Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৪

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৪

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৪
জান্নাত নুসরাত

ঘড়ির কাটায় টিকটিক করে চলছে আপন গতিতে। হেলাল সাহেবের সাথে সকাল সকাল ঝগড়া শেষে মনটা ভালো হয়ে গেছে নুসরাতের। নাছির মঞ্জিলে আসার পর বারান্দায় হাঁটল আর গুণগুণ করে গান গাইল। এমন মুহুর্তে লক্ষ হলো সৈয়দ বাড়ির অভ্যন্তর হতে বের হওয়া চুনোপুঁটির মতো মানুষদের।

নুসরাতের মতামতে আজকাল তার চোখের পাওয়াএ প্লাসে মায়নাসে চলছে, তাই চোখে দূরের জিনিস কম দেখছে। দূরের জিনিস স্পষ্ট দেখার জন্য বারান্দা থেকে দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসলো চোখের সাদা ফ্রেমের গ্লাস। গ্লাসের উপরের অংশটা সামান্য চিকন। নিজের চোখে গ্লাস এঁটে নিয়ে দাম্ভিকতার সহিত নাক তুলে অহংকার করল। তবুও স্পষ্ট কিছুই দেখল না চোখে, তাই নিজের যুগান্তকারী আবিষ্কার নিয়ে আসলো, যা তাদের ঘরের ছোট আহানটন বানিয়েছে। চোখের সামনে দূরবীন চেপে ওই বাড়িতে চোখ রাখল, মনে হলো এরচেয়ে ভালো তার চোখদুটোই। তাই ভন্ডামি ছেড়ে বারান্দার রেলিঙ ধরে ঝুলে গেল ওপাশের বাড়ির অবস্থা দেখতে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

প্রথমেই লিপি বেগমকে বের হতে দেখা গেল, ভদ্রমহিলার পরণে নুড কালারের বোরকা, মাথায় একই কালারের হিজাব। পিছু পিছু হেলাল সাহেব বের হচ্ছেন, কানে মুঠোফোনটা চেপে ধরে চ্যাঁচাচ্ছেন, কোনো একটা বিষয় নিয়ে। নুসরাত সময় নিয়ে খেয়াল করল শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য ভদ্রলোক আজ বেশ সেজেছেন। সচরাচর যেমন থাকেন তার থেকে বেশি আজ ভালো করে তৈরি হয়েছেন। বাড়ির ফ্রন্ট ইয়ার্ডে এসে কব্জিতে আঁটা ঘড়িতে চোখ রাখলেন, অতঃপর আবারো উচ্চ স্বরে চ্যাঁচালেন, চ্যাঁচানো শেষে ভাব নিয়ে ট্রাউজারের পকেটে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলতে ব্যস্ত হলেন। কথা বলা শেষে স্ত্রীর মুখশ্রী পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বোলালেন, মুখে সাজের অস্তিত্ব পেতেই খ্যাক করে ওঠেন। বলেন,”এসব কী লাগিয়েছ মুখে তুমি লিপি!

“কেন খারাপ লাগছে!
লিপি বেগম ভয়ার্ত স্বরে শুধালেন স্বামীকে। স্ত্রীর কথা কানে না তুলেই হেলাল সাহেব নিজের মোবাইলের সেল্ফি ক্যামেরা অন করলেন, লিপি বেগমের মুখের সামনে নিয়ে চেহারা দেখাতে দেখাতে বললেন,”দেখো, পুরো জিন্নাতের মতো লাগতেছে!
লিপি বেগম ভেংচি কেটে বললেন,
“সুন্দরের কিছু বুঝেন আপনি?
“নাহ, তুমি একাই বোঝো!

‘“হ্যাঁ বুঝি বলেই তো সেজেছি! আপনার মতো বুড়ো বয়সে নায়ক সেজে ঘুরছি না।
ভদ্রলোক হাত দিয়ে মাথার চুল পেছনে ঠেলে দিয়ে মিষ্টি হাসলেন। অহমিকা মিশ্রিত কন্ঠে বললেন,”নায়কের মতো দেখতে হলে তো, নায়ক-ই সাজব!
“নায়কের ন ও লাগতেছে না আপনাকে, দেখতে পুরো কার্টুনের মতো লাগতেছে।
“জেলাস, জেলাস, কোনো বিষয় না, এত সুন্দর হ্যান্ডসাম চেহারা না থাকলে মানুষ তো জেলাসই হবে, এটা তোমার একার বিষয় না, পুরো পৃথিবীর মানুষ-ই আমার এই রুপ দেখে জ্বলে।
“যত্তসব ডং, আমি কেন জ্বলব!
“ হ্যাঁ এখন তো মনে হবে ডং, সঠিক উত্তর দিয়ে দিছি না তোমাকে। কথা বলি না বলে তোমার আমাকে কী মনে হয় লিপি, আমি কথা বলতে জানি না, আমি যদি যুক্তি সহকারে কথা বলতে শুরু করি এই পৃথিবীর কেউই আমার সামনে ঠিকতে পারবে না।

