Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩০

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩০

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩০
আয়াত বিনতে নূর

ধরণীতে নতুন এক সকালের শুরু হলো।
ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারকে সরিয়ে দিচ্ছে। চারদিকে পাখিদের কিচিরমিচিরে ভরে উঠেছে আকাশ-বাতাস। দূরে কোথাও আজানের শেষ সুর ভেসে আসছে, আবার তার সাথে মিশে যাচ্ছে ঢাকা শহরের চিরচেনা গাড়ির শব্দ—হর্ন, ব্রেকের কড়কড়ানি, ব্যস্ত মানুষের পায়ের শব্দ।
শহর জেগে উঠেছে তার নিজের নিয়মে। কেউ অফিসের তাড়া নিয়ে ছুটছে, কেউ স্কুলের ব্যাগ কাঁধে তুলে নিচ্ছে, কেউ আবার দোকানের ঝাঁপ তুলছে নতুন দিনের আশায়।
এই ব্যস্ততার মাঝেও চৌধুরী ভিলার ভেতরটা যেন একটু আলাদা।
যেন সময় এখানে একটু ধীরে চলে।

ভিলার বড় কাচের জানালা দিয়ে সকালের সূর্যের আলো ঢুকে পড়েছে ঘরে। সোনালি সেই আলো বিছানার সাদা চাদরের ওপর পড়তেই ঘরটা আরও উষ্ণ হয়ে উঠলো। ফারিস ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙা চোখে চারদিকে তাকালো। মাথাটা এখনও একটু ভারী, রাতের ক্লান্তি পুরো কাটেনি। কিছুক্ষণ সে শুধু শুয়েই রইলো—চেনা ঘরের পরিচিত ছাদ, জানালার পর্দার নড়াচড়া, দূরে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো ঢোকার দৃশ্য।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তারপর হঠাৎই তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো তার বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা নীলাম্বরীর দিকে—নিশিতা।
নিশিতার মুখটা শান্ত, চোখ দুটো বন্ধ, নিঃশ্বাসটা নিয়মিত ওঠানামা করছে। ঘুমের মধ্যে আদরে বিড়াল ছানার মতো গুটিসুটি মেরে ফারিসের বুকে শুয়ে আছে সে। তার চুলের কয়েকগোছা এসে ফারিসের বুকের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। সকালের আলোতে নিশিতার মুখটা আরও কোমল লাগছে, আরও আপন।
ফারিস মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। কোনো তাড়া নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই—এই কয়েকটা মুহূর্ত সে শুধু এই দৃশ্যটুকুই দেখতে চায়। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠলো।

যে ফারিসকে সবাই চিনতো গম্ভীর, রাগী, সবসময় দায়িত্ব আর কাজের ভারে চাপা একজন মানুষ হিসেবে—সেই ফারিসই এখন নিশিতার মুখের দিকে তাকিয়ে হুটহাট নিজেই হেসে ফেলছে। কখনো কখনো নিজেই অবাক হয়ে যায় সে। এই পরিবর্তনটা কবে, কীভাবে হলো—তা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না।
তার নিজেরই বিশ্বাস হয় না, এতোটুকু একটা মেয়ে তার জীবনের সবকিছু হয়ে গেছে। আগে যেখানে দিন শুরু হতো মিটিং, ফাইল, ডিল আর হিসাব-নিকাশ দিয়ে—এখন সেখানে দিন শুরু হয় নিশিতার ঘুমন্ত মুখ দেখে। আগে জীবনে “আমি” ছিল সবচেয়ে বড় শব্দ, এখন সেখানে “আমরা” এসে জায়গা করে নিয়েছে।

ফারিস মনে মনে ভাবলো—তাকে ছাড়া বাঁচার কথা সে কল্পনাও করতে পারবে না। ভাবলেই বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হয়। কী অদ্ভুত মায়া! এতোটুকু একটা মেয়ের ওপর এমন গভীর টান!
কি আদুরে মাখা চেহারা! দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। শুধু চোখের দিকে তাকালেই মনটা নরম হয়ে যায়।
ফারিস খুব সাবধানে নিশিতার কপাল থেকে চুলের গোছাটা সরিয়ে দিলো, যেন তার ঘুম না ভাঙে। নিশিতা একটু নড়েচড়ে আরও কাছে সরে এলো, হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো ফারিসের শার্ট। এই ছোট্ট নড়াচড়ায় ফারিসের বুকের ভেতর কেমন একটা প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়লো।

এই শান্ত মুহূর্তের মাঝেই ফারিসের চোখ চলে গেলো দেওয়াল ঘড়ির দিকে। ঘড়ির কাঁটা জানালো—৭টা বেজে গেছে। এক মুহূর্তের জন্য বাস্তবে আবার ফিরে এলো। অফিস, দায়িত্ব, বাইরের দুনিয়া—সবকিছু আবার ডাকছে তাকে। হঠাৎ করেই ফারিসের মনে একটা অস্বস্তি ঢুকে পড়লো। এই সময়টায় বাড়ির সবাই হয়তো জেগে উঠেছে। মা, কাজের লোক—কেউ না কেউ নিশ্চয়ই চলাফেরা শুরু করেছে। এই অবস্থায় যদি কেউ হুট করে ঘরে ঢুকে পড়ে, কিংবা নিশিতাকে তার এমন কাছে দেখে—তাহলে অযথা ঝামেলা তৈরি হবে।

এসব ভেবেই ফারিস ধীরে ধীরে নিশিতাকে নিজের উপর থেকে উঠানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু নিশিতা যেন ঠিক উল্টোটা করলো। ঘুমের মধ্যেই সে আরও শক্ত করে ফারিসকে জড়িয়ে ধরলো। ছোট্ট নাকটা ফারিসের উন্মুক্ত বুকে ঘষে আবার আরাম করে শুয়ে পড়লো। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ফারিসের বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। যেন ঘুমের মাঝেও সে বুঝে গেছে—এই বুকটাই তার নিরাপদ জায়গা।
ফারিস নিশিতার এই কাণ্ডে আপন মনে একটু হেসে ফেললো। কী যে মায়া এই মেয়েটার! ঘুমের মধ্যেও এমন করে আঁকড়ে ধরে থাকে।

আর দেরি না করে সে খুব সাবধানে নিশিতাকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে নিলো। তারপর তাকে বিছানার সাথে চেপে ধরে পাশে শুয়ে পড়লো, যেন সে নড়াচড়া না করে আবার ঘুমাতে পারে।
ফারিস ধীরে করে নিশিতার গলায় মুখ গুঁজে নিলো। কণ্ঠটা নরম করে বলল—
“ঘুম উঠুন আমার পিচ্চি বউ… সকাল হয়ে গেছে। কলেজে যাবেন তো, নাকি?”
নিশিতা চোখ না খুলেই একটু বিরক্ত ভঙ্গিতে মুখ বাঁকালো। গলায় ঘুমঘুম স্বর—
“আমাকে ঘুমাতে দিন ফারিস ভাই। এমনিতেই কালকে আমাকে ঠিক মতো ঘুমাতে দেননি।”
তার এই কথায় ফারিসের ঠোঁটে আবারও হাসি ফুটে উঠলো। ফারিস নিশিতার আরও কাছে এসে, আদরের সুরে বলল—

“আচ্ছা, তাহলে এখন একটু আদর করি? আজ কলেজে যেতেই হবে না।”
এই বলে সে দুষ্টুমি করে নিশিতার গলায় হালকা করে কামড়ে দিলো, সঙ্গে সঙ্গে হাসির শব্দ।
নিশিতা হঠাৎ ব্যথা পেয়ে চমকে উঠলো। চোখ খুলেই তড়িঘড়ি করে ফারিসকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিলো।
“এই! কি করছেন আপনি!”
বিরক্তি আর লজ্জা মেশানো স্বরে বলে উঠলো সে।
ফারিসও বুঝে গেলো—এবার আর দুষ্টুমি বাড়ানো ঠিক হবে না। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে বসল। মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের শার্টটা তুলে নিলো। ধীরে ধীরে শার্ট পরতে পরতে একবার পেছনে তাকালো। নিশিতা তখনও বিছানায় বসে আছে। এলোমেলো চুল, আধখোলা চোখ, গালে হালকা লালচে ভাব—ঘুম ভাঙা সেই মুখটা ফারিসের চোখে অদ্ভুত সুন্দর লাগলো।
ফারিস মনে মনে ভাবলো—

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। বাইরের দুনিয়ার সব দায়িত্ব, সব কঠিন বাস্তবতা—এই ঘরটার দরজার বাইরে রেখে সে এখানেই বারবার ফিরে আসতে চায়।
নিশিতার ভেতরটা কেমন জানো অদ্ভুত লজ্জায় ভরে উঠলো। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে। সে আর ফারিসের দিকে তাকাতে পারলো না। তাড়াতাড়ি নিজের গা চাদর দিয়ে মুড়িয়ে নিলো, যেন এই সামান্য কাপড়টুকুই তাকে লজ্জার আড়াল দিতে পারে। চাদরের ভেতর থেকেও তার কান দুটো লাল হয়ে উঠেছে—এটা সে নিজেও টের পাচ্ছে।

ফারিস সবটাই বুঝতে পারলো। নিশিতার এই হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া, মুখ লুকিয়ে নেওয়া—সবকিছুই তার চোখ এড়ালো না। সে ঠোঁট কামড়ে হালকা করে হেসে ফেললো। সেই হাসিতে দুষ্টুমি আছে, আবার আদরও আছে।
“এখন লজ্জা পেয়ে কী আর হবে, বউ?”
একটু খুনসুটি ভরা স্বরে বলল ফারিস।
“যা হওয়ার, আর যা দেখার—সব তো আগেই দেখে নিয়েছি।”

ফারিসের এই লাগামছাড়া কথায় নিশিতা আরও বেশি লজ্জা পেয়ে গেলো। চাদরের ভেতর থেকেই মুখটা লুকিয়ে ফেললো সে। গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। এত লজ্জায় তার গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হলো না। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে যদি চাদরের ভেতরেই মিশে যেতে পারতো!
ফারিস আবারও কথা বলল, এবার কণ্ঠটা একটু নরম করে—
“আচ্ছা, এখন লজ্জা না পেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। কলেজে যাবি না কি?”
এই কথাটা শুনতেই নিশিতার মাথায় হঠাৎ করে একটা ঝাঁকুনি লাগলো। কলেজ! এক মুহূর্তে সব লজ্জা, সব সংকোচ যেন হাওয়ায় উড়ে গেলো।

“আল্লাহ! আজ তো কলেজ আছে!”
মনে মনে বলে উঠলো সে।
এক সেকেন্ডও দেরি না করে নিশিতা চাদর সরিয়ে তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে পড়লো। এতক্ষণ যে মেয়েটা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে বসে ছিল, সেই মেয়েটাই এখন একেবারে অন্য মানুষ। সে ঝটপট হাতের কাছে থাকা টাওয়ালটা তুলে নিলো। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে তখনও ঘুমের ছাপ, কিন্তু ভেতরে তীব্র ব্যস্ততা। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
এই দৃশ্য দেখে ফারিস একেবারেই অবাক। একটু আগেও যে মেয়েটা লজ্জায় লাল হয়ে বসে ছিল, কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না—সে এখন এমনভাবে দৌড়ঝাঁপ করছে যেন কিছুই হয়নি! ফারিস নিজের মনেই হাসলো।
“এই হলো নিশিতা,” মনে মনে ভাবলো সে।
ঠিক তখনই ফারিস পিছন থেকে ডাকলো—

“নিশিতা!”
নিশিতা দরজার সামনে গিয়েই থেমে গেলো। হাতে টাওয়াল ধরা অবস্থায় সে পিছনে ফিরে তাকালো। চোখে প্রশ্নভরা দৃষ্টি—
“কি?”
ফারিস বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল—
“টেবিলের উপর ওষুধ রাখা আছে। খেয়ে নিবি।”
এই কথার মানে নিশিতা ঠিকই বুঝতে পারলো। তার মুখে এক মুহূর্তের জন্য লাজুক ছায়া আবার ফিরে এলো। সে চোখ নামিয়ে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে আবার ঘুরে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।
ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ফারিস একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। সে জানে—এই মেয়েটা বাইরে যতই লাজুক হোক না কেন, ভিতরে ভিতরে কতটা সরল আর কতটা আপন।

ফারিস জানালার দিকে তাকালো। বাইরে সকালটা পুরোপুরি জেগে উঠেছে। আর তার জীবনের ভেতর—নিশিতাকে ঘিরেই যেন প্রতিটা সকাল, প্রতিটা ব্যস্ততা, প্রতিটা ভাবনা নতুন রঙে রাঙা।
ফারিস হাতে নিজের স্যুটটা তুলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। দরজাটা ধীরে বন্ধ করলো সে, যেন ভেতরের কোনো শব্দ বাইরে না যায়। করিডোরে পা দিতেই তার ভাবনায় ছিল দিনের কাজ, মিটিং—সব মিলিয়ে একটা দায়িত্বের চাপ।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলো রিয়া।

উপরের লিভিং এরিয়ায় পা রেখেই রিয়ার চোখ আটকে গেলো এক জায়গায়। সে দেখলো—ফারিস নিশিতার রুম থেকেই বের হচ্ছে! মুহূর্তের মধ্যে রিয়া যেন আকাশ থেকে পড়লো। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো, মুখে কথা নেই। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
মাথার ভেতর দিয়ে হাজারটা প্রশ্ন একসাথে ছুটে গেলো। ভাইয়া নিশির রুমে? সকালে?
কেন?

