Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ১৬ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ১৬ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ১৬ (২)
সাইয়্যারা খান

বিবস্ত্র করে মেয়ে দেখার মতো জঘন্য কিছু আছে বলে কারো মনে হলো না কিন্তু ঐ মূহুর্তে মীরার বলা একটা কথায় থমকে গেলো পৌষ সহ হেমন্ত। মীরা মুখ কুঁচকে বললো,
“অনুমতি ছাড়া তো দেখা হয় নি মেয়েকে। ওর বড় চাচিকে আমি নিজে ফোন দিয়ে বলেছি। কি বলি নি? মেয়েকে ওভাবে প্রস্তুত রাখেন নি কেন?”

মীরার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ যেন পৌষ’র কানটা ঝাঁ ঝাঁ করে দিলো। হেমন্ত এক পলক শুধু নিজের মায়ের দিকে তাকালো তখনই জোরে কিছু পরার শব্দ কানে আসে সবার। পৌষ হাতের কাছে থাকা স্টিলের একটা কারুকার্য করা মগ ছুঁড়ে মা’রে বড় চাচির দিকে। বড় বড় পা ফেলে যাওয়ার আগে হেমন্তকে শুধু বলে,
“বিদায় করো এদের। ঐ বুইড়া খাটাসকে আমি বিয়ে করব না৷”
পৌষ চলে যেতেই ওর পেছন পেছন পাক বাহিনীও ছুটলো। এদিকে হতভম্ব হয়ে বসে আছে ড্রয়িং রুমে সকলে। তারা শব্দ পেয়েছে কিন্তু কি হয়েছে তা বুঝে নি। তৌসিফ বাজপাখির দৃষ্টিতে যেন সব দেখলো, বুঝলো। চোখে তার দ্যুতি খেলো গেলো মুহূর্তে। ওখানে বসেই ডাকলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“হেমন্ত?”
হেমন্ত তখন এলোমেলো মস্তিষ্কে পা বাড়ায়। এগিয়ে আসতেই তৌসিফ সকলের সামনেই গম্ভীর থেকেও গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” বিয়ে আজই হবে হেমন্ত। এখনই।”
উপস্থিত সকলের মুখটা খোলা রয়ে গেলো তৌসিফের কথায়। তাহমিনা সরু চোখে তাকালো। এমন বেয়াদব একটা মেয়েকে বাড়ীর বউ করতে তার যথেষ্ট দ্বিমত রয়েছে কিন্তু আপাতত একটা রা করলো না ও। হেমন্ত নিচু স্বরে বললো,
“ভাই, একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমরা জানতাম না আপনাদের এমন কোন কিছু আছে। আম্মু বলে নি আমাদের।”
তৌসিফ কিছু বলার আগেই হেমন্ত আবার বললো,

“পৌষ না করেছে ভাই।”
“হ্যাঁ করাও হেমন্ত।”
কথাটা বলেই তৌসিফ উঠে দাঁড়ালো। হেমন্তকে চোখের ইশারায় বললো কথা আছে। বাকি দুই ভাইকে বসিয়ে হেমন্তের সাথে একটু বাইরে আসে তৌসিফ। বেশিক্ষণ না, তাদের মাঝে একপাক্ষিক আলাপ হয় মাত্র গুনে গুনে সাত মিনিট। তৌসিফ বলেছে, হেমন্ত চুপচাপ শুনেছে। কথা শেষে তৌসিফ শুধু ওর কাঁধে হাত রেখে শুধালো,
“যতটা চিন্তা তোমার চোখে দেখা যাচ্ছে ততটা চিন্তার কিছু নেই হেমন্ত। যা যতটুকু জানানোর তুমি জানো।”
“ও রাজি হবে না ভাই।”

