প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩২
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
প্রায় এক ঘন্টা যাবত গোসল করে গরম মাথা ঠান্ডা করে বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো ছবি। গায়ে তাঁর টাওয়াল জড়ানো। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তাঁর হাত হেঁচকা টান দিয়ে দেয়ালে চেপে ধরলো। হঠাৎ এমন হওয়াতে ছবি ভয় পেয়ে চিৎকার করতেই লাবিব ছবির মুখ চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো ” চুপ আমি, একটা সাউন্ড করবি না। ” বলেই ছবির মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলো।
সকালে লাবিব এর সাথে মনিকা কে দেখার পর ছবি বেশ ক্ষেপে আছে তাঁর উপর লাবিব কে এখন সামনে দেখে ছবির রাগ তিরতির করে বেরে উঠলো।
রেগে লাবিবের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইলো কিন্তু লাবিব এক চুল ও নড়লো না। বরং লাবিব অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে ছবির দিকে। সকালে প্রচুর মাথা ব্যাথায় বেলকনির চেয়ারে বসে ছিলো। কোথা থেকে মনিকা এসে জোড় করে লাবিব এর মাথা মালিশ করে দিয়েছে লাবিব হাজার বার মানা করার পর ও মনিকা লাবিব এর কথা শুনে নি।
তখনই ছবি তাদের একসাথে দেখেছে। তাকে দেখে লাবিব বেশ ভয় পেয়েছিলো। তাই এখন এসেছে তাঁর রাগ ভাঙাতে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
লাবিব ছবির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বললো ” এতো গুলো বছর পর সামনে পেয়ে ও এমন ব্যাবহার..? কিন্তু তুই কি জানিস তোর অভাবে আমি কতো পুড়েছি কতো মিস করেছি তোকে…?”
লাবিবের এর কথা শুনে মনে হলো ছবির রাগ আরো বেড়ে গেলো। রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো” কতো মিস করেছেন দেখেছি তো! দেশে এসে আমাকে ভেবে লামিয়ার সাথে কামড়াকামড়ি, আর মনিকার সাথে ঢলাঢলি করেছেন। কী মনে করেছেন কিছু জানি না আমি হ্যাঁ..?
ছবির এমন কথা শুনে লাবিব আগের ঠোঁট গোল করে বললো ” দেখ তুই যেমন ভাবছিস বিষয়টা তেমন নয়।”
ছবি কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো ” তাহলে কেমন বিষয়টা…? ”
লাবিব ঢোক গিলে বললো ” আমি তোকে বুঝিয়ে বলছি।”
ছবি রাগি চোখে তাকিয়ে বললো ” কী বুঝিয়ে বলবেন?মনিকা আপনার ঠোঁটে চুমু খেয়েছে সেটা বুঝিয়ে বলতে চান..?
সেদিন মনিকা তাঁর ঠোঁটে চুমু খেয়েছে ছবি কি করে জানলো। লামিয়া কী বলেছে তাঁকে ভেবেই শুকনো ঢোক গিললো।
লাবিবের এমন ভয় পাওয়া চেহারা দেখে ছবি তেতিয়ে বললো ” কী চেহারার রং পাল্টে গেলো কেনো এখন?”
লাবিব ছবির চোখের দিকে তাকিয়ে বললো ” দেখ সেদিন মনিকা জোড় করে কিস করেছিলো।”
” ওও ওই চুন্নি জোড় কে চুমু গেয়েছিলো আর আপনি তাঁর স্বাদ তৃপ্তি করে নিয়েছিলেন তাই না..?” বলেই চোখ ভিজে উঠলো ছবির।
লাবিব ছবির চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসলো।
এখনো সেই আগের মতোই আছে কিন্তু একটুও চেঞ্জ হয় নি। মেয়েটা ভাঙবে তবু মচকাবে না। ভেবেই ছবির শরীর দিকে চোখ যেতেই যেনো থমকে গেলো লাবিব।
শরীরে টাওয়াল পেঁচানো, ভেজা চুল থেকে টুপ টুপ পানি পড়ছে। লাবিব ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছবির দিকে। সেদিকে ছবির খেয়াল নেই সে অন্য দিকে তাকিয়ে চোখে থেকে পানি ফেলছে। লাবিব নেশাগ্রস্ত দৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়ে আচমকা ছবির গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো। আচমকা এমন হওয়াতে ছবি কেঁপে উঠলো। লাবিব ছবির গলায় ছোট ছোট চুমু এঁকে দিয়ে গলা থেকে মাথা তুলে দেখলো ছবি চোখ বুজে আছে, তা দেখে লাবিব ছবির ভেজা ঠোঁট জোড়া দখল করে নিলো। ছবি লাবিব এর বুকের কাছের টিশার্ট খামচে ধরতেই লাবিব হালকা হেসে ছবির ঠোঁটে আস্তে করে কামড়ে ধরতেই ছবি চোখ খুলে লাবিব এর বুকে ধাক্কা দিতেই লাবিব সরে গেলো বিরক্ত হয়ে তাকালো ছবির দিকে।
ছবি রেগে ঠোঁট মুছে বললো ” আমাকে চুমু খেয়েছেন কোন অধিকারে..?”
লাবিব এইবার আরো বেশ বিরক্ত হলো মনে হয়। বিরক্ত দৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়ে এক পা দু পা ছবির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো ” আয় দেখাচ্ছি কোন অধিকারে চুমু খেয়েছি।” বলেই হেঁচকা টানে ছবিকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় ফেলে সয়তানি হেঁসে বললো ” মায় লেডি, ইউ হেভ বিকাম মোর বিউটিফুল এন্ড হট দেন ডা লাস্ট টাইম।”
ছবি রেগে পাশ থেকে বালিশ তুলে ছুঁড়ে মারলো লাবিবের দিকে। লাবিব হেঁসে বালিশ ধরে পাশে ছুঁড়ে ছবির উপর শরীরের সমস্ত ভার ছেঁড়ে দিয়ে আবার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো।
রাত প্রায় নয়টা,
ইসলাম বাড়ির হল রুমে বসে আছে ছোট্ট থেকে সবাই। তাদের সামনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আরিফ আর আয়না। আনিসুল সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে বেশ বিরক্ত হয়ে। বেশ গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বললো ” একটা বার বলার প্রয়োজন করলে না আমাদের..?”
আরিফ মাথা নিচু করে আছে। রাশেদ সব কিছু সামলে নিয়েছে এবং বুঝিয়ে বলেছে ও তাই আনিসুল সাহেব তেমন কিছু বলতে পারছেন না।
পাশ থেকে আজমির সাহেব বললো ” বড় ভাই যা হওয়ার হয়ে গেছে। ওরা একে অপর কে যখন ভালোবাসে। তাই মেনে নিন।”
আরিফ মাথা তুলে তাকালো আজমির সাহেবের দিকে।
আনিসুল সাহেব হামিদ, আজমির, হাশিম সাহেব এর দিকে তাকালো তাঁরা চোখ দিয়ে সম্মতি জানাতেই আনিসুল সাহেব আয়নার দিকে তাকিয়ে বললো ” তোমার মা বাবা..?”
আয়না মাথা নিচু করে মিনমিন করে বললো ” বাবা মা কোনো দিন আমাদের মেনে নিবে না তাই আমি আরিফের হাত ধরে পালিয়ে এসেছি। তাঁরা এখনো হয়তো জানে না আরিফের সাথে পালিয়েছি ।”
আনিসুল সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো ” ঠিক আছে তুমি চিন্তা করো না। পড়ে যা হবে আমরা সামলে নিবো।
হামিদা আর লামহার বিয়ের সাথে সাথে তোমার আর আরিফ এর ও বিয়ে হবে। তোমাকে বউ সাজিয়ে বরণ করবো আমরা। কিন্তু বিয়ের আগে হামিদার সাথে তোমাকে থাকতে হবে। ”
আয়না মাথা নিচু করে বললো ” জ্বি আংকেল।”
আনিসুল সাহেব বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো ” আমার ছেলের হাত ধরে পালিয়ে বিয়ে করেছো আর আমাকে এখনো আংকেল ডাকছো? ইসলাম বাড়িতে আমার চার মেয়ে হামিদা,লামহা, তায়েবা,লামিয়া তবে আজ থেকে আমার পাঁচ মেয়ে। হামিদা,লামহা, তায়েবা, লামিয়া আর আয়না। তুমি এই ইসলাম বাড়ির পুত্রবধূ নও আজকে থেকে ইসলাম বাড়ির মেয়ে তুমি। আর আমাকে বাবা বলবে মনে থাকবে?”
আয়না মাথা নাড়িয়ে বললো ” জ্বি বাবা মনে থাকবে।”
আনিসুল সাহেব হালকা হেসে বসা থেকে উঠে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। আয়না মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আনিসুল সাহেব আয়নার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো ” চিন্তা করো না। আমরা সবসময় তোমার পাশে আছি। ”
বলেই আরিফ এর দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিয়ে বললো ” ওকে নিয়ে কালকে শপিংয়ে যাবে ওর যা যা পছন্দ হবে তাই কিনে দিবে
আরিফ কার্ড হাতে না নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর লজ্জা লাগছে বাবার থেকে টাকা নিতে।
ছেলের মনের ভাব বুঝতে পেরে আনিসুল সাহেব ধমকে বললো ” বেশ বড় হয়ে গিয়েছো তাই না? ধরো এটা আমি এই টাকা টা তোমাকে না আমার মেয়ে কে দিয়েছি। আর হ্যাঁ কালকে থেকে অফিসে যাবে বুঝতে পেরেছো?”
আরিফ মাথা ঘুরিয়ে রাশেদ এর দিকে তাকালো। রাশেদ চোখ দিয়ে ইশারা দিতেই আরিফ কার্ড হাতে তুলে নিলো।
আনিসুল সাহেব তা দেখলেন। হামিদ, আজমির, হাশিম যেমন তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু করে না। তেমন রাশেদ এর অনুমতি ছাড়া এই বাড়ির কোনো ছেলে মেয়ে কিছু করে না। ইসলাম বাড়ির ছেলে মেয়েরা একজন আরেকজনের জান। সবসময় তাঁরা একে অপরের সকল সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়। একজন আরেকজনের বিপদে কাউকে একা ছাড়ে না।
তা ভেবে আনিসুল সাহেব হালকা হেসে চলে গেলো নিজেদের রুমে।
একে একে সবাই হল রুম থেকে চলে গেলো নিজেদের কাজে।
দেখতে দেখতে বেশ কয়েক দিন কেটে গেলো। এগিয়ে এলো হামিদা, লামহা, সাফওয়ান, আরিফ,আয়নার বিয়ের ডেট।
আজ শুক্রবার ছুটির দিন ।
প্রচুর গরম পরেছে। কিছু দিন ধরেই লামিয়ার গায়ে ভীষণ জ্বর। প্রতিদিন রাতে জ্বর আসে। তাই আজমেরী বেগম কোথা থেকে একটা গাছের শিকড় এনে কালো সুতো দিয়ে বেঁধে দিয়েছে তাঁর বা হাতে। বেঁধে দিয়ে বলেছে যতোদিন না পর্যন্ত এই সুতো নিজে থেকে খুলে পড়ে যাবে ততদিন পর্যন্ত এইটা যেনো হাতে থাকে।
দাদীর কড়া নির্দেশ দেওয়ার এখনো এই সুতো খোলা হয় নি। না হলে কবে ফেলে দিতো এটা হাত থেকে।
সকাল সকাল উঠেই লামিয়া হাতের দিকে তাকিয়ে কেমন থমকে আছে। হঠাৎ মন চাচ্ছে শুধু টক কিছু খেতে। তাই উঠেই চলে গেলো বাড়ির বাহিরের চালতা গাছের নিচে।
আজ চালতা ছেঁচে ঝাল ঝাল কাঁচা মরিচ, ধনিয়া পাতা দিয়ে লবণ দিয়ে মাখিয়ে খাবে। ভেবেই মুখে টপ টপ করে নালা পড়ছে।
উফ আর দেরি করা যাবে না তাড়াতাড়ি পারতে হবে।
তাই পায়ের জুতো খুলে এক পাশে রাখলো। উড়না টা কোমড়ে পেঁচিয়ে বিসমিল্লাহ বলে গাছে উঠতেই কোথা থেকে শুভ্র লামিয়ার হাত টেনে ধরলো।
লামিয়া পাশ ফিরে তাকাতেই শুভ্র কে দেখতে পেয়ে বেশ বিরক্ত হয়ে বললো ” কী সমস্যা আবার গাঁয়ে হাত দিয়েছেন কেনো?”
লামিয়ার কথায় শুভ্র হাত ছেড়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো ” এই অবস্থায় গাছে উঠছেন কেনো?”
” গাছে উঠে নাচবো তা ধুম ধুম তানা। তাই গাছে উঠছি আপনার কোনো সমস্যা?” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
” নাচবেন ভালো কথা তবে গাছে উঠে কেনো?” ভ্রু কুঁচকে বললো শুভ্র।
” মন চাইছে তাই। আপনার কোনো সমস্যা?”
“হ্যাঁ অনেক সমস্যা। এখন বলুন গাছে কেনো উঠছেন?”
” উফফ মিঞা আপনি তো বদ্দ জ্বালাতন করেন। চালতা গাছে কেনো উঠছি এটা ও জানেন না?”
” না জানি না আপনি বলুন।”
” উফ্ চালতা ছেঁচে ভর্তা খাবো তাই পারতে উঠেছি গাছে। আর কিছু ?
লামিয়ার দিকে তাকিয়ে শুভ্র কপালে ভাঁজ ফেললো।
তারপর শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে চলে গেলো বাগানের মধ্যে যেয়ে প্রায় দু মিনিট পর একটা বড়সড় কৌটা নিয়ে আসলো।
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। তারপর এগিয়ে গিয়ে কৌটা ধরতেই শুভ্র বলে উঠলো ” ছেঁড়ে দিন পারবেন না আমি করে দিচ্ছি।”
লামিয়া শুভ্রর কাছ থেকে কৌটা নিতে নিতে বললো ” সরুন পারবো আমি।”
” আরে আপনি এই শরীর নিয়ে পারবেন না। ছাড়ুন লেগে যাবে আপনার।”
” দুনিয়ার এমন কিছু নেই যা লামিয়া ইসলাম না পারে।
আমি সব পারি যা বলবেন সব করতে পারবো। সরুন এখন আপনি।”
লামিয়ার কথা শুনে শুভ্র ঠোঁট চেপে হেঁসে বললো ” সব পারবেন?”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া বেশ ভাব নিয়ে বললো ” অবশ্যই।”
লামিয়ার কথা শুনে শুভ্র সয়তানি হাঁসি দিয়ে বললো ” তাহলে আপনি ফর্সা হয়ে দেখান তো।”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া বেশ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্র মনে মনে হেঁসে লামিয়ার থেকে কৌটা নিয়ে চালতা পারতে লাগলো।
এইদিকে লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো ” বিলাতি পোলা তোরে কালির পায়লা না বানিয়েছি তাহলে আমার নাম ও লামিয়া ইসলাম না।
এদিকে শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তাঁকে যে মনে মনে বকছে তা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝতে পারছে শুভ্র। তিনটা চালতা পেরে লামিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো ” আমাকে মনে মনে বকা শেষ হলে নিন আপনার চালতা। ”
লামিয়া চালতা নিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে কটমট চোখ করে চলে গেলো বাড়ির ভিতর। তা দেখে শুভ্র হালকা হেঁসে উঠলো। রাশেদ আসতেই শুভ্র আর রাশেদ বেরিয়ে গেলো তাদের কাজে।
বিকেল চারটা।
আজকে শুক্রবার থাকায় খান আর ইসলাম বাড়ির কর্তারা একসাথে বসে বাগানে গল্প করছেন এবং কর্তিরা সবাই গিয়েছে শপিং মলে কেনাকাটার জন্য।
ইসলাম বাড়ির হল রুম জুড়ে বসে আছে খান আর ইসলাম বাড়ির ছেলে মেয়েরা শুধু মাহির বাদে। সে তার মায়ের সাথে নানা বাড়িতে গিয়েছে আজ তার অসুস্থ নানা কে দেখতে। আর সবার মাঝে বসে আছে আজমেরী বেগম এবং শফিকুল খান।
টিভিতে চলছে বাংলা পুরাতন ঐতিহাসিক সিনেমা । খান আর ইসলাম বাড়ির ছেলে মেয়েরা বেশ বিরক্ত হয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তাদের মাঝে আজমেরী বেগম আর শফিকুল খান বেশ উৎফুল্ল হয়ে টিভি দেখছে। হঠাৎ সিনেমায় রোমান্টিক সিন দেখালো সেখানে প্রেমিক প্রেমিকা পায়ে পায়ে রাখলো। তাঁর দুদিন পর প্রেমিকা বাচ্চার মা হবে। সবাই চোখ বড় বড় করে টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে তখন ই পুরো হল রুম কাঁপিয়ে লামিয়ার ফোন বেজে উঠলো।
লামিয়া ফোন হাতে নিয়ে দেখলো মাহির ভিডিও কল করেছে। লামিয়া কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মাহিরের গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসলো
– কী করছিস তোরা আমাকে রেখে?
লামিয়া টিভির চোখ দিয়ে বললো
– বাংলা সিনেমা দেখছি। সবাই মিলে। বলেই ব্যাক ক্যামেরাতে সবাই কে দেখালো।
– বাংলা সিনেমা দেখছিস?? এসব কে দেখে ভাই আর কী শিক্ষা পাওয়া যায় এই বাংলা সিনেমা দেখে ভাই আমি বুঝি না।
মাহিরের কথা শুনে লামিয়া ইনোসেন্ট ফেস করে বললো
– বাংলা সিনেমা দেখে আজকে যা বুঝলাম শিক্ষা এইটাই পাওয়া যায় যে, প্রেমিক প্রেমিকার পায়ের ঘষাঘষি তে বাচ্চা হয়ে গিয়েছে।
সারাদিন পর কাজ শেষ করে ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে সবেই রাশেদ আর শুভ্র ভাতের লোকমা মুখে দিয়েছিলো লামিয়ার এমন কথায় দুজন ই বিষম খেয়ে উঠলো।
পাশ থেকে সবাই লামিয়ার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মাহির ফোনের ওপাশ থেকে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
পাশ থেকে তায়েব হাতে তালি দিয়ে বলে উঠলো
– কি শিক্ষা রে ভাই, তুমি দশে দশ স্মাইল পিলিচ।
লামিয়া ইনোসেন্ট ফেস নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে ক্যাবলা হাঁসি দিতেই তায়েব লামিয়ার ছবি তুলে ফেললো।
এইদিকে শুভ্র অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। এই মেয়ে কি এখনো ছোট্টটি আছে নাকি? কোথায় কী বলতে হয় এই মেয়ে কী জানে না। হায় রে এই মেয়ে কে নিয়ে সে বেশ ভিমশিম খাবে বোঝা যাচ্ছে। ভেবেই পাশ থেকে পানি নিয়ে খেয়ে আবার লামিয়ার দিকে তাকালো। জ্বরের কারণে মুখটা অনেকটা মলিন হয়ে গিয়েছে।
পিতলের তৈরি খাঁচায় হাত বোলাচ্ছে কায়সার। চোখ ঘুরিয়ে তাকালো সামনের দেয়ালের দিকে। বেশ বড় করে লামিয়ার ছবি প্রিন্ট করে বাঁধানো সেই দেয়ালে।
সেদিকে তাকিয়ে কায়সার বাঁকা হেঁসে বললো ” বুলবুলি আর কয়েকদিন তারপর এই খাঁচায় এনে তোমাকে আটকাবো। তুমি ছোটার জন্য ছটফট করবে কিন্তু এই কায়সার তোমাকে ছাড়বে না। আমার চোখ যেই পাখির দিকে পড়েছে আমি ঠিক সেই পাখিকে ধরে ভেজে খেয়ে নিয়ে হার গুলো ফেলে দিয়েছি তবে তোমাকে আমি ফেলে দিবো না। তোমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে জ্বালাবো সারা জীবন রেখে জ্বালাবো বুলবুলি শুধু আর কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরো। ”
বলেই এগিয়ে গেলো ছবির দিকে। ছবির উপর হাত রেখে বেশ ভয়ংকর ভাবে হেঁসে উঠলো কায়সার ।
” ওই মেয়ে কে আমার যেকোনো মূল্যে লাগবেই। যেভাবেই হোক মেয়েটিকে আমার চাই। ”
বলে উঠলো অন্ধকারে থাকা লোকটি। তাঁর সামনেই বসে আছে হুডি পড়া অবয়ব।
লোকটির কথা শুনে বেশ মেয়েওয়ালী কন্ঠে বলে উঠলো ” এতো উত্তেজিত হলে চলবে কীভাবে? আস্তে ধীরে সব হবে। পাখিকে ধরার জন্য ফাঁদ পাততে হবে যেনো পাখি নিজেই এসে ধরা দেয়।
বলেই হুড পড়া অবয়ব টি হেঁসে উঠলো।
রাত প্রায় আড়াইটা।
ঘুমন্ত চেহারার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে শুভ্র। পকেট থেকে একটা সোনালী রঙের ঘড়ি বের করে লামিয়ার হাতে সযত্নে পড়িয়ে দিয়ে হাতে চুমু দিলো।
তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
তাঁর শ্যামাঙ্গিণী কে কতো সুন্দর লাগছে ঘুমন্ত অবস্থায়। শুভ্র লামিয়ার কপালে গভীর চুম্বন করলো।
আজকে তাঁর ঘুম আসছে না। কেমন জেনো মন ছটফট করছে। তাই নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়ে বসে আছে প্রেয়সীর পাশে।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩১
এই মুখ টা দেখলে তাঁর সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। দূর হয়ে যায় তাঁর সকল চিন্তা।
কিন্তু খুব শীঘ্রই সে বলে দিবে তাঁর প্রেয়সীকে আবরার ই তাঁর শুভ্র ভাই। তখন কেমন রিয়েক্ট করবে তাঁর প্রেয়সী সেটা সে জানে না তবে এইটুকু জানে যে তাঁর প্রেয়সীকে সে আর কষ্ট দিতে পারবে না।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ শুভ্রর ফোনে কল আসতেই শুভ্র পকেট থেকে মোবাইল বের করে স্ক্রিন এর নম্বর দেখে বাঁকা হাসলো। তারপর লামিয়ার কপালে চুমু এঁকে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো নিজের গন্তব্যে।
