প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৯
সাইদা মুন
মেহরীন গোসল সেরে ভেজা কাপড়গুলো নাড়তে বারান্দায় আসে। কাপড় বারান্দায় মেলে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই নিচ থেকে ভেসে আসে মোটরসাইকেল বের করার শব্দ।
মেহরীন থমকে দাঁড়ায়। তাহসানের যে অবস্থা, সে তো এখন বাইক চালাবে না। তাহলে তালহা? হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন করে মুচড়ে ওঠে। অজানা এক আশঙ্কা। দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সে। বারান্দা থেকে উঁকি দিতেই চোখে পড়ে, গেট খোলা, তালহা হেলমেট পরছে।
বাইক নিয়ে বের হবে? এমনিতেই তাহসানের এক্সিডেন্ট হয়েছে। আবার তালহা বাইক চালাবে? আবার যদি তালহার কিছু হয়। এই ভেবেই সে অস্থির হয়ে ডেকে ওঠে,
—এই শুনছেন… এইইইই।
তালহা বাইক স্টার্ট দিতে যাবে। ডাক শুনে থেমে যায়। মাথা ঘুরিয়ে বারান্দার দিকে তাকাতেই মেহরীনের চিন্তিত মুখটা চোখে পড়ে। মেহরীন আবার ডাকে,
—এই শুনছেনন…
তার ডাক শুনে আনমনেই তালহার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। বুকের ভেতর যেন এক অশান্ত নদীর জল কিছুক্ষনের জন্য শান্ত হয়েছে। সে হেলমেটের সামনের গ্লাসটা তুলে শান্ত গলায় উত্তর নেয়,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—জ্বী ম্যাডাম, বলুন।।।
—আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
—একটু কাজ আছে। চিন্তা করবেন না, তাড়াতাড়ি চলে আসব।
মেহরীন একটু ইতস্তত করে বলে,
—না মানে, বাইক নিয়ে বের হবেন?
—হ্যাঁ।
—বাইক না নিলে হয় না?
তালহা কপাল কুঁচকে বলে,
—কেন? কোনো সমস্যা?
—আসলে… ওই তাহসান ভাইয়ের…
কথাটা শেষ করে উঠতে পারে না মেহরীন। তালহা মৃদু হেসে ফেলে। পুরো বিষয়টা বুঝে যায়। মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করে বলে,
—চিন্তা করবেন না। আস্তে ধীরেই চালাব।
মেহরীন ঠোঁট উল্টে বলে,
—আচ্ছা, সাবধানে যাবেন।
—অবশ্যই।
তালহা বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায়। তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মেহরীন। ঠোঁট নড়ে, নীরবে কয়েকবার বিপদের দোয়া পড়ে তার যাওয়ার পানে ফুঁ দেয়। তারপর ধীরে ঘরের ভেতরে ফিরে যায়।
এদিকে পুরো সময় ওপর থেকে তাদের কথা শুনছিল ফারহা। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সে। মোবাইলটা কানে ধরা, কিন্তু মনোযোগ পুরোপুরি নিচের দিকে। হঠাৎ ওপাশ থেকে কেউ জোরে ডাকতেই সে হকচকিয়ে ওঠে।
—ওহ! হ্যাঁ হ্যাঁ, বল।
—তুই কি শুনছিলি না? এতক্ষণ ধরে ডাকছি।
ফারহা অন্যমনস্ক গলায় বলে,
—আচ্ছা, কল রাখতেছি। রাতে কল দিবো। একটু কাজ আছে।
কল কেটে সে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ভিড় করে। তালহা আর মেহরীনের মাঝে, কি কিছু চলছে? এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে আসে।
—না না, এমন কিছু হবে না। মেহরীন এখনো ছোট।
ওর সাথে কেমনে কী? তালহা ভাই তো এমন না। তবু…তাদের কথোপকথনটা? ওটা কি সত্যিই একেবারে নরমাল ছিল?
চিন্তাগুলো তাকে ছাড়ে না। অস্বস্তিটা বুকের ভেতর ভার হয়ে বসে আছে। নানান ভাবনা মাথায় নিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে ফারহা।
তালহা দাঁড়িয়ে আছে বেশ পুরোনো দু’তলা এক বিল্ডিংয়ের সামনে। দেয়ালের রঙ অনেক আগেই প্রাণ হারিয়েছে। খসে পড়া প্লাস্টার, জমে থাকা শ্যাওলা আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধে বোঝা যায় জায়গাটা সময়ের কাছে বহুদিন ধরেই অবহেলিত। আশেপাশে কেমন একটা নির্জনতা।
ভেতরে পা রাখতেই কাঠের সিঁড়ি কেঁপে ওঠে। ঠিক তখনই দোতলা থেকে ভেসে আসে এক বৃদ্ধের কর্কশ কণ্ঠ,
—খালি নাই গো। এই মাসেই ভরাট হইয়া গেছে ব্যাচেলরের রুমগুলো।
তালহা থমকে দাঁড়ায়। ধীরে মাথা তুলে তাকাতেই চোখে পড়ে পানের পিক মুখে চেপে রাখা এক বুড়ো লোক, রেলিংয়ে ভর দিয়ে নিচে তাকিয়ে আছে।
হালকা একটা সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে তালহা বলল,
—আমি বাসা খুঁজতে আসিনি।
লোকটা অবাক হয়ে পানের পিক ফেলল, ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
—তাইলে কিয়ের লাইগা আইসো?
তার কাজে তালহার নাকটা অজান্তে কুঁচকে আসে। মুখের ভঙ্গি স্বাভাবিক রেখেই জিজ্ঞেস করল,
—জাবেদ নামের কেউ কি আপনার বাসায় থাকে?
বুড়ো লোকটা কয়েক সেকেন্ড ভেবে নেয়। চোখ সরু করে যেন স্মৃতি ঝালিয়ে নিচ্ছে।
—অফিসে চাকরি করে হেই জাবেদ?
তালহা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই লোকটা বলে,
—হো, থাকে তো। নিচতলার দুই নম্বর রুমে।
—ধন্যবাদ,
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে তালহা ভেতরের দিকে এগোয়। নিচতলার করিডোরটা আরও বেশি জীর্ণ। দেয়ালে সবুজ ছোপ, জায়গায় জায়গায় রঙ উঠে কাঠামো বেরিয়ে এসেছে। মনে হয় বহুদিন ধরে কোনো কাজ করা হয়নি। তালহার পায়ের শব্দগুলো অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
খুঁজতে খুঁজতে ‘২’ লেখা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় সে। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে, কোনো কলিং বেল নেই। তাই হাত তুলেই কাঠের দরজায় টোকা দেয়। প্রথম টোকায়, নীরবতা। আরও একবার এবারও নীরবতা। তৃতীয়বার টোকা দিতেই ভেতর থেকে ভেসে আসে অলস, ঘুমজড়ানো একটা গলা,
—আসি..
তালহা দরজার সামনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতর এক চাপা রাগ। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে যায়। একজন যুবক দাঁড়িয়ে, চুল এলোমেলো, চোখ আধখোলা। সামনে না তাকিয়েই বিরক্ত গলায় বলে,
—কে?
ঠিক সেই মুহূর্তে তালহা শান্ত, গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,
—আসসালামু আলাইকুম…
কণ্ঠটা পরিচিত লাগতেই যুবকটা হঠাৎ মাথা তুলে তাকায়। চোখে ঘুম কেঁটে গেছে, একরাশ বিস্ময় এসে ভর করেছে। সামনের ব্যক্তিকে দেখে কিছু বলতে নিবে। তার আগেই, বুকের পাঁজরে সজোরে এক লাথি এসে পড়ে।
হাওয়া বেরিয়ে যায় ফুসফুস থেকে। কোনো শব্দ করার আগেই জাবেদ পিছিয়ে গিয়ে ভারসাম্য হারায়। মুহূর্তের মধ্যেই সে ছিটকে পড়ে মেঝেতে।
চারপাশ নিস্তব্ধ। সামনের দিকে এগোতে এগোতে তালহা তার হাতের সিলভার ঘড়িটা ঢিলে করে নিল। ঘড়িটা হাতের আঙুল বরাবর ঝুলে আসতেই, আচমকাই হাতটা মুঠো করে নিল।
সামনে থাকা তখন ছেলেটা মাথা তুলছে। ভালো করে মাথা তুলে তাকালও না, তার আগেই নাক বরাবর এক জোরালো ঘুষি মেরে তালহা ছেলেটাকে ফের ছিটকে দিল। সঙ্গে সঙ্গে গলগলিয়ে রক্ত বের হতে লাগল, মুখ থেকে ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল। হাতঘড়ির উপরের গ্লাসটাও ফেটে গেছে।
সন্ধ্যা ছয়টা পঁয়ত্রিশ। ড্রয়িংরুমে বাড়ির সবাই বসে আছে। চা-নাশতার টেবিল ঘিরে গল্প জমেছে, নানার বাড়ির কথা, পুরোনো স্মৃতি, হাসি-ঠাট্টা। ঘরটা ভরে আছে একধরনের স্বস্তিকর কোলাহলে।
তাহিয়া আর মেহরীন কলেজ থেকে ফিরে দুপুরে ঘুমিয়েছিল। এখনো ঘুম ভাঙেনি। সাতটা বাজলে ডেকে তোলা হবে। এই বলে তিতলি বেগম আগেই সবাইকে সাবধান করে দিয়েছেন যেন দোতলায় কোনো শব্দ না হয়। হঠাৎ করেই সেই স্বাভাবিক মুহূর্তটা ভেঙে যায়। কলিংবেল বেজে ওঠে।
রিতু উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই মুহূর্তে থমকে যায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তালহাকে দেখে সে একপাশে সরে দাঁড়ায়। তালহা ক্লান্ত শরীরে ভেতরে ঢুকে পড়ে। মুখটা অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর। রিতু দরজা লাগিয়ে পেছনে ফিরতেই চোখ আটকে যায় ভাইয়ের হাতে। ডান হাতে মোটা ব্যান্ডেজ। আর সেই ব্যান্ডেজের ফাঁক গলে রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে চেঁচিয়ে ওঠে সে,
—ভাইয়া! হাতে কী হয়েছে? আম্মু বড়মা দেখো না ভাইয়ার হাতে কী হয়েছে।
রিতুর চিৎকারে পুরো ড্রয়িংরুম মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। হাসি-আড্ডা উধাও। সবার চোখে একসাথে ভর করে উদ্বেগ। তিতলি বেগম তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ছেলের হাত ধরেন। ব্যান্ডেজ ভেজা। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
—আব্বু…এটা কীভাবে হলো? আয়, আয় এখানে এসে বস।
তারপর রিতুর দিকে তাকিয়ে বলেন,
—রিতু মা, ফাস্টএইড বক্সটা তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়।
রিতু যেন দৌড়েই বক্স এনে দেয়। তালহাকে সোফায় বসানো হয়েছে। তানিয়া বেগম ব্যান্ডেজ খুলে নতুন করে পরিষ্কার করে বাঁধছেন। পাশে বসে তিতলি বেগম ছেলের মুখে, চুলে হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। চোখে পানি ধরে রাখতে পারছেন না।
তালহা বাম হাতটা বাড়িয়ে মাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে চেষ্টা করছে,
—আম্মু সামান্য একটু লেগেছে। এভাবে কান্না করো না। কিছুই হয়নি। ঠিক হয়ে যাবে।
তিতলি বেগম মাথা নাড়েন, কণ্ঠে চাপা অভিমান আর ভয়,
—আমি জানি না। তুই আর বাইক নিয়ে বের হবি না। ওই বাইকের জন্যই সব হয়েছে।
হালকা হাসার চেষ্টা করে তালহা,
—আহ আম্মু, বাইকের কী দোষ? কাঁচে লেগেছিল হাত, তাই কেটেছে।
নানান কথায় সে মাকে শান্ত করতে থাকে। নিচতলার এই হইচইয়ের শব্দে উপরের ঘরে তাহিয়া আর মেহরীনের ঘুম অনেক আগেই ভেঙে গেছে। দুজনেই আধঘুমে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিচে নামতে গিয়ে সিঁড়ির মাঝপথেই থেমে যায়।
চোখে পড়ে সেই দৃশ্য। রাফা দৌড়ে এসে তাদের কী হয়েছে সবটা বলতেই তাহিয়া আর দেরি করে না। দৌড়ে ভাইয়ের কাছে চলে আসে। চোখে পানি জমে উঠেছে। একবার ভাইয়ের মুখ, একবার তার ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে তাকায়। তাহিয়াকে দেখে তালহা পাশ ফিরতেই মেহরীনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়।
ঘুম ঘুম চেহারাটা একটু ফুলে আছে। চোখজোড়া টলমল করছে, এই বুঝি কান্না ভেঙে পড়বে। কোনো কথা বলছে না, শুধু দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যটা পড়ে তালহার চোখে। তাকে শান্ত করতেই সে তাহিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
—ভাইয়ার কিছু হয়নি রে। সামান্য চোট লেগেছে। বাইক খুব সাবধানেই চালাচ্ছিলাম।
শেষ কথাটুকু বলতে গিয়ে সে মেহরীনের দিকে আড়চোখে তাকায়। মেহরীন কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বলে না। উল্টো ঘুরে চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে উপরের দিকে চলে যায়। তাকে যেতে দেখে তালহা তাহিয়ার দিকে চোখের ইশারায় কিছু বোঝায়। তাহিয়াও বুঝে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মেহরীনের পিছু নেয়।
হাতের ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ হতেই তালহা উঠে দাঁড়ায়। গা ঝাড়া দিয়ে হালকা স্বরে বলে,
—হুদাই এতো টেনশন করছো সবাই। সত্যিই কিছু হয়নি। আমাকে নিয়ে চিন্তা বাদ দাও এখন।
নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ থেমে চারদিকে তাকিয়ে বলে,
—তাহসানকে দেখছি না যে?
