Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪০

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪০

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪০
সাইদা মুন

দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় দেড় মাস। এর মাঝে তাহসানকে নিয়ে তালহা আর নানুরা সবাই বাড়িতে ফিরে গেছে। দীর্ঘদিনের বিশ্রামের পর তাহসান কলেজে আবার জয়েন করেছে, এক সপ্তাহ হলো।
আজ মেহরীন আর তাহিয়াদের শেষ পরীক্ষা। সকাল ছয়টায় তিতলি বেগম ডেকে তুলেছে দুজনকেই। ঘুমচোখেই উঠে আপাতত পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে বসে আছে তারা। ঘরের ভেতরটা নিস্তব্ধ, শুধু বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ।
একবার তালহা এসে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে গিয়েছিল। কিছু বলেনি, শুধু তাকিয়ে থেকেছে কয়েক সেকেন্ড। আজ আইসিটি পরীক্ষা, দুজনেই এখন সঠিক উত্তরগুলো শেষবারের মতো রিভাইস দিচ্ছে। পড়ার মাঝেই তিতলি বেগম নাস্তা দিয়ে গেছেন। আজ আর নিচে সবার সঙ্গে খাওয়া হয়নি।

তখন সময় আটটা ত্রিশ। তাহিয়া তার আম্মুর মোবাইল হাতে নিয়ে বসে আছে। হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতেই রাফি, তনিমা, ফারিন, সবার মেসেজে ভরে গেছে স্ক্রিন। মেসেজ একবার দেখছে, তো একবার মেহরীনের দিকে তাকাচ্ছে তাহিয়া। দুজনের চোখাচোখিতে একটু দুশ্চিন্তা খেলে যায়।
মেহরীন ঠোঁট উল্টে বলল,
—তোর ভাই কি দিবে?
তাহিয়া গালে হাত দিয়ে একটু ভেবে বলল,
—দিবে না হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর… বাট!
—বাট?
—বাট একবার চান্স নিয়ে দেখতে পারি।
—কিভাবে?
প্রশ্নটা শেষ হতেই তাহিয়া দাঁত বের করে দুষ্টু হাসল। সেই হাসি দেখেই মেহরীন আঁতকে উঠে মাথা ঝাঁকাল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—না না না, আমি পারব না ভাই।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট উল্টে ফেলল,
—প্লিজ বান্ধুবি, তুই ভাইয়ার বউ লাগস। তোর কথা শুনবে শিওর।
মেহরীন কানে হাত দিয়ে ভীত গলায় বলল,
—বাপরে! তোর ভাই যেই চিজ, ধমক দেওয়ার সময় বউ-বইন কিছুই দেখেনা।
কথাটা বলতে না বলতেই তালহার গলা ভেসে আসে,
—আচ্ছা তারপর..?
হঠাৎ তার কণ্ঠে দুজনেই হকচকিয়ে উঠে দরজার দিকে তাকায়। কালো ট্রাউজার আর সাদা টি-শার্ট পরা তালহা দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু’হাত বুকের কাছে গুঁজে রাখা, মুখে সেই চেনা গম্ভীর ভাব। তাকে দেখামাত্রই দুজনের হাওয়া যেন ফুস। ভয়ে ঢোক গিলে দ্রুত মাথা নিচু করে ফেলে দুজনেই। ঘরের ভেতরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠে।
তালহা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ডান হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে টেবিলের মাঝখানে দাঁড়ায়। এক হাত টেবিলের ওপর রেখে হালকা কাত হয়ে মেহরীনের দিকে তাকায়,

—আমি আর কি কি..?
মেহরীন তোতলাতে তোতলাতে মাথা নাড়ায়,
—না না আপনি ক..কিছু না তো…
—তো ধমকাই না কি যেন শুনলাম।
মেহরীন তড়িঘড়ি বলে ওঠে,
—ছি ছি কি বলেন! এ কথা বলতে পারি? আমি তো বললাম আপনি ভীষণ মিষ্টি মানুষ। ত..তাই না তাহিয়া?
তাহিয়াও সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। এরমাঝে তালহা হঠাৎ সামনে রাখা কলমটা তাদের চোখের আড়ালে ইচ্ছাকৃতভাবেই মেহরীনের চেয়ারের পাশে ফেলে দেয়।
পরপর বলে ওঠে,

—অপ্স সরি, দাঁড়াও আমি তুলছি।
বলেই এগিয়ে গিয়ে মেহরীনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে। কলমটা পড়েছে চেয়ারের একেবারে নিচে। তুলতে গিয়ে তালহা আর মেহরীনের দূরত্ব এসে দাঁড়ায় শূন্যের কাছাকাছি। কান বরাবর মুখ নামতেই তালহা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
—মিষ্টিমুখ তো এখনো করালামই না। তার আগেই মিষ্টি লাগা শুরু হয়েছে, ইন্টারেস্টিং।
কানে কথাটা পড়তেই মেহরীন যেন একদম সোজা হয়ে গেছে। শরীরটা যেন পাথর হয়ে গেছে। কানের পাশ দিয়ে তালহার উষ্ণ নিশ্বাস বয়ে যাওয়ায় তার শ্বাস-প্রশ্বাসই যেন থমকে দিয়েছে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা হঠাৎই এমন মাত্রায় বেড়েছে যে নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে।
এক মুহূর্তেই লজ্জায় ভেঙে পড়ে মেহরীন। মাথা নিচু করে টেবিলে হাত চেপে বসে থাকে। তালহা দিনদিন যেন লাগামছাড়া হয়ে উঠছে, এই ভাবনাটাই তাকে আরও অস্থির করে তোলে।
ইতিমধ্যে তালহা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। কলমটা টেবিলে রেখে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে। দুজনকে পর্যবেক্ষণ করে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে,

—কি বলতে একজন আরেকজনকে গুতোচ্ছিলি?
তাহিয়া মিনমিনিয়ে মেহরীনের দিকে তাকায়,
—মেহু বলবে…
মেহরীন তখনো লজ্জায় গুটিয়ে আছে। তবু তাহিয়ার কথায় মাথা তুলে আঙুল বাড়িয়ে তাহিয়ার দিকেই ঠেলে দেয় দায়টা,
—না, ও বলবে।
সঙ্গে সঙ্গে তালহা ধমক দিয়ে ওঠে,
—শাট আপ স্টুপিডস, একে ওকে না ঠেলে নিজে বললে বল।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট উল্টে ফেলে,
—আপনি এখনই যেভাবে ধমকাচ্ছেন, বললে হয়তো আরও ঝাড়ি দিবেন।
তালহা মৃদু হেসে বলে,

—আচ্ছা ধমকাবো না, বলো।
তাহিয়া এবার বলে উঠল,
—ভাইয়া আজ তো আমাদের শেষ পরীক্ষা..
তালহা কপাল কুঁচকে বলল,
—কলেজের শেষ পরীক্ষা না প্রথমবর্ষের সাময়িক পরীক্ষার শেষ পরীক্ষা।
—ওই একই হলো। এতেও আমরা খুশি। তো সেই খুশিতে তোমার উচিত না আমাদের একটা কথা শোনা?
বলেই ইনোসেন্ট মুখ করে ভাইয়ের দিকে তাকায়। চোখ দুটো এমনভাবে গোল করেছে, যেন এই দৃষ্টিতে না গললে অপরাধ হবে।
তালহা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল,

—ভঙ্গি না ধরে, মতলব কি তা বল। আমি আম্মু না যে তোর ফেসিয়াল রিয়েকশন দেখেই গলে যাবো।
ভাইয়ের কথায় তাহিয়া এবার মুখ ফুলিয়ে ফেলে। গাল দুটো এমনভাবে ফুলিয়েছে যেন বাতাস ভরে রাখা বেলুন।
—যাও কথা বলবে না। আম্মু ছাড়া আর কেউ আমাকে ভালোবাসে না।
তালহা তাহিয়ার ফোলা গালে জুড়ে একটা গুতো দিয়ে বলল,
—নাটকবাজ, নাটক কম কর।
—তাহলে বলো আমার কথা রাখবে?
—আগে শুনি তারপর।
—না না ও ভাইয়া প্লিজ, ভালো কথাই বলল। বলো রাজি তুমি।
—আজব! আগে শুনি তো, তারপর রাজি কিনা বলব।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের হাত আঁকড়ে ধরে,

—ভাইয়া প্লিজ না করোনা। আমি তোমার থেকে এই তিন মাসে কিচ্ছুটি চাইনি। এই কথাটা রাখবে বলো বলো..
বোনের এই আকুতিমিনতিতে তালহা স্পষ্টই বিরক্ত হয়ে উঠে। একসময় ঝাড়ি মেরে উঠে,
—চুপ, রাখব। তোর কথা রাখব, তবে যদি ভালো কথা হয়। বল এবার…
তাহিয়া একবার মেহরীনের দিকে তাকায়। মেয়েটা ডান হাতের নখ কামড়াচ্ছে, টেনশনে ঠোঁটের রঙ ফ্যাকাসে। গলা খাঁকারি দিয়ে তাহিয়া বলল,
—আজ ছুটির সময় আমাদের একা আসতে দিবে?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে রাগী চোখে তাকায় চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে,
—কেনো?
—মানে আমরা সব ফ্রেন্ডসরা একসঙ্গে আসব।

কয়েক সেকেন্ড তালহা চুপচাপ বসে থাকে। ঘরের ভেতর নিঃশব্দ চাপা উত্তেজনা। মেহরীন আর তাহিয়া দুজনেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হঠাৎ তালহার ঠোঁট নড়ে ওঠে। দুজনের মুখে একচিলতে আশার আলো ফুটে ওঠে, এই বুঝি রাজি হয়ে গেল। কিন্তু পরের কথাটা শুনেই সেই আলো নিভে যায়।
—থাপ্পড় কি এখন দিবো? নাকি পরীক্ষা শেষে?
দুজনেই দু’গালে হাত দিয়ে বসে। তালহা উঠে দাঁড়ায়। টেবিলে জোরে হাত রেখে বলে,
—এসব আলতুফালতু ইচ্ছে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পড়ায় মন দে।
নানান জ্ঞান দিয়ে সে চলে যেতেই দুজনেই একসাথে ভেংচি কাটে। পড়া তো আগেই শেষ, এখন আর বইয়ের পাতায় চোখ বসছে না। মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই প্রশ্ন, রাজি করাবে কিভাবে?

—তোর ভাইটা এমন কেনো ঘোড়ার ডিম।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দেয়,
—তোর জামাইটা এমন কেন ঘোড়ার ডিম।
মেহরীন আড়চোখে তাকিয়ে সাবধান করে,
—এই খবরদার আমার জামাই নিয়ে কথা বলবি না।
তাহিয়াও একচুল ছাড়ে না,
—তুইও খবরদার আমার ভাই নিয়ে কথা বলবি না।
কিছু মুহূর্তের টানটান নীরবতা।
মেহরীন বিছানায় শুয়ে পড়ে। তাহিয়া পাশ থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। মেহরীন ভেবে ভেবে বলে,

—তোর ভাই, আমার জামাই, দুইটাই তো একই মানুষ। ঘটনা হলো চুলাচুলি না করে আগে আইডিয়া বের করা উচিত।
—হু তাই তো ভাবছি… উমমম আইডিয়া।
হঠাৎ ‘আইডিয়া’ শব্দটা বলে তাহিয়া চেঁচিয়ে উঠতেই মেহরীনও ধরফর করে উঠে বসে। কিছু বোঝার আগেই তাহিয়া মেহরীনের হাত ধরে টানতে টানতে ঘর থেকে বের করে আনে।
উদ্দেশ্য, বড়চাচ্চুর ঘর। মানে বিল্লাল সাহেব।
দরজার সামনে এসেই মেহরীনের পা জমে যায়। ভয়ে ফিসফিস করে বলে,
—এই না না আমি যাবোনা।
—কেনো?
—কেমন যেন লজ্জা লাগে তোর চাচ্চুদের সামনে যেতে। উনারা সব জানেন।
—তোহ কি হইছে? এই ফাইদাই তো নিবো চল।
মেহরীন সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
—মানে?
তাহিয়া শয়তানি হাসি হেসে বলল,
—আরে আগে আসবি তো।

দরজাটা হালকা করে খুলে আগে তাহিয়া উঁকি দেয়। চাচি আছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়াই উদ্দেশ্য। চোখ ঘুরিয়ে পুরো ঘরটা দেখে, না, চাচি নেই। চাচাও নেই ঘরের ভেতরে। অনুমান করতে সময় লাগে না, নিশ্চয়ই বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। এই নিশ্চিত হওয়াতেই সাহস পায় দুজন। চুপিচুপি ঘরে ঢুকে সরাসরি বারান্দার দিকে এগোতেই তার দেখা মিলে।
বিল্লাল সাহেবের চোখ শুরু থেকেই বারান্দার দরজার দিকেই ছিল। পায়ের হালকা আওয়াজে তিনি সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের দেখামাত্র মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে,
—কি খবর মামুনিরা, তোমরা যে কি মনে করে?
তাহিয়া এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। হাসিটা একটু বেশি মিষ্টি, একটু বেশি নিরীহ করে তুলল,
—আসলে বড় আব্বু আমাদের একটা আবদার ছিল।
তিনি মুচকি হেসে পত্রিকাটা ভাঁজ করে পাশে রাখেন।

—তা কি উপলক্ষে আবদার?
—আমাদের লাস্ট এক্সাম আজ সেই উপলক্ষে।
—তা তো বেশ, তা কি আবদার আমার মায়েদের?
এবার মেহরীন আর তাহিয়া একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। চোখে চোখে ইশারা। শেষমেশ তাহিয়াই সাহস করে বলে,
—ভাইয়ার থেকে পার্মিশন নিয়ে দিবে।
বিল্লাল সাহেবের কপাল সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে যায়,
—কিসের পার্মিশন?

—আজ আমরা কলেজ শেষে বন্ধুদের সাথে একটু কলেজের সামনেই একটা পার্ক আছে ওখানে পিকনিক করতে চাচ্ছি৷ কিন্তু ভাইয়া আমাদের একা ছাড়বেই না বলছে।
তিনি চশমাটা ঠিক করে নেন। মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নেয় গম্ভীরতা,
—না না এই পার্মিশন আমিও দিবোনা। দেশের যেই পরিস্থিতি জানো না? রিস্ক নিয়ে ছাড়া সম্ভব না আম্মু। তোমরা মেয়ে মানুষ।
এই না-টাই যেন তাদের আশায় জল ঢেলে দিল। এবার দুজনেই একসাথে অনুনয় শুরু করে। একেকজন একেক দিক থেকে কথার আক্রমণ করছে। কিন্তু বিল্লাল সাহেব নড়েন না।

—আমি জানিনা বাপু, তোমার ভাইকে এই কথা বললে উল্টো আমাকে ঝারবে।
—না না বড় আব্বু তোমার কথা ভাইয়া শুনে প্লিজজজ।
—না এইটা শুনবে না।
বারবার না শুনে তাহিয়া এবার নাটক শুরু করল। কণ্ঠে অভিমান, মুখে হতাশা নিয়ে বিলাপ শুরু করল,
—ছিহ বড় আব্বু ছিহ এই বুঝি তুমি চাচা শশুড়।
বলেই হঠাৎ মেহরীনের হাত ধরে তাকে সামনে টেনে আনে।
—তোমার ছেলের বউ সামান্য একটা কথা বলল তা রাখতে পারলে না ছিহ ছিহহ। আমার একটা মাত্র ভাইয়ের বউয়ের কথা রাখলে না।

তার এসব কথায় মেহরীন তক হতভম্ব। চোখ বড় বড় হয়ে আসে তার। এই মেয়ে এমনটা করবে তা সে কল্পনাও করেনি। এক মুহূর্তে কান পর্যন্ত লাল হয়ে ওঠে তার।
আর বিল্লাল সাহেব? তিনি পুরোপুরি বিপাকে পড়ে যান। একবার দরজার দিকে তাকান, একবার তাদের দিকে। তাহিয়ার বিলাপ থামার নামই নেই। তিনিই গলা নামিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলেন,
—আম্মাজান মুখটা বন্ধ কর কেউ জানলে কুরুক্ষেত্র বাধবে। আমি যাচ্ছি তালহাকে রাজি করাতে।
কথা শেষ করেই হন্তদন্ত পায়ে তিনি তালহার ঘরের দিকে চলে যান। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দুজন কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর একসাথে চিৎকার করে ওঠে, মিশন সাকসেস! খুশিতে দুজনের পা মাটিতে টেকে না। হাসতে হাসতে নিজেদের ঘরের দিকে ছুটে যায়। এখন শুধু একটাই কাজ বাকি, রেডি হওয়া।

নয়টা ত্রিশ বাজে। পরীক্ষা শুরু দশটায়।
করিডোরটা এখনো অর্ধেক ফাঁকা। চারপাশে পরীক্ষার আগের সেই চেনা টেনশন। কেউ বইয়ে মুখ গুঁজে, কেউ শেষবারের মতো নোট উল্টাচ্ছে।
তনিমা আজ একটু তাড়াতাড়িই চলে এসেছে। বাকিদের কাউকেই এখনো দেখা যায়নি। তাই একা একাই করিডোর জুড়ে হাঁটাহাঁটি করছে।

একবার নিচে নামছে, আবার উপরে উঠছে।
চোখ বারবার চলে যাচ্ছে মেইন গেইটের দিকে, কে কখন আসে সেই অপেক্ষা।
এই হাঁটাহাঁটির মাঝেই সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে হঠাৎ সামনে পড়ে যায় তাহসান। হাতে প্রশ্নপত্রের খাম। উপরের দিকে উঠছে। দুজনের মুখোমুখি হতেই তনিমা কিছুটা থতমত খেয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। মাথার ভেতর যেন হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে ওঠে। কিছু না ভেবেই এক সেকেন্ডের মধ্যে স্কাউটের মতো সোজা হয়ে হাত কপালে দাঁড়িয়ে সালাম দিতে যায়,

—আসসালামু আলাইকুম স্যাআয়ায়ায়ায়া..
সালাম শেষ হওয়ার আগেই ভুল স্টেপ। বেসামাল পা পড়ে যায় ফাঁকা জায়গায়। অমনি শরীর সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে নেয়। তা দেখে তাহসান ঝটপট সামনে হাত বাড়ায়। দ্রুত তনিমার দুবাহু শক্ত করে ধরে ফেলে। যাতে পড়ে না যায়। আর তনিমা? সে আঁকড়ে ধরে তাহসানের কলার।
এক সেকেন্ডের জন্য দুজনই থমকে যায়। তনিমার চোখমুখ শক্ত করে বন্ধ। ভয়ে কুঁচকে আছে। মুখে বিরবির করে কিছু বলছে। তাহসান একপলক তাকায় তনিমার দিকে। কিন্তু কি বলছে সেইসব শোনার কোনো আগ্রহ নেই তার।
সে সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে এক রামধমক দিয়ে বসল,

—স্টুপিড কোথাকার কি করছিলে? এখন যদি পরতে?
ধমক শুনে তনিমা চোখ বন্ধ অবস্থাতেই কেঁপে উঠে। কিন্তু কথা শুনে বুঝে যায়, সে পড়েনি সেইফ আছে। তারপর পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই দেখে তাহসানের লাল চোখ। ভয় আর নার্ভাসনেস মিলিয়ে জোর করে হেসে ওঠে। বোকা বোকা হাসি দিয়ে বলে,
—ইয়ে মানে আপনাকে সালাম দিচ্ছিলাম।
তাহসানের রাগ যেন তখন সপ্তম আকাশে। সেদিন তাকে দেখেও সালাম দেয়নি আর আজ কিনা এমন সালাম দিতে নিয়েছে যে পড়েই যেত

—এটা কি সালাম ছিল?
তনিমা দাঁত কেলিয়ে নির্দোষ ভঙ্গিতে বলল,
—এটা সম্মানজনক সালাম। ওইদিন বলেছিলেন না টিচার্স রা মা-বাবার মতো সম্মানি হয়, তাদের সালাম করতে শিখো বলে ঝেরেছিলেন না? তাই জন্যই আজ একদম মন মতো সালাম দিতে গেলাম, কিন্তু হলোই না। ওয়েট দাড়ান…
নিজের মতো বকবক করেই যাচ্ছে। তাহসানের কোনো কথা শোনার প্রয়োজনই মনে করল না। কথার মাঝে তাকে থামিয়ে হঠাৎ সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে দাঁড়ায়।
তাহসান জায়গায় দাঁড়িয়ে একদম হতভম্ব হয়ে মেয়েটার কাণ্ডকর্ম দেখছে। এর মধ্যেই তনিমা বুক ফুলিয়ে, একেবারে স্কাউট স্টাইলে হাত পা করে চেঁচিয়ে সালাম দেয়,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৯

—আসসালামু আলাইকুমমম স্যাআয়ায়ায়ার।
তাহসান সঙ্গে সঙ্গে কানে হাত দেয়। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। কয়েক সেকেন্ড কটমট চোখে চেয়ে সালামের কোনো জবাব না দিয়েই ধপধপ করে উঠে তনিমাকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলে যায়,
—তোমার পরিবারকে বলবে তোমার ট্রিটমেন্ট এর দরকার। মাথার তারে সমস্যা আছে, বেয়াদব মেয়ে।
তনিমা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে চেয়ে থাকে তাহসানের চলে যাওয়ার পানে। তারপর কোমড়ে হাত দিয়ে মাথা চুলকে নিজেই নিজেকে বলে,
—যাহ বাবা সম্মান করলেও দোষ না করলেও দোষ। যাবো কোনদিকে?

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪১