Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪০

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪০

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪০
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

” আমি জানতাম না ওই মেয়েটা কে তুই চিনিস।”
” ওর নাম লামিয়া। তাই ওই মেয়ে ওই মেয়ে বলা টা অফ কর। ”
” আরে আরে এতো রেগে যাচ্ছিস কেনো আমি তো এমনেই বলেছিলাম। ঠিক আছে আর ওই মেয়ে বলে ডাকবো না। ঠিক আছে?”

শুভ্র অরজুন এর কথায় কিছু না বলে দ্রুত একটা কালো হুডি পড়ে নিয়ে মুখে মাস্ক পরে নিলো। তারপর জ্যাকির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো ” তোর মাম্মা কে খুঁজে বের করতে আমাকে সাহায্য করবি তো চাম্প?”
জ্যাকি লেজ নাড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। মানে সে বোঝাতে চাইলো হ্যাঁ সে সাহায্য করবে।
শুভ্র অরজু এর দিকে তাকিয়ে বললো ” গাড়ি বের কর ফাস্ট।”
অরজুন শুভ্রর কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো গাড়ি বের করতে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু লোক। তাঁদের এক এক জনের কপালে, নাকে, মুখ দিয়ে রক্ত পাড়ছে । তাঁদের মাঝখানে বেশ আরামে বসে পায়ের উপর পা তুলে আপেল খাচ্ছে লামিয়া। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে কি*ডন্যা*প হয়নি, সেই কি*ডন্যা*প করেছে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোক গুলো।‌ লামিয়া কে এতোটা শান্তি ভাবে আপেল খেতে দেখে একটা লোক আরেকটা লোকের কানে কানে বললো ” দেখ দেখ আমাদের এই অবস্থা করে কীভাবে আরামে বসে আপেল খাচ্ছে। বস এই ঘূর্ণিঝড় কে তুলে আনার কথা বলেছে? ভাই আগে জানলে এই মেয়ের ধারের কাছেও যেতাম না।”
” চুপ কর ভাই আম্মাজান যদি শুনতে পায় তাহলে এইবার আর রক্ষে থাকবে না।” বলেই লোকগুলো থমথমে মুখ করে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো কিছুক্ষণ আগের কথা।

একটা ইটের তৈরি নতুন দশতলা বিল্ডিং এর ছাদের মধ্যে একটা চেয়ারে বসে আছে লামিয়া। দেখতে বেশ ইনোসেন্ট লাগছে তাকে। দেখে মনে হচ্ছে ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে জানে না এই মেয়ে। লামিয়া আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো প্রায় দশজনের মতো ছদে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোষাক পড়া কিছু লোক।
লোকগুলো প্রায় বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। সারা রাস্তা গাড়িতে পটরপটর করতে করতে তাদের মাথা খেতে খেতে এসেছে। কিছুক্ষণ পর পর এই মেয়ের খিদে লাগে, একটু পর পর এই মেয়ের বমি আসে। আরো কতো কথা বলে তাদের মাথা খেয়েছে এই মেয়ে সে আর নাইবা বললাম।
লামিয়া গোল গোল চোখ করে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বেশ আবদারের সুরে বললো ” রাত হয়ে গিয়েছে তো আমাকে এইবার ছেঁড়ে দিন না কি*ডন্যা*পার ভাইরা । দেখছেন না রাত হয়ে গিয়েছে আরো রাত হওয়ার আগে আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। ”

লোকগুলোর মধ্যে যে লিডার সে এবার বেশ রেগে বললো ” এই বাঁচাল মেয়ে চুপ একদম চুপ। আর একটা কথা বলবি না। বাড়ি যাওয়ার কথা বললে জানে মেরে ফেলবো।”
লামিয়া এইবার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো ” আরে কি*ডন্যা*পার ভাই আপনি আমার সমস্যা বুঝতে পারছেন না, বাড়ি যাওয়ার কথা বললে আপনি এখানে আমাকে জানে মেরে ফেলবেন , আর যদি রাতে বাড়িতে না যাই ওইদিকে আমার আম্মাজান আমাকে জানে মেরে ফেলবে।”
লামিয়ার কথায় লোকটি লামিয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বেশ চিন্তিত গলায় জিগ্যেস করলো ” বাড়ি না গেলে আম্মাজান কি বলবে হ্যাঁ?”