রিয়ার বুকের ভেতর হঠাৎ করে একটা ধাক্কা লাগলো। সে কিছু না বললেও তার মুখের ভাবটাই সব বলে দিচ্ছিল। ফারিস রিয়ার দিকে তাকিয়ে একটু থমকে গেলো, বুঝতে পারলো—দৃশ্যটা ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছু বলার সুযোগও নেই, সময়ও নেই। ফারিস শুধু স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে এগিয়ে চলে গেলো।
রিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড।
মনে মনে বলল,
“ভাইয়া নিশির রুমে কেন গিয়েছিলো?”
এর মধ্যেই ভেতরে ভেতরে তার কৌতূহল আর অস্থিরতা আরও বেড়ে গেলো।

এদিকে নিশিতা শাওয়ার শেষ করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। গরম পানির স্পর্শে তার শরীরটা হালকা আর মনটা একটু ফুরফুরে লাগছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেজা চুলের দিকে তাকালো। তারপর আলমারি খুলে হালকা গোলাপি রঙের একটা সুতির জামা বের করলো। সঙ্গে সাদা ওড়না আর পায়জামা।
ধীরে ধীরে পোশাক পরলো সে।
আরামদায়ক কাপড়ের স্পর্শে শরীরটা যেন আরও স্বস্তি পেলো। কোমর ছাড়ানো লম্বা চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে পেঁচিয়ে নিলো, যেন জল ঝরে মেঝে ভিজে না যায়। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থামলো নিশিতা—মুখটা এখন শান্ত, কিন্তু চোখে লাজুক একটা ছায়া এখনও রয়ে গেছে।
তারপর চোখ চলে গেলো টেবিলের দিকে।

টেবিলের ওপর রাখা ওষুধগুলো দেখেই সে বুঝে গেলো ফারিস কেন রেখে গেছে।
কাছে গিয়ে ভালো করে তাকালো—একটা পেইন কিলার। নিশিতা আর কিছু না ভেবে চুপচাপ ওষুধটা হাতে নিলো। পাশে রাখা পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে ওষুধটা খেয়ে ফেললো।
একটা অদ্ভুত যত্নের অনুভূতি বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়লো তার। কথায় কথায় যতই দুষ্টুমি করুক না কেন, ফারিস যে সবসময় খেয়াল রাখে—এটা নিশিতা খুব ভালো করেই জানে।

ওষুধ খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রেখে সে জানালার দিকে তাকালো। বাইরে সকালটা পুরোপুরি আলোয় ভরে গেছে।
এদিকে রিয়া ধীরে ধীরে নিশিতার ঘরের দিকে এলো। দরজার শব্দে নিশিতা চমকে উঠলো। সামনে তাকাতেই রিয়াকে দেখে তার ভেতরটা কেমন জানো কেঁপে উঠলো। মুখে স্বাভাবিক ভাব আনার চেষ্টা করলেও চোখে-মুখে এক ধরনের বিব্রত ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠলো। নিশিতার মাথার ভেতর তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—
একটু আগেই ফারিস ভাই তো এই রুম থেকেই বের হলো? রিয়া কি দেখে ফেলেছে? কিছু বুঝে গেল নাকি?
এই ভাবনাগুলো তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ তুলে দিলো। নিশিতার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলেও সে সেটা আড়াল করার চেষ্টা করলো। চুল ঠিক করার ভান করলো, ওড়নাটা গুছিয়ে নিলো—যেন সবকিছু একদম স্বাভাবিক।

রিয়া ঘরের ভেতরে ঢুকে নিশিতার সামনে এসে দাঁড়ালো। তার চোখে কৌতূহল, সঙ্গে একটু অবাক ভাবও লুকানো নেই। সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো সে—
“ভাইয়া তোর রুমে কী করছিলো নিশি?”
এই প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথেই নিশিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। মনে হলো, হৃদপিণ্ডটা বুঝি মুখ দিয়ে বের হয়ে আসবে। ঠিক যে ভয়টা সে এতক্ষণ মনে মনে পাচ্ছিলো—সেটাই সত্যি হয়ে গেলো।
মাথার ভেতর শূন্যতা নেমে এলো।

“কী বলবে? কীভাবে বলবে?”
এক মুহূর্তের জন্য সে কিছুই ভেবে পেলো না। চোখ দুটো অস্থির হয়ে উঠলো। তবুও নিজের সব সাহস
একত্র করে রিয়ার দিকে তাকালো নিশিতা।
হালকা গলায় বলল—
“ওনি… ওনার স্যুটটা মনে হয় আমার রুমে ফেলে চলে গিয়েছিলেন। ওইটা নিতে এসেছিলেন।”
তারপর একটু থেমে আবারও বলতে শুরু
করলো—
“আমি ঠিক জানি না। তখন সাওয়ার নিচ্ছিলাম।”
কথাগুলো বলার সময় নিশিতার গলা একটু কেঁপে উঠেছিলো, যদিও সে প্রাণপণে সেটা লুকানোর চেষ্টা করছিলো। চোখ নামিয়ে রাখলো, যেন রিয়া তার চোখের ভেতরের সত্যটা পড়ে ফেলতে না পারে।
রিয়া কিছু একটা বলতে যাবে—এমন ভাব করতেই নিশিতার ভয় আরও বেড়ে গেলো। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে তাড়াতাড়ি কথার মোড় ঘুরিয়ে দিলো—

