প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৬
জান্নাত নুসরাত
গড়গড় করে একধারে কিছু একটার শব্দ হচ্ছে। কীসের শব্দ এটা ভেবেই কপাল সামান্য কুঞ্চন সৃষ্টি হলো। চোখ কুঁচকে ভাবনার অতলে হারিয়ে গেল বিছানায় অর্ধজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটা। চোখ-মুখে অগাধ বিরক্তি। নাকে আবারো শক্তপোক্ত কুস্তুরীর ঘ্রাণ এসে লাগছে। এত প্রকট ঘ্রাণটা সে বালিশে নিজের মুখ চেপে ধরে লুকাল। না তবুও লাগছে, অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড়াল,”দূরে সরুন আরশ ভাই, নাক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অস্পষ্ট বিড়বিড় টুকু বোঝা গেল না, বালিশের নিচেই চাপা পড়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড এমন গড়াগড়ির ভেতর কাটল মেয়েটার। সময় নিয়ে চোখ খুলতেই দেখল উবু হয়ে শুয়ে আছে সে। চোখ বেডের দিকে স্থির হতেই কিছুক্ষণের জন্য থমকাল। অতঃপর নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে বসে ঢিলে থাকা চুলগুলো হাতখোপা করল। চোখ তুলে তাকাতেই তার সামনে পায়ের উপর পা তুলে কাউচে বসা আরশের সাথে চোখাচোখি হলো। নির্লিপ্ত কন্ঠে শুধাল,”কত মিনিট যাবত ধরে বসে আছেন?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আরশ হাতের সাবমেরিন টু-টোনের ঘড়িটা এক পলক দেখে নেয়। গম্ভীর অবয় মুখে বজায় রেখে বলে,”ওয়ান হাওয়ার, টুয়েন্টি মিনিট, ফোর সেকেন্ড।
কথা শেষে চোখ তুলে তাকাল ঘড়ি হতে। বিছানায় কম্ফোটার জড়িয়ে বসে থাকা নুসরাতকে নিষ্প্রাণ কন্ঠে আদেশ জারী করল,” নাও গেট দ্যা ফাক আউট অভ মাই রুম নুসরাত নাছির, অনেক ঘুমিয়েছ।
নুসরাত উঠে দাঁড়াল মুখ বাঁকিয়ে। আরশকে ভেঙচিয়ে ভেঙচিয়ে বলল,”মরে যাচ্ছি না আমি আপনার রুমে ঘুমাতে, নাও গেট দ্যা ফাক আউট অফ মাই লুম, নুতরাত নাতির।
মুখ বাঁকানো শেষে লাফিয়ে উঠল। নিজের পায়ের স্লিপার খুঁজে পেল না বেডের আশেপাশে কোথাও! নাক ফুলিয়ে এক পলক আরশের পানে তাকাতেই ব্যাটা খচ্চর আরশ হাত দিয়ে দেখাল রুম থেকে বের হয়ে যেতে। নুসরাত একবার দেখল আরশকে একবার দেখল তার পায়ে পরা জুতাকে, দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় চেপে বের হওয়ার ভান করল। বেরিয়ে গেল, সেকেন্ডের মাথায় আবার ফিরে আসলো। কিছু বোধগম্য হওয়ার আগেই আরশের পা থেকে টান দিয়ে স্লিপার জড়ে খুলে নিয়ে পালাল। আরশ তাকাল নির্জীব বদন ঘুরিয়ে। নুসরাত পালাতে গিয়ে হাতে জুতো নিয়ে কাঠের দরজার সাথে বারি খেল নাকে, কপালে, হাতের তালু দিয়ে নাকে ঘষল, অস্বাভাবিক কিছু শব্দ মুখ দিয়ে নিঃসৃত হলো।
আরশের রুম থেকে বেরিয়ে পায়ে স্লিপার জোড়া ঢুকিয়ে নিল। জুতোজোড়া অনেক বড় হয়ে গেল পা অনুযায়ী, তবুও নুসরাতের কিছু যায় আসলো না, অসুবিধেও হলো না। সে নিজের পায়ের সাইজ থেকে দু-সাইজ লম্বা জুতো পরতে অভ্যস্ত। তার পরণের জুতো জোড়া এক পলক দেখল, দেখেই মনঃপুত হয়ে গেল। নাইকের জুতো জোড়া এতটা আরাম দায়ক, সাথে এতটা শীতিল তার পায়ের নিচের তালু শিরশির করছে। খুশিতে ডগমগ করে উঠল, এ জুতো আরশকে আর জীবনেও ফিরিয়ে দিবে না সে, আজ থেকে জুতো জোড়া তার। বাড়ির প্রতিটা বন্ধ রুমের আনাচে কানাচে একবার করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। আনমনে কিছু একটার ভাবনায় ডুবে গিয়ে ধীর স্থির পায়ে অগ্রসর হলো তৃতীয় তলার ড্রয়িং রুমের খুঁজে। নুসরাত বেখেয়লে হাঁটতে গিয়ে ধাক্কা খেল কেউ একজনের সাথে, উপলব্ধি হলো কোনোভাবে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত না, অপাশের মানুষটা তাকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছে। নুসরাত ভ্রুকুটি করে, পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া মেয়েটাকে এক পলক দেখে নেয় আড়চোখে,একদম ধবধবে ফর্সা মেয়েটার মুখ, পাত্তা দিল না, এসব ছোট খাটো মাছিকে এখন পাত্তা দিলে চলবে না, তাকে এখন বড় একটা কাজ সম্পাদন করতে হবে।
ঘড়ির কাটায় তখন টিকটিক করে চলছে। বড় দেয়াল ঘড়িতে বাজছে আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তৃতীয় তলার ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হতেই দেখা হলো ইসরাত আহান, আর নাছির সাহেবের সাথে। চুপচাপ নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে গিয়ে বসল সোফার উপর। নাক ডলে নিয়ে শুধাল,”অত্যাচার করল কেন তোর উপর এই মহিলারা?
নাছির সাহেব নুসরাতের কথা কানে না তুলেই ভ্রু কুঞ্চিত করে জানতে চাইলেন,”কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ? তোমাকে পুরো খান বাড়ি খুঁজে পেলাম না কোথাও?
নুসরাত মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে কথাটা উড়িয়ে দিল। নিজের মতো করে আবারো বোনের কাছে জানতে চাইল,”যৌতুক-টৌতুক চাইতেছে নাকি তোর নানী শাশুড়ী ইসরাত?
ইসরাত দু-পাশে মাথা নাড়াল। নাছির সাহেব নুসরাতের কথার রেশ ধরে বললেন,“কিছু যদি মায়োই মা বলে থাকে ,তাহলে আমাকে বলো আম্মা, আমি নির্দ্বিধায় তাদের আশা পূরণ করব।
নুসরাত সহমত পোষণ করে মাথা নাড়াল বাবার সাথে। ইসরাত বিরক্ত হয়ে বলল,”আরে না, সেটা না, জায়িনের নানী পলির সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন তার, কিন্তু বড় আম্মু মানা করে দেওয়ায় আমার উপর সেই রাগ মিটাচ্ছে।
“ঠিক আছে রাগ মিটাক, কিন্তু খাবার খেতে দিল না কেন?
আহান জানতে চাইল। নুসরাত প্রশ্নাত্মক চাহনি নিক্ষেপ করল বোনের দিকে। শুধাল,”আরশ..
থেমে ঢোক গিলল। ভুলে আরশ চলে আসছে মুখ দিয়ে। গলা পরিস্কার করে নিয়ে বলে,“ জায়িন ভাইয়া কোথায়? উনি জানে না, উনার বউকে খাবার খেতে দিচ্ছে না উনার নানী? বিয়ে করার সময় তো খুব বড় বড় কথা বলেছে, এই করব, সেই করব, দুঃখ স্পর্শ করতে দিব না, এখন বউ খেতে পাচ্ছে না, সেই খবর নেই ব্যাটার কাছে। চল্, আর এখানে থাকতে হবে না, বাড়িতে চল্!
নাছির সাহেব নুসরাতের কথায় উত্তেজিত হলেন। বললেন,”মুখ শুকিয়ে একদম কাঠের মতো হয়ে গেছে, হ্যাঁ চলো আর থাকতে হবে না এখানে। কাজ করিয়ে করিয়ে আমার মেয়েটাকে দু-দিনে রোগা বানিয়ে দিয়েছে।
ইসরাত বাপ-বোন দু-জনকে থামাতে হাত তুলে বাঁধা দিতে চাইল, কিন্তু নুসরাত সে শোনার পাত্রী না উঠে দাঁড়াল তড়িৎ পায়ে। ইসরাতকে একহাতে নিজের সাথে টেনে ধরল, সোফা থেকে টেনে হিঁচড়ে তুলতে তুলতে জানতে চাইল,”জায়িন ভাইয়া কই?
ইসরাত গোমড়া মুখে বলল,
“নানী গতকাল আটটার দিকে উনাকে পাঠিয়েছে পুকুরে জাল ফেলার মানুষ আনতে।
নুসরাত মুখ ফসকে বলে ফেলল,
“ জাল আনতে গিয়ে কী মরে গেছে? এখনো দেখা নেই তার!
জিভ কেটে, পরপর আবার হাত দিয়ে ঠোঁট চাপল। ইসরাত বোনের দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টি নিবিষ্ট করল। নাক ফুলিয়ে বলল,”গতকাল রাত থেকে পেছনের পুকুরে বসে মাছ ধরছে বরশিতে।
নুসরাত ইসরাতের হাত ছেড়ে দিয়ে বসল এক পা তুলে সোফায়। শান্ত মাথায় জিজ্ঞেস করল,”তুই যে গতকাল থেকে না খাওয়া জানে জায়িন ভাই?
ইসরাত মনমরা গলায় বলল,
“জানবে কীভাবে, মাছ ধরছে না পুকুরে। সারারাত ধরে বসে মাছ ধরছে, বাড়িমুখো হয়নি এখনো।
নাছির সাহেব নিজের হাতের পলিথিন থেকে নাসপাতি বের করে ছুরি দিয়ে কেটে টুকরো করলেন। এক টুকরো ইসরাতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,” খাও মা..!
আবেগে আপ্লুত হয়ে ইসরাতের কান্না পেল, নাক টেনে, চোখ ঝাপটে কান্না আটকাল কোনোরকমের। নাসপাতির স্লাইস মুখে দিতেই নুসরাত জিজ্ঞেস করল,”কোন পাগলে সারারাত মাছ ধরে?
“আমি কল দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম আসবে কখন, বলে বাড়িতে আজ আসবে না, মাছ ধরা নাকি তার কাছে এডভেঞ্চারাস লাগতেছে।
নুসরাতের কপালে আরো ভাঁজ পড়ল। যা বোঝার বুঝেছে সে। তাই শুধাল,“রাতে খায়নি জায়িন ভাইয়া?
“না!
নুসরাত আর আহান হাতে ঠাস ঠাস করে মারল। তারপর কটমট করে উঠে নুসরাত বলল,”তোর জামাই খায়নি বলে, তোকেও খাইতে দেয়নি ওই মহিলা। ডেকচিতে তরকারি, ভাত ছিল?
ইসরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“না! আমাকে দিয়ে ভাত রান্না করিয়ে, আমার জন্যই ভাত রাখেনি।
নুসরাত আরাম করে বসল সোফায়। খান বাড়ি থেকে যাওয়ার জন্য লাফানো কমে এসে ভর করল শীতিলতা৷ নাসপাতি হাতের তালু দিয়ে একসাথে মুখে ঢুকিয়ে নিয়ে বলল,” শালি বুড়ি আদিম কালের। তোর জামাই খায় নাই এজন্য ভাত তরকারি সব তোলে রেখেছে কিচেনে।৷
কিৎকাল থেমে নুসরাত হুডির হাতা গোটাল। বলল,
“জায়িন শালার উঁচু নাকটা ঘুষি মেরে ইচ্ছে করছে ফাটিয়ে ফেলতে, একদম সারাজীবনের জন্য মাছ ধরা গুচিয়ে দিতে, শুধু আজ ভদ্র বলে ঘুষিটা মারলাম না।
এর মধ্যে তৃতীয় তলায় পুষ্পার পর্দাপণ ঘটল। ড্রয়িং রুমের ভেতর ঢোকে যখন অপরিচিত মানুষ দেখলেন তখব বিরক্তি নিয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠলেন,”এই কে রেম কোথা থেকে আসছো তোমরা? বাড়িতে ঢুকলে কেমনে? আম্মা, ও আম্মা…
ইসরাত নম্র কন্ঠে পুষ্পার চেচামেচি থামাতে বলল,
“আমার বাড়ির লোক ওরা।
মহিলা ইসরাতের কথা শোনে মুখ ঝামটা মেরে এগিয়ে আসলেন। নুসরাতের ভাষায় ষাঁড়ের মতো ভাউ ভাউ থামালেন, টেবিলের উপর রাখা ফলের পলিথিন হাতে নিতে যাবেন, নুসরাত অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে জানতে চায়,”এই রাখেন, রাখেন এগুলা নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
পুষ্পা অবাক হলেন, বললেন,
“এইগুলা ফ্রিজে রাখব না?
নাছির সাহেব বললেন,
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিয়ে যান।
নুসরাত বলে ওঠল,
“কীসের নিয়ে যাওয়া, এগুলা আমি খাওয়ার জন্য নিয়ে আসছি, উনাদের ফ্রিজে রাখার জন্য না। রাখুন, এই গুলা রাখুন…
নুসরাত বিরক্ত চোখে বোনের পানে তাকাল। এখানে আসার পর থেকে এই মহিলাকে দেখেনি সে, এই মহিলা-ই বা কে! এত বেশি নাক গলাচ্ছে কেন তাদের কাজে। শুধু বয়স্কা মহিলাকে দেখে ধারণা করেছে ইসরাতের নানী শাশুড়ী। মহিলাটার দিকে চোখ উল্টে তাকিয়ে বুঝতে চাইল উনি কে, কাপড়ের ধরণ আর মুখের ভাবসাব দেখে ধরে নিল কোনো কাজের বুয়া, তাই সেন্টার টেবিলে জুতো পরা পা তোলা ছিল তা আর নামাল না। ইসরাতের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে শুধাল,”এই শুয়োরের মতো চেহারা ওয়ালা বেডি কেডা? আর আমাদের খাবারে দিকেই কেন বা চোখ দিচ্ছে?
ইসরাত নুসরাতের ঠ্যাং এর কাছে হাত দিয়ে ঠাস করে চাপড় মারল। চোখ পাঁকিয়ে ইশারায় বোঝাল চুপ। ফিসফিস করে কানের কাছে বলল,”আমার মামি শাশুড়ী।।
ইসরাতের কথা শেষ হতেই ঘাড় বাঁকিয়ে মহিলার মুখ অবলোকন করল নুসরাত, বুঝল তার নিষেধাজ্ঞা শুনে বিশ্রীভাবে নাক কুঁচকে ফেলেছে মহিলাটা। সে হাসল, জানা প্রশ্ন আবারো ইসরাতের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ল। পুষ্পার শোনার মতো খ্যাক খ্যাক করে জানতে চাইল,”জল্লাদের মতো দেখতে এই মহিলাটা কে ইসরাত? এমন জল্লাদের মতো মুখ-চোখ কেন এই মহিলার?
নুসরাত আরো কিছু বলতে চাইল, ইসরাত একহাতে মুখ চেপে ধরল তার। খুব ভালোভাবে শুনেছেন কথাগুলো পুষ্পা, তাই গর্জারচ্ছেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, হাপিত্যেশ করে চিৎকার দিলেন,”ও আম্মা গো, হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ে আমায় জল্লাদ বলে দিছে। আম্মা গো, আপনি এর বিচার করেন, আম্মা আপনি কই?
নুসরাতকে রাম ধমক দিলেন নাছির সাহেব। চোখ পাঁকিয়ে বললেন,”স্যরি বলো, এক্ষুণি মামানিকে স্যরি বলো, অভদ্রতা করছ কেন উনার সাথে!
নুসরাত চোখ উল্টে নিল। কড়মড় করে বলল,
“চরি..!
স্যরি বলার মধ্যেই খান বাড়ির সবাই দলবদ্ধ ভাবে এসে ভীর জমিয়েছেন রুমে। নুসরাত তবুও নির্লিপ্ত রইল সবাইকে দেখে,, হঠাৎ রুমানা খাতুনকে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে সেন্টার টেবিল থেকে পা নিচে নামিয়ে নিয়ে ভদ্রভাবে বসতে বসতে বলল,”বড় মানুষের সামনে আমি আবার পা তুলে বসিনা।
কথাটা শেষ করে দাঁত কেলিয়ে হাসল। রুমানা খাতুনের মুখ বিতৃষ্ণায় তেতো হয়ে আসে, সেটা দেখেই নুসরাতের মনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল আলাদা প্রশান্তি।
বয়স্কার ইচ্ছে করল সোফা বসে দাঁত কেলিয়ে হাসা মেয়েটাকে আচ্চা মতো ধুয়ে দেওয়ার জন্য গলার কাছে দলা পাঁকাল কিছু বাক্য, কিন্তু ওই গা জ্বালানো হাসি, চোখের কপটতার কাছে হার মানলেন এই সময়ের জন্য। বললেন,”সকালের নাস্তা করবেন আসুন।
নাছির সাহেব কিছু বলার পূর্বেই নুসরাত কথা টান দিয়ে নিয়ে নিল। বলল,”খাব না, আমাদের নাস্তার জিনিস নিয়ে এসেছি আমরা। যে বাড়িতে নিজের নাত-বউকে সারারাত খাবার না খাইয়ে রাখা হয়, সেই বাড়ির দানা আমি আর আমার বাপ স্পর্শ করব না, সাথে আমার ভাই ও। তাই না?
আহান মাথা দোলাল উপর-নিচ একতালে। খিদেয় পেট চু চু করে উঠল, তবু্ও মাথা নাড়ানো একদম থামাল না, থামালেই উত্তম মাধ্যম সব পিঠে পড়বে। রুমানা খাতুন অসভ্য মেয়েটাকে দেখে নিয়ে ঢোক গিলে গলবিলে জমা হওয়া অযাচিত শব্দ আটকালেন। বললেন,”যা আপনাদের ইচ্ছে, আমরা তো আর জোর করতে পারিনা।
সবাই চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন, পুষ্পা যেতে যেতে মুখ ঝামটা দিতে ভুললেন না সবাইকে। নুসরাত হঠাৎ প্রশ্নাত্মক চাহনি নিক্ষেপ করল বাবার দিকে, শুধাল,”খিদে পেয়েছে?
নাছির সাহেব মাথা দোলালেন। মিনমিনে কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”খাবার খাবে তোমরা?
আহান বলে ওঠল,
“খাব কীভাবে, তুমি তো না করে দিলে।
নুসরাত হু হু করে হেসে উঠল। বলল,
“ তো কী হয়েছে, তখন আমাদের ইচ্ছে করেনি, এখন করছে, লেট’স গো।
নাছির সাহেব বললেন,
“লজ্জার একটা ব্যাপার আছে তো!
নুসরাত নাক ছিটকে বলল,
“ আব্বা লজ্জা নারীর ভূষণ, যেখানে আমি নারী হয়ে লজ্জা পাচ্ছি না, সেখানে আপনি পুরুষ হয়ে পাচ্ছেন কেন! চলেন, চলেন, পরে আবার খিদেয় অজ্ঞান টজ্ঞান হয়ে গেলে টানবে কে আপনাদের!
নুসরাত আগেভাগে লাফিয়ে চলে গেল রুমের বাহিরে , বেরিয়ে গিয়ে ফিরে আসলো আবার। ঝড়ের গতিতে এসে ইসরাতকে নিজের সাথে বগলদাবা করে আবারো বাতাসের গতিতে দৌড়াল। সিঁড়ি দিয়ে নামল বাঁদরের মতো। যখন এক-তলায় পৌঁছাল, তখন দেখল চেয়ার টেনে মাত্র বসতে নিয়েছে সবাই। এক পলক সবাইকে দেখে অবজার্ভ করল, নাকের ডগায় চশমা পরা ধবধবে ফর্সা মেয়েটাকে একটু ভালো করেই খেয়াল করল, মাথায় ধাক্কা দেওয়ার ব্যাপারটা আসতেই হেসে উঠল। ইসরাতের হাত ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেল চেয়ারের দিকে, মাত্র মেয়েটা চেয়ার টেনে ধরে বের করেছিল বসার জন্য, তার পূর্বেই নুসরাত তাকে এমন ধাক্কা দিল, মেয়েটা হোঁচট খেয়ে সরে গেল দূরে, পড়তে পড়তে বাঁচল কোনোরকম। আক্রোশ নিয়ে নুসরাতের পানে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ঠোঁট চোখা করে শ্লেষ মিশ্রিত আওয়াজে চুকচুক করল সে। চোখের পাতা ঝাপটে, কন্ঠে মেকি নমনীয়তা এনে বলল,”ওহ আমি খেয়াল করিনি, আপনি যে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আ’ম এক্সট্রিমলি…
বাকিটুকু গলার কাছে আটকে গেল, বের হলো না মুখ দিয়ে, সে আর চেষ্টা করল না বাক্যগুলো বের করার। নুসরাত চেয়ারটায় বসে নিজের আশপাশের সব চেয়ার টেনে দিল বাবা,বোন,ভাই বসার জন্য। খান বাড়ির কাউকে বসার সুযোগ না দিয়ে একে একে বসাল নিজের পরিবারের সবাইকে। লিপি বেগম আর হেলাল সাহেব পেছনের পুকুরের ওখানে, বসে বসে মাছ বরশিতে ধরা দেখতেছেন, তাই জানেন না এখানে কী হচ্ছে, বা কী পরিস্থিয়!
রুমানা খাতুন নিজের চেয়ারে বসতে বসতে কটাক্ষ করলেন,”বললে না যে, খাবে না, তাহলে এখন খেতে আসলে কেন?
নুসরাত ব্রেড হাত দিয়ে তিনটা নিজের প্লেট রাখল। ডিম পোচ করে রাখা ছিল তা চামচ দিয়ে না তুলে, ডান-হাতে থাবা মেরে নিয়ে নিল। যতটা হাতে উঠল ততটাই রেখে দিল নিজের প্লেটে।
রুমানা খাতুনের পাশাপাশি বসা আরশের পানে এক পলক তাকিয়ে জানতে চাইল,”আরশ ভাই নিবেন?
আরশ ভ্রু উচাল, জানতে চাইল,
“কী।
নুসরাত নিজের হাতের মুঠিতে পৃষ্ট ডিম পোচ বের করে একটা দুমড়ে মুচড়ে মুখে ঢুকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল,”আন্ডা ভাজি!
আরশ লাগবে না বলতে গিয়ে চোখ থামল ডিমের পিরিচে।৷ একটা ও নেই সেখানে ডিম, সবগুলা নুসরাতের হাতের মুঠিতে।
আরশের চোখের দৃষ্টি লক্ষ করে নুসরাত উপরের পাটির দাঁত বের করে হাসল। ভ্রু উচিয়ে ইশারায় বোঝাল,’নিবেন?
আরশ শীতিল চোখে দেখল কিৎকাল নুসরাতকে। ঠান্ডা কন্ঠে বলল,”দাও!
রুমানা খাতুন চুপচাপ থেকে,তীক্ষ্ণ চোখে, এতক্ষণ যাবত অগোছালো মেয়েটাকে খেয়াল করছিলেন। চামচ থাকতেও ইচ্ছে করে হাত দিয়ে স্পর্শ করছে খাবার গুলো, যাতে অন্যরা না খায়। কন্ঠে অগাধ রাগ চেপে জিজ্ঞেস করলেন,”হাত ধুয়েছ তুমি?
নুসরাত নিজের চেয়ারে বসে ডিম রাখল নিজের প্লেটে। হাতের তালু টিস্যু দিয়ে মুছে নিয়ে বলল,”ভুলে গেছি।
আরশ মাত্র মুখে নিয়েছিল ডিম পোচ, কথাটা শোনা মাত্র থমকাল। চোখ মুখে ফুটে উঠল অগাধ বিস্ময়, পাশ ফিরে তাকিয়ে শুধাল,”হ্যান্ড ওয়াশ করোনি তুমি?
নুসরাত ঠোঁট উল্টে ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,
“আজ আমি ব্রাশ-ই করিনি, হ্যান্ড ওয়াশ করব কখন ভাই। খেয়ে নিই, হাত ধুয়ে নিব, সাথে দাঁত ও।
রুমানা খাতুন খাবার খাওয়া রেখে উঠে দাঁড়ালেন। খাবার রুম থেকে প্রস্থান নিতে যাবেন, নুসরাত আক্ষেপ করে বলল,”এই বয়সে না খেয়ে উঠে যাচ্ছেন কেন, যেখানে সেখানে…
আরশ শক্ত কন্ঠে রাম ধমক দিল,
“শাট-আপ বেয়াদব!
নুসরাত আবার কিছু বলতে যাবে নাছির সাহেব হাতে থাপ্পড় দিলেন। চোখ রাঙালেন ক্ষোভ নিয়ে, আরশ শাসাল,”উইল ইউ শাট দ্যা হেল আপ ফর আ মোমেন্ট?
আরশের ধমকের ভেতর রুমানা খাতুন না খেয়েই চলে গেলেন খাবার রুম থেকে। এরপর তুলি, সার্থ, পলি, পুষ্পা ও প্রস্থান নিলেন। নাছির সাহেব বিক্ষোভ নিয়ে বললেন,”চলো বাসায় চলো, তোমার আর এখানে থাকতে হবে না।
নুসরাত ব্রেডে আরাম করে বাটার লাগিয়ে কামড় বসাল। বাপের কথা কানে না তুলেই আহানকে উদ্দেশ্য করে বলল,”জেলি দে তো ভাই আমাকে, খিদেয় চোখ মুখে অন্ধকার দেখতেছি, খেয়ে দেয়ে যাবনে বাড়িতে। এখন শান্তিমতো খেতে দাও আব্বা।
আহান নুসরাতের দিকে জেলি পাস করতেই তা ব্রেডে বাটার নাইফ দিয়ে লাগিয়ে নিল। দু-কামড় মেরে অর্ধেক খেয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ ফলার মতো চোখে তাকানো আরশকে দেখল। নিষ্পাপ মুখে জানতে চাইল,”খাবেন আরশ ভাই?
আরশ হা করে মুখ খুলতেই আধখাওয়া ব্রেড আরশের মুখে ঢুকিয়ে দিল৷ বলল,”বুঝেছি খিদে আপনার ও ব্রেইনে উঠে গেছে, আগে পেট ঠান্ডা করুন আরশ ভাই। যদি পেট ঠান্ডা থাকে তাহলে মন মেজাজ সব ঠান্ডা থাকবে একদম আমার মতো।
আরশ প্রলুব্ধ নিঃশ্বাস ফেলল। হিসহিসিয়ে বলল,
“তোমাকে সহ্য করা খুব কঠিন কাজ নুসরাত।
“এই জন্য-ই তো আমি নুসরাত নাছির।
আরশ নিষ্প্রাণ চোখে দেখল তাকে জ্বালানোর জন্য খিটখিট করে হাসা মেয়েটাকে। চেয়ার টেনে বসতে বসতে, জিজ্ঞেস করল,” মানুষকে জ্বালিয়ে তোমার কী মিলে?
“শান্তি।
আরশ ভ্রু কুটি করে জানতে চায়,
“ সত্যি শান্তি মিলে?
“অবশ্যই! চেষ্টা করেই দেখতে পারেন আপনি।
আরশের ঠোঁটের কোণে মারাত্মক হাসি দেখা গেল।। নাছির সাহেব খাবার রেখে চলে যেতে চাইলেন, নুসরাত টেনে বসাল। বলল,”পেট ভরে খান আব্বা, প্রথমবার মেয়ের নানা শ্বশুর বাড়ি এসেছেন।
ইসরাত নুসরাতের মুখোমুখি চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করল,“ সত্যি দাঁত ব্রাশ করিসনি?
নুসরাত গলার কাছে হাত চেপে ধরল। ঠোঁট টিপে হেসে নিয়ে আওড়াল,”আল্লাহির কসম, ব্রাশ করিনি আজ।
আহান হেসে ফেলল৷ বলল,
“আপু খেয়ে দেয়ে দাঁত ব্রাশ করবে।
পরপর আবার খেতে মনোযোগী হলো। নাছির সাহেব সবার মতো আরামে খেতে পারলেন না, কপালে চিন্তার বলিরেখা তীব্র উনার। এই মেয়ের মুখটা আল্লাহ একটু কেন যে সংযত করে দিল না, সেটা ভেবেই আফসোস হলো। নুসরাত বিশেষ পাত্তা দিল না বাবাকে, জন্মের পর থেকে দেখতেছে তাকে নিয়ে চিন্তা করতে, এসব আমলে নেওয়ার কোনো বিষয়-ই না। প্লেট থেকে তুলে ডিম পোচ মুখে ঢোকাতে যাবে আরশ নিয়ে নিল। নুসরাত হাসল, আবারো ডিম তুলে মুখে নিতে যাবে আরশ তার মুখের খাবার কেড়ে নিয়ে নিজের মুখে ঢুকিয়ে নিল। নুসরাত তাকাতেই, ভ্রু কুঞ্চন করে প্রশ্ন করল,”রাগ হচ্ছে?
নুসরাত ঠোঁট এলিয়ে মেকি হাসল। বলল,
“একদম না, ছোট খাটো বিষয়ে আমি মোটেও রাগ করিনা।
খুবই সন্তর্পণে ব্রেড হাতে নিল। আলগোছে মুখে ঢোকানোর আগেই আরশ তা কেড়ে নিল। নুসরাত হিংস্র বাঘিনীর মতো দেখল গম্ভীরতা এঁটে খাচ্চরের মতো বসে থেকে ব্রেড খাওয়া লোকটাকে। তার মুখের ভঙ্গি এমন সে শিকারী আর তার মুখ থেকে শিকার ছিনিয়ে নেওয়া তৃতীয় পক্ষ আরশ। শ্রবণেন্দ্রিয় প্রতিধ্বনি হলো আবার,”রাগ হচ্ছে?
নুসরাত ঠোঁট টেনে হাসল কৃত্রিম। বলল,
“একদম না, মোটেও না।
আরশ নুসরাতের নাকের ডগায় হাত দিয়ে টোকা দিল, তারপর ঠোঁটের উপর আঙুল ছুইয়ে চিন্তিত হওয়ার ভান করে বলে,”তাহলে নাক ঠোঁট কাঁপছে কেন? রাগ করছ তুমি কোনো বিষয় নিয়ে?
“না একদম-ই না, রাগ এত সহজে কেউ করে।
আরশ নিজের ঠোঁটে ঠোঁট চাপল। ধারাল থুতনিতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,” সত্যি রাগ করছ না?
নুসরাত আরশের চোখে চোখ রাখল। আক্রোশ, ক্ষোভ, রাগ চেপে যেতে চাইল হলো না। গলার কাছে মোটা মোটা গালি কয়েকটা জমা হলো, তবুও তা দিল না। ঢোক গিলে শুধাল,”আমাকে রাগানোর চেষ্টা করছেন কেন আরশ ভাই?
আরশ মেকি ভাবনার অতলে হারিয়ে যাওয়ার নাটক করল। টেবিলের উপর কব্জা রেখে হাতের তালু নিজের গালে রাখল। গ্রীবা বাঁকিয়ে নুসরাতকে দেখে নিয়ে নিষ্পাপ কন্ঠে বলল,”সত্যি,আমি তোমাকে রাগানোর চেষ্টা করছি নুসরাত, কিন্তু কীভাবে?
নুসরাত ক্ষেপল ষাঁড়ের মতো। যদি অভ্যন্তরীণ ধোঁয়া বের হতে দেখা যেত ,তাহলে রাগে নুসরাতের কান দিয়ে লাল লাল ধোঁয়া বের হতে দেখা যেত। আরশের গম্ভীয় মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,”আমি তাহলে রেগে যাচ্ছি কেন আরশ ভাই?
আরশ নির্বিকার চিত্তে কাঁধ ঝাঁকাল। পুরুষালি পুরু ঠোঁট চেপে আবারো ভাবনাতিত হলো। অতঃপর বলল,”সেটা তুই জানিস, আমি কী জানি!
গাল ফুলিয়ে অবিরাম বিড়বিড় করল কিছু একটা সে। তারপর বলল,“আরশ ভাই আমার পিছনে লাগা বন্ধ করুন, আমি রেগে যাচ্ছি।
আরশ অক্ষিকোটরের মধ্যে শীতিলতা। ভ্রুক্ষেপহীন কন্ঠে বলল,”আমি তোর পিছনে কখন লাগলাম, আমি তো তোর পাশে বসে আছি, এই যে, এই দেখ!
নুসরাত রাগে অন্ধ হয়ে গেল। শান্তিমতো খাবার খাওয়ার মুড চলে গেল নিমেষেই। ধুপ করে উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল সদর দরজার দিকে৷ ত্রিশ সেকেন্ড পর আবার ফিরে এসে চেয়ার টান মেরে শব্দ করে বসে পড়ল। ভাবলেশহীন মুখে টেবিলের উপর রাখা এক এক করে সব খাবার তুলে নিয়ে চেকে দেখল। আরশের পানে তাকিয়ে গা দুলিয়ে হেসে, ভ্রু উচিয়ে জানতে চায়,”খাবেন আরশ ভাই!
জায়িন খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে মাছ ধরতে ভীষণ ব্যস্ত। ঘন্টাখানেক পরপর ফোন দিয়ে ইসরাতের খবরাখবর নিচ্ছে, কোনো অসুবিধা হলে জানাতে বলছে। ইসরাত না করেছে তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, তবুও জায়িন প্রত্যেক বার একই প্রশ্ন করছে কল দিয়ে।
সকালের নাস্তা করেছে বেশিক্ষণ হয়নি, এর মধ্যে নুসরাতের খিদে পেয়ে গেছে, তাই ইসরাতের জন্য যে ফলগুলো নিয়ে আসছিল সে নিজেই একা তা সাবার করে ফেলছে। ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে হেঁটে হেঁটে খেতে গিয়ে আকস্মিক আবারো মুখোমুখি হলো পুষ্পার। নুসরাত নাক ছিটকে পথ করে দিল যাওয়ার, মহিলা তবুও গেলেন না। অনেকক্ষণ তার উপর থেকে নিচ দেখেন, তারপর নিজের অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য ছুঁড়ে দিলেন,”এ বাড়ির ব্যাটা মানুষ তোমার চোখে লাগে না?
নুসরাত ভ্রু উচিয়ে, না শোনার ভান করে জিজ্ঞেস করল,“জ্বি, কী বললেন?
পুষ্পা বিরক্ত হয়ে আবারো একই কথা বললেন,
“চোখে ব্যাটা মানুষ লাগে না তোমার?
নুসরাত নির্লিপ্ত কন্ঠে উত্তর দিল,
“চোখে কম দেখি বলেই তো চশমা পরি! কানা নাকি!
একটু থেমে শান্ত কন্ঠে বলল,
“চোখের পাওয়ার মাইনাসে প্লাসে চলছে তাই আজকাল ব্যাটা বেডি সব একই লাগে।
পুষ্পা অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিতে গিয়ে থেমে গেলেন। কারণ নুসরাতের মুখ দেখে ধারণা করে নিয়েছেন ইসরাতের মতো গালি দিলে ছেড়ে দিবে না এই মেয়ে, তার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়বে। বড় মানুষ বলে ছাড় দিবে না একটু ও। তাই আর কিছু না পেয়ে নুসরাতের পরণের কাপড়ের দিকে আঙুল তুলে বলললেন,”লজ্জা লাগে না, ব্যাটা মানুষের মতো কাপড় পরতে?
পুষ্পার কথা কানে যেতেই ঘাড় কাত করে হাসল সে। ক্রপ টপের গলা কাঁধ থেকে সরিয়ে অন্তবার্সের স্টেপ দেখিয়ে এলানো আওয়াজে বলল,”ব্যাটা মানুষ ব্রা পরে না, আমি পরি।
পুষ্পা বিব্রত চোখ-মুখে পেছনে তাকালেন। অতঃপর তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন৷ নুসরাত ঘাটাল না আর মহিলাকে, শালি গেছে এই বেশ, শ্বাস গহ্বরে জমা হওয়া দলা পাকানো শ্বাস নিঃসৃত করে পিছু ফিরতেই নাক, ঠোঁট, কপাল, ধপাস করে ঠেকল কারোর বুকে। সুরসুর করে নাকে তীব্র কুস্তুরীর ঘ্রাণ যেতেই নুসরাত বুঝে নিল এটা কে! হাতের তালুতে নাক ডলে দূরত্ব বাড়িয়ে নিল। বিতৃষ্ণায় ভ্রুকুটি করে হরবরিয়ে বলে ওঠল,”আরশ ভাই, আপনার শরীর নিয়ে আমার থেকে দূরে থাকবেন, কুস্তুরীর গন্ধ আমার সহ্য হয় না। নাক ব্যথা করে, গলা জ্বলে, চোখে উল্টে বমি এসে যায়, মাথা চক্কর দেয়, তখন মাথা চক্কর দিয়েছে কেন জানেন, আপনার এই শরীরের গন্ধে।
ফটাফট কথা শেষে সামনে পকেটে হাত পুরে দাঁড়িয়ে থাকা আরশের লাল হয়ে যাওয়া চোখ মুখ দেখল। অপমান করে ফেলেছে মনে হতেই পা টিপে টিপে আলগোছে কেটে পড়তে নিবে আরশ হাত বাড়িয়ে ঘাড় চেপে ধরল। টেনে এনে দাঁড় করাল নিজের সামনে। শক্ত কন্ঠে হিসহিসিয়ে শুধাল,”কী বললি তুই, গন্ধ! বোকারহদ্দ এটা প্রাকৃতিক ঘ্রাণ, মানুষ হাজার হাজার টাকা খরচ করে কিনে গায়ে মাখে কুস্তুরীর সুভাস যুক্ত পারফিউম, আর তুই গন্ধ বলছিস?
নুসরাত আরশের হাত টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। মৃদু আর্তনাদ করে উঠল ব্যথায়। ঠোঁট বেয়ে অস্ফুটে উচ্চারণ হলো,”ব্যথা পাচ্চি আরশ ভাই, ছাড়ুন।
আরশ ছাড়ল না, আরেকটু চেপে ধরল নুসরাতের ঘাড়। হিসহিসিয়ে কিছু বলতে নিবে নুসরাত ঠোঁট কুঁচকে ফটাফট বলে উঠল,”বোকারহদ্দ বলবেন না একদম, আমার আই কিউ লেভেল ১৮০+…
“এজন্য হাঁটুর দু-হাত নিচে বুদ্ধি..!
নুসরাত কটমট করে ওঠে নিজের ব্যথা ভুলে যায়, নাক ফুলিয়ে আরশের পিঠ খাঁমচে ধরে, ভেঙচানো হিসহিসিয়ে আওড়াল,”তাহলে আপনার বুদ্ধি হাঁটুর দু-হাত উপরে।
আরশ হু হু করে হেসে উঠল। কন্ঠস্বর নিরুত্তাপ, উদাসীন রাশভারি কন্ঠে আওড়ায়,”সঠিক, আমার হাঁটুর দু-হাত উপরেই বুদ্ধি বলে আমার মগজ এখনো কাজ করে।
নুসরাত চ্যাঁচিয়ে উঠল,
“আপনি বলতে চাইছেন আমার মগজ চলে না, অচল?
আরশ ছেড়ে দিল নুসরাতের ঘাড়। নুসরাত নির্দিষ্ট দূরত্বে সরে যাবে তার পূর্বেই আরশ আবারো থাবা মেরে বাঁ-হাতে মাথা চেপে টেনে নিয়ে আসলো নিকটে। গ্রীবা বাঁকিয়ে ঝুঁকে এসে ডান-হাতে নুসরাতের মাথায় তর্জনী আঙুল দিয়ে টোকা দিল। নিজেদের ভেতর ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা ফাঁক রেখে স্পষ্ট স্বরে সিসা কানে ঢেলে দেওয়ার মতো শব্দে উচ্চারণ করল,”এটা বোঝার জন্য যেটা প্রয়োজন, সেটা তোর এখানে নেই।
নুসরাত চিরবির করে উঠে জানতে চাইল,
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪৫
“কী নেই?
শান্ত স্বর কানের কাছে প্রতিধ্বনি হলো,
“মস্তিষ্ক!
রাগে ঠোঁট কাঁপল মেয়েটার। ঠোঁট চেপে, শ্বাস ফেলল ঘোৎ ঘোৎ করে। নাক ফুলিয়ে, রাগান্বিত স্বরে ডাকল,”আরশ ভাই…
প্রতিত্তোরে নির্জীব কন্ঠে উত্তর আসলো,
“জ্বি হ্যাঁ নুসরাত নাছির…

Next part ta taratari dio
এই পার্ট টা যেমন তারাতারি দিছেন নেক্সট পার্ট টাও তারাতারি দিবেন প্লিজ প্লিজ 🙏