লিপি বেগম তেরছা চোখে তাকিয়ে মিনমিন করলেন,
“আপনার মতো মাথায় সমস্যা যার, সেই-ই ঠিকতে পারবে।
হেলাল সাহেব শুনলেন না, কপালে ভাঁজ ফেলে, খ্যাক করে জিজ্ঞেস করলেন,” কিছু বললে লিপি?
ভদ্রমহিলা দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে বোঝালেন কোনো কিছু বললেননি। এই লোকের সাথে কথা বাড়ানো মানেই নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা, আর তিনি এত পাগল না এই মাথায় দোষ ধরা লোকটার সাথে কথা বাড়াবেন, তাই কথা না বলাই যুথসই মনে হলো।

স্ত্রীর সাথে এক চোট ঝগড়া করার ইচ্ছে থাকলেও তা সম্ভব হলো না, তাই হেলাল সাহেব সৈয়দ বাড়ির দো-তলার পানে তাকিয়ে বিকট শব্দে চ্যাঁচালেন,”এই আরশ, ঘুম এখনো শেষ হয়নি তোমার?
অপাশ থেকে কোনো শব্দ আসলো না। নুসরাত গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইল মুগ্ধ চোখে, এরা কী সুন্দর বিনোদন মূলক ঝগড়া করে, দেখেই মজা চলে এসেছে।
এর মধ্যে সৈয়দ বাড়ির ভেতর থেকে কালো কালার এক জোড়া ক্রিস্টিয়ানো ডিওর এর স্লিপার আর আড়ং এর ল্যাভেন্ডার কালার কামিজ পরে বের হলো ইসরাত। মাথায় হিজাব বাঁধা, ড্রেসের সাথের ওড়না একপাপে ফেলে রাখা। তড়িঘড়ি করে আসতে গিয়ে হোঁচট খেল সদর দরজার সামনে। উল্টে পড়ার আগে তাকে বাহু ধরে সামলে নিল জায়িন।

নুসরাত ভালো করে আরেকটু তাকঝাঁক করার জন্য রেলিঙ ধরে ঝুঁকে গেল। চোখ দাবিয়ে তাকাতেই দেখা মিলল সদর দরজার সম্মুখে সৃষ্ট একটা লম্বা গড়নের প্রতিবিম্বের। চোখের আকার সরু করে নিতেই অক্ষিকোটরে অন্তর্গত হলো দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসা লম্বা গড়নের লোকটাকে। গায়ে কালো ট্রাউজার আর ফুল স্লিভ সাদা টি-শার্ট জড়ানো। আজ রোদ কড়াভাবে উঠায় বাহিরে বের হতেই আলোর ঝাঁঝে চোখ খিঁচিয়ে নিল, হাতের মোবাইলটায় কিছু একটা টাইপিং করতে করতে গিয়ে দাঁড়াল ইসরাতের পাশে। তখনো একবারের জন্য লোকটা মাথা তুলে তাকায়নি মোবাইল হতে।

এতক্ষণ যাবত পলক বিহীন ওদিকে তাকিয়ে থাকায় চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো নুসরাতের, তাই সে দু-হাতে চোখ ঢলে নিয়ে পরিস্কার করল। ভ্যাপসা গরম গায়ে লাগতেই সাদা রঙের হ্যালো কিট্টির টি-শার্ট সামনের দিকে টেনে বাতাস করল। অতঃপর আবারো তাকঝাঁক করার জন্য ওদিকে তাকাতেই দেখল সূদর্শন মাখা চেহারাটায় বিরক্তি ভাব সরে গিয়ে রাগ ভর করেছে। প্যান্টের পকেটে মোবাইল ঢুকিয়ে কোনো বিষয় ভেবে ঠোঁট কামড়াচ্ছে লোকটা! জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আকস্মিক, কোনো পূর্ব আবাস ছাড়াই ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি তাকাল নুসরাতের চোখের দিকে। কপালের মধ্যভাগে গাঢ় ভাঁজ ফেলে এক ভ্রু উচাল, হয়তো জিজ্ঞেস করল, কী!।

নুসরাত এমন করে তাকানোতে হকচকিয়ে উঠল, সে ধরতে পারেনি লোকটা এত তাড়াতাড়ি তার দিকে ফিরে তাকাবে। চোখের দৃষ্টি এতটাই ধারাল যেন ওখানে দাঁড়িয়েই নুসরাতকে এফোড়-ওফোড় করে দিবে। নুসরাত কয়েক সেকেন্ডের ভেতর আরশের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। অস্বস্তিতে ঘাট হয়ে উল্টো পথে পা বাড়াল বাসার ভেতর যাওয়ার জন্য। চোখ বন্ধ করে নিজের অস্বস্তি কমাতে চাইল, মনে হলো চোখের পাতায় আরশের ফিরে তাকানোর দৃশ্যটুকু এখনো ভাসছে। সারাজীবন সে মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তিতে ফেলেছে, আর আজ সে আরশের দৃষ্টিতে পড়ে অস্বস্তিতে ঘাট হয়ে যাচ্ছে!! কথাটুকু উপলব্ধি হতেই হতবাক হলো!