“আর জেরা করিস না তো,”
নিশিতা একটু রাগের ভান করে বলল।
“যা, গিয়ে রেডি হ। আমিও রেডি হয়ে নিচে আসছি। ভুলে গেছিস নাকি—আজ কলেজ যেতে হবে আমাদের?”
রিয়ার মুখে হালকা একটা সন্দেহের ছায়া ফুটে উঠলো। মনে মনে সে বিষয়টা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলো না। ভাইয়ার নিশির রুমে যাওয়া—ব্যাপারটা তার কাছে একটু অস্বাভাবিকই লাগছিলো। কিন্তু নিশিতার আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তায় আর কিছু বললো না রিয়া।
একটু থেমে বলল—

“ও হ্যাঁ… ঠিকই তো।”
তারপর হালকা হাসি দিয়ে বলে উঠে —
“আচ্ছা, আমি রেডি হয়ে আসি।”
এই কথা বলে রিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
দরজাটা বন্ধ হতেই নিশিতা যেন পুরো শরীরের ভার ছেড়ে দিলো। এতক্ষণ যে নিশ্বাসটা সে আটকে রেখেছিল, সেটা এবার জোরে ছাড়লো। বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো। এক হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে নিজেকেই বলল—
“জোর বাঁচান বেঁচে গেছি!”
তারপর হালকা বিরক্তি আর অসহায়তার সুরে ফিসফিস করে যোগ করলো—
“ওই লোকটার জন্য যে আর কত মিথ্যা বলতে হবে!”
নিশিতা জানালার দিকে তাকালো। বাইরে রোদের আলো ঝলমল করছে। কিন্তু তার মনে তখন অন্যরকম আলো-আঁধারির খেলা চলছে—ভালোবাসার সাথে সাথে ভয়, লজ্জার সাথে সাথে মিথ্যার ভার।

তারপর আর দেরি না করে নিশিতা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ভেজা চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে ভালো করে শুঁকাতে লাগলো। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো—চোখের নিচে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু মুখে এক ধরনের লাজুক উজ্জ্বলতা। চুল শুকিয়ে নিয়ে সে সুন্দর করে ক্লিপ দিয়ে খোঁপা করে নিলো। খোঁপাটা করতে করতেই তার মনে পড়লো সকালের সেই মুহূর্তগুলো—ফারিসের দুষ্টুমি, নিজের লজ্জা। হালকা একটা হাসি ঠোঁটে ফুটে উঠলো।
তারপর আলমারি থেকে বোরকা বের করলো। ধীরে ধীরে বোরকা পরে হিজাব মাথায় তুললো। হিজাব ঠিক করতে গিয়েই আয়নায় নিজের গলার দিকে চোখ পড়লো। সেই জায়গাটায়—ফারিসের দেওয়া সেই হালকা লাভ বাইট।
এক মুহূর্ত নিশিতা স্থির হয়ে গেলো। তারপর লাজুক একটা হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটে। নিজের কাছেই কেমন জানো লজ্জা লাগলো। মনে হলো, আয়নাটাও যেন তাকে দেখে হাসছে। মাথা ঝাঁকিয়ে এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেললো সে।

“ধুর!”
নিজেকেই মনে মনে বলল।
হালকা করে ঠোঁটে লিপ গ্লস লাগালো। খুব বেশি না—শুধু একটু, যেন মুখটা ফ্রেশ লাগে।
তারপর ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে শুনতে পেলো নিচের ডাইনিং এরিয়ার কোলাহল। টেবিলে সবাই উপস্থিত। নিচে নেমে তাকিয়ে দেখলো—বাড়ির সবাই বসে আছে। শুধু ফারিস আর তনয়া নেই।
নিশিতা মনে মনে ভাবলো,
“হয়তো এখনো রেডি হচ্ছে।”
বেশি কিছু না ভেবে সে রিয়ার পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়লো। রিয়া তার দিকে একবার তাকালো, তারপর আর কিছু বললো না। কিন্তু নিশিতা টের পেলো—রিয়ার চোখে এখনও হালকা কৌতূহল লুকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই আলতাফ চৌধুরী গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন—

“কাল কোথায় ছিলে তোমরা?”
এই প্রশ্নটা শুনেই নিশিতার বুকটা আবার একটু কেঁপে উঠলো। হাতের চামচটা মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না—এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলবে। তবে আগেই বানানো গল্পটাই মনে পড়ে গেলো তার।
নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল—
“আসলে আব্বু…”
একটু থেমে, যেন কথাগুলো ঠিক সাজিয়ে নিচ্ছে—

“ওই দিন আমি হাঁটতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম। খুব ব্যথা করছিল।”
তারপর চোখ নামিয়ে আবার বলে উঠে —
“তাই ফারিস ভাই আমাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল।”
ডাইনিং টেবিলে নীরবতা নেমে এলো। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
নিশিতা সবার দিকে তাকিয়ে বলল—
“আর তারপর হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। খুব জোরে। তাই আমরা আর সেদিন বাড়ি ফিরতে পারিনি।”
কথাগুলো বলার সময় নিশিতার গলা শান্তই ছিল। কোনো অস্থিরতা প্রকাশ পেলো না। তার এই সরল, শান্ত কথায় কেউ আর সন্দেহ করলো না। সবাই যেন স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপারটা মেনে নিলো।
আলতাফ চৌধুরী হালকা মাথা নেড়ে বললেন—

“আচ্ছা।”
নিশিতা মনে মনে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো।
আরেকটা মিথ্যা—নির্বিঘ্নে পেরিয়ে গেলো।
সে জানে না, এইভাবে আর কতদিন সত্য লুকিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে শুধু এটুকুই ভাবছে— আজকের সকালটা যেন কোনো ঝামেলা ছাড়াই শেষ হয়।

কারণ এই বাড়ির কারোরই সাহস নেই—ফারিসকে সরাসরি জিজ্ঞেস করার, তারা ঠিক কোথায় ছিলো।
ফারিস চৌধুরী নামটাই যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল। তার সামনে প্রশ্ন তোলার মতো সাহস, কিংবা সন্দেহ প্রকাশ করার মতো ঔদ্ধত্য—এই পরিবারের খুব কম মানুষেরই আছে। তাই কেউ আর কিছু বলল না। কথাবার্তা থেমে গিয়ে সবাই মনোযোগ দিলো খাওয়ার দিকে। চামচ-প্লেটের শব্দে ডাইনিং টেবিলটা আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠলো।
কিন্তু নীরবতাটা বেশিক্ষণ থাকলো না।
আলতাফ চৌধুরী খানিকটা চিন্তিত কণ্ঠে আবার বললেন—

