Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৫

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৫

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৫
জান্নাত নুসরাত

ডাক্তার এসে দেখে গিয়েছে সৌরভিকে। চব্বিশ ঘন্টা যাবত অনাহারে থাকায় দূর্বল হয়ে পড়েছে, এজন্য মাথা ঘুরিয়ে ওভাবে পড়ে গেছিল তখন। হাতে স্যালাইন লাগানো তার, ঘুমাচ্ছে চুপচাপ এখন। ইরহাম রকিং চেয়ারে বসে দুলছে, সাথে করে পরিলক্ষণ করছে ঘুমানো স্ত্রীকে। ঘড়ির কাটায় দুপুর তিনটা বাজায় পশ্চিমমূখী জানালা দিয়ে তীর্যক আলোক রশ্মি প্রবেশ করছে রুমের ভেতর, যা গিয়ে আবার সৌরভির মুখে পড়ছে। কী নিষ্পাপ চেহারাটা! গতকাল থেকে খিঁচানো কপালটা শরীর নরম হয়ে আসায় মসৃণ হয়ে আছে। রাত থেকে খাবার না খাওয়ায় মুখটা মলিনতা ভীড়ে হারিয়ে গেছে। চোখের নিচে একরাতেই ডার্ক সার্কেলের আবরণ পড়েছে।

নাজমিন বেগমের শরীর খারাপ করায় নাছির সাহেব আর নুসরাত তাকে নিয়ে ছুটেছে হসপিটালে, তাই বাড়িতে এখন একা তারা দু-জন।
ইরহাম পা দিয়ে মেঝেতে আঘাত করছে খুবই ধীরে ধীরে। কপালে ভাঁজ ফেলে গভীর ভাবনায় ডুবে আছে সে। কীভাবে এই মেয়েকে ঠান্ডা করবে, কীভাবে শীতিল করবে মেয়েটার রাগটা! কোনো উপায় খুঁজে পেল না, তার মধ্যে শোনা গেল সৌরভির কঁকিয়ে ওঠার শব্দ। ইরহাম উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে। গ্রীবা বাঁকিয়ে ঝুঁকে আসতেই ফট করে চোখ খুলে তাকাল সৌরভি৷ চোখাচোখি হলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য, পরপর কানে আসলো সৌরভির তীক্ষ্ণ বুকে ক্ষোভ ফুটিয়ে তোলার মতো গা জ্বালানো শব্দ,”সুযোগ নিচ্ছো? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার শরীর গিলছ? অবচেতন, অজ্ঞান, একটা মেয়ে এভাবে পড়ে থাকলে তোর মতো লম্পট সুযোগ নিবে না এটা না ভাবাই তো বিলাসিতা।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ইরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ রুমের বাহিরে চলে গেল। ফিরে এলো হাতে ভাতের প্লেট নিয়ে। আকাশ তখন হলদেটে ভাব ধারণ করেছে। ইরহাম খাবারের প্লেট নিয়ে নাইটস্ট্যান্ডে রাখল, তাকাল দৃঢ় চোখে সৌরভির পানে। সৌরভি আবারো তার গা জ্বালানো কথা বলল,”তোর বিন্দুমাত্র লজ্জা লাগে না, এত পাপের বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকবি কীভাবে?
ইরহাম হজম করে নিল কথাগুলো, মুখ ফুটে টু শব্দটি করল না। শুধু বলল,“খাবার খাও!
“আমাকে আদেশ দেওয়ার কে তুই ফেরাউন, খাব না আমি, কী করবি?
ইরহাম নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল,

“ক্ষুধার তাড়নায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছো, তবুও তেতো মুখের গা জ্বালানো কথার তেজ কমেনি।
“কমবে না, কী করবি তুই?
ইরহাম প্লেট হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে দিল সৌরভির দিকে। বলল,” কিছু করব না, খাবার খাও।
“খাব না এ বাড়ির খাবার আমি।
ইরহাম ধৈর্য ধরে হাতে থাকা প্লেট বাড়িয়ে রইল সামনে। বলল,” গালি দিতে হলে শক্তির দরকার হবে, এভাবে তো তেজ কমে যাচ্ছে। নাও খাবার খেয়ে তেজ আরেকটু বাড়াও, পরে আবার পুরো তেজস্রী স্বরে গালি দিবে।
সৌরভি ইরহামের এত শীতিলতা মেনে নিতে পারল না। তাই ক্ষোভের সাথে সামনে রাখা খাবারের প্লেট উল্টে ফেলে দিতে চাইল, তার পূর্বেই তা সরিয়ে নিল ইরহাম। বলল,”উঁহু, ফেলে দেওয়ার জন্য আনিনি, খাওয়ার জন্য এনেছি।
সৌরভি চ্যাঁচাল,

“খাব না আমি।
ইরহাম সৌরভির মতো চ্যাঁচায় না। দৃঢ় স্বরে বলে,
“খাবে তুমি।
সৌরভি কন্ঠস্বর ক্ষোভে কাঁপল,
“খাব না বলিনি।
“ আমি বলেছি খাবার খাবে তুমি।
সৌরভি জেদ ধরল। কটমট করে বলল,
“খাবার খাব না…
বাকিটুকু বলতে পারল না, এক লোকমা ভাত ঠেলে তার মুখের ভেতর ঢুকে গেল। হা করে ফেলে দিতে চাইল ইরহাম ভাত মাখা হাতেই সৌরভির থুতনি চেপে ধরল। সৌরভি মুখে ভাত নিয়ে গর্জাল, আহত হরিণীর মতো। রাগে লাল হওয়া মুখে তাকিয়ে থাকল নিষ্পলক, হেজেল বলয় যুক্ত চোখদুটিতে।

আকাশে আজ পূর্ণ চাঁদ ফুটেছে। তালার মতো রুপালি চাঁদটা পুরো খান বাড়ির উঠোন জুড়ে আলো ছড়াচ্ছে। বাড়ির ভেতর হইচই ছেলে-মেয়েদের। গোল হয়ে আসর বসিয়েছে সবাই কিচেনে। গোল গোল চোখে তাকিয়ে রয়েছে হাতে সোনার পাতলা চুড়ি পরা ইসরাতের হাতের দিকে। মেহুল আর মেঘলা জমজ, বয়স মাত্র চারের ঘরের। দু-জনেই চঞ্চল প্রকৃতির। জায়িন আর সার্থের দেখা নেই। তারা আজ বাজারে, রুমানা খাতুনের আদেশে জায়িনকে বাজারে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাত বারোটা পর্যন্ত রাখার ভার তার কাঁধে। সার্থ নিজের দাদিকে খুব ভালো করে চিনে, নিশ্চয়ই ওই জটিল মাথায় কোনো প্যাচ চলছে, আর যার প্রয়োগ হবে ইসরাতের উপর।

ইসরাত আড় চোখে তাকাল কিচেনের দিকে। সবাই গোল গোল চোখে তাকে অবলোকন করছে। বটির দিয়ে মাছ কাটতে গিয়ে হাত কাঁপল তার থরথর করে। পলি পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে চেয়ারের উপর। তীক্ষ্ণ চোখে দেখছে ইসরাতের অপটু হাতে মাছ ধরার ভঙ্গি। ঠোঁটের কোণ উঁচু হলো। দাদি যদি দেখে নাত বউয়ের হাত মাছ কাটায় এত অপটু তাহলে আজ নির্ঘাত এ মেয়ের অবস্থা খারাপ হবে।
তুলি চোরের মতো কয়েকবার আশপাশ দেখল, কোথাও আরশের দেখা মিলল না। মিনমিন স্বরে মেঘলাকে শুধাল,”এই মেঘলা আরশ ভাই কইরে?
মেঘলা নাক ফুলিয়ে বলল,

“ছোট ভাইয়া ঘুম..!
তুলি আর দাঁড়াল না সেখানে, পা টিপে টিপে আলগোছে কিচেন হতে বের হয়ে গেল। ইসরাত তিন কেজি ওজনের মতো মাছটার মাথা কেটে বোলে রাখতেই ধুপধাপ পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন রুমানা খাতুন। শক্ত চোখে বোলের মধ্যে রাখা মাছের মাথার দিকে তাকিয়ে শ্লেষ মিশ্রিত স্বরে বললেন,”মা দেখি মাছ কাটাও শিখায়নি, এত মোটা মাথা ছেঁচে দিলে কীভাবে? এত বড় দামড়ি মেয়ে, দু-দিন পর দু-সন্তানের মা হবে, মাছ কাটা জানো না?
ইসরাত চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। রক্তে ভেজা হাত দুটো শক্ত করে গিলে নিল অপমান।
লিপি বেগম সবজি কাটছিলেন ইসরাত হতে দু-হাত দূরত্বে। মায়ের কথার বিপরীতে উত্তর দিলেন,”আম্মা, আমি বিয়ে করিয়ে ছেলের জন্য মেয়ে নিয়ে এসেছি, ও কাজ করলেও আমার মেয়ে, না করলেও আমার মেয়ে। প্রথম হিসেবে ও ভালোই মাছ কেটেছে..

লিপিকে এক হাত তুলে থামিয়ে দিলেন রুমানা খাতুন। বললেন,”ভাষণ ঝাড়তে তোমাকে বলিনি আমি, লিপি!
মায়ের ধমকে মুখ পাংশুটে হয়ে গেল। রুমানা খাতুন নিজের মেঝ বউয়ের দিকে তাকালেন, যে শিলে ফেলে পেঁয়াজ পিষছে। ওদিকে চোখ রেখেই ডাক দিলেন,”পুষ্পা।
পুষ্পা নিজের হাত থামিয়ে প্রশ্নাত্মক চাহনি নিক্ষেপ করলেন। রুমানা খাতুন বললেন,”আজ শিল নোড়া দিয়ে পেঁয়াজ পিষবে জায়িনের বউ, তুমি উঠে আসো মেঝ বউ।
ইসরাত আঁতকে উঠল। চোখাচোখি হলো পুষ্পার সাথে। মনে হলো মেঝ মামানি শ্লেষ মিশ্রিত স্বরে বলছেন,’হাড়ে হাড়ে টের পাবে এবার পেঁয়াজ পিষার মজা!’’

লিপি বেগম মায়ের এমন কথা শোনে বললেন,
“আম্মা, জায়িন জানলে খুব খারাপ হবে কিন্তু, ইসরাত কখনো শিলে পিষেছে পেঁয়াজ।
রুমানা খাতুন নিস্পৃহ কন্ঠে বললেন,
“কখনো পিষেনি বলে কী, আজ পিষবে না। যাও পেঁয়াজগুলো চুপচাপ পিষো!
ইসরাত ভয়ার্ত চোখে দেখল শাশুড়ী মাকে। এতো সাক্ষাৎ জম এসে দাঁড়িয়েছে তার সম্মুখে। হাত পা ছুঁড়ে কিচেনের টাইলসে শুয়ে পড়তে মন চাইল। বাচ্চাদের মতো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করল,’’এ কোথায় আমি ফেঁসে গিয়েছি।’’

ইসরাত চুপচাপ নিজের ভেতরের আক্রোশ, ক্ষোভ, রাগ, বিরক্তি, গিলে নিল৷ পলি নামক মেয়েটার সাথে পলক মিলতেই বুঝে গেল, মেয়েটা হাসছে তাকে নিয়ে। তেরছা চোখে তাকিয়ে, ইসরাত নাক কুঁচকে চোখ সরিয়ে নিল। নোড়া নিজের হাতে তুলে নিয়ে ইচ্ছে করল সামনে দাঁড়ানো থমথমে মুখের ওই বুড়ির গায়ে এইটা ফেলে দিতে, নিজের মনের ইচ্ছাকে তিরস্কার জানিয়ে আলগোছে নোড়া দিয়ে পিষল পেঁয়াজ। লিপি বেগম ভার মুখে দেখলেন মায়ের অত্যাচার। চেয়েও কিছু বলতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারছেন এখানে অসুস্থতার কথা বলে আনার কারণটা কী! ইসরাতকে দিয়ে আচ্চা মতো কাজ করিয়ে নিজের মনের আক্রোশ কমানো, কেন যেন আগে বুঝলেন না তিনি এই বিষয়টা।

পলির দিকে তাকাতেই দেখলেন চুপচাপ বসে আছে পায়ের উপর পা তুলে। লিপি বেগম নিজে বটি ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে পলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,”পলি বাকি সবজিগুলো তুমি বানিয়ে নাও।
পলি শ্রদ্ধায় যেন লুটিয়ে পড়বে লিপি বেগমের পায়ে। চোখ মেঝের দিকে স্থির রেখে বলল,”জ্বি হ্যাঁ ফুপি!
ইসরাত শিল নোড়া দিয়ে পেঁয়াজ পিষে উঠতেই সিঙ্কে রাখা বাসনগুলো তাকে ধরিয়ে দিলেন। এমনকি রাতের রান্নাবান্না অর্ধেক করানো হলো তাকে দিয়ে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা দুটো ধরে আসলো তার। একে তো মাটির বাঁধানো চুলা, তার উপর আগুন হচ্ছে না৷ ফু দিতে দিতে জান হাতে চলে আসছে, তবুও চুপ রইল আর কদিন এখানে থাকবে, দু-দিন পর-ই নিজ গৃহে চলে যাবে তারা।

ঘড়ির কাটায় তখন সাতটা চল্লিশ মিনিট। দূর দূরান্তের মসজিদে আজান দিচ্ছেন ইমামেরা মধুর সুরে। বাহির থেকে ঝি ঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে, সাথে কুকুরের ঘেউ ঘেঊ করে অনবরত ডাক। মাঝে সাঝে বাড়ির পেছনের পুকুরের আশপাশে গড়ে ওঠা সবজুরে সমাহার জঙ্গল থেকে শিয়ালের হুক্কাহুয়া করে ডাক শোনা যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চল হওয়ায় একবার কারেন্ট আসছে তো একবার যাচ্ছে। কারেন্ট চলে গেলে আই-পি-এস এর জন্য ফ্যান, লাইট জ্বলছে। তুলি চুপচাপ সামনে বসা বড় ভাইয়ের বউকে দেখল। হাত দুটো রক্তজবার ন্যায় টকটকে লাল, অপটু হাতে বড় মাছটা কাটতে গিয়ে হাত সরে যাচ্ছে বারংবার, তবুও মাথাটা কাটার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে নাকের ডগায় ঘাম জমাট বেঁধেছে, তার সাথে উঁচু নাকটা জ্বলজ্বল করছে। তুলি আর বসল না, টিপটিপ করে পা বাড়াল তৃতীয় তলার দ্বিতীয় রুমে।

যেখানে ঠাঁই মিলেছে আরশ ভাইয়ের। ভয়ার্ত চোখে একবার দেখল কেউ তাকে দেখছে নাকি, যখন দেখল কেউ দেখছে না, তখন স্বঃস্থির নিঃশ্বাস ফেলে পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। দ্বিতীয় তলা থেকে যখন তৃতীয় তলার করিডোরে পা রাখল তখন আটকে রাখা শ্বাস যেন আরেকটু আটকে গেল। খুব ধীরে শ্বাস ফেলল, পাছে যদি আবার কেউ শ্বাস ফেলার আওয়াজ শুনে জেগে যায়। নীরবে নিভৃতে যতটা রুমের দিকে পা আগাল বুকের ধড়ফড় বৃদ্ধি পেল, পায়ের হাঁটু ভেঙে আসলো, তলপেটে আনন্দে প্রজাপতি উড়ছে এমন অনুভুতি হলো।

দরজার সামনে গিয়ে তুলি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়ায়, আবারো তাকিয়ে দেখে কেউ দেখছে নাকি তাকে! নিজেকে স্বাভাবিক রেখে দরজা ঠেলে দিতেই হীম করে দেওয়া এসির বাতাস এসে ছুঁয়ে দেয় তার গা। নাসারন্ধ্রে কোষে কোষে পৌঁছে যায় পুরুষালি শরীরের তীব্র কুস্তুরীর ঘ্রাণ। তুলি চোখ বুজে নিয়ে নিজের ভেতরে বয়ে চলা তীব্র আন্দোলন থামায়। অন্ধকারে আলো সয়ে আসতেই কিং সাইজের বেডের দিকে তাকিয়ে হাপড়ের ন্যায় শ্বাস ফেলে। ধীরে ধীরে রুমের ভেতর ঢোকে দরজার ছিটকিনি লাগাতে চায়, পর মুহুর্তে আবারো কী ভেবে তা ছেড়ে দেয় ওমন করেই! গলার কাছে আটকানো শ্বাস আরেকটু হয়তো আটকে পড়ে সামনে এলোমেলো শোয়ারত লোকটাকে দেখে। পরণে ফিনফিনে জারার ফতুয়া আটসাট হয়ে লেগে থাকায় পিঠ দেখা যাচ্ছে কম আলোতেও। ঘাড় সমান চুলগুলো এবড়ো-থেবড়ো হয়ে পড়ে আছে কপাল জুড়ে। তুলি এক পা আগায়, আবার দু-পা পিছিয়ে যায়।