লামিয়া বেশ শীতল দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে আচমকা লোকটার নাক বরাবর ঘুষি মেরে লোকটার চুল ধরে নিচু করে ধাম ধাম লোকটার পিঠে তিন চারটা কিল বসিয়ে দিলো। আচমকা এমন হওয়াতে লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই লামিয়া লোকটার চুল ছেঁড়ে দিয়ে বুক বরাবর লাত্থি বসিয়ে দিলো। লোকটা এক হাত দিয়ে নাক আরেক হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে ছিটকে দূরে সরে ফ্লোরে শুয়ে কাতরাতে লাগলো ।
সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লোকটা ছিটকে দূরে সরে দাঁড়াতেই লামিয়া উড়না টা কোমড়ে প্যাঁচ দিতে দিতে ঠোঁট উল্টে লোকটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো ” প্রথমত আমাকে আমার আম্মাজান আমাকে ধরে এভাবে কেলাবে। ”

লামিয়ার কথা শেষ হতেই সামনে থেকে একটা লোক রেগে চেঁচিয়ে বলে উঠলো ” এইইইই মেয়েএ”
লামিয়া চোখ ঘুরিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে লোকটার সামনে এগোতে এগোতে বললো ” এতো রাগ? তোর এতো রাগ তোর নিজের আম্মার উপর চেঁচিয়ে উঠেছিস??” বলেই লোকটির গাল বরাবার থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে কান ধরে ঠাস ঠাস কতো গুলো থাপ্পড় বসিয়ে ঘাড়ের মধ্যে শরীরের সব শক্তি দিয়ে কিল মেরে পেটে লাথি বসিয়ে দিলো।

ঘাড়ের কিল টা বেশ জোরে লাগায় লোকটি ব্যাথায় চিৎকার করে হাঁটু গেড়ে নিচে বসে পড়লো।
আশেপাশে থাকা আর আটজন লোক হা করে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
আটজন লোকের থেকে একজন লোক পাশের জন কে রেগে বললো ” ভাই মা*লডা কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করতাছে।”
কথাটা লামিয়ার কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই । লামিয়া ঘুরে তাকালো লোকটার দিকে বেশ ধাবিত গলায় বলে উঠলো ” কিহ? কি বললি তুই নিজের আম্মাকে মা*ল বলেছিস? নিজের আম্মাকে খারাপ কথা বলেছিস?” বলতে বলতে পাশ থেকে একটা লোহার পুরানো মাঝারি সাইজের একটা রড তুলে এগিয়ে গিয়ে লোকটার পায়ের হাঁটু তে বারি দিতে দিতে বললো ” এতো বড় হয়ে গিয়েছিস তুই?? তোর আম্মা কে খারাপ কথা বলেছিস? জা*নোয়ার, নালায়াক, নিকর্মা।” বলেই রড দিয়ে পিঠে বারি মেরে দিলো।

লোকটা শুয়ে শুয়ে পা ধরে কান্না করতে লাগলো। লামিয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো ” জানিস তোর আম্মা কতো কষ্ট পেয়েছে তোর কথায়? এসব বলা উচিত হয়নি তোর।”
বলতেই আরো একটি শোক রেগে লামিয়ার দিকে লোহার শিকল নিয়ে এগিয়ে আসতেই লামিয়া রাড দিয়ে লোকটার কপাল বরাবর বারি বসিয়ে দিতেই লোকটার কপাল ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো। লোকটা শিকল ফেলে কপাল ধরে চেঁচাতে লাগলো। লামিয়া এগিয়ে এসে লোকটার পশ্চাদ্দেশে রড দিয়ে বারি দিতে দিতে বললো ” এই কুকুর বাঁধার শিকল তোর হাতে কেনো? আর উঠাবি এসব শিকল হাতে, উঠাবি আর হাতে এসব।”

বলতে বলতে আরো একজন লামিয়ার দিকে তাকিয়ে “এইইইই” বলতে বলতে এগিয়ে আসতেই লামিয়া সেদিক তাকিয়ে রড নিয়ে লোকটার হাতে বারি বসিয়ে দিয়ে লোকটার মেন পয়েন্ট এ লাত্থি বসিয়ে রড তুলে পিঠে সজরে বারি মারতে মারতে বললো ” যেখানে দুজন বড় কথা বলতাছে সেখানে তুই কেন কথা বললি? আর বলবি বড়দের মাঝে কথা? আর বলবি, আর বলবি?” এইসব দেখার জন্য কি তোকে লালন পালন করে এতো বড় করেছি! আর বলবি?”