“আচ্ছা, তনয়া কোথায়? ওকে তো দেখছি না। সকালে এখনো বাড়িতে নামেনি নাকি?”
এই প্রশ্নটা শুনেই আমেনা চৌধুরীর বুকটা কেমন করে উঠলো। চোখে-মুখে হালকা ভয়ের ছাপ ফুটে উঠলো। তিনি একটু থমকে গিয়ে চারদিকে তাকালেন, যেন কথাটা কীভাবে বলবেন ভেবে নিচ্ছেন।
তারপর ধীরে, একটু জড়ানো গলায় বললেন—
“আসলে… তনয়া তিন দিনের জন্য ট্যুরে গেছে।”
একটু থেমে বললেন—
“বাড়ির কাউকে ঠিকমতো বলে যেতে পারেনি।”
এই কথাটা শুনেই আলতাফ চৌধুরীর মুখের রঙ বদলে গেলো। চোখের ভেতর আগুন জ্বলে উঠলো। তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। রেগে উঠে গলা চড়িয়ে চিৎকার করে বললেন—

“বাহ্!”
“বাড়ির মেয়ে বাড়িতে নেই—আর আমরা কিছুই জানি না?”
টেবিলের সবাই চমকে উঠলো। নিশিতা পর্যন্ত চামচ নামিয়ে ফেললো ধীরে।
আলতাফ চৌধুরী রাগে গর্জে উঠলেন—
“তনয়া কি জানে না এই বাড়ির নিয়ম?”
“কারো অনুমতি ছাড়া, কাউকে না জানিয়ে—কিভাবে চলে যায় সে?” “এটা কোনো হোস্টেল না যে যার খুশি আসবে যাবে!”

তার গলার রাগে পুরো ডাইনিং টেবিলটা থমথমে হয়ে গেলো। কেউ কিছু বলার সাহস পেলো না।
আমেনা চৌধুরী একটু আতঙ্কিত হলেও শান্ত থাকার চেষ্টা করলেন।
নরম গলায় বললেন—
“আচ্ছা, যাক না।” “বাচ্চা মানুষ তো। এই বয়সটাই তো একটু মজা করার বয়স।”
তার কণ্ঠে মায়ের স্নেহ স্পষ্ট—
“এখন না করলে আর কখন করবে?”
“এত রেগে যাচ্ছো কেন?”
কথাগুলো শুনেও আলতাফ চৌধুরীর রাগ কমলো না। তিনি ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
এইদিকে আরাফাত চৌধুরি ঠিক তখনই যেন অন্য একটা কথা মনে পড়ে গেলো তার। হঠাৎ করে টেবিলের একপাশে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বললেন—
“আফিয়া, তোমার ছেলে কোথায়?”
“এখনো ঘুম ভাঙেনি নাকি?”
এই প্রশ্নটা শুনে নিশিতার বুকটা আবার হালকা কেঁপে উঠলো।
“ফারিস”

সে চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। জানে না, এই প্রশ্নের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে। ডাইনিং টেবিলের বাতাসটা আবার ভারী হয়ে উঠলো—যেন কোনো অদৃশ্য ঝড় আসার আগের নীরবতা। আর এই পরিবারের ভেতরে, অজান্তেই—একটার পর একটা প্রশ্ন জমতে শুরু করেছে,
যেগুলোর উত্তর কেউ এখনো দিতে প্রস্তুত।
আফিয়া চৌধুরী খানিকটা ভেবে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন—
“কালকে তো মনে হয় রাত করে বাড়ি ফিরেছে।”
“তাই হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে।”

তারপর টেবিলের একপাশে বসে থাকা রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“রিয়া, তুই গিয়ে একটু দেখে আস তো। ফারিস উঠেছে কি না।”
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে ফেললো। মুখে একরাশ অনীহা আর ভয়—
“না মা, আমি যাবো না ভাইয়ার ঘরে।”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট অস্বস্তি।
“ভাইয়ার ঘরে আমি ঢুকবো না।”
রিয়ার এই স্পষ্ট না-সূচক উত্তর শুনে আফিয়া চৌধুরী আর জোর করলেন না। তিনি এবার দৃষ্টি ফেরালেন নিশিতার দিকে। কণ্ঠটা একটু নরম করে বললেন—
“তাহলে নিশি মা, তুমি একটু গিয়ে ফারিসকে ডেকে আন।” “ছেলেটা তো কিছু খায়নি এখনো।”
এই কথা শুনে নিশিতার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেঁপে উঠলো। হাতের আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে গেলো। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠলো—

“তুমি রিয়াকে বলো না বড় আম্মু।”
“আমি যাবো না।”
নিশিতার কণ্ঠে অনুরোধ আর অস্বস্তি—দুটোই স্পষ্ট।
কিন্তু নিশিতার এই কথায় রিয়া যেন সুযোগ পেয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে বলল—
“নাহ্, আমি যাবো না। তুই যা।” “আম্মু তো তোকে যেতে বলেছে, আমাকে না।”
তারপর একটু গলা নামিয়ে যোগ করলো—
“তুই তো জানিস ভাইয়াকে কত ভয় পাই আমি।”
নিশিতা কিছু বলতে যাবে—ঠিক তখনই আফিয়া চৌধুরী আবার কথা বললেন। এবার কণ্ঠে হালকা চাপ, কিন্তু তাতে মায়ার ছোঁয়াও আছে—

“যা একটু মা।” “ডেকে আন, খাওয়াটা না খেয়ে অফিসে চলে যাবে আবার।”
এই কথার পর নিশিতার আর কিছু বলার সুযোগ থাকলো না। পুরো টেবিলের সামনে আর না বলা সম্ভবও ছিল না। সে মাথা নিচু করলো। চোখ নামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়লো।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে সে চেয়ার ঠেলে উঠলো।
কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো নিশিতা। প্রতিটা ধাপ ওঠার সাথে সাথে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। কিছুক্ষণ আগেই যেখানে সে ফারিসের সামনে লজ্জায় চোখ তুলতে পারছিল না—এখন আবার তাকেই ডাকতে যেতে হচ্ছে। মাথার ভেতর হাজারটা কথা ঘুরছে, কিন্তু কোনোটাই মুখে আনার মতো নয়।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে নিশিতা মনে মনে বলল—

“এই বাড়িতে সবচেয়ে কঠিন কাজটাই বুঝি আমার কপালে পড়ে।”
ফারিসের ঘরের দরজার সামনে এসে সে এক মুহূর্ত থেমে গেলো। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। হাত তুলেও দরজায় নক করতে একটু দেরি হলো। তারপর নিজেকে শক্ত করে নিয়ে ধীরে দরজায় টোকা দিলো। নিচে ডাইনিং টেবিলে কেউ জানে না—এই ছোট্ট ডাকটার ভেতর লুকিয়ে আছে কত লজ্জা, কত ভয় আর কত না বলা কথা।

এদিকে ফারিস জিম রুম থেকে ফিরে এসে একটা লম্বা, ঠান্ডা শাওয়ার নিলো। শরীরটা তখন বেশ ফুরফুরে লাগছে। শাওয়ার শেষে সে শুধু একটা টাওয়াল কোমরে জড়িয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। আরেকটা টাওয়াল হাতে নিয়ে মাথার ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। কাঁধে আর গলায় পানির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে তার ঘরটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
ঠিক এই সময়েই নিশিতা এসে দাঁড়ালো ফারিসের রুমের দরজার সামনে। এক মুহূর্ত সে থেমে গেলো।
নক করবে, না কি একটু অপেক্ষা করবে—এই দ্বিধায় পড়ে গেলো। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করতে লাগলো। ঠিক তখনই ভেতর থেকে ফারিসের কণ্ঠ ভেসে এলো—

“ভিতরে আয় বউ।
তোরি তো রুম।”
নিশিতা তব্দা খেয়ে দরজার সামনে জমে গেলো। চোখ বড় বড় হয়ে গেলো তার।বিড়বিড় করে নিজের সাথেই বলল—
“ফারিস ভাই কী করে জানলো আমি এসেছি?” “এমন কীভাবে সম্ভব?” “উনি আবার কোনো জাদু জানেন নাকি!”
আর বেশি ভাবার সুযোগ পেলো না। সাহস সঞ্চয় করে সে ধীরে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলো।
আর ঢুকেই—হতবাক।

ফারিসকে ওই অবস্থায় দেখে নিশিতার মাথা যেন ঘুরে গেলো। মুখে কথা আটকে গেলো, চোখ দুটো স্থির হয়ে রইলো এক সেকেন্ড। পরক্ষণেই সে তড়িঘড়ি করে চোখ বন্ধ করে নিলো।
দ্রুত পিছন ফিরে বলল—
“তাড়াতাড়ি কিছু পরুন!” “এ কী অবস্থায় আছেন আপনি!”
কণ্ঠে ছিল লজ্জা, ভয় আর অস্বস্তির মিশেল।
কিন্তু ফারিস একদম স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি। সে ক্লজেটের দিকে হেঁটে গেলো। ব্ল্যাক শার্ট আর প্যান্ট বের করে পরতে পরতে হালকা হাসি নিয়ে বলল—
“কি হয়েছে বউ?”“এমন করছিস কেন?”
“তোরি তো বর আমি।”
শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে আবার বলল—
“তাহলে এখনো ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে আছিদ কেন?”
“এইদিকে ঘোর।”

ফারিসের এই নির্ভার কথাগুলো শুনে নিশিতার মনে হলো—সে বুঝি ভুল শুনছে।
এই মানুষটা এমন করে কীভাবে এত স্বাভাবিক থাকতে পারে! নিশিতা চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে রইলো। কান পর্যন্ত গরম হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতরটা কেমন জানো এলোমেলো লাগছে।
একদিকে লজ্জা, অন্যদিকে অজানা এক অস্বস্তি।
মুখ না ফিরিয়েই সে ফিসফিস করে বলল—
“আপনি আগে ঠিক মতো কাপড় পরুন।”
ফারিস তখন শার্ট পরা শেষ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে।
আয়নায় নিশিতার পেছন ফিরে থাকা অবস্থা দেখে তার ঠোঁটে আবারও হালকা হাসি ফুটে উঠলো। সে জানে—এই লজ্জাটুকু ঠিক কতটা মিষ্টি। এইদিকে ফারিস এমন কথা বলবে—এটা নিশিতা কোনোদিন কল্পনাও করেনি। তার মাথার ভেতরটা কেমন জানো ঘুরে উঠলো। লজ্জা আর বিরক্তি একসাথে মিশে গিয়ে সে একটু
রেগেই বলে উঠলো—

“তাড়াতাড়ি কিছু পরুন!”
ফারিস এবার ঠোঁট কামড়ে হালকা করে হেসে
বলল—
“পিছনে ঘুরে দেখ। পড়ে নিয়েছি।”
নিশিতা অল্প অল্প করে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েই মুখ খুললো—
“বড় আম্ম—”
কিন্তু বাকিটুকু আর বলা হলো না।
হঠাৎ করেই ফারিস খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। নিশিতার কোমরে আলতো করে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে টেনে নিলো। সবকিছু এত দ্রুত ঘটলো যে নিশিতা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না কী হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই সে যেন নিজের চারপাশের সবকিছু ভুলে গেলো।

ফারিস হিজাবটা সরিয়ে ধীরে ধীরে তার গলার দিকে মুখ নামালো এবং আলতো করে ঠোঁটের কাছে স্পর্শ করলো। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই সে ছোট ছোট, দ্রুত, হাজারো চুমু দিয়েও যেন নিশিতার ভেতরের সব লজ্জা, সব অস্থিরতা ম্লান করে দিচ্ছে। প্রতিটি চুমু যেন নিখুঁত, মিষ্টি, অদ্ভুতভাবে আবেগে ভরা। নিশিতার হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেলো, চোখ কিছুক্ষণ বন্ধ হয়ে গেলো—মুহূর্তটা এত ঘনিষ্ঠ আর তীব্র যে সময় যেন থেমে গেছে।
একটু পরে ফারিস ধীরে ধীরে নিশিতার গলা থেকে মুখ তুলল। নিশিতার চোখ খোলা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় সে ঠোঁটে আলতো করে শুঁকনো চুমু দিলো। চুমুটার স্পর্শে নিশিতার ভেতরের সব কাঁপুনি আর লাজুকতা একসাথে ফুটে উঠলো, মৃদু উত্তেজনা আর অজানা অনুভূতির মিশ্রণে।

