প্রিয় রাগিনী পর্ব ৬২
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
বিছানায় বসে মন খারাপ করে মাথা নিচু করে বসে আছে মাহির। আর তাঁর রুম জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে আছে ইসলাম বাড়ির ছেলেমেয়েরা। একটু আগে খান বাড়িতে যা যা হয়েছে একে একে সবাই কে সব খুলে বলছে তায়েব। সব শুনে রাশেদ, আরিফ, আয়না, ছবি , শুভ্র,লামহা কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে হেঁসে উঠলো। লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো ” তোমরা হাসছো? আর আমা ভাবছি হাফসার মায়ের চয়েস টা কী। ওই বলদা নাকি বাঘের বাচ্চা।”
পাশ থেকে তায়েবা বললো
” ভাগ্যিস বাঘমামু শুনে নি। শুনলে হয়তো তাঁর পুরো বংশ নিয়ে আত্মহ*ত্যা করতো।”
তায়েবার কথা শুনে আবারো হেঁসে উঠলো সবাই। তবে মাহির চুপ কোনো কথা বলছে না। তা দেখে তায়েব মাহিরের কাঁধে ধাক্কা মেরে বললো ” তুই এমন মুখ করে বসে আছিস কেনো?”
মাহির আস্তে করে বললো ” ভালো লাগছে না।” বলেই লামিয়ার দিকে তাকালো । তাঁর ভাই – বোনরা যখন জেনে গিয়েছে হাফসার বিয়ে ওই ছেলের সাথে হতে চলেছে তাহলে সে জানে তাঁর ভাই – বোন কোনোদিন ও এই বিয়ে হতে দিবে না। যেভাবেই হোক বিয়ে টা ভেঙে দিবে তারা। তবে তাঁর মন খারাপ এখন হাফসার বিয়ের জন্য না বরং তাঁর মন খারাপ সকালে লামিয়ার সাথে সে খারাপ ব্যবহার করেছে সে কারণে। তাই অসহায় চোখে মাহির লামিয়ার দিকে তাকালো। লামিয়া ফিরেও তাকালো না মাহিরের দিকে। সে উল্টো ঘুরে হাসিঠাট্টা করছে সবার সাথে। তা দেখে মাহিরের আরো মন খারাপ হলো।
সবাই এটা ওটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টা করলো। আরিফ ঘড়িতে সময় দেখতেই বললো ” এই, এই তোরা আজ ভার্সিটি – অফিস যাবি না??”
সবাই একসাথে মাথা নাড়ালো মানে যাবে। এ কয়েকদিন ছুটির জন্য অনেক কাজ জমে গিয়েছে। তাই আজ থেকে অফিসে তাদের যেতে হবে কোনো বাহানা করে বাড়িতে বসে থাকা চলবে না।
বসা থেকে উঠে রাশেদ লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” তাহলে ওই বলদারে এখন কী করা উচিত??”
” ওইটা পরে দেখা যাবে। অনেকদিন হয়েছে ভার্সিটি যাই না আজকে যাবো। এই তায়েব, তায়েবা তৈরি হয়ে নিচে আয় সবাই। আমি রেডি হতে গেলাম।” বলেই মাহিরের রুম থেকে বেরিয়ে গেলো লামিয়া। তায়েবা বাদে একে একে বিদায় নিয়ে সবাই বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
মাহির মন খারাপ করে লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকালো। পাশ থেকে তায়েবা বললো ” এখন মন খারাপ করে কী লাভ? ওর সাথে এমন করে কথা বলাটা তোর মোটেও উচিত হয় নি।”
” আসলে আমি তখন বুঝতে পারি নি।”
” আচ্ছা হয়েছে এবার যা দ্রুত রেডি হ। আমিও যাই।” বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো তায়েবা।
বাড়ির সব কর্তারা একে একে কাজের জন্য বেরিয়ে গিয়েছে। শুভ্র, রাশেদ,লাবিব, জাহিদ একসাথে দাঁড়িয়ে কি যেনো বলছে নিজেদের মধ্যে। এর মধ্যেই তায়েব তাড়াহুড়ো করে তাদের পাশ কাটিয়ে নিজের বাইক আনতে চলে গেলো। জাহিদ, লাবিব, শুভ্র, রাশেদ তা দেখে ভ্রু কুঁচকে তায়েব এর দিকে তাকালো।
তারপর পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো মাহির আর তায়েবা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গাঁয়ে ডেনিম জ্যাকেট। মাহিরের কাঁধে গিটারের ব্যাগ ঝুলানো। তায়েবা কে দেখে জাহিদ চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে এগিয়ে গিয়ে তায়েবার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো ” এতো পরিপাটি হয়ে কোথায় যাচ্ছিস??”
তায়েবা তাঁর হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো ” ভার্সিটি।”
” কেনো?”
” ছেলে দেখতে।”
তায়েবার কথা শুনে জাহিদ বিরক্ত হয়ে কপাল কুচকালো। পিছন থেকে লাবিব বলে উঠলো ” ওদের সাথে কথা বলে লাভ নেই ভাই সব সময় ত্যারা ত্যারা কথাই বের হবে ওদের মুখ দেখে ভালো কিছু বের হবে না”
” আপনারা আমাদের ভালো কথা ডিজার্ভ করেন না।” বাইকের চাবির রিং ঘুরাতে ঘুরাতে লাবিব এর সামনে এসে দাঁড়ালো লামিয়া। লামিয়াকে দেখে শুভ্র ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেললো।
গাঁয়ে তার মাহির, তায়েব, তায়েবার মতো ডেনিম জ্যাকেট। তবে তাঁরটা লং জ্যাকেট, গলায় মাফলার পেঁচানো। কোমড় সমান চুল গুলো ফ্রান্স বেনী করে রেখেছে। সামনে লেয়ার কার্ট চুল গুলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে। কাঁধে গিটারের ব্যাগ ঝোলানো। চারজন আজ ম্যাচিং করেছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। লামিয়ার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে বললো ” আজ কি ভার্সিটিতে কোনো প্রোগ্রাম আছে??”
লামিয়া জাহিদের থেকে চোখ সরিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
” না তো।”
” তাহলে তোরা একরকম ড্রেস পরেছিস কেনো??”
” আমাদের ইচ্ছে হয়েছে তাই পরেছি।”
” আচ্ছা..?”
” কোথায় কখনো তো নিজের থেকে আমার সাথে ম্যাচিং করে ড্রেস পরিস নি।”
” আপনি কে যে আপনার সাথে মিলিয়ে আমাকে জামা – কাপড় পড়তে হবে??”
লামিয়ার কথা শুনে শুভ্র এক ভ্রু উঁচিয়ে বললো ” কী বললো আর একবার বল শুনতে পাই নি।”
লামিয়া কাঁধ থেকে গিটারের ব্যাগটা তায়েবার হাতে দিয়ে বাইকের চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে বললো
” কানের মাথা কবে খেয়েছেন??”
” কী?”
লামিয়া এগিয়ে গিয়ে এবার একদম শুভ্রর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে চিৎকার করে উঠল
” কানের মাথাআআআ কবে খেয়েছেন??”
কানের কাছে চিৎকার দেওয়ায় শুভ্র চোখ মুখ বন্ধ করে কান চেপে ধরে বললো ” এটা তোর মুখ নাকি মসজিদের মাইক ??”
পিছন থেকে লাবিব বললো ” ওর গলার সাথে মসজিদে মাইকের তুলোনা দিয়ে ওই মাইকের নাম খারাপ করিস না। কারণ ওর ফাটা বাঁশ গলার সাথে কোনো মাইকের তুলোনা হয় না।”
লাবিব এর কথা শুনে লামিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে চলে গেলো। মাহির আর তায়েবা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কোনো নড়চড় নেই। তা দেখে রাশেদ বললো ” তোদের আজ কি হয়েছে?? এমন শং এর মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?”
মাহির বললো ” বাইকের জন্য।”
” তো যা বাইক বের করে নিয়ে আয়।”
” গিয়েছে তো।”
” কে গিয়েছে??”
” লামিয়া।”
” লামিয়া বাইক চালাবে আজ?”
রাশেদের কথা শুনে মাহির উপর নিচ মাথা নাড়ালো, মানে হ্যাঁ।
তা দেখে রাশেদ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। পাশ থেকে শুভ্র বললো ” লামিয়া বাইক চালাবে??”
” হ্যাঁ।” তায়েবা বললো।
” তুই সিওর??”
” হান্ড্রেড পার্সেন্ট।”
” ওও বাইক চালাতে পারে??” বলতে বলতে বাইকের হর্ন বেজে উঠলো। সবাই পিছনে তাকাতে দেখলো তায়েবা, আর লামিয়া বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তা দেখে মাহির আর তায়েবা এগিয়ে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ালো। শুভ্র চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে লামিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো ” তুই বাইক চালাতে পারিস?”
” তেমন না।”
” তাহলে বাইকে কী করছিস??”
” বসে আছি চোখে দেখেন না?”
শুভ্র লামিয়ার সাথে আর কোনো কথা না বলে পাশে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বললো
” মাহির তুই বাইক চালাবি, ওর হাতে বাইক দিবি না।”
মাহির কিছু বলায় আগে লামিয়া বলে উঠলো ” এই আপনি আপনার কাজে যান তো বেশি পকরপকর না করে আর মাহির,তায়েবা তোরা যাবি নাকি আমি একাই চলে যাবো?”
কথা শুনে মাহির আর তায়েবা আর কিছু না বলে তায়েব আর লামিয়া আর তায়েব এর বাইকে উঠে বসলো। তারপর বাইক স্টার্ট দিতে দিতে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
” আমার চিন্তা আপনার করতে হবে না। যে কাজে যাচ্ছেন যান।” বলেই বাইক এক টান দিয়ে বেরিয়ে গেলো ভার্সিটির উদ্দেশ্য।
শুভ্র লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ফুস করে শ্বাস ফেলে পিছনে ঘুরে রাশেদের উদ্দেশ্য বলল
” তাহলে এখন যাওয়া যাক।”
রাশেদ, জাহিদ,লাবিব মাথা নেড়ে গাড়িতে উঠে রওনা হলো নিজেদের গন্তব্যে।
।
” ভাই সত্যি একটা কথা কইবেন?”
” বল কী সত্যি জানতে চাস।”
” মানে.. আপনে এমন পাল্টায় গেলেন ক্যান?”
রাসেলের কথা শুনে জুনায়েদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো
” আমার এই পাল্টানোর পিছনে ওই শ্যামবর্ণের মেয়ের হাত আছে।”
” ভাই ওই মাইয়া তো আপনারে দেহাই পারে না। ”
” কিন্তু আমি পারি। আমি লামিয়া কে ভালোবাসি রাসেল।”
রাসেল কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো
” কিন্তু ওই মাইয়া আপনেরে ভালোই বাসে না।”
” তো কী আমি তো বাসি।”
জুনায়েদ এর কথা শুনে রাসেলের মুখে স্পষ্ট বিরক্ত ছাপ ফুটে উঠল। তাই কিছু না বলে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকালো। জুনায়েদ তা দেখে হাসলো। ঠিক তখনই ভার্সিটির গেট দিয়ে প্রবেশ করলো তায়েব আর লামিয়ার বাইক। অনেক দিন পর ভার্সিটিতে পা রেখেছে চারজন। এতো দিন লামিয়ার জন্য প্রতিদিন এই ভার্সিটির বট গাছটার নিচে বসে অপেক্ষায় থাকতো জুনায়েদ। কিন্তু লামিয়ার দেখা আর পাই নি সে। সব দিনের মতো ঠিক আজ ও সে লামিয়ার অপেক্ষায় ছিলো। ভেবেছিলো আসবে না কিন্তু তার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে ভার্সিটিতে এসেছে তাঁর একতরফা প্রেমিকা। লামিয়া কে দেখেই যেনো জুনায়েদ এর চোখ খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো। খুশিতে আত্মহারা হয়ে জুনায়েদ চেঁচিয়ে উঠলো
” ইয়েস, ইয়েস, ইয়েস রাসেল এসে গেছে ওও এসে গেছে।”
হঠাৎ জুনায়েদ এর কথা শুনে রাসেল ভরকে গিয়ে বললো ” কী আইছে ভাই?”
” আরে গাধা সামনে তাকিয়ে দেখ।”
জুনায়েদ এর কথা শুনে রাসেল সামনের দিকে তাকাতেই লামিয়া কে দেখতে পেলো। তাকে দেখেই রাসেলের মুখটা কালো হয়ে গেলো।
বাইক পার্ক করে পায়ে পা মিলিয়ে জুনায়েদের সামনে দিয়েই কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলো চারজন। এতো দিন পর প্রেয়সী কে দেখে জুনায়েদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না লামিয়ার দিকে তাকিয়ে গিটারে ঝংকার তুলে গেয়ে উঠলো
~ ইট কমলায় ইট বানাইয়া, এক জায়গায় ভাটা সাজাইয়া
ভিতরে আগুন জ্বালাইয়া দিল গো
গোপনে জ্বলিয়া সারা, মাটি হইয়া যায় আঙ্গারা
এ দুর্বিন শার তেমনি দশা হলো গো।।
আমার অন্তরায়, আমার কলিজায়।।~
গান শুনে লামিয়ার পা থেমে গেলো। উল্টো দিকে না ঘুরে দু কদম পিছিয়ে এসে দাঁড়ালো তারপর উল্টা ফিরে তাকালো জুনায়েদের দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়লো। মাহির, তায়েব, তায়েবা ও জুনায়েদ এর গান শুনেছে এবং লামিয়াকে ইঙ্গিত করে যে গান গেয়েছে তা তাঁরা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। তবে কেনো লামিয়া কে দেখে কলেজের নেতার ভাই গান গাইছে তা বুঝতে পারছে না তাঁরা। সেই একদিন তাদের মাঝে কথা হয়েছিলো তারপর থেকে আর কোনোদিন কথা হয় নি । তবে আজ কেনো লামিয়া কে ইঙ্গিত করে গান গাইলো সেটা জানতে হবে।
তাই তাঁরা ও গিয়ে দাঁড়ালো লামিয়ার পাশে। লামিয়া শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে জুনায়েদ এর দিকে। জুনায়েদ ও গান গাইতে গাইতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লামিয়ার এমন শান্ত দৃষ্টিতে জুনায়েদ এর গান থেমে গেলো। লামিয়া আর কিছু না বলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই জুনায়েদ পিছু ডাকলো।
” এই মেয়ে দাঁড়াও।”
কথাটা শুনে পিছন ফিরে তাকালো লামিয়া। তারপর ভ্রু উঁচিয়ে বললো
” কী..?”
জুনায়েদ গিটার রেখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো লামিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো ” কোথায় ছিলে এতো দিন ভার্সিটি আসো নি কেনো ??”
কথাটা শুনে মাহির, তায়েব, তায়েবা, লামিয়ার ভ্রু কুঁচকে এলো।
” ভার্সিটি কেনো আসিনি এই কৈফিয়ত আপনাকে কেনো দিতে যাবো??”
” আমি জিজ্ঞেস করেছি তাই।”
জুনায়েদ এর কথা শুনে লামিয়ার ভ্রু সামান্য কুঁচকে এলো।
” আপনি জিজ্ঞেস করলেই যে আপনাকে সেই কৈফিয়ত দিতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে?”
জুনায়েদ লামিয়ার কথা শুনে সামান্য হাসলো। ঠিক এই লামিয়া কেই দেখতে চেয়েছিলো সে। তাই লামিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো
” তোমাকে রাগলে দারুন লাগে।”
লামিয়া ভ্রু উঁচিয়ে বললো ” কী বললেন আবার বলুন।”
লামিয়ার কথা শুনে জুনায়েদ মুচকি হেসে বেশ বড় একটা ভুল করে বসলো। এক পা এগিয়ে একদম লামিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো তারপর হাত বাড়িয়ে লামিয়ার কপালে পড়ে থাকা এলোমেলো চুল গুলো এক আঙুলের সাহায্যে সরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললো
” রাগলে তোমাকে দারুণ লা…।”
বলার আগেই জুনায়েদ এর মুখে এক শক্তপোক্ত ঘুষি এসে পড়লো। তাল সামলাতে না পেরে জুনায়েদ দু কদম পিছিয়ে গেলো। মাহির,তায়েব, তায়েবা এমন ভাবে দাড়িয়ে দেখছে যেনো এখানে কিছুই হয় নি। লামিয়া অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জুনায়েদ এর দিকে। জুনায়েদ নাকে হাত চেপে ধরে অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে । লামিয়া তাকে ঘুষি দিবে তা কল্পনার বাইরে ছিল তার। তাঁর নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। সেদিকে খেয়াল নেই তার। আশেপাশের সবাই অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। যে ছেলের গায়ে আজ পর্যন্ত কেউ হাত তো দূরের কথা চোখ তুলে তাকানোর সাহস করে নি আজ তার নাক কেউ ফাটিয়ে দিয়েছে, তাও কোনো মেয়ে। বিষয় টা বেশ অবিশ্বাস্য লাগছে সবার কাছে।
জুনায়েদ এর নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে দেখে রাসেল আর দেরি না করে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে জুনায়েদ কে ধরলো।
লামি এখনো তেজি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জুনায়েদ এর দিকে।
জুনায়েদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই লামিয়া তেজি কন্ঠে বলে উঠলো ” আমাকে স্পর্শ করার সাহস একবার দেখিয়েছেন, ভুল করেছেন। আজ প্রথম তাই বেশি কিছু করলাম না দ্বিতীয় বার এমন সাহস দেখাতে আসলে আপনাকে আর আপনার ওই হাত কে আস্ত রাখবো না। আমাকে স্পর্শ করার অধিকার শুধু একজনের ই আছে আর কারোর নয়।” বলেই উল্টো ঘুরে পা ফেলে চলে গেলো।
লামিয়ার শেষের কথাটা শুনে জুনায়েদ এর বুকে অদ্ভুত যন্ত্রণা হলো। তাঁর মানে সে যাকে ভালোবাসে তাঁর মনে অন্য কেউ আছে? ভেবেই তাঁর বুকে চিনচিন ব্যাথা শুরু হলো। যার জন্য সে পাল্টে গিয়েছে, যে মানুষ টির জন্য রাজনীতি ছেঁড়ে গান শিখছে, গিটার শিখছে সেই মানুষটি তাঁকে ভালোবাসে না , ভেবেই মন খারাপ করলো জুনায়েদ।
নির্জন এক রাস্তা দিয়ে ক্যামেরা হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে গাড়ির দরজা খুলে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো ছবি।
গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে কারো কল করতে লাগলো ছবি। একে একে তিনবার কল করলো কিন্তু অপর পাশের ব্যাক্তি কল রিসিভ না করায় ছবি রেগে আর কল না দিয়ে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে নিজের গন্তব্যের দিকে রওনা দিলো। ফুল স্পীডে গাড়ি চালাচ্ছে ছবি। আশেপাশে তাকাচ্ছে না সে।
ঠিক তখনই হঠাৎ ঠাস করে একটি গুলি এসে ছবির গাড়ির লুকিং গ্লাসে এসে লাগতেই চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে পড়লো। তা দেখে ছবি দ্বিগুণ স্পীড বাড়িয়ে দিলো গাড়ির। স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো চার – পাঁচ টা কালো গাড়ি তাঁর গাড়ির দিকে ধেয়ে আসছে। ছবি এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে অন্য হাত দিয়ে ফোল তুলে আবার কল লাগালো । একে একে দু- বার কল দিলো কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না দেখে কল কেটে দিয়ে গাড়ি চালাতে মনোযোগ দিলো। যতো দ্রুত সম্ভব এখান থেকে আগে বের হতে হবে ছবির নয়তো লোকগুলো তাঁকে মেরে ফেলবে। তাই যেভাবেই হোক আগে বের হতে হবে। কাউকে না জানিয়ে একা একা এখানে এসে মস্ত বড় ভুল করেছে তা সে এখন বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে।
সময়টা দুপুর বারোটা। ধরনীতে সূর্যের আলো সকালে দেখা গেলেও কুয়াশার কারণে সূর্য এখন দেখা যাচ্ছে না। চারপাশে বইছে শীতল ঠান্ডা বাতাস। এই ওয়েদারে রাস্তায় না বেরিয়ে বাড়িতে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা ঢের ভালো।
বলতে বলতে ভার্সিটি থেকে সবেই বের হলো লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা। সকালের ঘটনার পর জুনায়েদ কে কেউ এখনো ভার্সিটি দেখে নি। মাহির, তায়েব, তায়েবা ও এই বিষয়ে আর কথা বলে নি আর না লামিয়া এসব নিয়ে কোনো মাথা ঘামিয়েছে। তাঁরা চারজন ভীষণ স্বাভাবিক ভাবেই আছে।
লামিয়া আর তায়েব বাইক স্টার্ট দিতেই মাহির তায়েব এর বাইকে আর তায়েবা লামিয়ার বাইকে উঠে বসলো। হঠাৎ তায়েবা কি জানি মনে পড়তেই বাইক থেকে নেমে বললো
” ইসসস আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।”
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” কী?”
” তোরা দাঁড়া আমি এখন ই আসছি।”
” কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
” আরেহহ তোরা দুই মিনিট দাঁড়া আমি তিন মিনিটে আসছি।” বলেই তায়েবা রাস্তা পার হয়ে এক দৌড় দিলো।
লামিয়া, তায়েব, মাহির ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তায়েবার যাওয়ার দিকে তাকালো থাকলো। তারপর তায়েবা চোখের আড়াল হতেই তিনজন বাঁকা হাসলো। তায়েবা কোথায় গিয়েছে তা তাঁরা ভালো করেই জানে। কিছুদিন পর জাহিদের জন্মদিন। তাই সে জন্মদিন উপলক্ষে জাহিদের জন্য একটা স্বর্ণের একটা রিং বানাতে দিয়েছে। সেই রিং বানানো হয়েছে কি না সেটাই দেখতে গিয়েছে তায়েবা। সে ভেবেছিলো তাঁরা তিনজন জানবে না কিন্তু তাঁরা তিনজন যে সেই অনেক আগের থেকেই জেনে বসে আছে সেটা তায়েবা জানে না।
তায়েবার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে প্রায় বিশ মিনিট হয়ে গিয়েছে তবু ও তায়েবা আসছে না দেখে বেশ চিন্তিত হলো তিনজন।
” কি ব্যাপার তায়েবা এখনো আসছে না কেনো?”
” জানি না। এই মাহির একটা কল দে তো তায়েবা কে।”
লামিয়ার কথা শুনে মাহির কল করার জন্য পকেট থেকে ফোন করতেই লামিয়ার ফোন বেজে উঠলো। লামিয়া জ্যাকেট এর পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলো স্ক্রীনে জাহিদ নাম ভেসে আছে। হঠাৎ জাহিদ কল করেছে দেখে লামিয়ার কেমন খটকা লাগলো। তাই দ্রুত কল রিসিভ করতেই জাহিদ অস্থির কন্ঠে বললো
” হ্যালো লামিয়া, শুনতে পাচ্ছিস?? তায়েবা কোথায়?? আমার তায়েবা কোথায়? তোদের সাথেই তো ছিলো তাই না?? তোদের সাথেই আছে তো তাই না??”
জাহিদ এর কথা শুনে লামিয়ার বুক ধক করে উঠলো। কোনো কথা না বলে ফোন কানে নিয়েই পাশ ফিরে মাহির আর তায়েব এর দিকে তাকালো। বোনের চোখ দেখেই মাহির আর তায়েব এর বুঝতে অসুবিধা হলো না কিছু একটা হয়েছে। লামিয়া কে চুপ থাকতে দেখে জাহিদ ফোনের ওপাশ থেকে চিৎকার করে উঠল
” লামিয়া তায়েবা কোথায়?? কথা বলিস না কেনো?? আমার তায়েবার কিছু হলে আমি ছাড়বো না তোদের।”
জাহিদ কেমন পাগলের মতো আচরণ করছে। তাই শুভ্র জাহিদের থেকে ফোন নিয়ে বললো ” হ্যালো ভ্রমর। হ্যালো, হ্যালো….।”
টু, টু,টু করে শব্দ আসতেই শুভ্র বুঝলো লামিয়া কল কেটে দিয়েছে।
জাহিদ শুভ্রর থেকে ফোন নিয়ে তায়েবার ফোনে বারবার কল করছে আর বারবার দেখাচ্ছে তায়েবার ফোন বন্ধ। জাহিদ অস্থির হয়ে উঠছে বারবার। রাশেদ জাহিদ কে ভরসা দিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিলো। তারপর নিজে গিয়ে বসলো ড্রাইভিং সিটে। রাশেদ এর দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে মনে দোয়া করছে তাঁর বোনের সাথে জানি খারাপ কিছু না হয়। লামিয়া আর তায়েবা একসাথে চলাফেরা করলেও তায়েবা লামিয়ার মতো না। নিজের গাঁয়ে যতক্ষণ শক্তি থাকবে ততক্ষণ লামিয়া সবার সাথে লড়াই করতে পারবে কিন্তু তায়েবা আবার তেমন নয় আবার কম ও নয়। কিন্তু পুরোপুরি লামিয়ার মতো ও নয়। তায়েবার জায়গায় লামিয়া হলে রাশেদ কোনো টেনশন করতো না কিন্তু তায়েবা কে নিয়ে একটু ভয় হচ্ছে তার। শুভ্র আর লাবিব গাড়িতে উঠে বসলো। লাবিব কি জানি ভেবে পকেট থেকে ফোন বের করতেই দেখলো ছবি ৩০ বার রং করেছে। তা দেখে লাবিব দ্রুত কল ব্যাক করতেই ছবির ফোন অফ দেখালো। এবার লাবিব ও টেনশনে পড়ে গেলো। লাবিব এবার ছবির কথা সবাইকে জানাতেই সবাই এবার আরো টেনশন করতে লাগলো।
প্রথমে তায়েবা এখন ছবি, দু – বোন কোথায় আছে কী হচ্ছে তাদের সাথে কিছুই বুঝতে পারছে না তারা। রাশেদের পুরো শরীর কাঁপছে। চোখ দুটো জ্বালা করছে। বোনদের যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায় তাহলে তখন কী হবে?? ভাবতেই কান্না পাচ্ছে তার।
শুভ্র এবার সবাই কে শক্ত করে একটা ধমক দিয়ে বলল ” তোরা টেনশন করবি নাকি ওদের আগে খুঁজতে যাবি কোনটা? তোদের যেই অবস্থা দেখছি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারবি না। তাঁর চেয়ে ভালো তোরা সব গুলো নেমে যা আমি একাই যাবো।”
শুভ্রর কথায় কেউ কোনো জবাব দিলো না তবে নিজেদের শক্ত করলো। রাশেদ নিজের মন কে শক্ত করে গাড়ির স্টার্ট দিয়ে রওনা দিলো তায়েবা আর ছবি কে খুঁজতে।
।
ফুল স্পীডে বাইক চালাচ্ছে লামিয়া আর তায়েব। তায়েব এর বাইকের পিছনে বসে ফোনে শুভ্র কে মেসেজ করছে মাহির।
জাহিদের জন্য রিং কিনে আনার সময় ই একটা গাড়ি এসে তায়েবা কে তুলে নিয়ে যায়। যা লামিয়া, মাহির, তায়েব জানতে পারে দোকানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে। সেখানে থেকে গাড়ির নম্বর দেখে লামিয়া ইন্সপেক্টর অর্জুন কে কল করে বিস্তারিত সব কিছু জানিয়ে দিতেই অর্জুন সেই গাড়ি খুঁজে কোনো কোনো রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে তা সব কিছু লামিয়া কে জানাতেই লামিয়া,তায়েব আর মাহির সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে।
ওদিকে ছবির ফোন অফ তাঁর সাথে ও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না সেটা ও শুভ্র মাহির কে জানাতেই সে লামিয়া আর তায়েব কে বললো।
এক সাথে দু – জন কে তুলে নিয়ে গিয়েছে। কে হতে পারে আর কার এতো সাহস সেটা দেখে ছাড়বে তাঁরা। ইসলাম বাড়ির কন্যাদের তুলে নেওয়ার সাহস যেহেতু দেখিয়েছে তাঁর শাস্তি সে পাবেই।
।
” উমমম, উমমমম।”
” উফফ কখন থেকে এই মাল টা অদ্ভুত শব্দ করছে। এই রিস্ক ওর মুখের বাঁধন টা খুলে দিয়ে শুন তো কী বলতে চায়।”
মনার কথায় মাথা নেড়ে রিস্ক তায়েবার মুখের বাঁধন খুলে দিতেই তায়েবা চোখ মুখ কুঁচকে বললো
” ইয়য়াককক, হারামজাদা এই ময়লা কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধেছিস কেনো?? ভালো কাপড় ছিলো না তোদের কাছে?”
তায়েবার কথা শুনে সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা হুডি পড়া লোকটি মুচকি হাসলো। মনা, রিস্ক তায়েবার কথা শুনে বিরক্ত হয়ে তায়েবার দিকে তাকালো।
” এই মেয়ে বেশি পটর পটর না করে মুখ বন্ধ রাখো নয়তো আবারো মুখ বেঁধে দিবো।”
” এই এই এই খবরদার, খবরদার এই নোংরা কাপড় দিয়ে ভুলেও যদি আমার মুখ বেঁধেছিস তাহলে তোর ওই ঝাড়ুর চুল ছিঁড়ে ফেলবো।”
তায়েবার কথা শুনে মনা এবার রেগে গেলো। রেগে হাত বাড়িয়ে মনার চুল টেনে ধরতেই তায়েবা কড়া চোখে মনার দিকে তাকিয়ে বললো ” উঁহু ভুলেও ওই হাত আমার শরীরে দিবি না নয়তো ওই হাত আর রাখবো না।”
তায়েবার কথা শুনে মনার হাত থেমে গেলো। রিস্ক মনা কে টেনে নিজের পাশে নিয়ে আসলো। হুডি পড়া লোকটা স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বললো ” বাহ ইসলাম বাড়ির সব কন্যাই দেখি এক একটা বাঘিনী।”
কথাটা শুনে তায়েবা মনার থেকে চোখ সরিয়ে সামনের সিটের দিকে তাকালো। লোকটা সামনের দিকে ঘুরে থাকায় মুখ দেখা যাচ্ছে না তবে লোকটার কন্ঠ বেশ পরিচিত মনে হলো তায়েবার কাছে।
ভ্রু কুঁচকে তায়েবা বললো ” কে আপনি??”
ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা লোকটা কোনো জবাব না দিয়ে গাড়ি চালাতে মনোযোগ দিলো। তায়েবা তা দেখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো লোকটির দিকে। লোকটি তাঁর কথায় উত্তর দিবে না কোনো সে বুঝতে পেরেছে তাই তাঁর সাথে আর কোনো কথা না বলে পাশের সিটে তাকিয়ে বললো ” তোরা কি*ডন্যাপ করেছিস ভালো কথা। কিন্তু শুধু আমাকে কেনো একা করতে গেলি? লামিয়া, তায়েব, মাহির কে ও তুলে নিয়ে আসতি। তাহলে একা একা বোর হতাম না। ” বলেই মুখ খানা গোল করে ফেললো।
তায়েবার কথা শুনে মনা রেগে আবার কিছু বলতে যাবে তার আগেই তায়েবা গলগল করে মনার উপর বমি করে দিলো। তায়েবার এমন কান্ডে মনা বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠলো।
” আআআআআআআ,ইউজলেস গার্ল। কী করলে তুমি এটা??”
হাত বাঁধা থাকায় তায়েবা ঘাড়টা একটু বাঁকিয়ে জ্যাকেটে মুখ টা মুছে বললো ” বমি করলাম। আমাকে তুলে নেওয়ার আগে তোদের জানার দরকার ছিলো আমার গাড়িতে বমি আসে। তার উপর জানালাও আটকে রেখেছিস। তো কি করবো?”
তায়েবার কথা শুনে মনার রাগে ফেটে যাচ্ছে। রিস্ক নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে মনার অবস্থা দেখে কুটকুট করে হেঁসে উঠলো। তা দেখে মনা আরো ক্ষেপে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো ” রিস্ক আই উইল কিল ইউ”
মনার এমন চিৎকার শুনে তায়েবা চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। রিস্ক হাঁসি থামিয়ে দিলো ভয়ে। সামনে বসে থাকা লোকটা তায়েবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গাড়ি চালাতে লাগলো।
নাক – মুখে রক্ত নিয়ে চেয়ারে হাত – পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে ছবি। তাঁর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কালো পোষাক পরা কিছু মহিলা এবং পুরুষ গার্ডরা।
” এখানে আসার সাহস না দেখালেও পারতে।” বলতে বলতে ছবির সামনে এসে দাঁড়ালো এক হুডি পড়া অবয়ব।
ছবি আস্তে আস্তে মাথা তুলে ঘোলা চোখে তাকালো। অবয়ব টি মুখ ঢেকে রেখেছে মাস্ক দিয়ে। তবে অবয়ব টির কন্ঠ ভীষণ পরিচিত তার। অবয়ব টি পুরো মুখ ঢেকে রেখে মনে করেছে তাকে ছবি চিনবে না। কিন্তু গলার স্বর শুনেই যে ছবি তাকে চিনে ফেলেছে তা কী এই অবয়ব টি জানে? জানে না বোধহয়। জানলে কী আর কখনো মুখ ঢেকে কথা বলতো? বোকা এই অবয়ব। ভেবেই ছবি মনে মনে। তারপর না চেনার ভান করে ধীর গলায় বললো ” কে আপনি?”
অবয়বটি ছবির কথা শুনে ঘাড় কাত করে ছবির দিকে তাকিয়ে হেঁসে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই কারোর উমমম উমমম শব্দ শোনা গেলো। অবয়বটি পিছন ফিরে তাকালো। ছবি চোখ তুলে সামনের দিকে তাকাতেই চমকে গেলো।
অবয়বটি পিছন ফিরে তাকিয়ে হাসলো। মনা, রিস্ক আর হুডি পরা লোকটি দাঁড়িয়ে আছে আর তাদের সাথে হাত – মুখ বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে তায়েবা।
ছবি শীতল দৃষ্টিতে তায়েবার দিকে তাকাতেই তায়েবা আর ছবির চোখাচোখি হলো দুজনের।
” এসে গিয়েছো তাহলে।” বলে উঠলো অবয়বটি।
কন্ঠ শুনে তায়েবা চমকে অবয়বটির দিকে তাকালো। বেশ পরিচিত কন্ঠ, এর আগেও কোথাও সে শুনেছে এই কন্ঠটা কিন্তু মনে করতে পারছে না তায়েবা। তায়েবার পাশে থাকা হুডি পড়া লোকটি এবার মুখ খুললো।
” মার্কাস এখনো আসেনি??”
লোকটার কথা শুনে তায়েবা মাথা কাত করে পাশের দিকে তাকাতেই লোকটা তাঁর হুডি খুলে দিলো।
নাসির কায়সার কে দেখে ছবি আর তায়েবা চমকালো না তবে মনে মনে হাসলো।
” মার্কাসের আসতে একটু দেরি হবে। ততক্ষণে এই মেয়েটা কেও বেঁধে ফেলো মনা। ” কায়সারের কথা শুনে অবয়বটি বলে উঠলো।
অবয়বটির কথা শুনে মনা তায়েবা কে টেনে ছবির পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে হাত – পা বেঁধে ফেললো।
তায়েবা কে বাঁধার সময় তায়েবা মুখ দিয়ে উমম উমম শব্দ করে ছটফট করতে লাগলো। ছবি তা দেখে বেশ শক্ত পোক্ত গলায় বলে উঠলো ” ছেঁড়ে দাও আমার বোনকে। নয়তো খুব খারাপ হবে।”
ছবির কথা শুনে সবাই চমকে ছবির দিকে তাকালো। ছবি রক্তিম চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। ছবির হাব – ভাব কেমন লামিয়ার মতো দেখা যাচ্ছে । কায়সার তখন ফট করে বিড়বিড় করে বলে উঠলো
” বুলবুলি..!”
অবয়বটি ছবির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো তারপর গার্ড দের উদ্দেশ্যে বলল ” তোমাদের যাকে তুলে আনতে বলেছিলাম তাকে রেখে তোমরা কাকে তুলে এনেছো?”
বলেই গার্ডদের দিকে তাকালো।
” ম্যাম যে মেয়েটি আমাদের উপর নজর রাখছিলো আর আপনি যাকে তুলে আনতে বলেছিলেন আমরা তাকেই তুলে এনেছি।”
” বাস্টার্ড, আমি তোদের কে ছবি কে তুলে আনতে বলেছিলাম তোরা লামিয়া কে তুলে এনেছিস কেনো??” অবয়বটি বেশ চেঁচিয়ে বললো।
তাঁর কথা শুনে গার্ডরা সব ভয়ে ঢোক গিললো।
অবয়বটির কথা শুনে ছবি খিলখিল করে হেসে উঠলো। কায়সার শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছবির দিকে। ছবি কায়সার এর দিকে তাকালো এক নজর তারপর অবয়বটির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে বলল
” কেনো লামিয়া কে ভয় লাগে বুঝি??”
অবয়বটি ছবির কথা শুনে বললো
” ভয় আর তোকে?? হাহহ হাসালি। তবে ভালোই হয়েছে নকল পাখিকে ধরতে গিয়ে আমি আমার আসল পাখিকেই ধরে ফেলেছি।”
ছবি তা শুনে আবারো হাসলো।
তায়েবা বেশ কিছুক্ষণ অবয়বটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে মৃদু হাসলো। তাঁরা যা সন্দেহ করেছে তাই ঠিক হলো।
কায়সার শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার শ্যামবর্ণের বুলবুলির দিকে। বেশ নিখুঁত দৃষ্টিতে পরখ করছে ছবি কে।
ছবি কায়সারের দিকে আবার তাকাতে চোখাচোখি হলো দুজনের। এদিকে মনা, রিস্ক দুজনকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। কারণ এবারো ছবি কে না তুলে লামিয়া কে তুলে এনেছে এটা যদি মার্কাস জানে তাহলে এখানের কাউকে জীবিত রাখবে কি না সন্দেহ। এই নিয়েই দুজন বেশ চিন্তায় আছে।
যা যার চিন্তায় মগ্ন। কিছুক্ষণ নীরবতা। কায়সার
এগিয়ে গিয়ে সামনের সোফার উপর বসলো ছবির মুখ বরাবর । তারপর চুপচাপ ছবির দিকে তাকিয়ে পরখ করতে লাগলো ছবি কে। অবয়বটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ একবার দেয়াল ঘড়ির দিকে আর একবার দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে মার্কাস কখন আসবে।
এর মাঝেই তায়েবা উমম উমম করে উঠলো। সবার দৃষ্টি পড়লো তায়েবার দিকে। বেশ আগ্রহ নিয়ে কিছু বলতে চাইছে তায়েবা। কিন্তু মুখ বাঁধা থাকায় বেচারি কিছু বলতে পারছে না। তাই অবয়বটি বিরক্ত হয়ে বললো ” এই এটার মুখ খুলে দিয়ে দেখ কী বলতে চাইছে।”
রিস্ক বিরক্ত হয়ে বললো ” মুখ খুললে শুধু ফালতু কথা বলবে তাই এটার মুখ খোলার দরকার নেই। এভাবেই থাকুক।”
রিস্ক এর কথা শুনে তায়েবা আরো ছটফট করে উঠলো। তা দেখে অবয়বটি বলে উঠলো ” যা বলছি তাই কর । ওও কী বলছে শুনে তারপর আবার ওর মুখ বেঁধে দিবি।”
অবয়বটির কথা শুনে রিস্ক তাই ই করলো। এগিয়ে গিয়ে তারেবার মুখের বাঁধন খুলে দিতেই তায়েবা ত এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“বল এবার কী বলতে চাস?”
অবয়বটির কথা শুনে তায়েবা তাকালো তার দিকে তারপর বললো ” এভাবে মুখ ঢেকে সামনে না এসে মুখ খুলে সামনে দাঁড়া সাহস থাকলে।”
তায়েনার কথা শুনে অবয়বটি হেসে উঠলো। অবয়বটি কিছু বলতে যাবে তার আগেই মার্কাস প্রবেশ করলো সেই কক্ষে। এবার সবার দৃষ্টি পড়লো মার্কাস এর উপর।
অবয়বটি মার্কাস এক সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবো তার আগেই মার্কাস অবয়বটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তা দেখে তায়েবা খিলখিল করে হেসে উঠলো।
“তুষার রানী, আমার তুষার রানী। কতদিন পর দেখা আমাদের তাই না? আমার থেকে পালিয়ে কোথায় গিয়েছিলে তুষার রাণী? কেমন আছো তুমিও?? আর তোমার আর নাক – মুখে রক্ত কেনো? দেখি।”
বলেই ছবির ঠোঁটের কোণে রক্ত মুছে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই কেউ এসে মার্কাস এর হাত খপ করে ধরে ফেললো। মার্কাস পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো কায়সার তার হাত ধরে আছে।
” কী সমস্যা তোর??”
কায়সার মার্কাস এর হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে বললো ” স্পর্শ করবি না ওকে। দূরে থাক ওর থেকে।”
” আমার জিনিস কে আমি স্পর্শ করবো নাকি কাছে থাকবো সেটা আমার ব্যাপার তুই বলার কে??”
” ওও তোর নয় আমার।” কায়সারের বলতে দেরি। তাঁর নাকি এক শক্তপোক্ত ঘুষি পড়তে দেরি হলো না।
কায়সার দু – কদম পিছিয়ে গেলো। নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে কায়সারের । কায়সার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাকের রক্ত পরিষ্কার করে তাচ্ছিল্য হাসলো।
” বড় ভুল করে ফেলেছিস মার্কাস। এর ভুলের মাশুল যে তোকে দিতে হবে। ” বলেই কোমড় থেকে পিস্তল বের করে মার্কাস এর দিকে তাক করলো।
” কায়সার পিস্তল নামা। কি করছিস তুই? ভুলে গিয়েছিস আমরা সবাই এক দলে।”
” উঁহু ভুলিনি তবে এবার ভুলে যাবো। তুই হয়তো ভুলে গিয়েছিস আমি কে।”
” দেখ কায়সার তুই শুধু শুধু মাথা গরম করছিস। ওও আমার ছবি।”
” না ওও তোর ছবি না । ওও আমার বুলবুলি লামিয়া। ভালো করে তাকিয়ে দেখ।”
” আমি ভালো করেই দেখেছি। ওও আমার ছবি।”
মার্কাস এর কথায় কায়সার এবার রেগে গেলো। রেগে পাশে থাকা টেবিলে জোরে লাথি বসিয়ে চিৎকার করে উঠলো
” ওওও তোর নয় আমার আমার আমার শুধু মাত্র আমার লামিয়া । ছবি নয় ওও।”
কায়সারের কথা শুনে মার্কাস এবার ভীষণ ভাবে রেগে গেলো।
রেগে সেও কোমড় থেকে পিস্তল বের করে কায়সারের দিকে তাক করলো। তায়েবা আর ছবি বসে বসে হাসছে। অবয়বটি বেশ চিন্তিত হয়ে তাকিয়ে আছে মার্কাস আর কায়সারের দিকে। কারণ এরা দুজন যদি নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করে তাহলে সে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। তাই এদের দুজন কে যেভাবেই হোক শান্ত করতে হবে। অবয়বটি আর কিছু না ভেবে দৌড়ে কায়সার আর মার্কাস এর মাঝে গিয়ে দাঁড়ালো।
” থামো তোমরা কী শুরু করেছো নিজেদের মধ্যে??”
মার্কাস বললো ” ঝামেলা আমি না কায়সার আগে শুরু করেছে। তাই এর শেষ আমি করবো।”
” থামো মার্কাস কায়সার যা বলছে তা সত্যি। ওও তোমার ছবি নয় ওও লামিয়া । আমরা ভুল মানুষকে ধরে নিয়ে এসেছি।”
অবয়বটির কথা শুনে মার্কাস এর মূহুর্তের জন্য থেমে গেলো। হাত থেকে পিস্তল পরে গেলো। এবার ও তাহলে তাঁর তুষার রানীর দেখা পেলো না সে। ভেবেই কষ্ট পেলো মার্কাস।
হঠাৎ মার্কাস এর হাত থেকে পিস্তল পরে যাওয়ায় অবয়বটি খুশি হলো। তাই এগিয়ে গিয়ে মার্কাস কে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মার্কাস অবয়বটির গলা চেপে ধরলো। মনা আর রিস্ক ভয়ে ঢোঁক গিলছে। মার্কাস ভয়ঙ্কর রেগে গিয়েছে । চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে।
” বল আমার ছবি কোথায়?? তুই বলেছিলি আমার ছবি কে আমার কাছে এনে দিবি তাহলে ছবির বদলে কাকে নিয়ে এসেছিস তুই??”
” আআআ মার্কাস ছাড়ো আমাকে লাগছে।”
” লাগুক লাগার জন্যেই ধরেছি। বল আমার ছবি কোথায় বল।”
বলেই আরো জোরে গলা চেপে ধরলো। অবয়বটির চোখ উল্টে যেতেই মার্কাস অবয়বটি কে ছেঁড়ে দিলো।
অবয়বটি কাশতে কাশতে বললো
” ভুল হয়ে গিয়েছে। তুমি শান্ত হোও।”
” কী শান্ত হবো আমি?? তুই আমাকে মিথ্যা কথা বলেছিস যে ছবি কে এনে দিবি। কিন্তু তুই ছবির বদলে এ কাকে ধরে এনেছিস??”
” দেখো আমরা আবারো চেষ্টা করবো। একবার ধোঁকা খেয়েছি তো কী হয়েছে। আমি এখন ই লোক পাঠাচ্ছি।” বলেই গার্ডদের ছবি কে তুলে আনার হুকুম করতে পিছনে ফিরতেই একটা বুলেট তার পাশ কেটে চলে গেলো। অবয়বটি ভয়ে ছিটকে দূরে সরে গেলো। গুলির শব্দে সবাই চমকে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখলো তায়েব, মাহির আর লামিয়া দাঁড়িয়ে আছে পিস্তল হাতে। তবে কেউ অবাক হলো না। ছবি আর তায়েবা কে ধরে লামিয়া কে আনার ফাঁদ পেতেছিলো তাঁরা।
অবশ্য তারা তাদের প্ল্যান মতোই সব কিছু হয়েছে কিন্তু ছবি কে লামিয়া ভেবে তারা ভুল করেছে।
মার্কাস লামিয়ার দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে ফেললো। তারপর আবার পাশ ফিরে ছবির দিকে তাকালো। দুজনের গাঁয়ের রং ই এক। তাঁর তুষার কন্যার গাঁয়ের রং তো সাদা ছিলো তাহলে দুজনের গাঁয়ের রং সেম হলো কীভাবে?? কে লামিয়া কে ছবি বুঝতে পারছে না কেউ । কায়সার ও বোঝার চেষ্টা করছে কে তার বুলবুলি।
হঠাৎ হাসির শব্দে ধ্যান ভাঙলো সবার। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো ছবি আর তায়েবা হাসছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের সাথেই অর্জুন সিং দাঁড়ানো।
” এতোক্ষণ লাগলো তোদের আসতে?”
” আরেহহ বা*ল হেলিকপ্টার নিয়ে এসেছি নাকি যে এক মিনিটেই পৌঁছে যাবো? আমরা তো এসেছি বাইকে। সময় তো লাগবেই তাই না??”
তাদের দুজনের কথার মাঝে মার্কাস বলে উঠলো ” ওদের দুজনের মধ্যে কে লামিয়া কে ছবি। কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ”
মার্কাস এর কথা শুনে লামিয়া বাঁকা হেঁসে গান ধরলো
” Duniya Mein, Logon Ko
Dhokha Kabhi Ho Jaata Hai
Aankhon Hi, Aankhon Mein
Yaaron Ka Dil Kho Jaata Hai…
বলেই জ্যাকেট এর পকেটে হাত রেখে ধীর পায়ে অবয়ব এর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে আবার গান ধরলো ” Do Dil, Dono Jawan
Aankhon Ka Hai Yeh Bayaan
Dono Ke Darmiyaan,
Koi Bhi Ho Na Yahan
Parda Parda Haan Parda Parda
Haan Apno Se Kaisa Parda…
বলেই অবয়ব এর সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর দাঁত কেলিয়ে হাঁসি দিতেই মাহির বাঁকা হেঁসে গেয়ে উঠলো ” Monica O My Darling
O Monica O My Darling….
লামিয়া বাঁকা হেঁসে অবয়বটি দিকে তাকাতেই অবয়বটি পিছিয়ে গেলো। তা দেখে লামিয়া আরো জোরে হেসে উঠলো।
” ভয় ?? এতো ভয় পেলে যে পিছিয়ে গেলে?” বলেই হাসলো লামিয়া।
অবয়বটির মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। তা দেখে লামিয়া আবারো হাসলো। এর মাঝেই বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো লাবিব, রাশেদ, জাহিদ, শুভ্র। জাহিদ আর লাবিব অস্থির হয়ে তড়িঘড়ি করে রুমে প্রবেশ করতেই সবার দৃষ্টি সেদিকে পরলো।
জাহিদ দৌড়ে তায়েবা কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অস্থির কন্ঠে বললো
” ঠিক আছিস তুই?? কোথাও লাগে নি তো তোর??”
তায়েবা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললো” উঁহু কিছু হয় নি। ঠিক আছি আমি। আপনি চিন্তা করবেন না। ”
তায়েবার কথা শুনে জাহিদ একটু স্বস্তি পেলো।
লাবিব দৌড়ে ছবি কাছে যেতেই ছবি লাবিব কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তা দেখে মার্কাস এর চোখ রাগে লাল টুকটুকে হয়ে উঠলো।
” জান, আমার জান তুই ঠিক আছিস?? ভয় পাচ্ছিস কেনো আমি তো এসে গিয়েছি জান।”
” আপনি এতো দেরি করে এসেছেন কেনো?”
” সরি জান আর হবে না। ” বলেই ছবির মুখ তাঁর বুক থেকে তুলে ঠোঁটের কোণে রক্ত মুছে দিয়ে সেখানে শক্ত চুমু এঁকে দিলো।
এখন সবাই একটু হলেও বুঝতে পেরেছে ছবি আর লামিয়া কোনটা। মার্কাস রেগে ফ্লোরে পরে থাকা পিস্তল তুলে লাবিবের দিকে তাক করে শুট করতেই পিছন থেকে কেউ তাঁর পিঠে লাথি বসিয়ে দিলো। মার্কাসের হাত থেকে পিস্তল পরে গেলো। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো রাশেদ কে। মার্কাস রেগে রাশেদকে ঘুষি দিতে গেলেই রাশেদ তাঁর হাত ধরে নাকে ঘুষি মেরে দিলো। মার্কাস কে এভাবে মারতে দেখে রিস্ক আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না দৌড়ে গিয়ে রাশেদ কে লাত্থি মারার জন্য প্রস্তুত হতেই মাহির পাশ থেকে একটা লোহার পাইপ নিয়ে রিস্ক এর পিঠে বারি বসিয়ে দিতেই রিস্ক চেঁচিয়ে উঠলো।
এবার অবয়বটি গার্ডদের উদ্দেশ্য চেঁচিয়ে উঠলো ” দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছো?? যাও ওদের গিয়ে এমন হাল করো জানি সোজা হয়ে কেউ দাঁড়াতে না পারে।”
অবয়বটির কথা শুনে গার্ডরা ঘিরে ধরলো লামিয়া, শুভ্র, লাবিব, ছবি, জাহিদ, তায়েবা, রাশেদ, মাহির আর তায়েব কে।
লামিয়া তা দেখে বাঁকা হেঁসে জ্যাকেট এর পকেট থেকে একটা কালো চুলের রাবার ব্যান্ড বের করে সব চুল গুলো দু হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বেঁধে নিলো। বাইকে থাকায় চুলের ফিতে কোথায় উড়ে গিয়ে পরে চুল খুলে গিয়েছিলো সে নিজেও জানে না। তাই আগে ভালো মতো চুল গুলো বেঁধে নিয়ে বাঁকা হাসলো।
গার্ড গুলো দাঁড়িয়ে আছে দেখে অবয়বটি আবারো চেঁচিয়ে উঠলো
” তোদের টাকা কেনো দেই দাঁড়িয়ে থাকার জন্য মার সব গুলো কে।”
অবয়বটির কথা শুনে গার্ড গুলো এবার তেড়ে লামিয়া দের দিকে যেতেই শুভ্র, রাশেদ, জাহিদ, লাবিব, মাহির, তায়েব এক এক টার নাকে, মুখে ঘুষি দিতে লাগলো। মেয়ে গার্ড গুলো লামিয়া, তায়েবা আর ছবি কে মারতে আসলেই তাঁরা পাশ থেকে লোহা, কাঠ তুলে মারতে লাগলো তাদের।
কায়সার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু লামিয়া কে দেখছে।
একটা মহিলা গার্ড হঠাৎ দৌড়ে এসে লামিয়ার চুলের মুঠি ধরতেই লামিয়া তার আগেই মহিলা গার্ডের হাত ধরে পেটে লাথি বসিয়ে দিলো। তায়েবা একটা গার্ডের মাথায় লোহা দিয়ে আঘাত করতেই গার্ডটা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ছবি একটা গার্ডের চুল ধরে সজোরে মুখে ঘুষি দিতে লাগলো। এক পর্যায়ে গার্ডের নাক – মুখ থেকে র*ক্ত বেরিয়ে এলো।
তিনজন ইচ্ছে মতো মহিলা গার্ড গুলো কে বেদম পি*টিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে
বাঁকা হাসলো।
হঠাৎ মনা ছবি কে লামিয়া ভেবে দৌড়ে এসে ছবির পিঠে ছুরি বসিয়ে দিতেই তায়েবা চিৎকার করে উঠলো ” ছবিইই….”
মার্কাস এর সাথে হাতাহাতি হচ্ছিলো লাবিব এর কিন্তু তায়েবার চিৎকার শুনে লাবিব মার্কাস কে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে পিছন ফিরে তাকালো । শুভ্র, তায়েব, মাহির, রাশেদ, জাহিদ ও সেদিকে তাকাতেই দেখলো ফ্লোরে টুপ টুপ করে রক্ত পড়ছে ছবির সামনেই ছুরির ধারালো মাথা টা শক্ত করে ধরে আছে লামিয়া।
” লামিয়া…”
” সরে যা তুই।” মনার দিকে ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো লামিয়া।
ছবি আর কিছু না বলে সরে গেলো সেখান থেকে। ছবিকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতেই লামিয়া দৌড়ে এসে ছুরি ধরেছে। তাই ছবির কোনো ক্ষতি হয় নি। কিন্তু ধারালো ছুরি ধরায় লামিয়ার হাত কেটে টুপটুপ করে রক্ত পড়ছে। মনা বেশ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছুরি ছেঁড়ে দিতেই লামিয়া ঘাড় কাত করে মনার দিকে তাকালো। তারপর ছুড়ি টা কে দু দাঁতের মাঝে নিয়ে আগে ঝুটি করা চুল গুলো ভালোমতো খোঁপা করে নিয়ে ছুরি টা কে হাতে নিলো।
তারপর বেশ শীতল দৃষ্টিতে তাকালো মনার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ভয়ানক কিছু ছিলো যা মনা কিছুটা হলেও টের পেয়েছে। মনা ভয়ার্ত চোখে লামিয়ার দিকে তাকাতে তাকাতে পিছাতে পিছাতে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো ” আআআআ আমি তোমাকে চিনি। আমাকে ক্ষ…” আর বলতে পারলো না লামিয়া ঝড়ের গতিতে মনার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেরি না করে ছুরি দিয়ে মনার গলায় টান দিয়ে দিলো। মার্কাস, রিস্ক চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু চিৎকার করেও কিছু হলো না তার আগেই মনা গলা কাটা মুরগীর মত ছটফট করতে লাগলো ফ্লোরে শুয়ে। পুরো ফ্লোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। এদিকে রাশেদ,লাবিব, জাহিদ, শুভ্র অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে ।
কায়সার নিজের চোখে যেনো বিশ্বাস ই করতে পারছে না। মার্কাস আর রিস্ক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে মৃত মনার দিকে।
লামিয়া মনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে এবার দূরে থাকা অবয়বটির দিকে তাকালো। লামিয়ার এমন ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে অবয়বটি মনে হয় এবার বেশ ভয় পেয়েছে। তাই আর দেরি না করে দৌড় দিয়ে বেলকনির থেকে লাফ দিলো। লামিয়া ও আর দেরি না করে দৌড়ে গেলো অবয়বটির পিছন পিছন।
” মনা , মনা মার্কাস মনা আমাদের মাঝে আর নেই।” হাঁটু গেড়ে মনার লাশের পাশে বসে ভাঙা গলায় বললো রিস্ক।
মার্কাস নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে মনার নিথর দেহের দিকে। গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হচ্ছে না তাঁর।
” হ্যান্ডস আপ, পালানোর একদম চেষ্টা করবে না মার্কাস। নয়তো শুট করে দিবো।”
লাবিব এর কথা শুনে মার্কাস লাবিব এর দিকে শান্ত চোখে তাকালো।
তা দেখে লাবিব বাঁকা হাসলো। মার্কাস একবার ছবির দিকে তাকালো। মার্কাস এর তাকানো দেখে ছবি মুখ ঘুরিয়ে নিল। মার্কাস তা দেখে হাসলো। তারপর আবার লাবিব এর দিকে তাকিয়ে বললো
” আমাদের একজন কে মেরে দিয়ে খুব সাহসী ভাবছিস নিজেদের??”
” উঁহু, একদম নয়। ভাবছি না আমরা সবাই সাহসীইই বুঝতে পেরেছিস??”
” ওওও তাই নাকি?? তা তাহলে দেখি তোদের কেমন কলিজা।” বলেই লাবিব এর হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে ছবির মাথায় পিস্তল ঠেকালো।
” দেখ মার্কাস তুই যা বলবি আমি তাই করবো। তোকে ছেড়ে দিবো কিন্তু আমার বউ কে ছেঁড়ে দে।”
” যে টা আমি পাই নি সেটা আমি তোকেও পেতে দিবো না।” বলেই ছবির মাথায় শক্ত করে পিস্তল চেপে ধরলো। ছবি ছলছল চোখে লাবিব এর দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ বন্ধ করে নিলো।
” দেখ মার্কাস আমার বোন কে ছেড়ে দে নয়তো খুব খারাপ হবে।”
রাশেদ এর কথা শুনে মার্কাস হাসলো। লাবিব চিৎকার করে উঠলো
” আমার ছবির একটা আঁচ লাগলে আমি তোকে কী করবো নিজেও জানি না মার্কাস।”
মার্কাস হেঁসে বলল ” তাই নাকি?? দেখি তাহলে ওর আচ লাগলে কী করতে পারিস তুই?”
বলেই ট্রিগারে চাপ দিতেই ঠাস করে গুলি চালিয়ে দিলো। লাবিব ছবি বলে চিৎকার করে স্তব্ধ হয়ে গেলো। শুভ্র, রাশেদ, জাহিদ, মাহির, তায়েব, বাকরুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না তাদের।
” ছ্যা, হারামজাদার মাথায় না লেগে বুকে লাগলো কেনো??” বেশ বিরক্ত হয়ে বলল তায়েবা।
ততক্ষণে মার্কাস মাটিতে লুটিয়ে পড়লো বুকে হাত রেখে। সবাই অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে দেখছে বিরক্ত হওয়া তায়েবা কে। এই মেয়ে মার্কাস এর গাঁয়ে গুলি চালিয়েছে? কারোর যেনো বিশ্বাস ই হচ্ছে না। তায়েবা ছবির দিকে তাকিয়ে বললো
” তুই ঠিক আছিস??”
” হ্যাঁ।”
” ওকে এবার চল। লামু কে আগে খুঁজে বের করি কোথায় গেলো।”
মার্কাসের উপর গুলি চালিয়েছে তবুও যেনো কোনো হেলদোল নেই তায়েবার। সবাই তায়েবার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তায়েবা বললো
” এভাবে সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেনো?? এটা কে হসপিটালে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। এটাকে হসপিটালে নেওয়ার ব্যবস্থা করো।” বলেই রিস্ক এর দিকে তাকিয়ে বললো ” আর এটা কে তোমরা গ্রেফতার করো।”
অবয়বটির পিছন পিছন ছুটছে লামিয়া। আজকে ধরতে পারলে এই অবয়বটির মুখোশ খুলে সবার সামনে নিয়েই আসবে। পিছন পিছন দৌড়াতে হঠাৎ লামিয়ার সামনে তিন – চারটা কালো গাড়ি এসে লামিয়ার চারপাশে ঘুরতে লাগলো। লামিয়া দৌড় থেমে গেলো। লামিয়া চারপাশে তাকিয়ে গাড়ি গুলোর দিকে চোখ বুলাতেই তাঁর সামনে একটা গাড়ি এসে থামলো। লামিয়া সামনের তাকাতেই দেখলো গাড়ির জানালা খুলে কায়সার তাঁর দিকে বাঁকা হেঁসে তাকিয়ে আছে। লামিয়া কায়সারের দিকে তাকাতেই, গাড়ি গুলো থেকে একদল কালো পোষাক পরা কিছু লোক বেরিয়ে এসে লামিয়া কে ঘিরে ধরলো। তাঁর পালানোর রাস্তা সব বন্ধ। লামিয়া কে ঘিরে ধরতেই কায়সার গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো।
” বুলবুলি.. অনেক দিন পর দেখা তাই না?” বলতে বলতে হেঁটে এসে একদম লামিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর একটু ঝুঁকে লামিয়ার কপালে পড়ে থাকা বেবি হেয়ার গুলো ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিলো। লামিয়া একটু পিছিয়ে গেলো। কায়সার তা দেখে হাসলো।
” ভয় পাচ্ছো বুলবুলি??”
কায়সারের কথা শুনে লামিয়া বাঁকা হাসলো।
” ভয় আর আমি?? উঁহু ভয় আমি পাই না। আর ভয় কে জয় করাই হলো আমার কাজ।”
” আই’ম ইমপ্রেসড বুলবুলি। তোমার এই সাহস যত দেখি ততই মুগ্ধ হই আমি।”
লামিয়া তাকিয়ে আছে কায়সারের দিকে। শীতকালীন হালকা বাতাসে লামিয়ার সামনে থাকা চুল গুলো বারবার উড়ছে। যা দেখে কায়সার এর ভীষণ রাগ লাগছে। তাই আর এক পা এগিয়ে গিয়ে লামিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে সামনে থাকা চুল গুলোতে হাত দিতেই লামিয়া কায়সারের হাত আটকে রক্তিম চোখে তাকালো কায়সারের দিকে। চোখ দেখে মনে হচ্ছে এখন ই চোখ দিয়ে জ্বালিয়ে দিবে কায়সার কে।
” আপনার সাহস কী করে হয় আমাকে স্পর্শ করার??”
লামিয়ার কথা শুনে কায়সার হাসলো।
” তোমাকে স্পর্শ করার অধিকার শুধু আমার ই আছে বুলবুলি আর কারোল নয়।”
” ভুল, আমাকে স্পর্শ করার অধিকার শুধু একজনের ই আছে, আর সে একজন আমার স্বামী শাহরিয়ার শুভ্র ।”
লামিয়ার কথা শুনে কায়সারের ভীষণ রাগ হলো। তবুও নিজেকে শান্ত করে বললো ” বুলবুলি আ…।”
” এই বাল রাখ তোর বুলবুলি। আর একবার ওই মুখ দিয়ে বুলবুলি উচ্চারণ করলে আমি তোর মুখ ভেঙে দিবো।”
লামিয়ার কথা শুনে কায়সার শীতল দৃষ্টিতে তাকালো লামিয়ার রাগি মুখের দিকে। তারপর বেশ শান্ত গলায় বললো
” দেখো বুলবুলি আমি তোমার সাথে কোনো প্রকার খারাপ ব্যবহার করতে চাই না। তাই তুমি ভদ্র মেয়ের মতো আমার সাথে চলো বুলবুলি আমি তোমাকে ওই শুভ্রর চেয়ে রাখবো চলো আমার সাথে।” বলেই লামিয়ার হাত ধরলো। লামিয়া ঝাড়া দিয়ে কায়সারের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অন্য হাতে থাকা নাইফ দিয়ে কায়সারের বুকে আঘাত করতেই কায়সার লামিয়ার হাত ধরে ফেললো। তারপর লামিয়ার হাত মুচড়ে ধরে নাইফ ছিনিয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিয়ে রেগে বললো
” তোকে এতোক্ষণ ভালো ভাবে বলেছি তোর কানে যায় নি এখন খারাপ ভাবে কথা বলবো দেখবি কানে যাবে। এখন চল আমার সাথে।” বলেই লামিয়ার হাত ধরে নেটে নিয়ে যেতেই লামিয়া কায়সারের পায়ে লাথি বসাতে চাইলো কিন্তু কায়সার আগেই সরে গেলো।
” উঁহু বুলবুলি আমার সাথে কোনো চালাকি নয়। ” বলেই লামিয়ার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরতেই লামিয়া ব্যাথায় চোখ মুখ খিচে নিলো।”
” মালিকে না বলেই তাঁর বাগানের ফুলকে নিয়ে যাচ্ছিস??”
কথা শুনে কায়সারের পা থেমে গেলো। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে। কায়সার লামিয়ার চুলের মুঠি ধরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে ভীষণ রেগে গেলো।
” ওর গাঁয়ে স্পর্শ করার অধিকার তোকে কে দিয়েছে কায়সার??” রাগান্বিত স্বরে বলল শুভ্র।
কায়সার হেঁসে বলল ” আরে আরে ওর গাঁয়ে তো এখনো স্পর্শ করি নি। শুধু চুলেই হাত দিয়েছি। তবে করবো, প্রতিটি অংশে ছুঁয়ে দেখবো।”
” তার আগেই আমি তোকে জানে মেরে দিবো।”
” ওও তাই নাকি?? তাহলে স্পর্শ করে দেখি কি করতে পারিস।” বলেই লামিয়ার গলায় স্পর্শ করার জন্য হাত বাড়াতেই লামিয়া ছটফটিয়ে উঠলো।
” কাইসার বাচ্চা তোকে জ্যান্ত পু*ড়িয়ে মারবো আমাকে যদি তোর ওই নোংরা হাত দিয়ে স্পর্শ করিস।” ছটফট করতে করতে বললো লামিয়া।
কায়সার ভ্রু কুঁচকে লামিয়ার দিকে তাকালো। কাইসা মানে?? এই মেয়ে তাঁর এতো সুন্দর নামের ফালুদা বানিয়ে দিলো?
” এই কী বললে তুমি??”
” যা বলেছি শুনিস নি তুই?? ছাড় আমাকে নয়তো জ্যান্ত পু*ড়িয়ে মা*রবো।”
” কায়সার ছাড় ওকে। নয়তো আমি শুট করে দিবো।” কায়সারের দিকে ব*ন্দুক তাক করে বললো শুভ্র।
কায়সার শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া কে ছেঁড়ে দিলো। ছাড়া পেতে লামিয়া কায়সার কে সরিয়ে দৌড়ে শুভ্রর দিকে যেতেই। কায়সার বাঁকা হেঁসে কেমড় থেকে বন্ধুক বের করে লামিয়ার দিকে তাক করলো। শুভ্র তা দেখে চেঁচিয়ে উঠলো
” কায়সার নো স্টপ,ডোন্ট শুট।”
কায়সার শুভ্রর দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলল ” গুড বাই বাই বুলবুলি।” বলেই ট্রিগারে চাপ দিলো।
শুভ্র দৌড়ে এসে লামিয়া কে বুকে জড়িয়ে ধরতেই গুলি এসে শুভ্র পিঠে এসে লাগলো। শুভ্র লামিয়া কে শক্ত করে ধরে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।
” শুভ্র, শুভ্র, এইইই কি হয়েছে আপনার এ….।” বলতেই থেমে গেলো লামিয়া। শুভ্রর পিঠ থেকে গড়িয়ে মাটিতে রক্ত পড়ছে। লামিয়া ভয়ার্ত চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্রর চোখ বন্ধ, কথা বলছে না কোনো। লামিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় কয়েকবার ডাকলো শুভ্র কে। কিন্তু কোনো রেসপন্স করলো তা শুভ্র। তা দেখে লামিয়া চিৎকার করে উঠলো।
কায়সার বাঁকা হেঁসে গাড়িতে উঠে চলে গেলো সেখান থেকে। তাঁর পথের কাঁটা সরে গিয়েছে। এখন যেকোনো সময় তাঁর বুলবুলি কে নিজের করে পেতে পারবে সে। ভেবেই সয়তানি হাসলো।
” শুভ্র, উঠুন। এই কি হয়েছে আপনার চোখ খুলুন।” তবুও চোখ খুলছে না শুভ্র।
লামিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় এবার তেজি কন্ঠে বলে উঠলো
” খবরদার আবারো পালানোর পাঁয়তারা করবেন না একদম জানে মেরে দিবো। আমার এখনো সংসার করা বাকি আপনার সাথে ভুলে গেলেন..? কী হয়েছে কথা বলছেন না কেনো চুপ করে আছেন কেনো?? কথা বলুন আমার সাথে। কথা বলবেন না..? বেশ বলতে হবে না। তবে আমাকে ছেঁড়ে পালাবেন না আমি পালাতে দিবো না আর আপনাকে। গতকাল রাতের কথা ভুলে গিয়েছেন সব?? হ্যাঁ সব ভুলে গিয়েছেন?? কথা বলছেন না কেনো তাকান আমার দিকে?? কী সমস্যা আপনার কথা বলুন আমার সাথে। চুপ করে থাকবেন না। আমাকে রাগাবেন না শুভ্র আমি এবার যদি কথা বন্ধ করি তাহলে আপনি আমাকে আর ফিরাতে পারবেন না বুঝতে পেড়েছেন..? গতকাল রাতে কথা দিয়েছিলেন আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না ।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৬১
আর কষ্ট দিবেন না আমাকে, তাহলে আজকে এতো আয়োজন করে কেনো কষ্ট দিচ্ছেন আপনি?? আপনি বলেছিলেন আমাকে একটা সুন্দর ছোট্ট গোছানো ঘর – সংসার দিবেন তাহলে আজ কী হলো ?? কথা দিয়ে কোথায় পালিয়ে যাচ্ছেন ?? কথার ক্ষেলাপ করবেন আপনি হু?? এইই ছেলে কথা বলছেন না কেনো কথা বলুন। কথা দিয়েছিলেন তো তাহলে কেনো চলে যাচ্ছেন আমাকে ছেড়ে। যাবেন না শুভ্র যাবেন না আমার জন্য থেকে যান। আপনি এবার চলে গেলে লামিয়া বাঁচবে না। মরে যাবে একদম মরে যাবে। বলেই কেঁদে উঠলো লামিয়া।
