী সারপ্রাইজ পর্ব ১
জান্নাত নুসরাত
“তোর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে।
নুসরাতের হাত থেকে মোবাইল ধুপ করে কংক্রিটের রাস্তায় পড়ে গেল। নিজের কানের ভুল মনে করল পরপরই লাউড স্পিকারে থাকা ফোনের ও-পাশ থেকে সৌরভির উত্তেজিত গলার স্বর ভেসে আসলো,”শুনতে পাচ্ছিস নুসরাত,আরশ ভাইয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেছে।
নুসরাত কথা বলল না৷ চোখ মুখ অস্বাভাবিক করে নোংরা জায়গাটায় হাত পা ছড়িয়ে বসে গেল। ঢোক গিলে নিজের অস্তিরতা সামলানোর চেষ্টা করল। সৌরভি চিৎকার করছে ও-পাশে,”তুই কোথায়? ইরহাম আর আমি তোকে নিতে আসছি।
নুসরাত মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“রোজ ভ্যালি গার্ডেনে আছি।
ও-পাশ থেকে ফোন কাটার শব্দ হলো। নুসরাত হাত বাড়িয়ে মোবাইল হাতে নিতেই থরথর করে কেঁপে উঠল। আইজান হা করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁদো কাঁদো মুখ করে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, নুসরাত থামিয়ে দিল। পাশের ছোট্ট একটা খুটিতে হেলান দিয়ে বসল। চোখ বন্ধ করে বসে রইল চুপচাপ। নিজের ভিতরের অস্তিরতা নিজের ভিতরেই সমাদৃত করতে চাইল।
গেটের সামনে গাড়ির থামার শব্দ হতেই নুসরাত খুটিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। আইজানের এক হাত খপ করে চেপে ধরে এগোলো গেটের দিকে। গাড়ির ভিতর ইরহাম আর সৌরভি চোখ-মুখ কালো বসে আছে।
নুসরাত কথা বলল না। কোলে তুলে আইজানকে ব্যাক সিটে বসিয়ে দিয়ে নিজে ও উঠে বসল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। গাড়ির দরজা লাগিয়ে শরীর ছেড়ে দিল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সৌরভি-আর ইরহাম নিজেদের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। নুসরাতের এতো শান্ত থাকা দু-জনের দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দিল। সৌরভি কিছু বলতে যাবে নুসরাত গমগমে গলায় বলল,”এটা যদি কোনো প্রাঙ্ক হয় তাহলে এখানেই থেমে যা সবাই।
সৌরভি দুঃখি মুখ বানাল। দীর্ঘ শ্বাস ফেলল শব্দ করে। চোখ-মুখ নিদারুণ করুন করে বলল,”আমি প্রথমে মনে করেছিলাম আরশ ভাই প্রাঙ্ক করছে, কিন্তু আরশ ভাই রেজিস্ট্রি করে নিয়ে আসছে, এসেই রেজিস্ট্রি পেপার দেখিয়েছে।
নুসরাত ভিতরের তিক্ততা চুপচাপ গিলে নিল। মোবাইল আইজানের হাতে দিয়ে চোখ বন্ধ করে মাথা হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে বলল,”কখন বিয়ে করেছেন উনি?
এবার ইরহাম উত্তর দিল। রাগে ফেটে যাচ্ছে সে। রাগী কন্ঠে বলল,”এক ঘন্টা আগে।
নুসরাত চুপ করে বসে রইল। চুপচাপ ভাবতে বসল সত্যি যদি বিয়ে করে থাকে আরশ,তার আর আইজানের কি হবে?
