Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ শেষ পর্ব 

প্রিয় প্রণয়িনী ২ শেষ পর্ব 

প্রিয় প্রণয়িনী ২ শেষ পর্ব 
জান্নাত নুসরাত

প্রতুষ্যের নরম আলো এসে হাতছানি দিয়ে পড়ছে নাছির মঞ্জিলে। মিঠে রোদ বলা চলে। এখনো তা ঝাঁঝাল পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মিহি বাতাসের তালে ড্রয়িংরুমে পর্দা উড়ছে। বহুদিন পর ডায়নিং এর জানালাটা পুরোপুরি খুলে দিয়েছেন নাজমিন বেগম। নাহলে এইরুম সবসময় অন্ধকার থাকে। কৃত্রিম আলোর সাহায্যে আলোকিত করা হয়। সিলিং ফ্যান ছেড়ে রাখা। গতকাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় তেমন একটা গরম লাগছে না। মমো বসেছে মামাদের সাথেই নাস্তা করতে। নাজমিন বেগম নিজেও সব সাজিয়ে গুছিয়ে বসেছেন। তাড়াহুড়ো নেই তার চিত্তে। তবুও কিছুটা মনমরা।৷ ব্যাপারটা খেয়াল করলেন সোহেদ সাহেব প্রথমেই। কপালে ভাঁজ ফেলে শুধালেন,”কী হয়েছে মেঝ ভাবি? মুখ ভার কেন?
নাজমিন বেগম যেন এখানে ছিলেন না, হু করে নড়ে উঠলেন। চোখের পাতা ফেলে জিজ্ঞেস করে নিলেন,’আমাকে বলছ?’ যেন সে এখানে ছিলই না।

সোহেদ সাহেব হ্যাঁ বলতেই মাথা দোলালেন দু-পাশে কিছু না বলে। নাছির সাহেব খেয়াল করনেনি সকাল থেকে নাজমিন বেগমকে। সোহেদ সাহেব রাতে আসার পর থেকেই আড্ডায় মজেছেন দু-জনেই। এই সেই কথা বলে পার করছেন। এখনো তাই করছিলেন। স্ত্রীর দিকে তাকানোর সময় ছিল না, আকস্মিক ভাইয়ের কথায় নড়ে উঠলেন তিনি। গা ছাড়া করলেন না বিষয়টা। মন খারাপ নেই বললেই তিনি ঢিলে দিবেন না নাজমিনকে। যতই বলুক সে ঠিক আছে। কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে তার নিজের কপালে ভাঁজ পড়ল সোহেদ সাহেবের মতো। চেপে ধরলেন একপ্রকার স্ত্রীকে কী হয়েছে জানার জন্য। প্রথমে দেনামোনা করলেন নাজমিন, পরে গিয়ে মিনমিনিয়ে বলে ওঠলেন,”ইসরাতের খবর তো জানেন..!
কথা কেটে দিয়ে নাছির সাহেন ব্যস্ত হয়ে প্রায় দাঁড়িয়ে পড়লেন,”ইসরাতের খবর কী হবে? কিছু হয়েছে? কী হয়েছে? এতক্ষণ জানাওনি কেন?
নাজমিন বেগম মুখ দিয়ে আহ্ টাইপ শব্দ উচ্চারণ করলেন,”আগে শুনবেন তো, শোনার আগে বাগড়া দিলে জানাব কীভাবে?
সোহেদ সাহেব ভাইকে চেপে ধরে বসিয়ে দিলেন। বললেন,”আপনি বলুন ভাবি, আমরা শুনছি। মেঝ ভাই আপনি কথা কাটবেন না।

নাছির সাহেব বসতে পারলেন না নিশ্চিন্তে। মাথায় যেন তার এটে গেছে ইসরাতের কথা। কানের কাছে ভোঁ ভোঁ করে বাজছে ইসরাত, ইসরাত আর ইসরাত। অপেক্ষায় রইলেন নাজমিনের কথার। সে সময় নিল। তার এই সময় নেওয়ায় সামান্য বিরক্তি বোধ করলেন, ইচ্ছে করল উড়ে গিয়ে মেয়েকে দেখে আসতে। এভাবে কী আর সম্ভব? দেখা সম্ভব না। কতটা দূরে। এজন্যই তো উনি চেয়েছিলেন মেয়ে আশপাশে থাকুক। আশপাশে বিয়ে দিবেন,কিন্তু ভাগ্য যে এভাবে এত দূর নিয়ে যাবে সেটা কখনো ভাবেননি। অনেকদিন যাবত তাদের কল ধরায় অনিয়ম করছে। যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে। ওখানে কিছু হয়েছে কী? নাহলে ইসরাত এমন মেয়ে না। গতকাল থেকে একদম কল নেই। নাছির সাহেবের চিন্তার সুতো ছিঁড়লেন নাজমিন বেগম,”তেমন বিশেষ কিছু না, বাদ দাও।
সোহেদ সাহেব ততো চাপ দিলেন না, ছেড়ে দিলেন। বললেন,”না বলতে চাইলে সমস্যা নেই, কিন্তু বললে মন তোমারই হালকা হবে।
নাছির সাহেব ভাইয়ের কথায় সহমত পোষণ করলেন। বললেন,”চেপে রেখো না। বলে ফেলো। নাহলে শান্তি পাবে না।
সবার কথায় এবার বলেই ফেললেন ভদ্রমহিলা। মিনমিনিয়ে প্রথমে বললেন,”গুরুত্বপূর্ণ কিছু না, আমার দিক থেকে বলছি।

সবাই শোনার জন্য আগ্রহী হলেন। ভদ্রমহিলা আস্তে ধীরে বলতে শুরু করলেন,”মনটা ভীষণ আনচান করছিল। এজন্য ইসরাতকে ফোন দিলাম। মেয়েটা দূরে থাকে। ওর সাথে কথা বললে হয়তো ভালো হয়ে যেত এমনটা করা। কিন্তু মেয়েটাই ফোন ধরল না। এরপর থেকেই কেমন জানি লাগছে। আরাম পাচ্ছি না মনে। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। নুসরাতের এক্সিডেন্ট এর দিন এমন অনুভূতি হয়েছিল। আবারো আজ হচ্ছে।
নাজমিন বেগমের কথা শেষ হতেই সচকিত হলেন সবাই, তারপর আবার মিইয়ে গেলেন মমোর কথায়। সে সবাইকে ঠান্ডা করে দিয়ে বলল,”এখন তো ওখানে ভোর, এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে আপু উঠবে বলে আমার মনে হয় না। বিকেলের দিকে ফোন দিলে ভালো হয়।৷ তাহলে কলে পাবে আর কথা বলে নিলে মন ও ভালো হয়ে যাবে মামানী।
সোহেদ সাহেব কথাটা কাটিয়ে দিলেন নাজমিন বেগমের। সহমত পোষণ করে বললেন,’’মমো ঠিকই বলেছে। ঘুমাচ্ছে হয়তো। চারটা পাঁচটা বাজে এখনো ওখানে।

