ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৯
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
“হ্যাঁ বল প্রিয়স্মিতা, প্রিয়তাকে জানিয়েছিস কি বলেছে ও?”
ইরফানের উদ্বেগ অবলোকন করে খানিক দ্বিধায় পড়ল প্রিয়স্মিতা। তবে নিজের দোষ ধরার সুযোগ দিল না। থমথমে গলায় বললো—
“না, এখন অবধি তো নয়। তবে ভাবছি জানাবো, কিন্তু কতটা কাজ হবে সে বিষয় আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”
“হোয়াট! তুই এখনো বলিস নি! পুরো ২৪ ঘন্টা হয়ে গেছে আর কবে বলবি?”
ইরফান খানিক রেগে গেলো।
প্রিয়স্মিতা শান্ত থেকে বললো—
“এটা পুলিশ স্টেশন বা বিউরো নয় ভাইয়া। এখানে সুযোগ আর পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে হয়, নাহলে একটা রং গুটি পুরো দাবার চাল ওলট পালট করে দেবে।
আমার মনে হচ্ছে আমাকে কয়েকজন সন্দেহ করছে। তাছাড়া প্রিয়তাকে সবটা জানালেও যে কতটা কাজের কাজ হবে তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”
“যথেষ্ট সন্দেহ আছে মানে কি বলতে চাস?”
প্রিয়স্মিতা স্থির হলো। কণ্ঠে উগ্রে এলো হতাশা। দম নিয়ে বললো—
“এটাই যে আমার মনে হচ্ছে না, জানালে ও বিশেষ কোনো লাভ হবে। ওর তাল দিন দিন আরও বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে ওর অবসেশন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।”
চিন্তিত কণ্ঠে শুধালো ইরফান—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“তোর কী মনে হচ্ছে, প্রিয়তা কী মানুষ হিসেবে এতটাই নিচ হবে যে সবটা জেনে শুনে একজন অপরাধীকে বাঁচাতে চাইবে? তাও এমন একজন অপরাধী যার জন্য প্রতিদিন কত শত মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে?”
ইরফানের কথায় না হেসে পারলো না প্রিয়স্মিতা।
তাচ্ছিল্যের সুরে বললো—
“প্রেম ভালোবাসা যে জন্মান্ধ, এটাতো দুনিয়াতে নতুন নয়। যারা সত্যি ভালোবাসে তারা তাদের মানুষটাকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনে দুনিয়া ছেড়ে দেয়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ নিকৃষ্ট কাজটাতে ও লিপ্ত হয়ে যায় ভালোবাসাকে পেতে। কারো প্রাণ নিয়ে নিতেও দুবার ভাবে না। আর আমি আমার বোনকে যতটুকু চিনি, আবরার সিকদার প্রণয় যদি তার প্রাণটাও চায়, আমার বোন দ্বিধা করবে না। তাই অন্য একটা জিনিস ভেবেছি।”
“কি?”
এবার ঠোঁটের কোণে দুর্বৃত্ত হাসি খেলে গেলো প্রিয়স্মিতার। ঘাড়ের পিছে হাত রেখে রহস্যময় কণ্ঠে বললো—
“আমাদের কথা এএসআর আর তার র্যাকেটকে নিশ্চিহ্ন করা নিয়ে। তার আতঙ্ক থেকে দেশ ও দশকে রক্ষা করা নিয়ে। এটাই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু সেটা কিভাবে করা হচ্ছে, দেখার বিষয় নয়।”
“মানে?”
জবাবে হাসলো প্রিয়স্মিতা—
“বলছি। কিন্তু কালকের জন্য যেন কি প্ল্যান করে রেখেছিলাম?”
“ওই তো কাল ভোর রাতে এএসআর এর সব গুলো অফিস আর ফার্মহাউস এ এক সাথে রেড হবে—একদম অতর্কিতে।”
“কি মনে হয়, লাভ হবে?”
কপাল কুঁচকে এলো ইরফানের। জোর দিয়ে বললো—
“অবশ্যই কিছু না কিছু তো পাওয়া যাবেই।”
প্রিয়স্মিতা দায়সারা কণ্ঠে বললো—
“বেকার বেকার পন্ডশ্রম। ঘণ্টা পাওয়া যাবে। আমার কাছে সব ইনফরমেশন আছে—এএসআর অফিস আর বাড়িতে কিছুই নেই।”
“এত নিশ্চিত কিভাবে?”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো প্রিয়স্মিতা—
“এই বাড়ির রহস্যের শিকড় অনেক নিচে, ইরফান। শেখ আবরার সিকদার প্রণয়কে আপনারা কেউ চিনতে পারেননি। কিন্তু সে হয়তো ভুলে গিয়েছিল—আমি ও এই বাড়ির মেয়ে। একই বংশের, একই রক্ত বইছে আমার গায়ে। কেউ চিনুক বা না চিনুক, আমি ঠিকই চিনেছি। এই বাড়ির রহস্য জানতে হলে মাটির অনেক গভীরে পৌঁছাতে হবে, যার সন্ধান আজ পর্যন্ত কেউ পায় নি।”
“সেটা কোথায়?”
“টার্কি।”
“হোয়াট!”
“ইয়েস। এএসআর এর সব চক্রের উৎস টার্কি…
যদি ও শুধু এএসআর নয়, এই পুরো বাড়িটাই ১০৮ হাত পাপের নিচে চাপা পড়ে থাকে, তবে এসব পরে। আগে প্রণয় শিকদার যেটা বলছিলাম—প্রণয় শিকদারের সব কালো বাজারি বিজনেস, সব কিছু পরিচালনা করা হয় টার্কি থেকে। ওটাই মেইন।
টার্কির রাইট লোকেশন খুঁজে বের করে রেড করলে ওখানেই সব পাওয়া যাবে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই—অফিশিয়ালি টার্কি তে এএসআর এর বিজনেস এর কোনো রেকর্ড নেই। কোথায় আর কখন রেড করতে হবে জানি না।”
দুশ্চিন্তা বাড়লো ইরফানের। কপাল ঘষে জানতে চাইলো—
“তাহলে উপায়?”
“উপায় একটাই—প্ল্যান বি।”
“সেটা কি রকম?”
প্রিয়স্মিতার চোখে মুখে সেই একই হিংস্রতা ফুটে উঠলো, যা প্রায়শই প্রণয়ের চোখে মুখে দেখা যায়। সে কিঞ্চিত জটিলতা রেখে বললো—
“এএসআর এর আতঙ্ক থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হবে। সব চক্র উপরে ফেলতে হবে। তার এএসআর কে মারতে হবে—সব ঠিক আছে। কিন্তু দেশ জানিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে মারার তো কোনো দরকার নাই।”
“মানে?”
“মানে আমার বোনের বিষয়ে আমি কোন রিক্স নিতে পারব না। সবাইকে জানিয়ে প্রণয় শিকদার কে ফাঁসির দড়িতে ঝুলালে আমার বোনকে কোনভাবেই আর সামলানো যাবে না। মানসিক ভাবে সম্পন্ন ঘুরিয়ে যাবে, মরে ও যেতে পারে।
এর থেকে ভালো—অতর্কিতে মেরে ফেলো। সবাই জানবে এটা একটা দুর্ঘটনা। কিন্তু সরকারি রেকর্ডস এ লেখা হবে—এটা এনকাউন্টার সি১২ থ মিশন।”
ইরফানের কণ্ঠস্বর শান্ত—
“তুমি কার সম্বন্ধে বলছো জানো তো, প্রিয়স্মিতা। এ কোনো ছিঁচকে চোর নয়, যাকে তুমি রাস্তা ঘাটে ধরে অতর্কিতে মেরে ফেলবে। হি ইজ এ মোস্ট পাওয়ারফুল ক্রিমিনাল ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।”
“আই নো। কিন্তু সরকার যেভাবে ধরবে বলে চিন্তা ভাবনা করছে—ট্রাস্ট মি—ওভাবে কোনো দিন ও প্রণয় শিকদার কে ধরতে পারবে না। ধরতে পারলেও কিছু প্রমাণ করতে পারবে না।
এই সব ক্রিমিনাল রা যদি নিজে থেকে না চায়, তবে কোনো প্রুফ, কোনো এভিডেন্স এদের কিচ্ছু করতে পারে না। এদের মারতে হলে আগে এদের অপরাধ প্রমাণিত করতে হয়, যা প্রায় অসম্ভব এর কাছাকাছি।”
ইরফান প্রিয়স্মিতার কথায় যুক্তি খুঁজে পেল—
“সেটা ঠিক বলেছো। কিন্তু এএসআর কে এভাবে এনকাউন্টার করা এতো সহজ নয়। তাকে কিভাবে পাবো, কোথায় পাবো—এর জন্য সলিড প্ল্যান দরকার।”
“আই হ্যাভ এ প্ল্যান।”
“কি?”