ইরহাম নুসরাতের দিকে ড্রাইভিং করতে করতে তাকাল। নুসরাতের মুখ দেখে আরশের প্রতি রাগ আরো বেড়ে গেল। চোখ সরিয়ে নিয়ে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগী হলো।
দু-দিন আগে নুসরাত আর আইজান এসেছিল তাদের নানার বাসায়। কয়েকদিন যাবত নুসরাতের নানার শরীর খারাপ। তাই নানার কাছে কয়েকদিন থাকার জন্য এসেছিল। এই আসা যদি তার জীবনে এতো ভয়াবহ ধাক্কা দিবে সে জানত, তাহলে জীবনে ও সে এখানে আসত না। আরশ কীভাবে বিয়ে করতে পারল? একবার তার আর আইজানের কথা মাথায় আসলো না। নুসরাত ছাড়বে না, আরশকে। আজ ওকে জবাবদিহিতা করতে হবে। কেন করেছে ও দ্বিতীয় বিয়ে? নুসরাতের ভিতর কীসের কমতি ছিল যে,তাকে আরেকটা বিয়ে করতে হলো।
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। নুসরাত বিরক্ত হয়ে তাকাল ইরহামের দিকে। তিক্ত বিরক্ত কন্ঠে বলল,”এটা গাড়ি নাকি ঠেলাগাড়ি চালাচ্ছিস তুই! তাড়াতাড়ি চালা।
নুসরাতের বিরক্ত গলা শুনে ইরহাম গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। নুসরাত আইজানকে কোলে তুলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখল বুকের সাথে। বুক ব্যথা যদি একটু কমে সে জন্য। শক্ত করে ধরে রাখল ছেলেকে নিজের সাথে। গলার কাছে দলা পাকানো কান্না গুলো ঢোক গিলে গলার কাছে আটকে রাখল। ইরহামকে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল,”বড়-আব্বু, বড়-আম্মু, আম্মা আব্বা, চাচ্চুরা কি বলল?
ইরহাম শব্দ করে শ্বাস ফেলল। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল,”কিছু বলার আগেই মুখের উপর রেজিস্ট্রি পেপার ধরিয়ে দিয়েছেন। বড় আব্বু জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন? রিজন কি?
নুসরাত চোখ মুখ উদ্বেগ নিয়ে চেয়ে রইল, পরবর্তী কথা শুনার জন্য।। ইরহাম মাত্রারিক্ত রাগে হাত দিয়ে হুইল চেপে ধরে বলল,”বলেছেন, আমার লাইফ, আমার যা ইচ্ছে তাই করব। যেখানে ধর্মে চার বিয়ে করার সম্মতি আছে সেখানে আপনাকে আমি জবাবদিহিতার করার প্রয়োজন বোধ করছি না। বড় আব্বু আর কিছু বলার আগেই নতুন বউ নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন। আর ওই বেটি ও খুব মিনমিনে, ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যতক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
নুসরাত আইজানের দু-কান হাত দিয়ে চেপে ধরে নির্লিপ্ত মুখ বানিয়ে বসে রইল। গাড়ি গিয়ে সৈয়দ বাড়ির সামনে থামতেই আইজানের হাত ধরে নেমে দাঁড়াল নুসরাত। ধীরে ধীরে হেঁটে সৈয়দ বাড়ির ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই সবাই নুসরাতের দিকে দৃষ্টি দিল। চোখ ছোট ছোট করে সবাই বুঝতে চাইলেন নুসরাতের মনোভাব।
চোখ-মুখ শান্ত। নেই কোনো উদ্বিগ্নতা। সবার দিকে এক পলক নুসরাত চাইল। লিপি বেগম আর নাজমিন বেগম হাই হুতাশ করে কান্না করছেন। ঝর্ণা বেগম আর রুহিনি বেগম সান্ত্বনা দিচ্ছেন। নুসরাতের দিকে নাজমিন বেগম তাকিয়েই হাউ মাউ করে কান্না করতে শুরু করলেন। কান্নার সাথে মাথায় হাত দিয়ে বারি দিচ্ছেন আর বলছেন,”আমার মেয়ে আর মেয়ের বাচ্চাটার এখন কি হবে?