নিজের মনের দোলাচাল মনে চেপে খুবই সতর্কতার সহিত ঘাড় বাঁকাল। একবার সতর্ক চোখে তাকিয়ে দেখবে অপাশের পরিস্থিতি, আরশের বোঝার আগে বা তাকানোর আগেই আলগোছে পালাবে এইখান থেকে এই চিন্তা মস্তিষ্কে নিয়ে পেছনের দিক ঘুরল, সতর্ক চোখে তাকাতেই চোখাচোখি হলো আরশের সাথে, আর সেই মুহুর্তে ধ্বক করে ওঠল হৃদয়টা। পকেটে দু-হাত রেখে জিভ দিয়ে গাল ঠেলে হাসছে বেয়াদব লোকটা! তাকে নিয়ে মজা নিচ্ছে এই ব্যাটা ষাঁড়!

রকিং চেয়ারে বসে চুপচাপ বিছানা শোয়ারত স্ত্রীকে খেয়াল করছে ইরহাম। শাড়ীর আঁচল পেটের একপাশে সরে গিয়ে মেদহীন পেট, লতানো মেয়েলি কোমর বেরিয়ে এসেছে। ইরহাম চোখ সরিয়ে নিল সেদিক থেকে। কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর নির্লজ্জের মতো আবারো তাকাল। এবার আর পেটের দিকে তাকাল না, মুখটার দিকে তাকাল। গতরাতের থাপ্পড়ের দাগটা বেশ গাঢ়ভাবে পড়েছে মেয়েটার গালে। ইরহাম ঠোঁট চোখা করে ইস’স জাতীয় কিছু দুঃখজনক শব্দ উচ্চারণ করল। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে চাইল দূরে শুয়ে থাকা মেয়েটার গাল, অতো দূরত্বে কী তা সম্ভব হলো, উঁহু সম্ভব হলো না!

ইরহাম বসে রইল চুপচাপ, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল মুখের আকার, আকৃতি! গুটিয়ে শুয়ে থাকা সৌরভিকে দেখতে দেখতে চোখের পাতায় ভাসল ছোট্ট সৌরভির মুখ। মার্বেলের মতো চোখ দুটো নিয়ে কীভাবে মেয়েটা ছোটবেলায় তার দিকে তাকাত, কথাটা মনে হতেই ঠোঁট টিপে হেসে ফেলল। পরপর আবার মনে হলো, কী আশ্চর্য! সে হাসছে কেন! এ কেমন কান্ড! নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেই হতবাক হলো। মাথা এলিয়ে রকিং চেয়ারে শুয়ে পড়ল, গা ছেড়ে দিয়ে দুলতে লাগল ধীরে ধীরে। সারাজীবন চিল করতে থাকা, মেয়দের সাথে ফ্ল্যাটিং করতে থাকা, সৌরভির ভাষায় দুশ্চরিত্র, মেয়েবাজ ছেলেটার চেহারায় দুশ্চিন্তা খেলা করল। কিছু একটা ভেবে উঠে দাঁড়াল রুম থেকে বের হওয়ার জন্য, দরজার সামনে গিয়ে ছিটকিনি খুলতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল অজানা অস্বস্তিতে। দরজা খুলল না, উল্টো ঘুরে এসে সৌরভির নিকট শব্দহীন দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে শাড়ীর আঁচল টেনে ঠিক করে দিয়ে হাতের, পায়ের, এমনকি মুখের বাঁধন খুলে দিল। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বের হয়ে গেল রুমের বাহিরে।

বাড়ির বাহিরে বের হতেই দেখা মিলল নুসরাতের। অস্বাভাবিক চোখে নুসরাত ইরহামের দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক। কপাল কুঞ্চিত করে নাকের ডগা টিস্যুর মধ্যে মুছে নিয়ে শ্বাস ফেলল শয়তান মেয়েটা। ইরহাম হঠাৎ কী একটা কারণে তরতরিয়ে রেগে গেল, এতে বিশেষ পাত্তা দিল না নুসরাত। নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে থেকে আবার শব্দ করে নাক টানল, নাক মুছল টিস্যুতে! নুসরাতের ইতরামিতে ধ্যান না দিয়ে আদেশ দিল,”কিছু খাইতে দে, গতকাল থেকে না খাওয়া আছি।
নুসরাত গলে পড়ল। হাতের টিস্যু ফেলে দিয়ে হাতের তালুতে নাক মুছে নিয়ে হাসল। বলল,”এক্ষুণি নিয়ে আসতেছি খাবার।
ইরহাম হুশিয়ারি দিয়ে বলল,

‘“হাত আগে পরিস্কার করে নিস খাচ্চরনি!
নুসরাত মাথা দোলাল। পা বাড়াল কিচেনের দিকে। সে বিশেষ কিছু রান্না জানে না, আজ নাজমিন বেগমের ও দেখা নেই, তার বাপের ও দেখা নেই। স্বামী স্ত্রী দু-জনেই গাটি গেড়েছেন ঘরের ভেতর। বন্ধ দরজার পানে একবার তাকিয়ে বুঝে নিল, এখনো গতরাতের ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি কেউই! সবাই তো তার মতো শক্তিশালী ওমেন না, যে সবকিছু সংবরণ করে পরেরদিন একদম স্বাভাবিক আচরণ করবে। ভাব নিয়ে চুল পেছনে উড়িয়ে দিল, অতঃপর নিজেকেই বলল একটু বেশিই নিজের প্রশংসা হয়ে যাচ্ছে নুসরাত, কমিয়ে কর। ডং বাদ দিয়ে তাড়াহুড়ো হাতে এক কাপ চা গ্যাসে বসাল, অন্যটায় ডিম পোচ করতে দিল। এতটুকুই পারে সে, এর বেশি পারবে না কিছু। যদি খাইতে চায় তো খাক, নইলে না খাক! আরাম করে কেবিনেটের উপর বসল, হাতে ব্রেডের প্যাকেট তার, পরে স্যান্ডউইচ বানাবে ভেবে নিয়েছে তা। ডিম পোচ হতে হতে একহাতে ব্রেড ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজের মুখে ঢোকাল, ডিম হতে হতে তিনখান ব্রেড খেয়ে নিল একাই সে। এরপর চায়ে চা পাতা দিয়ে স্যান্ডউইচ বানানোর জন্য নেওয়া ব্রেডের পুরো প্যাকেট একাই সাবার করে দিল। ভাবনায় ডুবে থেকে প্যাকেটে হাত ঢোকাল আরেক টুকরো বের করে মুখে ঢোকানোর জন্য, কিছুই মিলল না। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখল খালি পড়ে থাকা ব্রেডের প্যাকেটটা, নিজের চোখ, পেট, দাঁত, গলাকে বিশ্বাস করাতে পারল না সে একাই এতটুকু খেয়ে নিছে।

লিপি খানের বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল এগারোটা বেজে গেল। জায়িনদের নানা বাড়িটা গ্রামের ভেতরের দিকে। ফসলী জমির মাঝখানে ভীষণ শখ করে বিশাল বাড়িটি তুলেছিলেন আরশের নানা। বাড়িটির ছাদে দাঁড়ালে খালি চোখে দূর দূরান্তের জমি দেখা যায়। ঘনবসতি গ্রামটার এপাশে তেমন একটা পরিবার বসবাস করে না। বাড়ির বাঁ-পাশে,পেছনে বড় বড় দুটো পুকুর আছে। বাঁ-পাশের পুকুরটায় মাছের চাষ হয়। জায়িনদের গাড়ি যখন মেঠোপথ ধরে এদিকে আসছিল তখন দূর-দূরান্তের সবকিছু হা করে দেখছিল ইসরাত।

আজ ড্রাইভিং সিটে আরশ বসেছে, ফ্রন্ট সিটে জায়িন, ব্যাক সিটে হেলাল সাহেব, লিপি বেগম, আর সে। শ্বশুর শাশুড়ীর মাঝখানে আরাম করে খরগোশ ছানার ন্যায় মুখ বানিয়ে বসে,নড়চড় বিহীন বাহিরের দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগছে। হেলাল সাহেব হাত তুলে দেখাচ্ছেন জায়িনকে এটা তোমার এর বাড়ি, ওটা তোমার ওর বাড়ি। হঠাৎ হঠাৎ ইসরাতকে বিভিন্ন রাস্তা দেখিয়ে বলছেন এদিক দিয়ে গেলে ওদিকে যাওয়া যায়, কোন রাস্তা কোন গ্রাম, কোন উপজেলার সাথে যুক্ত হয়েছে। ইসরাত চুপচাপ শ্রবণ করছে, তার মাথার পাঁচ হাত উপর দিয়ে যাচ্ছে এই কথাগুলো, তবুও হু হু করে মাথা নাড়াচ্ছে, বোঝাচ্ছে সে বুঝতেছে। গাড়ি যখন খান বাড়ির সামনে পৌঁছাল, তখন হেলাল সাহেব নড়েচড়ে উঠলেন। ইসরাতের দিকে নিজের বাহু বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,”দেখ সুগন্ধি টা কেমন?

এত তীব্র পারফিউমের ঘ্রাণে ইসরাতের নাক ঝাঁঝিয়ে উঠল। হাচ্চি চলে আসলো পারফিউমের ঝাঁঝাল গন্ধে, তবুও কোনোরকম চোখ ঝাপটে নিজেকে সামলাল। বলতে চাইল, সব ঢেলে চলে আসছেন বড় আব্বু, আর পারফিউম আছে সিসিতে! বলতে পারল না, ভদ্রতার খাতিরে মুখ ফুটে। হাতের ডিওর এর মেরুন কালার পার্সে খুঁজল কিছু একটা, হাতানো শেষে খুঁজে পেল না নিজের প্রয়োজন মাফিক জিনিস, হতাশ নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে জায়িন তার সামনে বাড়িয়ে দিল টিস্যু! গম্ভীর গলায় বলল,”নিন!
ইসরাত টিস্যু হাতে নিতেই হেলাল সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে দেখলেন বড় ছেলেকে। ভাবলেশহীন হওয়ার ভান করে সূক্ষ্ম খোঁচা মারলেন ছেলেকে,”এত ভক্তি…উঁহু, মেনে নিতে পারলাম না। একটা প্রবাদ বাক্য আছে অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ..!

সুর টেনে কথা শেষ করলেন ভদ্রলোক। জায়িন শ্বাস ফেলে কিছু বলতে নিবে তাকে কেটে দিয়ে ইসরাতের দিকে গদগদ করে তাকালেন হেলাল সাহেব। ছেলের বিরক্তি মাখা চেহারা দেখেও না দেখার ভান করে বললেন,”সাবধানে থাকিস, কেন জানি খারাপ অনুভূতি হচ্ছে আমার,আজকাল দুনিয়াটা বাটাপারে ভরপুর হয়ে গেছে।

ইসরাত মাথা দোলাল শুধু। কিছু বলতে নিবে কানে আসলো শব্দ করে বাজানো হর্ণের আওয়াজ। সামনে তাকাতেই দৃষ্টি সীমায় আটকাল লোহার উচু গেট। চারিদিকে পাথরের পাঁচিরে ঘেরা একটা বাড়ি। পাঁছিরের উপরে কাঁচের কাটা টুকরো গেঁথে রাখা। ইসরাতের গোল গোল চাহনির ভেতর গেট খুলে দিল ভেতর থেকে একটা লোক। পুরো গেট খুলে দিতেই সামান্য উঁচু হয়ে ওঠা কংক্রিটের রাস্তা দিয়ে গাড়িটা ভেতরে প্রবেশ করল। গাড়ি পার্ক করার আগেই দেখা মিলল হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা জায়িনের বয়সী একটা মেয়ের। গাড়িতে বসে থেকে ইসরাত অবাক চোখে মেয়েটার হন্তদন্ত পায়ে দৌড়ে আসার দৃশ্য দেখল, এমনকি পায়ে জুতোজোড়া পরেনি মেয়েটা, তার পেছন পেছন পাকিস্তানি মহিলাদের মতো মুখের অবকাঠামো নিয়ে বেরিয়ে আসলেন বয়স্কা মহিলা। ইসরাত বুঝে নিল বয়স্কাই জায়িনের নানি! মুখটা গম্ভীর করে রাখা, হাসির লেশমাত্র নেই তাতে। নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। দরজা খুলে সবার আগে বের হলেন হেলাল সাহেব। শাশুড়ীকে সালাম দিতেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। লিপি বেগম নিজেও সালাম দিতেই দু-হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন। এতদিন পর মাকে কাছে পেয়ে শব্দ করে কেঁদে ফেললেন লিপি বেগম, তাতে ভাবাবেগ হলো না রোমানা খাতুনের। শক্ত কন্ঠে মেয়েকে বললেন,”যাও লিপি ঘরে যাও, গিয়ে রেস্ট করো!

ইসরাত ভদ্রমহিলার এমন কাঠখোট্টা মুখ দেখেই নিজের মুখের হাসিটুকু গায়েব হয়ে গেল। এতক্ষণের উত্তেজনা সব উড়ে গিয়ে মুখে ভর করল অস্বস্তির। সালাম মুখ দিয়ে করতে নিবে দেখল হেলাল সাহেব পেছন থেকে দু-হাতে ক্রস দেখাচ্ছেন, পায়ের দিকে ইশারা দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে দেখাচ্ছেন কিছু একটা। জায়িন ইসরাতের বাহু চেপে ধরে আলগোছে ঝুঁকে গেল রোমানা খাতুনের পায়ের দিকে। পায়ে স্পর্শ করে সালাম দিয়ে হচকচক করতে থাকা সুন্দর হাতটায় চুমু খেল। ইসরাত একইভাবে হাতে চুমু খেল, অতঃপর জায়িন চুমু খেল ভদ্রমহিলার কপালে, তার দেখাদেখি ইসরাত ও চুমু খেল। ভদ্রমহিলা জায়িনের গাল চেপে ধরে নাকে নাক ঘষে হাসলেন। জিজ্ঞেস করলেন,”কেমন আছিস?

জায়িন মাথা নাড়াল শুধু। আরশ মুখ দিয়ে সালাম করে দু-হাতে বুকে জড়িয়ে নিল বয়স্ক মহিলাকে। চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে ঠাট্টা করল,”শরীর নরম হয়ে গেছে তোমার নানী।
রোমানা খাতুন আরশের হাতের মধ্যে থাপ্পড় মারলেন। দুই নাতীকে দু-হাতে আগলে ধরে চলে গেলেন সামনে। ইসরাত হা করে তাকিয়ে থাকল, হলোটা কী! তাকে গণাই ধরল না এরা, কেমন করে তাকে রেখে চলে যাচ্ছে সবাই। ইচ্ছে করল দুটো লাফ মারতে উঠোনো দাঁড়িয়ে, কিন্তু মারল না, রেপুটেশন এর ব্যাপার! চোখ কুঁচকে মনে মনে কয়েকটা চিৎকার দেওয়ার প্রস্তুতি নিতেই জায়িন একহাতে টেনে ধরল তার হাত। টেনে নিয়ে চলল নিজের সাথে। ইসরাতকে ভ্রু উচিয়ে শুধাল,”এখানে থাকার চিন্তা করেছেন নাকি রেই?
ইসরাত হকচকিয়ে পা বাড়াল সম্মুখে। জায়িনের সাথে পা মেলাতে গিয়ে বেগ পোহাতে হলো তাকে, তারপরও পা মিলিয়ে এগোলো। বাড়ির ভেতরে বাঁ-পা ঢোকাতে নিবে, কঠোর স্বরে রোমানা খাতুন বললেন,”আগে ডান পা ঢোকাও, জায়িনের বউ!

মহিলার কথাটা ধমকের মতো শোনাল ইসরাতের নইকট। আরেকটু জোরে বললে তার প্রাণপাখি এক্ষুণি তো উড়ে যেত। জায়িন হয়তো উপলব্ধি করতে পারল ইসরাতের ভয়টা, তাই রোমানা খাতুনের উদ্দেশ্যে বলল,”নানী, একটু ধীরে সুস্থে বলো, ও তোমার কথা শুনে ভয় পাচ্ছে, যা বলবে সামান্য মিষ্টিতা মিশিয়ে বলো!

জায়িনের কথায় ভাবলেশহীন থাকলেন রোমানা খাতুন। তিনি নাতিদের হাত ছেড়ে দিয়ে একাই অন্দরে চলে গেলেন। রোমানা খাতুন সোফায় বসতেই একে একে রান্নাঘর ছেড়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হলেন খান বাড়ির সবাই। রোমানা খাতুনের বৌদলতে লিপি বেগমের ভাইয়েরা এখনো আলাদা হননি। লিপি বেগমেরা তিন বোন, তিন ভাই! বড় ভাই পরিবার সহ আমেরিকার বাসিন্দা, মেঝ ভাই একাই আমেরিকায় থাকেন, পরিবারকে শীগ্রই নিজের কাছে নেওয়ার ইচ্ছে আছে। আর যে একজন দেশে সে এখানে থেকে বাড়ি আর জমির খেয়াল রাখছেন। মেঝ ভাইয়ের তিন ছেলে মেয়ে। বড় মেয়ে পলি, মেঝ মেয়ে তুলি আর ছোট ছেলে সার্থ! ছোট ভাইয়ের দু-ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে মেহুল, ছোট মেয়ে মেঘলা!

সবার সাথে কুশল বিনিময় শেষে নাস্তা দেওয়া হলো, নাস্তা খাওয়া শেষে সবাইকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো রুমে আরামের জন্য। লিপি বেগমের বড় ভাই, জায়িন, আরশ আর হেলাল সাহেবকে নিয়ে চলে গেলেন রোমানা খাতুনের জোর নির্দেশে আজকের বাজার করতে। জায়িনেরা বাজার শেষে ফিরার পরই খাবার খেতে বসলেন সবাই। বয়স্কার দু-পাশের চেয়ার জুড়ে বসে আছে আরশ আর জায়িন! গরুর মাংসের বাটি আরশের দিকে ঠেলে দিয়ে শুধালেন,”বিয়ে শাদির কোনো ইচ্ছে আছে তোমার, বয়স তো অনেক হলো?
আরশ চোখ তুলে তাকাল অদ্ভুত ভঙ্গিতে। কোনো কথা বলল না। রোমানা খাতুন নাতিকে আর না ঘাটিয়ে খাবার খাওয়ারত সবার দিকে তাকালেন। খাবার খাওয়া ইসরাতের কানে বোমলা হামলার ন্যায় বিস্ফোরণ ঘটালেন,”আজকের রাতের রান্না জায়িনের বউ করবে!
জায়িন ভ্রু উচাল সামান্য। তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“মজা করছ তুমি?

রোমানা খাতুন মাথা দোলালেন উপর-নিচ অতঃপর আবার ডায়ে-বায়ে! ঠিক বোঝা গেল না হ্যাঁ নাকি না বললেন। ভদ্রমহিলার মুখ ভঙ্গি দেখে ইসরাত যতটা ঠাহর করতে পারল, কোনো মজা করেননি উনি, তাই আগেভাগে গণনা শুরু করল এই পুরো পরিবারে মানুষ কতজন, গণনা শেষে সংখ্যা দাঁড়াল নয়জন। ওরা আরো পাঁচজন, সবে মিলে হয় তেরো জন। মেয়েটার শুভ্র চেহারাটা ফ্যাকাশে বর্ণের হয়ে গেল নিমেষে! ভয়ার্ত চোখে সবার পানে চেয়ে ঢোক গিলল, এ কোথায় সে ফেসে গেছে! আল্লাহ আল্লাহ বলে এখান থেকে বের হতে পারলেই শান্তি! হঠাৎ ভ্রু কুঞ্চিত করে সামনের কঠোর মুখ ভঙ্গি করে রাখা বয়স্কার দিকে দৃষ্টি জ্ঞাপন করল সে। তীক্ষ্ণ চোখে বুড়ির চেহারাটা অবলোকন করল, কোথায় অসুস্থ এই মহিলা, বয়স্কা তো তার থেকে দ্বিগুণ তরতাজা সুস্থ সবল মনে হচ্ছে। তাহলে মিথ্যে বলল কেন এরা! নাক ছিটকে বিড়বিড় করল,”মিথ্যুক মহিলা, আমাকে এখানে চাল দিয়ে এনেছে কাজ করানোর জন্য!।

সৌরভি গতকাল দুপুর থেকে না খাওয়া। নুসরাত সাধছে কখন থেকে খাবার খাওয়ার জন্য, কিন্তু কোনো প্রকার নড়চড় করছে না, বিছানায় মটকা মেরে শুয়ে আছে। নুসরাত ডাকল,”সৌরভি, এইইই সৌরভি!
উঁহু নড়ল না। নুসরাত গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিল। ভালোবেসে, আদর মিশিয়ে ডাকতে চাইল ‘সৌরভি’, কিন্তু তা হলো না, বের হলো কর্কশ স্বরে,”এইই সৌরভি ওঠ!

না উত্তর আসলো না অপাশ হতে। চোখ খুলে পর্যন্ত তাকাল না তার দিকে। নুসরাত কপালে দৃঢ় ভাঁজ ফেলে দেখল ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকা জেদি মেয়েটাকে। চোখের পাপড়ি নড়ছে তিরতির করে, সে চাইলেই একটানে মেয়েটাকে তুলে বসাতে পরে, কিন্তু করল না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাবারের প্লেট নিয়ে পিছু ফিরতেই ঝড়ের গতিতে এসে একটানে বিছানা থেকে তুলে বসাল তাকে ইরহাম। হিসহিসিয়ে বলল,”চুপচাপ খাবার খাও!
সৌরভি চিৎকার করে ওঠল,
“আমাকে স্পর্শ করার সাহস পেলি কীভাবে তুই? তুই কে আমাকে খাবার খাওয়ার জন্য বলার? আমি খাবার খাব না, শুনেছিস তুই?

ইরহাম নিজের রাগ প্রকাশ করতে গিয়ে ও করল না। শুধাল,“কেন মরে যাবে তুমি না খেয়ে?
“হ্যাঁ মরে যাব, তোর মতো পিশাচের সাথে সংসার করার চেয়ে মরে যাওয়া বেশি উত্তম!
ইরহাম নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে রইল ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে। বলল,“পরে মরো এখন খাবার খাও।
নুসরাত হাতে প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে দু-জনের ঝগড়া আরাম করে দেখছে। ইরহাম আবারো গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”তুমি কী ভাবছে, খাবার না খেলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিব, ভাবনা পর্যন্ত স্থায়ী রাখো কথাটা, এজীবনে তোমাকে আমি তালাক দিব না।

সৌরভি ক্ষোভে নাকের পাটা ফোলাল। দু-হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে ধরল শাড়ী। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শুণ্য হয়ে চ্যাঁচাল,জানোয়ার আমার অভিশাপ লাগবে তোর গায়ে, তুই জীবনে ও সুখী হবি না, জাহান্নামে যাবি তুই..!
সৌরভির এত কথার বিপরীতে ইরহাম নির্লিপ্ত রইল, কোনো জবাব দিল না, এমনকি মুখে রাগের বহিঃপ্রকাশ ও ঘটল না। এতে সৌরভির রাগ আরো বাড়ল, মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো তড়িৎ গতিতে দৌড়াতে লাগল। ফলে রাগ আরো বাড়ল, দাঁতে দাঁত চেপে নিজের অপ্রতিরোধ্য রাগ সামলাত চাইল, পারল না, তাই সপাটে ইরহামের গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। এতে ও রিয়েক্ট করল না ইরহাম, চুপচাপ খাবারের প্লেটের দিকে ইশারা করে বলল,”নাও, রাগ কমে গেলে খাবার খাও!

এইটুকু কথা রাগে কেরোসিন ঢালার মতো কাজ করল। সৌরভির মনে হলো, তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে এই লম্পটটা। তাই না চাইতেও গলবিল বেয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসলো আরো কিছু গালি। জবান দিয়ে শব্দের সহিত ফুটল,”চরিত্রহীন একটা, পিশাচ তুই, জানোয়ার, কাপুরুষের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা, তুই মরে যা, লম্পটের…
ইরহাম দাঁতে দাঁত চেপে প্রথম গালিগুলো হজম করে নিতে চাইল, কোনোরকম হজম করতে পারলেও শেষেরগুলা পারল না। রক্তাভ বর্ণের চোখে তাকিয়ে হাত শূণ্যে তুলল সৌরভিকে বাজিয়ে একটা থাপ্পড় দেওয়ার জন্য তার পূর্বেই চোখ বন্ধ করে শব্দ করে কেঁদে ফেলল সৌরভি।

দু-গাল থাপ্পড়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য চেপে ধরল খাঁমচে। যখন উপলব্ধি হলো থাপ্পড় গালে পড়েনি, তখন ঝাপসা চোখ খুলে তাকাল সম্মুখে। ইরহাম স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শূণ্যে তোলা হাত এখনো সেখানে আটকে। নিষ্প্রাণ চাহনিতে তাকে দেখছে, সৌরভি এইটুকুই দেখল, এরপর কী হলো! দূর্বলতায় শরীর থরথর করে কাঁপল তার, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসলো সেকেন্ডের ভেতর। ভারসাম্য বজায় রাখতে শক্ত কিছু ধরার জন্য হাতাল, হাত গিয়ে ঠেকল খড়কুটোর ন্যায় কিছু একটায়। পা নিজের স্থান থেকে টলে গিয়ে সামনের দিকে উল্টে পড়ল। অবচেতন মনে অনুভব হলো ব্যথা পাবে সে, তাকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে ব্যথার লেশমাত্র পেল না।

সৈয়দ বাড়িতে ভোরের আলো ফোটার পর চোখ লেগেছিল ঝর্ণা বেগমের। ঘন্টা তিনেক এর মতো ঘুমিয়েছিলেন, এরপর ঘুম থেকে উঠে আবারো আহাজারি করে কাঁদছেন৷ কপাল চাপড়ে কাঁদছেন, আর বলছেন এই ছেলেকে তিনি পেটে ধরেছেন! এই দিন দেখার আগে মরলেন না কেন তিনি! শোহেব সাহেব রকিং চেয়ারে আরাম করে বসে বই পড়ছেন। চোখে চিকন লেন্সের চশমা। স্ত্রীর কান্নায় বই পড়ায় ব্যঘাত ঘটে, তাই বিছানায় বসে হাই হুতাশ করা স্ত্রীকে একবার তাকিয়ে দেখলেন। নির্লিপ্ত কন্ঠে শুধালেন,”নিজেকে দোষ দিচ্ছ কেন?
ঝর্ণা বেগম হু হু করে কেঁদে উঠলেন। বললেন,
“আমিই ওকে ঠিকমতো শিক্ষা দিতে পারিনি, এজন্য আজ ও এমন করেছে, সব দোষ আমার! আমার জন্য সব হয়েছে।

শোহেব সাহেব স্ত্রীকে মোটেও দোষ দিলেন না। বললেন,”ভেবে নাও ভাগ্যে ছিল এমন হওয়ার তাই হয়েছে, যাও কিছু খেয়ে নাও, নাহলে শরীর খারাপ হবে, গতকাল থেকে না খাওয়া তুমি।
খাবার টেবিলে রুহিনী গোমড়া মুখে খাবার সাজাচ্ছিলেন। রমরমে বাড়িটা নীরব হয়ে আছে আজ। আহান চেয়ার টেনে বসল খাবার খাওয়ার জন্য, চেয়ার টানার শব্দটুকু এত জোরে হলো রুহিনী বেগম আঁতকে উঠলেন প্রায়।আহান দেখল বৌমাকে ধরে ধরে নিয়ে আসছেন চাচ্চু। চোখে সরিয়ে খাবার টেবিলে এনে চুপচাপ প্লেট টেনে খাবার বেড়ে নিল নিজের প্লেটে। কানে আসলো ঝর্ণা বেগমের নাক টেনে কান্নার শব্দ। উনি খাবার মুখের সামনে নিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছেন, আর বলছেন,” আমার বাচ্চাটা গতকাল থেকে না খাওয়া, সকালে খেয়েছে নাকি না কে জানে!
আহান বিড়বিড় করল,

“গতকাল রাতে যতটা মার খেয়েছে ভাই, তাতে আগামী দু-দিন কিছু না খেলেও পেট ভরা থাকবে।
ঝর্ণা বেগম পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিলেন, আর হুহু করে কাঁদলেন। আহান গালে হাত দিয়ে দেখল বৌমার নাকি কান্না। বুঝতে পারল তার ও চোখ জ্বালা করছে, চাচিকে কাঁদতে দেখে, তাই চোখের পলক ফেলে নিজের চোখের পানি লুকাতে চাইল, সাথে নিজের কাছে একটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। মিনমিন করে আওড়াল,”আমি কোনোদিন আব্বু, আম্মু, বৌমা, চাচ্চুকে কষ্ট দিব না, যাই হয়ে যাক না কেন! পড়াশোনা করে সবার মুখে হাসি ফোটাব।
ঝড়ের গতিতে এই খবরটা নুসরাতের কাছে পৌঁছাতে গেল সে। যখন নাছির মঞ্জিলে আহান পৌঁছাল তখন নুসরাতকে চিন্তিত ভঙ্গিতে পুরো করিডোরে পায়চারি করতে দেখল। তবুও তাকে দেখতেই নুসরাত ভ্রু উচিয়ে শুধাল,”কী বলবি বল!

“তুমি কীভাবে বুঝলে আমি কিছু বলতে চাই?
‘“কারণ আমি দ্যা ওয়ান এন্ড ওয়ানলি নুসরাত নাছির, মানুষের মুখ দেখে বুঝে যাই মানুষ কী উপলব্ধি করছে, বা কী বলতে চাইছে।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৩

আহান নুসরাতকে জানাল তার ভবিষ্যতের ভাবনাটুকু। নুসরাত কিৎকাল আহানের দিকে তেরছা চোখে তাকিয়ে থাকল। পরক্ষণে পেট চেপে হেসে উঠল। একহাতে রেলিঙে থাপ্পড় মারতে মারতে বলল,”ছোটবেলা সেন্টি খেলে আমিও এমন গাজাখুরি চিন্তা ভাবনা করতাম, হুহু হিহি হা হা!

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৫

4 COMMENTS

  1. লজ্জা থাকলে জীবনে আর কখনও রানিং গল্প পড়তে আসবো না☹️☹️☹️☹️

    • হো বোন ঠিক কইছ আমি কানে ধরছি আর জিবনও এইরকম রানিং গল্প পরুম না সিক্ষা হইয়া গেছে 🙁

Comments are closed.