Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৩
সাইদা মুন

চারপাশে তখন রীতিমতো রমরমা পরিবেশ। হলুদের ছবির পালা শেষ করে সবাই এখন নিজ নিজ আসনে বসেছে। স্টেজের সামনে বিশাল জায়গাজুড়ে দর্শকদের আসর জমে উঠেছে। মেয়েরা টানা কয়েকটি গানে নেচে মাতিয়ে দেওয়ার পর এবার ঘনিয়ে এসেছে সেই বহুল প্রতীক্ষিত নাচের কম্পিটিশন। মেহেদি মাইক হাতে স্টেজে উঠে দাঁড়াল। চারপাশে চোখ বুলিয়ে হাসিমুখে বলল,
—আপনারা সবাই রেডি তো?
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে একযোগে আওয়াজ এলো,
—ইয়েস!
মেহেদি ভ্রু কুঁচকে কানটা একটু এগিয়ে দিয়ে বলল,
—কি বললেন? শুনলাম না তো! এনার্জি কি এখানেই শেষ? আমাদের সঙ্গে নাচবেন কীভাবে তাহলে?
এবার সবাই আরও দ্বিগুণ জোরে চিৎকার করে সাড়া দিল।

—ইয়েস।
মেহেদি এবার রিশাদদের দিকে তাকাল। ওরা ইশারায় অল ওকে দেখাতেই সে মুচকি হেসে বলল,
—আমরা সবাই জানি, লেডিস ফার্স্ট। তাই আজও এর ব্যতিক্রম হতে দেব না। মহিলাসমাজ, স্টেজ আপনাদের। তবে গানটা থাকবে আমাদের।
বলেই মাইক হাতে স্টেজ থেকে নেমে গেল। তাহিয়া, ফারিন, তনিমাসহ মেয়েরা বেশ ভাব নিয়ে স্টেজে উঠে দাঁড়াল। একে একে সবাই নিজেদের জায়গা ঠিক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। নাচের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত তারা। ওদের পজিশন নেওয়া দেখে রাফি মাইক হাতে জিজ্ঞেস করল,
—রেডি তো? গান বাজাবো?
তাহিয়া আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,
—ইয়েস, রেডি। বাজাও গান।
রাফি মুচকি হেসে বলল,

—পারবি তো নাচতে? এখনো সময় আছে, মান-সম্মান বাঁচাতে হার মেনে নে।
তাহিয়া দাঁত পিষে তাকিয়ে বলল,
—বেশি ফটর ফটর করিস না। আমরা কথায় না, কাজে দেখাই। সো, স্টার্ট।
ছেলেরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গান বেজে উঠল। কিন্তু যেই গান বেজে উঠল তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না মেয়েরা। সবাই যে যার পরিকল্পিত স্টেপ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু গানটা কানে যেতেই একে একে সবার পা থেমে গেল। মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও। বক্সে গান বাজছে,

“বাপ মায়েরা মেয়েদেরকে শাসন করে না,
রাতে দশটার আগে তারা বাড়ি ফেরে না…
নিত্য নতুন ফ্যাশন করে চুলে করে রং,
কথায় কথায় ইংলিশ ঝাড়ে দেখি কতো ডং…”
অবাক হয়ে একে অপরের দিকা তাকাচ্ছে। ছেলেদের চালাকি বুঝতে আর সময় লাগল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একেকজনের চোখেমুখে রাগ ফুটে উঠল। সামনের দর্শক সারিতে তখন হাসির রেশ গান শুনে। আর ছেলেরা? তারা দিব্যি বুকের ওপর হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে বাঁকা হাসি।
রেগেমেগে চিৎকার করে উঠল মেয়েরা,
—এই মানি না। এটা কেমন গান? এসব চিটিং।
—হ্যাঁ, এটা কোনো নাচের গান হলো? এটা তো ডাইরেক্ট বাটপারি।
—কী যাতা-মাতা দিছিস। এই গান বন্ধ কর মেহেদির বাচ্চা।
ওদিকে ছেলেদের হাসি যেন আরও বেড়ে গেল। রিশাদ টিটকারি মেরে বলল,
—কথায় আছে না, নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা।
ব্যস! আর যায় কোথায়? একে একে মেয়েরা তেড়ে গেল ছেলেদের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই স্টেজের সামনে জমে গেল ছোটখাটো এক ভিড়। একদল আরেকদলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তুমুল তর্কে মেতে উঠল। মেয়েরা চিৎকার করে বলছে,