বলতে বলতে সব গুলো লোককে রড তুলে ইচ্ছা মতো পেটাতে লাগলো।
একজন লোককে এর পিঠে বারি বসিয়ে দিতেই লোকটি বাঁচার জন্য বলে উঠলো ” মাম্মি, মাম্মি ভুল হয়ে গিয়েছে ক্ষমা করে দিন।”
লামিয়া লোকটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো ” কী বললি মাম্মি, মাম্মি কে তোর?” বলেই আবার মারতে মারতে বললো ” বেশি ইংরেজি ঝাড়ছিস? এতো ইংরেজি পারিস তুই? আম্মাজান কে মাম্মি বলছিস!”
লোকটা তোতলাতে তোতলাতে বললো ” সরি সরি আম্মাজান ভুল হয়ে গিয়েছে মাফ করে দিন।”
লামিয়া বারি থামিয়ে বললো ” এইতো বাংলা বলতে বলেছি দেখে আবার ইংরেজি ভুলে গিয়েছিস। বাংলা ভালো মতো পারে না সে আবার ইংরেজি বললে?” বলেই বারি দিতে লাগলো।

হঠাৎ একজন লোক কোমড় থেকে গান বের করে লামিয়ার দিকে শুট করে দিতেই লামিয়া মাথা নিচু করে ফেললো। আবারো শুট করতেই লামিয়া হাতের রড খারা করে লোকটার হাতে ছুঁড়ে দিতেই রড লোকটার হাতে গেঁথে গেলো।‌
আরেকজন লোক লামিয়ার চুল ধরতেই লামিয়া ঘুরে লোকটার গলায় জোড়ে ঘুষি মেরে দিলো।
আরো একটা লোক সামনে আসলেই লামিয়া তাঁর মেন পয়েন্টে লাত্থি দিতেই লোকটা ” বাবাগো বলে চেঁচিয়ে উঠে হাঁটু গেড়ে লামিয়ার সামনে বসে পড়লো।

লামিয়া তা শুনে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” হারামজাদা লালন পালন করে বড় করলাম আমি আর ডাকছিস তোর বাপ কে।” বলেই লোকটার বুক বরাবর লাত্থি বসিয়ে দিলো।
এলোপাথাড়ি সব লোকগুলো কে মেরে লামিয়া বেশ ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে বসলো পায়ের উপর পা তুলে রড টা নিজের কোলে তুলে।

তারপর হাতে তালি দিয়ে বললো ” আটটেনশন প্লিজ। বাচ্চারা সবাই আসন গেড়ে ফ্লোরে বসে পরো তো দেখি।”
লামিয়ার কথায় লোকগুলো রক্তাক্ত অবস্থায় বহুত কষ্টে উঠে এসে বসলো লামিয়ার সামনে।
লামিয়া একটা লোকের দিকে তাকিয়ে বললো ” তোদেরকে শাসন করে তোদের আম্মার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে যা কিছু ফল নিয়ে আয়। আর আমি কিন্তু এক কথা দ্বিতীয় বার রিপিট করবো না।”
লামিয়ার এমন কথায় লোকটা তাড়াতাড়ি করে চলে গেলো খাবার আনতে।
সবাই নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। লামিয়া উপরে দু হাত তুলে আড়মোড়া ভেঙে নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সন্ধ্যা সাতটা ত্রিশ বাজে তা দেখে লোক গুলোর উদ্দেশ্য বললো ” কার কথায় আমাকে তুলে নিয়ে এসেছিস তোরা?”

