প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৯
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
ফ্লোরে পড়ে আছে লামিয়া। হামিদার কান্নাকাটি শুনে নিচে থেকে দৌড়ে এসেছে সবাই। বোন কে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ,আরিফ। এদিকে আজমেরী বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। সবসময় বাড়ি মাতিয়ে রাখা নাতনি আজ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না তিনি।
লাবিব, আবির, সাফওয়ান, জাহিদ যেনো কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। ছবি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে তাঁর মুখে কোনো কথা নেই। আশেপাশে তাকিয়ে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। ছবি আর না দাঁড়িয়ে দ্রুত গিয়ে ফ্লোরে বসে শুভ্র কে ডাকতে লাগলো।
লাবিব কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গিয়ে লামিয়ার পাশে বসে লামিয়ার মাথা টা নিজের কোলে রাখলো। সারাদিন তাঁর সাথে ঝগড়া করে বেড়ানো মেয়েটাকে এই অবস্থায় পরে থাকতে দেখে লাবিব এর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। লাবিব এর সম্পূর্ণ শরীর কাঁপছে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় লামিয়া কে ডাকতে লাগলো কিন্তু কোনো রেসপন্স পেলো না।
লাবিব বেশ কিছুক্ষণ লামিয়া কে ডাকতে লাগলো কিন্তু লামিয়া কোনো কথা বলছে না দেখে
সাফওয়ান তাড়াহুড়ো করে আবিরের উদ্দেশ্য বললো
” আবির দ্রুত গাড়ি বের কর যা। এখানে এভাবে রেখে সময় নষ্ট করে লাভ নেই ওকে এখন ই হসপিটালে নিতে হবে।” সাফওয়ান এর কথা শুনে আবির আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চলে গেলো গাড়ি বের করতে।
রাশেদ, আরিফ, তায়েব, মাহির যেনো পাথর হয়ে গিয়েছে। সাফওয়ান তাদের এই অবস্থায় দেখে আর কিছু না বলে লাবিব কে বললো
” লাবিব তুই ওকে কোলে তুলে নিয়ে আয় জলদি।”
লাবিব লামিয়ার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকালো তারপর একটা শুকনো ঢোক গিলে লামিয়া কে পাঁচ কোল তুলতেই পিছন থেকে কারোর হাত এসে থামিয়ে দিলো। লাবিব পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র টলটল চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। লাবিব শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
” শুভ্র তুই পারবি না। আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
শুভ্র লাবিব এর কথা শুনে তাঁর রক্তিম চোখে দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললো ” আমার বউ আমি পারবো, তুই সরে যা।”
লাবিব আর কথা না বলে সরে গেলো। শুভ্র কাঁপা কাঁপা হাতে লামিয়া কে তুলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই কেউ পিছন থেকে শুভ্রর শার্ট টেনে ধরলো।
শুভ্র পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো মীর আদনান আলীর বড় নাতি আব্দুল আশিক তাঁর শার্ট ধরে আছে। শুভ্র কিছু বলতে যাবে তার আগেই আশিক চেঁচিয়ে উঠলো
” কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমার কেশবতী কে তোমরা?? ছেঁড়ে দাও, ছেঁড়ে দাও বলছি। তোমরা আমার থেকে আমার কেশবতী কে আর দূরে সরাতে পারবে না।”
শুভ্র চোয়ালে শক্ত করে তাকালো আশিক এর দিকে। নূর দ্রুত এগিয়ে এসে আশিককে ঝাপটে ধরে শুভ্রর থেকে দূরে সরাতেই শুভ্র আর দেরি না করে চলে গেলো লামিয়া কে নিয়ে।
রাশেদ, আরিফ তাঁরা সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। হামিদা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। লামহা নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে হামিদার হাত চেপে আছে।
তায়েব,তায়েবা, মাহির একে অপরের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
এদিকে আশিক গলা ছেড়ে চিৎকার করছে বাচ্চাদের মতো। মীর আদনান আলী তা দেখে গম্ভীর গলায় বললো
” ওর ঘরের তালা কে খুলেছে??”
অনু মাথা নিচু করে জবাব দিলো
” দাদুভাই আমি ভাইয়া কে খাবার দিতে এসেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি তালা দিয়েছিলাম। ভাইয়া কীভাবে বের হলো আমি জানি না।”
মেয়ের এমন কথা শুনে আব্বাস আলী রেগে ধমকে উঠলো।
” তোমাকে খাবার দিতে বা এ ঘরে আসতে কে বলেছিলো?? বাড়িতে আর কেউ ছিলো না??”
ধমক শুনে অনু চমকে উঠলো, কিন্তু মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না।
আশিক বেশ পাগলামি করছে। ছেলের এমন পাগলামী দেখে মীর আব্দুল আলীম আর কিছু না ভেবে ড্রয়ার থেকে একটা ঘুমের ইনজেকশন পুশ করলো আশিকের ঘাড়ে। ঘাড়ে ইনজেকশন পুশ করতেই আশিক আস্তে আস্তে তলিয়ে যেতে লাগলো ঘুমের ঘোরে। তবে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করতে লাগলো
” আমার কেশবতী কে নিয়ে যেও না। ফিরিয়ে দাও ওকে নিয়ে যেও না ওকে।” বলতে বলতে তাঁর চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে গেলো।
নূর আর আব্দুল আলীম আশিক কে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলো। অনু মাথা নিচু করে চোখের পানি ফেলছে। আব্দুল আলীম এর স্ত্রী মারিয়াম বেগম ছেলের এ অবস্থা দেখে মুখে আঁচল গুঁজে কান্না করছে।
মীর আদনান আলী আর কিছু না বলে চুপচাপ চলে গেলেন রুম থেকে। জাহিদ রাশেদ আর আরিফ কে শান্তনা দিয়ে তাদের নিয়ে রোওনা হয়েছে তাদের বাগান বাড়িতে। একে একে সবাই আশিকের রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নূর তাঁর রুম টা তালাবদ্ধ করে নিজের রুমে চলে গেলো।
।
ফুল স্পীডে গাড়ি চালাচ্ছে আবির। তাঁর পিছনেই বসে লামিয়া কে জাপটে ধরে পাগলের মতো বিড়বিড় করছে শুভ্র।
” ভ্রমর আমার জান প্লিজ কথা বল। ঝগড়া কর আমার সাথে। কথা বল না প্লিজ ভ্রমর কথা বল। দেখ আমার কিছু ভালো লাগছে না। এই ভ্রমর কথা বল না আমার সাথে। চোখ খোল ভ্রমর।” বলতে বলতে শুভ্রর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো।
শুভ্রর এমন পাগলামী সাফওয়ান শুভ্রর উদ্দেশ্য বললো ” ভাই প্লিজ নিজেকে শক্ত কর।”
সাফওয়ান এর কথায় শুভ্র ভাঙা গলায় বললো ” কীভাবে শক্ত হবো আমি?? আমার ভ্রমর যে কথা বলছে না।”
” একটু ধৈর্য ধর সব ঠিক হয়ে যাবে কিছু হবে না আমাদের লামিয়ার।”
শুভ্র সাফওয়ান এর কথার পৃষ্ঠে আর কোনো কথা না বললো না।
তাদের গাড়ির পিছনের ফুল স্পীডে বাইক চালিয়ে আসছে তায়েব, তায়েবা, মাহির। বোনের এই অবস্থায় তাঁরা বাড়িতে বসে থাকতে পারবে না তাই তাঁরাও এসেছে তাদের পিছন পিছন।
হসপিটালের সামনে আসতেই আবির গাড়ি থামালো। শুভ্র দ্রুত লামিয়া কে কোলে তুলে নিয়ে হসপিটালের ভিতরে প্রবেশ করলো। আশেপাশে কোনো ডক্টর না দেখতে পেয়ে শুভ্র চেঁচিয়ে উঠতেই পাশের কেবিন থেকে একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলো।
লোকটা একনজর শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আবার শুভ্রর কোলে থাকা লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ” উনাকে আমার সাথে নিয়ে আসুন।” বলেই সামনে এগোতে লাগলো।
শুভ্র আর কিছু না ভেবে দ্রুত লামিয়া কে নিয়ে চলে গেলো ডক্টর এর পিছন পিছন।
পুরো হল রুম জুড়ে নিস্তব্ধতা, কারোর মুখে কোনো কথা নেই। কিছুক্ষণ পর পর ভেসে আসছে আজমেরী বেগম এর কান্নার শব্দ। তাঁর পাশেই আবিরা বেগম শান্তনা দিচ্ছে বড় বোন কে। আরিফ মাথা নিচু করে বসে আছে আর তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আয়না। ছবি তোয়া কে কোলে তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তোয়া ও মন খারাপ করে ছবির গলায় মুখ গুঁজে আছে। প্রাণ প্রিয় বিগ বসের এই অবস্থা দেখে তোয়াও যেনো একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে ।
সোফার এক কোণে বসে রাশেদ ফোনে কথা বলছে আবিরের সাথে। এর মধ্যে হঠাৎ কিছুর শব্দ পেতেই সবাই পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো লামহা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে ফ্লোরে। লামহা কে হঠাৎ জ্ঞান হারাতে দেখে সবাই ভয় পেয়ে গেলো। প্রথমে ছোট্ট বোনকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে এখন মেজো বোন কে ফ্লোরে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকতে দেখে হামিদা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। লামহা বলে চেঁচিয়ে উঠে দৌড়ে গিয়ে হাঁটু ভেঙে বোনের কাছে বসলো। একে একে সবাই দৌড়ে গেলো লামহার কাছে। আরিফ দৌড়ে লামহার মাথা নিজের কোলে তুলে নিয়ে আয়নার উদ্দেশ্য বললো
” তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে আসো।”
আরিফের কথা শুনে আয়না দৌড়ে পানি আনতে চলে গেলো। এদিকে লামহার কিছু হয়েছে ভেবে আবির ফোনের ওপাশ থেকে অস্থির গলায় রাশেদ কে বলতে লাগলো
” রাশেদ, রাশেদ লামহার কি হয়েছে?? রাশেদ কথা বল ভাই কি হয়েছে আমার লামহার।”
রাশেদ ফোন কানে তুলে তাকিয়ে আছে লামহার দিকে। মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না তার।
বোনদের এই অবস্থা দেখে রাশেদ যেনো পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শারমিন রাশেদ এর থেকে ফোন নিয়ে আবির কে জানিয়ে দিলো লামহার কিছু হয় নি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তা শুনে আবির আরো অস্থির হয়ে পড়েছে। শারমিন রাশেদের কাঁধে হাত রেখে বললো
” রাশেদ ভাই নিজেকে শক্ত করুন। আপনি যদি এই অবস্থায় ভেঙে পড়েন তাড়লে আমাদের কি হবে??”
শারমিনের কথা শুনে রাশেদ নিষ্প্রাণ চোখে তাকালো শারমিনের দিকে। শারমিন রাশেদের দিকে তাকিয়ে বললো ” কিছু হবে না আপনি ধৈর্য ধরুন। আর এখন আমাদের উচিত লামহা কে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া।”
রাশেদ শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে গেলো লামহার কাছে। আরিফ লামহার চোখ মুখে পানির ছিটা দিচ্ছে তবুও লামহা চোখ খুলছে না।
দুই নাতনির এই অবস্থা দেখে আজমেরী বেগম এবার জোরে কেঁদে উঠলো। তা দেখে শফিকুল খান তাঁকে ধমকে উঠলো।
আজমেরী বেগম কান্না করতে করতে বললো ” আমার পোলাপাইন গো উপরে কারোর চোখ পড়ছে তাই ওগো এই অবস্থা। আমার এই নাতনি মেডিকেল আর এক নাতনির এই অবস্থা হঠাৎ কি হইতাছে আমাগো বাড়ির পোলাপাইন এর লগে আমি কিছু বুঝতাছি না।”
আবিরা বেগম আজমেরী বেগম কে শান্তনা দিয়ে বললো ” কিছু হয় নাই বুবু তুই কাইন্দো না। তুমি পরে অসুস্থ হইয়া যাইবা।”
” আমি মইরা যাই আমার নাতি – নাতনি গুলা জানি সুস্থ থাকে। আল্লাহ কোন পরিক্ষায় ফালাইলা আমারে। আমার দাদুভাই গো তুমি সুস্থ কইরা দাও।” বলে হু হু করে কেঁদে উঠলো আজমেরী বেগম।
চোখ – মুখে পানি এবং হাজার ডাকার পর ও লামহার জ্ঞান ফিরছে না দেখে রাশেদ আর কিছু না ভেবে লামহা কে পাঁচ কোল তুলে জাহিদ এর দিকে তাকিয়ে বললো ” গাড়ি বের কর।”
জাহিদ আর কথা না বলে দ্রুত চলে গেলো গাড়ি বের করতে। রাশেদ লামহাকে কোলে তুলে আরিফ এর দিকে তাকিয়ে বললো
” তোর আসতে হবে না, তুই বাড়িতে থাক।”
বড় ভাইয়ের কথা শুনে আরিফ মাথা নাড়াতেই রাশেদ বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
।
এদিকে আবিরের কেমন পাগল পাগল লাগছে সব কিছু। তাঁর কোনো কিছু ভালো লাগছে না। লামহা হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছে কেনো তা ভেবে পাচ্ছে না আবির। তাঁকে এমন দেখে লাবিব ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলো। সাফওয়ান বাড়িতে ফোন করতেই শারমিন জানালো লামহা কে নিয়ে রাশেদ আর জাহিদ হসপিটালে রওনা হয়েছে।
শুভ্র লামিয়া কে নিয়ে কেবিনে বসে আছে। ক্ষত তেমন গুরুতর হয় নি। সামান্য চোট পেয়েছে । জ্ঞান হারানোর কারণ তাঁর ঘাড়ে কেউ ইনজেকশন পুশ করেছে, যার কারণে সে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে।
শুভ্র ভেবে পাচ্ছে না কে করেছে এসব আর কেনো করেছে। লামিয়ার উপরেই অ্যাটাক কেনো করেছে বুঝতে পারছে না শুভ্র। তখন ই হুড়মুড় করে কেবিনে প্রবেশ করলো মাহির, তায়েব, তায়েবা। শুভ্র তাদের দেখে ভ্রু কুঁচকে কিছু জিগ্গেস করার আগেই তায়েবা বলে উঠলো
” মেজো আপা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছে। তাঁকে এখানে আনা হচ্ছে। আবির ভাই ভেঙে পড়েছে তাঁকে শান্তনা দিয়ে আসুন। ততক্ষণে আমরা লামুর পাশে আছি।”
তায়েবার কথা শুনে শুভ্রর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। সে আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়িয়ে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে লামিয়ার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে। শুভ্র বেরিয়ে যেতেই মাহির, তায়েব, তায়েবা দৌড়ে লামিয়ার পাশে গিয়ে লামিয়ার পুরো শরীর চেক করতে লাগলো। কপাল ছাড়া আর কোথাও ব্যাথা পেয়েছে কি না দেখতে লাগলো।
গাড়ি হসপিটালের সামনে এসে দাড়াতেই আবির দৌড়ে গেলো সেদিকে। রাশেদ পাঁচ কোল তুলে লামহা কে বের করতেই আবির হুমড়ি খেয়ে পড়লো লামহার উপর।
” লামহা পাখি আমার পাখি কি হয়েছে তোর চোখ খোল কথা বল।” বেশ অস্থির গলায় বললো আবির।
রাশেদ আবির কে সরিয়ে দিয়ে লামহা কে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো ” প্লিজ একটু সর আমার বোনটা এমনেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছে । আগে ওকে ডক্টর দেখিয়ে নেই তারপর তুই ডাকা ডাকি করিস।” বলেই ডক্টর এর কেবিনে চলে গেলো।
আবির দৌড়ে যেতে লাগলো রাশেদ এর পিছন পিছন। লাবিব, শুভ্র , জাহিদ, সাফওয়ান আবিরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারাও হাঁটতে লাগলো সেদিকে।
” আমি কোথায়??”
” হসপিটালের বেডে।”
মাহিরের কথা শুনে লামিয়া লাফিয়ে উঠে বসলো শোয়া থেকে। তারপর চঞ্চল চোখে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে মাথায় হাত রাখতেই বুঝলো মাথায় ব্যান্ডেজ করা। মাহির,তায়েব,তায়েবা লামিয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের এমন তাকাতে দেখে লামিয়া বললো ” আমি এখানে কী করে এলাম??”
” উড়ে উড়ে।”
তায়েব এর কথা শুনে লামিয়া বিরক্ত হয়ে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। বিরক্ত হয়ে কিছু বলার আগেই দেখলো শুভ্র আর জাহিদ কেবিনে প্রবেশ করলো।
লামিয়া ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে শুভ্রর দিকে তাকাতেই দেখলো শুভ্র শান্ত চোখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে এক- পা, দু -পা করে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। শুভ্র কে লামিয়ার দিকে যেতে দেখে মাহির, তায়েব, তায়েবা তাঁরা সরে গিয়ে বললো ” আমরা মেজো আপা কে দেখে আসছি লামিয়া থাক তুই।”
তাদের কথা শুনে লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” মেজো আপা কে দেখে আসবি মানে?? কি হয়েছে মেজো আপার??”
” জানি না জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছে।”
তায়েবার কথা শুনে লামিয়ার কপালে ভাঁজ পড়লো।
” জ্ঞান হারিয়ে গিয়েছে মানে?? কী হয়েছে আপার?? চল আমিও যাবো তোদের সাথে।” বলেই দ্রুত বেড থেকে নামতেই শুভ্র লামিয়ার পথ আটকে দিলো। তারপর জাহিদের উদ্দেশ্য বললো
” এদের কে নিয়ে বিদায় হ।”
জাহিদ আর কিছু না বলে মাহির, তায়েব, তায়েবা কে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
তাদের বেরিয়ে যেতে দেখে লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
” কী সমস্যা?? আপনার আমার পথ আটকালেন কেনো??”
শুভ্র শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো
” তোর শরীর ভালো না তাই।”
” আপনাকে বলেছে আমার শরীর ভালো না??”
” হ্যাঁ বলেছে।”
” আমাকে যেতে দিন। মেজো আপার কী হয়েছে?? আমি দেখতে যাবো মেজো আপা কে।”
” এখন না পরে। লামহার তেমন কিছু হয় নি।”
” তেমন কিছু না হলে হঠাৎ কেনো জ্ঞান হারাবে??”
” আমি বললাম তো কিছু হয় নি।”
” ঠিক আছে বিশ্বাস করলাম। কিন্তু এখন আমাকে যেতে দিন। আমিও দেখতে চাই আপা কে।”
” এখন না পরে।”
” না এখন ই যাবো।”
” সবসময় জেদ করবি না আমি বলেছি না ওর কিছু হয় নি।”
” যথি কিছু না ই হয় তাহলে যেতে দিতে কী সমস্যা আপনার??”
” অনেক সমস্যা আমার।”
” কি সমস্যা??”
” তুই অসুস্থ এখন এটাই আমার সমস্যা।”
” কে বলেছে আমি অসুস্থ?? আমি পুরোপুরি সুস্থ দেখুন।” বলেই লামিয়া বেডের থেকে নেমে হাত – পা নাচাতে লাগলো।
শুভ্র লামিয়ার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। এই মেয়ে এখনো দূর্বল তবুও বাঁদরের মতো লাফাচ্ছে মানে এর এতো এনার্জি কোথা থেকে আসে বুঝে উঠতে পারে না শুভ্র। ভাবতে ভাবতে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বললো
” বাঁদরের মতো লাফালাফি শেষ হলে এখানে চুপচাপ বস।”
লামিয়া হাত – পা নাড়ানো রেখে শুভ্রর দিকে তাকালো। তারপর দাঁত কেলিয়ে হেঁসে বলল
” আপনি চুপচাপ বসে থাকুন আমি গেলাম।” বলেই ফুড়ুৎ করে দরজা খুলে দৌড় দিলো।
শুভ্র আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার যাওয়ার দিকে। এই মেয়ে যে লাফাতে লাফাতে তাঁকে বোকা বানিয়ে চলে যাবে তা সে বুঝতে পারে নি। শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো ” লামিয়ার বাচ্চার তোর কপালে মার ফরজ হয়ে গিয়েছে।” বলেই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে হাঁটতে লাগলো লামিয়ার পিছু পিছু।
” কংগ্র্যাচুলেশনস আবির খান আপনি বাবা হতে চলেছেন।” বলেই ডক্টর আবিরের সাথে হ্যান্ডশেক করলো।
আবির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে লামহার দিকে। লামহার তখন ও জ্ঞান ফিরে নি। এদিকে লাবিব, সাফওয়ান, রাশেদ, জাহিদ হা করে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে।
সবেই দৌড়ে কেবিনের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে লামিয়া। ডক্টর এর কথা শুনে হাতে তালি দিতে দিতে কেবিনে প্রবেশ করলো সে। মাহির, তায়েব, তায়েবা এতোক্ষণ বসে বসে ডক্টর এর কথা শুনছিলো। লামিয়া কে হাতে তালি দিতে দেখে তাঁরাও হাতে তালি দিয়ে উঠলো। এর মধ্যে তায়েবা হঠাৎ সিটি বাজাতে আবিরের ধ্যান ফিরলো। লামিয়া হাতে তালি দিতে দিতে এগিয়ে এসে আবিরের হাত ধরে বললো ” অভিনন্দন আবির ভাই। আপনি আপনার বড় ভাইয়ের আগে যে এই খুশির খবর টা সবাই কে শোনাবেন তা আমরা জানতাম না।”
আবির আহাম্মক এর মতো তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। একে একে তায়েব, তায়েবা, মাহির এগিয়ে এসে আবিরের সাথে হ্যান্ডশেক করে অভিনন্দন জানালো।
আবির তখন ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কীভাবে কী হলো সে কিছু বুঝতে পারছে না।
এদিকে রাশেদ লামিয়া কে দেখে এগিয়ে গিয়ে বোনের মাথায় হাত রাখতেই লামিয়া মাথা তুলে রাশেদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল ” কী বড় ভাই তুমি তো মামা হতে চলেছো।”
রাশেদ লামিয়ার কথা শুনে হালকা হেসে বললো ” আর তুই খালা।”
রাশেদের কথা শুনে লামিয়া হেঁসে উঠলো। রাশেদ লামিয়ার মাথার ব্যান্ডেজে হাত বুলাতে বুলাতে বললো ” বেশি ব্যাথা করছে।”
” না বড় মিঞা।”
” সত্যি??”
” আরেহহ তিন সত্যি।”
রাশেদ হেঁসে লামিয়ার মাথায় চুমু খেলো। তারপর এগিয়ে গিয়ে লামহার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো ” তোর জন্য আমার বোনের এই অবস্থা। তোকে আমি ছাড়বো না দেখিস।”
আবির শুকনো ঢোক গিলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো লামহার দিকে। লামিয়া আবিরের অবস্থা দেখে হেঁসে আবিরের বাহুতে ধাক্কা মেরে বললো ” কী সমস্যা?? এতো ভয় পাচ্ছেন কেনো??”
আবির লামিয়ার দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিলে এগিয়ে গিয়ে লামহার পাশে দাঁড়ালো। রাশেদ লামহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললো ” তোরা সবাই এবার চল। ওদের একটু একা থাকতে দে।” রাশেদ এর কথা মতো সবাই বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
সবাই বেরিয়ে যেতেই আবির লামহার হাত ধরে তাঁর কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বললো
” কংগ্র্যাচুলেশনস বউ তুমি মা হতে চলেছো।”
।
” ইয়েএএএ আমি আর তায়েবা খালা হতে চলেছি।” বলেই লাফিয়ে উঠলো লামিয়া।
” আমি আর মাহির মামা।” বলেই চোখ জ্বল জ্বল করে উঠলো তায়েব এর।
ভাই – বোনদের এমন খুশি দেখে রাশেদ হেঁসে উঠলো। বাড়িতে নতুন সদস্য আসতে চলেছে ভাবতেই খুশি লাগছে।
শুভ্র বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লামিয়ার হাঁসি মুখখানা দেখছে।
হঠাৎ লামিয়ার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। নিজেকে সামলাতে না পেরে লামিয়া পরে যেতে নিলেই
শুভ্র লামিয়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরলো। লামিয়া নিভু নিভু চোখে শুভ্রর দিকে তাকাতেই দেখলো শুভ্র রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
লাবিব ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো ” কী ব্যাপার তুই আবার ঘুরিয়ে পরে যাচ্ছিস কেনো??”
লামিয়া লাবিব এর দিকে তাকিয়ে বললো ” জানি না।”
লাবিব মুখে হাত দিয়ে বললো
” তাঁর মানে শুভ্র তুই…!”
বলার আগেই শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” স্টুপিড , ওর শরীর দূর্বল তাঁর জন্য ওর মাথা ঘোরাচ্ছে।”
শুভ্রর কথা শুনে লাবিব টেনে টেনে বললো ” ওওওওওও আগেএএএ বলবিইইই না। আমি তো ভাবলাম তোরাও সুখবর শোনাতে যাচ্ছিস।”
” লাবিব তুই যদি আর একটা বাজে কথা বলেছিস তো, তোর মুখ আমি ভেঙে দিবো।”
লাবিব শুভ্রর কথা শুনে মুখ বাকালো।
।
” আবির..!”
লামহার মলিন কন্ঠে আবিরের ধ্যান ফিরে। আবির দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে লামহার দিকে তাকাতেই লামহা শোয়ার থেকে উঠে বসতে চাইলো। আবির লামহা কে ধরে বসাতেই লামহা আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বলে উঠলো
” আমি এখানে কেনো?? আর লামিয়া?? ওও কেমন আছে??”
আবির লামহার দিকে তাকিয়ে বললো ” লামিয়া ঠিক আছে এখন।”
” আমি ওকে দেখতে যাবো।”
” যাবে তো একটু পর ই সবাই বাড়িতে যাবো। ”
লামহা মাথা নাড়লো তারপর আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো
” আমি এখানে কীভাবে??”
” রাশেদ নিয়ে এসেছে তোমাকে।”
” কিন্তু কেনো??”
লামহার কথা শুনে আবির হাসলো। আবির কে হাসতে দেখে লামহা কপালে ভাঁজ ফেলে বললো
” আপনি হাসছেন কেনো???”
আবির লামহার দিকে মুখ টা একটু এগিয়ে নিয়ে বললো
” কংগ্র্যাচুলেশনস ।”
আবিরের কথা শুনে লামহা কপাল কুঁচকে বললো ” কীসের জন্য??”
আবির লামহার দিকে তাকিয়ে আবারো হাসলো। তা দেখে লামহা এবার বেশ বিরক্ত হলো।
” কী সমস্যা হাসছেন কেনো??”
” মন চাইছে তাই।”
” বলুন না কী হয়েছে??”
” শুনবি??”
লামহা মাথা নাড়ালো। আবির লামহার দিকে ঝুঁকে লামহার নাকের ডগায় ছোট্ট চুমু খেয়ে বললো ” আপনি আমার বাবুর মা হত চলেছেন।”
আবিরের কথা শুনে লামহা বড় বড় চোখ করে তাকাতেই আবির মাথা নাড়লো। খুশিতে লামহার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তেই আবির মেকি রাগ দেখিয়ে বললো ” কান্না করছিস কেনো?? খবরদার কান্না করবি না। তোর জন্য আমার বাচ্চা পেটের মধ্যে কান্না করলে তোর খবর আছে।”
আবিরের কথা শুনে লামহা হেঁসে আবিরের গলা জড়িয়ে ধরতেই আবির চেঁচিয়ে উঠলো ” আআ এভাবে জড়িয়ে ধরেছিস কেনো?? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
লামহা আবিরের গলায় মুখ গুঁজে কামড় দিয়ে বসতেই আবির বলে উঠলো ” এই এই খবরদার কামড়াকামড়ি করবি না। পরে দেখা যাবে আমার বাচ্চা ও তোর মতো কামড়াকামড়ি করবে।”
লামহা আবিরের দিকে তাকাতেই আবির লামহার ঠোঁটের কোণে চুমু খেতেই লামহা আবিরের বুকে কিল মেরে বসলো। আবির হেঁসে বললো
” বউ এই বুকে শুধু তোরই বসবাস। আয় বউ আয় কলাকলি করি।”
লামহা হেঁসে আবির কে জড়িয়ে ধরে বললো ” বেয়াদব।”
আবির লামহা কে জড়িয়ে ধরে বললো ” শুধু তোর জন্য।”
সন্ধ্যা থেকে বাড়িতে ছিলো শোকের ছায়া, একটু আগে সাফওয়ান লামহার প্রেগন্যান্ট এর কথা এবং লামিয়া সুস্থ আছে সে খবর দেওয়াতে এখন বাড়ির সবাই আনন্দে মেতে উঠেছে। আজমেরী বেগম ভেজা চোখ মুছে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো।
তোয়া এতোক্ষণ চুপচাপ মুখ মলিন করে ছিলো। লামিয়া সুস্থ আছে শুনে তোয়া ছবির কোল থেকে নেমে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কখন তার বিগবস আসবে সে অপেক্ষায়।
গাড়ি চলছে আপন গতিতে। গাড়িতে লামহার কাঁধ ধরে বসে আছে আরিফ। শুভ্র লামিয়ার মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে আছে। লামিয়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি ড্রাইভ করছে সাফওয়ান। লাবিব, জাহিদ আর রাশেদ গিয়েছে তায়েব, তায়েবা আর মাহিরের বাইকে। এতো রাতে তাদের তিনজন কে একা ছাড়তে চায় নি তাই শুভ্র রাশেদ, লাবিব এবং জাহিদ কে তাদের সাথে পাঠিয়েছে। তাদের গাড়ির পিছনেই নিজ গতিতে চলছে তিনটি বাইক।
গাড়ির জানালা খোলা। বাহিরের মৃদু বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে লামিয়া কে। তাঁর এলোমেলো চুল গুলো বাতাসে দুলছে। শুভ্র ঘুমন্ত প্রেয়সীর দিকে তাকালো। ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাঁর ভ্রমর কে। বাহিরের বাতাসে লামিয়া কেঁপে উঠতেই শুভ্র দ্রুত গ্লাস উঠিয়ে দিয়ে লামিয়া কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। তারপর মাথায় চুমু খেয়ে আস্তে করে বললো ” আমার ভ্রমর।”
বলেই কিছুক্ষণ আগে লামিয়ার বলা কথা গুলো ভাবতে লাগলো।
কিছুক্ষণ আগে,
” তোর এই অবস্থা কীভাবে হলো??”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া তাঁর দিকে তাকালো। তারপর ভাবুক কন্ঠে বললো ” আমি জানি না শুভ্র ভাই কে ছিলো বা কীভাবে হলো। কিন্তু যখন অনু আমাদের সবাই কে বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো তখন আমি পিছনে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো যে কেউ আমাদের দিকে নজর রাখছে। আমি পিছন ফিরে ওই দোতলা অন্ধকার বারান্দার দিকে তাকাতেই দেখলাম একজোড়া চোখ আমাকে দেখছে। ওখানে কে আছে সেটা দেখার জন্য আমি সেখানে যাই। তখনই হঠাৎ ঘাড়ে ব্যাথা অনুভব করতেই আমি পিছনে ঘুরেই তাকাতেই দেখলাম মুখোশ পড়া কেউ আমার মুখ চেপে ধরলো। আমি চিৎকার করতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারি নি। ওই মুখোশ পড়া অবয়ব টা আমাকে টেনে কোথাও নিয়ে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু তাঁর আগেই একটা লোক আসতেই ওই অবয়ব টা আমাকে ধাক্কা দিয়েছিলো তারপর আর কিছু মনে নেই আমার।”
কে এই মুখোশ পড়া অবয়ব ভেবে পাচ্ছে না শুভ্র। এসব ভাবতে ভাবতে শুভ্র হঠাৎ অনুভব করলো লামিয়ার শরীর গরম হয়ে আসছে। আজকে রাতে যে এই মেয়ের জ্বর আসবে তা শুভ্র বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে। শুভ্র কিছু ভেবে লামিয়া কে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আরেক হাত দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে মেসেজ করে ফোন আবার পকেটে রেখে দিলো।
” এএএ পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলো তো??”
” আপনার এই বেসুরো কন্ঠে গান গাওয়া টা কী অফ করবেন?? নাকি আমি নেমে যাবো কোনটা??”
” যা না, নেমে যা। মানা করেছে কে তোকে নামতে??”
” গাড়ি থামান, গাড়ি থামান বলছি। আমি যাবো না আপনার সাথে।”
” ইহহহ তোর সাথে যাওয়ার জন্য কী আমি মরে যাচ্ছি মনে হয়।”
” আমিও মরে যাচ্ছি না আপনার সাথে যাওয়ার জন্য।”
” তাহলে তখন বাইকে উঠে বসলি কেনো??”
” সরি আমি উঠি নি আপনি উঠেছেন আমার বাইকে।”
” এটা তোর বাইক??”
” জ্বী না, নূর এর বাইক।”
নূরের কথা শুনে জাহিদ গাড়ি থামিয়ে রেগে বললো ” নাম, নাম বলছি।”
জাহিদ এর এমন ধমক খেয়ে তায়েবা ভয়ে দ্রুত বাইক থেকে নেমে পড়লো।
জাহিদ বাইক থেকে নেমে তায়েবার বাহু চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” নূর??? ওই ছেলের সাথে তোর এতো পিরিত হয়েছে যে ওর বাইক নিয়ে এসেছিস??”
” জাহিদ ভাই কথা সাবধানে বলবেন। কী বলছেন আপনার কোনো আইডিয়া আছে?? পিরিত মানে?? আপনার মাইন্ড এতো নিচ আমি জানতাম না।”
” হ্যাঁ আমার মাইন্ড নিচ তাই না ?? ওই নূর এর মাইন্ড খুব ভালো তাই না??” বলেই তায়েবার বাহু আরো শক্ত করে চেপে ধরতেই তায়েবা কুঁকড়ে উঠলো।
” জাহিদ ভাই ছাড়ুন আমাকে নয়তো খারাপ হবে অনেক।”
” কী খারাপ হবে হ্যাঁ?? ওই নূর এর কথা বলেছি দেখে গাঁয়ে ফস্কা পড়ে গিয়েছে তোর??”
জাহিদ এর কথা শুনে তায়েবার শরীর রাগে রি রি করে উঠলো।
” আপনাকে আমি ভালো মনে করেছিলাম কিন্তু আপনার কথা বার্তা যে এতোটা খারাপ তা আগে জানতাম না। ”
” হ্যাঁ আমি খারাপ। ওই নূর তোর কাছে ভালো তাই না??” বলেই তায়েবার বাহু ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলো। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” থাক তুই তোর নূর কে নিয়ে।” বলেই গটগট পা ফেলে চলে গেলো সেখান থেকে।
অন্ধকার মাটির রাস্তা তায়েবা একা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। জাহিদের যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। চোখের কোণে পানি এসে জড়ো হয়েছে তাঁর। হঠাৎ চোখ থেকে টুপ করে তায়েবার গাল বেঁয়ে পানি পড়তেই তায়েবা তাচ্ছিল্য হেঁসে উঠলো। তারপর বাইকে বসে বাইক স্টার্ট দিয়ে এক টান দিয়ে একটু সামনে আসতেই দেখলো জাহিদ হাঁটছে। তায়েবা তা দেখেও না দেখার ভান করে বাইক জোরে টেনে চলে গেলো সেখান থেকে। জাহিদ তা দেখে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকিয়ে রইল তায়েবার যাওয়ার পানে।
একে একে সবাই বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। জাহিদ অর্ধেক রাস্তা হেঁটে আসার কারণে একটু দেরিতেই বাড়িতে ফিরেছে। সবাই আজ ভীষণ ক্লান্ত তাই লামহার সাথে কথা বলে যে যার রুমে চলে গেলো। লামিয়ার সাথে ও তাঁরা কথা বলতে চেয়েছিলো কিন্তু লামিয়া গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে তাই আর কেউ তাকে ঘুম থেকে তুলে নি। শুভ্র লামিয়া কে কোলে তুলে নিজের রুমে এনে শুইয়ে দিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।
ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখলো হামিদা খাবার নিয়ে এসেছে। শুভ্র হামিদার হাত থেকে খাবার নিতেই হামিদা বললো ” আজ আমি থাকি লামিয়ার সাথে??”
শুভ্র ছোট্ট করে জবাব দিলো
” প্রয়োজন নেই। তুই ঘুমাতে যা।”
” যদি কিছুর প্রয়োজন হয়??”
” আমার বউয়ের কিছু প্রয়োজন হলে সেটা আমি দেখে নিবো।”
শুভ্রর কথা শুনে বুঝলো এখানে সে থাকতে পারবে না। তাই মুখটা মলিন করে বললো ” ঠিক আছে। তবে কিছু লাগলে আমাকে ডাকবি হ্যাঁ??”
শুভ্র হামিদার কথায় মাথা নাড়ালো। হামিদা একবার বোনের দিকে তাকিয়ে তারপর চলে গেলো। শুভ্র এগিয়ে গিয়ে দরজা লাগাতেই দেখলো তোয়া অসহায় মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র তা দেখে এগিয়ে গিয়ে তোয়া কে কোলে তুলে বললো ” কী হয়েছে আমার প্রিন্সেস এর??”
” আমার মন খারাপ হ্যান্ডসাম বয়।”
” আমার প্রিন্সেস এর মন খারাপ কেনো হুমমম??”
” বিগবস শুধু ঘুমিয়ে আছে, না চোখ খুলছে আর না কথা বলছে। বিগবস এমন করলে কী ভালো লাগে বলো??”
শুভ্র তোয়ার কথা শুনে বললো
” তোমার বিগবস ভীষণ ক্লান্ত তাই ঘুমিয়ে আছে। তুমি আজকে ঘুমিয়ে পড় গিয়ে। কালকে সকালেই দেখবে তোমার বিগবস আগের মতো হয়ে গিয়েছে।”
” সত্যি বলছো তুমি??”
” হ্যাঁ সত্যি বলছি।”
” সত্যি কী কালকে সকালে বিগবস ভালো হয়ে যাবে??”
” ইয়েস।”
” ইয়েএএএ তাহলে ভীষণ মজা হবে। আমি এখন ই যাচ্ছি ঘুমোতে কালকে বিগবস আগের মতো হয়ে যাবে কী মজা কী মজা।” বলেই শুভ্রর কোল থেকে নেমে খুশিতে লাফাতে লাফাতে চলে গেলো।
শুভ্র তোয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হেঁসে দরজা বন্ধ করে দিয়ে সামনে ঘুরে তাকাতেই দেখলো বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে আছে তার ভ্রমর। শুভ্র এগিয়ে গিয়ে লামিয়ার কপালে হাত রাখতেই দেখলো জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। শুভ্র আর দেরি না করে একটা রুমাল ভিজিয়ে লামিয়ার কপালে রেখে তাঁর পাশে বসে লামিয়ার হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেয়ে বললো ” দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠ ভ্রমর। তুই ছাড়া সব কিছু শূন্য শূন্য লাগে। তুই ছাড়া আমার কে আছে বল হুমমম??” বলেই লামিয়ার কপালে চুমু এঁকে দিলো।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৮
তারপর পাশে থেকে ফোন নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে কারোর সাথে কথা বলতে লাগলো। তখনই চোখ পড়লো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কালো হুডি পড়া এক অবয়ব কে। শুভ্র ফোন কান থেকে নামিয়ে ভালোভাবে তাকাতেই দেখলো একটা গাড়ি এসে সেই অবয়ব টি কে নিয়ে চলে গেলো। শুভ্র আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে থাকলো সেদিকে। কে এই অবয়ব তাকে যে এক নজর দেখতেই হবে। কিছু ভাবতে ভাবতে রুমে চলে আসতেই দেখলো ঘুমন্ত প্রেয়সী কে। শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আশেপাশে পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে বেলকনির দরজা টা ভালোমতো লক করে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তারপর লামিয়া কে নিজের বুকে টেনে শান্তির এক শ্বাস ফেলে চোখ বুঁজে পারি জমালো ঘুমের দেশে।

next part tara tari pleas