নুসরাত আর অপেক্ষা করল না। চুপচাপ হেঁটে চলে গেল কিচেনের দিকে। পাঁচ মিনিট পর কিচেন থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। ধীর পায়ে অগ্রসর হলো আরশের রুমের দিকে।
আইজানকে কোলে তুলে নিয়েছেন শোহেব। মন খারাপ করে বসে থাকা বাচ্চাটার মনভুলানো কথা বলে মন ভালো করার চেষ্টা করছেন। হেলাল সাহেব আর নাছির সাহেব মাথায় হাত চেপে বসে আছেন। হেলাল সাহেব মাথা নিচু করে বসে থাকলেন। চোখ তুলে তাকাতে পারলেন নুসরাতের চোখে। ছেলের এতো অবনতি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। মেয়েটাকে আর বাচ্চাটাকে কীভাবে মুখ দেখাবেন তিনি?
নুসরাত ধীরে ধীরে পা বাড়াল। তার পিছু পিছু হেঁটে আসছে ইরহাম, ইনায়া আর সৌরভি। নুসরাতের বুকের ভিতর ধুক ধুক শব্দ হচ্ছে। চোখ বন্ধ করতেই চোখের কোণ বেয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। দু-আঙুলের সাহায্যে টোকা মেরে ফেলে দিল অবেহেলা নিয়ে পানিগুলো। হাতের কব্জিতে চোখ ডলতে লাগল যাতে আরশের সামনে গিয়ে চোখ দিয়ে পানি না বের হয়।
রুমের সামনে দাঁড়াতেই ভিতর থেকে খুনসুটির আওয়াজ ভেসে আসলো। নুসরাত চোখ মুখ স্বাভাবিক করে কাঁপা হাতে দরজা ঠেলে রুমের ভিতর প্রবেশ করল।
রুমের ভিতরের পরিবেশ দেখে নুসরাতের সারা-দুনিয়া নড়ে উঠল। আরশ মেয়েটার ঘোমটা তুলে চুমু খাচ্ছে কপালে। মেয়েটা নুসরাতের দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে আর আরশের মুখ হাসি হাসি। এখনো নুসরাত কে খেয়াল করেনি তারা।
নুসরাত নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না, এই পরিবেশ দেখে পায়ের স্লিপার খুলে ছুঁড়ে মারল আরশের দিকে। স্লিপার গিয়ে আরশের উপর পড়তেই আরশ খেপা চোখে তাকাল সামনের দিকে। নুসরাত কে দেখতেই খেপা দৃষ্টিতে নেমে আসলো নমনীয়তা।
নুসরাত এখনো স্থির নিজের জায়গায়। একবার আরশ আর একবার বিছানায় বেনারসি পরে উল্টো হয়ে বসে থাকা ছোটো খাটো মেয়েটাকে দেখছে।
আরশের ভাবাবেগ হলো না নুসরাতকে দেখে। উঠে দাঁড়িয়ে টেনে সাদা পাঞ্জবীর ভাঁজ ঠিক করে নিল। গম্ভীর গলায় বলল,”কে তোকে নিয়ে এসেছে?
নুসরাত উত্তর দিল না। চোখ-মুখ শক্ত করে হাত তুলল বিছানায় বসে থাকা মেয়েটার দিকে। তর্জনী আঙুল তাক করে বলল,”ওই মেয়েটা কে?
আরশের গলার স্বর নির্লিপ্ত। নুসরাতের সামনে দাঁড়িয়ে দু-হাত দিয়ে মেয়েটার দু-হাত আগলে ধরল নিজের হাতের মধ্যে। গলার স্বর গম্ভীর রেখে ভরাট গলায় বলল,”আমার বউ।
নুসরাত নিজেদের দিকে আঙুল তুলল। কান্নারা চোখের ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে, তবুও নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,”তাহলে আমি কে?
আরশ নির্বিকার। নুসরাতের হাত ছেড়ে দিয়ে মেয়েলি দু-গাল আগলে নিল নিজের হাতের মধ্যে। দরজার দিকে গম্ভীর চোখে এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। মোলায়েম কন্ঠে বলল,”তুই ও আমার বউ।
নুসরাত নির্বাক। কথার বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। গাড়িতে বসে গুছিয়ে রাখা কথা গুলো এক এক করে সব উলোট পালোট হয়ে গেল। মুখ দিয়ে বের হলো না একটি শব্দ। ভাঙা গলায় বলল,”ওই মেয়েকে বিয়ে করেছেন কেন?
আরশ নিজের হাতের তালু দিয়ে আরো একটু চাপ দিয়ে ধরল নুসরাতের গাল। মৃদু হেসে নুসরাতের গালে চুমু খেয়ে বলল,”ওকে আমি ভালোবাসি।
দরজার সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলো নির্বাক। ইরহাম রাগে দরজার নব চেপে ধরল বল প্রয়োগ করে। সে যদি পারত তাহলে আরশকে মাটির নিচে আস্তো পুতে ফেলত। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে চেয়ে রইল নুসরাতের দিকে। কী উত্তর দে তা দেখার আশায়?
নুসরাত তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠল। টেনে শ্বাস নিল। মনে হলো এই রুমে অক্সিজেনের গার্তি আছে। আরশের হাত গাল থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,”ওই মেয়েটাকে ভালোবাসলে, আমার সাথে আপনার কীসের সম্পর্ক?
আরশ হাস্কি টোনে বলল,
“তোর সাথে আমার মায়ার সম্পর্ক।
নুসরাতের নিজেকে সামলানো দায় হলো। সামনে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রাগে মাথা দিয়ে ধুপ ধাপ বারি দিতে লাগল।। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আরশ নির্বাক হয়ে গেল নুসরাতের কান্না দেখে। হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল নুসরাতের কব্জি। টেনে নিজের কাছে এনে দাঁড় করাতেই নুসরাত নিজের চুল টেনে ধরল এক হাত দিয়ে।
আরশের হাত থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার প্রাণপণ চেষ্টা করল। আরশ নুসরাতের রাগ আরো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,” আরে এরকম করছিস কেন? কি হয়েছে তোর?
নুসরাত আরশের হাত থেকে নিজের কব্জি ছাড়িয়ে নিয়ে এসে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা এখনো চুপচাপ বসে আছে বিছানার উপর ঘোমটা টেনে।
নুসরাত হাত বাড়িয়ে চুল চেপে ধরতে চাইল মেয়েটার, আরশ পিছন থেকে নুসরাতের উদর চেপে ধরল। উদর চেপে ধরে টেনে নিয়ে আসলো দরজার সামনে।
নুসরাত হাত দিয়ে আরশকে কিল থাপ্পড় মারছে। আরশ ছেড়ে দিয়ে নুসরাতকে ধমকে উঠল,”কি, হয়েছে কি?
নুসরাত দাঁতে দাঁত পিষল। আরশের গলা দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠে বলে,”তুমি কেন বিয়ে করেছ ওই মেয়েকে?
আরশ বিরক্তির সাথে নুসরাতের হাত থেকে নিজের গলা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,”বললাম না, ভালোবাসি তাই!
নুসরাত আরশের দিকে স্থির তাকিয়ে থেকে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”এতো ভালোবাসা তোর কোথা থেকে আসে?
আরশের বুকের বাঁ-পাশে তর্জনী আঙুল রেখে বলল,
“এখান থেকে।
নুসরাত নিশ্চুপ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল নিজের স্বামীর দিকে। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলল,” আমার মধ্যে কি ত্রুটি ছিল যে, আমি থাকতে অন্য আরেকজন তোর মনে জায়গা পেয়েছে?
আরশ নিশ্চুপ। নুসরাত পাঞ্জাবীর কলার টেনে ধরে আরশের মুখে নিজের মুখের কাছে আনলো। দাঁত দিয়ে দাঁত চেপে বলল,”আমি উত্তর চাই। নিশ্চুপ থাকতে তোকে বলিনি।
আরশ নুসরাতের হাত কলার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙল। বিরক্তি গলায় নাক-মুখ কুঁচকে উত্তর দেয়,”একবার বললাম হলো না, এক প্রশ্ন বারবার করিস কেন?
নুসরাত মুখ দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে গেল। মুখ চেপে রেখে চোখ-মুখ কুঁচকে কান্না করে দিল। শব্দ হলো না কান্নার! কিছুক্ষণ বসে থেকে দু-হাত মুখের পানি মুছে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল,”আমার কোনো সমস্যা নেই বিয়ে হলে, আপনি ওকে ডিভোর্স দিয়ে দিন, তাহলে তো সব কেচ্ছা খতম হয়ে যায় এখানে।
আরশ যেন নুসরাতের কথায় ভারি অবাক হলো। নাক মুখ ছিটকে বিরক্তির স্বরে বলল,”তোকে একবার বললাম না, ওকে আমি ভালোবাসি, তাহলে ডিভোর্স দিতে যাব কোন দুঃখে ।
নুসরাত নিজেকে সামলাতে পারল না। এক পায়ে অবশিষ্ট থাকা স্লিপার সোজা ছুঁড়ে মারল আরশের ঠোঁট বরাবর। স্লিপার আরশের মুখের উপর পড়তেই আরশ নিজের মুখ চেপে ধরল। আর্তনাদ করে উঠল, মুখে দু-হাত চেপে।
আরশের আর্তনাদ শুনে বিছানায় বসে থাকা ছোটো খাটো ধরণের মেয়েটা ঘোমটা চেপে ধরে এসে আরশের পাশে দাঁড়াল। মেয়েলি রিনরিনে গলায় বলল,
“আপনার লাগেনি তো!
নুসরাতের রাগে মাথা গরম হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকাল দু-জনের দিকে। দেখে মনে হলো অক্ষিকোটরের উপরে চোখ বের হয়ে আসবে। দু-হাত দিয়ে নিজের চুল খাঁমচে ধরে আর্তনাদ করে উঠল।
নুসরাত তিক্ততা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুই ডিভোর্স দিবি না?
আরশ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
” না।
নুসরাত দরজার সাথে নিজের মাথা দুটো বারি মারল। আরশ পিছন থেকে কপালে স্পর্শ করার আগেই নুসরাত নিজেকে সরিয়ে নিল দূরে।
“স্পর্শ করবেন না আমায়, নোংরা লোক। মেয়ে মানুষ দেখলেই আপনার চাহিদা জেগে উঠে।
” এসব কোন ধরনের কথা নুসরাত? যা তা মুখে আসলো আর বলে দিলেই হলো।
নুসরাত সে কথার উত্তর দিল না। রাগে নিজের ধ্যান জ্ঞান খুইয়ে মুখে যা আসলো তা বলে গেল।
“যখনি দেখেছেন কচি খুকি তখনি পুরুষত্ব জেগে উঠেছে আপনার। কি ওই মেয়ের কাছে আছে, যা আমার কাছে নেই। কি নেই আমার কাছে!
নুসরাত কথা থামিয়ে হেসে উঠল। মেয়েটার হাতের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য মিশিয়ে আরশের দিকে চোখ দিল। ঠোঁট টেনে হাসল এক পেশে! চাপা ক্লেষ নিয়ে আওড়ায়,” ওও তোমার নতুন বউ দেখছি অনেক সুন্দরী, সৌন্দর্য দেখে বিয়ে করেছেন। আমার মতো কালো মহিলার সাথে থাকতে আপনার এই রঙ নিয়ে অসুবিধা হচ্ছে।
দরজার সামনে দাঁড়ানো সবাই নির্বাক। তখনি সবাইকে ঠেলে আইজান রুমের ভিতর ঢুকতে চাইল। ইরহাম বড়দের মাঝে বাচ্চাকে রাখতে চাইল না। কোলে তুলে নিয়ে অন্যদিকে ঘুরতেই আরশ পিছন থেকে ডেকে উঠল,”আইজানকে আমার কাছে দে।
আরশ হাত বাড়িয়ে আছে আইজানকে কোলে নেওয়ার জন্য। ইরহাম দেনামোনা করে আইজানকে এগিয়ে দিতেই নুসরাত বাজ পাখির মতো ছু মেরে ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে নিল।
রুমের দরজার দাঁড়ানো সবাই হতবম্ব। নুসরাত রাগে রি রি করতে করতে বলল,”একদম আমার ছেলেকে স্পর্শ করবেন না।
আরশ নুসরাতের কথার পিঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“কেন? আইজান আমার ও ছেলে!
” কীসের ছেলে? যখনি আপনি ওই মেয়েকে কবুল বলে নিজের করেছেন, তখন থেকেই আমি আর তেহবিন আপনার পর হয়েছি।
আরশ হা করে তাকিয়ে থাকল নির্মিশেষ চোখে বিস্ময়ের সহিত সামনের দিকে। নুসরাতের পরিবর্তি কথা শুনে সে নিজের চোয়াল শক্ত করে নিল।
“আমাকে ডিভোর্স দিন। আমি সতিনের সংসার করব না। আপনি যদি ভেবে থাকেন আমি সতিনের সংসার করব এটা আপনার মনের ভুল। আমি ঐ সব নারী না, যারা মুখ বুজে, অন্ধ না হয়েও অন্ধ হয়ে, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে চুপচাপ মেনে নেয়। আমার সাথে একদম ঐ-সব টিপিকাল মহিলাদের মিলাতে যাবেন না। আমি সৈয়দা নুসরাত নাছির, এইসব লেইম এক্সকিউজ শুনে আপনার সাথে সতিনের সংসার করব, এটা আপনার সো কোল্ড ভাবনা! আ’ম স্যরি, প্লিজ গিভ মি ডিভোর্স। আমি ডিভোর্স চাই মানে চাই। আর একটা বাক্য যেন, না বের হয় আপনার মুখ থেকে। নাহলে মুখে কীভাবে স্টেপলার মেরে বন্ধ করতে হয় তা আমি খুব ভালো জানি এবং হাত চালাতে ও বেশ জানি। একদম হালকা নিবেন না আমাকে আরশ। আমাকে ডিভোর্স আপনাকে দিতে হবে।
আরশ নুসরাতের কথার উত্তর দিল না। মুখ ফিরিয়ে নিতেই নুসরাত খাঁমচে ধরল আরশের পিঠের কাছের পাঞ্জাবী৷ আরশ গম্ভীর চোখে তাকাতেই বলল,
“আমাকে তালাক দিন।
আরশের গম্ভীর গলার আওয়াজ,
“দিব না।
নুসরাত চোখ ছোট ছোট করে নিল। আরশ নুসরাতের দিকে চোখ স্থির করতেই দু-জনের চোখাচোখি হলো। মেয়েটার ভিতর তীব্র কম্পন হলো। হৃৎপিন্ড গতি বেড়ে গেল স্বাভাবিকের তুলনায়। নিজের ভিতরের উৎকন্ঠা নিজের ভিতর চাপা দিয়ে তেজী কন্ঠে আওড়ায়, “প্রয়োজন হলে আপনাকে খুন করব, তারপর তালাক নিব,তবুও সতিনের সংসার করব না। আমাকে তালাক দিন এক্ষুনি, এই মুহুর্তে!
আরশ নুসরাতকে বোঝানোর জন্য হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল তার কাঁধ। আইজানসহ তাকে টেনে নিয়ে আসলো নিজের কাছে। ফিসফিস কন্ঠে আওড়াল,” সমস্যা কোথায়?
নুসরাত ক্ষোভে ফেটে পড়ল। দ্বিতীয় বিয়ে করে আবার বলে সমস্যা কোথায়? দাঁতে দাঁত চেপে নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকাল।
আইজান মায়ের কাঁধে মাথা ফেলে শুয়ে আছে। একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে নুসরাত প্যান্টের পকেট থেকে নাইফ বের করল।
তখন বাড়িতে ঢুকেই এই নাইফ পকেটে ঢুকিয়ে ছিল সে। মৃদু হাসল মাথা কাত করে। আরশের দিকে এগিয়ে এসে নিজেদের ভিতরের দূরত্ব কমিয়ে নিল। দাঁত বের করে মৃদু হেসে হিসহিসিয়ে বলে,”আমি সতিনের সংসার করব না, প্রয়োজন হলে প্রথমে খুন আপনাকে, এবং দ্বিতীয় খুন আপনার বউকে করব। তারপরে ও সতিনের সংসার এই নুসরাত একদমই করবে না। আপনি আমার বাংলা কথা বুঝতে পারছেন না।
ছুড়ির চোখা অংশ আলগোছে আরশের বুকের বাঁ-পাশে চেপে ধরল। বাচ্চাদের মতো করে আরশের দিকে তাকায় ভোলাভালা মাছুম চেহারা বানিয়ে,ঠোঁট উল্টে ফিসফিস করে বলল,”যে হৃদয়ে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারীর অস্তিত্ব আছে, সেই হৃদয় চলাচলের চেয়ে না চলাচল করাই ভালো। হৃৎপিন্ড বরাবর একটা কোপ মেরে দেই, সব শেষ হয়ে যাবে এক নিমেষে। কি বলেন আপনি?
নুসরাত কথা বলতে বলতে আরশের পাঞ্জাবীর ভিতরে ছুড়ির চোখা অংশ ঢুকিয়ে দে। আরশ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নুসরাতের দিকে। নিজেকে সামলে নিয়ে ছুড়ি চেপে ধরার আগেই নুসরাত ছুড়ি হাত থেকে ফেলে দিয়ে চুল চেপে ধরল ছোটো খাটো মেয়েটার।
দু-হাত দিয়ে ঘোমটার উপর থেকেই মেয়েটার চুল চেপে ধরতেই,মেয়েটা চিৎকার করে উঠল। নুসরাত কটমট করে দাঁত দিয়ে দাঁত পিষল। আরশ মেয়েটাকে টেনে ছাড়িয়ে আনলো নুসরাতের কাছ থেকে। মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার আগেই সে আবার তেড়ে গেল।
আরশ দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখল নিজের সাথে। নুসরাত ধস্তাধস্তি করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। মুখ দিয়ে বিশ্রী ভাষায় আরশ আর ছোটো খাটো মেয়েটাকে গালি দিচ্ছে।
হঠাৎ আরশের বলা কথায় নুসরাত স্তব্ধ হয়ে গেল। নড়াচড়া বন্ধ করে নিজের জায়গায় অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ তুলে আরশের দিকে তাকাতেই আরশ চোখ দিয়ে ভরসা দিয়ে বলল,”ওকে আমি বিয়ে করিনি। ইট’স আ প্রাঙ্ক।
অপ্রাত্যাশিত ভাবে এই কথা শুনে নুসরাত নড়তে ভুলে গেল। আরশ মনে করল এই কথা শুনে, হয়তো বা নুসরাত কিছুটা শান্ত হয়েছে,কিন্তু তার চিন্তায় পানি ঢেলে দিল মেয়েটা।
ঘর কাঁপিয়ে থাপ্পড় পড়ল আরশের গালে। ইরহাম আর ইনায়া দু-পা পিছনে সরে গেল। দু-জনের আখিঁ যুগল প্রশস্ত হয়ে গেল নিমেষে।
থাপ্পড়ের বেগে আরশের মুখ পাশ ঘুরে গেল। চোখ তুলে জিজ্ঞাসার চোখে নুসরাতের দিকে চাইতেই আবার ও রুম কাঁপিয়ে অন্য গালে থাপ্পড় পড়ল।
ইরহাম ভয়ে পিছনের দিকে আরেকটু সরে গেল। সৌরভি হা করে তাকিয়ে আছে। কি হয়েছে? নুসরাত প্রাঙ্কের কথা শুনে থাপ্পড় মারছে কেন? তাদের আশ্চর্য চাহনি নুসরাত ফিরে দেখল না।
আরশকে থাপ্পড় মেরে হাত পা ছড়িয়ে বাচ্চাদের মতো মেঝেতে বসে হাউমাউ করে মুখ চেপে কেঁদে উঠল। ঝরঝর করে চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল গাল। আরশ এখনো নিজের জায়গায় স্থির। থাপ্পড় মারার কারণ এখনো খুঁজে পাচ্ছে না সে।
নুসরাতের কান্না শুনে হাঁটু ভাঁজ করে মেঝেতে বসল। হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দিতে গেলেই নুসরাত হাত ছিটকে সরিয়ে দিল। ফুঁপিয়ে উঠে আরশের বুকে, মুখে গলায় দু-হাতে দূর্বলভাবে আঘাত করতে শুরু করল।
আরশ নুসরাতকে থামানোর জন্য হাত চেপে ধরল। মাথা চেপে ধরে এনে রাখল বুকের কাছে। নুসরাত কেঁদে চলেছে এখনো। ফুঁপিয়ে উঠে বিড়বিড় করল,
“খুব বাজে, খারাপ একটা প্রাঙ্ক ছিল। আপনাকে আমি হত্যা করব। আপনি আবার ও আমার ইমোশন নিয়ে খেলা করলেন, আপনি কি আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবেন না। কেন এরকম করলেন? আমার শ্বাস এখানে আটকে গিয়েছিল।
নুসরাত গলার কাছে হাত দিয়ে দেখাল। ইরহাম এসে আইজানকে কোলে তুকে নিয়ে চলে গেল রুমের বাহিরে। সৌরভি আর ইনায়া ও পিছন পিছন হাঁটা ধরল। নিচে গিয়ে জানাতে হবে তো আরশ প্রাঙ্ক করছিল এতক্ষণ ধরে।
নুসরাত দু-হাত দিয়ে আরশের গলা চেপে ধরল। হাত পেঁচিয়ে নিয়ে আরশের চুলের ভাঁজে ঢুকিয়ে নিয়ে চুল টেনে ধরল। ফিসফিস কন্ঠে আওড়াল,”হার্ট অ্যাটাক করে মরে গেলে খুব ভালো লাগত তাই না। আপনি এরকম করলেন কেন? আপনি বাচ্চাদের মতো করলেন কেন?
আরশ শব্দ করে হেসে উঠল। দু-হাত দিয়ে নুসরাতের গাল চেপে ধরে নাকে নাক ঘষল। গালে, কপালে ঠোঁটে, নাকে, থুতনিতে সূক্ষ্ম চুমু খেল।
শাড়ী পরা মেয়েটা লজ্জা পেয়ে মিনমিন করে বলল,
” ভাইয়া আমি রয়েছি।
দু-জন নিষ্প্রাণ চোখে সামনে তাকাল। মেয়েটা মুখ থেকে ঘোমটা তুলতেই নুসরাতের মুখ হা হয়ে গেল। ঘোমটার নিচ থেকে আহানের হাসি হাসি মুখ বের হয়ে আসছে। মাথার মধ্যে আলাদা মেয়েলি চুল লাগিয়েছে। চোখ ঝাপটে মেয়েলি গলায় বলে,”বড় আপু কেমন দিলাম?
নুসরাত নিজের চোখ ডলে নিল দু-হাত দিয়ে। এই আহানের বাচ্চা তার জামাইয়ের বউ সাজছে। হাত তুলে নুসরাত থাপ্পড় মারার ভঙ্গি করতেই আহান হাসতে হাসতে বের হয়ে গেল রুম থেকে। গলার স্বর চিকন করে বলল,”ক্যারি অন ভাইয়া, আর বড় আপু।
প্রিয় প্রণয়িনী সারপ্রাইজ শেষ পর্ব
নুসরাত আহানের যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে এসে আরশের দিকে তাকাতেই আরশের ঠোঁটের এক পাশে চুমু খেল। একমুহূর্ত বিলম্ব না করে নুসরাত কে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হতে হতে বলল,”আর আমার অবাধ্য হবি।
নুসরাত উপর নিচ মাথা নাড়াল। নিষ্প্রাণ গলায় আওড়াল,”হ্যাঁ।
তারপরই দু-জন দু-জনের দিকে তাকিয়ে পুরো ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল।