” ব…বসের কথায়।” সামনে থাকা লোকটা বেশ ঝটপট উত্তর দিলো লামিয়ার প্রশ্নে।
লামিয়া এক ভ্রু উঁচিয়ে লোকটাকে বললো ” তোদের এই বস টা কে? ”
” লন্ডনের মাফিয়া ডন মার্কাস।”
লামিয়া কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তা করতে লাগলো। সে তো কোনো মাফিয়া কে চিনে না। আর কোনো মাফিয়াদের সাথে তাঁদের ফ্যামিলির কোনো শত্রুতাও নেই । তাহলে কে এই মার্কাস , বিষটা দেখতে হচ্ছে তাহলে ।
ভাবনার মাঝে তার খাবার নিয়ে হাজির হয়েছে লোকটা।‌ লামিয়া নিজেকে শান্ত করে আপেল হাতে তুলে খেতে লাগলো।

বর্তমান।
লোকগুলো লামিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। লামিয়া আপেল খেতে খেতে বললো ” এভাবে যে তোরা তাকিয়ে আছিস যদি আমার পেটে ব্যাথা করে তাহলে তোদের খবর আছে।”
লামিয়ার কথা শুনে লোকগুলো ভয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
লামিয়া আপেল খাওয়া শেষ করে আরো একটা আপেল তুলে নিলো। আপেল তার বেশ পছন্দের একটি ফল। তাই তো হামিদ সাহেব আপেল দিয়েই ফ্রিজ ভরে রাখে সবসময়।
লামিয়া আপেল চিবুতে চিবুতে লোকগুলোর লিডার কে বললো ” আমাকে এখানে কতোক্ষণ রাখা হবে?”

” জানি না আম্মা! বস আসলেই আপনাকে বসের হাতে তুলে দিবো আমরা।” বেশ ভয়ে ভয়ে বললো লোকটা।
” তা তোদের বস কখন আসবে?”
” আরো একটু পরেই এসে পড়বে আম্মা।”
লামিয়া আর কিছু না বলে চুপচাপ আবার খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করে ফলের ঝুড়ি লোকগুলো দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো ” খেয়ে নে তোরাও। বুঝেছিস আমার ছেলেরা, তোদের আম্মা এইভাবে তোদের মেরেছে দেখে ভাবিস না যে তোদের আম্মা অনেক খারাপ একটা মানুষ। উহু মোটেও আমি খারাপ না কিন্তু। ওইযে আমার মাথাটা একটু গরম হয়ে গেলো আরকি একটু কঠিন হই বেশি কিছু না। থাক তোরা কিন্তু মনে কিছু করিস না বুঝলি। তোদের মা তো আমি দেখ একটু আগে কুত্তার মতো মেরেছি এখন আবার ভালোবেসে তোদের কে ফল ও খাওয়াচ্ছি। এটাই হলো মায়ের আদর বুঝলি।”

লোকগুলো লামিয়ার কথায় আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। একটু আগে বাঘিনীর রূপ দেখিয়ে এখন আবার ভালোবাসা দেখাচ্ছে সবাইকে। এটা মেয়ে নাকি অন্যকিছু।
লোকগুলো ভয়ে ভয়ে ঝুড়ি থেকে ফল নিয়ে সবাই ভয়ে ভয়ে খেতে লাগলো।
লামিয়া আপেল শেষ করে বললো ” জানিস আমাদের বাড়িতে বিয়ে ছিলো। আজ আপাকে আর লামহা কে আমাদের বাড়িতে আসার কথা। সেটা নিয়ে আজ একটা প্ল্যান ছিলো, বাড়িতে থাকলে তায়েব, তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন আমি মিলে প্ল্যান টা করেও ফেলতাম। কিন্তু তোদের জন্য আমি সব মিস করে ফেলেছি। তোরা আমাকে ধরে না আনলে আমি বাড়িতে মজা করতাম। কিন্তু তোরা এখানে নিয়ে এসে আমাকে বোর করছিস। ছ্যা মুডের দাদী নানী হয়ে যাচ্ছে। আমি আবার তোদের আম্মার পার্টে যাওয়ার আগে দ্রুত আমার মুড ঠিক কর।”
লোকগুলো লামিয়ার কথা এতোক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো তবে লাস্টের কথা টা শুনে ভয় পেয়ে গেলো।
পাশ থেকে একজন লোক লিডার কে বললো ” বস তাড়াতাড়ি আম্মার মুড ঠিক করুন নয়তো আম্মা আবার আগর ফ্রমে আইসা পরবো।”

লিডার লামিয়ার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বললো ” আম্মা আপনার মুড ঠিক করতে আমরা কি করতে পারি?”
লামিয়া গালে হাত দিয়ে বেশ ভাবতে লাগলো কি করানো যায় এই লোক গুলো কে দিয়ে। হঠাৎ মাথায় কিছু আসতেই বললো ” দেখ তোদের বস যতোক্ষণ না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোরা নাচতে থাকবি। এই যা একট ছোট্ট স্পিকার বক্সের ব্যাবস্থা কর। আর আমার জন্য বেশ কিছু খাবার আনিস কেমন?”