—এইটা চিটিং!
ছেলেরা পাল্টা বলছে,
—কিসের চিটিং? ইটস রুল!
তাহিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
—চিটিংবাজের দল। রুলসের নাম দিয়ে চিটিং করছে।
তুর্য সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল,
—হপ! আমরা কোনো চিটিং করিনি। আমরা তো শুধু গান দিয়েছি!
ফারিন রেগেমেগে বলল,
—এই গানে নাচা যায়?
রিশাদ তখন আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। কোমরে হাত দিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বলল,

—এই যে, নাচা যায়। আমি তো নাচতেই পারছি। এই, তোরা নাচিস না কেন?
বলেই সে কোমরে হাত দিয়ে কোমর দোলাতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে বাকি ছেলেরাও তার সঙ্গে যোগ দিল। একসঙ্গে কোমর দুলিয়ে, অদ্ভুত সব ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করল সবাই। ছেলেদের এমন কাণ্ড দেখে মেয়েদের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। আর তাদের সেই রাগান্বিত মুখ দেখে ছেলেরা তো বেশ মজা লুটছে।
একসময় পরিস্থিতি দেখে বিল্লাল সাহেব সাবধান করতে বললেন,
—কোনো বিশৃঙ্খলা যেন না হয়।
বড়দের কথা শুনে মেয়েরা শেষমেশ একটু দমে গেল। তবে চোখেমুখে স্পষ্ট প্রতিশোধের ঝিলিক। কারণ এবার পালা ছেলেদের। এদের এবার অপদস্ত না করলেনয়। মেয়েরা সরে যেতেই ছেলেরা একে একে স্টেজে উঠে দাঁড়াল। এবার তাদের প্রত্যেকের মুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ দ্বিগুন। একই রঙের পাঞ্জাবি, গলায় সাদা ওড়না আর সাদা প্যান্ট, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে বেশ সুন্দর লাগছে। একেকজন দুহাত বুকের ওপর গুঁজে, বুক ফুলিয়ে, একেবারে ফুল কনফিডেন্সে পোজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে থেকে মুহূর্তেই ভেসে এলো উল্লাস আর চিৎকার,

—ওওওওও!
—চলবে মামা চলবে।
—এবার দেখিয়ে দে!
এদিকে মেয়েরা নিজেদের রাগ সংবরণ করে এবার ভাবতে লাগল, কীভাবে এদের একটু উচিত শিক্ষা দেওয়া যায়। ছেলেদের আত্মবিশ্বাসী মুখগুলো দেখে সবারই মেজাজ আরও খারাপ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ তনিমার মাথায় একটা আইডিয়া এলো। চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলল,
—এই, নকিয়ার রিংটোন দিলে কেমন হয়?
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—হ্যাঁ হ্যাঁ! এটাই ভালো হবে। এরা নাচটাচ কিছুই পারে না, এর সঙ্গে তো নাচতেই পারবে না।
—তাহলে বাজা এটাই।
বলতেই মেয়েদের মুখে যেন একটু শান্তির ছাপ ফুটে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গান বাজাল। গান শুরু হতেই আশপাশ থেকে আবারও উচ্চহাসির শব্দ ভেসে এলো। ছেলে-মেয়েদের এই নাচের লড়াইটা তখন বেশ জমে উঠেছে। ছোট-বড় সবাই সমানভাবে উপভোগ করছে।

মেহরীন তো হাসতে হাসতে কাহিল। আর তার পাশেই তালহার অন্যরকম ব্যস্ততা। মেহরীন একটু নড়াচড়া করলেই মাথা থেকে দোপাট্টা সরে যাচ্ছে, তো টিকলি নড়ে যাচ্ছে, আর তালহা কয়েক মুহূর্ত পরপর ঠিক করে দিচ্ছে। বউ তার মতো করে আনন্দ করছে, আর স্বামী সাহেবের ব্যস্ততা শুধু বউয়ের দেখভালেই।
এদিকে প্রথম কয়েক সেকেন্ড ছেলেরা একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। যেন কেউই বুঝতে পারছে না, এই গানের সঙ্গে আসলে কী করা উচিত। হঠাৎ রিশাদ চেঁচিয়ে উঠল,
—ভাই, জীবনে যা যা শিখছিস, সব একসঙ্গে অ্যাপ্লাই কর। মনে কর সকলেএ হিডেন ট্যালেন্ট দেখানোর সুযোগ পেয়েছিস।

ব্যস! শুরু হয়ে গেল তাদের তাণ্ডব। একেকজন যে যার মতো করে নাচতে শুরু করল। কোনো তাল-লয় নেই, কোনো নিয়ম নেই, শুধু বিটের সঙ্গে মিলিয়ে ক্ষণে ক্ষণে লাফিয়ে ওঠা। এভাবেই লাফালাফির মাঝে হঠাৎ সবাই থেমে পিছিয়ে গেল পেছন থেকে মাঝখানে এসে দাঁড়াল রাফি। ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে একদিকে কাত হয়ে এমন এক পোজ দিয়ে দাঁড়াল, যেন সিনেমার কোনো অ্যাকশন হিরো। তার স্টেপ শেষ হতেই সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা লাফিয়ে উঠে আবার নাচ শুরু করল। এরপর মাঝখানে এলো মেহেদি। শুরু করল তার নিজস্ব রোবটিক নাচ। কয়েকটা অদ্ভুত মুভমেন্টের পর হঠাৎ পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর তার পোজ শেষ হতে না হতেই বাকিরা আবারও উল্লাসে লাফিয়ে উঠল। এরপর একে একে সবাই নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শনে নেমে পড়ল। কেউ লাফ দিয়ে ঘুরে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কেউ লুঙ্গি ড্যান্সের মতো কোমর দোলাচ্ছে, কেউ আবার এমন সব অদ্ভুত ভঙ্গি করছে যার কোনো ব্যাখ্যাই নেই। মানে থামাথামির কোনো নামগন্ধ নেই! গান যতক্ষণ বাজছে, ততক্ষণ তারা নিজেদের মতো করে পুরোপুরি উপভোগ করে যাচ্ছে।

সামনে বসা দর্শকরাও আর চুপচাপ বসে নেই। একেকজন হাসতে হাসতে এর গায়ে ও পড়ছে। চারপাশে হাসি, চিৎকার আর হাততালিতে পরিবেশ একেবারে জমজমাট। তবে মেয়েদের মুখ দেখার মতো। স্টেজের পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেদের এমন উদ্ভট নাচ দেখে একেকজন মুখ লটকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে, কোনো চিড়িয়াখানা থেকে একদল বানর এনে স্টেজের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নাচের সঙ্গে তালমিলের তো কোনো বালাই নেই, তার ওপর এমন উড়াধুরা নাচ।
তাহিয়া আর সহ্য করতে না পেরে রেগেমেগে মাইক হাতে নিয়ে বলল,
—আচ্ছা, এবার নাচাচ্ছি ভালো করে একদম কুত্তা ডান্স।
বলেই সঙ্গে সঙ্গে বাজিয়ে দিল সেই ভাইরাল তামিল গান “Ichu Ichu”। পরিচিত গান বাজতেই ছেলেরা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেদেরমধ্যে বুদ্ধি এটে নিল। এবার যেন স্টেজে শুধু নাচই না নাটক ও পরিবেশন করবে এরা।

রাফি মাথায় ওড়না দিয়ে মেয়ের সাজ ধরল। এক পাশে রাফি, অন্য পাশে মেহেদি, মাঝখানে তাদের বয়সী আরেকটা ছেলে। তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যেতেই মাঝখানের ছেলেটা আচমকা জুতোর দিকে তাকিয়ে বসে পড়ল। এদিকে ছেলেটা বসে পড়ায় রাফি আর মেহেদি ভুলবশত তাকে ফেলেই একে অপরের হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল। পেছনে পড়ে থাকা ছেলেটা তাদের হাত ধরাধরি দেখে রাগে-বিরহে হাততালি দিতে দিতে উঠে দাঁড়াল। সাথে সাথে সবাই ছুটে এসে নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল। গানের সেই পরিচিত অংশ বাজতেই সবাই একসঙ্গে শুরু করল সেই বহুল পরিচিত হাস্কি ড্যান্স। এবার যেন আনন্দের মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে গেল। ছোটদের সঙ্গে বড়রাও হেসে উঠেছেন। পুরো পরিবেশটাই মুহূর্তে পরিণত হয়েছে এক বিশাল আনন্দের আসরে। অবশেষে দীর্ঘ নাচের পর গান থামতেই একে একে সবাই স্টেজ থেকে নেমে এলো।
মেয়েদের তখন রাগে একেবারে ফুলেফেঁপে অবস্থা। একেকজন মুখ গোমড়া করে নিজেদের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। মেহেদি আবার মাইক হাতে স্টেজে উঠে দাঁড়াল। মুখে দুষ্টু হাসি,

—তো, দর্শক। এবার সিদ্ধান্ত আপনাদের হাতেই। কে জিতেছে? ছেলেরা, নাকি মে..
বাকিটা আর বলতে পারল না। চারপাশ থেকে একসঙ্গে কন্ঠ এল,
—ছেলেরা।
একথা শুনেই ছেলেদের ভাব যেন একেবারে আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। একেকজন মেয়েদের দিকে তাকিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে ইশারা করছে, দেখেছ? আমরা পেরেছি। আর মেয়েরা? তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে যদি চোখের দৃষ্টিতেই মানুষ পুড়িয়ে ফেলা যেত, তাহলে স্টেজের ওপর ছেলেদের ছাই ছাড়া আর কিছুই থাকত না।
এসব হৈ-হুল্লোড় আর হাসি-ঠাট্টার মাঝেই আচমকা বদলে গেল গানের সুর। স্টেজজুড়ে বেজে উঠল “মেরে সাইয়্যা সুপারস্টার” গানটার সুর। স্টেজে তখন কেউ নেই। সবাই অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার স্টেজের দিকে চেয়ে রইল, এই গানে নাচবে কে? ঠিক তখনই তালহার পাশে বসে থাকা মেহরীন আচমকা তার হাত সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।

তালহা কপাল কুঁচকে অবাক চোখে তাকাতেই মেহরীন মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে স্টেজের ঠিক নিচে, তালহার সামনে দাঁড়াল। গানের প্রথম সুরে তাল মেলাতে দুহাত কোমরে রেখে কোমর নাড়িয়ে নাচ শুরু করল সে। সঙ্গে সঙ্গেই ছেলেদের দল থেকে শিস আর উল্লাস ভেসে এলো। “ভাবি ফাটাই দিচ্ছেন”, ” ভাবি চলবে…” এমন নানান উৎসাহমূলক কথা। এর মধ্যেই পেছনে এসে দাঁড়াল তাহিয়া, তনিমা, ফারিন, ফারিহা, রাফাসহ বাকিরা। একে একে সবাই মেহরীনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে শুরু করল।
“Hai Wo Handsome Sona Sabse..
Mere Dilko gaya le kaar..
Mere Neend Churali Usne..
Aur khab Gaya Dekar…”

গানের তালে তালে মেহরীন বারবার তালহার দিকে ইশারা করে গালভরা হাসিতে একের পর এক নাচের স্টেপ দিতে লাগল। তালহা যেন একেবারেই প্রস্তুত ছিল না এমন কিছুর জন্য। একপর্যায়ে মুখে হাত চাপা দিয়ে মুচকি হেসে ফেলল সে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময়, আর তার থেকেও বেশি মুগ্ধতা। তালহা এবার ঠোঁট কামড়ে হাসল। পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় হেলান দিয়ে বসে একমনে উপভোগ করতে লাগল তার বউয়ের নাচ। চোখ যেন সরছেই না। গানের তালে মেহরীনের প্রতিটি স্টেপের সঙ্গে তালহার মুখের হাসিটাও যেন আরও গভীর হতে লাগল।

“Ab yee Neena Bole Yaar..
Bole Yehi Lagatar…
Koi Chaahe..
Kitna Rooke…
Karungi pyaaaar…”
একপর্যায়ে মেহরীন দুহাত দিয়ে হৃদয়ের আকৃতি বানিয়ে সরাসরি তালহার দিকে ছুড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করল। এতে তালহা সঙ্গে সঙ্গে বুকে হাত চেপে সোফায় হেলে পড়ল। যেন তা এসে একদম বুকে বিধেছে। এতেই যেন উল্লাস আরও বেড়ে গেল। কম-বয়সী মেয়ে ছেলেরা তো চিল্লিয়ে উঠল। চারপাশ থেকে মুহূর্তেই চিৎকার আর শিসের শব্দে পরিবেশ আরও চঞ্চল হয়ে উঠল।
মেহরীন ফিক করে হেসে ফেলল। এরপর আবার তালহার দিকে তাকিয়ে নাচতে নাচতে হাতের ইশারায় যেন তাকে নিয়েই নিজের মনের কথাটা বলে যেতে লাগল গানের তালে তালে,

“Mere Saiyaan Superstar..
Mere Saiyaan Superstar…
Main Fan Hui Unki…
Mere Saiyaan Superstar… ”
গানের শেষ অংশে এসে মেহরীন দুহাত ছড়িয়ে তালহার দিকে তাকিয়ে নাচ শেষ করতেই চারিদিক থেকে ভেসে এল করতালি। হাসিমুখে মেহরীন এল তালহার কাছে জিজ্ঞেস করল,
—হু, কেমন?
তালহা যেন এতক্ষণে বাস্তবে ফিরল। নড়েচড়ে বসে কপাল কুঁচকে বলল,
—হু? কী কেমন?
মেহরীন ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানের ভঙ্গিতে বলল,
—নাচলাম যে, দেখেননি?
তালহা মাথা চুলকে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—আসলে তোমাকে দেখতে গিয়ে নাচটাই মিস হয়ে গেল।

কথাটা শেষ হতেই তাহিয়ার দিক থেকে একটা জোরালো শিস ভেসে এলো। বাকিরাও বলতে লাগল “ওহহো লাভারবয়”। মেহরীনের মুখ মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। কাচুমাচু হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। মেহরীনের এমন অবস্থা দেখে তালহা আর বসে থাকল না। উঠে দাঁড়িয়ে রিশাদের কাছ থেকে মাইকটা নিয়ে ধীর পায়ে মেহরীনের দিকে এগিয়ে গেল। হাসিমুখে বলল,
—আপনি কি জানেন, আপনাকে দেখতে দেখতে এতক্ষণ আমার মন কোন গানটা গুনগুন করছিল?
মেহরীন ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
—কোন গান?
আশপাশ থেকেও সাড়া এল,
—ভাই আমরাও শুনতে চাই কোন গান।
তালহা মেহরীনের বাম হাতটা আলতো করে আঁকড়ে ধরল। তারপর তাকে টেনে নিজের কাছাকাছি আনলো। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই খালি গলায় গেয়ে উঠল,

“নেমে এল চাঁদ আকাশ থেকে ধুলোমাখা গলিতে…
রঙ-চটা দিন করলো রঙ্গিন স্বপ্নের তুলিলে…
দেখে ওই হাসি, আমি বান ভাসি, মন ডুবে যেতে চায়..
তার ওই চাওয়া, ঝড়ো হাওয়া, কেন পাগল করে যায়…
প্রেম আমার হো হো প্রেম আমার হোওওওও…”
গাবটা শুরু করতেই চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক মায়া। মেহরীন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুগ্ধতায় ছেয়ে গেছে তার মন। গানের শেষের অংশের “প্রেম আমার ” গেতে গেতে তালহা মেহরীনের হাতটা একটু উঁচু করে তাকে ঘুরাতে লাগল। মেহরীনও প্রশস্ত হেসে তালহার তালে তালে ঘুরতে লাগল। চারপাশের হৈ-হুল্লোড় মুহূর্তের জন্য থেমে এই সুন্দর দৃশ্যটা উপভোগ করছে।

সিকদার আর আহমেদ পরিবারের সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছে তাদের এই ছোট্ট মিলনমুহূর্ত। তিতলি বেগমের চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল জল। আহমেদ পরিবারের অন্যদের চোখেও খুশির ঝিলিক। কারও মুখে কোনো কথা নেই। সবাই চোখ ভরে দেখছে তাদের প্রাণগুলোকে। একেকজনের বুকের ভেতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসছে অগণিত দোয়া, এই ভালোবাসা যেন এমনই অটুট থাকে, এই হাসি যেন কখনো মলিন না হয়।
স্টেজের সামনেই তখন ছেলেমেয়েরা জড়ো হয়ে আবারও হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে। হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দে চারপাশ মুখরিত। এরই মাঝে সকলের চোখের আড়ালে ধীরে ধীরে উঠে বাড়ির দিকে চলে গেলেন তিতলি বেগম। তালহা সবার সঙ্গে হাসিঠাট্টার মাঝেই বিষয়টা লক্ষ্য করল। মায়ের চলে যাওয়ার দিকে একবার তাকিয়ে কোনো কথা না বলে সবার মাঝ থেকে বেরিয়ে এল সেও। তারপর নিঃশব্দে পিছু নিল মায়ের। তিতলি বেগম বাড়ির সামনে এসে ভেতরে ঢুকলেন না। সোজা পা বাড়ালেন বাড়ির পেছনের সেই নির্জন কবরস্থানের দিকে। কবরস্থানের দিকে এগোতেই যেন হঠাৎ তাঁর পা দুটো ভারী হয়ে এলো। ধীর হয়ে গেল হাঁটার গতি। সামনে যে তাঁর পুরো পৃথিবীটা শুয়ে আছে।
ডেকোরেশনের মৃদু আলোয় কবরস্থানটা আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। তিতলি বেগম কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে যেন শরীরের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে এলো। কবরের পাশে বসে পড়লেন তিনি। কবরের ওপর বড় একটি নীল পলিথিন দিয়ে ঢাকা। বৃষ্টির পানি যাতে মাটিতে না লাগে, সেজন্যই দেওয়া হয়েছে। সেই পলিথিনের ওপর স্বামীর বুক বরাবর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন তিনি। মুহূর্তেই বুক ফেটে হুহু করে কান্না বেরিয়ে এলো। কাঁপা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বললেন,

—জানো, আমাদের তালহা অনেক ভালো একটা মেয়ে পেয়েছে। আমাদের ছেলেটার মুখের হাসিটা দেখেছো? মনে হচ্ছে যেন পুরো পৃথিবীর সুখ পেয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ থেমে কান্নাটা সামলে নিলেন। তারপর হঠাৎ কপট রাগে গলা ভারী করে বললেন,
—ওহ, তুমি কী করে দেখবে? তুমি তো অলস ব্যাটাছেলে। দায়িত্বকে ভয় পেয়ে মাটির নিচে শুয়ে পড়েছো। ছেলে-মেয়ের বিয়ের সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে কী আরামেই না আছো। যেন ছেলে-মেয়ে সব আমার একার, হাহ।
কথার শেষদিকে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল বললেন,
—পরকালে একবার দেখা হোক, আচ্ছামতো শায়েস্তা করব তোমাকে।
শেষ কথাটা বলতে বলতে মুচকি হাসলেন তিনি। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্বামীকে অনুভব করার চেষ্টা করলেন। মাটির নিচে আজ এত বছর পর হয়তো পড়ে আছে শুধু হাড়গোড়। তবুও তিতলি বেগমের কাছে এই মাটির নিচেই তো তাঁর মানুষটা আছে। তাঁর ভালোবাসা আছে। তাঁর সংসারের অর্ধেকটা আছে। কিছুক্ষণ নীরবে পড়ে থেকে আবারও হঠাৎ কেঁদে উঠলেন তিনি।

—কেন চলে গেলে আমাদের ছেড়ে? আমার ছেলেটা আজ বাবা ছাড়া বিয়ে করছে। নিজেকে খুব শক্ত দেখাচ্ছে সে। কিন্তু তার মনে যে কত কষ্ট, তা কি আমি মা হয়ে বুঝি না? তুমি আমাদের ছেলেটার জন্য অন্তত থেকে যেতে পারতে।
এবার কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে কাঁপছিল তাঁর পুরো শরীর। ঠিক তখনই কাঁধে কারও হাতের স্পর্শ পেয়ে থেমে গেলেন তিনি। ধীরে ধীরে কান্নাভেজা মুখটা তুলে তাকাতেই দেখলেন, তালহা দাঁড়িয়ে আছে। ছেলের চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। ছেলেকে দেখামাত্রই তিতলি বেগম তাকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলেন। এবার যেন এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা কান্নার বাঁধটা পুরোপুরি ভেঙে গেল। একসময় তালহা মায়ের মুখটা দুহাতের আজলায় তুলে নিল। নিজের আঙুলে মায়ের দুগাল বেয়ে নামা অশ্রুগুলো মুছে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তুমি আবারও আমার আব্বুকে বকছো?
তিতলি বেগম কান্নার মাঝেও গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বললেন,
—তোর আব্বু একটা স্বার্থপর লোক। তো বকব না?
তালহা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,

—একদম না। আমার আব্বু হলো জেন্টেলম্যান, আমার আইডল। সে স্বার্থপর হতেই পারে না। আর কে বলেছে আমি কষ্ট পাচ্ছি? এই তো আমার আব্বু আছে পাশে, আমার আম্মুও আছে। আর কী লাগে, শুনি?
দূর থেকে হঠাৎ কাঁপা, কান্নাভেজা একটা কণ্ঠ ভেসে এলো,
—বাহ! তোমরা শুধু তোমাদের ছেলেকেই মনে রেখেছো? মেয়েটাকে বুঝি ভুলেই বসেছো? আব্বু, আম্মু তোমাদের সঙ্গে আড়ি।
অভিমানী কণ্ঠ শুনে তিতলি বেগম আর তালহা দুজনেই ফিরে তাকাল। তাহিয়া দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরে। চোখে পানি, ঠোঁটে অভিমানের রেখা। সেই ছোট্ট তাহিয়াটার মতো করে আজও বাবা মায়ের কাছে ভাইকে একা দেখে একই কথাটা উচ্চারণ করলো সে। তার কথা শুনে কান্নার মাঝেও তিতলি বেগম হেসে ফেললেন। তালহা হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮২

—এই হিংসুটে বুড়ি আমার সবকিছুতেই খালি ভাগ বসাতে আসে।
তাহিয়া দুহাতে লেহেঙ্গা সামলে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাদের পাশে বসে পড়ল। তারপর মা আর ভাইকে জড়িয়ে ধরে বাবার কবরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—এই তো আমাদের হ্যাপি ফ্যামিলি…
তিনজনের চোখেই তখন জল। তবুও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি…..

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here