নিশিতার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো। সে অবচেতনভাবে ফারিসের বুকে হাত রাখলো, যেন নিজেকে সামলাতে চায়। তার ভেতরটা কাঁপছে—লজ্জা, ভয় আর অজানা এক অনুভূতিতে। নিশিতা লজ্জায় মাথা নিচু করল, ঠোঁট কম্পিত, ভেতরের উত্তেজনা আর লজ্জা মিশে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হলো।
ফারিস তাকে ছেড়ে দিলো না, তবে তার আচরণে ছিল না কোনো কঠোরতা—বরং এক ধরনের গভীর আবেগ। সে নিশিতার কানের কাছে মুখ নামিয়ে নিলো, গলায় আলতো করে মাথা ঠেকালো। ছোট ছোট আদুরে স্পর্শে যেন নিশিতাকে শান্ত করতে চাইছে।
নিশিতার হিজাবটা ঢিলে হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো, কিন্তু সে খেয়ালই করলো না। তার মাথা তখন একদম শূন্য। ফারিস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে তাকে ছাড়লো।
তারপর নিশিতার দিকে তাকিয়ে, চোখে মিশ্রিত দুষ্টুমি আর আদর নিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল—

“কি হয়েছে বউ?”
“এবার বল।”
নিশিতা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। গাল দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সে ফারিসের দিকে তাকাতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মিনমিন করে বলল—
“বড় আম্মু… আপনাকে ডাকছিলো।” “নাস্তা করার জন্য।” “তাই… ডাকতে এসে ছিলাম।”
ফারিস কথাটা শুনে আরেকবার হেসে ফেললো—এবার সেই হাসিতে দুষ্টুমি কম, মমতা বেশি। সে বুঝতে পারলো, এই মেয়েটার লজ্জার আড়ালে কতটা সরলতা আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।
ফারিস মেঝেতে পড়ে থাকা নিশিতার হিজাব ধীরে ধীরে তুলে নিলো। হাতের প্রতিটি স্পর্শে যেনো এক ধরনের যত্ন আর মমতার ছোঁয়া ছিলো। তা
রপর হালকা করে নিশিতার মাথার ওপর দিয়ে হিজাবটা সুন্দরভাবে ঠিক করল, যেন সবকিছু ঠিক থাকে এবং নিশিতা আর বিব্রত না হয়।

নিশিতার চোখে কৌতূহল আর লজ্জা একসাথে ফুটে উঠলো। ফারিস কপালে আলতো করে একটা চুমু খেলো। স্পর্শটা ছিলো মৃদু, প্রণয়ের ছোঁয়ায় ভরা।
তারপর ধীরে ধীরে বললো—
ল“কলেজে যাবি ঠিক আছে। কিন্তু আমি তোকে একটা কথা বলি—আর কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলতে না দেখিস। নাভিদ তো দূরে থাক। এখন থেকে তুই শুধু আমার ওয়াইফি। তোর ওপর আমার সম্পূর্ণ অধিকার। শুধু আমার, আর কারও না। বুঝতে পারলি?”
নিশিতা মাথা নেড়ে অচেতনভাবে বলল,

“হ্যা।”
ফারিস মুচকি হেসে বললো,
“চল, নাহলে লেট হয়ে যাবে। এমনি ৮:৩০ বেজে গেছে।”
এই বলে সে নিশিতার দিকে চোখ রাখল, যেন নিশ্চিত করলো সব ঠিক আছে। তারপর দুজন হাত ধরা ধরা অবস্থায় ধীরে ধীরে রুমের দরজা খুলে বের হলো। নিঃশ্বাসে তাদের মধ্যে এক ধরনের শান্তি, স্বচ্ছন্দ্য আর মিষ্টি আবেগ ভেসে আসছে।
অন্যদিকে নিচে, ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা আফিয়া চৌধুরীর দৃষ্টি বারবার ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। নিশিতা এতক্ষণে কোথায় গেলো, তা তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। কণ্ঠে হালকা অস্থিরতা—
“নিশি ডাকতে পাঠালাম, আর নিশিই কোথায় চলে গেলো?”
রিয়া চেয়ারটা ধাক্কা দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“দাড়াও, আমি গিয়ে দেখি আসছি।”
তবে ঠিক সেই মুহূর্তে, ডাইনিং রুমের দরজার দিকে নিশিতা এবং ফারিস ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলো। রিয়ার চোখে পড়তেই সে বললো—

“ওই তো, এসে গেছে।”
নিশিতা চুপচাপ রিয়ার পাশে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লো। ফারিস তখন নিশিতার চেয়ার সামনের চেয়ারে বসে পড়লো। তাদের চোখে-চোখে যেনো এক মিষ্টি বোঝাপড়া।
ডাইনিং টেবিলের অন্যরা ততক্ষণে খাওয়া শুরু করেছে। প্লেটের শব্দ, চামচের টকটক, আর মুখে মুখে হাসি—সব মিলিয়ে সকালে একটা শান্ত, স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে এসেছে। কেউই আর কারও ওপর নজর রাখছে না। সকালের ব্যস্ততা, লজ্জা আর উত্তেজনা—মিলিয়ে একটা নিখুঁত সমন্বয় তৈরি হয়েছে।
সবাই মিলে খাবারটায় মনোযোগ দিলো। নিশিতা নিজের সিটে বসে হালকা নিঃশ্বাস ফেললো, মনে মনে ভাবলো—আজকের সকালটা কিছুটা অদ্ভুত হলেও, শেষমেষ সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। ফারিস পাশে বসে আছে, আর তার পাশে বসা মানেই যেন নিরাপত্তা, আদর আর মমতার এক অদ্ভুত অনুভূতি।

এইভাবে সকালটা ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো—খাবারের মধ্যে হাসি, কথাবার্তা আর অচেতন আনন্দ মিশে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের পরিবেশটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী টেবিলের একপাশে হালকা টুকটাক কথা বলছিলেন। মাঝে মাঝে একে অপরের সঙ্গে হেসে উঠছিলেন, কথা চলছিল অতি স্বাভাবিক। ডাইনিং টেবিলের পরিবেশে ছোটখাটো হাসি-মজার ছন্দ ছিলো।
এদিকে খাওয়ার মাঝে ফারিস আবারও নিশিতার দিকে তাকালো। তার চোখে ছিল সেই মৃদু দুষ্টুমি, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই। নিশিতা হঠাৎ ফারিসের দৃষ্টি টের পেয়ে মনটা লাজুক হয়ে গেলো। ঠিক সেই মুহূর্তে দুইজনের চোখাচোখি হলো।

ফারিস হঠাৎ নিশিতার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারলো। ঠোঁট কামড়ে হালকা করে হাসি দিয়ে আবার নিজের খাবারে মন দিলো। নিশিতা তা দেখে ভিষম খেয়ে গেলো। কাশি উঠে গেলো তার। ভেতর থেকে লাজুক হাসি ও বিরক্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আমেনা চৌধুরী টেবিলের অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন—
“আস্তে খাবি তো, কি একটা কান্ড হলো?”
নিশিতা হালকা কণ্ঠে পানি খেয়ে বলল—
“আমি ঠিক আছি, আম্মু।”
তারপর ফারিসের দিকে আবার তাকিয়ে নিঃশব্দে, ফিসফিস করে বলল—
“এই লোক… ফ্ল্যাটও করতে পারে। কত গুণ একজন মানুষের।”
নিশিতা আর কিছু না ভেবে উঠে দাঁড়ালো। টেবিলের চেয়ারের সঙ্গে সামান্য ধাক্কা
দিয়ে বলল—

“রিয়া, চল। দেরি হয়ে গেছে আমাদের। আর লেট করিস না।”
রিয়া সাথে সাথে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ালো। সে মনে মনে ভাবলো—নিশিতা আজ সকালে যেন এক নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছে।
তাদের যাবার সময়, ফারিস পিছন থেকে বলল—
“দারা, তোদের আমি ড্রপ করে দিচ্ছি। চল।”
এই কথার পর কেউ আর কিছু বলল না।নিশিতা আর রিয়া হাসিমুখে যেতে লাগলো। ফারিস তাদের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিলো। ভিতরে একটা শান্তি, তৃপ্তি আর মিষ্টি বোঝাপড়া ভেসে উঠলো। পুরো ডাইনিং রুমে অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিকতা ফিরেছে, যেন এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই তাদের দিনের শুরুটা সম্পূর্ণ।

ফারিসের সঙ্গে নিশিতা গাড়িতে উঠলো। রিয়া অল্পদূর বসেই ভেতরে এক ধরনের বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে ভাবছিল—নিশি তো আগেই বলেছিলো,
“ভাইয়ার সঙ্গে আমি যাবো না।”
তবে হঠাৎ করেই সে ফারিস ভাইয়ার সঙ্গে গাড়িতে চেপে বসেছে। রিয়ার মনটা একেবারেই জড় হয়ে গেলো।
পুরো রাস্তা জুড়ে নীরবতা বিরাজ করছিলো। কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু গাড়ির হালকা গর্জন আর টায়ারের চাকা ঘর্ষণের শব্দ শুনা যাচ্ছিলো। নিশিতা ভেতরের কিছুটা উত্তেজনা চেপে ধরে খামোখা বাইরে তাকাচ্ছিল।
ফারিসও চুপচাপ ড্রাইভ করছে, মাঝে মাঝে নিশিতার দিকে চোখ দিতে চোখে একটা অদ্ভুত মৃদু হাসি ফুটে উঠছে।কিছুক্ষণ পর গাড়ি ধীরে ধীরে থামলো। সামনে ছিলো কলেজের বড় প্রধান গেট। রিয়া একেবারেই চমকে দাঁড়ালো।
সে প্রথমে বলল,

“ওই তো, আমরা এসে পৌঁছেছি।”
এরপর দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে চলে গেলো।
নিশিতা চাবির মতো হাত বেঁধে গাড়ি থেকে নামার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হঠাৎ ফারিস তার দিকে একটু এগিয়ে বলল—
“নিশি… শোন।”
নিশিতা মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে এগিয়ে গেলো। ফারিস তার হাতে আলতো করে হাত রাখল, তারপর ধীরে ধীরে নিশিতার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল—
“সাবধানে যা।”
নিশিতা চারদিকে একবার তাকালো। চারপাশের মানুষ, রাস্তার যান্ত্রিক শব্দ, সবকিছু যেন ক্ষণিকের জন্য হালকা হয়ে গেলো। তার মুখে লাজুক, কিন্তু মিষ্টি একটি মুচকি হাসি ফুটে উঠলো।
সে ফিসফিস করে বলল—

“আপনিও সাবধানে যাবেন।”
ফারিস তখন ধীরে ধীরে পিছু হেটে গাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার চোখে ছিল সেই মুগ্ধ দৃষ্টি, যা নিশিতাকে এক ধরনের নিরাপত্তা দিচ্ছিল। নিশিতা গাড়ি থেকে নামার আগ মুহূর্তেই ফারিস তার দিকে এগিয়ে আসলো।
হঠাৎ সে নিশিতার কাছে গিয়ে হালকা করে তাকে জড়িয়ে ধরলো। ফারিসের চোখে গভীর মায়া আর আবেগ ফুটে উঠলো। সে বলল—

“আই উইল মিস ইউ, জান।”
রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থাকার কারণে নিশিতা একটু লাজুক মনে হলো। কিন্তু সে ভেতরের উত্তেজনা আর আবেগকে চাপতে পারলো না। অবশেষে সে ফারিসকে আঁকড়ে ধরল এবং বলল—
“এতো মিস করা লাগবে না। আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
তারপর সোজা মুখ রেখে বলল—
“এবার যান। আমি অলরেডি লেট হয়ে গেছি।”
এই বলে নিশিতা একেবারে দৌড়ে কলেজের ভিতরে চলে গেলো। ফারিস কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো, তার চোখে শুধু মুগ্ধতা, আনন্দ আর প্রিয়ার গভীর অনুভূতি ফুটে উঠলো। নিশিতার চলার সময় সে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে ফারিসকে মুচকি হাসি দিলো।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২৯

ফারিস ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসলো। স্টার্ট দিলো, গাড়ির ইঞ্জিন হালকা গর্জন করতে লাগলো। সে কলেজের গেটের দিকে ধীরে ধীরে গাড়ি নিয়ে এগোতে লাগলো, কিন্তু চোখ কিছুটা যেন নিশিতার দিকে আটকে থেকে গেল। এই ছোট্ট সকালটা—নিশিতা আর ফারিসের মধ্যে মিষ্টি বোঝাপড়া আর আবেগের সেই মুহূর্তগুলো—দুটো মানুষের মধ্যে গভীর বন্ধন…..

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩১