Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৫

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৫

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৫
রোজ ও রুশা

ভোরের আলো তখনো পুরো ফোটে ওঠেনি। পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস—কিন্তু গ্রামের সেই মাজার চত্বর আজও কুয়াশায় ঢাকা, ঠিক মানুষের চোখের মতো, যারা সত্যটা দেখেনি।
নাভান আর হেরা বসে ছিল মাজারের বারান্দায়। খাদেম বাবা এটা ওটা দিচ্ছিলো, শরীর দু’জনেরই দুর্বল—অসুস্থতা, ভয়, আর গত রাতের অমানুষিক ঘটনার ধাক্কা এখনো কাটেনি। তারা পবিত্র ছিল, নিঃশব্দ, নির্দোষ। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে এক মুহূর্তেই অপবিত্রতার ট্যাগ লেগে গেছে।

“একসাথে ছিল”—এই একটিমাত্র কথাই তাদের জন্য রায় হয়ে গেছে।
কেউ জানেনি, তার আগে তারা কিডন্যাপারদের হাতে পড়েছিল।
কেউ শোনেনি, তারা কতটা কষ্টে তাদের থেকে পালিয়ে এসেছিল। একজনের ট্যাগ আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল, ওই অসুস্থ অবস্থায়, দুজনই তখন নিরুপায় ছিল! তাদের কথা কেউ বুঝতে চায়নি, পবিত্রতা কখনো শরীর দিয়ে নয়—নিয়ত দিয়ে বিচার হয়।
মাজারের খাদেম, সাদা দাঁড়ি আর শান্ত চোখে, গভীরভাবে তাকিয়েছিলেন ওদের দিকে। মানুষের কোলাহল, সন্দেহ, আর অভিযোগের মাঝখানে তিনি শুধু একটাই কথা বলেছিলেন—
“মানুষ বিচার করে চোখ দিয়ে, আল্লাহ বিচার করেন নিয়ত দিয়ে।”
তারপর খুব সাদাসিধে ভাবে বিয়েটা পড়ানো হয়।
না কোনো সাজ, না কোনো হাসি।
শুধু দুটো ভাঙা মানুষ, আর একখানা পবিত্র বন্ধন—যেটা তারা তখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি নাকি কেউ বুঝেছে তা ঠিক বোঝা যায়নি!!
খাদেম বাবা উপদেশ দিয়েছিলেন,

“এই বিয়ে তোমাদের পাপ ঢাকার জন্য না,
এই বিয়ে আল্লাহর ইচ্ছায়—তোমাদের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য।”
ভোরে, আজানের ধ্বনি আর পাখির প্রথম ডাকের সাথে সাথে, তারা মাজার থেকে বেরিয়ে আসে। পহেলা ফাল্গুনের সকাল—কুয়াশার ভেতর হলুদের হালকা রোদ, বাতাসে বসন্তের গন্ধ। কিন্তু নাভান আর হেরার ভেতর তখনো শীত লেগে আছে।
তারা পাশাপাশি হাঁটে গ্রামের মাটির রাস্তায়।
হাতের কাছাকাছি, কিন্তু স্পর্শ নেই।
দু’জন একসাথে, কিন্তু মন কি এক?
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, অথচ তাদের ভালোবাসা জন্ম নেয়নি—জন্ম নিয়েছে ক্ষোভ একে অপরের প্রতি, সমাজের চাপ, আর আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া এক অজানা ভবিষ্যৎ। কেউ তো বিয়েটা মানেই না, তাহলে মনে এত প্রশ্ন কেন? প্রশ্ন আর প্রশ্ন। যাকে অহংকারীর খাতা থেকে নিচে নামাতে এসেছে নিয়তি, তার সাথে ভাগ্য জুড়ে দিয়েছে। এ কেমন পরিকল্পনা আল্লাহ তাআলার।
হেরা থামে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো তার চোখে পড়ে।
ধীরে বলে,

“আমরা যে ভুল করেছি তা এখানেই শেষ! আমি এই সম্পর্ক মানি না, আর না কোনোদিন মানবো।”
নাভান মাথা নাড়ায়। সম্মতি দিয়ে বলল,
“না। ভুলটা আমাদের না… ভুলটা যারা আমাদের না জেনে বিচার করেছে তাদের।” তোমার কথায় আমিও একমত। আমিও মানি না এই সম্পর্ক। তোমার মতো মিসাইল গার্লকে তো মানা অসম্ভব, এখানেই সব শেষ করছি আমি।
না, নাভান বলতে পারলো না শেষের কথাটা জোর গলায়। কেমন জানি কেঁপে উঠেছে গলাটা তার। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর তারা আবার হাঁটে। হেরার খুব রাগ হয়, কিন্তু সে আজ নিরব থাকে। রাগে ভাগ্যের দোষ দিচ্ছে সে। কেন পাকনামি করে ওই অসভ্য গিটারওয়ালার কাছে কাজ শিখতে চেয়েছিল? তখন সে না আটকালে ওই নেকা রানি তিতির নিয়ে যেত—এটাই ঢের ভালো ছিল। নিজেকেই সে দোষ দিচ্ছে মনে মনে।
পবিত্র বন্ধনের ভেতর দিয়েই
ধীরে ধীরে ভালোবাসা জন্ম হবে না জেনেও তারা হাঁটে একসাথে পাশাপাশি।

বন্ধুকে খুঁজতে খুঁজতে সবার অবস্থা শেষ। কেউ থানায় যাওয়ার কথা বলছে, কেউ আবার কিডন্যাপারদের সিনেমার মতো প্ল্যান বানাচ্ছে। ঠিক তখনই দেখা গেল—মাজারের ভেতর থেকে লাল লুঙ্গি, মাথায় লাল কাপড় বাঁধা, পরনে আগের শার্ট পরে একদম শান্ত মুখে বের হচ্ছে নাভান ও হেরা। প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে অক্ষত অবস্থায় দেখে সবার প্রাণ ফিরে পায় যেন। কিছুক্ষণ আগে একটা চায়ের দোকানে বয়স্ক চাচার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে আসতে বলে নাভান তাদের এই মাজার চত্বরে। তারাও এই পথ দিয়ে আসছে।
অধীর প্রথমে চিনতেই পারলো না। একটু তাকিয়ে থেকে চোখ কচলে বলল—

— দাঁড়া দাঁড়া… উপরেরটা তো আমাদের নাভান। কিন্তু নিচেরটা খাজা বাবা কেমনে হলো? এক রাতেই ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট এত ফাস্ট কিভাবে কি ভাই?
অধীর আবারো ভালো করে তাকিয়ে সৃজনকে উদ্দেশ্য করে বলে—
— কিরে সৃজন, কিডন্যাপাররা নিয়ে গিয়ে সাধু বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে ঢাকার ক্রাশ বয়কে?
সৃজন বেশ বিরক্ত নিয়ে বলে—
— এই চুপ করবি? পরিস্থিতি বুঝে কথা বল। (সৃজন)
অধীর থামার পাত্র না—
— পরিস্থিতি বুঝেই বলছি! আমরা সারারাত টেনশনে, আর সে এখানে আধ্যাত্মিক আপডেট নিয়ে বের হলো! তাও খাজা বাবার বেশে।
সৃজন তখন অধীরের দিকে তাকিয়ে বলল—

— এই তুই না একটু আগে মেয়েদের মতো কাঁদছিলি? “আমার ভাই রে ফিরায়া দাও! ও খোদা আমার ভাই রে ফিরাই দাও” বলে নাক টানছিলি! এখন আবার ভণ্ডামি শুরু করছিস!
সৃজনের কথাটা মনে ধরেনি অধীরের। তার তো একটু আগে যখন নাভানের সাথে কথা হয়েছে, তখনই সব টেনশন রকেটের গতিতে দূর আকাশে চলে গেছে নাভান ঠিক আছে শুনে। অনেকক্ষণ নিজের ক্যারেক্টার থেকে দূরে ছিল সে, তাই তো বারুদ মার্কা মুখ দিয়ে অধীর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল—
— আরে ওটা কান্না না, ইমোশনাল সাপোর্ট! এখন আই’ম টেনশন মুক্ত!
এবার তুষার গম্ভীর মুখে বলল—

— ইমোশনাল সাপোর্ট? তোমার সেই সাপোর্ট দেখে মাজারের কবুতরও ভয় পেয়ে উড়ে গেছে। দেখো শালা বাবু।
এবার সৃজন আবার খোঁচা দিল অধীরকে—
— সত্যি, নাভান যদি আর দশ মিনিট দেরি করতো, অধীর মাজারে চাদর বিছিয়েই মানত করে ফেলতো।
অধীর মুখ গম্ভীর করে বলল—
— হ্যাঁ করতাম! কারণ ভাইকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি সব করতে পারি… তবে লাল লুঙ্গি খাজা বাবার সাধু বেশে না!
থেমে আবার বলে—
এটা আমাদের নাভান তো ভাই!!

“না বেশি চিন্তার ফলে আমরা ভুল দেখছি, এ খাজা বাবার ভক্ত হবে নিশ্চিত?” (অধীর)
সৃজন কটমট করে তাকিয়ে তুষারের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো—
“ভাই গাড়ি থামান তো? এ হাফ পাগলের কথায় কান দিয়েন না, ওইটা নাভান।”
তুষার গাড়ি থামায়। অধীরের মনে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
খাজা বাবার ভক্ত কবে হলো আমাদের হিরো?
“এ লুঙ্গি কেমনে সামলাচ্ছে? আমার মনে লাল গোলাপি প্রশ্ন!”
ইস যদি আজ অধীরের মতো নাভান হতো তাহলে হয়তো বলতো!!
মাথায় লাল গামছা বেঁধে, লুঙ্গি পরে আমি বিয়ে করেছি এক মিসাইল গার্লকে!
ভালোবাসা দিবসে লাল লুঙ্গি পরে দেখি, মাজার চত্বর আমার শ্বশুরবাড়ি!
কেউ বলে অপবিত্র নাকি, কেউ বলে ভাগ্য জোর।
আমি বলি হঠাৎ বিয়ে, বুঝার আগেই শেষ ঘোর!
মাজার ভরা লোকজন, সবাই দেয় উপদেশ।
মিসাইল বউ তাকায় রাগি চোখে — “এই বিয়ে কিন্তু এখানেই শেষ!”
রাগে হেসে বলি আমি, দোষটা কিন্তু আমার না।
লাল গামছাই আর লুঙ্গি ফাঁসাইছে, পালানোর কিন্তু আর রাস্তা খুঁজো না!

তুষার গাড়ি থামাতে তিনজন ছুটে আসে তাদের কাছে। নাভান গাড়ি দেখেই বুঝতে পারে এরা তার ভাই ব্রাদার, গটগট পায়ে গাড়িতে উঠে বসে। কেউ প্রশ্ন করলে তার উত্তর দেয় না সে, যেন রাগটা এখন পড়েছে তার। কিন্তু কী নিয়ে তা অজানা। আগের ফর্মে ফিরে আসে নাভান।
হেরা মোটামুটি সব বলে, জাস্ট বিয়েটা স্কিপ করে। বাড়িতে আসতেই রোজ আর রুশা হেরাকে জাপটে ধরে আছে সেই কখন থেকে। হেরা ও নাভানকে জোর করে তখন তুষার নিজ হাসপাতালে নিয়ে ট্রিটমেন্ট করায়, মাথায় ব্যান্ডেজ দুজনেরই।

এদিকে নিজ কাজ হাসিল করতে না পেরে বাট্টু আর বল্টুকে তার বস ইচ্ছে মতো শাসায়। নাভান সবাইকে এই ঘটনা জানাতে না করে, বিশেষ করে তার মাকে। সবাই চুপ থাকে, কেউ কিছু বলে না। নিজের প্রাণপ্রিয় বন্ধু উরফে ভাইকে কাছে পেয়েছে এতেই তারা হ্যাপি।
কিন্তু অধীরের মনে অনেক প্রশ্ন—এই যেমন লুঙ্গি পরলো কিভাবে আর ওই লুঙ্গিটা বেঁধে দিলই বা কে? এই জীবনে সে তো নাভানকে লুঙ্গি পরতে দেখেনি, তাও কী না একেবারে চকচকে ঝকঝকে ফকফকা লাল লুঙ্গি! বিষয়টা তাকে খুব গভীর করে ভাবাচ্ছে। সে নাভানকে লক্ষ্য করেছে—বেশ চিন্তিত তার হিরো ভাই।
হেরা বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নেয় অনেকক্ষণ, আর রোজ রুশার সাথে আড্ডা দেয়। অনেক কথা বলে তাদের কিভাবে কী হয়েছে, বিয়ের জায়গাটা জাস্ট স্কিপ করে।

১৪ ফেব্রুয়ারি, সন্ধ্যা ৬টা।
শহরের আকাশ তখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। শরীর দুর্বল হেরার, ঘুমাবে আজ তাড়াতাড়ি। রোজ রুশা আজ রান্না করছে, কাজের বুয়া খালাটা আজ আসেনি, তাই দুজন মিলে রান্না করছে। ঝিনুককে অনেক বলেছে থাকতে, কিন্তু সে থাকেনি, নাভানদের বাসায় চলে গেছে তুষারের সাথে।
ঘুমজড়ানো চোখে দরজা খুলতেই হেরা থমকে গেল।
দরজার সামনে বিশাল লাল বাক্স।
তার ওপরে সোনালি অক্ষরে লেখা—
“১,০০১ রকমের ভালোবাসা, শুধু তোমার জন্য।”
হেরা অবাক। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন আরও জোরে বাজতে লাগল। এর মধ্যে রোজ ও রুশা উপস্থিত, তারা দুজন স্ট্যাচু হয়ে গেছে এত বড় ফুলের বুকেট দেখে। তিনজন রুমে নিয়ে আসে।
বাক্সটা খুলতেই—

গোলাপ, টিউলিপ, জারবেরা, রজনীগন্ধা, গাঁদা, লিলি, অর্কিড…
লাল, গোলাপি, সাদা, বেগুনি, নীল, হলুদ—
রঙের এমন উচ্ছ্বাস যেন বসন্ত নিজেই এসে দাঁড়িয়েছে তার বারান্দায়।
১০০টা ফুলে ১টা চিঠি, ১০০০টায় ১০টা, আর লাস্ট ১০০১ নম্বরের ফুলে একটা সাদা কাগজের সবচেয়ে বড়ো খামে একটা চিঠি। হেরা কয়েকটি চিঠি তুলে পড়তে থাকে।
১০০ ফুলের মধ্যে ১ নম্বর ফুলের চিঠিতে লেখা-
আমি মুগ্ধ হয়েছি প্রথম তোমার মুখের হাসিটা দেখে।
৫ নাম্বার চিঠি –
“তোমার রাগটাও আমার কাছে আদুরে।”
৭ নম্বর চিঠি-
“যেদিন তুমি কেঁদেছিলে, আমার বুকটাও ভেঙেছিল।”
৮ নম্বর চিঠি-
“আমি হারিয়ে গেলেও, তোমাকে খুঁজে নেবো।”
আর ১০ নম্বর চিঠি-
একটি সাদা গোলাপ।
কার্ডে শুধু একটা লাইন—
“তোমাকে ছাড়া আমার পৃথিবী অসম্পূর্ণ।”
হেরা বুঝতে পারল—
এটা শুধু ফুল না, এটা তার প্রতি প্রতিদিনের অনুভূতির হিসাব।
তারপর শেষ ১১নাম্বার চিঠি খুলে পড়তে থাকে।

আজ ভালোবাসা দিবসে, আমি কেবল তোমাকে লিখছি না—আমি আমার সমস্ত অনুভূতি, আমার সমস্ত স্বপ্ন, আমার সমস্ত নীরব গল্প তোমার কাছে তুলে ধরছি। কখনো মনে হয় না শব্দগুলো যথেষ্ট, তবুও আমি চেষ্টা করি, কারণ তুমি আমার জীবনের সেই অনন্য সুর, যা আমি চিরকাল অনুভব করতে চাই।
তুমি যখন পাশে থাকো, সময় থেমে যায়। প্রতিটি মুহূর্ত যেন একটি স্বপ্নের পৃষ্ঠা হয়ে ওঠে। তোমার হাসি আমার অন্তরকে আলোকিত করে, আর তোমার চোখের গভীরতা আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে শুধু আমরা দু’জনে আছি, আর পৃথিবী থেমে গেছে। তোমার স্পর্শের নরমতা মনে করিয়ে দেয়, জীবন ছোট ছোট ক্ষুদ্র সুখের সমুদ্রের মতো, আর তুমি সেই সমুদ্রের একমাত্র জ্বলজ্বলে রৌদ্র।
আমি স্বপ্ন দেখি আমাদের ভবিষ্যতের—যেখানে আমরা একসাথে হেঁটে যাব, ঝড় আর শান্তির মধ্য দিয়ে, একে অপরের হাত কখনো ছাড়ব না। যেখানে আমাদের নীরবতা কথা বলবে, যেখানে আমাদের হাসি প্রতিটি অন্ধকার মুহূর্তকে আলোকিত করবে। তুমি কেবল আমার ভালোবাসার প্রিয়তমা নও, তুমি আমার জীবনের সেই অদৃশ্য কাব্য, যা প্রতিটি শ্বাসে বাজে।

ভালোবাসা মানে শুধু অনুভূতি নয়—এটি আমাদের গল্প, এটি আমাদের ছায়া, এটি আমাদের স্মৃতি। প্রতিটি বার্তা, প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি হাসি—এগুলো আমার অন্তরের প্রতিটি কোণে লেখা, আর আমি চাই, তুমি সেই কোণগুলোতে বাস করো চিরকাল।
আজ এই চিঠিতে আমি শুধু বলছি—আমি তোমাকে চিরকাল ভালোবাসব। তুমি আমার জীবনের সব রং, সব আলো, সব গান। তুমি নেই এমন কোনো দিন আমার কাছে নেই। তুমি আমার সব, এবং আমি চিরকাল তোমার হব। ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা, নেশাময়ী অক্সিজেন!

ইতি তোমার ভালোবাসা N
হেরা মুচকি হাসে। চিঠিটা যে নিলয় দিয়েছে তা আর বুঝতে বাকি নেই। আসলেই ছেলেটা পাগল। কিন্তু কেন সে এই ছেলেকে ভালোবাসতে পারছে না? রাতের আধারে ধীর পায়ে বারান্দায় যায় হেরা। তার ঘুম আসছে না। চিন্তায় কী হলো তার সাথে? সে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে কখনো কারো সামনে আসতে দেবে না। ওই লোকটা তার অপছন্দের লিস্টে সবসময় থাকবে। ভাগ্য কি নির্দয়! কেন এমন হলো? কেন ওই লোকটার সাথে পবিত্র সম্পর্কের বন্ধনে আটকে যেতে হলো?
হেরা মনে মনে প্রতিশ্রুতি দেয়, যতই পবিত্র হোক সে কখনো এই বিয়ে মানে না। যত দূর ওই লোকটাকে আরও ঘৃণা করতে হবে, ওই বিয়ের কথা আজ মুছে ফেলতে হবে একটা এক্সিডেন্ট ভেবে। তাই করলো হেরা, মনকে শক্ত করে শুয়ে পড়ে নিজ বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে।
হেরা আর নাভান দুজনেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শারীরিক ধকল আর মানসিক চাপে দুজনই ঘুমাচ্ছে। শুধু যে তারা ঘুমাচ্ছে তা নয়, সবাই গভীর ঘুমে, কারণ কাল কারো ঘুম হয়নি।

দুদিন পর, নিলয় ফোনে না পেয়ে ক্যাম্পাসে চলে এসেছে আজ হেরাকে দেখতে সবার আগে। সিয়ামকে সাথে নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে আছে হেরার জন্য। সিয়াম নিলয় এর পাগলামি দেখে অবাক যে ছেলে জাস্ট একটা খাবারের অডার দেরিতে আসলে মেমেজারের মাথায় গিয়ে বাড়ি মেরেছিলো অপেক্ষা করতে পারবে না বলে।আর সেই ছেলে একটা মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছে? সিয়াম ঠাট্টার সুরে বলে।
“ভাই তুই কি দিওয়ানা হইলি রে হেরার জন্য? এতো দিওয়ানা হস না ভাই, পরে মরবি না পাইলে।” (সিয়াম)
নিলয় মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠলো—
“তাকে নিজের করে পেতে মরতে হলেও আমি রাজি।” (নিলয়)
সিয়াম যেন হাসলো, টিটকারি করে বলল—

“কি ভাই, তাজমহল বানাবি নাকি?” মরলে থাকবি তুই সারে তিন হাত কবরের নিচে আর হেরা আরেকজনের বুকে (সিয়াম)
নিলয় বুক ফুলিয়ে তীব্র কনফিডেন্সে বলল—
“আমি তো তার তাজমহল, যেখানে তার রাজত্ব চলে আর কারো না।” আর মরার আগে হলেও তাকে আমার করে নিবো তারপর মরবো (নিলয়)
সিয়াম এবার একটু নরম হলো যেন। চোখে মুখে এক আশার আলো দেখতে পেল সে। নিলয়ের চোখে চোখ রেখে বলল—

“তাহলে নেন্সির কি হবে?”
“ও ভালো সুন্দরী একটা মেয়ে, কিন্তু আমার মন থেকে কোনো টান আসে না তার জন্য। মেয়েরাই তো আসে আমার কাছে, মন বড়ো বলে একটু আরেকটু মজা নেই। কিন্তু দোস্ত বিশ্বাস কর, হেরাকে মন চায় পুতুলের মতো আগলে রাখতে। তাকে ছুঁতে গেলেও আমার হাত কাপে, মনে হয় সে ব্যথা পাবে।”
“আংকেল জানে তার ছেলে সত্যি প্রেমে পড়েছে?”
“নাহ, বাবাকে জানাবো না। এমনি বাবা অনেক চিন্তায় থাকে, কী নিয়ে জানি ভাবে সারাক্ষণ। বর্তমানে ঢাকাতেই আছে!”
দুই বন্ধুর মধ্যে কথা হতে থাকে টুকটাক।
চোখের সৌন্দর্য হলো সবচেয়ে ভয়ংকর।

নাভান চোখ বন্ধ করলেই হেরার মায়াবি চোখ তার আক্ষিপল্লবে ভেসে ওঠে। হেরারও শেষ রাতে ঘুম ভেঙে যায়। কী একটা স্বপ্ন দেখেছে সে—কেউ তার পিছু ছুটে যাচ্ছে আর কী একটা নামে সে ডাকছে তাকে।
মাথা যন্ত্রণায় উঠে বসে হেরা। নাভানের সাথে তার অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছে কাল। ঠিক তার মতো মাতাল নেশাময় চোখ, অনেকটাই একরকম। আর কেমন দুজনকে ভিন্নদেশি মনে হয়। গলার তিলটাও তার মতো, কিন্তু নাভানের একটা আর হেরার কণ্ঠদেশে দুইটা, আর বুকের পাশে একটা তিল।
ভোর রাত থেকে তিতির পাগল করে ফেলছে তার বাবাকে—নাভানের কাছে যাবে। সে কিভাবে জানি জানতে পেরেছে নাভান আর হেরা একসাথে কিডন্যাপ হয়েছে, ব্যাস এটাই ছিল তার বুক ব্যথার কারণ।
হায়দার মেয়ের এমন পাগলামি দেখে ভয় পেয়ে যায়। ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করে ক্ষান্ত হয়নি মেয়েটা। ক্যাম্পাসে হেরার সাথে নাভানের ডান্সের নাম ওঠার পর থেকে মেয়েটা সাইকোর মতো বিহেভ করছে। নাভান বলতে পাগল। শেষ রাতে সেন্সলেস হয়ে যায় মেয়েটা। হায়দার চৌধুরি না পেরে নাভানকে কল দেয়। নাভান হায়দার চৌধুরির কথা শুনে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যায় হাসপাতালে।

“নাভান হায়দার চৌধুরিকে সাহস দিয়ে বলে—
“আমি আছি, চিন্তা নেই।”
“আমি আছি চিন্তা নেই”—এই কথাটাই হায়দার চৌধুরির কানে বাজে। মেয়েটা ছোট থেকে বিয়ের জন্য কী পাগলামি করছিল। যাক, এখন নাভান এসেছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। আর সে নিস্তার পাবে।
তিতির ঘুমের ঘোরে কারো আবছা কিছু দেখতে পায়, যেখানে কেউ তাকে ডাকছে। ওই ছেলেটার মতো সেও বলছে—
“বাবা, বিয়ে করবো তো আমি। বিয়ে দাও আমায়! আমায় যেতে দাও আমার জি ম্যানের কাছে যাবো।
যেও না, আমায় নিয়ে যাও! আমি যাবো তোমার সাথে, থাকবো না এখানে। তোমায় ছাড়া কি আমি থাকতে পারি বলো? না পারি না তো, জি ম্যান… জি ম্যান!”
তিতির চেঁচিয়ে ওঠে। নাভান তিতিরকে এমন অবস্থায় দেখে তার হাত চেপে ধরে।
“তুমি এসেছো জি ম্যান, আমি জানতাম তুমি আসবে। তোমার তিতির অসুস্থ, তুমি না এসে কি থাকতে পারবে? না, মোটেও পারবে না!”

নাভান মায়াবি চোখে তাকায় তিতিরের দিকে। নরম কণ্ঠে বলে—
“হুম তিতির, আমি এসেছি। তোমার কিছু হলে আমি আসবো না তা কি করে হয়? আমি এসেছি। এবার শান্ত হও।”
তিতিরের চোখে মুখে হাসির ঝিলিক। সে বাবাকে হাসিমুখে বলল—
“দেখেছো বাবা, আমি জানতাম আমার নাভান আমার কাছেই আসবে। বেবি, তুমি ওই মেয়েটার সাথে কই হারিয়ে গিয়েছিলে জানো? আমার খুব রাগ লাগছিল। তুমি ওই বেহেনজি টাইপ মেয়ের সাথে কিছু করবে না। তুমি ডান্সও দিবে না ওই মেয়েটার সাথে।”
তিতির নাভানের এক হাত জড়িয়ে ধরে আছে। নাভান এক হাত তিতিরের মাথায় রাখে।
“ওকে, শান্ত হও তিতির। আমি ওই মেয়ের সাথে ডান্স করবো না। এবার শান্ত হও।”
হায়দার চৌধুরি চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস ফেলে। মেয়েটা ছোট থাকতেই জি ম্যান বলতে পাগল। এখন তার জি ম্যানকে পেয়ে কী পাগলামি করে! যাক এখন শান্ত হবে মেয়েটা।