প্রিয়স্মিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে সবটা ভেবে নিয়ে বললো—
“আমার কাছে খবর আছে, প্রণয় শিকদার কাল তুরস্কে যাচ্ছে—তার আসল সাম্রাজ্যে। এএসআর সেজে নয়—আবরার শিকদার প্রণয় সেজে, একদম সাধারণ ভেসে। সাথে কোনো গার্ডস থাকছে না।
ওটাই একমাত্র গোল্ডেন অপরচুনিটি। ওখানেই ধরে তাকে এনকাউন্টার করে দাও। ব্যক্তি তো চেনো। ধরে এনকাউন্টার করে দাও। পরে দেশ জুড়ে টেরোরিস্ট অ্যাটাক বলে চালিয়ে দেবো।
এএসআর এর আতঙ্ক ও মুছে যাবে, আর আমার বোন কে ও বুঝিয়ে নেব যে এটা একটা দুর্ঘটনা। তারপর বছর দুয়েক পর ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেবো—”
কথা শেষ করতে পারলো না প্রিয়স্মিতা। দরজায় করাঘাতের শব্দে কেঁপে উঠলো।
দ্রুত ফোন কেটে মোবাইলটা লুকিয়ে ফেললো প্রিয়স্মিতা।
বাহির থেকে প্রিয়তার কণ্ঠ—
“আপু! এই আপু! দরজা খোল। কে যেন তোর সাথে দেখা করতে এসেছে এই আপু।”
প্রিয়স্মিতা বুক ভরে লম্বা শ্বাস টানলো। চোখ মুখ স্বাভাবিক করে দরজা খুলে দিয়ে ঝাড়ি মেরে বললো—
“কি পাগলা কুত্তা কামড় দিছে তোকে? এমনে হাঁপাচ্ছিস কেন?”
প্রিয়তা দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে লম্বা শ্বাস নিলো। এক সাথে চার তলা ডিঙিয়ে কোমরটা টন টন করছে বেচারির।
প্রিয়স্মিতা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে দেখলো ওর অবস্থা।
প্রিয়তা দম ফেলে সোজা হয়ে বললো—
“কখন থেকে ডেকে মরছি তোমায় আপু।”
“এতো ডাকাডাকি করছিস কেন?”
প্রিয়তা কোমরে হাত রেখে এক ভ্রু তুলে বললো—
“কেন ডাকছি সেটা তো একটু পরেই টের পাবে।”
“মানে?”
“মানে তোমার এক্স বাড়িতে এসে হাজির। তোমার বর ও ডাকাডাকি শুনে ড্রয়িং রুম এ পৌঁছে গেছে। তোমাকে বাঁশঝাড়ের আগাম শুভেচ্ছা। তুমি শুধু একটা বাঁশ না—পুরো ঝাড় খেতে চলেছো।”
প্রিয়তা কথা শ্রবণ করে বেকুব বনে গেলো প্রিয়স্মিতা। মুখ লটকে বললো—
“আমার এক্স?”
প্রিয়তা উপর নিচ মাথা দুলালো।
“চল তো দেখি।”
ড্রয়িং রুমে মুখোমুখি বসে আছে শুদ্ধ ও নির্বাণ। তবে নির্বাণের উপস্থিতিতে অতটা ও ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না শুদ্ধর মধ্যে; যতটা না ব্যথা বেদনা ফুটে উঠেছে নির্বাণের চোখে-মুখে।
শুদ্ধ শান্ত চোখে চেয়ে দেখলো সামনে বসা ২৫-২৬ বছর বয়সী ছেলেটার দিকে। ছেলেটাকে বেশ সুদর্শন বলা চলে, হয়তো অরণ্যের বয়সী। শুদ্ধ নমনীয় কন্ঠে শুধাল—
“তাহলে তুমি প্রিয়স্মিতার সিনিয়র বন্ধু?”
নির্বাণের চোখ ভরে উঠল। অসহ্য যন্ত্রণায় গলায় কান্নারা দলা পাকিয়ে আসছে, কণ্ঠনালী দিয়ে চেয়েও শব্দগুচ্ছ বের করতে পারছে না। বুকের ভেতরের বিশাল একটা অংশ জুড়ে অসহ্য ব্যথায় টনটন করছে। শুদ্ধর সামনে বসে থাকতে পারছে না, ভেতর ভেতর ছটফটিয়ে উঠলো নির্বাণ।
যে মানুষটা বিশ্বাসঘাতকতা করলো ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তার হলো না, অযথা সেই মানুষটার সংসারে ভুল বোঝাবুঝি বা ঝামেলার সৃষ্টি করতে চায় না নির্বাণ। সে তো কেবল দেখতে এসেছে—বেইমানি করে ও মানুষ কতটা সুখে থাকতে পারে।
শুদ্ধর ঈগল চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে বাদ যায় না কোনো কিছুই। যার লুকোনোর চেষ্টায় মরিয়া নির্বাণ, তার সবটাই দেখলো শুদ্ধ। তবে এতে তার আর কী! বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালো না শুদ্ধ।
কৌতূহল দমিয়ে নিচে পা রাখতেই থমকে গেল প্রিয়স্মিতা। চোখের সামনে দন্ডায়মান নির্বাণকে দেখে মুখের রা হারিয়ে গেল যেন। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে—সে নির্বাণকে মোটেও আশা করেনি।
প্রিয়তা ধীরে এসে পাশে দাঁড়াল। প্রিয়স্মিতাকে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল নির্বাণ। চোখের কোটর ভর্তি হয়ে এলো নোনা পানিতে। বুকের ভেতর তোলপাড় করে উঠলো অবাধ্য অনুভূতিগুলো। মন চাচ্ছে ছুটে গিয়ে জাপ্টে ধরতে ওই নিষ্ঠুর রমণীকে, কিন্তু মস্তিষ্ক মনে করিয়ে দেয় তার অবস্থানের কথা।
প্রিয়স্মিতা এদিক-ওদিক চোরা দৃষ্টি ফেলে তাকালো নির্বাণের দিকে। পাশে শুদ্ধকে বসে থাকতে দেখে ঘাবড়ে গেলো মেয়েটা। ভয় পেলো ভীষণ—নির্বাণ যদি এবার উল্টোপাল্টা কিছু বলে দেয়!
শুদ্ধ বিস্তর হেসে হাতের ইশারায় ডাকে প্রিয়স্মিতাকে। মিছে আহ্লাদ দেখিয়ে বললো—
“আরে বেগম, তুমি উপরে কী করো? দেখো, বাসায় তোমার মেহমান এসেছেন।”
প্রিয়স্মিতা ঘামতে শুরু করলো। মুহূর্তেই ভিজে উঠল ঘাড়, গলা, পীঠ। গুটি গুটি পায় এগিয়ে গেলো শুদ্ধর নিকট। চোখ তুলে তাকানোর সাহস হলো না নির্বাণের পানে।
প্রিয়স্মিতাকে টেনে পাশে বসালো শুদ্ধ। নির্বাণের দিকে তর্জন তুলে বলল—
“হ্যাঁ, তো তুমি কী যেন বলছিলে—তুমি সেজো মামুর বন্ধুর ছেলে, একই অ্যাপার্টমেন্টেই থাকতে?”
“জ্বী।”
হাসলো শুদ্ধ। কৌতুক করে বলল—
“হ্যান্ডসাম গায়! নাইস টু মিট ইউ। তো এখন কী করছ? পড়াশোনা তো শেষ নিশ্চয়ই?”
ভেতরটা পুড়ে গেলে ও বহু কষ্টে নিজেকে দমিয়ে রাখলো নির্বাণ। প্রত্যুত্তরে বললো—
“জ্বী, গত বছর ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করেছি। বাই দ্য ওয়ে, আপনাদের একসাথে খুব সুন্দর মানিয়েছে।”
নির্বাণের ছাই ছাপা আগুন দেখে মনে মজা পেলো শুদ্ধ। যাক, কেউ তো আছে তার মতো। বাঁকা হেসে প্রিয়স্মিতার নিকট এগিয়ে আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো শুদ্ধ। আঙুলের ফাঁকে আঙুল গুঁজে বলল—
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
অস্বস্তিতে পড়ে গেল প্রিয়স্মিতা। নির্বাণের সারা শরীর ঝা ঝা করে উঠল এমন দৃশ্যে ।অজান্তেই চোখ গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা নোনা জল।
নিজেকে সামলে নিয়ে হাসার চেষ্টা করলো নির্বাণ। প্রিয়স্মিতার পানে চেয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—
“আমি কিন্তু খুব কষ্ট পেয়েছি চড়ুই।”
চট করে চোখ তুলে তাকাল প্রিয়স্মিতা। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো ভয়ে। শুদ্ধ একটু অবাক হওয়ার ভান করল—
“কেন?”
“এই যে চড়ুই আমাকে তার নির্বাণ ভাইকেই তার বিয়েতে দাওয়াত করলো না! অন্তত একবার জানাতে তো পারত। আমি আসি বা না আসি, মন ভরে দোয়া করে দিতাম।”
কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ফোন বেজে উঠলো শুদ্ধর। শুদ্ধ তড়িঘড়ি করে ফোনটা রিসিভ করে বলল—
“ওহ! জাস্ট এ ফিউ মিনিটস গাইস, আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল আসছে। তোমরা কথা বলো?”
বলে ফোন কানে নিয়ে উঠে চলে গেল শুদ্ধ।
কিছুদূর এগিয়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পুনরায়। প্রিয়তা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে নির্বাণ ও প্রিয়স্মিতার দিকে। একটুখানি হাসল শুদ্ধ। কাছে গিয়ে আলতো করে টোকা দিল প্রিয়তার মাথায়। কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বলল—
“ওভাবে কী দেখো প্রিয়া?”
গভীর মনোযোগ সহকারে চেয়ে প্রিয়তা বিধায় আচমকা গভীর কণ্ঠ শুনে লাফিয়ে উঠল। পাশ ফিরে তাকাতেই চোখ আটকালো শুদ্ধর ধূসর রঙা চোখের মনিতে। মুখের উপর ঝুঁকে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে শুদ্ধ।
আপনাআপনি মাথা নিচু হয়ে গেল প্রিয়তার। এই একটা মানুষ যার থেকে সে সর্বক্ষণ পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। কেন জানি এই মানুষটার চোখের সাথে চোখ মিলাতে পারে না। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়। মনের কোথাও একটা গভীর অপরাধবোধ কাজ করে। প্রিয়তা নিজের মনকে বুঝানোর অনেক চেষ্টা করে যে সে কোনো ভুল করেনি, এসবে তার কোনো দোষ নেই আর না তার প্রণয় ভাইয়ের কোনো দোষ আছে। কিন্তু তবুও কোথাও যেন একটা খচ খচ করে। কেন জানি ঘুরেফিরে তার নিজেকেই অপরাধী মনে হয়, স্বার্থপর মনে হয়। এই মানুষটাকে দেখলে কেন জানি মনে হয়—এই মানুষটা একটুও ভালো নেই।
শুদ্ধ ফের বলল—
“কী হলো এলোকেশী কন্যা? তোমার চোখ দুটো বিষন্ন কেন? আমার প্রিয় চোখে কেন ভাসে অপরাধবোধের চাপ? তুমি তো নিষ্পাপ পবিত্র, তবে কীসের এতো হাহাকার? নাকি ওর মতো তুমিও নিজের স্বার্থে কারো বুকে গভীর ক্ষত দিয়েছ, ভালোবাসার বিনিময়ে এক বুক যন্ত্রণা দিয়েছো?”
প্রিয়তা একটা কথারও জবাব দিতে পারল না। দৌড়ে চলে গেল উপরে।
হাসল শুদ্ধ। প্রিয়তার যাত্রাপথের পানে চেয়ে ধীর কণ্ঠে গেয়ে উঠলো—
কোনো নাম না জানা গল্পে
কিছু বেশি কিংবা অল্পে
আমি চাইছি ছুঁতে তোমায়।
কি উপায়?
জানি তোমার গল্পে অন্য,
তুমি অন্য কারোর জন্য,
আমি যাচ্ছি ভেঙে তবু নিরুপায়
বোঝেনা সে বোঝেনা,
বোঝেনা সে বোঝেনা,”
অস্থির নিশ্বাস ফেলে চোখ বুজল শুদ্ধ নীরব তুষের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে বুক।
অসহায় কন্ঠে আওড়াল—
“চোখ দিয়ে অন্তরে ছুরি চালাও মেয়ে। আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত করে দাও নরম মনটা। এমন কিছু কী করতে পারো না, যা করলে আমার চোখ দুটো আর কোনদিন তোমায় দেখার জন্য ব্যাকুল হবে না? প্রতিবার নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে হৃদপিণ্ডটা আর তোমার নাম নেবে না? তোমাকে অন্য পুরুষের ঘরে, অন্য পুরুষের বিছানায় দেখার দুঃখটা আমাকে আর সইতে হবে না? এই বিষাক্ত নরক থেকে কি আমার কোনদিনও মুক্তি মিলবে না!”
“তারপর আমাকে চার বছর অপেক্ষা করতে বলে তুমি নিজের ফুফাতো ভাইকে বিয়ে করে নিলে চড়ুই!
কী বলব তোমায়! তোমাকে এতটাই ভালোবাসি যে নিজের ছন্দের বাইরে একটা বাক্যও জিভ দিয়ে বের করতে পারবো না। জানি না আমার জায়গায় অন্য কোনো পুরুষ হলে কী বলত, কিন্তু আমি আমি তোমাকে চেয়ে ও কিছু বলতে পারবো না।”
কন্ঠে ক্ষোভ উগড়ে আসছে নির্বাণের, তবু ও শান্ত।
“আমি আমি সরি নির্বাণ ভাই। আমি তোমাকে মিথ্যা বলতে চাইনি, কিন্তু আমার আর কোন উপায় ছিল না। আমি আসলে তখন আর্জেন্টলি অস্ট্রেলিয়া যেতে চেয়েছিলাম, আর পাপ্পার শর্ত ছিল তোমাকে বিয়ে করতে রাজি না হলে যেতে দেবে না।
অস্ট্রেলিয়া যাওয়াটা আমার জন্য খুব জরুরি ছিল, তাই তোমাকে রাজি করাতে ওগুলো বলতে হয়েছে। কিন্তু আমি কখনো ভাবিনি, বিশ্বাস কর, তুমি এগুলো সিরিয়াস নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি তো কি কি বলেছিলাম, আমার এখন আর সবটা মনেও নেই। সত্যি বলছি বিশ্বাস করো নির্বাণ ভাই—তোমার প্রতি আমার মনে ওরকম কোনো অনুভূতি কোনোদিনও ছিল না। তোমাকে শুধু আমি আমার ভালো ভাই বা বন্ধু ভাবতাম। পাপ্পার জোরাজুরিতে সাময়িক হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়েছিলাম। আমি ভালোবাসি না তোমায়।”
চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দিল প্রিয়স্মিতা।
নির্বাণ স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল প্রিয়স্মিতার পানে।
প্রিয়স্মিতা ফের বলল—
“আমি কখনোই লুকোচাপা রাকঢাক এগুলো পছন্দ করি না নির্বাণ ভাইয়া। আমি জীবনে একবারই ভালোবেসেছি আর একজনকেই ভালোবেসেছি। এর বাইরে আমার মনে কখনো কারো জন্য কিছু ছিল না। আমার দ্বারা আপনি কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে মাফ করে দেবেন, কিন্তু এটাই সত্যি।”
নির্বাণের মনে হলো কেউ তার বাকশক্তি শোষণ করেছে। মেয়েটা এত সহজে বলে দিতে পারল যে ভালোবাসে না! এখন আর চোখে পানিও আসছে না নির্বাণের।
প্রিয়স্মিতাকে অবাক করে দিয়ে আচমকা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল নির্বাণ। যাওয়ার পূর্বে কেবল বলল—
“তুমি আমার সাথে যে প্রতারণা করেছ চড়ুই, চাইব না এর এক কণা স্বাদও তুমি কোনদিন আস্বাদন করো। চাইব না যে যন্ত্রণা তুমি আমায় দিলে, সেই একই যন্ত্রণা কোনোদিন তুমিও পাও। যে ভালোবাসার ভুল ধারণা আমার ভেঙে গেল, চাইব না এমন পরিস্থিতি কোনোদিন তোমার জীবনেও আসুক। বিশ্বাস করো, আমি তো সহ্য করে নিচ্ছি, কিন্তু তুমি পারবে না।”
আর একটা বাক্যও বেশি বললো না নির্বাণ। হনহনিয়ে স্থান ত্যাগ করল। কথাগুলো শুনে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়স্মিতা। এগুলো কী তাকে অভিশাপ দিয়ে গেল?
প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে যে সকল ভালো মানুষের মুখোশধারী মানুষকে দেখতে পাই প্রকৃতপক্ষে তারা কি আসলেই ভালো মানুষ?তাদের আসল চেহারা প্রত্যক্ষ করাটা কি আসলেই সৌভাগ্যের নাকি দুর্ভাগ্যের—এই ব্যাপারটা চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেঁসে গেছে অরণ্য। কারণ আজ তার এই ২৫ বছরের জীবনে সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে কি আসলে ঠিক দেখছে।
তার চোখের সামনে দাঁড়ানো মানুষ দুজন কি সে দুজন যাদের সে নিজের আদর্শ মনে করত নিজের আদর্শকে এমন জায়গায় দেখতে পাবে তা কোনদিন দুঃস্বপ্নেও কল্পনা অরণ্য। হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সামনে তার ধূসর বাদামি চোখে স্পষ্ট অবিশ্বাস।
কামরাঙ্গীরচর, বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত ঢাকা শহরের সব থেকে বড় রেড লাইট এরিয়া যেখানে দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামলেই শরীরের দর কষাকষি শুরু হয়ে যায় ঠিক সেই স্থানেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে প্রণয় ও খালিদ শিকদার। তারা সম্ভবত নিজেদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে কথা কাটাকাটি করছে বা বিরূপ অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে, কিন্তু এমন স্থানে নিজের বাবা ও দাদাকে দেখে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় অরণ্য।
তার বন্ধুর বলা কথাটা বিশ্বাস করতে পারেনি বলেই কাছাকাছি ছিল বলে নিজেই এসেছে দেখতে কিন্তু তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এটা মিথ্যে। কিন্তু এসে যা দেখল, তাতে বিশ্বাসটা কাচের বস্তুর মত গুঁড়িয়ে চূর্ণ হয়ে গেল অরণ্যের তাদের জন্য মনে জমা হল এক আকাশ পরিমাণ ঘৃণা।
“বয়স তো প্রায় ষাটের কাছাকাছি এই বয়সে ও যৌবনে এত তেজ আপনার শিকদার সাহেব, যন্ত্রপাতিতে জং ধরে যায়নি এখনো দাঁড়ায়?”
কথাটা শুনতেই ফুঁশে উঠলেন খালিদ শিকদার। চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন,
“বেয়াদবি করো না প্রণয়, আমি তোমার বাবার সমতুল্য।”
জবাব শুনে ফিক করে হেসে দিল প্রণয়। মাথা দুলিয়ে বলল,
“তা তো নিশ্চয়ই, কিন্তু এই বয়সে বেশি মধু খেলে বদহজম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে যে শিকদার সাহেব। যতই হোক আপনি আমার পিতৃতুল্য, ছেলে হয়ে কী বাবার চিন্তা না করে থাকা যায়? আশ্চর্য!”
খালিদ শিকদার মুখ থমথমে করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আজ হঠাৎ করেই এই বেয়াদব ছেলেটার মুখোমুখি পড়ে গেছেন তিনি।
খালিদ শিকদারের অপ্রস্তুত মুখ দেখে বাঁকা হাসল প্রণয়। পতিতালয় প্রধানের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমার সম্মানীয় আব্বাজানকে আপনাদের বেস্ট সার্ভিসটা দেবেন। এর জন্য যা টাকা লাগে আমার PA-র কাছ থেকে নিয়ে নেবেন।”
“জাভেদ”
“ইয়েস স্যার”—পাশ থেকে তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো জাভেদ।
প্রণয় খালিদ শিকদার কে এক চোখ টিপ দিয়ে বলল,
“আজ না হয় আপনার ছেলেই আপনাকে ট্রিট দিল, চিন্তা করবেন না বিশেষ মুহূর্তে দুর্বল হলে যৌবন ফিরে পাওয়ার মেডিসিন ও প্রোভাইড করা হবে জাস্ট ইনজয়!”
ভাতিজার রসিকতা দেখে থতমতো খেয়ে গেলেন খালিদ শিকদার।
পান খাওয়া লাল ঠোঁটে দাঁত বের করে হাসল রঙ্গিলা। চোখের ইশারায় একটা মেয়েকে ডেকে বলল,
“চম্পা, স্যারকে নিয়ে খুশি করে দে তো।”
মেয়েটা যেন এই কথারি অপেক্ষায় ছিল। ছুটে এল সে তুমুল আগ্রহে প্রণয়ের বাহু স্পর্শ করতে নিলেই ৪ সেন্টিমিটার দূরত্বেই তার কপালে রিভলভার চেপে ধরল প্রণয়।
সাথেসাথেই পতিতালয়ের কোলাহলমুখর পরিবেশ একদম শান্ত হয়ে গেল।
আঁতকে উঠল মেয়েটা, ভয়ার্ত চোখে তাকাল প্রণয়ের শীতল চোখে। এতক্ষণ যে মেয়েগুলো লোলুপ চোখে গিলে খাচ্ছিল প্রণয়ের লম্বা চওড়া আকর্ষণীয় শরীর, এখন তারাই আতঙ্কে সিঁটিয়ে গেল নিজের ভেতর।
প্রণয় বন্দুকের ইশারায় দূরে সরতে ইশারা করল মেয়েটাকে।
রঙ্গিলা মেয়েটার মুর্খামিতে চরম তেতে উঠলো কটা অকথ্য গালি দিয়ে বলল,
“খানকি পরানে কি ডর ভয় বলে কিছু নাই? কাকে ধরতে বলেছি আর কাকে ধরেছিস! সুন্দর পুরুষ মানুষ দেখলেই জিভ দিয়ে পানি ঝরে!”
অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে এল মেয়েটার।
রঙ্গিলার ইশারায় অন্য একটা মেয়ে খালিদ শিকদারকে নিয়ে চলে গেল।
“সে কোথায়?”—গমগমে কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল প্রণয়।
রঙ্গিলা আশেপাশে তাকিয়ে নিচু কণ্ঠে বলল,
“আমার সাথে আসুন স্যার।”
রঙ্গিলা প্রণয়কে নিয়ে পতিতালয়ের পেছন দিকে চলে গেল।
চাঁদনি রাতের উজ্জল আলোয় বাহিরের অন্ধকারটা খুব একটা গাঢ় নয়, তবুও চারদিকের বড় বড় গাছপালায় ঘেরা জায়গাটা বেশ আলো–আঁধারি একটা অন্যরকম রহস্যের সৃষ্টি করেছে।
রঙ্গিলা এসে দাঁড়াল ঢিবির সামনের বিশাল আমগাছটার নিচে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে গাছটায় একটাও পাতা নেই, যদিও চারপাশের অন্যান্য গাছগুলো ঘন সবুজে ঢাকা। এই গাছটার তাই মরে যাওয়ার কথা নয়।
পেছনে উঁচু মাটির ঢিবি।
রঙ্গিলা গাছের ছালে একটু ঘষা দিতেই ঘষঘষ শব্দে গাছটা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল।
চোখে হাসি ফুটে উঠল রঙ্গিলার। গাছের অপর প্রান্তে দেখা গেল ছোট্ট একটা সাদা রংয়ের কাঠের দরজা।
রঙ্গিলা দরজাটা খুলে দিয়ে প্রণয়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“এর মধ্যেই সে আছে স্যার।”
প্রণয় কোনো কথা না বলেই ভেতরে প্রবেশ করলো।
ভেতরটা একদম ফাঁপা, তবে দামী আতর আর সুগন্ধির ঘ্রাণে মম করছে। বেশ্যার ঘরে ঢুকেছে ভাবতেই ঘৃণায় নাক সিটকাল প্রণয়।
সামনে দুটো দরজা, যার মধ্যে একটা তালাবদ্ধ আর একটা খোলা। প্রণয় উন্মুক্ত দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতর একদম রাজকীয় ঢঙে সাজানো দামী দামী সব আসবাব আর তীক্ষ্ণ সেই আতরের ঘ্রাণ।
“আরে আজ সুধাময়ীর ঘরে চাঁদ উঠেছে যে! আসেন আসেন, গ্রহণ করেন সুধাময়ীর প্রেম সুধা।”
বুকের আঁচল ফেলে লাস্যময়ী ভঙ্গিতে শুয়ে আছে এক নারী। নারী বললে ভুল হবে তার রূপ যৌবন তাকে অপ্সরীর খেতাব পাওয়ানোর যোগ্যতা রাখে। বয়স আনুমানিক ত্রিশ থেকে বত্রিশের কোঠায়। দুধে–আলতা ধবধবে মেদযুক্ত ফর্সা শরীর হালকা নড়লেই লক লক করে। এমন যৌবন ঠাসা শরীর দেখলে যেকোনো পুরুষই নিজের কাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না।
চোখ পড়তেই ঘৃণায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল প্রণয়। কামনা তো দূরের কথা, একে দেখা মাত্রই তড়াক করে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল।
তবুও নিজেকে সংযত রাখল প্রণয়। অন্যদিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“শরীর ঢেকে কথা বল।”
সুধাময়ী ঠোঁট কামড়ে ধরল। গায়ের পাতলা শাড়িটা আরও খানিক মেঝেতে লুটিয়ে বলল,
“ওদিকে তাকালে আসল সৌন্দর্য দেখবে কীভাবে?”
সুধাময়ীর কথা শুনে বাঁকা হাসল প্রণয়। বিদ্রূপের সুরে বলল,
“রাস্তার চিল–শকুনদের খাবারে তাকানো তো দূরের কথা থু থু-ও ফেলবে না আবরার শিকদার প্রণয়।”
ঠোঁট উল্টিয়ে হাসল সুধাময়ী। তিক্ন অপমান টা সে প্রশংসা হিসেবেই নিল।
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে এসে দাঁড়াল প্রণয় এর পাশে। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো প্রণয় কে মাথা থেকে পা পর্যন্ত, যতটা শুনে ছিল তার থেকে হাজার গুণ বেশিই মনে হলো সুধাময়ীর নিকট। তার সব থেকে বেশি চোখ আটকালো হাতের ফুলে ফেঁপে ওঠা মাংসপেশিতে। কালো শার্টের হাতা ফেটে যেন বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে বাইসেপস গুলো।
চট করে মনের ভেতর কামনার আগুন জ্বলে উঠল সুধাময়ীর, স্পর্শ করার জন্য উতলা হল হাতটা। বাহুতে একটু ছোঁয়ার চেষ্টা করতেই তার কপাল বরাবর বন্দুকের নল চেপে ধরল প্রণয়।
শান্ত গলায় সতর্ক করে বলল,
“যেটা করতে চাচ্ছিস ওটা করার কথা দুঃস্বপ্ননে ও ভাবিস না, আমাকে স্পর্শ করে শুধু শুধু নিজের মরণ ডেকে আনিস না। এই সাম্রাজ্যের মালকিন পবিত্র কেউ। তোর স্পর্শ লাগলে ওই অংশটাই কেটে বাদ দিতে হবে।”
পুনরায় হাসল সুধাময়ী। বিন্দুমাত্র ভয় করল না সে।
প্রণয় দাঁতের দাঁত চেপে বলল,
“বিশ্বাস কর, অনেক বেশ্যা দেখেছি কিন্তু তোর মতো ধড়িবাজ একটা ও দেখিনি।”
শুধামায়ী এই সম্ভাষণটা ও প্রশংসা হিসেবেই নিল। চুলে আঙ্গুল পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
“দেখবে কীভাবে সুদর্শন পুরুষ? এই সুধাময়ী পুরো বিশ্বে এক পিসই আছে। এসেছো যখন একটু সুধা টেস্ট করেই যাও।”
প্রণয় ওপর–নিচে কোথাও না তাকিয়ে সরাসরি সুধাময়ীর চোখের দিকে তাকাল। কণ্ঠে ঘৃণা নিয়ে বলল,
“বেশ্যার তোর শরীর ঢেকে কথা বল।”
সুধাময়ী ঢং করল,
“এভাবে বোলো না সুদর্শন পুরুষ, দেখো এখানে ব্যথা লাগে।”
প্রণয়ের ক্রোধ বাড়ছে। সে স্পষ্ট কণ্ঠে জানতে চাইল,
“মেয়েগুলো কোথায়?”
খিলখিল করে হাসলো সুধাময়ী থুতনিতে আঙুল রেখে বলল,
“আমি শুনেছিলাম যার শিকার কেড়ে এনেছি সে সুদর্শন, কিন্তু এতটা তো আমার কল্পনায়ও ছিল না। মেয়েগুলোকে আমি দেব, কিন্তু তার আগে তোমাকে আমার ঘরে কিঞ্চিৎ সুধা পান করতে হবে। চেয়ে দেখো আমার পানে, মেয়ে তুমি অনেক পাবে কিন্তু সুধাময়ীর মতো একটাও পাবে না।”
প্রণয় জহুরীর চোখে এতক্ষণে যা দেখার দেখে নিয়েছে।
সুধাময়ী কামনায় জ্বলে উঠল। প্রণয়ের দিকে হাত বাড়াতে নিলেই রিভলভারের ট্রিগার চেপে দিল প্রণয়। বিকট একটা শব্দের সাথে স্তব্ধ হয়ে গেল সব কিছু।
ক্ষুধা পেটে অপেক্ষা করতে করতে হালত পিন্ডি চটকে যাচ্ছে প্রিয়তার। টেবিলে সাজানো নানা পদের বাহারি খাবার-দাবার—তবুও কিচ্ছুটি মুখে তুলতে পারছে না বেচারি, কারণ তার স্বামী এখনো বাড়ি ফেরেনি। বিয়ের পর থেকে অকারণে একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছে প্রিয়তার মধ্যে। সে এখন আর চাইলেও প্রণয়কে ফেলে একা একা খাবার খেয়ে নিতে পারে না। যদিও আগেও পারত না, তবুও এখন মনে হয় ব্যাপারটা আরো বেশি বেড়েছে।
পাংশুটে মুখে খাবার আগলে টেবিলে বসে আছে প্রিয়তা। ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন প্রায় ১টা বেজে ২০ মিনিট। বসে থাকতে থাকতে হালকা হালকা ঝিমুনিও আসছে।
প্রিয়তা ধৈর্য ধরে আরও ১০ মিনিট অপেক্ষা করতেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়লো। রাগে গজগজ করতে করতে ত্রয়োদশ বারের মতো ফোন লাগালো প্রণয়ের নির্দিষ্টকৃত নম্বরটিতে।
তবে বিশেষ লাভ হলো না। এবারও পূর্বের ন্যায় নিরাশা জুটলো কপালে। গত দ্বাদশ বারের ন্যায় এবারেও অপর প্রান্ত থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠে ভেসে এলো—
“আপনি যে নম্বরে কল করেছেন তা এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। The number you have dialed is currently switched off.”
এতবার ফোন বন্ধ পেয়ে ভেতর ভেতর দুশ্চিন্তায় অস্থির হতে শুরু করলো প্রিয়তা। অপেক্ষা করতে করতে ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠে এসে বসলো ড্রয়িং রুমের সোফায়। কিন্তু মনে এক ফোঁটাও শান্তি পেলো না। প্রিয়তা এক জায়গায় বেশিক্ষণ মন টিকছে না এখন আর।
প্রিয়তা বসা থেকে উঠে দ্রুতপায়ে ঘরময় অস্থির পায়চারি করতে লাগলো। তীব্র রাগ অভিমানের মিশেলে ফসফস করতে করতে বলল—
“ব্যাটা তোর কোনদিনও ভালো হবে না। আমার মতো একটা অবলা মেয়েকে জ্বালাচ্ছিস। না দেখিস তোর বউ শাকচুন্নির মতো দেখতে হবে—”
বলতে বলতে থেমে গেলো প্রিয়তা। নিজেই নিজের মাথায় গাট্টা মেরে বলল—
“মাথামোটা বলদ মাইয়া! ওর বউ তো তুই! তুই কি শাকচুন্নির মতো!”
প্রিয়তার ভেতর থেকে জোরালো শব্দে না-সূচক প্রতিবাদ ভেসে এলো। গলা ঝাড়া দিলো প্রিয়তা। গালমন্দ করতে গিয়ে কিঞ্চিত মাত্রার ভুল হয়ে গেছে। ইতিউতি তাকিয়ে সে আবার প্রথম থেকে বলা শুরু করলো—
“আমার মতো একটা ভালো লক্ষ্মীমন্ত মেয়েকে পটিয়ে বিয়ে করতে পেরেছিস বলেই কপালে বউ জুটলো। নাহলে আজীবন চিরকুমার থাকতে হতো।”
“বিয়ের আগেও আমার হারমাস জ্বালিয়ে খেয়েছে ব্যাটা, বিয়ের পরেও খাচ্ছে। সর্বক্ষণ এমন একটা ভান ধরে থাকে যেন কোনো দেশের এমপি মন্ত্রী হয়ে বসে আছে। ব্যাটা আমার মতো একটা ভালো লক্ষ্মীমন্ত বউ পেয়েছিলিস বলেই আজ বেঁচে গেলি। নাহলে তোর এসব উল্টাপাল্টা অন্য কোনো মেয়ে সহ্য করতো না। এতক্ষণে বাপের বাড়ি গিয়ে বসে থাকতো। নেহাতই আমার বাপের বাড়ির অপশনটা নেই, নাহলে বুঝিয়ে দিতাম।”
মুখে যাই বলুক, মনে প্রচুর দুশ্চিন্তা হচ্ছে প্রিয়তার। হাত-পায়ের তালু ঘামতে শুরু করেছে প্রবল চিন্তায়। দেয়ালঘড়ি ঢং ঢং করে জানান দিচ্ছে রাত প্রায় দুটো বাজতে চললো। না পেরে পরপর আরও বেশ কয়েকবার ফোন দিল প্রিয়তা, কিন্তু প্রত্যেকবারেই কপালে জুটলো একরাশ নিরাশা।
অষ্টাদশতম ফোনটা কাটতেই পরপর দুবার বাসার ডোরবেল বেজে উঠলো। চোখের মণি চলকে উঠলো প্রিয়তার। ছোট্ট বুকে প্রবাহিত হলো শীতল ঠান্ডা বাতাস। মন বলে উঠলো—নিশ্চয়ই প্রণয় ভাই আসছেন।
প্রিয়তা ফোন ফেলে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয়। সুদর্শন মুখটা দৃষ্টিতে ভাসতেই সব দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা মুহূর্তেই পানি হয়ে গেলো প্রিয়তার।
ক্লান্ত শরীরটা টেনে বাড়িতে পা রাখতেই বুকটা ভরে উঠলো প্রণয়ের। চোখের সামনে নিজের জানটাকে দেখে ক্লান্তি সব ভেসে গেল যেন।
এত রাত অবধি কোথায় ছিল মানুষটা! লোকটার কি কোনো আক্কেল-জ্ঞান নেই! রাগ গলে যাওয়ার ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতে দেবে না প্রিয়তা। সে নিজেকে সামলে কিছু কড়া কড়া কথা শোনানোর প্রস্তুতি নিতেই আচমকা ছোট্ট শরীরটা ঝাপটে ধরল প্রণয়। শরীরের সবটুকু ভার ছেড়ে দিলো প্রিয়তার নাজুক দেহের উপর।
শত্রুপক্ষের নীরব আত্মসমর্পণে মনের কথা মনেই থেকে গেলো প্রিয়তার। ভাবগুলো শব্দের রূপ পাওয়ার পূর্বেই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
প্রণয় ঝুঁকে প্রিয়তার বুকে মাথা রাখলো। কোমর জড়িয়ে ধরে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বললো—
“তোকে দুটো চুমু বেশি খাবো, বউ। প্লিজ বকিস না। তোর স্বামীর খুব খিদে পেয়েছে।”
বেস, প্রিয়তাকে আর পায় কে! কী বলবে বলে ভেবে রেখেছিল, তার সবটাই তালগোল পাকিয়ে ভুলে গেল প্রিয়তা। সব রাগ-অভিমান গলে পানি পানি হয়ে গেল মুহূর্তে।
পরম যত্নে প্রণয়ের চুলের ভাঁজে আঙুল রাখলো। সুমিষ্ট কণ্ঠে বলল—
“আপনাকে খাবার বেড়ে দেবো বলেই তো অপেক্ষা করছি।”
প্রণয় হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। জেদি কণ্ঠে বললো—
“শুধু বেড়ে দিলে হবে না।”
“তাহলে?”
“খাইয়ে দিতে হবে। বউকে বিয়ে করেছি কি নিজের হাতে খাবো বলে? বউকে ১৬ আনাই কাজে লাগাতে হবে। এইটুকু ছাড় দেবে না আবরার শিকদার প্রণয়।”
লজ্জায় দৃষ্টি নুইয়ে পড়লো প্রিয়তার।
প্রণয়কে হাত ধরে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে দিলো। পুরো বাড়িটা শুনশান নীরবতায় ঢেকে আছে, কেবল এইদিকটায় টুং টাং বাসনকুসনের মৃদু শব্দ। প্রিয়তা প্রণয়ের প্লেটে সযত্নে সহকারে ভাত, মাছ, মাংস সব বেড়ে দিলো।
হাত ধুয়ে এসে পাশের চেয়ার টেনে বসতে নিলেই বাগড়া দিলো প্রণয়। কোমর ধরে টেনে বসালো নিজের কোলে। তুলতুলে গালে গাল ঘষে রাগী কণ্ঠে বললো—
“আমার কোল থাকতে তুই অন্য কোথাও বসছিস কেন?”
পুনরায় লজ্জায় লাল হলো প্রিয়তা।
প্রণয় ঘোর লাগা চোখে চেয়ে রইলো সেই রিক্ত গাল দুটোর দিকে। দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো মসৃণ পেট। প্রিয়তা ভাত মেখে সযত্নে একের পর এক লোকমা তুলে দিচ্ছে প্রণয়ের গালে। প্রণয়ও একদম নিশ্চুপ, লক্ষ্মী বাচ্চাদের মতো চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছে সবটা। তার ভাতের দিকে মনোযোগ নেই, তার ধ্যান-জ্ঞান সবকিছু গেড়ে আছে কোলে বসা রমণীটির ভেতর। দেখতে দেখতে নেশা লেগে যাচ্ছে তার।
রমণীকে খোলা চুলে লাল শাড়িতে বউ বউ লাগছে। তবে এই লাল টুকটুকে সুন্দর বউটা তার একান্ত, একদম ব্যক্তিগত—একদম নিজের, একদম আপন। ভাবতেই প্রশান্তিতে বুকটা ভরে উঠলো প্রণয়ের।
সে ভেবে কুল পায় না এই মেয়েটা তাকে এত ভালোবাসে কিভাবে। এত পাগল হয় কিভাবে। কী এমন বিশেষ আছে তার মধ্যে। কোনো প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর খুঁজে পায় না প্রণয়। শুধু জানে এই মেয়েটা তার খুব আপন, খুব ব্যক্তিগত। এই মেয়েটার বিচ্ছেদ সহ্য করার মতো সাধ্য আর তার মধ্যে নাই—এতটুকুও।
জীবন চলাকালীন নিশ্বাসের প্রতিটি সেকেন্ডে, মিনিটে এই মেয়েটাকে তার বুকে চাই, কাছে চাই, পাশে চাই।
প্রিয়তা খাওয়াতে খাওয়াতে লক্ষ্য করছে লোকটা কী রকম ফ্যাল ফ্যাল করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ভাবখানা এমন যেন খাবার নয়, প্রিয়তাকেই গিলে খাচ্ছে পানি দিয়ে। ঢোক গিললো প্রিয়তা।
প্লেটের শেষ লোকমা ভাত মুখে তুলে দিয়ে বললো—
“আপনাকে আরেকটু ভাত দেবো, প্রণয় ভাই?”
“উউমমম, দাঁড়া।”
প্রিয়তা চোখ তুলে তাকালো। প্রণয় তার নরম হাতের কবজিটা তুলে টুপুস করে আঙুলগুলো মুখের ভেতর পুরে নিলো। গরম জিভের স্পর্শ পেতেই বুকের ভেতর চ্যাৎ করে উঠলো প্রিয়তার। শরীর জুড়ে বয়ে গেল শিহরণের ঢেউ। চোখ বুজে এলো আপনা-আপনি।
প্রণয় চেটে-পুটে প্রিয়তার আঙুলগুলো পরিষ্কার করে দিলো। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললো—
“খাবারটা অনেক মজার ছিল। কী তরকারি দিয়েছিলি যেন?”
ভাত খাওয়ার শেষে এমন একটা প্রশ্ন শুনে আহাম্মক বনে গেলো প্রিয়তা। চোয়াল হাঁ হয়ে গেলো আপনাআপনি।
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বললো—
“এমন এক্সপ্রেশন দিচ্ছিস কেন? বল কী দিয়ে খাইয়েছিস?”
প্রিয়তা তৎক্ষণাৎ প্রণয়ের গালে-কপালে হাত চেপে বললো—
“আপনার শরীর ঠিক আছে?”
“এতক্ষণ ঠিক থাকলে ও এখন আর ঠিক নেই,” বলতে বলতে একই প্লেটে আরও খানিক ভাত নিলো প্রণয়।
ইলিশ মাছের পেট থেকে ডিমটা বের করে প্রিয়তার মুখে তুলে দিয়ে বললো—
“আমাকে খুব মিস করেছিস তাই না?”
উপর-নিচ মাথা ঝাঁকালো প্রিয়তা। মুচকি হাসলো প্রণয়।
ডান হাতের কবজিতে আটকানো বোতামটা খুলে কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিলো। কাঁচা মরিচ ভেঙে ইলিশ মাছের তেল দিয়ে গরম গরম ভাত মাখাতে মাখাতে বললো—
“আমাকে খুব ভালোবাসিস তাই না?”
প্রিয়তা এবারও উপর-নিচ মাথা ঝাঁকালো।
প্রণয় ইলিশ মাছ ভেঙে ভাতের লোকমা প্রিয়তার মুখে তুলে দিয়ে বললো—
“আচ্ছা ধর, আমি যদি কিছু দিনের জন্য বাহিরে চলে যাই—যেমন আমেরিকা, কানাডা, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া কোথাও একটা—তুই কি পারবি না সবার সাথে থাকতে?”
প্রিয়তা চোখ বড় বড় করে ফেললো। মুখ ভর্তি ভাতে দুই গাল উঁচু হয়ে আছে। সে তৎক্ষণাৎ রিঅ্যাক্ট করলো। শক্ত করে প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরে অস্পষ্ট কণ্ঠে বললো—
“অসম্ভব! আপনি আপনাকে ছেড়ে এখন আর একদিনও থাকতে পারবো না।”
স্থির চোখে তাকালো প্রণয়। শান্ত থেকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো—
“এটা একটু বেশি বলছিস। আগেও তুই চার বছর আমাকে ছাড়া থেকেছিস। এমনকি এই দেশে ফিরতেই চাচ্ছিলি না। তার মানে তুই চাইলেই আমাকে ছেড়ে দিব্যি থাকতে পারবি।”
দুই চোখ পানিতে ভরে উঠলো প্রিয়তার। অভিমানে গলায় কান্না দলা পাকিয়ে এলো।
প্রণয়ের শার্ট খামচে ধরে বুকে মাথা রেখে বললো—
“ওই দিনগুলোর কথা মনে করাবেন না প্লিজ। ওই দিনগুলোতে আমি কিভাবে বেঁচে ছিলাম, আমি আর আমার আল্লাহই জানেন। শুধু একটা কথা জেনে রাখুন—মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, প্রিয়তাও তেমন তার প্রণয় ভাইকে ছাড়া বাঁচবে না।”
জবাব শুনে প্রণয়ের চোখ-মুখের আশা নিভে গেলো। চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে।
ভাতের শেষ লোকমা মুখে তুলে দিয়ে বললো—
“তোকে আমি কী বললাম আর তুই আমারে কিসের উত্তর দিলি। সব সময় দুই লাইন বেশি বুঝিস, পাকা মেয়ে। দেখি চোখের পানি মোছ।”
বলে শার্টের হাতায় চোখ মুছিয়ে দিলো প্রণয়।
প্রিয়তা এখনো বসে আছে প্রণয়ের কোলে। প্রণয় চোখের ইশারায় টেবিলের মাঝে রাখা ছোট্ট একটা কাঁচের বয়াম দেখালো। প্রিয়তাও চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলো—
“কি?”
প্রণয় ঘাড় কাত করে ঘোর লাগা কণ্ঠে বললো—
“মিষ্টি খেতে চাই।”
বিস্ময়ে চোখ গোল করে তাকালো প্রিয়তা। আবারও প্রণয়ের গালে-কপালে হাত রেখে বললো—
“ঠিক আছেন আপনি?”
বউয়ের অবুঝপনা দেখে বিরক্ত হলো প্রণয়। কোমরে হালকা চাপ প্রয়োগ করে বললো—
“তোর কি আমাকে রোগী মনে হয়?”
“আহ! ব্যথা পাই তো!” মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো প্রিয়তা।
“আমি মিষ্টি খাবো।”
প্রিয়তা মুখ বাঁকালো।
“দিচ্ছি দিচ্ছি, ছাড়ুন আমায়। আপনি কখনো মিষ্টি খান না, তাই জিগালাম। এই জন্য চিমটি কাটবেন?”
প্রিয়তা বসা থেকে উঠতে নিলে ফের কোমর চেপে বসিয়ে দিলো প্রণয়। প্রিয়তা ভ্রু কুঁচকে শুধালো—
“কি?”
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“মিষ্টি আনতে।”
“কোথা থেকে?”
“ফ্রিজ।”
“তোকে পড়াশোনা করিয়ে শুধু শুধু আমার কোটি কোটি টাকার পিন্ডি দিয়েছি।”
“এ্যাঁ!”
“এ্যাঁ নয়, হ্যাঁ! আমি ফ্রিজের মিষ্টি খাবো না। ওগুলোতে সুগার আছে, হেভি ক্যালরি।”
প্রিয়তা চোখ সরু করে তাকালো প্রণয়ের পানে। সে এই লোকটার হাবভাব বুঝলো না। মিষ্টি খাবো আবার মোটা হবো না—এ কেমন মামাবাড়ির আবদার?
প্রণয় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আরও কাছে টেনে নিলো প্রিয়তাকে। মেয়েটার শরীরের নেশা এত বেশি তীব্র যে মাথা ঠিক রাখতে পারে না প্রণয়। সে কোমল ঘাড়ে নাক ঘষতে ঘষতে নেশালো কণ্ঠে বললো—
“আমি জিরো ক্যালোরির মিষ্টি খাবো, জান।”
“হাহ! আপনার জন্য ময়রা ছানা ছাড়া মিষ্টি বানাতে পারে, কিন্তু চিনি ছাড়া মিষ্টি কোনোদিনও বানাবে না। যে মিষ্টিতে চিনি নাই, ওটা আবার কেমন মিষ্টি?”
হুমমম… প্রণয়ের চোখ-মুখ কেমন ঘোলাটে। তাকাতে কেমন ভয় ভয় লাগছে প্রিয়তার। বেশিক্ষণ কেন জানি চোখের পানে তাকিয়ে থাকতে পারছে না।
প্রণয় পুনরায় সেই কাঁচের বয়ামটা দেখিয়ে বললো—
“এটা এদিকে দে।”
“ওটাতে মিষ্টি না, ওটা বোম্বাই মরিচের আচার।”
“তুই এদিকে দে।”
“আপনার একটুও ঝাল সহ্য হয় না, তাহলে ওটা দিয়ে কী করবেন?”
“তোকে দিতে বলেছি।”
প্রিয়তা মনে মনে ভেংচি কাটলো। ব্যাটা ঝাল খেয়ে লাফালে লাফাক, আমার কী! সাথে সাথে মত চেঞ্জ হয়ে গেলো প্রিয়তার। এই মানুষটা কষ্ট পেলে তো তারই খারাপ লাগবে। কিন্তু যেই ঘাড় ত্যাড়া দিতে হবে বলেছে, মানে দিতেই হবে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আচারের বয়ামটা এনে দিলো প্রিয়তা।
প্রণয় ঢাকনাটা খুলে এক চামচ আচার প্রিয়তার মুখের সামনে ধরলো।
এবার আর বিস্ময়ের অন্ত রইলো না প্রিয়তার। এই বোম্বাই মরিচের আচার তাকে খেতে হবে? কী ভয়ংকর শয়তান লোকটা—নিজের জন্য নয়, তার জন্য এনেছে!
এই লোকটার জন্য আবার নাকি সে কষ্ট পাচ্ছিলো! মনে মনে আসা সহানুভূতিটুকু তুলে নিলো প্রিয়তা।
শোনা গেলো প্রণয়ের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ—
“কি হলো? হাঁ কর।”
প্রিয়তা ঝাল খায় ঠিক আছে, তাই বলে এত!
ঢোক গিললো প্রিয়তা। না বলারও সাহস নেই। অগত্যা চামচটা মুখে নিলো।
আচার জিভে পড়তেই ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠলো প্রিয়তার। মুহূর্তেই তীব্র ঝালে চোখে পানি চলে এলো। জিভ-ঠোঁট একসাথে পুড়তে শুরু করলো।
প্রণয় একদৃষ্টিতে উন্মত্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো প্রিয়তার রক্তিম ঠোঁটের ফুলে ওঠা। প্রিয়তা ঝালের জ্বালায় কোলে বসেই ছটফটিয়ে উঠলো।
পানির গ্লাসে হাত দিতে নিলেই গ্লাস তুলে ঢকঢক করে পুরো পানিটা খেয়ে নিলো প্রণয়। চোখের পলকেই গ্লাস ফাঁকা।
প্রিয়তা অসহায় চোখে তাকালো। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে।
প্রিয়তা খামচে ধরলো প্রণয়ের শার্ট। তীব্র ঝালে অস্থির হয়ে উঠলো।
আচমকা তার দৃষ্টি পড়লো প্রণয়ের ডার্ক রেড ঠোঁটে। লাল ঠোঁটে এখনো কয়েক বিন্দু পানি লেগে আছে।
ঝালে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলো না প্রিয়তা। প্রণয়ের কলার খামচে ধরে তীব্র বেগে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।
চোখে হাসলো প্রণয়। তার উদ্দেশ্য সফল।
তাদের চুম্বনের দৃশ্য গাঢ় হতেই—
চোখের পাতা বুজে নিলো শুদ্ধ। বন্ধ দুই চোখের কোণা বেয়ে গড়িয়ে নামলো ব্যথাতুর দুই ফোঁটা অশ্রু। সে এখানে দাঁড়িয়ে ছিল চার ঘণ্টা যাবত। উদ্দেশ্য একটাই—ভালোবাসার মানুষটাকে দূর থেকে হলেও দু’চোখ ভরে দেখা। কিন্তু এমন কিছু যে দেখবে, তা কখনো দুঃস্বপ্নেও আশা করেনি শুদ্ধ।
যন্ত্রণা কমাতে এসে এখন রাতের ঘুমটাই হারাম হয়ে গেল শুদ্ধর। আজ হয়তো ঘুমের মেডিসিনও কাজ করবে না। হলহল করে অসহ্য যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়লো বক্ষ জুড়ে। আর দেখার সামর্থ্য পেলো না শুদ্ধ। টলমল পায়ে চলে গেলো সেখান থেকে।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৮ (২)
দীর্ঘ চুম্বন শেষে প্রিয়তাকে কোলে তুলে নিলো প্রণয়। চপল পায়ে হাঁটা ধরলো নিজের ঘরের দিকে।
প্রিয়তা শরমে মুখ লুকিয়েছে প্রণয়ের বুকে। মুখে না বললেও মনে মনে লাড্ডু ফুটছে তার। কে জানতো তার এই হাসি পানি ছাড়াই গিলে নেবে প্রণয়।