“রাজি করাও। এখন বিকেল গড়াচ্ছে। রাতে বিয়ে। কাজী ডাকানো হচ্ছে। আর রইলো তোমার বোন মানছে না। তাকে গতকালের কথা মনে করাও। এই গোটা এলাকা তার নাম জপছে গতকাল থেকে। আমার নামে খুব সূক্ষ্ম চির ধরেছে হেমন্ত যা খুব করে চোখে বাজছে আমার। আশা করি বুঝতে পারছো।”
হেমন্ত সবটা শুনে চুপ করে যায়। প্রতিটা কথার পৃষ্ঠে কথা। প্রতিটা প্রশ্নের পেছনে উত্তর। রহস্য গুলো এক পৃষ্ঠায় লিখা যার উন্মোচন লিখা আরেক পৃষ্ঠায়। হেমন্তকে নাহয় আজ তৌসিফ অপর পৃষ্ঠা দেখালো কিন্তু পৌষ, ওকে কে দেখাবে? উত্তর না জেনে পৌষ কি মানবে? মানার মতো মেয়ে তো পৌষ না। হাজার বলেও তো ওকে মানানো যাবে না৷ যথেষ্ট একগুঁয়ে স্বঘোষিত কথার মালিক পৌষ।
না চাইতেও হেমন্ত এগিয়ে আসে পৌষ’র ঘরে। ঘাপটি মেরে সবগুলো বসা এখানে। হেমন্ত এক পলক দেখেই বললো,

“সবগুলো বাইরে যা।”
“এখানেই থাকবে।”
পৌষর তপ্ত কণ্ঠ। হেমন্ত আড়ালে ঢোক গিলে। পৌষ’কে কিভাবে মানাবে ও? নিজেকে শক্ত করে হেমন্ত। পৌষ’কে এখানে বিয়ে তার দিতেই হবে। হেমন্তের হাত শূন্য। দ্বিধা তার মাঝেও আছে কিন্তু হেমন্ত অপারগ। কণ্ঠে দৃঢ়তা এনে বললো,
“বের হ সবকটা।”
ধমকটা জোরেই ছিলো। নিচে তৌসিফরা বসা। সময় হাতে নেই। তিন বোন টলটলে চোখে বেরিয়ে যায়। জৈষ্ঠ্য আর চৈত্র তখনও দাঁড়িয়ে। আপাকে একা ছাড়তে চাইছে না তারা কিন্তু হেমন্তের সামনে টিকতে না পেরে ওরাও বেরিয়ে আসে। দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকে।
খালি ঘরটা তখন নিস্তব্ধ। পৌষ নখের কোণা দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে হেলামি করে জিজ্ঞেস করলো,

“আপদ বিদায় হলো?”
“আজ বিয়ে হবে।”
“ওমা, কার?”
হেমন্ত চাপা শ্বাস ত্যাগ করে। পৌষর দিকে তাকিয়ে বলে,
“তৌসিফ আজই বিয়ে করতে চাইছে। রাতে বিয়ে হবে পৌষ। তোর কিছু লাগলে বল। ভাই এনে দিব।”
পৌষ চোখ তুলে তাকালো। কপাল কুঁচকে তাকালো। হেমন্ত কি কাঁপছে? তাকে একটু এলোমেলো দেখাচ্ছে। পৌষ পানির গ্লাসটা নিয়ে কুঁচকে রাখা কপালেই হেমন্তকে বললো,
“কি হয়েছে? পানি খাও। বসো এখানে? হেমু ভাই? হেমু ভাই, তোমার কি খারাপ লাগছে?”
পানিটা হেমন্ত তিন নিঃশ্বাসে পান করলো। পৌষ দেখলো কিছুক্ষণ। হেমন্তের আচার-আচরণ ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। পৌষ ঠান্ডা স্বরে ডাকলো,

“হেমু ভাই?”
হেমন্তের কান্না পেলো। সে কান্না করতে চাইছে। একটু কাঁদলে কি খুব লজ্জাজনক হবে? পৌষটাকে ধরে কি কাঁদা যায় না? ওর জেদি একটা বাচ্চা এই পৌষ যাকে ছাড়া হেমন্ত জ্ঞান হওয়ার পর ততটা সময়ও একা থাকে নি। ছোট্ট একটা বাচ্চা যাকে হেমন্ত প্রথম কোলে তুলেই ডেকেছিলো ‘পৌষ’ বলে। স্কুল থেকে এসেই আগেই এই ছোট্ট জানটাকে দেখা হতো। কত সময় তাকে কোলে নিয়ে হেঁটেছে সারা বাড়ী অথচ আজ তাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করা যাবে না। হেমন্ত এক পলক তাকালো। পৌষ’র চিরপরিচিত সেই সহজ দু’টো চোখ। সেই সুন্দর বাচ্চা একটা মুখ। এই মুখটা রেগে গেলেই লাল হয়ে যায়। জেদ করে সুন্দর মুখটা কুঁচকে রাখে। পৌষ আস্তে করে বললো,

“খুব খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে হেমু ভাই?”
হেমন্ত কথা বলে না। পৌষ অস্থির হয়। রেগে যায় হঠাৎ,
“আমি কিন্তু ওনাকে বিয়ে করব না৷”
“ভাইয়ের কথাটা শোন পৌষ।”
“এসব ম’রাধরা কথা শুনতে ভালো লাগছে না।”
“ভাইকে একটাবার বিশ্বাস কর বাচ্চা।”
” যার শুরু ভালো না তার শেষও ভালো হবে না হেমু ভাই। ওনাদের কোনকিছুই আমার ভালো লাগে নি।”
“একটা বার… ”

পৌষ রেগে যায়। হেমন্তের কথা ও কিছুতেই শুনে না। রাগে গজগজ করতে করতে বলে,
“কি ভাবছো, তৌসিফ তালুকদার ছাড়া কেউ আমাকে বিয়ে করবে না? না করলেই বা কি হেমু ভাই? তোমাদের ঘাড়ে বোঝা হয়ে যাচ্ছি? এটা তো নতুন না। পুরাতন কথা। মানুষের রটানো কাহিনীতে আমাকে কেন বলি হতে হবে?”
“তোকে আমি বোঝা ভেবেছি কখনো?”
“অতশত বুঝি না৷ এই *লের বিয়ে আমি করব না৷ তোমার মা’কে আরেকটা বিয়ে দাও। যথেষ্ট পখম পখম করছে…”
কথাটা শেষ করার আগেই হেমন্তের হাত উঠলো। পৌষ আজ চারটা চড় খেলেও টু শব্দ করতো না কারণ বেফাঁস সে বলে ফেলেছে রাগের মাথায়। হেমন্ত হাতটা তুললেও চড় দিলো না। তীব্র রাগ দেখিয়ে বললো,
“এখনেই বিয়ে করবি তুই।”
“করব না। না মানে না।”
হেমন্ত ততক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছে। ও বের হওয়া মাত্রই তিন চাচা ভেতরে ঢুকেছে, একসাথে। পৌষ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। তার এই ছোট্ট ঘরে চাচারা সহজে পা রাখে না। পৌষ যে বড়ই অপ্রয়োজনীয় তাদের নিকট।

ঐ দিকে হেমন্ত জানলোও না তার অনুপস্থিতিতে তার ছোট্ট পৌষ’কে বাপ-চাচারা ঘিরে ধরেছে। সে তৌসিফকে না করতে এসেছিলো কিন্তু দেখলো ওর মা-চাচিরা যথারীতি আড্ডা শুরু করেছে। হেমন্ত ফাঁকফোকড় খুঁজে চলছে কিন্তু কথা বলার সুযোগটাই হচ্ছে না। এদিকে ওরা ভাইও এখানে নেই। শুধু মহিলা মানুষ আছে। হেমন্ত ভীষণ ভ্যড়াছ্যড়ায় পরে গেলো। এদিকে এশারের আজান দিবে। তৌসিফের নাম্বারে পরপর লাগাতার ফোন দিলো হেমন্ত, ফলাফল শূন্য। তৌসিফ ধরছে না৷ অগত্যা না পেরে হেমন্ত এবার তাহমিনার দিকে এলো। ওনাদের না বলতে হবে কিন্তু এর আগে তাদের সাথে কখনো আলাপ হয় নি ওর। সাহস জুগিয়ে কিছু বলার আগেই তাহমিনার ভারী কণ্ঠ শোনা গেলো,
“তৌসিফ নামাজ পড়েই চলে আসবে। কাজী এসেছে। মসজিদেই আছেন৷ ইমাম সহ আসছে।”
হেমন্তের বুকটা ধ্বক করে ওঠে। কি করবে? এত এত মানুষের সামনে এখন আবার তামাশা হবে? গতকালের ঘটনা নিছক কম ছিলো না, এখন আবার আজ নতুন কাহিনী। গোটা এলাকায় তার পৌষটার নামই খারাপ হবে। হেমন্ত অস্থির হয়ে বললো,

“আপা, একটু কথা ছিলো।”
“হ্যাঁ, বলো।”
“আপা, ভাইকে নাহয় দুই দিন অপেক্ষা করতে বলুন। পৌষ রাজি হচ্ছে না। হঠাৎ করে বুঝেনই তো আপা। ছোট মানুষ।”
বাপ-চাচারা তখন এদিকটায় আসলো। হেমন্তকে বললো,
“নামাজ পড়ে আসছি আমরা। পৌষ রাজি।”

হেমন্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। পৌষ রাজি মানে? জামাত দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। হেমন্তও পা মিলালো। বিধ্বস্ত মুখটা নিয়ে মসজিদে ছুটলো৷ ওযু করে গিয়ে দাঁড়ালো এক কোণায়। মসজিদের বাতি বন্ধ। মৃদু আলোয় নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদছে এক ভাই যার বুক ভরা এক অবাস্তব আশা, তার চাচাতো বোনকে সে নিজের মেয়ে হিসেবে চাইলো। হেমন্তর চারপাশের এই কোণার দেওয়ালটা সাক্ষী হলো গুমরে কান্নার। এক ভাই আজ খুব করে কাঁদছে তার বোনের জন্য। তার বোনটা সুখ পাক। যদি সুখ ওর কপালে এখানেই থাকে তাহলে এখানেই হোক, নাহয় ফিরে যাক। হেমন্তের মন মানলো না। বিতর পড়ার আগেই দুই রাকাত ইস্তেখাড়া পড়লো ও। চরম সিদ্ধান্তে আসার জন্য এছাড়া আর পথ খোলা পেলো না ও৷ সিজদাহ্ দিয়ে শুধু চাইলো তার বাচ্চাটার জন্য যেটা ভালো হয় সেটাই যাতে কবুল হয়। হেমন্ত খেয়াল করলো ওর অস্থিরতা কমেছে কিন্তু মনের কোণে সামান্য বিরোধীতা। মোনাজাত ধরেই বাড়ীর পথে ছুটে ও। ওর পৌষটা নিশ্চিত ওর অপেক্ষায়।

শ্রেয়া পৌষ’কে জড়িয়ে ধরে আছে। পৌষ চুপ করে আছে। শ্রেয়া ওর চুলে হাত বুলিয়ে বললো,
“তুমি রাজি না থাকলে সবাইকে বলো পৌষ।”
পৌষ মৌন রইলো। বিছানায় একটা লাল রঙা শাড়ী রাখা৷ নিচ থেকে পাঠানো হয়েছে। পৌষ জিজ্ঞেস করলো,
“তৌসিফ তালুকদার নিচে আছে?”
শ্রেয়া মাথা নাড়ে। পৌষ কিছু না বলে বেরিয়ে এলো। চৈত্র শক্ত করে বোনের হাতটা ধরে। তৌসিফরা তিন ভাই বেশ দাম্ভিক ভাবে বসা সোফায়। কাজি আর বড় হুজুর আসছে। হেমন্ত দরজা পর্যন্ত আসতেই কানে এলো পৌষ’র কণ্ঠ,
“আপনাদের রীতিমতো তো আমাকে দেখেছেন কিন্তু আমি তো দেখি নি। আপনাকেও ঠিক ওই ভাবেই দেখাতে হবে যেভাবে আমাকে দেখা হয়েছে।”

পৌষ’র কথায় অদ্ভুত কতগুলো দৃষ্টি তাকিয়ে রইলো ওর পানে৷ তুরাগ একটু কাশি দিলো শুধু। মীরা বলে উঠলো,
“পা’গল হয়েছো মেয়ে? কাকে কি বলছো?”
“আপনার দেবরকে দেখার কথাই বলছি।”
মূহুর্তেই নীরবতায় ঘিরে উঠলো চারপাশ। তৌসিফের চোখে দুষ্টামী। পৌষ এক পলক তাকিয়েই দৃষ্টি সরালো। বুকের ভেতর দামামা বাজছে হঠাৎ। লোকটার চোখ দুটো সম্রাটের মতো। তাকিয়ে থাকা দায়। ইনি, মিনি তখন তৌসিফের কাছে এসেছে৷ তৌসিফকে অবাক করে দিয়ে দু’বোন সোফায় উঠে তৌসিফে’র দাঁড়ি আর চুল টেনে ধরে। হকচকিয়ে গিয়ে তৌসিফ কিছু বলার আগেই দু’বোন সিগন্যাল দিলো সবার সামনে,
“আপা আথল তুল আর দালি।”

হকচকালো উপস্থিত সকলে। এই মেয়ে বোনদের পাঠিয়ে তৌসিফের চুল, দাঁড়ি আসল কিনা নকল পরখ করছে? ভাবা যায়? তার সাহস ঠিক কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সরাসরি অপমান ঠিক যেভাবে পৌষকে করা হয়েছিলো। তৌসিফ মনে মনে হাসলো। মেয়েটার সাহস আছে বলতে হবে। চাইলেই সে নাস্তানাবুদ করে ছাড়তে পারে পৌষ’কে কিন্তু তৌসিফ সেটা করলো না। একবার তার ঘরে উঠুক তখন তৌসিফ বুঝাবে কে তৌসিফ তালুকদার।
পৌষ’কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হেমন্ত এগিয়ে এলো৷ হেমন্তকে দেখা মাত্র পৌষ চলে গেলো গটগট করে। তাকালো না পর্যন্ত। আহত হেমন্ত বোনের পিছু ছুটে। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রয়। নিচে তখন কাজি এসেছে। হেমন্ত এলোমেলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি এমন হলো যে পৌষ রাজি হলো? হেমন্ত যেভাবেই হোক তৌসিফ থেকে অন্তত সময় নিতো। তৌসিফকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য তার নেই।

দরজা খুলে লাল শাড়ী পরিহিত পৌষ যখন বের হলো হেমন্ত তখন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। হালকা একটা লাল রঙা শাড়ী। মাথায় ঘোমটা, তার ছোট্ট বাচ্চা পৌষ এটা? কই, বিশ্বাস তো হয় না। পৌষ তাকালো না পর্যন্ত। শ্রেয়া ওর পেছনে বেরিয়ে এসেছে তখন। পৌষ কি মনে করে একবার শুধু বললো,
“হেমু ভাই, ওনাদের তাড়িয়ে দাও।”
হেমন্ত নিজেকে শক্ত করলো। এই বিয়ে ভাঙার সাধ্য তার নেই। তার ছোট্ট পৌষ’র জীবনটায় খুব জটলা পাকানো যা এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই। হেমন্ত নিজেকে সংযত রেখে শুধু বললো,

“তোর ভালোর জন্যই সব পৌষ।”
“এমন ভালো না থাকুক।”
“কোন কথা না৷ আয় চুপচাপ। কোন ঝামেলা করবি না পৌষ। খুব খারাপ হবে।”
সারাটা জীবন হেমন্ত ধমকালো তবে আজকের মতো নির্জীব হয়ে কখনো ধমকায় নি সে। পৌষ শেষ চেষ্টা করে চুপচাপ এগিয়ে এলো একা একা, মাঝপথে তার সাথে এলো ছোট ভাই-বোন গুলো। সবার পেছনে হেমন্ত। সাজসজ্জাহীন পৌষ যাকে বসানো হলো তৌসিফ তালুকদারের সাথে। দাঁড়িয়ে রইলো উপস্থিত সকলে। কাবিন নামায় সাক্ষর হলো। পৌষ হেমন্তের কথা রাখলো, টু শব্দও করলো না। বড় হুজুর যখন বললেন,
“পৌষরাত হক পৌষ, আপনি কি শাহজাহান তালুকদার এর মেঝ পুত্র তৌসিফ তালুকদারকে বিবাহ করতে রাজি? রাজি থাকলে বলুন কবুল।”

“কবুল।”
সেকেন্ডের ব্যবধানে কবুল পড়ে পৌষ। একবার এদিক ওদিক তাকায়। বাকিদের মতো মাথায় হাত দিয়ে আদর করার মতো কেউ নেই তার। মা নেই, শক্ত হাতের বাবা নেই। হেমন্ত দ্রুতই এগিয়ে আসে। পৌষ’র মাথায় হাত রাখে। অপর পাশে তৌসিফ কবিননামায় পৌষ’কে পাঁচ লক্ষ টাকা উসুল দিয়ে তার মার্কেটের একটা দোকান আর মিরপুরের নতুন কাজে হাত দেওয়া বিল্ডিংটা দিলো। যথারীতি কবুল পড়েই পৌষ’র হাতটা আলতো করে ধরলো। আলতো ভাবটা খুব শিঘ্রই শক্ত হলো যেন সে নিজের আধিপত্য বোঝালো পৌষকে অথবা বোঝালো, তুমি একা না। তৌসিফ তালুকদার আছে তোমার জন্য।
সামান্য মিষ্টি পৌষ’র মুখে দিলো তৌসিফ, বাকিটা নিজে খেয়ে বললো,
“এলাকা ভরে মিষ্টি পাঠাও হেমন্ত। আমাদের বাড়ী থেকেও যাবে। সবার কানে যাক খবরটা। বাকি কথা পরে হবে। রাত হচ্ছে, আমরা তাহলে উঠি।”

বড় চাচা রাতের খাবারের কথা বারবার বললেন কিন্তু কেউ রাজি না। রাত হয়েছে, তারা ফিরবে। পৌষ’কে একবার রাখতে চাইলো হেমন্ত কিন্তু পৌষই বোধহয় সুযোগটা দিলো না৷ তাকালো না পর্যন্ত হেমন্তের দিকে। হেমন্ত দেখলো তৌসিফ পৌষ’র হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। সকলে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো অথচ হেমন্ত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার পৌষ চলে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে? এই তো বাজারটা শুধু নামমাত্র দূরত্ব অথচ ওর মনে হচ্ছে পৌষ হারিয়ে যাচ্ছে। বহুদূর যাচ্ছে। পৌষ’কে আর দেখা গেলো না। চৌকাঠ মাড়িয়েই সে এগিয়ে গিয়েছে। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট ভাই-বোন গুলো যাদের কপালে মাত্রই তাদের আপা চুমু খেয়েছে। খুব বিরল ঘটনা৷ সচরাচর এটা ঘটে না তাহলে আজ কেন ঘটলো? বিরল ঘটনা কখন ঘটে?

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ১৬

সবাইকে চমকে দিয়ে এক পুরুষ কণ্ঠের কান্না হু হু করে বাড়লো। শ্রেয়া দৌড়ে এসে ধরার আগেই ধপ করে মেঝেতে পরে হেমন্ত। বাড়ীর মানুষ সবাই অবাক হয়ে আজ হেমন্তকে দেখলো। এটা হেমন্ত না,এটা পৌষর চাচাতো ভাই হেমন্ত না। এটা সেই হেমন্ত যে নিজের ভেতর পৌষর বাবা হওয়ার সখ রাখে। তীব্র ইচ্ছে রাখে। সে নিজের বাচ্চা হারিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদছে। বড় চাচি ঢোক গিললেন। তার বড় ছেলেকে তিনি কখনো কাঁদতে দেখেন নি বড় হওয়ার পর। কেউ ধরার সহাসটুকু পেলো না অথচ পাঁচ ভাই-বোন ছুটি গিয়ে হেমন্তের উপর পরলো। বাড়ীটা মূহুর্তে তীব্র কান্নায় নিমজ্জিত হলো। ছোট ছোট বাচ্চা দুটোও বুঝে গেলো যেন তাদের আপা আর আসবে না। কখনোই না। পৌষদের জন্য ফিরে আসা নিষিদ্ধ। খুব করে মানা।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ১৭