Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৭

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৭

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৭
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

নিজের রুমে বিছানায় বসে পেটে হাত চেপে বসে আছে লাবিব।
অতিরিক্ত ফুসকা খাওয়ার ফলে সকাল থেকে লাবিব এর পেট ভীষণ ভাবে জ্বালা করছে সাথে পেট ব্যাথা ও করছে। বিছানা থেকে উঠে অনেক কষ্টে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমেই দেখলো সবাই খাবার টেবিলে বসে আছে। লাবিব বহু কষ্টে এগিয়ে এসে টেবিলে বসে পাশে তাকাতেই দেখলো লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির হাম হাম করে খাবার খাচ্ছে। এমন ভাবে খাচ্ছে দেখে মনে হচ্ছে বহু বছর পর খাবার পেয়েছে তাই এইভাবে খাচ্ছে। তা দেখে লাবিব বেশ বিরক্ত হয়ে বললো ” এমন ভাবে খাবার খাচ্ছিস কেনো..? আস্তে ধীরে খা।”
লাবিব এর কথা শুনে চারজন খাবার খাওয়া রেখে লাবিব এর মুখের দিকে তাকালো। লাবিব বিরক্ত হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মাহির লাবিব কে কিছু বলার আগে পাশ থেকে শুভ্র গম্ভীর গলায় বললো

” তোর খাওয়া তুই খা ওদের খাওয়ার দিকে নজর না দিলেও চলবে। ”
শুভ্রর কথা শুনে লাবিব বিরক্ত হয়ে খাবার খেতে মনোযোগ দিলো। লাবিবের চোখ মুখ কেমন মলিন দেখাচ্ছে দেখে ছবি লাবিব কে জিজ্ঞেস করলো
” লাবিব ভাই আপনার চোখ মুখ এমন লাগছে কেনো..? আপনি কী অসুস্থ..?”
লাবিব খাবার মুখে নিয়েও নিলো না। ছবির দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে বললো ” ভীষণ পেটে ব্যাথা করছে রে ছবি।”
লাবিব এর কথা শুনে পাশ থেকে শারমিন বললো
” তোমাকে কতো করে বললাম এতো ফুসকা খেও না। তবুও তুমি জেদ করে খেয়ে নিলে ভাইয়া। এখন বুঝো কেমন লাগে।”
শারমিনের কথা শুনে লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা হে হে করে হেঁসে উঠলো। লাবিব তাদের হাসির দেখে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” হাসবি না তোরা নয়তো তোদের দাঁত আমি খুলে ফেলবো।”
লাবিবের কথা শুনে লামিয়া শান্ত গলায় বললো

” কেনো আপনি কি ডেন্টিস্ট নাকি..?”
লামিয়ার কথা শুনে লাবিব এবার আরো রেগে গিয়ে বললো ” আর একটা উল্টো পাল্টা কথা বললে এমন মার মারবো তোকে, যা খেয়েছিস সব হজম হয়ে যাবে।”
লামিয়া আগের ন্যায়েই বললো ” কেনো হাজমোলা নাকি আপনি..?”
লাবিব লামিয়ার কথা শুনে লামিয়ার দিকে পর পর পলক ফেলে বললো ” কী বললি..?”
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” কানে কম শোনেন কবে থেকে..? আমি বলেছি আপনি হাজমোলা নাকি..?”
লাবিব লামিয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের দিকে আঙুল তুলে বললো ” আমি হাজমোলা..?”
লামিয়া চোখ উল্টিয়ে বললো ” কোনো সন্দেহ আছে..?”

লাবিব লামিয়ার কথা শুনে রেগে ফট করে লামিয়ার চুল টেনে ধরতেই লামিয়া লাবিব এর মাথার চুল বেশ শক্ত করে টেনে ধরতেই লাবিব চেঁচিয়ে উঠলো। তবুও কেউ কাউকে কে ছাড়ে নি। ইচ্ছে মতো মারামারি হচ্ছে দুজনের। এইদিকে সবাই হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে দুইজনের দিকে। মাহির, তায়েব, তায়েবা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো ” একটা যদি আগুন হয় আর একটা পেট্রোলের ট্যাংক। এক সাথে হলেই বিস্ফোরণ।”
লামিয়া লাবিবের চুল আঁকড়ে ধরে পিঠে ধিম ধিম দুটো কিল বসিয়ে দিতেই লাবিব চিৎকার করে উঠলো।
” আআআ জল্লাদ ছাড় আমাকে নয়তো তোকে আজ ইচ্ছেমতো কেচে ধুয়ে দিবো।”
লামিয়া লাবিব এর পিঠে আর একটা দুম করে কিল বসিয়ে দিয়ে বললো
” কেনো আপনি কী ধোপা নাকি যে আমাকে ধুয়ে দিবেন??”
লামিয়ার কথা শুনে লাবিব রেগে চুল গুলো আরো শক্ত করে টেনে ধরতেই ব্যাথায় লামিয়া চোখ মুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠলো।

খাবার টেবিলে বসে শান্ত চোখে লাবিব আর লামিয়ার মারামারি দেখছিলো শুভ্র। কিন্তু লামিয়ার চেঁচানো শুনে শুভ্র এবার আর বসে থাকতে পারলো না। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে লাবিবের হাত থেকে লামিয়ার চুল গুলো ছাড়িয়ে নিয়ে লাবিবের বুকে জোরে ধাক্কা দিতেই লাবিব পিছিয়ে গেলো।
শুভ্র লামিয়ার হাতের কব্জি টেনে নিজের কাছে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে লাবিবের দিকে গরম চোখে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে উঠলো
” তোর সাহস কী করে হয় ভ্রমরের গায়ে হাত দেওয়ার??”
লাবিব শুভ্রর কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো
” আমি? আমি ওর গায়ে হাত দিয়েছি?? চোখে কী ছানি পড়েছে তোর নাকি অন্ধ হয়ে গিয়েছিস?? এখানে উপস্থিত সবাই দেখেছে ওও আমার গাঁয়ে আগে হাত তুলেছে।”

” কিন্তু আগে তো আপনি লামুর চুল টেনে ধরেছিলেন তাই না??” পরোটা ছিরে মুখে পুরতে পুরতে বললো তায়েব।
তায়েব এর কথা শুনে লাবিব কপাল কুঁচকে বললো ” এই এই একদম ওর হয়ে কথা বলতে আসবি না। তোর বোন আমাকে আগে কী বলেছিলো শুনিস নি??”
” হাজমোলা বলেছে এতে রেগে যাওয়ার কী আছে??” বেশ শান্ত দৃষ্টিতে লাবিব এর দিকে তাকিয়ে মাহির বলে উঠলো।
” তো রাগ করবো না?? তোরা কালকে আমাকে গরুর দৌড়ানি খাইয়েছিস। এখনো গরুর গুঁতো খেয়ে আমার পিছনে ব্যাথা হয়ে আছে।”
” পিছনে কী লাবিব ভাই..?” লাবিব এর কথার শেষে তায়েবা ঠোঁট উল্টে প্রশ্ন করলো।
তায়েবার কথা শুনে তোয়া কপালে হাত রেখে বললো

” ” পিছন মানে বাম তুমি জানো না আপু?”
তোয়ার কথা শুনে তায়েবা তোয়ার দিকে তাকালো। তোয়া তা দেখে বেশ ভাব নিয়ে লাবিব এর দিকে তাকিয়ে বললো ” লাবু ভাইয়ার বামে গুঁতো দিয়েছে ষাঁড়ে।” বলেই হেঁসে উঠলো ‌।
লাবিব তোয়ার কথা শুনে বিরক্ত হয়ে তোয়ার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সদর দরজায় টোকা পড়লো।
সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে চোখ রাখতেই দেখলো জমিদার বাড়ির প্রধান কর্তা মীর আদনান আলী, তাঁর ছোট্ট নাতি নূর দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদ তাদের দেখে হেঁসে বসা থেকে উঠে এগিয়ে গেলো তাদের দিকে।
” আরে দাদা জান তুমি এখানে?? এসো এসো ভিতরে এসো।” বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে আদনান আলীর কাঁধ জরিয়ে ধরলো।
মীর আদনান আলী হেঁসে বলল ” কী দাদুভাই কেমন আছো তুমি??”

” আলহামদুলিল্লাহ দাদাজান। তুমি কেমন আছো??”
” আমি একদম ফিট আছি।” বলতে বলতে ভিতরে প্রবেশ করতে লাগলো আদনান আলী।
নূর ধীর পায়ে এগোতে এগোতে আশেপাশে সবার দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো তায়েবা বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নূর তা দেখে মুচকি হাসলো।
খাবার টেবিল ছেড়ে সবাই একে একে গিয়ে বসলো হল রুমে। মীর আদনান আলী এবং নূর সকলের সাথে কৌশল বিনিময় করে টুকটাক কথা বলতে লাগলো। এদিকে নূর কিছুক্ষণ পর পর আড়চোখে তায়েবার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু তায়েবার তাতে কোনো মাথা ব্যাথা নেই সে চুপচাপ স্থির হয়ে লামিয়ার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।
সোফার এক প্রান্তে বসে আছে জাহিদ। সবার সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে বার বার তাকাচ্ছে নূরের দিকে। নূর যে একটু পর পর তায়েবার দিকে তাকাচ্ছে তা জাহিদের চোখ এড়ায় নি। তায়েবার দিকে নূরের তাকানো টা সহ্য হচ্ছে না জাহিদের। তবুও মুখ বুঝে হজম করছে সব।
মীর আদনান আলী রাশেদের কাঁধে হাত রেখে আজমেরী বেগম এবং শফিকুল খান এর উদ্দেশ্যে বললেন
” আমি চাইছি তোমরা আজ রাতে সবাই আমাদের জমিদার বাড়িতে রাতের ডিনার করবে। কী ভাবী যাবে না??”
আজমেরী বেগম হেঁসে বললো

” তুমি বলছো আর আমরা যাবো নখ এটা কী করে হয়?? আমরা অবশ্যই যাবো।”
শফিকুল খান ও আজমেরী বেগম এর সাথে হ্যাঁ বলে দিলেন।
মীর আদনান আলী তা শুনে হাসলো। তারপর টুকটাক কথা বলতে শুরু করলেন।
বড়দের কথার মধ্যে থাকাটা মোটেও পছন্দ নয় ইসলাম বাড়ির চার বিচ্ছুদের। তাই তাঁরা হল রুমে আর না দাঁড়িয়ে চলে গেলো বাড়ির বাহিরে ‌।
এখানে আসার পর তেমন ঘুরা ঘুরি হয়নি তাদের। তাই ঠিক করলো একটু হাঁটাহাঁটি করে বাড়ির আশ পাশ টা ঘুরে দেখবে তাঁরা ।
আই.কে বাগান বাড়ির ঠিক একটু সামনেই শেখ বাড়ি। বাড়ির দুয়ারে চেয়ার পেতে পায়ের উপর পা তুলে বসে পান চিবুচ্ছে শেখ পরিবারের প্রধান কর্তা শেখ জব্বার উদ্দিন।
তাঁর ডান পাশেই কিছু লোক লুঙ্গি, গেঞ্জি আর মাথায় লাল গামছা বেঁধে লাঠি খেলছে।
লোকগুলো জব্বার সাহেবের বিশ্বস্ত লোক।

গ্রামের মানুষদের সাথে অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন করা শেখ জব্বার উদ্দিন এর কাজ। মানুষদের উপর জুলুম করতে তিনি ভীষণ পছন্দ করে বললেই চলে।
জব্বার উদ্দিন এর ঠিক সামনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুতু মিয়া এবং তার স্ত্রী জরিনা বেগম।
” সাহেব আর কয়ডা দিন সময় দেন আমি আপনের সব ট্যাক্যা দিয়া দিমু।” মাথা নিচু করে বললো পুতু মিয়া।
জব্বার উদ্দিন পানের পিক ফেলে ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে পান খাওয়া দাঁত গুলো কেলিয়ে বললো ” আহা তোমাগো ট্যাক্যার জন্য তুইল্যা আনি নাই তো। তোমাগো লগে কিছু কথা কমু তাই আনছি তোমগোরে।”
পুতু মিয়া বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো ” কী কথা সাহেব??”
” ট্যাক্যা যহন নিছিলা তখন কি কইয়া নিছিলা?? মনে আছে??”
পুতু সাহেব মাথা নিচু করে রাখলো। তা দেখে জব্বার উদ্দিন হেঁসে বলল ” আমি মনে করায় দিতাছি। তুমি যখন ট্যাক্যা নিছিলা তহন কইছিলা যে সাহেব আমি তিন মাসের মধ্যে আপনেরে ট্যাক্যা ফিরায় দিমু। এই কথা কইছিলা তাই না??”

পুতু মিয়া নিচু গলায় বললো ” হ সাহেব।”
” কিন্তু দেহো আইজ এক বছর হইতে যাইতাছে কিন্তু তোমার ট্যাক্যা দেওনের খবর নাই।”
” সাহেব আর এক মাস সময় দেন আমি আপনের সকল ট্যাক্যা ফিরায় দিমু।”
” আমার তো এহন ট্যাক্যা চাই না পুতু।”
” তাইলে আপনে কি চান সাহেব??”
জব্বার উদ্দিন তাঁর সাদা পাঞ্জাবীর বুকের উপরের দিকে বোতাম খুলে জরিনা বেগম এর দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে বললো ” তোমার বৌ ডা রে আমার সেবার লেইগ্যা লা….!”
জব্বার উদ্দিন আর বলতে পারলো না তাঁর আগেই তার পিঠে চটাস করে একখানা লাঠির বারি এসে পড়লো। আশেপাশের মানুষ হা করে তাকিয়ে আছে সেদিকে।
জব্বার উদ্দিন ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো কালো হুডি পরা একটা ছেলে দাঁত কেলিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হাতে তাঁর বেশ শক্ত পোক্ত একটা লাঠি। জব্বার উদ্দিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই সামনের থেকে কেউ বলে উঠলো

” দূর দাদীর নাতি, তোকে আগেই বলেছিলাম এই লাঠি ভালো না। আমার কথা বিশ্বাস করলি না। বলেছিলাম তো এই লাঠি ভাঙবে না। তুই বলেছিস ভাঙবে কিন্তু দেখ আমার কথাই ঠিক হলো তো??” বলতে বলতে জব্বারের সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো লামিয়া। তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তোয়া, মাহির, তায়েবা।
” আরেহহ আমি তো ভেবেছিলাম ভাঙবে কিন্তু ভাঙলো না কেনো??” বলেই ঠোঁট উল্টালো তায়েব।
” আরে ভাঙবে ভাঙবে এদিকে নিয়ে আয় লাঠিটা।”
তায়েব লামিয়ার কথা শুনে দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো লামিয়ার কাছে। লামিয়া তায়েব এর থেকে লাঠি টা নিজের হাতে তুলে নিয়ে কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হতেই জব্বার উদ্দিন চেঁচিয়ে উঠলো ” এই এই তোরা কেডা?? আর আমার বাইত্তে কী করতে আইছোস?? আর ওই ছ্যাড়া তুই আমার পিঠে মারলি ক্যা??”
জব্বার উদ্দিন এর কথায় লামিয়া লাঠি ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বললো
” আহা চাচা এতো হাইপার হচ্ছেন কেনো?? আমরা পরিক্ষা করছিলাম কোন লাঠি মজবুত।”
লামিয়ার কথার শেষে তায়েবা বলে উঠলো ” হ্যাঁ রে লামু এটা তো দেখছি বেশ শক্ত। এতো জোরে বারি দিলো তবুও ভাঙলো না কেনো??”

” হুমম ভাঙবে, তবে লাঠি টা যতো শক্ত দেখাচ্ছে অতোটাও শক্ত না বুঝলি??”
” কীভাবে বুঝলি যে এই লাঠি শক্ত পোক্ত না??”
” এই লাঠি দিয়ে যদি আর একটা বারি দিস তাহলে এটা ভেঙে যাবে।”
” আমার মনে হয় না।” পাশ থেকে তায়েব বলে উঠলো।
” কিন্তু আমার মনে হচ্ছে।”
” তো একটা বারি দিয়ে প্রমাণ কর দেখি।”
লামিয়া তায়েব এর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে সামনে জব্বার উদ্দিন এর দিকে তাকালো। জব্বার উদ্দিন তা দেখে চেঁচিয়ে উঠলো
” এই মাইয়া – পোলা কেডা?? আমার বাড়িতে আইয়া আমারে মারছে।”
মাহির বেশ শান্ত কন্ঠে বললো
” আহা চাচা আপনাকে আমরা কখন মারলাম??”
” তোরা মারছ নাই আমারে?? এই লাঠি দিয়া বারি দিছে এই পোলায় আমারে।”
” উঁহু চাচা আপনার ভুল হচ্ছে কোথাও। আমরা আপনাকে মারি নি শুধু লাঠি টা শক্ত কি না তাই পরিক্ষা করলাম।”
মাহিরের কথা শুনে পাশ থেকে তায়েব, তায়েবা, লামিয়া মাথা নাড়িয়ে বললো ” ঠিক ঠিক।”
জব্বার উদ্দিন তাদের কথা শুনে বেশ চটেছে তাঁর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
তা দেখে পুতু মিয়া এগিয়ে গেলো লামিয়া দের কাছে। তারপর ভীতু গলায় বললো

” ছোট্ট আম্মা আপনেরা এইহানে না থাইক্কা বাড়ি যান।”
” বাসায় যাবো কেনো?? আমরা তো এখানে আসছি ঘুরা ঘুরি করতে। তাহলে বাসায় যাবো কেনো??”
” ছোট্ট আম্মা আপনেরা এইহানে থাইক্কেন না।”
” কেনো থাকবো না?? কী হয়েছে চাচা একটু খুলে বলেন তো।”
” কিছু হয় নাই ছোট্ট আম্মা।”
” কিছু না হলে এই লোকটা আপনাকে খারাপ প্রস্তাব দিচ্ছিলো কেনো??”
পুতু মিয়া অসহায় চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে। তারপর ভাঙা গলায় বললো ” আম্মা আপনেরা সব..!”
পুতু মিয়া কে থামিয়ে তায়েবা বলে উঠলো ” হ্যাঁ চাচা আমরা সব শুনেছি, তবে প্রথম থেকে তেমন কিছু শুনি নি। আমরা তো হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে এখানে আসতেই দেখলাম আপনাকে আর চাচি কে তাই তো এখানে আসছিলাম। কিন্তু এসে এসব শুনেছি। কি হয়েছে চাচা একটু খুলে বলুন তো।”

পুতু মিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। পাশ থেকে লামিয়া বেশ শান্ত কন্ঠে বললো ” চাচা আপনি কী ভয় পাচ্ছেন?? প্লিজ চাচা ভয় পাবেন না। বলুন আমাদের কী হয়েছে?? তারপর আমরা দেখবো।”
জরিনা বেগম এগিয়ে আসতে আসতে বললো ” ছোট্ট আম্মা দয়া কইরা আপনেরা এই ভেজালে ঢুকবেন না। আমাগো ভেজাল আপনেগো উপরে নিবেন না। এই লোক টা ভালা না।”
” কে ভালো খারাপ ওইটা আমরা দেখছি। আগে বলুন কী হয়েছে আমাদের সব খুলে বলুন।”
লামিয়ার কথা শেষ হতেই জব্বার উদ্দিন চিৎকার করে উঠলো
” এইই কে কই আছোস ?? এই মাদারির বাচ্চা গুলারে ধইরা বাইন্ধা রাখ।”
এদিকে জব্বার উদ্দিন এর বলতে দেরি শক্ত পোক্ত লাঠির এক ঘা তাঁর বুকে পরতে দেরি হলো না। জব্বার উদ্দিন বুকে আঘাত পেয়ে বুকে হাত চেপে কাতরাতে থাকলো।
পুতু মিয়া এবং তার স্ত্রী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। তাঁরা ভাবতে পারে নি লামিয়া জব্বার উদ্দিন কে এতো জোরে আঘাত করে বসবে। এদিকে বারির জোরে লাঠি ভেঙে গিয়েছে। সেদিকে কারোর খেয়াল নেই।
মাহির জব্বার উদ্দিন এর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু বরাবর এক লাথি বসিয়ে দিতেই জব্বার উদ্দিন আরো কুঁকড়ে উঠলো।

তায়েবা এগিয়ে গিয়ে জব্বার উদ্দিন এর হাতের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেই জব্বার উদ্দিন চিৎকার করে উঠলো। হাতে ভাঙা লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে লামিয়া এগিয়ে গিলো জব্বার উদ্দিন এর সামনে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো ” বাজে ভাষায় গালাগালি জিনিস টা তেমন পছন্দ হয় আমার। তার উপর আমার পরিবার নিয়ে যদি কেউ গালাগালি করে তা তো একদমই ই সহ্য হবে না।”
জব্বার উদ্দিনের কিছু লোক এবার তেড়ে আসতেই মাহির আর তায়েব হাতে মোটা একটা লাঠি তুলে সজোরে আঘাত করতে লাগলো তাদের। ইসলাম বাড়ির চার কুখ্যাত ডাকাত দলেরা আজ ভীষণ রেগে আছে। ফ্যামিলি নিয়ে কেউ খারাপ মন্তব্য করলে সহ্য হয় না তাদের। তার উপর জব্বার তাদের গালি দেওয়ায় ভীষণ রেগে গিয়েছে তাঁরা।
মাহির, তায়েব ইচ্ছে মতো মারছে লোকগুলো কে আর লামিয়া, তায়েবা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।
হঠাৎ পিছন থেকে জব্বারের একজন লোক এসে তায়েবার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরতেই তায়েবা চেঁচিয়ে উঠলো

” হালার পো চুল ছাড়। নিজের ভালো চাইলে চুল ছাড় নয়তো তোর হাত কেটে কুত্তা কে খাওয়াবো।”
তবুও লোকটা চুল ছাড়ছে না লোকটা ‌। তায়েবার চিৎকার শুনে সবাই সেদিকে তাকালো। লামিয়া পাশ ফিরে লোকটার হাঁটু বরাবর লাথি মারতেই লোকটা তায়েবা কে ছেড়ে দিলো। তায়েবখ ছাড়া পেয়ে লোকটার পেটে লাথি মেরে বসলো। তা দেখে তোয়া বেশ চেঁচিয়ে উঠলো
” আআআআ বিগ বস মেইন পয়েন্টে অ্যাটাক করো।”
লামিয়া আর তায়েবা তোয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে এক সাথে বলে উঠলো ” গুড ভালো জিনিস মনে করিয়ে দিয়েছিস।” বলেই একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে লোকটার মেইন পয়েন্টে লাত্থি মেরে দিলো।
বেশ কিছুক্ষণ পিটাপিটি করে সবাই ক্লান্ত হয়ে হাতে থাকা লাঠি ফেলে দিলো। মাটিতে পরে আছে ছয়জন লোক। এই ছয়জনকে এমন কুকুরের মতো পিটিয়েছে এই ইসলাম বাড়ির চার সন্তান পুতু মিয়া এবং তার স্ত্রীর যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না। তাঁরা জানতো এই চারজন বেশ বিচ্ছু কিন্তু এতোটা বিচ্ছু তা জানতো না। তাঁরা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৬ (২)

জব্বার উদ্দিন মাটিতে বসে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চারজনের দিকে। মাহির জব্বার উদ্দিন এর দিকে তাকিয়ে বললো ” এখন এটাকে কী করবো??”
লামিয়া সামনে তাকিয়ে জব্বার উদ্দিন এর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে বললো ” বেশি না একটা কাজ ই করবো।”
তায়েব, তায়েবা, মাহির এক সাথে বলে উঠলো ” কী কাজ??”
লামিয়া তাদের দিকে সয়তানি হাঁসি দিতেই তাঁরা মাথা নাড়ালো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৮

1 COMMENT

Comments are closed.