লামিয়ার কথা শুনে লিডার থতমত খেয়ে বললো ” আম্মা আমরা তো নাচতে পারি না তবে নাচাতে পারি।”
লামিয়া পাশ থেকে রড হাতে তুলে সেটাকে দেখতে দেখতে বললো ” আমিও কিন্তু নাচাতে পারি দেখবি? তোরা দেখতে চাইলে আমি কিন্তু দেখাতে পারি। ”
লামিয়ার কথায় লিডার পাশের লোকটার গালে থাপ্পড় মেরে ধমকে বললো ” আম্মা কি বলেছে শুনিস নি? তাড়াতাড়ি যা স্পিকার বক্সে এর ব্যাবস্থা কর আর আম্মার খাবারেল ব্যাবস্থা কর তাড়াতাড়ি। ”
লিডারের কথা শুনে লোকটি দ্রুত উঠে চলে গেলো খাবার আর স্পিকার বক্স আনতে।

” নিহিড় আর কতোক্ষণ লাগবে তোমার?”
” বস আর বিশ মিনিট। লোকেশন এর কাছাকাছি এসে পড়েছি আমরা। একটু ধৈর্য ধরুন মেম এর কিছু হবে না।”
” ওই মার্কাস কে আমি ছাড়বো না। ও জানে না ও কাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। ছাড়বো না আমি ওকে”
বলেই হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো কায়সার। তাঁর মন ছটফট করছে লামিয়ার জন্য। লামিয়া একটা পবিত্র ফুল, এই ফুলকে সে ছাড়া অন্য কেউ এই ফুলকে ছুঁয়ে দিলে কায়সার তাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে। আর সবচেয়ে বড় কথা লামিয়া তাঁর চিরো শত্রু ফ্যালকনের প্রাণ, ফ্যালকনের দূর্বলতা। তাঁর শত্রুর দূর্বলতা কে কীভাবে হাত ছাড়া করবে সে। যদি পারে আজ ই কায়সার লামিয়া কে তাঁর সাথে নিয়ে যাবে। একবারের জন্য নিজের করে নিবে লামিয়া কে। অনেক দূরে নিয়ে যাবে তাকে। তারপর তাকে নিয়ে বন্দি করবে তার জন্য তৈরি পিতলের খাঁচায়। কোনোদিন ও মুক্তি করবে তা তাঁর বুলবুলি কে। যখন তার প্রয়োজন হবে, যখন তার বুলবুলি কে ছোঁয়ার ইচ্ছে জাগবে তখন কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি করে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করবে তাঁর বুলবুলি কে।
ভেবেই বাঁকা হাসলো কায়সার।

” এটা কি গাড়ি চালাচ্ছো নাকি ঠেলা গাড়ি?” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো মার্কাস।
” মার্কাস আর কতো জোড়ে চালাবো বলেন?”
” তোমাকে এতো কথা বলতে বলেছে কে দ্রুত গাড়ি চালাও। ”
” উফফ মার্কাস এতোটা হাইপার হচ্ছো কেনো তুমি? শান্ত হও। আমাদের লোকেরা তো মেয়েটা কে আটকিয়েই রেখেছে তাহলে এতো প্যারা নেওয়ার কী আছে?” পাশ থেকে বলে উঠলো মনা।
” তুমি তো জানোই মনা আমি সেই কতো বছর ধরে এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছি। আমার তুষার রানী কে যতোক্ষণ পর্যন্ত না ছুঁয়ে দিচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমি স্থির থাকতে পারছি না।”
” মার্কাস তুমি তোমার তুষার রানীর জন্য এখন ই এতো পাগল, আজকে রাতের পর তো তুমি আরো পাগল হয়ে যাবে।” বলেই হেঁসে উঠলো জোজো। তাঁর সাথে তালে তাল মিলিয়ে হেঁসে উঠলো মনা, রিস্কি,মাইল্স।
মার্কাস দাঁত দিয়ে ঠোট কামড়ে হাসলো।

ফাকা রাস্তায় গাড়ি ছুটছে ঝড়ের গতিতে। ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে আরজুন। পিছনের সিটে জ্যাকি চার পায়ে ভর করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভিং সিটে বসে ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে শুভ্র। চোখ অসম্ভব লাল টুকটুকে বর্ণ ধারণ করেছে। ফর্সা চেহারা রাগে লাল হয়ে গেছে। কপালের শির গুলো ফুটে উঠেছে। ঘাড় সমান চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে আজকে মার্কাসের অবস্থা খারাপ করে ছাড়বে।
আরজুন ভয়ে ঢোক গিলে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো ” এই ভাই গাড়ি আস্তে চালা ভীষণ ভয় করছে। যেকোনো সময় অ্যাক্সিডেন্ট করে ফেলবো।”

শুভ্র আরজুনের দিকে তাকিয়ে রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” ওইখানে আমার জীবন্ত ফুল একা ওই হায়েনাদের মাঝে আছে। আর তুই আমাকে আস্তে গাড়ি চালাতে বলছিস?”
আরজুন শুভ্রর কথা শুনে আর কিছু বলার সাহস দেখালো না। তবে মিনমিন করে বললো ” আমার তো মনে হয় ওই মেয়ে নিজেই একটা হায়না। ”
আরজুনের কথা শুভ্র শুনেও পাত্তা দিলো না। তবে জ্যাকি শুনতেই আরজুনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করতে করতে আরজুনের চুল কামড়ে টেনে ধরলো।

” আআআ চ্যাম্প ছাড় আমার চুল কি করছিস ব্যাথা পাচ্ছি তো!”
” ওর সামনে ওর মাম্মা কে নিয়ে কথা বললে ও ভুলে যাবে তোর সাথে ওর সব সম্পর্ক। চ্যাম্প আমাদের চেয়ে ওর মাম্মা কে বেশি ভালোবাসে। ” বেশ শীতল গলায় বললো শুভ্র।
জ্যাকি শুভ্রর কথা শুনে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আরজুন বেশ অবাক দৃষ্টিতে তাকালো জ্যাকির দিকে।
” একটা কুকুর এতোটা বুঝদার কীভাবে হয় ভাই, আর ওকে ওই মেয়ে না মানে ওর মাম্মা কীভাবে পেলো?” বেশ অবাক হয়ে বললো আরজুন।

” আমরা ছোট্ট বেলায় ওকে সেদিন ফেলেছিলাম, লামিয়া ওকে রাস্তা থেকে সেদিন কুরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো ইসলাম বাড়িতে। তারপর ওর নাম রাখা হয় জ্যাকি। সেদিনের পর থেকে ওর পিছনে যতোটুকু খাটতে হয় লামিয়া খেটেছে। ইসলাম বাড়িতে যাওয়ার পর আমি নিজ চোখে দেখেছি লামিয়া ভীষণ ভাবে যত্ন করে চ্যাম্প কে। চ্যাম্প প্রথম দেখায় আমাকে চিনে ফেলিছিলো সেদিন। আমি চ্যাম্প কে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু চ্যাম্প ততদিনে লামিয়ার প্রতি দূর্বল হয়ে গিয়েছিলো, আর লামিয়া ও।

তাই আর নেই নি ওকে। লামিয়া বেশ ভালো করেই ট্রেনিং দিয়েছে তাই ওও এতো বুঝদার।”
শুভ্রর কথা আরজুন বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনে জ্যাকির দিকে ঘুরে ভালোমতো তাকালো তাঁর দিকে।
চ্যাম্প এর লোম গুলো আগের তুলনায় আরো বড় বড় হয়েছে, ব্রাউন রঙের কুকুর টা আগের চেয়ে বেশ বড় আর বেশ স্বাস্থ্যবান হয়েছে। দেখেই আরজুন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মিনমিন বললো ” কুকুরের প্রতি এতো যত্ন আর এতো ভালোবাসা কিন্তু মানুষ কে দেখলেই মুখ দিয়ে এতো তেতো কথা বের হয় কীভাবে?”