যদি কেউ দেখে ফেলে সেই ভয়ে, কিন্তু নিজের ভেতরের বয়ে চলা আন্দোলন থামাতে পিছানো দু-পা আবারো বাড়িয়ে দেয়৷ নিজের শঙ্কা বাতাসে উড়িয়ে দেয়, যা হবে দেখা যাবে,সে শুধু এখনকার কথা ভাববে ভেবে। ভাবনায় স্থির থেকে ভয়হীন পা জোড়া গিয়ে থামে আরশের খাটের পাশে। নিচের দিকে বুক দিয়ে শোয়া পুরুষালি বাহুর দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক সে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে চায় আরশের গাল, নাক, ঠোঁট হাত সরিয়ে নেয়,মাথা ঝেড়ে আজগুবি খেয়াল গুলো ঝেড়ে ফেলে। চুপচাপ দেখতে থাকে ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রঃশ্বাস নেওয়া তার স্বপ্নের পুরুষটাকে৷ নির্জীব চোখে তাকিয়ে রয়, কাল, বিলম্ব, স্থান ভুলে। একটা মানুষ কীভাবে এত আকর্ষণীয় হতে পারে ভাবনায় ডুবে যায় সে।

আরশ নড়েচড়ে উঠে পাশ ফিরে। পায়ের কাছে পড়ে লুটোপুটি খাচ্ছে কম্ফোটার। গায়ের শার্ট শুধু পরিবর্তন করেছে, কালো রঙের ট্রাউজারটা এখনো শরীরে লেপ্টে। তুলি ভয়ার্ত চোখে আরশের মুখ দেখে , যখন দেখে এখন ঘুমে কাতর তখন আবার হাত বাড়ায় গলার কাছে থাকা তিল এর দিকে, পরপর আবার হাত গুটিয়ে নেয়, হঠাৎ কানে আসে মৃদু আওয়াজে আওড়ানো আরশের গাঢ় স্বর,”নুসরাত নাছির মাই বেবিগার্ল কাম উইদ মি…..
তুলির কপালে ভাঁজ পড়ল, নুসরাত নাছিরটা আবার কে! মনে করল হয়তো এমনি ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করছে তাই আর ঘাটাল না। আকস্মিক তুলির চোখ দুটো স্থির হলো অ্যাডামস অ্যাপল এর দিকে, এবার আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। তর্জনী আঙুল বাড়িয়ে অ্যাডামস অ্যাপল ছুঁয়ে দিতে চাইল, ছুয়ে দিল ও, তারপর ঘটল বিপত্তি,তার হালকা স্পর্শে জেগে উঠেছে আরশ, তাকিয়ে আছে তার দিকে নিষ্প্রাণ চোখে। কালো বলয়ের চোখগুলো দিয়ে গণে গণে দু-সেকেন্ড দেখল তুলিকে এরপর বিতৃষ্ণা নিয়ে আওড়াল,”গেট আউট!

তুলি গেল না, হা করে তাকিয়ে রইল বিছানায় নিজের সম্মুখে থাকা শয়নরত লোকটার দিকে। আরশ কন্ঠস্বর আরেকটু চাপা করে গর্জে উঠল,”বের হও রুম থেকে।
তুলি অত্যাধিক সাহস দেখিয়ে বলে ওঠল,
“বের না হলে কী করবেন আরশ ভাই?
আরশ উঠে বসে চুল টানল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মাথা যন্ত্রণায় মাথা দপদপ করছে। তুলির কথা শোনে কপাল থেকে এক হাত সরিয়ে, ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,“একটা থাপ্পড় মাটিতে পড়বে না। মেয়ে মানুষের গায়ে আমি হাত তুলি না, তোমার গায়ে হাত তুলতে আমায় বাধ্য করো না। নাও আউট, আই সে গেট আউট..!

তুলি ডরভয়হীন চোখে তাকিয়ে রইল আরশের দিকে। আরশের ধৈর্য ধরে খিঁচানো মেজাজটা ঠিক করা আর হলো না এই মেয়ের ছ্যাবলার মতো চাহনি নিজের উপর দেখে। বজ্রকন্ঠে বলে ওঠল,”বের হো আমার রুম থেকে বেয়াদব, থাপড়ে গাল ফাটিয়ে ফেলব। আমার সামনে যেন তোকে না দেখি, আউট..! বলেছি না যেতে, গেট আউট!
তুলি নড়ল না, কেমন করে তাকিয়ে রইল। আরশ ঢোক গিলে দাঁতে দাঁত চাপল। ঠোঁট দুটো কুঁচকাল, সাথে কুঁচকাল কপাল। অগ্নি মানবের ন্যায় জ্বলে ওঠে বিছানা থেকে নামল। ট্রাউজারের পকেট হাতড়ে রুমাল বের করে তুলির হাত রুমাল দিয়ে চেপে ধরল৷ একটানে বসা থেকে তুলে টেনে হিঁচড়ে বের করল রুম থেকে।

তুলি ঘো ধরে বসে থাকার পণ করেছিল সেখানে, কিন্তু আরশের একটানেই সে কুপোকাত হয়ে গেল। যখন রুমের বাহিরে বের করে দিয়ে পুরো বাড়ির ইট-পাথর কাঁপিয়ে দরজা মুখের উপর দিল, তখন গিয়ে নিজের অবস্থান ঠাহর হলো তুলির। মাথা নিচু করে নিচের দিকে তাকাতেই দেখল, অনিহা নিয়ে ফেলে দেওয়া তাকে যে রুমাল দিয়ে ধরা স্পর্শ করেছে সেটা। ঝুঁকে রুমাল স্পর্শ করতেই কান্না পেল , একহাতে রুমাল চেপে ধরল হাতের মুঠিতে, অতঃপর ছলছল চোখে চেয়ে রইল বন্ধ দরজার দিকে। নিজের কান্না লুকিয়ে, মুঠিতে থাকা রুমাল বুকে চেপে ধরল, দৌড় দিল দো-তলার দিকে। তাড়াহুড়ো করে চোখের পানি মুছে নিয়ে নিজের রুমের ভেতর প্রবেশ করতে গিয়ে খেয়াল করল না নিচতলার ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে তাকে তীক্ষ্ণ চোখে অবলোকন করছেন রুমানা খাতুন।

ইসরাত নিজের কপাল মুছল ওড়না দিয়ে। টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে খাবার। এতক্ষণ যাবত মাটির চুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় মাথা ভনভন করছে। গরমে মুখ লাল হয়ে আছে, মাথা ব্যথায় দপদপ করছে মস্তিষ্ক, সাথে চোখে অন্ধকার দেখছে। শব্দ করে শ্বাস ফেলে কিচেন থেকে বের হতেই ড্রয়িং রুমে বসে থাকা রুমানা খাতুনের সাথে দেখা হলো। তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধালেন,”কাজ শেষ?
ইসরাত উপর নিচ মাথা দোলাল। আগুনের সামনে শুধু সে দাঁড়িয়ে থেকে চুলোয় ফু দিয়েছে, বাকি সব কাজ একা হাতে সামলেছেন লিপি বেগম, এইটুকু কাজ করেও মাথা ঘোরাচ্ছে তার মনে হলো। চুপচাপ নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে পা বাড়াতেই রুমানা খাতুন বললেন,”আমার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও, বিছানার উপর সুঁতি কাপড় রাখা আছে ওইটা পরে নিও।

ইসরাত এককাল বিলম্ব না করে দ্রুত পদক্ষেপে চলে গেল রুমানা খাতুনের রুমে। বিছানার উপর ভালো করে দেখতেই মাথায় বজ্রপাত হলো, মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো,”শাড়ী!
তেতো মুখে শাড়ীর দিকে তাকিয়ে হাতে তুলে নিল, চুপচাপ গোসল সেরে সুঁতি শাড়ী গায়ে জড়াল। কুচি ঠিকঠাক হলো না, তাই দুমড়ে মুচড়ে গুজে নিল পেটের কাছে। মাথা ভালো করে মুছে নিয়ে তোয়ালি মেলে দিল বাহিরে, নাক সুরসুর করল, ইসরাতের বুঝতে বিলম্ব হলো না সর্দি হতে দেরি নেই, খুব শীগগির নাক মুছতে মুছতে সে কাহিল হয়ে পড়বে।
ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে যেতেই রুমানা খাতুনের দৃষ্টির কবলে আবারো পড়ল। দেখে তাকে বিড়বিড় করছেন কিছু একটা।

ঘড়ির কাটায় এগারোটা আটচল্লিশ মিনিট। খাবার টেবিলে বসলেন রুমানা খাতুন, জায়িন, হেলাল সাহেব, লিপি বেগম, সার্থ, মেঘলা, মেহুল, পলি আর সাথে আরশের ছোট মামা আতিক। আরশ আর তুলি আজ খাবে না, দু-জনের নাকি মাথা ব্যথা।
ভাত খাওয়া শুরু করতে যাবেন আজকের রাতের ভেতর পঞ্চমবারের মতো কারেন্ট নিয়ে নিল। ইসরাত এসে জায়িনের পাশে দাঁড়াতেই জায়িন নিজের বাঁ-পাশের চেয়ার টেনে ইশারায় বোঝাল বসার জন্য। ইসরাত বসল না, আড়চোখে তাকাল রুমানা খাতুনের দিকে। রুমানা খাতুন ইশারা বলছেন, না বসার জন্য। জায়িন ইসরাতের হাতে ধাক্কা দিয়ে বলল,”বসুন!

ইসরাত বসল না, আবারো আড় চোখে দেখল বয়স্কাকে। বয়স্কার চোখ কঠোর। জায়িন ইসরাতের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাল, নানিকে ইশারায় ইসরাতকে বসতে না বলতে দেখে বুঝে নিল সবটুকু। একটানে নিজের পাশে বসিয়ে দিয়ে বলল,”বসুন, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।
রুমানা খাতুন অসন্তোষ নাতির প্রতি প্রকাশ করলেন চোখে, মুখ ফুটে কিছু বললেন না। খাবার খাওয়া শুরুর পূর্বেই বললেন,”কতদিন থাকবে তোমরা?
হেলাল সাহেব বললেন,
“পরশু চলে যাব।
রুমানা খাতুন কঠোর স্বরে বললেন,
“পরশু টরশু বাদ, আগামী মাসে যাবেন আপনারা।

হেলাল সাহেব শাশুড়ী কথায় দ্বিমত পোষণ করলেন না। মাথা দুলিয়ে বোঝালেন ঠিক আছে। ইসরাত গায়ের সব ভার ছেড়ে দিল চেয়ারের উপর। লাশের মতো, অনুভূতি হীন চোখে চেয়ে রইল বড় মায়ের দিকে। ঠোঁট টেনে কান্না আটকাল, লিপি বেগম নিজেও বিমর্ষ মুখে তাকিয়ে আছেন ইসরাতের দিকে। চোখ দিয়ে বোঝাচ্ছেন, আমার কিছু করার নেই মা। সহ্য করে নে কষ্ট করে, আমি আছি তো সাথে।

এরপরের দিন ইসরাতের উপর একইধারায় কাজ করানো চলল। জায়িন যখনই তাকে বাড়ি ফাটিয়ে ডাকল তখনই শুনল কাজ করছে। দুপুর দুটোর দিকে রেগেমেগে বের হলো রুম থেকে। বেড়াতে এসে এত কীসের কাজ মেয়েটার! এমনিতেই মাথা গরম ছিল তার উপর মেঝ মামানির চিৎকার শুনে মেজাজ আরো খারাপ হলো। যখন কিচেনে গিয়ে উপস্থিত হলো দেখল ইসরাত আর মেঝ মামানির তর্ক-বিতর্ক চলছে। ইসরাতের মুখ দেখেই ধারণা করল ভীষণ রেগে আছে, সাথে তীক্ষ্ণ গলায় চ্যাঁচাচ্ছে,”একদম আমার মায়ের দিকে আঙুল তুলবেন না।
পুষ্পা দ্বিগুণ জোরে চ্যাঁচিয়ে বললেন,

“একশো বার তুলব, মা-মেয়ে মিলে আমার ননাস আর ননাসের ছেলেকে জাদু করে বিয়ে করেছো তা আমরা বুঝি না মনে করো। বেশ্যা মেয়ে…
ইসরাত চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
“যে নিজেকে যা মনে করে, অন্যকে ও তার কাছে তেমন লাগে।
ইসরাত কথা শেষ করতে পারল না পুষ্পা হাত শূণ্যে তুলে ফেললেন পাঁচ ইঞ্চি লম্বা জবান যুক্ত মেয়েটাকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারার জন্য, তা আর পারলেন কই, শক্ত হাতের পিষ্টনে শূণ্যে তোলা হাত ওমনই রইল। আক্রোশ নিয়ে পেছনে ফিরতেই, মুখের ভাব ভঙ্গি বদলে গেল। ক্ষোভ সরে গিয়ে ভর করল মেকি নমনীয়তা। বললেন,”বাবা জায়িন, তুমি এখানে…
কথা শেষ করার আগেই জায়িন চিৎকার করে ডাকল নানিকে। রুমানা খাতুন জোহরের নামাজ শেষ করে মাত্র উঠেছিলেন নাতির গর্জনে দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে আসলেন কিচেনে। চোখে আতঙ্কিত ভাব নিয়ে শুধালেন,’”কী হয়েছে?
জায়িন বজ্র কন্ঠে বলে ওঠে,

,”এটা আমার বউ, কোনো বেশ্যা না, তোমার ছেলের বউ কোন সাহসে আমার বউকে বেশ্যা বলল। ওদের সবাইকে ভালো করে দেখে নিতে বলো, ও আমার ওয়াইফ, জায়িন হেলালের ওয়াইফ, রাস্তা থেকে উঠে আসা কেউ না! এখানে আমার বউ এসেছে আমার সাথে বেড়াতে, তোমাদের চাকরানিগিরি করতে না, নিজেদের রেখার পরিধি টেনে নাও সময় থাকতে, নাহলে পস্তাতে হবে অনেক। আমার বউকে দ্বিতীয়বার যদি কেউ ছোট করে কথা বলে, তাহলে এবাড়িতে আমি আর এক মিনিট থাকব না। এক্ষুণি ক্ষমা চাইতে বলো তোমার ছেলের বউকে।
রুমানা খাতুন পুষ্পার দিকে তাকালেন অসন্তুষ্ট মুখে। পুষ্পা কৃত্রিম কান্নায় ভেঙে পড়লেন আম্মা বলে। নাতিকে সামলানোর জন্য পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে নিলেই, ইসরাতকে বাহু বন্ধনীতে আটকে সরে গেল সে। তবুও রুমানা খাতুন চোখ মুখ স্বাভাবিক রেখে শান্ত স্বরে বললেন,”বড় মানুষ ভুল করলে ক্ষমা করে দিতে হয়, এভাবে ছোট মানুষের কাছে ক্ষমা চাইবে, মা ভেবে ভুলে যাক।

ইসরাত কিছু বলল না। সে এই মহিলাকে জীবনেও ক্ষমা করবে না। কত বড় সাহস তাকে কী জঘন্য গালি দিয়েছে। জায়িন রুমানা খাতুনকে বলল,”হয় তোমার ছেলের বউ ক্ষমা চাইবে, নয় আমি আমার বউ নিয়ে আজ, এই মুহুর্তে এই বাড়ি পরিত্যাগ করব।
জায়িনের সূক্ষ্ম হুমকিতে রুমানা খাতুন একটু টললেন। পুত্রবধুর পানে চেয়ে চোখাচোখি করে নিয়ে কিছু একটা আস্বস্থ করলেন। পুষ্পের চোখ-মুখে আক্রোশ দপদপিয়ে ফুটে উঠল। তবুও শাশুড়ীর কথা রাখতে ক্ষমা চাইলেন, বললেন,”আমি ও তো তোমার মায়ের মতো মা, তোমার মা এমন বললে তুমি ক্ষমা করে দিতে না, আমাকে ক্ষমা করে দিও!
ইসরাত টু শব্দটি করল না। পুষ্প ইসরাতের বাহুতে স্পর্শ করতে নিবে সে গা সরিয়ে নিল। বিতৃষ্ণার সহিত মুখ ফুটে বেরিয়ে এল,”আমার মা আপনার মতো এত নিচ না যে আমাকে বেশ্যা বলবে।
সকলের মুখ থমথমে হয়ে গেল। পুষ্প বললেন,

“দেখলেন আম্মা, দেখলেন কী বলল!
লিপি বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেলেন। নাক ফুলিয়ে যেতে যেতে স্পষ্ট করে আওড়ালেন,”আমি ইসরাতের কথায় কোনো ভুল দেখতে পাচ্ছি না ভাবি, ও ঠিকই বলেছে।
কিচেনে খান বাড়ির সবাইকে থমথমে মুখাভাব রেখে প্রস্থান করলেন লিপি বেগম, ইসরাত ও জায়িন। ফিরে তাকাল না দ্বিতীয় বার কেউই ওদিকে।

শিশির ফোটা চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে পাতা হতে৷ আকাশে তখন সূর্যের লালাভ ভাব বিদৃস্ত। বাদুরের মতো সোফার উপর দিয়ে মন মরা হয়ে শুয়ে থাকা নুসরাতের মোবাইলটা কর্কশ আওয়াজে চ্যাঁচিয়ে উঠতেই, খিঁচানো মেজাজ গালি বের হলো মুখ দিয়ে,”কোন মাদারবোর্ড এই গান দিছে কলটোনে, যত্তসব অশ্লীল পোলাপাইন!
উঠে বসল অলস ভঙ্গিতে সোফায় সোজা হয়ে। মোবাইল হাতে নিয়ে ভাবল কল ধরবে না, তারপর আবার কীভেবে কল ধরে ফেলল। কানে লাগাতেই ইসরাতের কাঁন্না মিশ্রিত কন্ঠস্বর ভেসে বেড়াল নুসরাতের কানে,”নুসরাত, ওরা আমাকে গতকাল থেকে খেতে দেয়নি, এমনকি আমাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে কখন থেকে।

ইসরাত বাকিটুকু পূরণ করতে পারল না, নুসরাত ফট করে ফোন রেখে দিল। পরমুহূর্তের ঘটনা ঘটল খুব দ্রুত। বাসি মুখে নাছির সাহেব নিজেকে পেলেন বাইকের পেছনে বসা অবস্থায়। সামনে নুসরাত বসা, গায়ে হুডি জড়িয়েছে, বাড়ি থেকে বের হতে হতে দু-মিনিটে। নাছির সাহেবের পেছনে আবার আহান বসা, কোথা থেকে বাঁদরটা এসে টপকেছে লাস্ট মুহুর্তে। বাইকের স্প্রিড বাড়িয়ে দিল নুসরাত আরেকটু। নাছির সাহেব বুঝলেন না সকাল সকাল এই মেয়ে কোথায় তাকে নিয়ে ছুটছে। বাড়িতে পরা লুঙ্গি বাতাসে উড়ছে। আহান পানি পোকার মতো আকড়ে ধরে আছে তাকে পেছন হতে। নুসরাতকে শুধালেন,”কোথায় যাচ্ছি আমরা, এই সাতসকালে?
নুসরাতের স্বাভাবিক স্বর,

“ইসরাতের নানী শাশুড়ীর বাড়ি।
নাছির সাহেব নিজেকে একবার দেখলেন একবার মেয়েকে।আঁতকে উঠে বললেন,” আম্মা আমাকে নামাও,আমি এভাবে যাব না।
“কেন যাবে না?
নুসরাত তিরিক্ষি মেজাজ শুধাল। নাছির সাহেব চূড়ান্ত পর্যায়ে বিরক্ত মেয়ের প্রতি। তেরছা স্বরে বললেন,”লজ্জার আত্মীয়..!
নুসরাত বিড়বিড় করল,
“মাদারচুদির আত্মীয়, চুথিয়ামি করে আমার বোনের সাথে, সবগুলারে পানিতে চুবিয়ে মারব।

সাতটা চল্লিশ মিনিটে খান বাড়ির লোহার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছাল তারা, ততক্ষণে নাছির সাহেবের কানে কথাটা তুলে দিয়েছে নুসরাত ইসরাতকে খাবার খেতে দিচ্ছে না সবাই, তাই মেয়েকে খাওয়ানোর জন্য আবার বাড়ি ফিরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে আপেল, আঙুর, মাল্টা, নাসপাতি নিয়ে এসেছেন সবাই মিলে। হাত ভর্তি সেসব খাবারের পলিথিন। খান বাড়ির লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নুসরাত অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিল মনে মনে, আব্বা সাথে না থাকলে নিশ্চয়ই সে গলা ফাটিয়ে গালি দিত। তারপর রাস্তা থেকে পাথর তুলে ছুঁড়ে মারল দালানে, লোহার গেটে। চিৎকার করল,”এই গেট খুলেন… দু সেকেন্ড লেট করে বালের গেট খুললে লাথি মেরে ভেঙে ফেলব।

নুসরাতের চ্যাঁচানোর আওয়াজ প্রতিধ্বনি হলো খান বাড়ির অভ্যন্তরে। সকাল সকাল এমন হেঁড়ে গলায় কে চিৎকার করছে সেটা দেখতে চোখে চশমা পরে এগিয়ে আসলেন রুমানা খাতুন। যতক্ষণে বাড়ির বড় সদর দরজায় পৌঁছালেন, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে বটে। দেখলেন একটা মেয়ে গেট বেয়ে উপরের দিকে উঠে আসছে, তারপর ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। চোখ কুঞ্চন করে নিলেন মেয়েটার মাটিতে পড়া দেখে, কানে ভেসে আসলো,ব্যথা পেয়ে কঁকিয়ে ওঠার শব্দ, তারপর এমন ভাবে লাফিয়ে উঠে গেট টেনে খুলে দিল মেয়েটা যেন ব্যথাই পায়নি।
গেট খুলে যেতেই কাচা পাকা দাড়ি নিয়ে দাঁড়ানো নাছির সাহেবের মুখ দেখলেন। প্রথমে চিনলেন না, ধীরে ধীরে যত সম্মুখে পা বাড়ালেন রুমানা খাতুন, তত মুখটা চেনা পরিচিত হয়ে উঠল।৷ বিস্ময় চোখে তাকিয়ে বললেন,”নাছির আব্বা?

নাছির সাহেব নিজের পরণের লুঙ্গি সামলে হাসলেন। কী অদ্ভুত ভাবে চলে এসেছেন এই মেয়ের চক্করে পড়ে। সালাম ঠুকলেন,”আসসালামু আলাইকুম মায়োই মা।
নাছির সাহেবের সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
“এ কেমন বেয়াদবি আচরণ, সাত-সকালে এমন ডাকাতের মতো হামলা করেছ কেন এ বাড়িতে? এটা তো কোনো ভদ্রলোকের বাড়ি তাই না?
নাছির সাহেব মাথা দোলাবেন সঃবেগে নুসরাত বাধা সৃষ্টি করল। বলল,”দেখে তো মনে হচ্ছে না এটা কোনো ভদ্রলোকের বাড়ি। তাছাড়া আমি আর আমার বাপ যেখানেই যাই, সেখানেই এমন ডাকাতের মতো হামলা করি। এনি প্রবলেম?
রুমানা খাতুন চিরবির করে উঠলেন। বললেন,

“অবশ্যই সমস্যা, কোনো ভদ্র ঘরের মেয়েরা এমন সাত-সকালে গুন্ডাদের মতো এসে কারোর বাড়ির সদর গেটে হামলা করে না।
নুসরাত নির্লিপ্ত। নির্বিকার চিত্তে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“তো আমি কখন বললাম আমি ভদ্র ঘরের মেয়ে, আপনিই তো কখন থেকে বলছেন ভদ্রঘরের মেয়ে ভদ্রঘরের মেয়ে। যাই হোক, আমি বয়স্ক মহিলাদের সাথে কথা বলিনি, ইসরাত কোথায়?
নাছির সাহেব মেয়ের ঝগড়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছেন, কোনো কথা বলতে গেলেই না ভদ্রমহিলা মুখ দিয়ে একদম ঝাঁঝিয়ে ফেলেন সেই ভয়ে ঠোঁটে কুলুপ এঁটেছেন। নুসরাত প্রশ্নে নাছির সাহেব তাকালেন রুমানা খাতুনের দিকে। ভদ্রমহিলা নিষ্প্রভ কন্ঠে জানালেন,”আছে কোথাও একটা, আপনারা এখন আসতে পারেন। আতিক গেট বন্ধ করে দাও।

অপমানে থমথমে হয়ে গেল নাছির সাহেব আর আহানের চেহারা। নুসরাত না শোনার মতো রুমানা খাতুনের কথাটা হুহু করে হেসে উড়িয়ে দিল। বলল,”এই ভদ্র ঘরের কায়দা, চ্যাহ, মানুষকে আপ্পায়ন না করে এভাবে ফিরিয়ে দেন আপনারা! আমাদের বাড়িতে আসবেন, একদম হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিব কীভাবে আত্মীয়তা করতে হয়।
রুমানা খাতুন কিছু বলতে যাবেন নুসরাত দু-পা আগাল। হাতের মধ্যে ধরে রাখা পলিথিন হতে আপেল বের করে বড় করে একটা কামড় বসাল। এমনভাবে পা বাড়াল খান বাড়ির দিকে যেন এ বাড়ি তার, সে কোনো এখানের আত্মীয় না। রুমানা খাতুনের না শোনার মতো বিড়বিড় করল,”যত্তসব সাউয়ার জাতের কথা…. কিন্তু ওইটুকু কথা শুনে ফেললেন রুমানা খাতুন, কঠোর মুখে নাছির সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন,”মেয়েকে আদব শিখাওনি, এ কী বেয়াদব মেয়ে, ভদ্রতা বলতে তো কিছুই নেই ভেতরে।

নুসরাত হাতে আপেলের পলিথিন নিয়ে ফিরে আসলো। আহান আর নাছির সাহেবকে বগলদাবা করে নিয়ে যেতে যেতে বলল,”আপনি যে ছিলেন না, তাই কেউ আদব শিখায়নি, এখন আমি আপনার কাছে নিজে এসে গেছি, মাস খানিক থাকব, একদম অক্ষরে অক্ষরে, রগে রগে ঢুকিয়ে দিয়েন ভদ্রতা, নম্রতা, আদব কায়দা।
নুসরাত এক পা দু-পা করে এগোলো সামনে। নাছির সাহেব আর আহান তখন আটকে পড়েছেন ড্রয়িং রুমে লিপি বেগমের সম্মুখে, তাই কথা বলছেন। ইসরাত বলেছিল সে তিন তলার ছোটো ড্রয়িং রুমে আছে, তাই নুসরাত দো-তলায় না থেমে একেবারে তৃতীয় তলায় চলে গেল। করিডোরে কোনো প্রকার আলো জ্বালানো হয়নি, এমনকি থাইগ্লাস গুলো খোলা হয়নি বলে চারপাশ ডুবে আছে অন্ধকারে।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৪

নুসরাত হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল। শ্বাস ভারী হয়ে আসলো কোনো কারণ ছাড়াই, বুক ভার হলো, চোখ দুটো খোলা রাখতে চাইল, অবসন্নতায় লেগে আসলো পাতা দুটো। ঠোঁট কেঁপে উঠল তিরতির করে,হাত থেকে খসে পড়ল আপেলের পলিথিনটা, বাতাসের গতিতে গড়িয়ে পড়ল চারিপাশে আপেল। রেলিঙ চেপে নিজকে একজায়গায় ধরে রাখতে চাইল, টলে গেল দু-পা পেছনে। মনে হলো এই বুঝি পড়ে যাবে তৃতীয় তলার করিডোর থেকে, কিন্তু পড়ল না, নিজেকে কষ্টে সামলাল। মেঝেতে উল্টে পড়ার আগে ঝাপসা চোখে দেখল স্লিপার পড়া এক জোড়া পা এগিয়ে আসছে তার দিকে, তাড়াহুড়ো করে নয়, খুবই ধীর স্থির ভঙ্গিতে, নুসরাত ঢলে পড়ল, যতটুকু ব্যথা পাবে ভাবছিল ততটুকু পেল না, সহনীয় ব্যথা পেল, আরাম করে শক্ত জায়গাটায় মাথা চেপে ধরে অবচেতন মনে ডাকল,”আরশ ভাই..!
সারা শব্দ পাওয়া গেল না। ভারী শ্বাস ফেলার শব্দ আসলো শুধু। শ্রবণেন্দ্রিয় বেয়ে বয়ে বেড়াল,”লং টাইম নো সি বেইবিগার্ল…

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৬

4 COMMENTS

  1. তাড়াতাড়ি পর্ব দিবেব নাহলে আপমার খবর আছে

Comments are closed.