Home প্রিয় বেলিফুল প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৭

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৭

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৭
উম্মে হাবিবা

মেহতাব ভিলার সামনে গাড়ি থামতেই সোহা ধীরে দরজা খুলে নামল। মাথাটা এখনো ঝিমঝিম করছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত ভারী একটা অনুভূতি। আজকের দিনটা যেন তাকে পুরো ভেঙে দিয়েছে।
সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে চোখ গেল।
সেখানে সোফায় বসে আছে আদিবা আর রাজিয়া চৌধুরী।
দুজনে বসে বসে টিভি দেখছে।
সোহাকে এভাবে হঠাৎ ফিরতে দেখে আদিবার চোখে কুটিল ঝিলিক ফুটে উঠল।
কে এসেছে দেখার জন্য কিচেন থেকে বেরিয়ে এলেন রুনিয়া মেহতাব।
সোহাকে দেখে মুখে মায়া ফুটে উঠল।

— আরে মা, এত তাড়াতাড়ি? শরীর খারাপ নাকি?
সোহা কষ্ট করে ঠোঁটে হাসি আনল।
— না আম্মু… একটু মাথা ধরেছে।
রুনিয়া এগিয়ে এসে কপালে হাত রাখলেন।
— মুখটা এমন শুকনো কেন? যাও, ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে কিছু খেয়ে নিও।
সোহা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
— ভালো লাগছে না আম্মু। একটু ঘুমাবো।
বলেই আর দাঁড়াল না। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
সোহা চোখের আড়াল হতেই আদিবা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
দেখলেন? এই মেয়ের চালচলন আমার একদম সুবিধার লাগে না।
রাজিয়া চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
— কলেজে গিয়ে কী করে কে জানে! এখন আবার দেখেন কেমন মুখ করে ফিরেছে।
রুনিয়া বেগম বিরক্ত হলেন।
— তোমরা না বুঝে এসব কথা বলো না। মেয়েটার শরীর ভালো নেই।
আদিবা কুটিল হেসে বলল,
— শরীর খারাপের আড়ালে অনেক কিছুই লুকানো যায় মামি।
রুনিয়া এবার কড়া চোখে তাকালেন।
— যথেষ্ট হয়েছে আদিবা। কারো সম্পর্কে না জানে তাকে নিয়ে ধরণা করার অভ্যাস এবার বদলাও।
আদিবা চুপ করলেও মুখে রাগ জমে রইল।
সোহা রুমে এসে আর নিজেকে আটকাতে পারলো না ব্যাগ টা রেখে সোজা ওয়াসরুমে ডুকে গেলো। ঝরনা ছেড়ে দিয়ে তার নিচে বসে জোরে জোরে কান্না করতে লাগলো। কতো সময় এভাবে বসে ছিলো তার কোনো হিসেব নেই। অনেক টা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর কোনো মতে জামা কাপড় পাল্টে শরীরটা টেনে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে আসে। ভেজা চুল নিয়েই শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।

বিকেলে সব কাজ শেষ করে পার্কিং এরিয়াতে যায় রুদ্র। তার
মাথার ভেতর বারবার ভেসে উঠছে সোহার কান্নাভেজা মুখ। নিজের ওপরই বিরক্ত লাগছে।
নাহ তারাতারি ফিরতে হবে মেয়ে টাকে তখন ওভাবে বলা উচিত হয়নি।
ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল দুটো চেনা মুখ
রবিন আর সিফাত।
কলেজ জীবনের বন্ধু।
— আরে রুদ্র!
রবিন জোরে হেসে বলল। সিফাত এসে কাঁধে চাপড় দিল।
— কোথায় হারিয়ে গেছিস রে?
রুদ্র একটু জোর করে হাসলো। আমি কই হারালাম তোরাই তো হারিয়ে গেছিস।
এখন কোথায় যাচ্ছি বাসায়?
হুম কলেজের কাজ শেষ ভাবলাম বাসাতেই যাই বাহিরে তো কোনো কাজ নেই এখন।
সিফাত বললো,, শুনলাম বিয়ে করেছিস। একটা বার জানালিও না
তোদের কারো সাথেই তো যোগাযোগ নেই জানাবো কিভাবে।
রবিন বলে ফয়সালের সাথে নাকি ঝামেলা চলে?
রুদ্র হালকা হেসে বলে তেমন কিছু না। আসলে সে চায় না তার আর ফয়সালের ঝামেলার ব্যপারে কেউ জানুক।

— আচ্ছা এখন তো কোনো কাজ নেই চল বসি।
রুদ্র প্রথমে না করলেও ওরা একরকম টেনেই নিয়ে গেল কাছের এক ক্যাফেতে।আড্ডা শুরু হলো।পুরনো স্মৃতি।কলেজের দুষ্টুমি শিক্ষকদের গল্প। সব চলছিল।
কিন্তু রুদ্রর মন কোথাও নেই। তার চোখে বারবার ভেসে উঠছে—
সোহা। তার কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যাওয়া।
রবিন সেটা টের পেয়ে বলল,
শুনেছি বিয়েতে তোর মত ছিলো না? তা এখন কি ভাবির প্রেমে পড়েছিস নাকি?
রুদ্র চুপ করে থাকল। সিফাত হেসে বলল,
— দেখ! মুখটাই সব বলে দিচ্ছে।
রুদ্র এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— জানি না… সত্যি কি তাই, আমি তো জানি আমি মেয়েটাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি তাহলে কেনো বললাম জানি না।
আমি ভালো বাসি মেয়েটাকে।
রুদ্র দূরে আকাশটার দিকে তাকালো। চাঁদ টা ক্ষণে ক্ষণে মেঘের আড়ালে যাচ্ছে।
আড্ডা শেষ হতে হতে রাত আটটা। রুদ্র উঠে দাঁড়াল। রবিন আর সিফাত কে বাসার ঠিকানা দিয়ে তাদের থেকে বিদায় নিলো।
বাড়ির পথে যেতে যেতে রাস্তার পাশে একটা ফুলের দোকানে গাড়ি থামাল।
সোহা বেলি ফুল পছন্দ করে। তবে আজ বেলি নিলো না,, এ গুচ্ছো লাল গোলাপ নিলো।
আজকের আচরণের জন্য তার খারাপ লাগছে,,,, মাফ চাইবে।
নিজের অনুভূতি গুলো প্রকাশ করবে মেয়েটার কাছে।
ভাবা যায় পিচ্চি একটা মেয়ে তাকে বস করে নিয়েছে।
এসব ভেবে মুচকি একটা হাসি দিয়ে গাড়ির ভিতরে বসলো।
ফুল হাতে গাড়িতে বসতেই ফোনে টুং করে মেসেজ এল।

Unknown Number।
কয়েকটা ছবি। রুদ্র খুলে দেখল।
প্রথম ছবিতে—
সোহা একটা ছেলের বুকের মধ্যে।
দ্বিতীয় ছবি—
সোহা ছেলেটার বুকে থেকেই তার হাত ধরে রেখেছে।
তৃতীয় ছবি—
দুজন খুব কাছাকাছি। ছেলেটা সোহার পিঠে হাত দিয়ে জড়িয়ে আছে,, আর ছেকেটা আর কেউ নয় রাফিন।
মুহূর্তেই রুদ্রর মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। হাতের ফুলগুলো মুঠোর চাপে চূর্ণ হয়ে গেল। চোখ লাল হয়ে উঠল। সে স্টিয়ারিংয়ে সজোরে ঘুষি মারল।
—রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো,, সোহা শুধু আমার,, ওর সাহস কি করে হলো অন্য একজনকে জড়িয়ে ধরার।
রুদ্রের বুকের ভেতর জ্বলে উঠল ভয়ংকর রাগ। সব ব্যথা, সব অনুশোচনা মুহূর্তে বিষে বদলে গেল। উন্মাদের মতো গাড়ি চালিয়ে বাড়ির দিকে ছুটল।
কিন্তু এতো চতুর রুদ্র একবার ও এটা ভাবলো ন াছবি গুলো কে পাঠিয়েছে।

ঘুম ভাঙতেই মাথাটা ভারী লাগছিল।ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।
রাইসা।
কল ধরতেই ইচ্ছে না থাকা সত্যেও ধরলো…. ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ—
— কেমন আছিস?
— হুম ভালো।
— আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম রে।
সোহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর দুজন কথা বলতে লাগল।
রাইসা হঠাৎ বলল,
— আজ রাফিন স্যার না থাকলে কি যে হতো …
সোহা বলল,
— কি হতো এতক্ষনে দাফন দিয়ে আসতো।
এসব কথা বলিস না সোহা আমার কষ্ট হয়। আর তা ছাড়া ভাইয়া জানলোও কেমন কষ্ট পাবে ভাব।
সোহা ভিতর থেকে একটা তাচ্ছিল্য ভরা হাসি আসলো।
সব থেকে বেশি খুশি হতো হয়তো।
রাইশা বুঝতে না পেরে বলে_কিছু বললি?
হুম..না কিছু না।
রাইসা একটু থেমে বলল,

— তবে একটা কথা বলি? আমার মনে হয় রাফিন স্যার আমাকে একটু আলাদা ভাবে দেখে।
সোহা স্বাভাবিক ভাবেই বললো
— কিভাবে বুঝলি।
— তখন আমার থেকে তোর কথা শুনার পর আমাকে জোর করে উনার গাড়িতে উনার পাশের সিটে বসিয়েছেন।
আবার তোকে পৌঁছে দিয়ে আসার সময় আমার বাসার সবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন।
পরে তোর কথা জিজ্ঞেস করায় আমি তোর বাবর বাড়ির কথায়ই বলছি যেহেতু তুই বিয়ের বিষয়টা হাইড রেখেছিস তাই।
সোহা হাসলো,,বোকা রাইশা বুঝতেও পারছে না রাফিন আসলে রাইশার না তার প্রতি ইন্টারেস্টেড। তবে সোহা এটা হতে দিবে না সে চায় না তার একমাত্র প্রিয় বান্ধবী কষ্ট পাক সে কিছু একটা করবেই।
রুদ্র বাসায় ফিরে হনহন করে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছে রুনিয়া আর আশরাফ মেহতাব তাকিয়ে দেখছিলেন। আশরাফ রুনিয়াকে বলে__
কি হয়েছে বলতো বউমা, রুদ্র কে দেখে মনে হচ্ছে ভিষন রেগে আছে।
জানি না বাবা।মেয়েটাও দুপুরে রুমে গেলো আর বের হলো না খাবার ও খেলো না।
রাইশা আবার বললো _ আর জানিস রাফিন স্যার __ সোহা রাইশাকে থামিয়ে দিয়ে বলে_
রাফিন ___ বাকি কথা শেষ করার আগেই,, দরজা ধাক্কা মেরে খুলে গেল।
রুদ্র চোখ রক্তবর্ণ। হাতে চূর্ণ ফুলের ডাঁটা। সোহা চমকে উঠল।

— আপনি—
কিন্তু রুদ্রর কানে শুধু একটা শব্দই বাজলো “রাফিন”
তার মাথায় মুহূর্তে গেঁথে গেল— সোহা রাফিনের সাথেই কথা বলছে।
ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। ফোনটা ভেঙে টুকরো টুকরো।
সোহা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। — আপনি এটা কী করলেন?!
রুদ্র মুহূর্তেই তার দুই গাল শক্ত করে চেপে ধরল।
এমনভাবে— যেন হাড় ভেঙে যাবে।
সোহা ব্যথায় কথা বলতে পারছিল না। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। রুদ্র দাঁত চেপে বলল,
— এতদূর গড়িয়েছে?
— ক…কি?
— আমার পেছনে এসব করছো? সে ফোনে ছবিগুলো দেখাল।
সোহা স্তব্ধ।
— এগুলো কী?!
সোহা কাঁপা গলায় বলল,,, এটা… এটা দুর্ঘটনা ছিল—

— চুপ! রুদ্র গর্জে উঠল। আমার সামনে নাটক করবে না।
— আপনি ভুল বুঝছেন—
— ভুল? আমি অন্ধ নই।
রুদ্র আরও কাছে ঝুঁকে এল। কলেজে ওর সাথে হাসাহাসি। বাইরে দাঁড়িয়ে কথা। তারপর রাস্তায় বুকের মধ্যে গিয়ে পড়া! এসব কিছু কি ছিলো।
সোহা এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
আপনি ভুল বুঝছেন,, উনি আমাকে বাচি,,,,,
রুদ্র এবার গাল টা আরেকটু জোরে চেপে ধরে,,, তামালের সাথেও বুঝি এভাবে ঘেষেছো । এখন তো আমার সন্দেহ হচ্ছে,,,, ঐদিন তমাল তোমাকে জোরে করছিলো নাকি তুমি তাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।
সোহা স্তব্ধ হয়ে যায় রুদ্রের কথা শুনে। শেষে রুদ্র কিনা তার চরিত্রের দিকে আঙ্গুল তুললো। সোহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

— আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না?
রুদ্র তাচ্ছিল্য হেসে বলে___ বিশ্বাস,, তোমার তো চরিত্রে
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সোহা ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিল।
চোখে আগুন। অপমানে শরীর কাঁপছে।
— Enough!
রুদ্র থমকে গেল।
সোহা কাঁপা গলায় বলল, আজ আপনি আমার চরিত্র নিয়ে কথা বললেন?
চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে।
আপনার সম্পর্কে আমার ধরণা ভুল ছিলো। আমি ভেবেছিলাম আপনি কখনো আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলবেন না। গায়ের রং কারণে চরিত্র নিয়ে অনেক মানুষের অনেক কথা শুনেছি। ভেবেছিলাম আপনি আদালা অন্য রকম মানুষ। কিন্তু আমার ভাবনা ভুল। আপনিও বাকি সবার মতো। পুরো বিষয় না শুনে না জেনে আপনি আমার চরিত্রের উপর আঙ্গুল তুলেছেন।
একসাথে এতো গুলো কথা বলে সোহা থামলো,, তারপর খুব ঠান্ডা কন্ঠে বললো__
ভালোবেসেছিলাম আপনাকে… এটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল।
কথাটা শুনে রুদ্রর বুক কেঁপে উঠল।কিন্তু রাগে সে চুপ।
সোহা চোখ মুছে বলল,

— আজ থেকে আপনার জীবনে আমি নেই।
বলেই রুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
করিডোরে আসতেই রুনিয়া মেহতাব এর সাথে দেখা। সোহা না দাঁড়িয়ে সোজা দৌড়ে ছাঁদে চলে যায়।
রুনিয়া মেহতাব তখন ছেলেকে এভাবে রেগে উপরে আসতে দেখে এখন দেখতে এসেছিলেন কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা।
কিন্তু সোহা এভাবে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো কেনো? বুঝতে পারলেন না তিনি।
রুদ্র তখন ও পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে,, হুশ ফিরতেই একে একে সোহাকে বলা কথা গুলো তার মনে পড়তে লাগলো।
রাগের রুমের জিনিস মেঝে ছুড়ে মারতে লাগলো। প্রতিটা কাঁচে জিনিস ঝন ঝন শব্দ তুলে চূর্ণ বিচূর্ণ হতে লাগলো।
রুনিয়া ভাঙ্গার আওয়াজ শুনে ছেলের রুমের সামনে এসে দাঁড়ান।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরো। বিছানার পাশে মুচড়ে যাওয়া গোলাপ গুলো। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র নিশ্চুপ।
স্থির। চোখ লাল। হাতের গাঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছে।
রুনিয়ার বুক কেঁপে উঠল।
রুদ্র… কী হয়েছে?
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না। রুনিয়া সামনে গিয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। এমন মুখ তিনি বহু বছর দেখেননি।
শৈশবে একবার রুদ্র তার বাবার ওপর রাগ করে নিজের হাত কেটে ফেলেছিল।
আজ সেই একই আগুন চোখে।

— সোহা এভাবে কাঁদতে কাঁদতে কেন বের হলো?
রুদ্র মাথা নিচু করে চুপ হয়ে আছে।
— রুদ্র! আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি!
রুদ্র ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর ফিসফিস করে বলল, — ও আমাকে ধোঁকা দিয়েছে আম্মু।
রুনিয়া ভ্রু কুঁচকে গেলেন।
— কী বলছো?
রুদ্র ফোনের স্ক্রিনে থাকা ছবিগুলো দেখাল।
রুনিয়া কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন, — একটা ছবি দেখে তুমি এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে?
রুদ্র রাগে বলে উঠল, — আমার চোখ কি ভুল দেখেছে?
— চোখ অনেক সময় ভুল দেখে, কিন্তু বিশ্বাস যদি ঠিক থাকে, মানুষ ভুল করে না।
রুদ্র এবার চুপ। কথাগুলো কেমন তীরের মতো গেঁথে গেল।
রুনিয়া ধীরে মুচড়ে যাওয়া গোলাপ ফুলগুলো হাতে তুলে নিলেন।

— এই ফুলগুলো কার জন্য এনেছিলে?
রুদ্র নিচে তাকাল। কিছু বলল না।
রুনিয়া তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, — উত্তর দাও।
খুব নিচু গলায় রুদ্র বলল, — সোহারের জন্য।
— মানে কলেজে কিছু হয়েছিলে, যার জন্য মেয়েটা দুপুরে এমন মুখে ফিরে এসেছিলো।
রুনিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— তুমি জানো তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?
রুদ্র তাকাল।
— তুমি ভালোবাসতে জানো, কিন্তু সেই ভালোবাসার উপর ভরসা করতে জানো না।
এই কথাটা শুনে রুদ্রর বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিল।
তার মনে পড়তে লাগল—
সোহারের কাঁদতে কাঁদতে তাকে কিছু বলতে চেয়ে ছিলো। সত্যি কি সোহার কোনো ভুল নেই? আমি কি একবারও থেমে শুনেছিল?

না শুনি নি তো,, মেয়েটাকে বলতেও দেইনি।
শুধু রাগ করেছি,, অপমান করেছি। চরিত্র নিয়ে কথা বলেছি।
হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
রুনিয়া বেগম বললেন__ মেয়েটা আজ সারাদিন কিছুই খায় নি দুপুরে রুমে এসে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়েছে আর এখন,,, তার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে যেতে লাগলেন।
রুনিয়া চলে যাওয়ার আগে বললেন, — যদি মেয়েটা সত্যিই নির্দোষ হয়, তাহলে আজ তুমি যা করেছো, তার জন্য নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। রুদ্র বিছানায় বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল।
মাথার ভেতর একটার পর একটা দৃশ্য ঘুরছে—
ছাদে বেলি ফুল পরানো সোহা… তার আঙুলে সুই ফুটলে ব্যথা পাওয়া সোহা…রাতে তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে থাকা সোহা…আর আজ…কাঁদতে কাঁদতে চলে যাওয়া সোহা।
হঠাৎ মনে হলো বুকের ভেতর কেউ ছুরি বসিয়ে দিয়েছে।
রুনিয়া মেহতাব রুদ্রের রুম থেকে বেরিয়ে সোজা ছাদে চলে আসেন। সোহাকে দেখতে পেয়ে,,রুনিয়া কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। অন্তত বাড়ি ছেড়ে যায়নি।
ছাদে উঠে সোহা সোজা গিয়ে সেই দোলনাটায় বসে পড়ল।
রাতের ঠান্ডা বাতাস তার এলোমেলো চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে।
আকাশে আধখানা চাঁদ।

কিন্তু আজ সেই চাঁদের আলোও যেন তার কাছে বিষাদময় লাগছে।
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল—সেই বেলি ফুল গাছটার দিকে।কাল বিকেলের সেই মুহূর্তটা মনে পড়ে গেল। রুদ্র নিজের হাতে ফুল ছিঁড়ে দিয়েছিল। চুলে গুঁজে দিয়েছিল।
সেই মানুষটাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার চরিত্র নিয়ে কথা বলল!
সোহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
রুনিয়া মেহতাব ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন সোহার দিকে।
নিজের সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে তাকালো সোহা।
নিজের মায়ের মতো শাশুড়ী কে সামনে দেখে নিজের কান্না লুকাতে চাইলো। জোর পূর্বক হাসতে চাইলো।
তবে রুনিয়া বেগম যেনো বুঝলো। সোহার পাশে বসে তার মাথা আলতো হাত ভুলিয়ে দিলেন।
শাশুড়ীর এমন আদরে কান্নারা যেনো ভিতর থেকে উগলে আসছে। রুনিয়া খুব শান্ত ভাবে বললেন __
আমি জানি মা তোমাদের মধ্যে কি নিয়ে সমস্যা হয়েছে। রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। আমার ছেলেটা তোমাকে খুব ভালো বাসে। যার জন্য তোমাকে অন্য কারো সাথে সয্য করতে পারে না।
সোহা এবার মুখ তুলে তাকালো_ খুব ধীরে বললো_

তাই বলে আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলবে?
রুনিয়া বেগম চোখ বন্ধ করলেন। তিনি মোটেও ছেলের থেকে এটা আশা করেন নি তার এমন গভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলে কিভাবে এমন করতে পারে বুঝতে পারছেন না।
তিনি সোহাকে শান্ত করে বললো নিচে চলে। দুপুর থেকে কিছু খাও নি। খাবে এসো।
খাবো না আম্মু ক্ষিদে নেই।
মায়েদের কথা শুনতে হয় নিছে চলো।
সোহা আর তেমন কিছু বললো না রুনিয়ার সাথে নিচে চলে আসলো।
রুনিয়া বেগম নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দিলেন। গালের ব্যথার জন্য একটু খেয়েই আর খাবে না বললো। তিনি সোহার গালে দিকে খেয়লা করলেন,,,, অনেকটা কালছে হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কেউ খুব জোরে চেপে ধরেছেন।
“সোহাকে বসিয়ে রেখে নিজ রুম থেকে একটা মলম আর ব্যথা কমার ঔষুধ নিয়ে ফিরে এলেন।
মলমটা লাগিয়ে দিয়ে ঔষুধ টা খাইয়ে দিলেন। তার পর বললেন,, যাও ঘুমাতে যাও ”
সোহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে ঐ রুমে জীবনেও যাবে ঘুমাতে।
রুনিয়া বুঝলো সোগার মনের কথা তাই সামান্য হেসে বললো। চলো আমার সাথে। বলে হাত ধরে উপরের ঠিক কর্ণেরে আগের রুমটায় নিয়ে গেলো। যাওয়ার সময় সোহা একবার রুদ্র রুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকালো।
এতো কিছুর পর কি লোকটা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে,, আমার জন্য কি তার মনে সামান্য তম অনুভূতিও জন্মায়নি!. সোহা নিজের উপর উপহাস করলো।

সবাই ঠিকি বলে,, এই গায়ের রং নিয়ে কারোর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না আমি।
রুনিয়া রৌদ এর রুমেস সামনে এসে থামে তারপর কয়েকবার ডাকে। রৌদ দরজা বন্ধ করে পড়ছিলো। হঠাৎ দরজায় আওয়াজ হওয়ায় খুলে দেখে সোহা আর রুনিয়া দাঁড়িয়ে।
কি ব্যপার মা তুমি এখন এখানে।
রুনিয়া ভিতরে ডুকলেন না। শুধু বললেন, সোহা আজ তোমার রুমে ঘুমাবে তোমার কোনো সমস্যা হবে?
রৌদ তো খুশিতে আত্মহারা। অসুবিধা হবে কেনো মা আমি তো অনেক খুশি।
রুনিয়া সোহার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে। আজ এখানে থাকো কাল তোমার জন্য একটা রুমে সুন্দর করে গুছিয়ে দিবো।
সোহা মাথা নাড়ে রুনিয়া বেরিয়ে যায় রুম থেকে।
রুদ্র রুম থেকে বেরিয়ে সারা বাড়ি সোহাকে খুঁজেছো ছাদেও দেখে এসেছে। এমন সময় রুনিয়ার সামনে পড়ে।
রুনিয়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে ,, কাকে খুঁজচ্ছো

আম্মু সোহা কোথায়?
ঘুমাতে গিয়েছে।
কোথায়?
সেটা তোমার জানার বিষয় না।
রুদ্র মাথা নিচু করে নেয়।
আজ রৌদের সাথে ঘুমিয়েছে,, কাল আলাদা রুম দিবো ওকে। ও এখন থেকে আলাদা রুমে থাকবে। আজ রুম ছাড়লো,, হয়তো একটা সময় পর এই বাড়ি ছেড়ে তোমাকে ছেড়েও চলে যাবে। কথা খানা বলেই রুনিয়া মেহতাব গটগট পায়ে হেঁটে চলে যান।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৬

আর রুদ্র…
সে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
আজ প্রথমবার নিজের ভেতর ভয় অনুভব করল।
সত্যি যদি সোহা তাকে ছেড়ে দেয়?
এই ভাবনাটাই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করল।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here