রিতু উত্তর দেয়,
—ভাইয়া নিজের রুমে রেস্ট নিচ্ছে।
—ওহ। ঠিক আছে,
বলে তালহা সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। তালহা চলে যেতেই তিতলি বেগমের বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা একটু একটু করে হালকা হয়। তিনি উঠে যান ছেলের জন্য কিছু নাস্তা বানাতে।
তালহা নিজের ঘরে যেতে নিয়েও থেমে দাঁড়ায় তাহিয়ার রুমের দরজার কাছে। ভেতর থেকে ফিসফিসানি ভেসে আসছে। কান পাততেই শুনতে পায়, মেহরীন কাঁদছে, তাহিয়া তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
এই মুহুর্তটা না দেখেও অনুভব করেই তালহার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে ওঠে। তার জন্য মেহরীন চিন্তিত, এই ভাবনাটাই যেন অদ্ভুত এক ভালো লাগা এনে দিচ্ছে তার মধ্যে।
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ সে গুনগুনিয়ে ওঠে,
“Main hi main ab tumhare,
Khayalon mein hoon…
Main jawab-on mein hoon,
Main sawalon mein hoon…”
গুনগুন করতে করতেই ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে চলে যায় তালহা। পেছনে রেখে যায় এক ঘর ভরা উদ্বেগ, আর নিঃশব্দ ভালোবাসা।
সন্ধ্যা সাতটা ছুঁইছুঁই। ঘরের আলোটা নরম, জানালার বাইরে আজান ভেসে আসছে। তালহা একেবারে বাধ্য ছেলের মতো মায়ের কাছে বসে আছে। তিতলি বেগম সোফায় বসে খাবারের প্লেট কোলে নিয়েছেন। তালহা মেঝের কার্পেটের ওপর, ঠিক মায়ের পায়ের কাছে বসে, মাথা ফেলে রেখেছে মায়ের কোলে। এই ভঙ্গিটায় বয়স নেই, পদমর্যাদা নেই, আছে শুধু নিখাদ আশ্রয়।
তিতলি বেগম পরোটা একটু একটু করে ছিঁড়ে ছেলের মুখে দিচ্ছেন। তালহা নীরবে খাচ্ছে, আবার মাথাটা আলতো করে মায়ের কোলে গুঁজে দিচ্ছে। যেন কথার চেয়েও এই নীরবতা বেশি কিছু বলতে চাইছে।
হঠাৎ তালহা ধীরে বলে উঠল,
—আম্মু সন্তান যদি ভুলবশত কোনো ভুল করে বসে, তাহলে কি মা অনেক বেশি রাগ করে থাকতে পারে?
তিতলি বেগম হাত থামিয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কণ্ঠে নরম দৃঢ়তা,
—না রে। মায়েরা রাগ করতে পারে, কষ্ট পেতে পারে… কিন্তু বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। কারণ রাগের চেয়েও সন্তান বড়।
তালহা একটু চুপ করে থাকল। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো যেন পথ খুঁজছে। তারপর বলল,
—আম্মু, একটা ঘটনা বলব? শুনবে?
—হুম, বল। কী হয়েছে?
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠটা এবার ভারী,
—আমার এক বন্ধু…সে ঘুরতে গিয়ে রাস্তার ধারে এক অসহায় মেয়েকে দেখে। মেয়েটা নির্জন রাস্তায় ভয় পেয়ে ছিল, একদম একা। ছেলেটা মানবিকতা থেকে সাহায্যের হাত বাড়ায়।
তিতলি বেগম বললেন,
— খুব ভালো কাজ করেছে।
—কিন্তু আম্মু, সাহায্য করতে গিয়েই সব উল্টে যায়। পথিমধ্যে তারা একটা এলাকার কয়েকজন মুরুব্বির সামনে পড়ে। তারা পুরো বিষয়টা ভুল বুঝে, সমাজের ভয় দেখিয়ে, মানসম্মানের দোহাই দিয়ে, জোর করে তাদের বিয়ে পড়িয়ে দেয়।
তিতলি বেগম বিস্ময়ে তাকালেন,
—কি বলিস! তারপর?
—তারপর আর কী, ছেলেটা বাধ্য হয়ে মেয়েটাকে বিয়ে করে বাসায় নিয়ে আসে। কারণ মেয়েটার আর কেউ নেই। ওকে ছেড়ে দেওয়ার মতো মন বা সুযোগ, কোনোটাই ছিল না তার কাছে।
তিতলি বেগম ধীরে বললেন,
—যাক….অন্তত দায়িত্ব থেকে পালায়নি তো, তারপর?
এবার তালহা মাথা তুলে মায়ের মুখের দিকে তাকায়। চোখে একরাশ প্রশ্ন, প্রত্যাশা।
—কিন্তু আম্মু, ছেলের মা-বাবা মেয়েটাকে বউ হিসেবে মানেনি। তারা ধরে নিয়েছে ছেলে ইচ্ছা করে সব করেছে। রাগের মাথায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এখানে তো ছেলের বা মেয়ের কারও দোষ নেই। তবু এমন আচরণ, এটা কি ঠিক হয়েছিল?
তিতলি বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। মুখে গভীর আফসোসের ছায়া। তারপর বললেন,
—দেখ, মা-বাবার কষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক না। ছোট থেকে মানুষ করে বড় করে, হঠাৎ শুনল ছেলে জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত একা নিয়েছে, মনে হবে বিশ্বাস ভেঙে গেছে। কষ্ট লাগবেই।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—কিন্তু আম্মু, এখানে তো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই ছিল না। পরিস্থিতি ওকে ঠেলে দিয়েছে।
তিতলি বেগম মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। কণ্ঠটা এবার আরও গভীর,
—যেহেতু সে পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তাহলে এতটা রাগ করা, কথা বন্ধ করে দেওয়, একদমই ঠিক হয়নি। ছেলে তো কোনো অপরাধ করেনি। চুরি-ডাকাতি করেনি, অন্যায় পথে যায়নি। এমন সময়ে মায়ের উচিত ছিল ছেলের পাশে দাঁড়ানো, পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা, আর সেই মেয়েটার দিকেও মানুষ হিসেবে তাকানো।
এই কথাগুলো শুনে তালহা ধীরে একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন কিছুটা হালকা হলো। মায়ের কথায় সে যেন নিজের অজানা অপরাধবোধেরও বিচার পেয়ে গেল।
ততক্ষণে তিতলি বেগম খাওয়ানো শেষ করেছেন। ব্যথার। ট্যাবলেটটা হাতে দিয়ে বললেন,
—এইটা খেয়ে নে ভালো লাগবে আব্বু।
তালহা ওষুধ খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। মায়ের যাওয়ার দিকে একবার তাকায়, চোখে তার নিঃশব্দ স্বস্তি।
ল্যাপটপ হাতে তালহা বের হয়। তাহিয়ার রুমের সামনে দিয়ে যেতে যেতে গলা বাড়িয়ে একবার হুঁশিয়ার করে দেয় পড়তে বসার কথা। তারপর আর দেরি না করে সোজা ঢুকে পড়ে তাহসানের ঘরে।
হঠাৎ কারো উপস্থিতি টের পেতেই তাহসান সামনের ল্যাপটপে চলতে থাকা পডকাস্টটা সঙ্গে সঙ্গে অফ করে দেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই তালহাকে দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ব্যথা চেপে রেখে কষ্ট করে উঠে খাটে হেলান দিয়ে বসে।
তালহা তার সামনে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি চেপে বলে,
—হাই ভাঙাচোরা তাহসান ব্রো, হাউ আর ইউ?
তাহসান দাঁত চিবিয়ে উত্তর দেয়,
—আমার সাথে না লাগতে আসলে তোর শান্তি মেলে না?
কথাটা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে তালহা নিজের হাতে থাকা ল্যাপটপটা খুলে ফেলে। কয়েকটা ফাইল টেনে বের করে স্ক্রিনটা তাহসানের দিকে এগিয়ে দেয়। তাহসান স্ক্রিনে চোখ রাখতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সিসিটিভি ফুটেজ। লেডিস রুম থেকে তালহা মেহরীনের হাত ধরে বের হচ্ছে। তাহসানের হাত শক্ত হয়ে মুঠো হয়ে আসে। চোখে আগুন জমছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই ভিডিওতে আরেকজনের আগমন ঘটে, একটা ছেলে বের হয়েছে। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি ছুঁড়ে উল্টো দিকে দ্রুত হেঁটে যায়। ঠিক তখনই তালহা ভিডিও স্টপ করে দেয়। জুম করে ছেলেটার মুখটা পরিষ্কার করে তোলে।
কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে তাহসান প্রশ্ন করে,
—কে?
তালহা ল্যাপটপটা নিজের দিকে টেনে নেয়,
—জানোয়ার!
তাহসান বিরক্ত হয়ে বলে,
—তো আমাকে দেখাচ্ছিস কেন?
তালহা দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
—মেহরীনকে টাচ করেছে….
তাহসান সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
—তো আমার কী..?
কথাটা বলেই দু সেকেন্ড থেমে যায়। হঠাৎ যেন শব্দটার মানে মাথায় ঢুকে পড়ে। চোখ বড় হয়ে যায়। সে চেঁচিয়ে ওঠে,
—ওয়েট! কী বললি? আবার রিপিট কর…
তালহা ডোন্ট-কেয়ার ভঙ্গিতে বলে,
—তালহা এক কথা দু’বার বলতে পছন্দ করে না।
তাহসান রাগে উঠে বসে। শরীর থরথর করে কাঁপছে। কপালের রগ ফুলে উঠেছে, চোয়াল শক্ত, চোখ লাল। তালহার চোখে চোখ রেখে গর্জে ওঠে,
—কে এই জানোয়ার? নামটা খালি বল, দুনিয়াতেই জাহান্নাম দেখিয়ে আনব। এত বড় স্পর্ধা! তুই এখনো চুপচাপ বসে? ওই মা*রচু*কে কিছু করিসনি?
তালহা গম্ভীর মুখে আবার ল্যাপটপটা তাহসানের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তাহসানের নাক কুঁচকে আসে। রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে সেই ছেলেটা। নিথর শরীর। চারপাশে ছোপ ছোপ রক্ত। মুহুর্তেই মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে। ছেলেটার এই অবস্থা তাকে যেন আনন্দ দিচ্ছে।
তালহা উঠে দাঁড়ায়। ল্যাপটপ হাতে নিয়ে এক হাত পকেটে গুঁজে ধীরে ধীরে তাহসানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কণ্ঠ নামিয়ে ফিসফিস করে বলে,
—তালহার জিনিসের হেফাজত তালহা নিজেই করতে জানে। এটা তোকে দেখালাম জাস্ট হুঁশিয়ার করতে। ফারদার যদি আমার আর মেহরীনের মাঝে প্যাঁচ লাগানোর চেষ্টাও করেছিস, এর জায়গায় তুই থাকবি। সেদিনের কথা এখনো ভুলিনি। এক্সিডেন্ট করেছিস মানবতার খাতিরে ছাড় দিলাম..।
বলেই এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সে ঘুরে দাঁড়ায়। দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। পেছনে পড়ে থাকে তাহসান, রাগ, অপমান একসাথে গিলে খেতে খেতে।
তাহিয়ার রুমে ঢুকতেই তালহার চোখে পড়ে, দুজনেই একেবারে ভালো মেয়ের মতো বইয়ে মুখ গুঁজে বসে আছে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে বায়োলজির বই, খাতা, পেন, হাইলাইটার। জানালার পাশে স্টাডি ল্যাম্প জ্বলছে। ঘরটা নিস্তব্ধ, শুধু পাতার শব্দ আর কলমের হালকা ঘষাঘষি।
তালহা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দুজনের মাঝখানের চেয়ারে বসে পড়ে। তার উপস্থিতি টের পেয়ে দুজনেই একসাথে চোখ তুলে তাকায়। মেহরীন একটু ইতস্তত করে মুখ খুলল,
—আজ আমরাই পড়তে পারব। আপনি রেস্ট নিন।
তালহা কোনো উত্তর না দিয়ে ল্যাপটপটা টেবিলের ওপর রাখে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে কোষ বিভাজনের এনিমেশন, মাইটোসিসের ধাপে ধাপে ভিজ্যুয়াল।
তারপর শান্ত গলায় বলে,
—সমস্যা নেই, আমি ঠিক আছি। আজ হাতে লিখে করাব না।
মেহরীন আর কিছু বলে না। মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তালহা পড়ানো শুরু করে একদম গোড়া থেকে।
—দেখো, কোষ বিভাজন মানে শুধু বইয়ের সংজ্ঞা না। এটা লাইফের বেসিক প্রসেস। এখন এইটা প্রোফেজ, এখানে ক্রোমোজোমগুলো কন্ডেন্স হতে শুরু করে।
বলতে বলতে কার্সর ঘুরিয়ে দেখায়। তাহিয়া মাথা নেড়ে নোট নেয়,
—মানে নিউক্লিয়াস তখন ভাঙতে থাকে, তাই না?
