প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ৬৯+৭০
Afnan Lara
মহল্লার সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানো শেষ করে শান্ত ফিরে আসলো বাসায়,আজ তার সবচাইতে খুশির দিন!!
আহানা চুপচাপ জামা চেঞ্জ করতেসে অফিস যাবে তাই
শান্ত মিষ্টি একটা আহানার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে পুরো মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বিছানায় বসে খেয়ে যাচ্ছে
আহানা শান্তর হাসিখুশি চেহারা দেখে কিছুই বলার সাহস খুঁজে পাচ্ছে না
আজ অফিসে যাওয়ার পথে একজন ফেরিওয়ালার হাতে একটা পুতুল দেখে কিনে নিলো সে,তার মেয়ে হলে তাকে দিবে খেলার জন্য
পুতুলটা কম দামি হলেও দেখতে বেশ লাগলো তার কাছে
আহানা সারাদিন ধরে শুধু শান্তর মুখের দিকে চেয়ে ছিল
শান্তর মন ভাঙ্গতে হবে এই ভেবে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে
শান্তকে সত্যিটা জানানোর জন্য সে সব চেষ্টা করছে
আজ অফিস ছুটি হওয়ার পর শান্ত আহানাকে নিয়ে সোজা তার বাসায় ফিরেছে,সেখানে আহানাকে সারপ্রাইজ দিবে সে
আহানার চোখে ফিতা বেঁধে দিসে বাসায় ঢুকার আগমূহুর্তে
তারপর আহানার হাত ধরে রুমে ঢুকে ওর চোখের ফিতাটা খুলে দিলো
পুরো রুমটায় বেশ সুন্দর করেই ডেকোরেশন করানো,পর্দার উপর বড় বড় করে লিখা “HAPPY BIRTHDAY AHANA”
আহানার মুখে হাসি আসার মত কোনো অবস্থা নেই তাও সে বাধ্য হয়েই হাসলো,সামনে এগোনোর জন্য এক পা কদম ফেলতেই উপর থেকে কৃষ্ণচূড়া ফুলের পাপড়ি এসে পড়তে লাগলো,আহানা এবার মন থেকেই হাসলো,শান্ত ভার্সিটির পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটার থেকে অর্ধেক ফুল নিয়ে এসেছিল
পিছন থেকে রুপা,নওশাদ,রিয়াজ আর সূর্য আসতেসে
পুরো বার্থডে পার্টিতে শান্ত খেয়াল করেছে আহানার মুখে এক ফোটাও হাসি নেই
রাত ১০টা বাজে,সবাই মিলে ডিনার করায় ব্যস্ত
আর আহানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার আকাশ দেখে যাচ্ছে,আকাশে তারা ছাড়া কিছুই নেই,চাঁদ ও না,তাও আহানা এত মনোযোগ দিয়ে দেখে যাচ্ছে
আসলে তার মন আকাশের দিকে নয়,এমনিতেই মুখটা আকাশের দিকে ফিরিয়ে রেখেছে,মনে মনে তো ভাবতেসে কিভাবে সে তার বাচ্চাকে বাঁচাবে,কিভাবে শান্তকে সত্যিটা জানাবে
শান্ত সত্যিটা শুনলে নির্ঘাত এবোরশান করানোর জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে
পেটের মধ্যে শান্তর হাতের স্পর্শ পেতেই আহানা চমকে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলো
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
শান্ত আহানার ঘাড়ে মুখ রেখে কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললো “তোমার কি মন খারাপ আহানা?
আমি জানি কেন মন খারাপ”
আহানা চমকে পিছন ফিরে শান্তর দিকে চেয়ে বললো “আপনি জানেন?”
তোমার মা বাবা নেই তোমার জন্মদিনে তাই
আহানা মাথা নিচু করে রুমের দিকে চলে গেলো
শান্ত রান্নাঘর থেকে খাবার এক প্লেট নিয়ে এসে আহানার পাশে বসলো,আহানা শুরুতেই হাত দিয়ে মানা করে বললো সে খাবে না
কি হইসে তোমার??সারাদিনে কিছুই খাওনি তুমি,তুমি কি ভুলে গেসো যে তোমার পেটে এখন একটা জীবন আছে?
আহানা চোখ তুলে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললো “জীবন??আমাদের মতো?”
হুম,আমাদের মতই তো,আমরা সবাই তো এমন ছিলাম
আহানা আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না,জড়িয়ে ধরলো শান্তকে
শান্ত হাত থেকে প্লেট বিছানায় রেখে আহানাকে ধরে বললো “কি হয়েছে তোমার?আমাকে বলো”
শান্ত আমি এবোরশান করাতে পারবো না,আমাকে ক্ষমা করেন
এবোরশান মানে??কি বলতেসো এসব?
আহানা কান্নার জন্য কিছু বলতে পারছে না,শুধু বলেছে তার ডাঃ রোস্তমের সাথে কথা হয়েছে
আর কিছু মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না তার
শেষে শান্ত ফোন নিয়ে ডাঃ কে কল করে পুরো বিষয়টা শুনলো উনার থেকে
সবকিছু শুনার পর হাত থেকে ফোন পড়ে গেলো তার
আহানা বিছানার নিচে এক কোণায় বসে আছে, তার চোখ শান্তর দিকে
শান্ত হাত দিয়ে চুল টেনে নিজেকে সামলালো,তারপর বড় একটা নিশ্বাস ফেলে নিচে ফ্লোরে বসে আহানার হাত দুটো ধরলো
শান্ত প্লিস!আমি এবোরশান করাবো না
দেখো আহানা,আমার কথা শুনো,আমরা চাইলে পরে আরও আরও বেবি নিতে পারবো
তাহলে এখন এই বেবির জন্য তুমি কেন লাইফ রিস্ক নিবা?
তোমার আর বেবির দুজনেরই লাইফ রিস্ক আছে এটাতে,আর সবচেয়ে বেশি হলো তোমার লাইফ রিস্ক
দেখো আহানা,ট্রাস্ট মি,এখনও বেবি হয়নি তোমার পেটে,জাস্ট একটা অংশ তৈরি হয়েছে,এটা নষ্ট করলে বেবি ব্যাথা পাবে না,সত্যি!
শান্ত প্লিস!আমাকে এসব বুঝাবেন না,আমি বাচ্চা না
আহানা শুনো!যদি এমন হয় ৯মাস পর আমরা বেবিকে না বাঁচাতে পারি?তখন তুমি শোক কি করে সামলাবে?
আপনি নেগেটিভ কেন ভাবতেসেন,বাঁচতেও তো পারে,সব আল্লাহর হাতে,আল্লাহ চাইলে কি না হয়?
জানি আমি,কিন্তু বিপদ সামনে জেনে শুনে আমরা কেন এমন করবো বলো??আমি তোমাকে হারাতে দিতে পারি না,এটা জেনে শুনে তো কখনই না,তুমি কাল সকালে আমার সাথে যাবা, এবোরশান করিয়ে আনবো,এতবড় রিস্ক আমি কিছুতেই নিব না
আই প্রমিস!তোমার কোর্স শেষ হলেই আমরা বেবি নিব
না,আমার মা বাবা আমাকে ফেলে গেসিলো,আমি জানি এটার কি কষ্ট!!সেই আমি কিনা আমার সন্তানকে মেরে ফেলবো??
জাস্ট শাট আপ আহানা!!!আমি যা বলেছি তাই হবে,তুমি এই বাচ্চা নিতে পারবে না,কাল আমি অসম্পূর্ন কাজ সম্পূর্ণ করবো,এখন খেয়ে ঘুমাবা তুমি
কথাটা বলে শান্ত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো
আহানা শান্তর ধমকে চুপ করে চেয়ে রইলো তারপর চোখ মুছে বললো”সে কি আপনার সন্তান নয়??শুধু আমারই ভেতরটা পুড়তেসে,আপনার পুড়তেসে না??”
শান্ত আকাশের দিকে চেয়ে বললো”হ্যাঁ আমার সন্তান,আমি অস্বীকার করতেসি না একদমই!!বাট বাচ্চার চেয়ে আমার কাছে এখন বাচ্চার মা সব চাইতে বেশি জরুরি!
আগে বাচ্চার মা,মা বেঁচে থাকলে বাচ্চা এমনিতেই আসবে”
আহানা উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত চোখে তাকিয়ে বললো”বাচ্চা না থাকলে বাচ্চার মা ও থাকবে না”
ব্যস কথাটা বলে আহানা রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেলো
আহানা দাঁড়াও বলতেসি,পাগলামি করবা না
কিরে শান্ত কি হয়েছে?আহানা বেরিয়ে গেলো কেন?
পরে বলতেসি,রিয়াজ!একজন ডাক্তার নিয়ে আহানার বাসায় আয়,বলবি ঘুমের ইনজেকশান নিয়ে আসতে
আহানা নিজের বাসায় ঢুকে দরজা লাগাতে যেতেই শান্ত ধরে ফেললো
আহানা বেশি বেশি করতেসো তুমি
আপনি চলে যান এখান থেকে
যাবো না
আহানা বিরক্ত হয়ে নিজের রুমে চলে গেলো
খাটের এক কোণায় বসে আছে সে আর শান্ত পাশেই দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
শান্ত ওর পাশে এসে বসতেই ও সরে বসলো
ঠিক আছে,এবোরশন করাতে হবে না,শান্তি?তুমি মরে যেও, তুমি মরার ২মিনিট আগে আমি বিষ খাবো,তাহলে তো তুমি হ্যাপি?
আহানা চোখ মুছতেসে বারবার
নওশাদ আর রিয়াজ মিলে ডাক্তার নিয়ে আসলো,আহানা ডাক্তার দেখেই পিছিয়ে গেলো, চিৎকার করে বললো”শান্ত প্লিস এমন করবেন না”
শান্ত আহানাকে আগলে ধরে বললো”কিছুই করবো না,উনি তোমাকে রেস্টে রাখার জন্য একটা ইনজেকশান দিবে জাস্ট
না লাগবে না
শান্ত ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো,তারপর আহানার হাত চেপে ধরলো
শান্ত প্লিস!!আমি মরে যাবো,আমার বেবিকে চাই শান্ত,এমন করবেন না
ডাক্তার ইনজেকশানটা দিয়ে চলে গেলেন,রুপা আহানার মাথায় হাত বুলাচ্ছে,আহানা ঘুমিয়ে পড়েছে ততক্ষণে
শান্ত জানালার গ্রিল ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে
আহানা ডিপ্রেশনে ভুগতেসে,ওকে ঘুমের ইনজেকশান দিতেই হতো নাহলে উল্টা পাল্টা কাজ করে বসতো আজ
তুই এখন কি করবি??আমার তো মতামত হলো এবোরশান করানো উচিত,নাহলে আহানার লাইফ নিয়ে টানাটানি লাগবে
ভাইয়া আমি বলতেসি কি আহানার কথাই ঠিক,সম্পূর্ন আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলে হয় না??
ভবিষ্যতে কি হবে আমি জানি না তবে ডাঃ রোস্তম যা বললেন তা সত্য,,১০০শতাংশে ০.৯৯ ও চান্স নাই যে বাচ্চা আর মা দুজনেই বেঁচে যাবে
একজন না একজন মারা যাবেই,আর কথা হলো বাচ্চাকে না বাঁচিয়ে আহানাকে সেদিন বাঁচাতে গেলেও অনেক বড় রিস্কি হবে ব্যাপারটা,এত কিছুর পরও তাকে বাঁচানো নাও যেতে পারে,তাহলে সব জেনেও আমি কেন এত বড় রিস্ক নিবো?
দেখ শান্ত miracle ও তো হতে পারে?
নাহ,এরকম অনেক অপারেশন ডাক্তার করেছেন,এরকম ঘটনায় মায়ের মৃত্যু হয়েছে,আমি শুধু শুধু ব্যাপারটা সিরিয়াস নি নাই,যেটা সত্যি সেটাই
কি আর করার,তুই আহানাকে বুঝা,কারন ওর অনুমতি ছাড়া এবোরশন করাবে না ডাক্তার
পরেরদিন ভোরবেলায় লাফ দিয়ে উঠে বসে গেলো আহানা
পেটে হাত দিয়ে এদিক ওদিক তাকালো,চিন্তায় রুম থেকে বের হতেই দেখলো শান্ত মাথার উপর হাত রেখে সোফায় ঘুমাচ্ছে
আপনি এবোরশন করিয়ে ফেলসেন??
শান্ত ঘুম থেকে জেগে চোখ ডলতে ডলতে বললো “না”
আহানা পেটে হাত দিয়ে আবার রুমে চলে গেলো
শান্ত রান্নাঘরে এসে নাস্তা বানাচ্ছে
আহানা পেটে হাত দিয়ে চুপ করে বসে ভাবতেসে সে কি করবে এখন
১ঘন্টা পর শান্ত রুটি ভাজির প্লেট নিয়ে রুমে ঢুকলো
শান্তকে দেখে আহানা দূরে সরে বসলো
আহানা তুমি কাল সারাদিনে তেমন কিছুই খাওনি,এখন চুপচাপ খেয়ে নাও
না আমি খাবো না,কিছু খাবো না
আমি মোহনগঞ্জের আশ্রমে চলে যাবো
আহানা আজগুবি কথাবার্তা বাদ দাও,তুমি কাল থেকে এমন কেন করতেসো?একটা কথা বুঝার চেষ্টা করছো না কেন?
আমি এবোরশান করাবো না
শান্ত পকেট থেকে একটা ছোট্ট বোতল বের করে আহানার হাতে দিলো
ফাইন,এবোরশান করিও না,এখন এগুলো এই গ্লাসে ঢেলে আমাকে খাইয়ে দাও
আমি আমার আগে তোমার মৃত্যু সয্য করতে পারবো না,তার আগেই আমাকে মেরে দাও
দেখুন,বাচ্চার কিছু হবে না,সবসময় একই জিনিস হবে এমন তো না,আমি রোজা রাখবো,নফল নামাজ পড়বো,তাহাজ্জুদ নামাজ পড়বো
আল্লাহ আমার আর আমার বাচ্চার ক্ষতি হতে দিবে না
শান্ত রেগে গিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে চলে গেলো
আহানা নাস্তা আর খেলো না,একেবারে অফিস টাইমে রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হলো সে
শান্ত বাইক নিয়ে আসেনি,রাগ করেছে নিশ্চয়
তাই আহানা একটা রিকসা নিয়ে অফিসে গেলো,এসে দেখলো শান্ত অফিসে আগেই এসে গেছে
আহানা এসে ওর পাশে বসতেই শান্ত ফাইল এডিট করতে করতে বললো “নাস্তা খেয়েছিলা?”
না
শান্ত রেগে ওর দিকে তাকালো তারপর উঠে ক্যানটিনে চলে গেলো খাবার আনতে
খাবারের প্যাকেট হাতে নিতেই দেখলো রাফি দৌড়ে দৌড়ে আসতেসে,এসে বললো আহানা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে
শান্ত দৌড়ে কেবিনে চলে আসলো,লিজা ওর কোলে আহানার মাথা রেখেছে,শান্ত ওকে কাছে নিয়ে আনলো,রাফি বললো হসপিটালে নিয়ে যেতে
দেরি না করে শান্ত ওকে নিয়ে হসপিটালে চলো আসলো
ডাক্তার রোস্তম চেক আপ করেতেসেন
খাওয়া দাওয়া ঠিকমত করে না নাকি?
আমি কি করবো একটু বলেন,সে চায় না এবোরশন করতে জেদ ধরে বসে আছে,আমি তার কথার বিরুদ্ধে বলায় এখন খাওয়া দাওয়াই অফ করে দিসে সে
এজ এ ডক্টর আমি আপনাকে একটাই পরামর্শ দিব আর সেটা হলো “এবোরশান”
একজন মা হিসেবে আহানার এমন রিয়েকশান স্বাভাবিক তবে একে উপেক্ষা করে এবোরশান করানো উচিত,কারন লাইফ রিস্ককে এভাবে সহজভাবে নেওয়াটা বোকামি
আমি বুঝেছি বাট সে বুঝতেসে না,এভাবে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলে আমি কি করতে পারি?ও ওর কথায় অটল
এবোরশনে মায়ের অনুমতি সব চাইতে বেশি ইম্পরট্যান্ট! যেহেতু আহানা রাজি হচ্ছে না সেহেতু আমি আর কি বলতে পারি বলুন
আপনারা যে সিদ্ধান্ত নিবেন সেটাই হবে
বাট আমি আপনাদের আবারও মানা করতেসি এই ভুল করবেন না,কথটাা সিরিয়াস নেন,এরকম কেস আমি আরও দেখেছি,জাস্ট ১/২বছর ওয়েট করতে পারবেন না আপনারা??
শান্ত আহানার মাথায় হাত বুলিয়ে ওর বেডের সামনে চেয়ার টেনে বসলো
নওশাদকে ফোন দিয়ে বললো কোন দেশে চিকিৎসা করলে এই সিচুয়েশনেও বাচ্চা মা দুজনকেই বাঁচানো যাবে এরকম দেশের খোঁজ নিতে
একদিকে আহানা আরেকদিকে তার সন্তান
মনে হচ্ছে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতেসে সে,এক নৌকা ছেড়ে দিতেই হবে,যেটা ছাড়বে সেটা তার শরীরের একটা অংশ,আরেকটা তার প্রান
আহানা চোখ খুলে দেখলো শান্ত কানে ফোন ধরে এদিক ওদিক পায়চারি করছে
উঠে বসে পেটে হাত দিয়ে বসে থাকলো সে,তারপর চোখ মুছে নেমে গিয়ে শান্তর পা ধরে বসে পড়লো ফ্লোরে
ছল ছল চোখে চেয়ে রইলো শান্তর দিকে
শান্ত চমকে ফোন থেকে মনোযোগ হটিয়ে নিচে তাকালো
আহানা ওর পা ধরে বলতেসে যেন এবোরশান না করায়
আহানা এসব কি করতেসো?
শান্ত প্লিস!
ওকে ওকে,করবো না,কান্না থামাও প্লিস,উঠো এখন
আহানা উঠে দাঁড়িয়ে শান্তর হাত ধরে নিজের মাথায় রাখলো
“বলেন কখনও এমনটা করবেন না,কথা দিন আমাকে
শান্ত চুপ করে থেকে বললো”কথা দিলাম”
আহানা খুশি হয়ে শান্তকে জড়িয়ে ধরলো
শান্ত ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাবনার রাজ্যে ডুব দিয়েছে
আহানার মন রক্ষার্থে বলে তো দিলাম কিন্তু এতে তো আহানাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলেও দিলাম
বাসায় ফিরে আহানা একটা সুতির শাড়ী নিয়ে বসলো এটা কেটে কেটে বাবুর কাঁথা বানাবে সে
শান্ত চা বানাচ্ছে আর সোফার দিকে বারবার চেয়ে দেখতেসে
আহানার চোখ মুখ হাসিতে টইটুম্বুর
এই মেয়েটার কিছু হলে আমি বাঁচবো না,মেয়েটা বুঝতে চায় না কেন!!
চা বানিয়ে নিয়ে আসলো শান্ত
আহানা চা খাচ্ছে আর সেলাই করতেসে
সন্ধ্যা হতেই রুপা আর নওশাদ আহানার বাসায় এসে হাজির,হাতে অনেক অনেক খেলনা আর একটা কিউট বেবির দোলনা
আমার একটা মাত্র বেস্টফ্রেন্ডের বাবুর জন্য সামান্য কিছু গিফট!!
হুম আর আমার একটা মাত্র বেস্টির😎
এত কিছু??আচ্ছা রুপা তুই মেয়েদের জামা আনলি যে তুই কি সিউর মেয়েই হবে?
আরে মেয়ে হবে দেখিস,আমার আন্দাজ অনেক ভালো হুহ
নওশাদ দেখি ছেলেদের জামা আনছে
আরে আমার ধারনা ছেলে হবে তোদের!তাই আনলাম,রুপা অনেক ঝগড়া করলো যে মেয়ে হবে কিন্তু আমার মতে ছেলে হবে
হইসে ঝগড়া করতে হবে না,বসো তোমরা আমি চা বানাই আনতেসি
আরে আহানা বসো,তুমি কাজ করতে হবে না,আজ রুপা রাঁধবে
কি বললে তুমি?আমি তো রান্না পারি না
আরে আমি আছি না,চলো
শান্ত আহানার পাশে বসে একটা খেলনা দিয়ে খেলতে খেলতে বললো “আজ আর নাস্তা করা হবে না,দুটোয় মিলে রান্নাঘরে বোম ব্লাস্ট করে তারপর ফিরবে”
আহানা একটা খেলনা গাড়ী হাতে নিয়ে দেখতেসে
“আচ্ছা কোর্সটা এই ৯মাসে করে নিলে হয় না?”
শান্ত তার হাতের খেলনাটা রেখে আহানার দিকে তাকালো
“হুমমম!তা করাই যায়,আমি ডাঃ রোস্তমের সাথে কথা বলো দেখতেছি”
শান্ত ডাঃরোস্তমকে ফোন করে ব্যাপারটা সম্পর্কে কথা বললো
উনি বললেন গর্ভকালীন সময়ে এটা করা যাবে না
নওশাদ জানালো তার জানা মতে বিদেশেও এরকম হসপিটাল নেই যে অসম্ভব কে সম্ভবে পরিণত করবে কথাটা শুনে শান্তর কলিজা কেঁপে উঠলো
এদিকে আহানা রুপার সাথে বসে বাচ্চা নিয়ে গল্প করছে
মেজাজ বিগড়ে গেলো শান্তর,রেগে রুম থেকে জ্যাকেটটা নিয়ে তার বাসার দিকে চলে গেলো সে
গোটা একদিন হয়ে গেছে শান্ত আহানাকে একটিবার দেখতেও আসেনি
আজ অফিস বন্ধ বলে অফিসের বাহানায় ও আহানা তাকে দেখতে পারার সুযোগটা পোলো না
অফিসের রুমে রঙ করতেসে তাই আজ কাজ নেই
আহানা ভাবতেসে শান্ত হঠাৎ এমন কেন করতেসে
বলা নেই কওয়া নেই যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো?
চিন্তায় থাকতে না পেরে আহানা বাসায় তালা দিয়ে শান্তর বাসার দিকে চললো,বাসায় এসে দেখলো পুরো বাসা ফাঁকা শুধু শান্তর রুমে আলো জ্বলতেছে,শান্ত টিভি দেখতেসে কোলে বালিশ নিয়ে
আহানাকে দেখে এমন ভাব করলো যেন সে খুশিই হয়নি
কি ব্যাপার??আপনি আজ সারাদিনে বাসা থেকে বের হোন নি কেন?আমার ফোন ও ধরলেন না!
কেন ধরবো?তুমি থাকো তোমার বাবু নিয়ে,এমনিতেও বাবু আসলে চলে যাবা তাই আগে থেকেই দূরত্ব রাখছি যাতে পরে কষ্ট না হয়
কথাগুলো শুনে আহানা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে
কি এমন করে দাঁড়িয়ে আছো কেন যাও বাসায় গিয়ে কাঁথা সেলাই করো
আহানা মন খারাপ করে চলে গেলো
শান্তর এবার নিজেরই খারাপ লাগতেসে,কিন্তু সে কি করবে?
তার কাছে যে আহানা সব চাইতে বেশি ইম্পরট্যান্ট
রাত ৮টার দিকে শান্ত আহানার বাসায় আসলো,আহানা তার রুমে,বিছানায় গুটিশুটি দিয়ে শুয়ে আছে
আহানা!
কি?
সরি
কেন?
বকসি তাই
কথাটা বলে শান্ত আহানাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো ওর পাশে
আমি কি করবো বলো,আমি তোমাকে হারাতে চাই না,প্লিস ডিসিশন পাল্টাও
কখনওই না
শান্ত আর কি করবে,আহানাকে বুঝানোর সব টেকনিক এপ্লাই করে ফেলসে তাও লাভ হলো না,শেষে বাধ্য হয়ে আহানাকে জড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়লো সে
রাত ৯:৪৫এর দিকে আহানা উঠে রান্নাঘরে এসে শান্তর জন্য খাবার নিতেসে
আহানা উঠে যাওয়ার পর পরই শান্ত ও উঠে গেসিলো,গাল ফুলিয়ে সোফায় বসে টিভি দেখতেসে এখন সে
দেখতে দেখতে কখন যে ৬টা মাস হয়ে গেলো বুঝাই গেলো না
এখন আপাতত শান্তই অফিসে যায় আহানা যায় না
তার ছুটি,মাতৃকালীন,একটু আগেই ছুটি পেয়েছে
প্রাইভেট কোম্পানি তো যতদিন কাজ করবে না ততদিন বেতন পাবে না,শান্ত আর আহানা সেটাতেই রাজি হলো
শান্ত এখন সংসার চালায়,আহানা বাসায় থাকে সারাদিন
আজ মাসের এক তারিখ
শান্ত আর আহানা রেডি হচ্ছে,মোহনগঞ্জ যাবে,বাবার কড়া আদেশ আহানা ১মাস মোহনগঞ্জে থাকবেই থাকবে
আহানা সেই শাড়ীটা পরেছে যেটা শান্তর মা রেখে গেসিলেন আহানার জন্য
আজ ৬মাস তাই নিয়মমাফিক সে এটা পরেছে,আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পেটে হাত দিয়ে চেয়ে আছে সে
শান্ত একটা পাঞ্জাবি পরে হাতে ২টা ট্রলি ব্যাগ নিয়ে সেই কখন থেকে তাকিয়ে আছে দাদা দাদির বাসার দিকে
দাদি আহানাকে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিচ্ছেন আরও অনেক দোয়া পড়ে ফু দিয়ে বললেন জলদি চলে আসতে,ঢাকার হসপিটাল ভালো,চিকিৎসা ও ভালো
আহানা বললো ডাঃ রোস্তম অপারেশন করবে এখানেই,তারা জলদিই চলে আসবে
শান্ত রাফির সাথে কথা বলে তার বাসায় ল্যাপটপে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করবে এটা বলে সে আপাতত মানিয়েছে আর যদি দরকার হয় তাহলে আহানাকে সাথে করে নিয়ে চলে আসবে ঢাকায়
বাবার কথামত এক মাস থাকা কোনো মতেই সম্ভব না
কদিন থেকেই চলে আসতে হবে নাহলে চাকরিটা যাবে
আর এখন শান্তর মাস্টার্স কমপ্লিট!!
সে এখন আহানার সাথে ঝগড়া লাগলেই বলে “ঠিক করে কথা বলবা আমি তোমার চেয়ে অধিক শিক্ষিত”
আহানাও কিছু বলতে পারে না মাঝে মাঝে মনে মনে ভাবে শান্তর থেকে বয়সে এত ছোট না হলেও হতো,এই এক পয়েন্টের জন্য আহানা ঝগড়ায় হেরে যায় বারবার
ট্রেনে বসে আহানা বাইরে তাকিয়ে পেটে হাত দিয়ে বলতেসে “আমার বাবু!!আজ আমরা প্রথমবার তোমাকে নিয়ে তোমার দাদুর বাড়ি যাচ্ছি,তোমার কেমন লাগছে?”
আমি বলি?
আপনি কি বলবেন?ওর কেমন লাগছে আপনি জানবেন কি করে?
ওর ভাল্লাগতেছে না,কারণ ওর বাবার অফিস বাদ দিয়ে যেতে হচ্ছে এইটা ওর কেন ভাল্লাগবে
এখন থেকে বাচ্চাকে নিজের সাইডে করে নিচ্ছেন?স্টুপিড!
তো কি সারাদিন ম্যা ম্যা করুক তুমি চাও?
ব্যা ব্যা করুক সেটাও চাই না
হইসে সে তার মতো হবে,খুশি?
হু!!
এখন চলেন মোহনগঞ্জ এসে গেসে
শান্ত ট্রেন থেকে নেমে আহানার হাত ধরে ওকে নামালো,সকালে রওনা হওয়ায় এখন বিকাল হতে চললো,অনেকটা সময় লেগে গেছে,একটা রিকসা নিয়ে আহানাকে নিয়ে এবার সে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে
ওমা বাসার গেটে ফুল টুল দিয়ে সাজানো,গেটের সামনে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,সবার মুখে হাসি,অথচ আনুষ্ঠানিক বিয়ের আগের দিন ওরা যখন এসেছিল তখন বাবা আর ফুফু ছাড়া কেউ ছিল না আর আজ কিনা পুরো ব্যাটালিয়ন??
আহানা রিকসা থেকে নেমে কিছুটা শক খাওয়ার মত দাঁড়িয়ে আছে,মিতু এসে জড়িয়ে ধরলো আহানাকে
রেনু এসে আহানার ডান হাত ধরে ওকে ভিতরে নিয়ে সোফায় বসালো
আহানা তো রীতিমত ভূত দেখার মত করে মুখ করে আছে
শুধু সে না শান্তর ও মুখের ভাবগতি একই,এরকম সবাই বদলে গেলো কেন
ফুফু এসে আহানার কানের পিছনে টিকা লাগিয়ে দিলেন
রেনু একটা গয়নার সেট এনে সেগুলো আহানাকে পরানোর ব্যস্ত হয়ে গেসে
শান্ত ফ্রিজ থেকে জুস নিয়ে খাচ্ছে আর সবার কাণ্ডকারখানা দেখে যাচ্ছে
খালা মিষ্টির প্লেট নিয়ে যাওয়া ধরতেই শান্ত উনাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো সবাই এমন বদলে গেলো কেন
আরে শান্ত বাবা একটা বাচ্চা আসতে চলেছে এটার চেয়ে বড় খুশির খবর আর কি হতে পারে?
তাই বলে এতো?
আরে এখনও তো হয়নি বলে অল্পসল্প করছে
হলে তো সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিবে তোমার বউকে,তবে রেনু আপার এমন বদলে যাওয়াতে আমিও চমকেছি,হুট করে এত বছর পর এমন বদলালেন এখন বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়
হুমম!সায়ন কোথায়?
সে তো তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে পিকনিকে গেসে
ওহ,যাক ভালো
আহানাকে সাজিয়ে দিয়েছে সবাই,আহানা শান্তর দিকে অসহায়ের মত চেয়ে আছে,ওমা এবার আশেপাশেরর সবাই আহানাকে দেখতে আসতেসে এক এক করে
কি ঝামেলা,আহানার শরীর খারাপ করছে.এত জার্নি করে এসে এখন আবার সবার হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাতে হচ্ছে
পাশের বাসার চারু আন্টি বললেন আহানাকে এমন লাগছে কেন
বয়সে প্রবীণ হওয়ায় সবাই উনার কথায় মনোযোগ দিলেন
উনি আহানার হাত পা চোখ সব দেখে বললেন “মাইয়ার দেখি শরীরে রক্ত কম”
শান্ত কথা কাটিয়ে এসে বললো”হইসে সব বাদ,আমার বাচ্চার মাকে রেস্ট নিতে দাও তোমরা,সেই বিকাল থেকে সবাই খালি দেখেই যাচ্ছো,বাচ্চা হলে তো মনে হয় ২দিন ধরে দেখবা
আরে দেখবো না তো কি করবো,গায়ের রঙ কেমন চকচক করতেসে তুই দেখোস না শান্ত?
শান্ত চোখ মেরে বললো”ওমা আমার বউকে তো আমি দিনে ৪৫বার দেখি,এটা আবার বলতে হয় নাকি চারু আন্টি?”
ওরে বাপরে ৪৫বার??
হ😉
শান্ত! যাও আহানাকে নিয়ে তোমার রুমে চলে যাও,ওকে বলো এসব চেঞ্জ করে হালকা পাতলা সুতির শাড়ী পরতে, এসময়ে এত ভারী শাড়ী, গয়না গাটি পরা ভালো নয়
আচ্ছা মা
শান্ত আহানার হাত ধরে ওর রুমে নিয়ে গেলো
আহানা একটা সাদা কালো শাড়ী পরে নিলো সব গয়না খুলে,শান্তর দিকে তাকিয়ে দেখলো শান্ত ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কাজ করতেসে মনোযোগ দিয়ে
আহানা ওর পাশে এসে বসে ওর পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে বললো “তা মিঃ অশান্ত??আজ কয়বার দেখলেন আমাকে?”
হুমমম!৩৪বার
ওরে বাপরে তার মানে আর ১১বার দেখবেন?
জি
সব গুনে গুনে?
হ্যাঁ,এখন যাও টেবিলের উপরে রাখা এক ঝুড়ি ফ্রুটস সব খেয়ে শেষ দাও
কিহহ,এত কেন?
তোমার জন্য না আমার বাবুর জন্য
আমি এত খেতে পারবো না
তাহলে আজ রাতে একা ঘুমাইও,অন্ধকারে
আপনি এমন করেন কেন,আপনার তো আর আমার মত অবস্থা হয়নি তাই এমন করতেসেন,হলে বুঝতেন
প্রেমের পাঁচফোড়ন পর্ব ৬৭+৬৮
ল্যাপটপটা রেখে শান্ত একটা কুশন পাঞ্জাবির নিচে দিয়ে পেটে বসিয়ে প্রেগন্যান্ট এক্টিং করতে করতে ঝুড়িটা নিয়ে বিছানায় আসলো
আহানা হাসতেসে মুখে হাত দিয়ে
কি?দেখো এখন সব ফল আমি খেতে পারবো
আহানা শান্তর চুল টেনে দিয়ে বললো “আপনি পুরাটাই পাগল!!”
আর তুমি মহাপাগল!
কেন😒
কারন তুমি পুরোটাই পাগল এমন ছেলেকে বিয়ে করছো😁