ছাদের উপর গান ছেঁড়ে লোকগুলো কে নাচাচ্ছে লামিয়া। লোকগুলো এক হাত মাথায় আর আরেক হাত কোমড়ে রেখে শুধু কোমড় দুলাচ্ছে। তা দেখে বেশ বিরক্ত লামিয়া। নাচলে ঢক মতো নাচ না নাচলে বলে দেক। তবুও এতো বিশ্রী নাচ কেনো নাচচ্ছে তাঁরা তা বুঝতে পারছে না লামিয়া।
” গান বন্ধ কর ” বেশ জোড়ে বলে উঠলো লামিয়া।
তা শুনে লোকগুলো নাচ থামিয়ে দ্রুত একজন লোক গান অফ করতেই লামিয়া বিরক্তি নিয়ে বললো ” এই তোরা নাচতে পারিস না তাহলে নাচতে এসেছিস কেনো? ”

” আম্মা আগেই তো বলেছিলাম আমরা নাচতে পারি না।” বেশ ভয়ে ভয়ে বলে উঠলো লিডার।
” আবার আমার মুখে মুখে তর্ক করছিস?” চোখ বড় বড় করে বললো লামিয়া।
” না না আম্মা ভুল হয়ে গিয়েছে আর করবো না।”
” গুড। আচ্ছা আয় শোন তোদের আমি নাচ শিখাই, প্রথমে এইভাবে, তারপর এইভাবে, তারপর এইভাবে। বুঝতে পারছিস?”
লোকগুলো পিটপিট করে চোখ করে মাথা নাড়ালো তাঁরা বুঝতে পেরেছে। লামিয়া তা দেখে রড সাইডে রেখে লোকগুলো কে যেভাবে দাঁড়াতে বললো তাঁরা ঠিক সেইভাবে ই দাঁড়ালো। তাঁদের মাঝে লামিয়া দাঁড়িয়ে আবার বোঝাতে লাগলো কীভাবে নাচতে হবে।

ব্লিডিং এর নিচে কালো রঙের দুটো গাড়ি থামলো। একটা থেকে কালো পোশাক পরা কিছু বর্ডিগার্ড বেরিয়ে এসে দ্রুত পিছনের গাড়ির দরজা খুলতেই মার্কাস, মনা, রিস্কি, জোজো, মাইল্স বেরিয়ে আসলো।
উপরে ছাদের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে দ্রুত পা বারলো ছাদের দিকে।
তাঁরা যেতেই আরো দুটো গাড়ি এসে থামলো সেখানে। নিহিড় গাড়ি থেকে বেরোনোর আগেই কায়সার দ্রুত বেরিয়ে হাটা শুরু করলো ছাদের দিকে। ব্লিডিংয়ে কোনো লিফট না থাকার কারণে সিঁড়ি বেয়ে ই উপরে উঠতে হচ্ছে তাদের।
কায়সারদের পরেই শুভ্রর গাড়ি এসে থামলো। কায়সার, আরজুন দ্রুত নিচে নেমে কোমড় থেকে গান বের করে ব্লিডিং এর ভিতরে যেতেই ছাদে থেকে হিন্দি গানের সাউন্ড পেলো উপর থেকে। তা শুনে আরজুন ভ্রু কুঁচকে বললো ” আমরা কী ভুল জায়গায় এসেছি নাকি? এখানে হয়তো তোর ফুল নেই ভাই। এখানে হয়তো কোনো পার্টি হচ্ছে চল অন্য জায়গায় খুঁজি।”

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩৯

শুভ্র কটমট দৃষ্টিতে আরজুনের দিকে তাকাতেই আরজুন ভয়ে চুপ হয়ে গেলো। জ্যাকি নাক দিয়ে শুঁকতে শুঁকতে ঘেউ ঘেউ করে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে যেতে লাগলো। শুভ্র আর কিছু না ভেবে জ্যাকির পিছন পিছন যেতে যেতে হুডির টুপি আর মাস্ক টা পড়ে নিলো। তাঁর পিছন পিছন আরজুন ও যেতে লাগলো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪১