প্রিয় রাগিনী পর্ব ১২
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
– নাসির কে. ইন্ডাস্ট্রিজ আমাদের কোম্পানির সাথে জয়েন্ট প্রোজেক্টে কাজ করতে চায়। কলম হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো রাশেদ।
রাশেদের কথা শুনে সামনে বসে থাকা আনিসুল, হামিদ, হাশিম, আজমির, শফিউর, আমির, জায়েদ সাহেব কপালে ভাঁজ ফেললো।
– তার মতো এতো বড় কোম্পানির মালিক আমাদের সাথে কাজ করতে চাচ্ছে—বেশ ভালো খবর তো! উৎফুল্ল গলায় বললেন জায়েদ খান।
– তুই কি বলিস? আনিসুল সাহেব শফিকুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।
শফিকুল সাহেব ভেবে নিয়ে বললেন—
– যদি আমাদের সাথে কাজ করতে চায়, তাহলে আমরা তার প্রস্তাব একসেপ্ট করি। তোমরা কী বলো?
হামিদ, হাশিম, আজমির, আমির, জায়েদ সাহেব একসাথে বললেন—
– আপনারা যেটা ভালো মনে করবেন, এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।
এ নিয়ে তাদের মধ্যে টুকটাক আলাপ হলো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
পাশেই নীরব দর্শকের মতো বসে আছে শারমিন, লাবিব, আবির, সাফওয়ান আর রাশেদ।
শারমিন আড়চোখে তাকালো রাশেদের দিকে। সিগারেটের পুরে যাওয়া ঠোঁট, চুলগুলো পরিপাটি করে সেট করা, সাদা শার্টে হালকা হাসি নিয়ে সাফওয়ানদের সাথে কথায় মগ্ন—প্রিয় মানুষটিকে আজ বেশ অন্যরকম লাগছে। সেদিন রাতের পর থেকে কেউ কারো সাথে কথা বলেনি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শারমিন। হঠাৎ রাশেদ চোখ তুলে তাকাতেই শারমিন দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো। রাশেদও একপলক তাকিয়ে আবার চোখ ঘুরিয়ে নিলো।
বড়দের আলোচনা শেষে আনিসুল সাহেব রাশেদকে বললেন—
– নাসির গ্রুপকে জানিয়ে দাও আমরা প্রস্তাবে রাজি।
রাশেদ হালকা মাথা নাড়লো।
সবাই চলে যেতেই শফিকুল সাহেব রাশেদকে ডাকলেন।
রাশেদ পিছন ফিরতেই তিনি বললেন—
– আজ থেকে শারমিন তোমার সাথে এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে।
কথা শুনে রাশেদের কপালে ভাঁজ পড়লো। কিছু না বলে শুধু “ঠিক আছে” বললো আর চলে গেলো। পিছন পিছন শারমিনও বেরিয়ে এলো।
এদিকে বাগানে দাঁড়িয়ে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া। চিন্তায় কুঁকড়ে আছে—জ্যাকিকে কোথায় রাখবে? বাড়ির ভেতরে রাখা যাবে না, মায়ের কড়া নির্দেশ। তাই ঠিক করেছে বাগানের একপাশে ছোট একটা ঘর বানাবে। কিন্তু ঘর বানাতে অনেক কিছু প্রয়োজন, কিভাবে করবে সে—এই ভেবেই বিরক্ত।
উপরে থেকে হামিদা বোনের রাগী মুখ দেখে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এসে কাঁধে হাত রেখে বললো—
– রেগে আছিস কেন?
– দেখ না আপা, ঘর বানাত অনেক কিছু লাগবে সেগুলো তো নেই আমার কাছে। খুব বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
পিছন থেকে লামহা বলে উঠলো—
– মাথা মোটা, এতো ভেবে কী হবে? ডগ হাউস কিনে আনলেই তো হয়!
লামহার কথা শুনে লামিয়ার চোখ চকচক করে উঠলো—
– ঠিকই তো বলেছিস! এখনই কিনে আনবো!
হামিদা চিন্তিত মুখে বললো—
– কিন্তু কীভাবে আনবি? বাবা তো বাসায় নেই। টাকা পাবি কোথায়?
লামিয়া কপাল কুঁচকে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ ভেবে তাড়াতাড়ি নিজের রুমের দিকে দৌড় দিলো। হামিদা আর লামহা পিছন পিছন গেলো।
।
।
অন্যদিকে রাশেদের কেবিনে সোফায় বসলো শারমিন। রাশেদ নিজের টেবিলে বসে কাদের সাহেবকে ফোন করলো।
– আমরা প্রস্তাবে রাজি, জানিয়ে দিন নাসির কায়সারকে।
ওপাশ থেকে কাদের সাহেব খুশি হয়ে বললেন—
– তাহলে আজই স্যার আপনাদের কোম্পানিতে যাবেন, সবার সাথে দেখা করতে।
রাশেদ “ঠিক আছে” বলে ফোন কেটে রাখলো।
ফোন শেষ হতে দেখে শারমিন নিচু গলায় বললো—
– আমি কোথায় থাকবো? মানে আমার বসার জায়গা কোথায়?
রাশেদ ফোনে কিছু করতে করতে গম্ভীর স্বরে বললো—
– আমার কোলে এসে বসতে পারেন।
শারমিন হকচকিয়ে বড় বড় চোখ করলো—
– মানে?
রাশেদ শীতল চোখে তাকালো, তারপর চেয়ার থেকে উঠে দরজা লাগিয়ে দিলো।
শারমিন তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললো—
– একি! দরজা লাগালেন কেন? দরজা খু…
আর বলতে পারলো না। রাশেদ এগিয়ে এসে হঠাৎ তার চুল খপ করে ধরলো।
ব্যথায় চোখ বন্ধ করে শারমিন বললো—
– কী করছেন? ছাড়ুন! ব্যথা পাচ্ছি…
রাশেদ আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। শারমিনের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। শান্ত চোখে তা দেখে রাশেদ ঠান্ডা গলায় বললো—
– এসব শরীরের সাথে লেপ্টানো জামা পরে সবাইকে শরীর দেখিয়ে ঘুরবেন—বেশ ভালো কথা। কিন্তু আমার এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতে চাইলে এসব শরীর দেখানো পোশাক পড়া যাবে না।
বলেই তার চুল ঝাড়া মেরে ছেড়ে দিয়ে ফোন হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
চোখের পানি মুছে শারমিনও বেরিয়ে এলো।
নিজের কেবিনে বসে কাগজপত্রে চোখ বুলাচ্ছিলো লাবিব। হঠাৎ ফোনে মেসেজ আসতেই ক্লিক করে মেসেজ পড়লো। পড়ে হেসে উঠলো। ফোনটা টেবিলে রেখে আবার কাজে মন দিলো।
কালো কিছু গাড়ি এসে থামলো IK গ্রুপের বিল্ডিংয়ের সামনে। একে একে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো কালো স্যুট পরা কয়েকজন বডিগার্ড। তারা চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হলো, নিরাপদ, তারপর গাড়ির দরজা খুলে নামলো নাসির কায়সার।
সাদা শার্টের উপর ধূসর ব্লেজার, চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে সিগারেট।
নাসির কায়সার ঠোঁটে সিগারেট ধরে সুখটান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি খেললো। তার পেছনে গম্ভীর মুখে হাঁটছে নিহিড়।
ভেতরে খবর পৌঁছে গেলো রাশেদের কাছে।
রাশেদ ব্লেজার গায়ে চাপিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। সিঁড়ির সামনে দাঁড়াতেই নাসির কায়সারের চোখ পড়লো রাশেদের উপর।
রাশেদ ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে হাত বাড়িয়ে দিলো।
— Welcome to IK Group, Mr. Nasir Kayser।
নাসির কায়সার হালকা হাসি দিয়ে হাত ধরলো।
— Pleasure is mine, Mr. Rashed Islam।
রাশেদ হেসে বললো—
— আসুন।
বলেই নিজের কেবিনে চলে গেলো। তার পিছনেই নাসির কায়সারও এসে ভিতরে বসলেন। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো লাবিব, আবির আর সাফওয়ান। তারা সবাই নাসির কায়সারের সঙ্গে হেসে হ্যান্ডশেক করলো। কৌশল বিনিময় করে টুকটাক কথা বলতে লাগলো।
আকাশে মেঘ জমেছে, মনে হচ্ছিলো বৃষ্টি হবে।
অফিসে নিচে এসে দাঁড়ালো লামিয়া। গায়ে হলুদ রঙের থ্রি-পিস। কোলে জ্যাকি, বিরক্ত মুখে অফিসের দিকে পা বাড়ালো। হাঁটতে হাঁটতে বিরবির করে তায়েব তায়েবা মাহিরকে বকতে লাগলো। একজন ঘুমিয়েছে, আরেকজন বান্ধবীর বাসায়, আরেকজন যে কোথায় গেছে একশো বার কল করেও পাওয়া যায়নি। তাই বিরক্ত হয়ে নিজেই এসেছে একা।
হামিদ সাহেবের কেবিনে ঢুকতেই আরেকবার বিরক্ত হলো—বাবা আবার কোথায়? দিশেহারা হয়ে রাশেদের কেবিনের দিকে পা বাড়ালো। বাবা নেই, ভাইয়া তো আছে। হালকা হেসে রাশেদের কেবিনের দরজা খুলে প্রবেশ করলো। আশেপাশে কারোর দিকে না তাকিয়ে সরাসরি রাশেদের কাছে এগিয়ে গেলো।
হঠাৎ অফিসে লামিয়াকে দেখে রাশেদ, লাবিব, আবির, সাফওয়ান বেশ অবাক হলো।
নাসির কায়সার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। সে আশাও করেনি যে আজকেই লামিয়ার দেখা পাবে।
রাশেদ লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বুঝলো সে বেশ রেগে আছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে লামিয়ার কাছে এগিয়ে বললো—
— কি হয়েছে, এত রেগে আছিস কেনো, হঠাৎ অফিসে?
— বাবা কোথায়, ভাইয়া? — বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো লামিয়া।
— চাচারা সবাই মিটিংয়ে আছে।
— কখন শেষ হবে মিটিং?
— ঘন্টা খানেক লাগবে।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে সোফায় বসে পরলো। রাশেদ জ্যাকি কে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো—
— এই কুকুর কোথা থেকে এনেছিস তুই, আর এভাবে কোলে তুলে নিয়েছিস কেনো?
লামিয়া রেগে বললো—
— খবরদার ভাইয়া, কুকুর বলবা না, ওর নাম জ্যাকি, আমার বন্ধু।
রাশেদ ঠোঁট চেপে ধরে পিছনে তাকালো। সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
আবির এগিয়ে এসে জ্যাকি কে কোলে তুলে বললো—
— তুই ওকে কুকুর বলিস কেনো? ওর নাম জ্যাকি, আজকে এটার জন্যও ওর পিঠে ঝাটার বারি পড়েছে।
রাশেদ সকাল সকাল অফিসে এসেছিলো, তাই কিছু জানে না। ভ্রু কুঁচকে বললো—
— সব পরে জানবো, এখন বল কিসের জন্য এসেছিস?
লামিয়া নাটকীয়ভাবে রাশেদের গলা জড়িয়ে কান্না করতে লাগলো। সবাই ভরকে গেলো। সাফওয়ান অস্থির গলায় বললো—
— কী হয়েছে, কেনো কান্না করছিস?
পিছন থেকে লাবিব হেসে বললো—
— ভাইয়া, এইসব কুমিরের কান্না, পাত্তা দিও না।
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকালো লাবিবের দিকে। লাবিব ভেংচি কেটে অন্য দিকে তাকালো।
পাশ থেকে যে চোখ দিয়ে গিলে লামিয়াকে খাচ্ছে, কারোর খেয়াল না থাকলেও , দূরে দাঁড়িয়ে থাকা
একজনের চোখে সেটা ঠিকই পড়লো। রেগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো।
রাশেদ লামিয়াকে মাথায় আদর করতে করতে বললো—
— কী হয়েছে, বোন, আমাকে বল।
— ভাইয়া, আমার কিছু টাকা লাগবে।
রাশেদ পকেট থেকে একশো টাকা বের করে লামিয়ার হাতে দিয়ে বললো—
— নে।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো—
— একশো টাকা দিয়ে কি হবে ভাইয়া?
— তাহলে কতো টাকা লাগবে? — ভ্রু কুঁচকে বললো রাশেদ।
লামিয়া মুখে হতাশা আর রাগের মিশ্রণ নিয়ে বললো—
— কমপক্ষে বিশ হাজার।
রাশেদ বড় চোখ করে বললো—
— কী! বিশ হাজার? এতোটা দিয়ে কি করবি তুই?
— জ্যাকির জন্য ডগ হাউস, কিছু জামা-কাপড় কিনবো, — বললো লামিয়া, চোখে উচ্ছ্বাস নিয়ে।
রাশেদ বিরক্ত হয়ে বললো—
— এই কুকুরের জন্য এতো কিছু কেনো লাগবে বোন?
লামিয়া রেগে বসে পড়লো সোফায়। রাশেদ শেষমেশ উপায় না পেয়ে জেদের কাছে হার মেনে ফোন বের করে বিকাশে বিশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিলো।
লামিয়া ফোন চেক করতেই সোফা থেকে লাফ দিয়ে দাঁত কেলিয়ে বললো—
— থ্যাংক ইউওও!
বলেই চলে যেতে নিলেই রাশেদ বললো—
— গাড়ি নিয়ে যা, আমি ড্রাইভার আংকেলকে বলে দিচ্ছি।
লামিয়া মাথা নেড়ে জ্যাকি কে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
নাসির কায়সার এতোক্ষণ লালোসা দৃষ্টিতে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলো। সেই তেজি চোখ, ভেবেই বাঁকা হাসলো। পাশ থেকে নিহিড় কে কিছু ইশারা করতেই, নিহিড় বুঝে ফোন নিয়ে বের হয়ে কাউকে কল করলো, তারপর কায়সারের কাছে ফিরে এলো।
লামিয়া যেতেই রাশেদ পিছনে ঘুরে কায়সারকে বললো—
— সরি, অপেক্ষা করানোর জন্য।
কায়সার হেসে বললো—
— আরে না, সমস্যা নেই। ছোট্টরা তো এমন জেদ করবেই।
রাশেদ মাথা নাড়ালো। তারপর তাঁরা নিজেদের কথোপকথন শুরু করলো।
অফিস থেকে বের হয়ে সোজা গাড়িতে চড়ে শপিংয়ের জন্য রওনা হলো লামিয়া। ফোনে বারবার মাহিরকে কল করছিলো, কিন্তু ফোন বন্ধ। বিরক্ত হয়ে আর ফোন করলো না।
ঠিক তখন আননোন নাম্বার থেকে WhatsApp মেসেজ এলো। কপাল কুঁচকে লামিয়া ফোন হাতে নিয়ে দেখলো, বেশ কিছু মেসেজ। কিছুদিন ধরে ভীষণ বিরক্ত করছে এই নম্বর থেকে। মেসেজগুলো পড়ে লামিয়া মাঝে মাঝে অবাক হয় । একবার মেসেজে লেখা ছিলো—
“প্রিয় রাগিনী, সারাক্ষণ বাইরে ঘুরে বেড়াও কেনো? প্রতি পদে পদে বিপদ তোমার। তুমি কি জানো? তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে একবারও ভেবে দেখেছো?”
মেসেজ পড়ে লামিয়া ভীষণ অবাক হয়েছিলো। তার মাথায় হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। পরে ভেবেছিলো কেউ হয়তো মজা করছে, তাই মাথা ঘামায়নি।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বিকট শব্দ হলো পিছন থেকে। লামিয়া কেঁপে উঠলো। কোলে থাকা জ্যাকি শব্দে ঘেউ ঘেউ করতে করতে চিল্লিয়ে উঠলো।
লামিয়া ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললো। ড্রাইভার গাড়ি থামাল। লামিয়া জ্যাকি কে গাড়িতে বসিয়ে বেরিয়ে এলো। একটা কালো গাড়ি মারাত্মক এক্সিডেন্ট হয়েছে। চারদিকে ধোঁয়া উড়ছে, কিছু দেখা যাচ্ছে না।
রাস্তার পাশে পাশে থেকে মানুষ দৌড়ে আসছে, চারদিকে ধোঁয়া উড়ছে, ধোঁয়ার কারনে কিছু দেখা যাচ্ছে না। লামিয়া এক পা দু পা করে সামনে এগোতেই থমকে গেলো।
কালো রঙের লং ব্লেজার, পুরো শরীর ঢাকা, মাথায় কালো ক্যাপ, একজন লোক হাতে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ,তার সামনেই গুরুতর আঘাত পেয়ে কেউ তার পা জড়িয়ে বাঁচার আকুতি করছে।
লোকটি পিস্তল দিয়ে সুট করতেই লামিয়া চিৎকার করে উঠলো – নো ডোন্ট সুট। বলেই লোকটির দিকে দৌড়ে আসতে লাগলো।
লোকটি লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে সামনে থাকা ছেলেটির কপালে ঠাস করে সুট করে দিলো। লামিয়ার পা থেমে গেলো। চোখ তুলে লোকটির দিকে তাকাতেই চোখগুলো শুধু দেখা গেলো। লামিয়া লোকটির চোখ দেখে চমকে উঠলো।
আরও সামনের দিকে এগোতে চাইলেই ধোঁয়ায় মিলিয়ে গেলো লোকটি। লামিয়া দৌড়ে যেতেও তাকে আর পেলো না। কে এই লোক আর চোখ দুটো এতো চেনা মনে হলো কেনো।
— ছোট্ট আম্মা, তাড়াতাড়ি গাড়িতে বসুন। বড় বাবা কল করে বলেছে তাড়াতাড়ি করে শপিং শেষ করে বাসায় যেতে। — পিছন থেকে ড্রাইভার বললো।
লামিয়া ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো ড্রাইভারের কথায়। আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে গাড়িতে বসলো।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলো। জ্যাকি লাফ দিয়ে লামিয়ার কোলে বসলো। তার চোখের সামনে একজন লোক আরেকজনকে মেরে ফেললো। আর ওই চোখগুলো এতটা পরিচিত কেনো মনে হলো—কে সে? তাকে কি চিনি?
ভাবতে ভাবতে গাড়ি শপিং মলে এসে থামলো। লামিয়া আর কোনো কিছু না ভেবে জ্যাকি কে কোলে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই সিকিউরিটি পথ আটকে দিলো। লামিয়া কপাল কুঁচকে ফেললো।
সিকিউরিটি ভদ্রভাবে বললো—
— ম্যাম, পশু পাখি এখানে প্রবেশ করতে পারবে না।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো—
— কেনো? ভিতরে তো কুকুর-বিড়ালের সব কিছু পাওয়া যায়, তাই না?
— জী ম্যাম।
— তাহলে ওদের নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে সমস্যা কোথায়? ওদের না দেখিয়ে কিছু কিনলে ওরা পছন্দ না করলে টাকা নষ্ট হবে। তাই ওদের দেখিয়ে কিনাটাই ভালো। এখন তাড়াতাড়ি রাস্তা ছাড়ুন।
সিকিউরিটি কিছু বলতে গিয়ে ফোন পেয়েও কথা বললো। লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো—
— সরি ম্যাম, আপনি যেতে পারেন।
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে হেসে ভিতরে প্রবেশ করলো।
মলে ঢুকতেই লামিয়া কোল থেকে নামিয়ে দিলো জ্যাকিকে। নামার সাথে সাথেই জ্যাকি খুশিতে লেজ নেড়ে নেড়ে হাঁটা শুরু করলো। লামিয়া ওর ছোট্ট পায়ে সাথে রেখে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে লাগলো। যখনই কিছু পছন্দ হয়, জ্যাকিকে দেখিয়ে দেখিয়ে কিনতে লাগলো। জ্যাকি আবার চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে লেজ নেড়ে সবকিছু উপভোগ করছিলো।
কিন্তু তারা জানলোই না, মলের সিসি ক্যামেরার ওপাশ থেকে কেউ তাদের প্রতিটি মুহূর্ত গভীরভাবে লক্ষ্য করছে। লামিয়ার উল্টাপাল্টা কাজকর্মে সেই অচেনা দর্শকের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছিলো।
অনেকগুলো জিনিস কেনাকাটা শেষে, এক এক করে গাড়িতে সব তুলে রাখলো। গাড়িতে বসতেই ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে মাহির নাম ভেসে উঠলো। লামিয়া ফোন ধরেই কিছু বলার আগেই মাহির তাড়াহুড়ো করে বললো—
“তাড়াতাড়ি ভার্সিটিতে আয়, কালকে পরীক্ষা। কিছু নোট করতে হবে। আমি এখন ভার্সিটিতে আছি।”
বলেই ফোন কেটে দিলো।
“কালকে পরীক্ষা?”—শুনেই লামিয়ার কপাল ভাঁজ পড়লো। সারাবছর সে যতই হাসি-ঠাট্টায় সময় কাটাক না কেন, পড়াশোনার ক্ষেত্রে সে ছিলো সিরিয়াস। কারণ তার একটাই স্বপ্ন—ভবিষ্যতে একজন অ্যাডভোকেট হওয়া। পড়াশোনা নিয়ে সে কখনোই হেলা ফেলা করতো না।
মাহির ফোন কাটা মাত্রই লামিয়া আর সময় নষ্ট করলো না। জ্যাকিকে ড্রাইভারের সাথে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজে দ্রুত একটা রিকশায় উঠে বসল।
।
– স্যার, এইটা নিশ্চয়ই ফ্যালকনের কাজ।
নাসির কায়সার চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। লামিয়াকে তুলে আনতেই তার পিছনে লোক পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, তাদের গাড়ি কে যেন উড়িয়ে দিয়েছে। এ কি ফ্যালকনের কাজ? অথচ এখনো সে ফ্যালকনকে চোখে দেখেনি।
কিন্তু ফ্যালকন জানলো কীভাবে, লামিয়ার পিছনে লোক পাঠানো হয়েছে? তাহলে কি সে সবসময় আশেপাশেই ঘুরছে?
ভাবনার ভিড়ে হঠাৎ করেই কায়সারের ফোনে টুং করে মেসেজ এলো। আননোন নাম্বার। কৌতূহলী হয়ে কায়সার মেসেজ ওপেন করলো। ভেতরে একটি ভিডিও।
ক্লিক করতেই স্ক্রিনে স্পষ্ট ভেসে উঠলো—তার গোডাউনে আগুন। ধাউ ধাউ করে জ্বলছে চারপাশ।
কায়সারের চোখ রক্তলাল হয়ে উঠলো। রাগে হাত থেকে ফোন ছুঁড়ে ফেললো দূরে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো, যেন এখনই সবকিছু ছাই করে ফেলবে। দাঁতে দাঁত চেপে, গর্জন করে উঠলো—
-ফ্যালকন… তোকে আমি ছাড়বো না।
আকাশ জুড়ে মেঘ গর্জে উঠলো। যেকোনো সময় নেমে আসতে পারে ঝুম বৃষ্টি।
এদিকে লামিয়া ক্লাস শেষে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ ঝরঝর করে বৃষ্টি নামলো। সাথে বজ্রপাত। আজ সে ব্যাগ আনেনি, শুধু মাহিরের কাছ থেকে নেওয়া নোটের খাতা হাতে ছিলো। সেটাই বুকে শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে রইল।
বৃষ্টিতে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। তখনই হঠাৎ মাথার উপর ছাতার ছায়া। তার গাঁয়ে বৃষ্টি পড়ছে না দেখে অবাক হয়ে উপরে তাকাতেই দেখলো ছাতা। ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে পাশে তাকাতেই চমকে উঠলো।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ। লামিয়ার মুখ আপনাআপনি হা হয়ে গেলো। ছেলেরা ও এতো সুন্দর হয় তার জানা ছিলো না।
সুঠাম দেহ, গায়ের রং সাদা ধবধবে, চোখের মনি কালো কুচকুচে। চোখে হালকা সাদা ফ্রেমের চশমা। ঠোঁটগুলো হালকা গোলাপি। কালো সিল্কি চুল কপালে পড়ে আছে। গায়ে ব্রাউন ওভারশার্ট, সাথে হালকা ব্লু জিন্স। দেখতে একেবারে বিদেশিদের মতো।
লামিয়ার মনে হলো… এই চোখ! কোথাও যেন সে দেখেছে। মলে যাওয়ার সময়? তখন ধোঁয়ায় ঘেরা হলেও এই চোখের গভীরতা যেনো একই।
চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। অচেনা তবুও চেনা মনে হচ্ছিলো। লামিয়া আবার চোখের দিকে তাকাতেই চার চোখ এক হলেই লামিয়া তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিলো। কি আছে এই চোখে কেনো বারবার মনে হচ্ছে এই চোখ সে খুব ভালো করে চিনে।
– এতো বৃষ্টির মধ্যে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? বেশ গম্ভীর স্বরে বললো লোকটি।
কথার শব্দ শুনে ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো।
– আমি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়াই বা শুই, তাতে আপনার কী সমস্যা? কে আপনি? ঝাঁঝালো কণ্ঠে জবাব দিলো লামিয়া।
– আমি কে সেটা না জানলেও চলবে। নিন ছাতাটা।
– আমি কেনো আপনার ছাতা ধরবো? চিনি না, জানি না। বিরক্তি লুকোল না সে।
– আপনি বড্ড কথা বলেন। আপনার নাম কী?গম্ভীর ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো লোকটি।
– আমার নাম দিয়ে কী করবেন?ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো লামিয়া।
– আচ্ছা, নাম লাগবে না। নিন ছাতা ধরুন, অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। বলে জোর করে ছাতাটা তার হাতে ধরিয়ে দিলো, তারপর ধীরে ধীরে চলে গেলো।
লামিয়া স্তব্ধ চোখে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নোটের খাতার দিকে তাকিয়ে ছাতাটা মাথায় দিয়ে সামনে এগোল। সামনে ঠিক তখনই একটা রিকশা এসে দাঁড়ালো। সুযোগ বুঝে লামিয়া ঝটপট উঠে বসল।
রিকশা ঝুম বৃষ্টির ভেতর দিয়ে এগোতে লাগলো। যদি লামিয়া একবার পিছনে তাকাতো, তবে দেখতে পেত—কেউ তাকে দূর থেকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে তাকে।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ১১
রিকশা চোখের আড়াল হতেই লোকটি মৃদু হাসলো। ঠোঁটে ফিসফিস করে উঠলো—
– শক্ত করে ধরিনি হাত, চুরি গুলো ছিল সূক্ষ্ম… শহরে আবার বৃষ্টি নামুক, ঝড়ে যাক তোমার দুঃখ।
তোমার জীবন আমি আবার রঙিন করে দেবো। তোমার সব দুঃখ আমিই দূর করবো। কথা দিলাম… রাগিনী।
