প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৭
সাইদা মুন
—আরে স্যার! আপনি কি পিজ্জার বেঁচে যাওয়া দুটো স্লাইস খেতেই এত দূর ছুটে এসেছেন?
টেনশনে বাইকটা কোনোরকমে সাইড করে রেখে প্রায় ছুটে এসে তনিমার সামনে দাঁড়িয়েছিল তাহসান। কিন্তু কথাটা কানে যেতেই তার পা যেন হঠাৎ মাটিতে গেঁথে গেল। কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে অনুভূতিহীন চোখে তনিমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার কিছুক্ষন পর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে নিজেকেই ধমকাল। এ তো তনিমা। এই মেয়ের কাছ থেকে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো কথা আশা করা যায়। আর কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ গিয়ে তনিমার পাশের চেয়ারটায় বসল। বসেই কাউন্টারের দিকে চেয়ে অর্ডার দিল,
—এক্সকিউজ মি, একটা কোল্ড ড্রিংকস প্লিজ।
মুহূর্তের মধ্যেই একজন এনে দিল। তাহসান কোনো কথা না বলে একটানা কয়েক ঢোক খেয়ে প্রায় অর্ধেক বোতল শেষ করল। মনে হলো এতক্ষণে একটু স্বাভাবিক হলো। বোতলটা টেবিলে নামিয়ে এবার ধীরে ধীরে চোখ তুলল পাশের টেবিলের দিকে। সেখানে বসে থাকা কয়েকটা ছেলে তনিমার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাহসানের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখে নেমে এল ঠান্ডা কঠোরতা। এদিকে তনিমা আড়চোখে তাহসানকেই পর্যবেক্ষণ করছিল। একটু ইতস্তত করে মিনমিনে গলায় বলল,
—স্যার, আপনি চাইলে আরেকটা পিজ্জা অর্ডার দিই?
তাহসান ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরল। এমনিতেই এই মেয়েটার জন্য নিজের সময় বরবাদ করে এই পর্যন্ত ছুটে এসেছে। আর সে কিনা এখন পিজ্জার অফার দিচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে সংক্ষিপ্ত গলায় বলল,
—ফাস্ট খাবার শেষ করো।
—আপনি খাবেন না?
—না।
—তাহলে আসলেন কেন?
তাহসান বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল। তারপর ধৈর্য ধরে বলল,
—এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ধৈর্য আমার নেই। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো। তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমাকে আবার নিজের বাসায় ফিরতে হবে। আমি খুব টায়ার্ড।
তনিমা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এসেছে শুধু তাকে বাসায় পৌঁছে দিতে? তাহসান তার চিন্তায় ছুটে এসেছে? ভাবনাটা বেশ অবাক করলো তাকে। আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাবে তবে থেমে গেল। হঠাৎই লোকটার ক্লান্ত মুখটা তার চোখে পড়ল। অপরাধবোধে কণ্ঠটা নরম হয়ে গেল। আস্তে আস্তে বলল,
—স্যার, আপনি শুধু শুধু কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন? আমি তো একাই চলে যেতে পারতাম। আপনি বরং ফিরে যান।
তাহসান যেন কথাটা শুনলই না। সে হাত তুলে একজন স্টাফকে ডাকল। স্টাফ এগিয়ে আসতেই বলল,
—এই টেবিলের বিলটা?
স্টাফ একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল যেন। তখনই অপাশের ছেলেদের মধ্য থেকে একজন উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
—বফ নাকি?
তনিমা চোখ বড়বড় করে চাইল তাদেরদিকে। দাঁত কটমট করে ঝারি মেরে বলল,
—কি আবুলতাবুল বকছেন। আমার স্যার হয়।
তা শুনতেই যেন ছেলেটা খুশি। সঙ্গে সঙ্গে স্টাফকে বলল তাহলে বিলটা আমিই দেব। স্টাফটা এবার তাহসানের উদ্দেশ্যে বলল,
—স্যার, উনারা বলেছেন বিলটা উনারাই দেবেন।
তাহসানের ভ্রু কুঁচকে গেল। পাশের টেবিলের ছেলেগুলোর দিকে চাইতেই তাদের মধ্য থেকে একজন হালকা হাত তুলে সালাম দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম স্যার, বিল আমি দেব।
তাহসান ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে একেকটা মাপা পা ফেলে ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গভীর, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—তুমি কেন দেবে?
ছেলেটা তনিমার দিকে তাকিয়ে মুঁচকি হেসে বলল,
—কারণ আমার ইচ্ছে হয়েছে।
তনিমা বিরক্ত কন্ঠে বলল,
—আমার বিল আমিই দিব। আমি কি একবারও কাউকে বলেছি আমার বিল দিতে? আজাইরা প্যাচাল করছেন কেন?
ছেলেটা দাপটের সঙ্গে বলল,
—তাহলে তুমি বিলটা দিয়ে দেখাও। এই ক্যাফের কোনো স্টাফ তোমার থেকে টাকা নেয় কিনা দেখি।
এই বলে গরম চোখে স্টাফদের দিকে চাইল। তাহসান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু কাহিনি দেখেই গেল। তারপর আচমকাই ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটল তার। সে ফিরে এসে তনিমার সামনে দাঁড়াল। তনিমা তখন বিরক্ত চোখে তাদের দেখছিল।
—তনিমা, যা যা খেতে ইচ্ছে করে সব অর্ডার করো।
তনিমা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—কেন স্যার?
তাহসান বিরক্তিতে “চ” উচ্চারণ করে বলল,
—আহা আমি কী বললাম?
তাহসানের গলায় এবার কড়া সুর,
—যা যা ইচ্ছে হয় সব নাও। এমন সুবর্ণ সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না। ওরা তোমার বিল দিচ্ছে তো টাকার চিন্তা নেই।
তনিমা হতভম্ব হয়ে একবার তাহসানের দিকে, তো একবার ছেলেগুলোর দিকে তাকাল। তাহসান কি রাগ করে বলছে, নাকি সত্যিই সিরিয়াস হয়েই তাকে নিতে বলছে। কিছুই বুঝতে পারছে না সে। তাই দ্বিধাবোধ করতে করতে বলল,
—কিন্তু স্যার..
—থাক।
বিরক্ত হয়ে তাহসান নিজেই তার হাত থেকে মেনুকার্ডটা নিয়ে নিল। উল্টাতে উল্টাতে শান্ত গলায় বলল,
—আমি-ই অর্ডার করছি।
তারপর আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একে একে মেনুর প্রায় সব ধরনের স্ন্যাকস, আর ড্রিংকস পার্সেল করে দিতে বলল। স্টাফরা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তনিমা হতবাক। আর পাশের টেবিলের ছেলেগুলোর মুখের হাসি ততক্ষণে উধাও। দশ মিনিটের মধ্যে বড় বড় দুইটা পলিথিন ভর্তি খাবার কাউন্টারের ওপর রাখা হলো। তাহসান দুহাতে ব্যাগ দুটো তুলে নিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
—চলো।
তনিমা এখনও পুরো ঘটনাটা বুঝে উঠতে পারেনি। সব যেন তার মাথার উপর দিয়ে চলছে। ধীরে ধীরে নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে তাহসানের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। ঠিক তখনই একজন স্টাফ দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়াল।
—স্যার বিলটা?
তাহসান অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
—বিল?
তারপর পাশের টেবিলের ছেলেটার দিকে আঙুল তুলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গলায় বলল,
—বিলটা তো ওরাই দিবে।
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে ভদ্র হাসি টেনে ঘাড় ঘুরিয়ে দুহাত উঁচু করে ব্যাগগুলো তাদের দেখিয়ে যোগ করল,
—থাংক ইউ।
ছেলেটা অপ্রস্তুত মুখে থমথমে হয়ে শুধু মাথা নাড়ল। তাহসান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তনিমাকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল। ওদিকে একজন স্টাফ বিলের কাগজটা হাতে নিয়ে ছেলেগুলোর টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।
—স্যার, আপনার বিল।
ছেলেটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বিলটা হাতে নিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মুখের রঙ পাল্টে গেল। চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কাগজের নিচে মোটা অঙ্কে লেখা, ১০,০০০ টাকা।
—কীইই? এত টাকা!
পাশের ছেলেরাও বিলটা কেড়ে নিয়ে দেখতেই একসঙ্গে চেচিয়ে উঠল। একেকটার মুখ ঝুলে আছে। তাদের হাবভাব দেখে স্টাফ বিব্রত হেসে বলল,
—আসলে স্যার, উনি প্রায় সবকিছুই ডাবল ডাবল করে নিয়েছেন। তার ওপর আমাদের সবচেয়ে দামি স্ন্যাকস আর ড্রিংকসগুলোই পার্সেল করেছেন।
ছেলেগুলো একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কয়েক মিনিট আগের হাসিটা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। তাড়াহুড়ো করে একেকটা জায়িগা থেকে উঠে ছুট লাগাল বাহিরের দিকে।
এদিকে রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে তাহসান ব্যাগ দুটো বাইকের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখল। তারপর গাড়ি স্টার্ট করতে করতেই তাড়া দিয়ে বলল,
—ফাস্ট ওঠো। এখুনি এল বলে।
তনিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কে আসবে?
—ওই ছেলেগুলো। ফাস্ট ওঠো বলছি, গর্দভ!
ধমক খেয়ে আর দেরি করল না তনিমা। ভয় পেয়েই তাড়াতাড়ি বাইকে উঠল। মাঝখানে নিজের ব্যাগটা রেখে একপাশে দুই পা ঝুলিয়ে বসল সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল আচমকা চিৎকার,
—এই ভাই! দাঁড়ান দাঁড়ান।
—গাড়ি থামান বলছি।
কথাগুলো কানে যেতেই তাহসান সংক্ষিপ্ত গলায় বলল,
—শক্ত করে ধরো।
কথা শেষ হতেই বাইকটা গর্জে উঠল। হঠাৎ গতিতে ছুটতে শুরু হতেই ভয় পেয়ে তনিমা তাড়াহুড়ো করে তাহসানের কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর পেছনে তাকাতেই দেখল, ছেলেগুলো দৌড়ে তাদের পিছেই আসছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি। তাহসান স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকটা দূরে চলে এসেছে তারা। পেছন থেকে শুধু তাদের অসহায় ডাকটাই ভেসে আসতে লাগল। তনিমা আর কৌতূহল সামলাতে পারল না। মুখটা তাহসানের কানের কাছে এনে জোরে চিৎকার করে প্রশ্ন করল,
—স্যার! কাহিনিটা কীইই?
তাহসান সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেলল ধমক দিয়ে বসল,
—স্টুপিড! এভাবে কে কথা বলে? কানের পর্দা ফাটিয়ে দিবে নাকি?
তনিমা সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে ফেলল,
—না মানে ভেবেছিলাম আপনি শুনতে পাবেন না, তাই একটু জোরে বললাম।
—আমি কি বধির?
—না, তা বলিনি। কিন্তু স্যার, ওরা আমাদের পেছনে ছুটছিল কেন?
তাহসান আচমকাই হো হো করে হেসে উঠল। খোলা বাতাসে তার প্রাণখোলা হাসির শব্দ কানে আসতেই তনিমা চমকে উঠল। এ লোক হঠাৎ হাসছে কেন। অজান্তেই সে লুকিং গ্লাসের দিকে উঁকি দিল। আর ঠিক তখনই চোখে ধরা পড়ল দৃশ্যটা। বাতাসে উড়ে যাওয়া ছোট ছোট কপালের চুলগুলো। ঠোঁটভরা নির্মল হাসি। আর সেই হাসিতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠা সুদর্শন মুখটা। এক মুহূর্তের জন্য তনিমার বুক ধক করে উঠল। এই প্রথম সে হাসতে দেখলো তাহসানকে। গম্ভীরমুখ ব্যতিত এই প্রথম দেখলো সে। হৃদস্পন্দন যেন অকারণে বেড়ে গেল। সে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল তনিমা। এক হাত দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরল। এ কেমন অনুভূতি? এমন অদ্ভুত অস্থিরতার মুখোমুখি সে আগে কখনো হয়নি। এদিকে তাহসান হাসতে হাসতেই বলল,
—জানো, এই ব্যাগ দুটোতে কত টাকার জিনিস আছে?
তনিমা নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেও পারছে না। তাহসান যেন আজ হঠাৎ ফ্রেন্ডলি বিহেভ করছে। যা তার হজম হচ্ছে না। তবু প্রতিউত্তরে কোনোরকমে জিজ্ঞেস করল,
—কত?
—দশ হাজারেরও বেশি মেবি।
মুহূর্তের মধ্যেই তনিমার সব অস্থিরতা উধাও হয়ে গেল। কথাটা যেন তার কানে নয়, সরাসরি মাথার ভেতর বিস্ফোরিত হলো। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল তাহসানের পিঠের দিকে। প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠল,
—কীইই?
তাহসানের মুখভঙ্গি আরও গম্ভীর হয়ে এল। কণ্ঠটা ঠান্ডা দৃঢ় শোনাল,
—অসভ্যগুলো যখন এত শখ করে বিল দিতে চাইছিল, তখন ভালো করেই দিক। আশা করি, এ জন্মে আর কোনো মেয়ের বিল দেওয়ার শখ হবে না।
কথাটা শেষ হতেই তনিমার উচ্চস্বরের হাসির শব্দ কানে এল। শুধু তাই-ই নয়, মুহুর্তে এমন এক কাণ্ড করে বসল সে, যা তাহসান একেবারেই কল্পনা করেনি। হাসতে হাসতেই সজোরে একটা চাপড় বসিয়ে দিল তাহসানের কাঁধে। আকস্মিক আঘাতে তাহসান হকচকিয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য বাইকের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। বাইকটা এদিক-ওদিক দুলে উঠতেই সে দ্রুত হ্যান্ডেল সামলে আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনল। ওদিকে তনিমা যেন হাসি থামাতেই পারছে না। খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতেই এবার দুই হাত দিয়ে তাহসানের দুই কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। হাসির ঝাঁকুনিতে বারবার তার শরীর এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাহসানের পিঠ। তাহসানের কপাল কুঁচকে আছে। স্পষ্ট অস্বস্তি ফুটে উঠল মুখে। ঘাড় সামান্য ঘুরিয়ে একবার তাকাল। দেখল, মেয়েটা তার ডান কাঁধের শার্টটা শক্ত করে মুঠো করে ধরে আছে। যার ফলে বড় বড় নখগুলোর আঘাত লাগছে কাঁধে।
ঠিক তখনই আরেকটা চাপড় এসে পড়ল তার কাধে। তাহসান দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে নিল একমুহূর্তের জন্য। গভীর নিশ্বাস নিয়ে চোয়াল শক্ত করে বাইকের হ্যান্ডেল আরও জোরে চেপে ধরল। এবার চাপড় মেরেই উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলে উঠল তনিমা,
—স্যার, আপনি তো সেইইই। একদম কড়াক লেভেলের সেইই। এভাবেও যে মানুষকে বাঁশ দেওয়া যায়, মাথাতেই আসেনি। আগে বলতেন, তাহলে আমি আরও দু-চারটা আইটেম এড করতাম।
বলেই আবার হেসে উঠল সে। বেচারি হাসতে হাসতে বোধহয় ভুলেই গিয়েছে, যাকে হাসি ঠেলায় নির্দ্বিধায় ধুমধাম মারছে, সে তার বন্ধু নয়। সে তাহসান। তাহসানের ধৈর্যের বাঁধ এবার শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকল। দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর গলায় ধমকে উঠল,
—স্টুপিড! হাতটা আরেকবার আমার কাঁধ টাচ করলে বাইক থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিব।
এক মুহূর্তেই যেন হুঁশ ফিরে এল তনিমার। হাসিটা ঠোঁটেই শুকিয়ে গেল। দ্রুত এক হাত কাঁধ থেকে সরিয়ে আনল। বোধগম্য হলো সে কি করছিল। সাথে সাথে শুকনো ঢোক গিলে ছটফটে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
—স… সরি, স্যার আসলে…
তাহসান তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই গম্ভীর স্বরে বলল,
—বাসার ঠিকানাটা বলো, ফাস্ট।
একটু থেমে, রাগীস্বরে যোগ করল,
—নয়তো মাঝরাস্তাতেই ফেলে চলে যাব।
তনিমা তাড়াহুড়ো করে ঠিকানাটা বলতেই তাহসান আর একটি কথাও বলল না। নীরবে বাইক চালিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এল। তনিমা কোনটা তাদের বাড়ি দেখিয়ে দিতেই ঠিক সেই বাড়ির সামনেই বাইক দাঁড় করাল সে। ইঞ্জিন বন্ধ করে ব্যাগ দুটো নামিয়ে তনিমার হাতে ধরিয়ে দিল। এতক্ষণ যেন নিজেকে সংযত করে রেখেছিল। এবার যেন বের হয়ে এল তার বহুল পরিচিত সেই রাগচটা স্বভাবটা।
—এই তুমি যে একটা মেয়ে, সেটা কি ভুলে গিয়েছিলে? একা একা রাত করে বাইরে বের হওয়ার মতো দুঃসাহস দেখানোর আগে একবারও নিজের কথা ভাবোনি? এখন দিনের আলোতেও মেয়েরা নিজের ঘরে নিরাপদ না, আর তুমি কিনা রাত করে একা বেরিয়ে পড়েছ।
একটানা কথাগুলো বলে সামান্য থামল সে। তনিমা যেন এরই অপেক্ষায় ছিল। মুঠোগুলো শক্ত করে মাথাটা নিচু করে নিল। নিজেকেই বকছে কেন সে বাঘের গুহায় পা রাখতে গেল। কেন সে লোকটালে কল করতে গেল। তাকে চুপ দেখে তাহসান আরও গম্ভীর স্বরে বলল,
—ওই ছেলেগুলোকে দেখেছিলে? ওরা তোমার বিল কেন দিতে চেয়েছিল, বলতে পারবে?
তনিমা মাথা নিচু করেই রইল। ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে জানাল, সে জানে না। তাহসান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
—তোমাকে পরে রাস্তায় আটকে হ্যনস্তা করার জন্য বিল দিতে চেয়েছিল। আজ যদি আমি সময়মতো না পৌঁছাতাম, কী হতে পারত, সেদিকে তোমার কোনো ধারণা আছে? ছেলেগুলো তোমার পিছু নিত। একা গলিতে যদি পেয়ে যেত তখন কি হতো একটুও ভাবতে পারছো?
তনিমার শরীরের প্রতিটি লোম যেন খাড়া হয়ে গেছে। তাহসানের একটা কথাও মিথ্যা নয়। আসলেই তো আজ যদি ছেলেগুলো তার পিছু নিত, সে একা কি করতে পারতো।
—মোবাইলের ওপাশ থেকেই আমি বুঝতে পারছিলাম ওরা তোমার সঙ্গে খারাপ উদ্দেশ্যে কথা বলছে। আর তুমি সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও সেটা বুঝতে পারোনি?
তাহসানের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট ক্ষোভ। তনিমা ভয়ার্ত গলায় এবার মুখ খুললো,
—সরি, স্যার। আসলে এতকিছু চিন্তা করিনি।
দাঁতে দাঁত চেপে তাহসান বলল,
—আমাকে সরি বলে কী হবে? আমার কিছু হতো নাকি? যা হওয়ার, তোমারই হতো। তুমি ঝুঁকির মধ্যে পড়ত্ব। আমি না।
এরইমধ্যে তাদের কথার শব্দে বাড়ির দারোয়ান গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। তনিমাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বলল,
—আরে তনিমা আপা। আপনি বাইরে কী করেন?
প্রশ্নটা শুনে তাহসানের জমে থাকা বিরক্তির যেন নতুন লক্ষ্য মিলল। সে ঘুরে সরাসরি দারোয়ানের দিকে তাকাল। তাকে উপর থেকে নিচ অব্দি দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—পাহারাদার?
ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে বুক উঁচু করে বলল,
—হ্যাঁ আপনি আমার তনিমা আপার সঙ্গে এভাবে চিল্লিয়ে কথা বলছেন কেন।
তাহসান দুহাত পকেটে গুজে তার দিকে সম্পূর্ণ ফিরল। তনিমা ঢুক গিলে চাইল বেচারার দিকে। এখন তাকে যে ধুয়ে দিবে তা জানা কথা।
—ওহ তুমি সেই গুনধর ব্যক্তি। তোমাকে আংকেল আন্টি বলে যায়নি তনিমার খেয়াল রাখতে?
লোকটা শক্ত কন্ঠে বলল,
—হ, কইয়া গেছে। কিন্তু আপনে কে?
তাহসানের কণ্ঠ আরও চড়া হয়ে উঠল,
—আমি কে, সেটা গুল্লি মারো। তুমি কেমন দায়িত্ব পালন করছ শুনি? জলজ্যান্ত একটা মেয়ে রাত করে বাড়ির বাইরে চলে গেল, আর তুমি টেরও পেলে না! গেটে কি তোমাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে মশা মারার জন্য?
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে লোকটা চাইল তনিমার দিলে। তারপ্প্র চোখ গেল তার হাতের দিকে। অবাকসুরে জিজ্ঞেস করল
—তনিমা আপা আপনে বাইরে গেছিলেন? কিন্তু কেমনে?
তনিমা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল। ডানদিকে দুকদম এগিয়ে দারোয়ান ছেলেটিকে ফিসফিসিয়ে বলল,
—এখন চুপ থাকেন ভাই। নিজের ঘাড়ে দোষ চেপে সরি বলে আমারে বাঁচান আগে।
কথা বুঝে দারোয়ান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে তাহসানকে বলল,
—আমার ভুল হইছে, স্যার। এরপর থেইকা আর এমন হইব না। খেয়াল রাখমু।
তাহসান বিরক্ত হয়ে কপাল স্লাইড করতে লাগল। সে নিজেও অবাক। সে কেন এতটা উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে? গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। তারপর তনিমার দিকে ফিরে কঠোর গলায় বলল,
—দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে যাও।
একটু থেমে তার হাতের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
—আর ওই রাক্ষসী নখগুলো আজ রাতেই কাঁটবে।
তনিমা সঙ্গে সঙ্গে হাত দুটো পেছনে লুকিয়ে ফেলল। মাথা নেড়ে কয়েক কদম এগিয়েও আবার থেমে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
—স্যার, আপনি প্রথমবার আমাদের বাসায় এলেন। ভেতরে আসলে…
বাকিটা আর বলা হলো না। তাহসানের লালচে, কঠোর চোখের দিকে তাকিয়েই কথাগুলো গিলে ফেলল সে। জোর করে ঠোঁটে হাসি এনে বলল,
—না থাক। অন্যদিন না হয় আসবেন। আজ আপনি বাসায় যান, অনেক ক্লান্ত লাগছে আপনাকে।
কথা শেষ করেই প্রায় দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। দারোয়ানও ইতস্তত ভঙ্গিতে তার পিছু নিল। ওদের ভেতরে যেতে দেখে তাহসান আবার বাইকে উঠে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে গিয়েও একবার তাকাল সামনে। দেখল, তনিমা মেইন দরজার কাছে পৌঁছে পেছন ফিরে তাকিয়েছে। তাহসান হাত তুলে ইশারা করল, ভেতরে যাও। তনিমাও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে ব্যাগ থেকে এক্সট্রা চাবিটা বের করল। দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।
মেইন দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হতে দেখেই তাহসান যেন স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বাইক স্টার্ট দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল নীরব রাস্তায়। হেডলাইটের আলো রাতের আঁধার চিরে লম্বা এক রেখা এঁকে সামনে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু পথের অর্ধেক যেতেই হঠাৎ ব্রেক কষে রাস্তার একপাশে থামিয়ে দিল বাইকটা। ইঞ্জিনটা তখনও চলছে। তাহসান দুহাতে হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল। বুকের ভেতরটা যেন এখনও অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে। কিছুক্ষণ আগের প্রতিটা মুহূর্ত বারবার ফিরে আসছে মাথায়। সে কেন এভাবে ছুটে গিয়েছিল? শুধুমাত্র একটা স্টুডেন্ট এর জন্য? মেয়েটা কি ভাবছে তাকে নিয়ে? তার টিচার তাকে সাহায্য করতে এত রাতে নিজ থেকেই লোকেশন চেয়ে ছুটে গিয়েছে? কথাটা নিজের কাছেই যেন অযুক্তি লাগল। চোখ বন্ধ করে কপালে হাত বুলিয়ে নিল। বুকের ভেতর অস্বস্তিটা আরও বাড়ল। মেয়েটা আবার কী ভাববে? যদি অন্য কিছু ভেবে বসে? এসবই তাকে অস্থির করে তুলছে। আর ভাবতে পারল না, মুহূর্তের মধ্যে পকেট থেকে মোবাইল বের করল সে। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল,
“তুমি একবার আমাকে মৃত্যুর পথ থেকে বাঁচিয়েছিলে। তাই তোমার বিপদে সাহায্য করাটা আমার দায়িত্ব মনে হয়েছে। এর বাইরে উল্টাপাল্টা কিছু ভাববে না।”
মেসেজটা পাঠিয়ে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতরের চাপটা যেন খানিকটা হালকা হয়ে গেল। মোবাইলটা পকেটে রাখল। তারপর আবার বাইক স্টার্ট দিয়ে নিজের বাসার উদ্দেশে রওনা হলো। ওদিকে ঘরে ঢুকেই মেসেজের শব্দে মোবাইল হাতে নিল তনিমা। তাহসানের পাঠানো বার্তাটা পড়ে প্রথমে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর নাক-মুখ কুঁচকে বিরবির করে বলল,
—আমি আবার কী উল্টাপাল্টা ভাবব?
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে অজান্তেই চিকন একটা হাসি ফুটে উঠল,
—স্যারের হাসিটা মারাত্মক…
—উফ! রাফির বাচ্চা, থাপ্পড় চিনিস? এক থাপ্পড়ে ৩৬০° অ্যাঙ্গেলে ঘুরিয়ে দেব।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে দুই গালে হাত চেপে ধরল। মুখটা কুঁচকে প্রতিবাদী কন্ঠে বলল,
—চুপ, বেয়াদব। তোর থেকে আমি গুনে গুনে দুই মাসের বড়। একটু তো লেহাজ কর, ভাই!
ফারিন চোখ রাঙিয়ে তেতে উঠল,
—লেহাজ মাই ফুট। তুই নিজেরটা খেয়েছিস, খেয়েছিস। আমার ফুচকায় হাত দিলি কেন?
রাফি নির্বিকার মুখে কাঁধ ঝাঁকাল মাসুম কন্ঠে বলল,
—আরে ভাই, তোর খেতে সময় লাগছিল তাই একটু হেল্প করলাম।
—তোকে আমি একবারও বলেছি আমাকে হেল্প করতে? যা সদ সামনে থেকে, রাক্ষস একটা।
কথাটা শুনেই রাফির মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। আর কোনো প্রতিবাদ না করে সে ধীর পায়ে ফুচকার স্টল ছেড়ে বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। মুখটা গম্ভীর, চোখেমুখে অভিমান স্পষ্ট। তাহিয়া, মেহরীন, তনিমা, তিনজনই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। ফারিনও খানিকটা অপ্রস্তুত। তনিমা মুখে ফুচকা পুরতে পুরতে বলল,
—ভাই, ও কি সত্যিই রাগ করল?
মেহরীন সেদিকে তাকিয়েই বলল,
—মনে তো হচ্ছে তাই।
তাহিয়া এবার ফারিনকে ধমকাল,
—একটা ফুচকাই তো নিয়েছে। তাই বলে এভাবে বলতে হয় নাকি? বেচারা সত্যিই কষ্ট পেয়েছে।
ফারিন নাক ফুলিয়ে বলল,
—একটা? গুনে গুনে তিনটা গপাগপ খেয়ে নিয়েছে। আর আমি কিছুই বলব না? তোর থেকে নিলে তুই কী করতি?
তাহিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—আমি তো ঠাস করে একটা লাগাতাম!
—তাহলে আমার বেলায় এত ষোলো আনা কেন?
দুজনের আবার নতুন করে তর্ক বেঁধে যেতেই মেহরীন বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
—আরে ভাই, তোরা আবার শুরু করবি নাকি। থাম তো। ওই ব্যাটা রাগ করে বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না। একটু পর বেহায়ার মতো নিজেই চলে আসবে।
এই ভেবে চারজন আবার নিজেদের মতো গল্প করতে করতে ফুচকা শেষ করল। কিন্তু আশ্চর্য! রাফি আর ফিরল না। এবার সবারই একটু খারাপ লাগতে শুরু করল। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে শেষমেশ আরেক প্লেট ফুচকা নিয়ে চারজনই কাছে গেল। ফারিন প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল,
—রাগ করার কি আছে? নে যত ইচ্ছে খা।
রাফি মুখ ফিরিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
—দরকার নেই। তুই-ই খা।
তনিমা তার কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল,
—এত ডং না করে খেয়ে নে তো।
কথাটা শুনে রাফির মুখটা কেমন যেন ভেঙে গেল। চোখ দুটো মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল,
—এই আমার অভিমানটা তোদের ডং লাগছে? যা তোদের কাউকে লাগবে না। কাউকে চাই না, সর।
তার হঠাৎ এমন অভিমান দেখে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তনিমা হতচকিত হয়ে তাড়াতাড়ি তার কাঁধে আস্তে আস্তে ঘষে দিতে দিতে বলল,
—আরে না না। আমি ওইভাবে বলিনি। এমনি বলেছি।
মেহরীনও সায় দিল,
—হ্যাঁ রে, তনি তো মজা করেই বলেছে। তাই বলে কেঁদে দিবি নাকি।
ফারিন চুপচাপ প্লেটটা তার হাতে ধরিয়ে দিল। তাহিয়াও পাশে একটা চেয়ার টেনে দিল। রাফি ধীরে ধীরে বসল। নাক টানতে টানতেই একটার পর একটা ফুচকা খেতে শুরু করল। চারজনই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখে একই অপরাধবোধ, তাদের কথাতে হয়তো ছেলেটা সত্যিই কষ্ট পেয়েছে। রাফিও কোনো তাড়াহুড়ো করল না। বেশ আয়েশ করে পুরো প্লেট শেষ করল। এরই মধ্যে তনিমা গিয়ে বিলও মিটিয়ে এল। মেহরীন পানির বোতল এগিয়ে দিল। তাহিয়া টিস্যু বাড়িয়ে দিল।
সেবা-যত্নের মাঝে ফুচকা খেয়ে শেষ করে রাফি একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আরাম করে চেয়ারে হেলান দিল। দুই হাত ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে আড়মোড়া ভেঙে বলল,
—আহ, এখন ভালো লাগছে। জীবনে এই প্রথমবার মনে হচ্ছে, চারটা বান্ধুবি বানিয়ে আসলেই লাভ হয়েছে। কাল রাত থেকে মনটা এমন খারাপ ছিল, তোরা একদম ঠিক করে দিলি। লাভ ইউ, দোস্ত!
চারজনই অবাক চোখে চাইল। রাত থেকে মন খারাপ কথাটা হুনে কপাল কুঁচকালো তাদের। পরপরই কিছু একটার সাতপাঁচ মেলাতেই একেকগ তার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল, যেন এই মুহূর্তেই জীবন্ত পুঁতে ফেলবে। ফারিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। কোমরে হাত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—কাল রাত থেকে মন খারাপ ছিল তোর?
—হু।
—তার মানে আমার কথায় তোর কিচ্ছু হয়নি?
রাফি দুই আঙুলের মাঝে সামান্য ফাঁক রেখে দেখাল,
—এইটুকু খারাপ লেগেছিল। তারপর রাতের কথাটা মনে পড়ে গেল, তাই পুরোপুরি মন খারাপ হয়ে গেল।
তাহিয়া কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—রাতের কথা মানে?
রাফির মুখটা আবার করুণ হয়ে গেল ভাবনায় ডুবে গিয়ে বলল,
—নারী তুমি ছলনাময়ী, কথাটা কিন্তু এমনি এমনি বলেনি।
ফারিনের কপালের রগ ফুলে উঠেছে। গরম চোখে জানতে চাইল,
—ঘটনাটা খুলে বলবি?
পাশ থেকে তনিমা বিরক্ত মুখে বলল,
—ঘটনা আবার কী! ছ্যাকা খেয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
রাফি চোখ কপালে তুলে তাকাল,
—এই তুই জানলি কী করে?
তনিমা অসন্তুষ্ট কন্ঠে বলল,
—দুই বছর ধরে তোকে দেখছি। তুই কখন হাঁচি দিবি, কখন পাদ দিবি, সেটাও তোর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে বুঝতে পারি।
রাফি থতমত খেয়ে গলা খাঁকারি দিল,
—ভালো করে চিনিস, এটুকু বললেই হতো। এত এক্সট্রা ডিটেইলস দেওয়ার কী দরকার ছিল?
তা শুনে তনিমা মুখ ঝামটা মারতেই ফারিন এবার মুঠো শক্ত করল,
—তার মানে তুই ব্রেকআপের শোকে মন খারাপ করে ছিলি?
—হু…
মেহরীন অসহ্য কন্ঠে বলল,
—আর আমরা ভেবেছি, ফারিনের কথায় কষ্ট পেয়েছিস।
কথা শেষ হতে না হতেই ফারিন বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
—ধর শালারে! উল্টো ঝুলিয়ে পেট থেকে সব বের করব।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না রাফি। চেয়ার ছেড়ে ভোঁ দৌড়। তার পেছনে ফারিন, তারপর তাহিয়া, তনিমা আর মেহরীন। মুহূর্তেই পুরো কলেজ ক্যাম্পাসে শুরু হয়ে গেল এক দফা হাসি-ঠাট্টায় ভরা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। আর তাদের সেই হৈচৈ দেখে আশপাশের সবাইও না হেসে পারল না।
আজ শেষ হলো তাদের বহুল প্রতীক্ষিত এইচএসসি জীবনের অধ্যায়। আজই ছিল শেষ পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হতেই কেন্দ্র থেকে সোজা সবাই চলে এসেছে কলেজে। পরিকল্পনাটা ছিল মেহরীনদেরই, এই কলেজ ড্রেস পড়ে হয়তো আর একত্রিত হওয়া হবে না। এজন্যই শেষবারের মতো সবাই একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটাবে কলেজে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আগেই সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তাই একে একে পরীক্ষা শেষে প্রায় পুরো ক্লাসই হাজির হয়েছে সেই চিরচেনা কলেজ প্রাঙ্গণে।
রাফি ছুটে এসে ধপ করে বসে পড়ল মাটিতে। তার দেখাদেখি বাকিরাও হাঁপাতে হাঁপাতে পাশে বসে গেল। তাদের বসতে দেখে মুহূর্তের মধ্যেই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বাকিরাও বসে পড়ল মাঠজুড়ে। সবার দৃষ্টি স্থির একই জায়গায়, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুইতলা বিশিষ্ট কলেজ ভবনটার দিকে। চারিদিকে আরও অনেক ভবন আছে। তবু ইট-পাথরের তৈরি এই সাধারণ ভবনটাই তাদের কাছে সবচেয়ে দামী। তাদের কাছে যেন এটা নিছক কোনো বিল্ডিং নয়, দুই বছরের জমে থাকা অগণিত স্মৃতির নীরব সাক্ষী। প্রথম বর্ষ কেটেছে দ্বিতীয় তলার ক্লাসরুমে। দ্বিতীয় বর্ষে নেমে এসেছে নিচতলায়। এই দুটো তলা জুড়েই ছড়িয়ে আছে তাদের হাসি, অভিমান, দুষ্টুমি আর কৈশোরের সবচেয়ে নির্মল সময়গুলো।
কখনো পানি আনার অজুহাতে পুরো কলেজ চক্কর দিয়ে এসেছে একেকজন। কখনো দেরি করে এসে টিচারের চোখ এড়িয়ে পেছনের দরজা দিয়ে নিঃশব্দে ক্লাসে ঢুকেছে। ক্লাস চলাকালীন গল্পগুজব করতে করতে পুরো ক্লাসের নামই ক্লাস ক্যাপটেন বোর্ডে লিখে ফেলত। আবার ঠিক স্যার কিংবা ম্যাডাম আসার আগ মুহুর্তে তড়িঘড়ি করে সব নাম মুছেও ফেলত।
তাদের পুরো ক্লাসের বন্ধুত্বটা ছিল গলায় গলায়। একজনের বিপদ মানেই যেন সবার বিপদ ছিল। এমনও দিন গেছে, একজন পড়া না পারায় স্যার তাকে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন দেখে বাকিরা পড়া জেনেও ইচ্ছে করেই উত্তর দেয়নি। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে স্যার পুরো ক্লাসকেই বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। শাস্তি পেয়েছিল সবাই, কিন্তু কারও মুখে অনুশোচনা ছিল না। বরং সবাই মিলে হেসেছিল, মজা করছিল। সেই শাস্তিটুকুও যেন এখন এক অমূল্য স্মৃতি।
আর টিফিন টাইম? পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ যেন তখন শুধু তাদের দখলেই থাকত। দৌড়ঝাঁপ, হাসাহাসি, একে অপরের টিফিন ভাগাভাগি, আড্ডা, প্রতিটা মুহূর্ত ছিল প্রাণবন্ত, নির্ভার, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর অংশ। আজ সেই সব স্মৃতি যেন একে একে ভেসে উঠছে চোখের সামনে। মনে হচ্ছে, এই তো সেদিন প্রথম দিন কলেজে এসেছিল তারা। একে অপরের সাথে পরিচিত হচ্ছিল। অথচ দেখতে দেখতে দুটি বছর কী অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ফুরিয়ে গেল।
যে দিনটার জন্য এতদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল সবাই, কলেজ জীবনের শেষ দিন, সেই দিনটিই আজ এসেছে। তবে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতাও এনে দিয়েছে। কোনো এক অজানা অস্থিরতা যেন সবাইকে নিঃশব্দে গ্রাস করে আছে। হয়তো এটাই বিদায়ের ভার। এই চেনা প্রাঙ্গণ, এই পরিচিত ভবন, এই প্রিয় মুখগুলোকে আর প্রতিদিন একসঙ্গে পাওয়া হবে না। এই উপলব্ধিটাই বুকের কোথাও তীব্র ব্যথা হয়ে বিঁধছে। চারদিকে নীরবতা। অথচ এই মানুষগুলো একত্র হলে তাদের নিরব করা কঠিন হতো স্যার ম্যামদের।
একেকজনের চোখ চিকচিক করছে। কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছে, কেউ আবার মাথা নিচু করে বসে আছে। কেউ সবচেয়ে কাছের বান্ধুবিকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। ঠিক তখনই ভিড়ের মাঝ থেকে ভেসে এল এক পরিচিত মোটা গলা। গলাটা শুনেই সবাই হেসে উঠল। এ আর কেউ নয়, তাদের সেই বিখ্যাত ক্লাস ক্যাপ্টেন। মেয়েটা তার ভারী কণ্ঠের জন্য পুরো কলেজেই আলাদা পরিচিতি ছিল। এজন্যই তাকে ক্যাপ্টেন হিসেবে সকলে ভোট দিয়েছিল। সকলে যখন চেচামেচিতে ব্যস্ত তখন তার এক চিৎকারই সকলকে কিছুক্ষণের জন্য চুপ করাতে সক্ষম হতো।
মেয়েটা সকলের সামনে এসেই দু’হাত উঁচু করে ঘোষণা দিল,
—আজ আমি ক্যামেরা এনেছি। শেষ দিনের আমাদের সবার শেষ স্মৃতিগুলো ক্যামেরায় বন্দি করে রাখব।
কথাটা শুনতেই মুহূর্তের মধ্যে যেন পরিবেশটা আবার প্রাণ ফিরে পেল। বিষণ্ন মুখগুলোতে ফুটে উঠল উজ্জ্বল হাসি। মেহরীন, ফারিনসহ কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—এই তো কাজের কাজ করেছিস। চল, আগে সবাই মিলে একটা গ্রুপ ছবি তুলি।
এক মুহূর্তও দেরি না করে পুরো ক্লাস কলেজ গেটের বাইরে চলে এল। গেটের ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা কলেজের নামটাকে পেছনে রেখে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ছেলেমেয়েদের সেই উচ্ছ্বাস দেখে দারোয়ান নিজেই এগিয়ে এল ছবি তুলে দিতে। লোকটা ক্যামেরাটা হাতে নিলেও তার চোখদুটো কেমন যেন ভিজে উঠছিল। এই দুই বছরে ছেলেমেয়েগুলোকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবেসে ফেলেছদ মানুষটা।
আজ তাদের বিদায়ের দিন। তার কাছেও দিনটা কম আবেগের নয়। কলেজের সামনের ছোট ছোট দোকানগুলোর কয়েকজন বিক্রেতাও দোকান ছেড়ে বাইরে চলে এল। হাসিমুখে শুভকামনা জানাল সবাইকে। শুধু কলেজের ভবন কিংবা কলেজের ভেতরকার মানুষজনের সঙ্গেই নয়, এই দুই বছরে কলেজের আশপাশের মানুষগুলোর সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য আত্মীয়তার বন্ধন।
ওরইমাঝে ক্যামেরার শাটারের শব্দের সঙ্গে যেন বন্দি হয়ে গেল এক টুকরো কৈশোর জীবনের শেষ স্মৃতি। যে মুহূর্ত আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। গ্রুপ ছবি তোলা শেষ করে সবাই চলে গেল অফিসরুমের দিকে। এক এক করে সব স্যার আর ম্যাডামের সঙ্গে ছবি তুলল সকলে। তাদের জন্য আগে থেকেই ফুল নিয়ে এসেছিল সবাই। একজন একজন করে এগিয়ে গিয়ে প্রিয় শিক্ষকদের হাতে ফুল তুলে দিতে লাগল।
তবে মেহরীন, তাহিয়া আর ফারিনের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলল। দু’জনে চোখাচোখি করে মুঁচকি হেসে একটা ফুলের তোড়াটা গুঁজে দিল তনিমার হাতে। তারপর প্রায় ঠেলেই তাহসানের সামনে পাঠিয়ে দিল তাকে। তনিমা অসহায়ের মতো একবার বন্ধুদের দিকে তাকাল। ওরা শুধু দাঁত বের করে হাসছে। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল সে। উপায় না পেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তাহসানের দিকে।
সেদিনের ক্যাফের সেই ঘটনার পর থেকে মানুষটাকে দেখলেই কেন যেন বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠত। অন্যরকম অনুভূতি হত। প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কৃতজ্ঞতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতিটা নীরবে অন্য এক রূপ নিতে শুরু করেছিল। অজান্তেই ভালো লাগতে শুরু করেছিল মানুষটাকে। আর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা সে করেছিল নিজের হাতেই। নিজের প্রাণের বন্ধুদের কাছে একদিন অসাবধানতাবশত সেই অনুভূতির কথা বলে ফেলেছিল। ব্যস! সেদিন থেকেই নিজের জন্য নিজেই বাঁশ গেড়ে রেখেছে সে। এখন সুযোগ পেলেই ওরা তাকে কোনো না কোনো অজুহাতে তাহসানের সামনে ঠেলে দেয়।
তনিমাকে দেখেই তাহসান মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
—আজকের পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
তনিমাও মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই হয়েছে স্যার।
—যাক। কলেজ পার করেছ বলে নিজেকে আবার বেশি বড় মনে করতে যেয়ো না। পরিবারের কথা শুনে চলবে।
তনিমা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। তারপর ফুলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—স্যার, আপনার জন্য।
তাহসান ফুলটা নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
—বাকিদের তো অন্য ফুল দিচ্ছে, আমাকে গোলাপ কেন?
কথাটা শুনেই তনিমার যেন হিচকি উঠে গেল। একের পর এক হিচকি তুলতে তুলতেই তাহসানের হাতের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকাল। সত্যিই তার হাতে গোলাপ। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ঘুরিয়ে দেখল, অন্য সব শিক্ষকের হাতে রজনীগন্ধার স্টিক। মুহূর্তেই যেন মাথায় বাজ পড়ল তার। মেহরীন তাড়াহুড়ো করে তার হাতে যেই ফুল গুঁজে দিয়েছিল, সেটা না দেখেই নিয়ে চলে এসেছে সে। অস্বস্তিতে মুখ লাল হয়ে উঠল বেচারির। ঘাড় ঘুরিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীনদের দিকে তাকাতেই তারা চোখ টিপে ইশারায় ‘অল দ্য বেস্ট’ জানাল। সে দাঁতে দাঁত চেপে রাগ দেখাতেই তারা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে অন্যদিকে ফিরল।
তাকে এমন অস্থির দেখে তাহসান কপাল কুঁচকে বলল,
—পানি খাবে?
তনিমা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। তারপর আমতা আমতা করে তাহসানের হাত থেকে ছোঁ মেরে গোলাপটা নিয়ে বলল,
—স..সরি স্যার। ভুল করে আপনাকে এটা দিয়ে ফেলেছি। আপনার জন্য রজনীগন্ধার স্টিক ছিল। এক মিনিট, আমি এখনই এনে দিচ্ছি।
বলেই ঘুরে যেতে নিল। পেছন থেকেই তাহসানের শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল,
—তনিমা।
সে থেমে গেল। ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল। তাহসান মৃদু হেসে বলল,
—থাক, বদলানোর দরকার নেই।
তনিমাকে অবাক করে দিয়ে তাহসান গোলাপটা আবার তার হাত থেকে নিয়ে বলল,
—আমার এটাই পছন্দ হয়েছে। এটাই থাক।
কথাটা বলেই সে অন্য শিক্ষকদের দিকে এগিয়ে গেল। আর তনিমা সেখানেই কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষন। মুঁচকি হেসে ফিরে গেল বান্ধুবিদের কাছে। সবাই বসে আছে কলেজের প্রধান ভবনের প্রশস্ত সিঁড়িগুলোতে। প্রথম দুটো ধাপে ছেলেরা, আর তার পরের ধাপগুলো জুড়ে মেয়েরা। সামনে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে আছে তাহসান। ছাত্রছাত্রীদের এই শেষ মুহূর্তগুলো ফ্রেমে বন্দি করতে সে নিজ ইচ্ছাতেই এগিয়ে এসেছে।
আজ তার মনে হচ্ছে, শিক্ষকতার পেশা বেছে নেওয়া জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এই ছেলেমেয়েগুলোকে চোখের সামনে বড় হতে দেখা, তাদের হাসি-কান্না, দুষ্টুমি, অভিমান আর স্বপ্নের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা, এসবের তুলনা হয় না। ওদের হাসিমুখগুলো দেখলেই বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক তৃপ্তিতে ভরে ওঠে।
মুঁচকি হেসে সে বলল,
—আমি এক দুই তিন বললে দুই পাশ থেকে একজন করে পাশের জনের কাঁধে মাথা রাখবে। ওকে?
সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
—ওকে, স্যার!
তাহসান হেসে গুনতে শুরু করল,
—ওয়ান… টু… থ্রি…
মুহূর্তেই দুই পাশ থেকে সবাই একে অপরের কাঁধে মাথা রাখতে লাগল। সবশেষে মাঝে বসে থাকা ছেলে মেয়েগুলোর দুকাধে দুটো মাথা রাখতেই সে হাসিমুখে দু’হাত বাড়িয়ে দুপাশের বন্ধুদের জড়িয়ে নিল। কেউ মাথা কাত করল, কেউ চোখ বন্ধ করে হেসে উঠল। সেই মুহূর্তটা পুরোটা ভিডিও করে নিল তাহসান।
ঠিক তখনই পেছন দিক থেকে কেউ গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“আমার এ ক্লান্ত বিকেল,
বুকে হাওয়া লাগিয়ে হাঁটা কতটা পথ,
হেঁটেছি গন্তব্যহীন,
চেনা এ শহরের গলি…”
একজনের কণ্ঠে শুরু হওয়া গান মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল সবার মাঝে। একে একে সবাই গলা মেলাল,
“তোদের মাঝে যখন থাকি আমি,
পৃথিবী তখন আপন লাগে।
তোরা ভুলে যাস না কখনো,
আমাদের বন্ধুত্ব রঙিন
কোনো ঘুড়ির মতো…”
গাইতে গাইতেই কারও চোখ ঝাপসা হয়ে এল। কারও কণ্ঠ কেঁপে উঠল। কেউ হাসতে হাসতেই চোখ মুছছে, আবার কেউ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সহপাঠীর কাধে মাথা রেখেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা তাহসানও কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে রইল। ভিডিও বন্ধ করলো। গলা ভারী হয়ে এসেছে তারও। তবু হাসার চেষ্টা করে তাদের স্বান্তনা দিত্ব বলল,
—কান্নাকাটি একদম না। কলেজ শেষ হয়েছে, বন্ধুত্ব না। সত্যিকারের বন্ধুত্ব দূরত্বে হারিয়ে যায় না। আশা করি, সবাই আজীবন যোগাযোগে থাকবে।
তার কথায় সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল,
—জ্বি, স্যার!
তখনই টুপটাপ করে বৃষ্টি নামল। মনে হলো, আকাশও যেন এই বিদায়ের সাক্ষী হয়ে নীরবে কাঁদছে। মুহূর্তেই কে যেন চিৎকার করে উঠল,
—চল আমরা শেষবারের মতো বৃষ্টিতে ভিজি।
ব্যস এ কথাই যেন যথেষ্ট ছিল। এক নিমিষেই সবাই ছুটে গেল মাঠের দিকে। কেউ দু’হাত ছড়িয়ে বৃষ্টিকে বরণ করে নিল, কেউ বন্ধুর হাত ধরে ঘুরতে লাগল, কেউ আবার একে অপরকে পানি ছিটিয়ে হেসে কুটিকুটি। হাসি, কান্না, চিৎকার, উল্লাস সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল বৃষ্টির তালে। হঠাৎ আকাশ গর্জে উঠতেই সকলে ভয় পেয়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে পরমুহূর্তেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীরাও তাদের সিনিয়র ভাই-বোনদের এইসব বাচ্চামো দেখছে। তাদের বুকেও চাঁপা কষ্ট অনুভব করলো। একদন তাদেরও এমন দিন আসবে এই কলেজ ছেড়ে সহপাঠী ছেড়ে যেতে হবে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নীরবে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। কারও ঠোঁটে হাসি, কারও চোখে জল। এই মাঠেই একদিন প্রথম পা রেখেছিল ওরা। আজ সেই মাঠেই শেষবারের মতো নিজেদের ছড়িয়ে দিয়ে বিদায় নিচ্ছে। এটাই সময়ের নিয়ম।
বৃষ্টির মাঝেই একে একে সবাই বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। হাসি-ঠাট্টা করতে করতেই কলেজ গেট পেরোচ্ছিল তারা। ঠিক তখনই অসাবধানতাবশত সামনে থাকা এক বখাটে ছেলের সঙ্গে ধাক্কা খেল রাফি। সে তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল,
—সরি ভাইয়া, খেয়াল করিনি।
তবু ছেলেটা রুঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
—খেয়াল করোনি? চোখ কই থাকে, বাসায় রেখে এসেছো নাকি?
ত্যাড়া কথা শুনে রাফির রগও যেন সঙ্গে সঙ্গে ত্যাড়া হয়ে গেল। সেও ত্যাড়া গলায়ই জবাব দিল,
—জি, বাসাতেই রেখে এসেছি।
একে তো ধাক্কা দিয়েছে, তার ওপর আবার এমন জবাব। মুহূর্তেই ক্ষেপে গিয়ে ছেলেটা রাফির শার্টের কলার চেপে ধরল। তার সঙ্গের কয়েকজনও মারতে এগিয়ে এল। ছেলেটা রাফিকে ঘুষি মারতে হাত উঠাতেই থেমে গেল। রাফির পেছন থেকে বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠল অসংখ্য কণ্ঠ,
—খবরদার ওর গায়ে হাত লাগালে আমাদের একটা করে হাত আপনার গায়ে পড়বে।
কথাটা শুনে ছেলেটা রাফির পেছনে তাকাল। বাকি ছেলেগুলোও পিছিয়ে এল। কারণ মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ব্যাচ রাফির পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এতগুলো ছেলেমেয়ে একত্রে দেখে কিছুটা ভড়কাল। ছেলেরা সামনে মুখিয়ে আছে, যেন রাফিকে মারতে হাতটা এগোলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে তারা। আর মেয়েদের চোখেমুখেও স্পষ্ট রাগ।
একসঙ্গে এতগুলো মানুষের দৃঢ় অবস্থান দেখে বখাটে ছেলেটারও মুখের দম্ভ মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। ঢোক গিলে ধীরে ধীরে রাফির কলার ছেড়ে দিল। এক পা পিছিয়ে গিয়ে সাঙ্গুপাঙ্গুদের নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই তনিমা, মেহরীন, তাহিয়া আর ফারিন সামনে এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়াল।
তনিমা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—কি ভাইয়ে, যাচ্ছেন কোথায়? বিনা কারণে আমার বন্ধুর কলার ধরেছেন, এখন সরি না বলেই চলে যাচ্ছেন?
তাহিয়া কঠোর স্বরে যোগ করল,
—এক্ষুনি মাফ চান।
সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে আরও অনেকেই বলে উঠল,
—হ্যাঁ, আগে ক্ষমা চান!
—সরি বলেন!
এতগুলো মানুষের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই দাঁতে দাঁত চেপে তারা বলল,
—সরি।
কথাটা বলেই দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল। ছেলেগুলো চোখের আড়াল হতেই আবারও পুরো দলে হাসির রোল পড়ে গেল। কেউ রাফির কাঁধে চাপড় মারল, কেউ বলল,
—বখাটে গুলো মারামারি করার পথ খুঁজছিল। তবে আমাদের দেখে সাহস পায়নি।
কেউ হাত গোটাতে গোটাতে বলল,
—মারলে ও কি আস্ত থাকতো। এমন কেলানি দিতাম না দুইমাস বেড থেকে উঠতে পারতো না।
তনিমা বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৬
—তোদের ছেলেদেএ পেটানো লাগতো না। আমরা সবকটা মেয়ে মিলে এমন ছ্যাচা দিতাম না লজ্জায় কাউকে বলতেও পারতো না।
তাদের একেকজনের ক্রুধভরা কন্ঠে শুনে রাফি শুধু মুচকি হেসে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর থেকে অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