তালহা বলে,
—একদম। এবার মেটাফেজে আয়। এই জায়গাটা এক্সামিনারে খুব পছন্দ। কারণ এখানে ভুল করলে পুরোটা কাটা যায়।
মেহরীন হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে,
—আর এনাফেজে সেন্ট্রোমিয়ার কখন স্প্লিট হয়?
তালহা তাকিয়ে মুচকি হাসে,
—ভালো প্রশ্ন। এই জন্যই তো পড়াচ্ছি। দেখো,
সে এনিমেশনটা আবার চালায়, ধীরে ধীরে বোঝায়। মেহরীন খাতায় স্কেচ আঁকে, পাশে নোট লিখে রাখে। এইভাবে একটার পর একটা টপিক যায়, মাইটোসিস, মিয়োসিস, ডিফারেন্স, ডায়াগ্রাম, এক্সাম টিপস। তালহা মাঝেমাঝে থামিয়ে দুজনকেই প্রশ্ন করে।
—এইটা যদি সৃজনশীল আসে, কীভাবে লিখবে?
—এই ডায়াগ্রামে দুইটা লেবেল ভুল করলে কত নাম্বার কাটবে?
তাহিয়া কখনো ভুল করে, তালহা ধৈর্য নিয়ে শুধরে দেয়। মেহরীন একটু ধীরে বুঝলেও একবার বুঝলে আর ভুল করে না, এই জিনিসটা তালহার চোখ এড়ায় না। সময় গড়িয়ে যায় টেরই পায় না কেউ।
টানা তিন ঘন্টা পড়ানোর পর তালহা ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়।
—আজকের মতো এখানেই থাক। এইগুলো লিখে ফেলবে। কাল আমি চেক করব।
দুজনেই একসাথে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। বের হওয়ার আগে তালহা একটু থেমে মেহরীনের দিকে তাকায়,
—পড়া শেষ করে একবার আমার রুমে এসো। পাঁচ মিনিট লাগবে।
এইটুকু বলেই সে বেরিয়ে যায়। রুমে আবার নীরবতা নামে। তাহিয়া খাতায় চোখ রেখেই ফিসফিস করে বলে,
—ভাইয়া পড়ালে বুঝতে কিন্তু সহজই লাগে।
মেহরীন শুধু “হু” বলল।
পড়া শেষ করতে করতে রাত এগারোটা ছুঁইছুঁই। মেহরীন ধীরে ধীরে তালহার রুমের দিকে আসে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখে, সোফায় বসে আছে তালহা, ফোন কানে। কারো সঙ্গে কথা বলছে। কণ্ঠটা নিচু, অফিসিয়াল।
মেহরীন নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে লাগিয়ে দেয়। ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। তালহার সামনে এসে দাঁড়াতেই তালহা কথা বলতেই চোখের ইশারায় পাশে বসতে বলে। মেহরীন বাধ্য মেয়ের মতো বসে পড়ে।
পরের মুহূর্তেই তালহা নিজের মাথাটা মেহরীনের কোলে রেখে দেয়। হাত তুলে ইশারা করে, চুল টেনে দিতে। মেহরীন একটু থমকে গিয়ে আস্তে আস্তে তার চুলে আঙুল চালাতে শুরু করে।
তালহা সেভাবেই ফোনে কথা বলছে। কথাবার্তায় বোঝা যায়, কোনো গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল কাজ নিয়েই কথা চলছে। মেহরীন চুপচাপ, নিঃশ্বাসও যেন সাবধানে নিচ্ছে। হঠাৎ তালহার কথা থেমে যায়। কল কেটে দেয়।
সে চোখ তুলে মেহরীনের দিকে তাকায়। চোখে চোখ পড়তেই তালহা সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
—মেহরীন, আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছো না তো?
এই প্রশ্নে মেহরীন চমকে ওঠে। আঙুলগুলো চুলে থেমে যায়। গলা শুকিয়ে আসে হঠাৎ,
—ম.. মানে কিসের কথা বলছেন?
তালহা চোখ বন্ধ করে একবার গভীর নিশ্বাস নেয়। তারপর শান্ত গলায় বলে,
—তোমার কোনো অতীত ছিল? থাকলে আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারো। আমি কিছু বলবো না।
মেহরীনের বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়। চোখ ছানাভরা হয়ে এদিক-সেদিক তাকায়।
হঠাৎ কেন এসব কথা? তালহা কি কিছু শুনেছে? তালহাকে সেসব সত্যিই বলেছে? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে,
—আপনাকে.. কেউ কিছু বলেছে?
তালহা এবার চোখ খুলে তার দিকে তাকায়। দৃষ্টি শক্ত।
—যদি বলি, বলেছে?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে বলে ওঠে,
—কি বলছেন! আজাইরা কথা। আমাকে এখানে কেউ চিনেই না। কে কী বলবে? হয়তো এমনি মিথ্যা বলেছে।
তালহা আর কিছু বলে না। শুধু চুপ করে থাকে। এই নীরবতাই মেহরীনের অস্বস্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বুকের ভেতর যেন দেয়াল ভাঙছে। তালহা কিছুক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করে হঠাৎ বলে,
—জাবেদকে চিনো?
এই নামটা শোনামাত্রই যেন মেহরীনের চোখ স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যায়। শ্বাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসে। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কী বলবে, খুঁজে পায় না। শীতের রাতেও কপালে ঘাম জমে ওঠে। তালহার মাথার নিচে রাখা হাতটা কাঁপছে।
ঢোঁক গিলে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
—ক কে? আমি আমি চিনি না। জানি না। এই নামে কাউকে আমি চিনি না।
তালহা এক হাত মেহরীনের গালে রেখে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে,
—আরে কুল। আমি তো বলিনি তুমি চিনো। জাস্ট জিজ্ঞেস করলাম চিনো কিনা। এত টেনসড হচ্ছো কেন? ঘামছো কেন? আর ইউ ওকে, মেহরীন?
মেহরীন বারবার মাথা নেড়ে বলে,
—আ.. আমি ঠিক আছি। ঠিক আছি।
—তাহলে এত ঘামছো কেন?
মেহরীন তোতলাতে তোতলাতে বলে,
—এ.. এমনি। আমার খিদা লেগেছে। খেতে যাবেন না? নিচ থেকে আন্টি ডাকছে।
তালহা কয়েক সেকেন্ড সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা যেন মিলছে না, আবার কিছু স্পষ্টও নয়। আপাতত নিজের ভাবনাগুলো গিলে ফেলে বলে,
—উঠো।
তালহার কথায় মেহরীন পিটপিট করে তাকায়,
—আপনি তো শুয়ে আছেন, এভাবেই উঠে যাবো?
—তুমি উঠো আগে।
মেহরীন উঠে দাঁড়ায়।
—একটা বালিশ এনে দাও।
গুটিগুটি পায়ে গিয়ে খাট থেকে একটা বালিশ এনে তালহার মাথার নিচে রাখে। তালহা মাথা রেখে আবার বলে,
—সামনের কালো কোটের পকেটে হাত দাও।
মেহরীন হাত ঢুকিয়ে একটা বেলি ফুলের মালা বের করে আনে। মালাটা হাতে নিতেই মনটা কিছুটা শান্ত হয়। তবে তালহা আজ আর কিছু বলল না। শুধু একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—এবার যেতে পারো।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৮
মেহরীনের বিষয়টা খারাপ লাগলেও, কোনো কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে যায়। পেছনে পড়ে থাকে তালহা, সোফায় শুয়ে, চোখে জমে থাকা সন্দেহ নিয়ে। নিজের চুল নিজেই টেনে ধরে। তার মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
—তুমি এত ঘাবড়ে গেলে কেন, মেহরীন?
তাহলে কি ধরেই নেব, তুমি আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছ?