সোহেদ সাহেবের কথায় মনে আরাম বোধ করার কথা থাকলেও বুকের ঢিপঢিপ শব্দ কমল না, আরো বাড়ল। মনে শান্তি পেলেন না। সূচ ফোটার ন্যায় খোঁচাচ্ছে কিছু একটা। তার সেই খোঁচানো স্থায়ী রইল অনেকক্ষণ। কাজে ও মন লাগল না। কাকে বোঝাবেন তিনি,ইসরাত এমন মেয়েই না। সে রাত তিনটায় কল দিলেও কল ধরতে।। তাতে বিন্দুমাত্র তার ক্লান্তি প্রকাশ করে না, বিরক্তি প্রকাশ করে না। প্রেগন্যান্ট থাকার কারণে এমন হবে এটাও মনে হচ্ছে না। কয়েকদিন পূর্বেই তো শেষ রাতের দিকে কথা বলেছেন। তাহলে কিছু কী হয়েছে? উঁচুনিচু কিছু হয়ে গেল নাকি?
ব্যাপারটা ভাবতে গিয়েই গা শিহরিত হলো, ভাবনাটা বেশি এগোল না ভদ্রমহিলা। ইসরাতকে নিয়ে খারাপ চিন্তা করতে গেলেই বুকে কিছু হয়। নুসরাতকে হারাতে হারাতে পেয়েছেন, জানেন সেই কষ্ট৷ এখন ইসরাতের কিছু হলে…..আল্লাহ সহায় হোক মেয়েটার। শান্ত মেয়েটার কিছু না হলেই হলো।
এতক্ষণ চিন্তার যে প্রলেপ নাজমিন বেগমের কপালে ছিল তা চলে গেল নাছির সাহেবের কপালে একইভাবে। সোহেদ সাহেবের সাথে আলাপ আর জমে উঠল না। মনমরা হয়ে গেলেন তিনিও। অন্যমনস্ক হয়ে খাবার পর্ব সারলেন। ভাই যা বলল তার টুকটাক উত্তর দিলেন। হু হা ছাড়া আর বাক্য ব্যয় করলেন না। সোহেদ সাহেব নাশতা শেষ করে চলে গেলেন, কিন্তু নাছির সাহেব, নাজমিন বেগম কেউই নিশ্চিন্ত হতে পারল না। সারা সকাল ভাবতে ভাবতে গেল খারাপ কিছু হয়েছে কী? কোনো অঘটন কী ঘটেছে?

জায়িন যতক্ষণে বাসায় ফিরে এলো ততক্ষণে ইসরাতের অবস্থার আরো বেশি অবনতি হয়েছে। ডাক্তাত বলে গেছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিদ্ধান্ত নিতে যাতে অ্যাবোর্শন করাতে পারেন। বিষয়টার পক্ষে হেলাল সাহেব নেই। লিপি বেগম ছেলে যেদিকে যাবে তিনি সেই পথে এগোবেন। হেলাল সাহেবের ঘোর নিষেধাজ্ঞা ছিল এই ব্যাপারে। সেই নিষেধাজ্ঞায় চিড় ধরল ইসরাতের বেহুশের মতো পড়ে থাকা দেখে। এতক্ষণ যে হেলাল সাহেব পা বাড়াচ্ছিলেন না হসপিটালের দিকে, সে হেলাল সাহেব এক পায়ে খাড়া ইসরাতকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। জায়িন আগের মতোই। তার কথায় অটল আছে। বাচ্চা মরলে মরে যাক, সামনে আর না আসলে আসুক, তবুও ওই হাত ছাড়বে না সে।
ইসরাতের বাহ্যিক সুন্দর কোনোদিন জায়িনকে আকৃষ্ট করেনি ব্যাপারটা বললে একটা মিথ্যে হয়ে যাবে, তবুও এই চেহারার মানুষটার প্রতি কোনোদিন উদাসীনতা দেখাতে পারেনি, বিরক্ত হয়নি। একটা চেহারা দেখে দেখে নাকি মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়, জায়িন তো ঊনিশটা বছর ধরে এই চেহারার মালিককে দেখেছে, তার মায়া, ভালোবাসা, আবেগ, যাই হোক না কেন, এর গাড়ত্ব দিন দিন কমবে বৈকি বৃদ্ধি পেয়েছে । সেই ভালোলাগা নিয়ে এখনো সে তাকিয়ে আছে আরামে শয়নরত স্ত্রীর দিকে। ওই চেহারার দিকে তাকালে আজকাল ভেতরে পীড়া হয় তার। যখন ভাবে তার জন্যই এই কান্ডটা ঘটেছে। মনের কোণে ঘাটি গেড়ে থাকা অপরাধবোধ চায় বেরিয়ে আসতে, কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তাকে। নিজের এই পস্তানো সে কীভাবে দেখাবে ইসরাতকে? ইসরাত তো দেখতে চাইছে না বলেই চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। সে কী ভাবে এভাবে শুয়ে থাকলে জায়িন তার পিছু ছেড়ে দিবে? তাকে আর বিরক্ত করবে না? মুখ গোঁজ করলে, ইগনোর করলে সে হার মেনে নিবে? ইসরাত ভুল ভাবে। জায়িন কোনোদিন তার পিছু ছাড়েনি আর এখন তো একদমই ছাড়বে না। নো ম্যাটার হোয়াট..!

ক্ষীন বাতাসের ঝাপটা এসে গায়ে লাগছে। মে মাসের সকাল হওয়ায় শীত তেমন নেই। তেরছা রোদ পড়ছে থাইগ্লাসে। হেলাল সাহেব কোথায় বেরিয়ে গেছেন রুম থেকে তার খবর বলতে পারবে না জায়িন। লিপি বেগম ইসরাতের পাশ ঘেঁষেই বসে আছেন। সে এক পা দু-পা করে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসল। অসুস্থতায় কায়া হয়ে থাকা ইসরাত চোখ মেলে তাকাল না আগের মতো। বলল না,’জায়িন, চোখ সরান।’ এ ও বলল না,’দয়া করে, এত তাকিয়ে থাকবেন না। ভালো লাগে না৷’

শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে খুব আস্তেধীরে। বুকের উঠানামা একদম শূণ্যের কোটায় বললেই চলে। যেন শেষ সময়ের নিঃশ্বাস ফেলছে সে। পৃথিবীতে তার শেষ সময় চলে এসেছে। ভাবনাটা ভাবতে গিয়েই দু-পাশে মাথা দোলাল জায়িন। এসব চিন্তা মাথায় আনছে কেন সে? ইসরাতের কিছু হবে না। কিছু হতে পারে না। তাকে ছেড়ে যেতে পারে না। নিজের ভাবনার ভেতরেই হাত নিয়ে স্পর্শ করল মেয়েটার উষ্ণ গালে। লাল লাল চোখ দুটো দিয়ে অনিমেষ চেয়ে রইল। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ক্লান্তি চলে আসে, জায়িনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন, তার ক্লান্তি আসলো না। বিড়বিড় করতে শোনা গেল, যা রুমে প্রতিধ্বনি হলো ফিসফিসিয়ে,”আপনার কী মনে হয় ইসরাত? এভাবে অভিমান করে চোখ বুজে থাকলে আপনাকে আমি ছেড়ে দিব? এত কষ্ট করে নিজের করেছি এজন্য? আপনার মুক্তি চাই আমার কাছ থেকে, তাই না? মুক্তি চান আমার কাছ থেকে? না হলে এতটা জ্বর বাঁধিয়েছেন কেন? আপনার সংসার করার প্রয়োজন নেই আমার সাথে। তবুও আপনাকে আমার প্রয়োজন। নিজের চোখের শান্তির জন্য হলেও আমি আপনাকে নিজের কাছে বন্দী করে রেখে দিব। তবুও এ জীবনে আপনার মুক্তি নেই।
লিপি বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে এমন। মেয়েটা চোখ মেলে তাকাতে পারছে না আর এই পাগল ছেলে বলে নাকি বন্দী করে রাখবে। তার তাকিয়ে থাকার ভেতরই ইসরাতের কপাল ঠোঁট ছোঁয়াল সে। বলল,”জানেন কত কষ্ট করেছি আপনাকে পাওয়ার জন্য? আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চেয়েছি। আর আপনি…আপনি…
কথা জড়িয়ে আসলো। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সংকোচ বিহীন চোখ মুছল, পাশে মা আছেন তাতে তার ভাবাবেগ হলো না,”আপনি আমাকে বিন্দুমাত্র মূল্য দিলেন না। আমাদের একটা সংসার হলে খুব বেশি কী ক্ষতি হতো? আপনাকে শুধু নিজের করে চাইতে চাইতে, আমার এক জীবন কেটে গেল, আর এখন যখন পেয়ে গেলাম আপনি আমাকে ছেড়ে দিচ্ছেন? কেন? বলুন, আমার ভুল কী? আপনাকে জোর করে নিজের কাছে আনার জন্য এই শাস্তি দিচ্ছেন?

ঠোঁট টিপল, নিজেকে সামলানোর বৃথা প্রচেষ্টা। গলার কাছে কাটা বেঁধে গেছে অনুভূতি হলো, তারপর ও বলল,”শাস্তি দেওয়ার হলে আমার সাথে থেকে দিন, এভাবে ছেড়ে গিয়ে কেন? আপনাকে কে বলেছিল কনসিভ করতে? এই খারাপ, নিষ্ঠুর লোকের বাচ্চা কে বলেছিল পেটে ধরতে? বলুন? এখন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য তৎপর হয়েছেন। আপনার আমার জন্য একটুও মায়া হয় না, ইসরাত। এই আড়াই মাসের বাচ্চার জন্য আপনার মায়া, তার মায়ায় পড়ে আমাকে ছাড়তে বসেছেন, যে আসেইনি, আর আমি, আমি জায়িন গত ঊনিশটা বছর যে আপনার অপেক্ষা করলাম, আপনাকে ভালোবাসলাম, তার কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে। ভুল করেছি, ভুল মানছি না? হ্যাঁ? বলুন? মেনেছি তো, ফিরে আসুন। এভাবে শুয়ে থাকবেন না।

ভীষণ অভিযোগ প্রকাশ পেল তার কন্ঠে। বুকের দিকে ইশারা করে বলল,”এখানে কষ্ট হয়, ইসরাত, ভীষণ কষ্ট হয়। ছুরির আঘাতে জর্জরিত জায়গায় যেমন ব্যথা হয়, তেমন ব্যথা হয়। দুনিয়ার প্রতিটা মানুষের জন্য তোমার দরদ হয়, মায়া হয়, এক আমি জায়িনের জন্য তোমার কোনো কিছু হয় না। রাস্তার কুকুরটাকে ও তুমি ভালোবাসার চোখে দেখো, শুধু আমাকে না। কেন? আমি এতটাই নিকৃষ্ঠ!.. হ্যাঁ আমি মেনে নিলাম আমি নিকৃষ্ঠ, খারাপ, পাষাণ, তবুও ফিরে আসুন। একটা অনাগত বাচ্চার জন্য আপনি আমাকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন, ইসরাত। ইসরাত, ইসরাত, এইইইইই ইসরাত…. সবসময় কেন আমিই? আমি কেন তোমার শক্ততা দেখব, অন্য কেউ কেন না?
জায়িন আহাজারি শুনে কেঁদে ফেললেন লিপি বেগম। মনে প্রশ্নেরা দলা পাঁকাল। জায়িন কী সুস্থ আছে? বহু দেরিতে প্রশ্ন জাগল লিপি বেগমের মনে। কখনো ছেলেদের দাম্পত্য জীবনে বাঁ-হাত ঢোকাননি। ভাবতেন যদি ছেলেরা খারাপ ভাবে। একত্রে থাকছেন, সম্মান পাচ্ছেন এটাই তো বেশ৷ জায়ের মেয়ে হলেও কখনো তাকে অপমান করে দুটো কথা বলেনি। সবসময় তার প্রতি দুটো মেয়ে সম্মান বজায় রেখেছিল। শুধু তারা স্বার্থপর হয়েছে। নিজ স্বার্থে দেশ ছাড়ল। শ্বশুরের কথা ছেলের বিয়ে দিল। বাড়ি ছাড়তে হলো সেজন্য আরেকজনকে। সাধারণ চোখে দেখতে গেলে সবসময় ভুক্তভোগী হয়ে গিয়েছে তারা।

তবুও সেটা নিয়ে কখনো আওয়াজ তুলেনি। সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা হলো যখন আজমল আলীর তখনো জায়িন আর আরশের খাতায় বেশি জায়গা জমির নাম আসলো, তবুও নাছির সাহেব নির্লিপ্ত। ভাতিজারা বেশি পেয়েছে, তার মেয়েরা কম পেয়েছে এটা নিয়ে মোটেও দিল ছোট করলেন না তিনি। নিজের বাপের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হলো যখন গলার আওয়াজ উপরে না তুলেই বিদায় নিলেন। নিজের হক ছেড়ে দিলেন। বারো বছর পর দেশে গেলেন যখন তখন মনে মনে ইচ্ছে লালন করেছিলেন লিপি বেগম সব ঠিকঠাক করে ফেলবেন এবার। তার সেই ভাবনা গুড়েবালি হলো। এতদিন থাকলেন, ক এর গোড়ায় খ জোড়া দিতে পারলেন না। অদেখা করার চেষ্টা করলেন অনেক বিষয় তবুও যেন চোখে পড়ল অনেক বিষয়। আরশের উগ্রতা, বেপরোয়া আচরণ, দেখেও দেখেননি যেন তিনি। তারপর জায়িনের ইসরাতকে দেশে রেখে আসা। পাঁচ বছরে একবারো কেন এই ব্যাপারটা মাথায় এলো না জায়িনের সাথে ইসরাতের সম্পর্ক ঠিক আছে? বা এখন এই যে পাঁচ মাস তারা সংসার করল সব ঠিক আছে কিনা? কিছু তো জানেন-ইনা তারা। ছেলে মেয়েগুলো আসলেই সুখী আছে কিনা তাতে বিন্দুমাত্র ধ্যান ছিল না তাদের৷ আরশ আর নুসরাতকে নিয়ে এতটাই মেতে ছিলেন জায়িন ইসরাতকে চোখে দেখেননি। যখনই ইসরাতকে ভালো করে দেখতে যান, তখনই নুসরাতের কোনো বিষয় অদেখা করা হয়। এবার জায়িন আর ইসরাতের। কখনো এই ভাবনা আসলো না কেন মস্তিষ্কে? জায়িনের মানুসিক অবস্থা কী ঠিক আছে? ভালো করে তাকালেই তো বোঝা যায় মানুসিক অবস্থা ভালো না। স্বাভাবিক মস্তিষ্কের মানুষ কখনোই এরকম শব্দ উচ্চারণ করবে না।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলেন। একজনের ভাগ্যটা ঠিক হলে অন্যজনেরটায় এত কষ্ট চলে আসে কেন? না চাইতেও দীর্ঘ শ্বাস বেরোল লিপি বেগমের ঠোঁটের ফাঁক গলে। তখনো জায়িনের পাগলের প্রলাপ বলা অব্যাহত। সে বকবক করছে, ইসরাতকে কখনো ছাড়বে না। এভাবেই রেখে দিবে৷ মারা গেলে ফ্রিজে রাখবে।
কী কী সহ্য করেছে মেয়েটা ভাবতে ভাবতে লিপি বেগমের চোখ গেল ইসরাতের দিকে। ক্রপ টপস গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটাকে পুতুলের মতো লাগছে। শুকিয়ে গিয়ে কী হয়েছে? কী মেয়ে নিয়ে আসছেন আর এখন কী বানিয়েছেন? নাছির সাহেবকে কী জবাব দিবেন? এইভাবে ফেলে রাখার জন্য নিয়ে এসেছিলেন মেয়েটাকে? চোখে আবারো তার জল জমা হলো৷ বুকের ভেতরের হৃৎপিন্ডটা দাপাদাপি করছে। ডাক্তারের একটা কথা মনে হতেই হুহু করে কেঁদে উঠলেন। জায়িন একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে আবারো ইসরাতের দিকে তাকাল। বিশেষ ভাবাবেগ হলো না তার। গালে হাত ঠেকিয়ে এখনো চেয়ে আছে সে ওই মুখের দিকে। মৃদু স্বরে ডাকছে,’”ইসরাত? ইসরাত? এই বোকা..

ফিরতি জবাব আসলো না। চোখের পাতা সামান্য নড়ে উঠল না আগের মতো। নির্জীব শুয়ে রইল ইসরাত তার জায়গায়৷ জায়িন শুধাল,”রাগ করেছ আমার উপর? দেশে যাবে তুমি?
কন্ঠস্বরটা ভাঙা। কথা বলতে গিয়ে আটকাচ্ছে কোথাও। বলল,”আমি নিয়ে যাব তোমাকে। সুস্থ হয়ে যাও, আমরা দু-জন যাব। আমাকে ক্ষমা করে দিতে হবে না তোমাকে, শুধু সুস্থ হয়ে যাও। তুমি সুস্থ হয়ে উঠলেই আমি খুশি। এরপর যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাবে। থামাব না। ওয়াদা…
কথা বলতে বলতে চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। চেহারাটার উজ্জ্বলতা একদিনে ভেঙে পড়ছে ছেলেটার। দীর্ঘ একটা শ্বাস ছাড়ল জায়িন,”ইসরাত, এই ইসরাত… আমাকে শুনতে পাচ্ছেন? আর কষ্ট দিব না আপনাকে। চোখ মেলে তাকান।
জায়িনের এত ডাকের বিপরীতে সাধারণের ন্যায় নিভু নিভু চোখ মেলে তাকাল না ইসরাত।তাকে তাকাতে না দেখে জায়িন লিপি বেগমের দিকে ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকিয়ে শুধাল,”ও তাকাচ্ছে না কেন আম্মু? ক্ষমা চাইছি তো আমি, আর কী করব?
লিপি বেগম হুহু করে কেঁদে উঠলেন। কথার জবাব দিলেন না।

আকাশ মেঘে ঢেকে আছে। বৃষ্টি আসার আগে যেমন পরিবেশ হয় ঠিক তেমনি বাহিরের অবস্থা। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে সবকিছু। মাথার উপর টিন থাকায় শা শা শব্দটা একটু বেশি কানে লাগছে আহানের। সৈয়দ বাড়িতে বৃষ্টি হলে বোঝাই যায় না, বোঝাটা দুষ্কর। বাহিরে সবাই ছুটাছুটি করছে। কেউ কাপড় তুলছে, কেউ মুরগী খোঁপে তুলছে, কেউ আবার ঘাস কেটে গরু গোয়ালে ঢোকাচ্ছে। আহান চুপচাপ চেয়ে তা দেখছে৷ শীতল বাতাস গায়ে লাগায় আরাম বোধ হচ্ছে। একটু পরই হয়তো আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। বাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় আহান বুকের বাঁ-পাশ চেপে ধরল হাতের মুঠোয়। সূক্ষ্ম পীড়নে ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে মনে হলো। হাফসাফ লাগতে শুরু করেছে। এতক্ষণ যে বাহিরের পরিবেশ দেখতে ভালো লাগছিল তা নিমেষেই দুল্যিসাৎ হলো। মনের ভেতর কিছুটা আনচান করছে। মনে হানা দেয় একটা বিষয়। কয়েক মাস পূর্বের ঘটনাটা। যেটা সবাই প্রায় ভুলতে বসেছে। বুকের খোঁচানোটা আরো বাড়ল৷ চোখ সরে গেল বাহির থেকে৷ হাতের মুষ্টিতে আরো বল প্রয়োগ করে খাঁমচে ধরল। বাহ্যিক সেই ব্যথা অভ্যন্তরীণ ব্যাথাটা নিঃসৃতি দিতে পারল না।

এতক্ষণ ঝড়ো হাওয়া বইলেও এখন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে মাটিতে। মাথার উপর থাকা টিনে ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ার শব্দ। কানে এসে তা লাগছে ভালো করেই। কানে বাজছে অন্যকিছু৷ আর্তনাদ। বৃষ্টির সাথে ধুয়ে মুছে যাওয়া রক্ত। ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া একাংশ শরীরের প্রতিচ্ছবি। বুকের ধড়ফড় এরপর আর কমল না, বাড়তেই থাকল। নিজের অবস্থা দেখেই নিজেরই কষ্ট হলো। গা এলিয়ে দিল বিছানার উপর। চোখে বুজতেই এক ফোটা জল চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল বিছানায়। তবুও টু শব্দটি করল না। আমিরাকে ও ডাকল না।
আমিরা যখন রুমে এসে প্রবেশ করল তখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে আহান। ঠোঁট দুটো নড়ছে ধীর লয়ে। ঘাটাল না সে। বিছানার পাশ ঘেঁষে বসল। জানালার পানে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখতে ব্যস্ত হলো, আহানের ঠোঁট নাড়ানো তখনো অব্যাহত। কিছু একটা ঘাপলা আছে বুঝতে পেরেই স্বামীর গায়ে হালকা হাতে ধাক্কা দিল মেয়েটা। নড়ল না৷ কেমন চুপচাপ পড়ে রইল। আমিরার ভ্রু কুঁচকাল। অন্য সময় হলে তো এই ব্যাটা আহান লাফিয়ে উঠত, ঝগড়া বাঁধিয়ে দিত, তাহলে আজ এমন পড়ে আছে কেন মটকা মেরে? এবার একটু জোরে ধাক্কা দিল আহানের গায়ে। এক চোখ মেলে তাকাল বড়ো অনিহা নিয়ে লোকটা৷ কপালে ভাঁজ পড়ল স্বাভাবিকের ন্যায়। জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে, আমিরা?

গলার স্বর নমনীয়। এতটা ঠান্ডা কখনো তাকে দেখায়নি। জিজ্ঞেস করেই চোখ বুজে ফেলল। যেন উত্তর শুনতে চায় না। আমিরা আবারো ধাক্কা দিল হালকা করে। আহান চোখ খুলল না, ধমকাল না, মরার মতো পড়ে রইল। আমিরা গাইগুই করল জিজ্ঞেস করবে কী করবে না! যদি লাফ মেরে উঠে? এই ব্যাটার স্বভাব তো খারাপ। পাশে মুখে হাত দিয়ে বসে থাকল। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন আহানকে নড়তে দেখল না, সিদ্ধান্ত নিল পরে যা হওয়ার হবস, দেখা যাবে, এখন কী হয়েছে তা জানা জরুরি। তাই গায়ে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,”আপনার কী হয়েছে? শরীর খারাপ?
স্বাভাবিকের ন্যায় কাঠখোট্টা জবাব এলো,”তোমাকে বললে তুমি ভালো করে দিবে? দিতে পারলে বলো, বলছি?
মেজাজ গরম হয়ে গেল শোনামাত্র। এই তো ভালো করে কথা বলছিল, আবার চলে গেছে খবিসি সেই ফর্মে। কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এই ব্যাটাকে জিজ্ঞেস করতে আসাই ভুল হয়েছে তার। যা ইচ্ছে হোক, তবুও সে জিজ্ঞেস করবে না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারল না দু-সেকেন্ড ও। নরম হৃদয়ের মানুষ হওয়া কত বড় ভুল হয়েছে তা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। অপমান ভুলে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,”শরীর খারাপ লাগলে বলুন, পাশেই হসপিটাল আছে, ডাক্তার দেখিয়ে আসবেন।
আহান এবার পুরোপুরি চোখ মেলে তাকাল। প্যান প্যান না করতে বলার জন্য চোখ মেলে তাকিয়ে আর কিছু বলল না, আলাভোলা মুখটার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। ধমকাতে ইচ্ছে হলো না আর। তার বুক ব্যথার জন্য বেচারির তো আর দোষ নেই।

আহানকে এমন চুপ মেরে যেতে দেখে মনে করল হয়তো চটে গিয়েছে, তাই মানে মানে কেটে পড়বে, কিন্তু তার পূর্বেই আহান তার হাত চেপে ধরল। চোখ দুটোর অবস্থা খারাপ। লাল হয়ে আছে। ও বাড়ির সবার চোখ মাঝে মাঝে এমন লাল হয়ে যায়। কারণটা কী আমিরা জানে না। জানার ইচ্ছেও নেই। আলগোছে কেটে পড়াই ভালো। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই আহান টেনে এনে বসাল পাশে। ঘোর লাগা কন্ঠে শুধাল,”কোথায় যাচ্ছো এখন?
অস্ফুটে উচ্চারণ হলো,”কোথাও না, এই তো এখানেই আছি।
হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, ছাড়ানো দুষ্কর ঠেকল। আহান শক্ত করে বিছানার সাথে হাতটা চেপে ধরেছে। বলল,”তোমার ইচ্ছে এখানে এসেছ, এখন আমার ইচ্ছেয় বাহিরে যাবে। শুয়ে ছিলাম চুপচাপ সহ্য হয়নি, তাই না?
আমিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। এই তো মরে যাচ্ছিল ব্যাটা, এখন এমন করে তাকিয়ে আছে কেন। যেন সে শিকার, ব্যাটা শিকারী। মাথা দু-পাশে ঝাঁকিয়ে চিন্তা ফেলে দিতে চাইল, তার পূর্বেই তাকে টেনে নেওয়া হলো বুকের কাছে। পুরুষালি সান্নিধ্যে গুটিয়ে গেল আমিরা। চেহারায় ফুটে উঠল ভয়। ধাক্কা দেওয়ার জন্য হাত তুলতেই আহান চেপে ধরল বুকের সাথে। পিষে ফেলল নিজের সাথে। বলল,”ধাক্কাধাক্কি করবে না, আমিরা। আই ওয়ার্ন ইউ। শরীরটা ভালো না, এমন করলে আস্তো রাখব না। ভদ্র হয়ে আছি ভদ্র থাকতে দাও। খারাপ হতে দেখতে না চাইলে চুপচাপ শুয়ে থাকো৷

এরপর সাহসে কুলায় কী করে আমিরার এই ব্যাটাকে ধাক্কার মারার, তাই ভেজা বিড়ালের ন্যায় চুপচাপ শুয়ে রইল বুকের মধ্যে গাপট্টি মেরে। ক্ষীণ শ্বাস প্রঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো। সময়ের সাথে তা ঢাকা পড়ে গেল রুমের ভেতর। পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির মাত্রা বাড়ছে,সাথে বাড়ছে বাতাসের দাপট। মাথার উপরের টিনে ধুপধাপ শব্দে বড় ফোটার বৃষ্টি পড়ছে। দরজা জানাল একবার এদিকে এসে বারি খেল তো একবার সেদিকে৷ মুষুলধারে বৃষ্টি চলল ঘন্টাখানেক। তা থামার কথা থাকলেও থামল না। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বজ্রপাত হলো, সাথে বৃষ্টি নিজ ছন্দে মাটিতে পতিত হলো।

চট্টগ্রাম সমূদ্র সৈকত৷ সকাল থেকে আজকের আবহাওয়া খারাপ। তার মধ্যে আবার ইসরাতের সাথে কথা বলার পর থেকে ইরহামের মনটা খারাপ। মন খারাপ কেন তার যুথসই কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না৷ জ্বরে ডুবে থাকা মুখটা মনে পড়ছে। ঘন্টাখানেক আগে কথা বলেছিল, সেই কথার রেশ এখনো রয়ে গেছে। কানে বাজছে ইসরাতের গলার ক্ষীন স্বর। খারাপ চিন্তা করতে চায় না ইরহাম, তবুও কেন জানি আসছে খারাপ চিন্তা৷ দলা পাঁকিয়ে মাথার মধ্যে বসে আছে। ইসরাতের সাথে এই কথাই যেন তার শেষ কথা মনে হচ্ছে। কেন এমনটা মনে হচ্ছে? ইরহাম জানে না। তার কান্না পাচ্ছে। ভীষণ রকম। কারণ ছাড়া এমন বুক হওয়ার মানে কী? চোখ দুটো বন্ধ করে গা এলিয়ে দিল বালু মাটিত, স্বস্থির খুঁজে। এত সহজে স্বস্থির দেখা মিলে? না মিলে না, তবুও পড়ে রইল ছেলেটা।

সূর্যের আজ দেখা নেই। একবার মেঘের আড়াল থেকে বের হচ্ছে তো একবার ঢেকে যাচ্ছে। মাথার নিচে দু-হাত রাখল ছেলেটা৷ চোখ বন্ধ করতেই ইসরাতের হাস্যরত মুখ ভাসল। ছোট বেলার কিছু কথা খুব মনে পড়ছে।৷ ইসরাতকে কী একবার কল দিয়ে তার খোঁজ খবর নেওয়া উচিত? কথাটা ভাবতে ভাবতে মোবাইল পকেট থেকে বের করল। চোখ একবার গেল সময়ের দিকে। একটা বাজছে। ওখানে আটটা বাজছে হয়তো। আগে যেহেতু ইসরাত সজাগ ছিল এখনো থাকবে। তড়িঘড়ি কল লাগাল নাম্বারে। কিন্তু কীসের কী? কল পিক করল না৷। বাজতে বাজতে কেটে গেল। লাগাতার কয়েকবার কল দিল ইরহাম। মেসেজ দিল৷ কোনো কিছু ব্যাক আসলো না৷ এবার হেলাল সাহেবকে কল দিল। উনি নেটওয়ার্ক এর ভেতরে নেই। একে একে সবাইকে কল লাগাল। না কেউই নেই। খারাপ চিন্তারা আশকারা যেন পেল এতে আরেকটু বেশি। পুরো মস্তিষ্ক জুড়ে গেল। ইরহাম আবারো ধুপ করে গা এলিয়ে দিল মাটির মধ্যে। তার কিছুই ভালো লাগছে না, ছুটে বাড়িতে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আকাশের দিকে তাকাল, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। মনে মনে অনেক কথা বাজল। ঠোঁট দিয়ে উচ্চারণ হলো না কিছুই। শোহেব সাহেব আর ঝর্ণা বেগমের কথা ভেসে আসছে। সামনেই দাঁড়ানো তারা। সৌরভির হাসির কলতান ভেসে বেড়াচ্ছে। সবার সান্নিধ্যে থেকেও মনটা হালকা হচ্ছে না। দীর্ঘ শ্বাস ফেলল, এমন কেন হচ্ছে ভেবে।

ইরহামের মনের পূর্বাভাস বুঝেই হয়তো বৃষ্টি নামল মাটিতে। পুরো তোড়জোড়ের সাথে। সামনের সমূদ্রে ঢেউ উঠল বিশাল। চোখ স্থির সেখানে থাকলেও গায়ের টান জোরালো বুঝল। শরীরটার ভার ছেড়ে দিল যে টানছে তার উপর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার ইচ্ছে নেই। কে নিয়ে যাচ্ছে? নিয়ে গেলেই হয়েছে। অনুভূতি হচ্ছে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে কোথাও, কিন্তু তার চোখ যে এখনো ওই সমূদ্রপৃষ্ঠে আর আকাশে থমকে আছে। বাতাসে বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে খারাপ কিছু হবে। এমনই তো হয়েছিল নুসরাতের এক্সিডেন্ট এর সময়। আবারো কী কোনো কঘটন ঘটতে চলেছে? ইরহামের শরীর বাবার সাথে তাল মিলিয়ে চললেও চোখ তখনো স্থির ঢেউয়ের দিকে। হৃৎপিন্ড ধড়াস ধড়াস করছে। আহ… এই অনুভূতি সে কাকে বোঝাবে? মনটা শান্ত হচ্ছে না কেন একটু? শরীরটা বিছানার আরাম খুঁজছে, হাত পা ছড়িয়ে শুতে পারলে ভালো হতো।

নুসরাত পায়চারি করছে। মুখটা রক্তশূণ্য। বর্তমান অবস্থা দেখলে ভাববে কেউ তার জামাই মরে গেছে, আসলে তেমন কিছু না। তার পায়চারির কারণ অন্যটা। ইসরাত ফোন ধরেনি৷ ফোন ধরল না কেন এটাই সমস্যা? আরশ বলল,’হয়তো কাজে আছে। এটা মেনে নিতেই চায় না নুসরাত, কাজে থাকলে ফোন ধরবে না কেন? আরশ স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করেছিল,’তুই কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী তোর কল ধরতেই হবে?’ এরপর থেকে আর কথাই বলেনি। গত আধঘন্টা যাবত মোবাইল হাতে নিয়ে ঘুরছে। রিং হচ্ছে কল ধরছে না। এই নিয়ে তার মাথা ব্যথার শেষ নেই। আরশকে কিছু বলার জন্য হা করে আবারো মুখ বন্ধ করে ফেলে। ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইলেও কথা বলে না। লাগাতার দিতেই আছে কল। জায়িনকে, লিপি বেগম, হেলাল সাহেবকে, সবাইকে কল দেওয়া শেষ। এতবার দিয়েছে ফোন, একটা মানুষ ধরেনি। এই নিয়ে নুসরাত রাগে ফুসে উঠছে৷ আরশ বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ তার কান্ডকারখানা দেখল। ব্যঙের মতো লাফালাফি দেখতে ভালো লাগছে। একবার এদিকে যাচ্ছে, একবার সেদিকে। স্থির হয়ে বসে ও কল দেওয়া যায়, কিন্তু সে টানটান দাঁড়িয়ে কল দিচ্ছে। চোখ ঘোয়াচ্ছে আশপাশে। মুখটায় গাঢ় কালো ছায়া নেমেছে। সেটা দেখে আরশ আর শুয়ে থাকতে পারল না৷ শোয়া থেকে উঠে বসল। তার জ্বর নেমেছে। সামান্য থেকে গেছে। নুসরাতের জলপট্টি দেওয়া কাজে লেগেছে। তাই মুখটা আঁধার করে রাখা আরশের কাছে সহনীয় ঠেকল না। ভুতের মতো হাঁটাহাঁটি করতে থাকা নুসরাতের বাহু চেপে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। এতে বিরক্তিতে তেতে উঠল মেয়েটা। খ্যাক করে উঠতে গিয়ে কী ভেবে থেমে গেল। নরম হলো গলার আওয়াজ,”কী হয়েছে আপনার? হাত ছাড়ুন…

আরশ হাত ছাড়ল না, আরো শক্ত করে ধরল। নুসরাতের চোখ একবার সেদিকে গিয়ে আবারো ফিরে আসলো আরশের চোখের দিকে৷ বলল,”হাত ছাড়ুন, কাজ করছি দেখছেন না?
আরশ হাত ছাড়ল না, স্থির ধরে রেখে দিল। আকস্মিক কাঁধে তুলে নিল তাকে। চ্যাঁচানোর সুযোগ পেল না, তার পূর্বেই ধুপধাপ পা ফেলে রুমের বাহিরে চলে গেল। লম্বা লম্বা ঠ্যাং দিয়ে দু-পাড়া দিল। এরপরই সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল। অর্ধ ঝুলে থেকে উলটো দেখল সবকিছু নুসরাত। চোখে শুধু ভাসল মেঝে। চোখ বন্ধ করে চ্যাঁচানোর পূর্বেই আরশ ধমকে উঠল,”চুপ.. একদম চুপ, চ্যাঁচানো বন্ধ৷
বন্ধ হয়ে গেল। খাদে নামানো আওয়াজে আরশের মতো জিজ্ঞেস করল,”কোথায় যাচ্ছি?
উত্তর আসলো সেকেন্ড কয়েকের ভেতর,“গেলেই দেখতে পাবি।
নুসরাত আর দেনামোনা করল না।চুপচাপ ঝুলে থাকল আরশের কাঁধের উপর। রাস্তায় নিয়ে নামিয়ে দেওয়া হলো তাকে। এতেও সে কিছু প্রশ্ন করল না। অন্য সময় হলে প্রশ্নের পাহাড় আরশের সামনে রাখা হতো৷ তার দৃষ্টি, চিন্তা, মন সব এখন নিজের মোবাইকে ঠেকে আছে। আরশ যে নামিয়ে দিয়েছে তাও টের পায়নি। নিজের হাতের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে আরশ হাঁটা শুরু করল। নুসরাতের চোখ তখনো মোবাইলে স্থির৷ ইসরাতের কল আসার অপেক্ষায়। এই অপেক্ষা কতটা দীর্ঘ হবে সে জানে না৷ হাঁটতে হাঁটতে সোসাইটির বাহিরে চলে আসলো তারা। সামনের মোড়েই ফুলের একটা দোকান। আরশ নুসরাতকে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে চলে গেল। মুখটা তখনো আঁধার নামানো মেয়েটার। আরশ আছে না গেছে তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।।বর্তমানে তার সব ধ্যান জ্ঞান ইসরাতের উপর ঠেকে আছে। বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস করছে। না চাইতেও চোখের মধ্যে জমা হলো পানি। আহাজারি করে উঠল,’ইয়া রব..

হতাশায় কান্না আসছে৷ তাই আকাশের দিকে চোখ তুলল। আর সেদিকে চোখ স্থির রেখে চেয়ে রইল। কোনো শব্দ ব্যয় হলো না মুখ দিয়ে।৷ নিশ্চুপ চেয়ে থেকে অনেক কিছু বলে ফেলল।
আরশ দোকানের অপাশে দাঁড়িয়ে থেকে এদিকে চেয়েই ছিল। নুসরাতকে নির্মিশেষ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজেও তাকাল। মেঘে ঢাকা আকাশ, আর তাদের চলাফেরা চলছে, এছাড়া তেমন কিছু দেখল না।
দোকানাদার ছেলেটা আরশকে ডাকল। সে নড়ল না। আবারো ডাকতেই ধ্যান ভঙ্গ হলো। দৃষ্টিগোচর হলো ফুলের বুকেট তৈরি করছে পটু হাতে। আরশকে অন্যমনস্ক দেখে বলল,”ভাই, হুনছইননি কিতা কইছি?
আরশ বুঝেইনি কী বলেছে। চোখ কুঁচকে বলল,”বুঝিনি।
ছেলেটা বুঝল হয়তো কিছু। বিড়বিড় করল,”ই আবাদি ইগু খান থাকি আইছে, আল্লায় ভালা জাননোইন। সিলেট থাখে সিলেটি মাত পারে না। হ্লার হ্লা..
নিজ মনের বিড়বিড় শেষ করে আরশের পানে তাকাল। লোকটা তাকিয়ে আছে এখনো। গলা খাঁকারি দিল। বলল,”সিলেটি বুঝেন না?

“একটু একটু বুঝি।
উপর নিচ মাথা দুলিয়ে সিলেটি কথাগুলো শুদ্ধ ভাষা করার চেষ্টা করল ছেলেটা। তারপর নিজ মনে কথা জোড়া লাগাল। সময় নিয়ে আরশকে শুধাল,”অ্যানিভার্সেরি অর লাভ কনফেশন?
কথাটা ভাঙা ভাঙা। সিলেটি টান এসে গেছে ছেলেটার কথায়। আরশ ঈষৎ হাসল। সময় নিয়ে উত্তর দিল,”লাভ কনফেকশন বা অ্যানিভার্সেরি কোনোটা-ই নয়। আজকের দিনটা ওর খারাপ ছিল, অ্যাজ আ হাজবেন্ড ভালো করার প্রচেষ্টা করছি।
আরশ থামল। ছেলেটা মিটিমিটি হাসছে। মন দিয়ে কথা শোনে ফুলের বুকেট বানাচ্ছে। মাত্র যে বকাঝকা করেছিল, বিরক্ত হয়েছিল সিলেটি জানে না বলে তার লেশমাত্র নেই। তার হাসির মধ্যেই আবারো শোনল ভারী গলাটা,”এইটুকুই। আর কিছু না৷
“আজকের দিনটা কেন খারাপ ছিল?
আরশ উত্তর দিল না, শুধু হাসল। আকাশ এখনো মেঘের সাঁঝে সেজে আছে৷ ফুলের বুকেটটা হয়ে যেতেই তা হাতে নিল আরশ,আর ছেলেটার হাতে চকচকে দুটো নোট ধরিয়ে দিল। রাস্তা পার হয়ে ওপাশে গিয়ে দেখল নুসরাত এখনো ঠাঁয় আকাশে তাকিয়ে আছে। গায়ে হাত দিতেই কেঁপে উঠল। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল না। হাঁটা ধরল মোবাইলের দিকে তাকিয়ে। কী ভেনে হাঁটা ধরেছে এক নুসরাত আর আল্লাহ ভালো জানে৷ তাই তাকে থামানোর জন্য আরশ নিজ উদ্যেগে ডাকল,”নুসরাত নাছির..?
নুসরাত দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সরাসরি আরশের দিকে৷ চোখে গম্ভীরতার প্রতিচ্ছবি থাকলেও মনের ভেতর শিরশিরে অনুভূতি বয়ে চলল। এতক্ষণে বুকে চলা হালচাল কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। নুসরাত জানে এই ডাকে তেমন বিশেষত্ব নেই, তবুও তাকে থমকে দাঁড়াতে হয়। সে জানে এই লোকের মুখে নুসরাত নাছির ডাকটা শোনে সে হাজার বছর কাটিয়ে দিতে পারে।

হসপিটালের করিডোরে বসে আছেন হেলাল সাহেব। মাথা নিচের দিকে ঝোঁকানো। বয়সটা যেন বেড়ে গেছে দ্বিগুণ আজ। অন্যদিন যতটা সতেজ মনে হয় তাকে আজ তার টিকিটুকু নেই। আত্মগ্লানিতে শিরদাঁড়া নিচের দিকে ঝুঁকে হেছে। ইসরাতের এই অবস্থার জন্য দোষ দিচ্ছেন নিজেকে। মেয়েটার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। আগে শ্বাস প্রঃশ্বাস ক্ষীন চললেও এখন তা একদম শূণ্যের কৌঠায়৷ হেলাল সাহেব যখন কথা বলতে নিচে নেমেছিলেন তখনই ওই অঘটন ঘটেছে। এই দোষের ভাগিদার তারা সবাই। তাদের জন্য সবকিছু হয়েছে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখলেন জায়িন হাত পা ছড়িয়ে করিডোরে বসে আছে। শার্টের জায়গায় জায়গায় ভাঁজ। বোতাম খোলা। চুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। চোখ দুটো শূণ্য। লাল বর্ণের ধারণ করেছে। কান্না করেছে এজন্য এই অবস্থা। এতক্ষণ যাবত ইসরাতের রুমের দরজার সামনে বসে ছিল। এখন একটু সরে এসে দেয়ালে পাশ ঘেঁষে বসেছে। মুখটা ভঙুর। হাত পা ছড়িয়ে বসে থেকে অনেকক্ষণ কিছু ভাবল। তারপর উঠে দাঁড়াল কী ভেবে। কাপড় ঝেড়ে নিল দু-হাতে। আওয়াজ একদম নিচু। করিডোর শান্ত থাকায় শোনা গেল,’আমি আসছি..!

জায়িনকে সামনের একটা রুমের ভেতর ঢুকতে দেখা গেল। ঘাড় নিচের দিকে নামানো। পড়ে যাবে, পড়ে যাবে করেও পড়ল না। দরজা ভেজিয়ে দিল। হেলাল সাহেব একবার উঠে উঁকি দিলেন ভেতরে। ওয়াশরুমে দরজা মেলে ঢুকেছে। ওযু পড়ছে। চোখ ফিরিয়ে এনে বসে গেলেন নিজ স্থানে। লিপি বেগম দোয়া করছেন বারবার। আল্লাহর কাছে সফা চাচ্ছেন। ট্রান্সপারেন্ট দরজার অপাশ ঝাপসা। সামান্য দেখা যাচ্ছে। জায়িনকে রুকু সিজদাহ দিতে দেখে চোখ ফিরিয়ে আনলেন। গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছে চারিদিকে, না চাইতেও শুনে ফেললেন” হ্যা খোদা একদিন আমি এসেছিলাম তোমার কাছে ইসরাতকে পাওয়ার জন্য। বলেছিলাম তাকে পেয়ে গেলে কখনো তোমার ইবাদতে আমি গাফিলতি করব না। আমি করিওনি। আমার কথা রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। আমি আজ, নিজের ভঙুর হৃদয় নিয়ে আবার তোমার কাছে এসেছি। আমি তোমার এক গুণাহগার বান্দা, যে নিজের স্বার্থ ছাড়া তোমার দরবারে মাথা নত করে না। তবুও আজ এসেছি। এই গুনাহগার বান্দা নিজের…নিজের শেষ খায়েশ নিয়ে এসেছে তোমার কাছে। যদি, যদি ইসরাত নাছির না বেঁচে থাকে এই পৃথিবীর বুকে, তাহলে আমিও বেঁচে থাকতে চাইনা। তাকে যদি নিজের কাছে নিয়ে নাও তুমি, তাহলে এই পৃথিবীতে আমি বেঁচে থেকে কী করব? তার আয়ু যদি আজ পর্যন্ত থেকে থাকে, তাহলে তার সাথে তোমার কাছে আমাকেও নিয়ে নাও।

শব্দগুলো সূচের মতো এসে বিঁধল হেলাল সাহেবের বুকে৷ চোখ বন্ধ করে ফেললেন অসহনীয় ব্যথায়। মনের ভেতর কী চলছে তা বাক্যে বয়ান করতে পারবেন না তিনি। মাথা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে নিতেই এক জীবনী মনে পড়ে গেল। জন্ম থেকে এতকালের একেকটা দিন। পাশাপাশি রুমে দুটো সন্তান দু-রকম ভাবে বিধ্বস্থ। মুখ দিয়ে উচ্চারণ না হলেও বারবার খোদার নিকট ক্ষমা চাইলেন। সুস্থ করে দেওয়ার আর্জি করলেন। চোখ বেয়ে পানি পড়ল টপটপ করে। বেদনার্ত আওয়াজ গুলো চার দেয়ালির মধ্যে যেভাবে আটকে থাকে, হৃদয়ের ভেতরের কথাগুলো সেভাবে আটকে রইল। পানিগুলো সাদা টাইলসেই মিশে গেল। কানে বাজছে ঘন্টাখানেক আগের কথা, অ্যাবোর্শন করালেও রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভবনা পঁঞ্চাশ পার্সেন্ট। মির‍্যাকেল বাঁচাতে পারে। ঈশ্বর এর নিকট প্রার্থনা করতে থাকুন।’
জায়িন এটা শোনার পর থেকেই হাত পা ছড়িয়ে পড়ে ছিল। কোনোপ্রকার উচ্চবাক্য ব্যয় করেনি। অ্যাগ্রোসিভ আচরণ করেনি। ব্যাপারটা শোনার পর থেকেই এমন থমকে গেছে সময়। দেশ থেকে অনবরত কল আসছে। কারোর কল তুলছেনই না। কী জবাব দিবেন তিনি? একের পর একজনের কল আসছে, আর আসতেই আছে। হেলাল সাহেবের ভাবনা কেটে গেল শব্দে। দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ডাক্তার।। হেলাল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। পা টলে গেল সামান্য। ব্যাপারটা ধরতেই পারলেন না তিনি। এক পা দু-পা আগালেন যতো ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ ততো বেশি জোরালো মনে হলো। শ্বাস ত্যাগ করার ধ্বনি নিজের কানের কাছেই বেশি ঠেকল। ডাক্তার হাতের গ্লাভস খুলে রাখলেন। তারপর মুখের মাস্ক। রোবটিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে কিছু একটা বললেন। ব্যাপারটা শুধু শুনলেন হেলাল সাহেব, টু শব্দটি করলেন না। করার মতো শক্তি নেই।

একসময় কথা শেষে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন তারা। কানের কাছে আর্তনাদ বাড়ছে। এই প্রহরে করিডোরে কে এভাবে কাঁদছে? কী তীক্ষ্ণ সেই শব্দ। কানে খুব করে বাজছে।
এক পা দু-পা করে পাশের রুমের দিকে আগালেন হেলাল সাহেব। জায়িনকে সিজদায় দেখতে পেলেন। হাসলেন সামান্য বয়স্ক। দাঁড়িয়ে রইলেন নামাজ শেষ হওয়ার জন্য। জায়িনের দীর্ঘ সিজদাহ্ শেষ হয়নি তখনো। হেলাল সাহেবের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। খুশির কান্না নাকি দুঃখের কান্না বোঝা দায়। ঘড়ি শব্দ করে ডেকে উঠে জানান দিল দুপুর দুটো বেজে গেছে। হেলাল সাহেব হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলেন জায়িনের শরীর। ছেলেটা নড়ছে না কেন? গায়ে ধাক্কা টাক্কা না দিয়ে প্রথমে ডাকলেন,”জায়িন, এই জায়িন?

জায়িনের থেকে জবাব আসলো না, সে তো আল্লাহর দরবারে লুটিয়ে পড়েছে। ছেলেকে ব্যাপারটা কীভাবে জানাবেন, কীভাবে নিবে, কী আচরণ করবে, ধরতে পারছেন না তিনি, তবুও তো জানাতে হবে। ঠোঁট ছিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চোখ বেয়ে টুপ করে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। সিজদাহ থেকে উঠছে না দেখে গায়ে ধাক্কা দিলেন, আর দিতেই বুকটা ধড়াস করে উঠল। বাহিরের আহাজারি এখনো ভেসে আসছে। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর কথা ভাবলেও পারলেন না, তার সামনেই ডলে পড়েছে জায়নামাজে জায়িন। ঠান্ডা হয়ে আছে পুরো শরীর। হেলাল সাহেব গগন বিদারী চিৎকার দিলেন জায়িন বলে। তবুও কোনো উত্তর আসলো না, জায়িন পড়ে রইল নিজের জায়গায়৷ অতঃপর নর-নারীর কান্নায় পুরো করিডোর ভারী হয়ে উঠল।

“সকালে কী বলেছিলে মনে আছে?
নুসরাত বাড়ানো হাত গুটিয়ে নিল। শুধাল,” কী বলেছিলাম?
মুখটা তখনো গোমড়া করে রাখা। ভালো লাগছে না কিছু। হাত পা ছড়িয়ে পড়ে থেকে কিছুক্ষণ কাঁদলে ভালো লাগত, কিন্তু কান্না তো আসছে না৷ আরশের গলার স্বর ভেসে এলো,”জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ থাকলে বিয়ে করবে না।
“এসব ধরে বসে আছেন আপনি?
“ তো বসব না, এত বড় কথা বললে তুমি।
নুসরাতের অভ্যাস হয়ে গেছে কয়েকদিনে তুই, তুমি, আপনি এর বেড়াজালে থেকে। এখন আর তুমি বলাতে কোনো কিছু যায় আসে না তার। অদ্ভুত লাগলেও কথা বাড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে না, তাই হার মানল,”আর বলব না। এবার ফুল দিয়ে দিন।।
কথা শেষ করতে পারল না হাচ্চি দিয়ে উঠল। আরশ একবার ফুলের দিকে তাকাল একবার নুসরাতের দিকে। জিজ্ঞেস করল,”এলার্জি ফুলে?

মিথ্যা কথা বলল মাথা দুলিয়ে দু-পাশে। হাত বাড়িয়ে ফুলের বুকেট নেওয়ার আগে আরশ পিছনে সরিয়ে নিল। বলল,”আগে আমার কথার উত্তর দেয়, তারপর দিচ্ছি।
আরশ থামল। বলল,”জীবনে আর বিয়ের সুযোগ থাকলে তুই বিয়ে করবি?
কোনোপ্রকার ত্যাড়ামি না করেই উত্তর দিল নুসরাত,”করব।
ফুল নেওয়ার জন্য হাত পেতে রইল, তারপরও তার হাতে লাগল না তা। বিরক্ত হিয়ে শুধাল,”দিবেন না?
“একমিনিট, দিচ্ছি! আগে প্রশ্নে ফিরে যাই।
নুসরাতের ইচ্ছে করছে হাত পা ছড়িয়ে ঠান্ডা কোথাও শুয়ে পড়তে, আরশের সাথে বাক্য ব্যয় করার মতো ইচ্ছে হচ্ছে না। মোবাইলের দিকে এর মধ্যে পাঁচ ছ-বার তাকাল। আরশ আবার জিজ্ঞেস করল,”বিয়ের সুযোগ থাকলে কাকে করবি?
সামনের জনের ইচ্ছে অনুযায়ী উত্তর আসল,”আপনাকে।

মনে মনে খুশিতে গদগদ করে উঠলেও বাহিরে প্রকাশ করল না। কান পরিস্কার করে বলল,”শুনতে পাইনি, আবার বল, কাকে বিয়ে করবি?
নুসরাত বিরক্ত হতে গিয়েও হেসে ফেলল। বলল,“কী ছেলে মানুষি লাগিয়ে রেখেছেন, বলেছি তো একবার।
“আবার বল, শুনতে ভালো লাগছে। সাউন্ড’স গুড।
নুসরাত উত্তর দিল,” আপনাকে বিয়ে করব।
হয়েছে, খুশি? বলতে চাইল তার আগেই হাতের মোবাইলটা বেজে উঠল। হেলাল সাহেবের কাছ থেকে কল এসেছে। আরশের হাতের ফুলের বুকেটটা নুসরাতের বুকে ঠাঁই পেয়েছে এর মধ্যেই৷ মোবাইলটা হাসিমুখে কানে লাগাতেই হআসির লেশ মিটে গেল নিমেষেই। হ্যালো বলতে পারল না, তার পূর্বে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা খবর পেয়ে হাত থেকে কালো আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত মোবাইলটা উড়ে গিয়ে পড়ল রাস্তায়। বুকের কাছে থাকা ফুলগুলো খসে গেল। চোখ বেয়ে এক ফোটা পানি পড়ল৷ এতক্ষণ যে জল গুলো কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না বের হওয়ার তা বের হওয়ার কারণ পেয়ে গেল। নুসরাতের স্বাভাবিক স্থিতি সরল। পা দুটো অবস হয়ে আসলো। পুরো দুনিয়ার ভার মনে হলো তার কাঁধে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধড়াম করে পড়ে গেল। দুটো হাত যে আগলে নিল, বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই সেদিকে। শূণ্য মস্তিস্ক, শূণ্য চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কানে তখনো একধারে বাজছে,”ইসরাত বেঁচে নেই, মা। সে আর বেঁচে নেই। আল্লাহ নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছেন। জায়িন…

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭২

জায়িনের কথাটা পূর্ণ করতে পারেননি, তার পূর্বেই মোবাইলের স্ক্রিন ভেঙে চূরমার হয়ে গেছে। আরশ জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে কী হয়েছে, নুসরাতকে উত্তর দেওয়ার জন্য কোনো তাড়াহুড়ো করতে দেখা গেল না। নিশ্চুপ অনেকক্ষণ থেকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। যে নিজের দূর্বলতা দেখাতে চায় না, সে দিন দুনিয়া ভুলে রাস্তার ধারে বসে থেকে কাঁদল। তার আহাজারিতে নাকি প্রকৃতির ডাকে বৃষ্টি নামল বোঝা গেল না। সেই বৃষ্টির সাথে তার কান্না, আওয়াজ সব ঢাকা পড়ে গেল। সাথে কানে বাজনা বাজা শব্দটা ও থেমে গেল,”ইসরাত আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here