ডান্স ক্লাবে সবাই ডান্স করছে, কিন্তু রোজ ডান্স পারলেও রুশা পারছে না। এদিকে অধীর হেসে কুটিকুটি। বাংলা গানে যে হেরা আর রুশা ডান্স করতে অভ্যস্ত নয়। ওরা রিমিক্স গানে ডান্স করবে। নাচের মধ্যে একজনের পার্টনার অন্যজনের সাথে অদলবদল করে ডান্স করবে—এমনটাই রুলস।
রুশা, রোজ আর হেরা ডান্সের জন্য মেরুন কালারের চুরিদার পরে এসেছে। ক্যাম্পাসে যখন তারা এসেছিল, তখন সবাই হাঁ করে তাকিয়ে ছিল—মনে হচ্ছিল একটা গ্যাং। কিন্তু সৃজন রোজকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল—
“দের ব্যাটারি গ্যাং।”

তারা মানে হাইটে তারা তাদের মতো তালগাছ না, কিন্তু একেবারে শর্টও বলা যায় না। ৫.২/৩-এর মেয়েরা একেকটা কিউটের ডিব্বা। তারা সবকিছুতেই কমফোর্ট—হাই হিলও পরতে পারে আবার স্লিপারও। রোজ ভেংচি কেটে চলে এসেছিল। কাল থেকে ছেলেটা ভীষণ জ্বালাচ্ছে। হেরার নাম করে কিছুক্ষণ পরপর ফোন দিয়ে বিরক্ত করছে। রুশা রাগে পারছে না বলে চলে যাচ্ছিল, তখন অধীর পাশ থেকে টিজ করে—
“ঠোঁট দুটি তোর কমলা লেবু, গাল দুটি তোর আপেল, লম্বা চুলে বেনি ঝুলিয়ে কোথায় যাস কোমরখানি দুলিয়ে।”
রুশা যেতে গিয়েও ফিরে আসে। অধীরের সামনে গিয়ে বলে—
“এই লাইভ টেলিকাস্ট মেয়েদের এমনভাবে ইভটিজিং করেন? দেখতে তো নিষ্পাপ শিশুদের মতো মনে হয়, কিন্তু আপনি তো দেখি ইভটিজিং করেন খুব ভালো।”

অধীর চেয়ার টেনে, শার্টের বোতাম খুলে পিছনের দিকে হেলিয়ে দেয়। পিঠের দিকে শার্টটা, পরনে তার সাদা গেঞ্জি। ফর্সা শরীরে চাঁদের মতো ঝলক দিচ্ছে যেন তার বডি। অধীর বাচ্চা বাচ্চা ফেস করে বলে—
“তুমি আমায় শিশু বললে, এখন যদি তুতু খেতে চাই আমি!”
রুশা ‘তুতু’ কী বুঝল না, ভ্রু কুঁচকে থাকে। অধীর হেসে বলল—
“আমি তো নিষ্পাপ শিশু। এখন অব্দি তোমার মতো কারও লাইভ টেলিকাস্ট দেখিনি। আমার কি পাপ হবে? শিশুদের ভুল আল্লাহ ক্ষমা করে দেন জানো, লাল গোলাপি। যেহেতু তুমি আমায় শিশু উপাধি দিলে, তাহলে একটু শিশুদের মতো আচরণ করি কি বলো? তুমি দেখেছো, আমিও দেখে নেবো!”
রুশা কটমট চোখে বলল—

“লোকাল বাসের মতো খুলে রাখলে দোষ আমাদের না। আপনার?”
“ওই লাল গোলাপি, অপমান করবা না। সব দোষ তোমার—তোমার চোখের। লাল গোলাপি চোখ দিয়ে লাল গোলাপি জিনিস দেখে ফেলেছো?”
“ভণ্ডামি করার জায়গা পান না। আমি আগেই বলছি, এখনো বলছি—আমি দেখিনি, জাস্ট জার্সি দেখেছি।”
“ভণ্ড! তাও আমি ছি ছি। তবা পরো লাল গোলাপি। দুধের বাচ্চাকে এমন অপবাদ দিলে আল্লাহ সইবে না।”অইটা জার্সি না অইটা দাবি ব্রেন্ডের ***আন্ডার***
না লজ্জায় ছেলেটা বলতে পারলো না।রুশা দাত কটমট করে হাজারো গালি দিতে থাকে অধীর কে।
তাদের ঝগড়া দেখে রোজ ছুটে আসে। অসহায়ের মতো করে রুশার হাত ধরে বলে—
“চল না রসুন রানী, আমি শিখিয়ে দিবো চল, পাক্কা এবার আমি সব শিখিয়ে দিবো। দেখ, আমাদের পরের রিহার্সাল করবে গ্রুপে N ‘হেরাদের দল’। প্লিজ আয়।”

সিয়াম ন্যান্সির দিকে চেয়ে আছে একমনে। মেয়েটাকে সে ভীষণ ভালোবাসে, কিন্তু নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের জন্য চুপচাপ সরে যায়। বুকে ব্যথা নিয়ে দূরে চলে আসে। সেও তো অনেক মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং করেছে। মেয়েটাকে সে বোঝাতে চেয়েছে—নিলয় তাকে জাস্ট ইউজ করবে, ভালোবাসবে না। কিন্তু কার নামে বলবে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডকে? সেও তো কম সুন্দর না। তবুও কেন ন্যান্সি নাভান আর নিলয়ের প্রতি দুর্বল ছিল? হায় কপাল! সুন্দর্যের কি কদর এই সমাজে! ন্যান্সিও মাশা-আল্লাহ। কিন্তু নিলয় তাকে রেখে হেরাতে মজেছে। আর নাভান হেরাকে একদম সহ্য করতে পারে না। কেউ কারো দিক থেকে পরিষ্কার নয়। সে ভালোবাসে ন্যান্সিকে, যদিও বলা হয়নি। কোন মুখে বলবে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত দেখার পর? তাও কেন জানি সিয়াম এই মেয়েটার থেকে চোখ সরাতে পারে না।

আজ তিতিরকে সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে এসেছে নাভান। মেয়েটা যে বায়না ধরেছে! তিতিরও মাশা-আল্লাহ, যদিও সে বিদেশি কালচার পছন্দ করে—জিন্স আর টপস পরে সবসময়, মাথার চুল কালার করা। তিতিরের চুল মোটামুটি বড়। নিজেকে সবসময় নাভানের সামনে উপস্থাপন করে রাখে তিতির। কিন্তু নাভান তাও তার দিকে অন্য চোখে তাকায় না, সবসময় কেমন এদিক-সেদিক তাকিয়ে কথা বলে। এই তো আজ বাইক নিয়ে আসার জন্য কত কাহিনি করেছে, কিন্তু নাভানের সাফ কথা ছিল—

“তিতির, যেতে হলে কারে করে যাবে। আমি আমার বাইকের পিছনে মেয়েদের নিতে অপছন্দ করি।
তিতির কি করবে! এত বলেও যেহেতু লাভ হয়নি, তাই বাধ্য হয়ে সে কারে আসতে রাজি হয়েছে।
আজ সকালটা হেরার কাছে অন্যরকম। স্যারের সাথে কথা বলে নাভানকে খুঁজতে বের হয়েছে হেরা। কিন্তু নাভানের খবর নেই। দূরে ঝিনুক আর তুষার ভাই আসছে—কি সুন্দর জুটি তাদের! ঝিনুক যেহেতু লেডি বাইকার, তাই বেশিরভাগ সময় সে জিন্স আর টি-শার্ট পরে। শ্যামলা দেখতে মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে বড় বোনের ছাপ দেখতে পায় হেরা । আর তুষার ভাই কত বুঝদার! এই যে পিছন পিছন এসেছে কার নিয়ে—ভালোবাসার মানুষটা ঠিকমতো ক্যাম্পাসে এসেছে কি না দেখতে। এই মেয়ে যে উড়াধুড়া বাইক রাইড করে, তাই তো ভয়। একসময় ঝিনুকের বাইক রাইড ছিল খুব শখের। কিন্তু একদিন পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে। সেদিন নাভান, সৃজন, অধীর আর আরও অর্ধশতাধিক স্টুডেন্টের সামনে তুষার ছেলেটা পাগলের মতো কেঁদেছে। সেদিনের পর থেকে নাভানের কড়া আদেশে বাইক রাইড থেকে বিরতি নেয় ঝিনুক। তুষার ঝিনুককে ক্যাম্পাসে দিয়ে তারপর সে তার হাসপাতালে যায়।
এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ ধাক্কা খায় কারও সাথে। নিচে পড়ে যাওয়ার আগে শক্ত হাত তাকে ধরে ফেলে। চোখ তুলে তাকাতেই কালো কুচকুচে তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকায়। চোখটা চলে যায় ফর্সা শরীরের অ্যাডামস অ্যাপেলের দিকে। তিলটা মুখের দিকে তাকাতে চোখের সামনে উঁকি মারে চাঁদের মতো।তিতির আর নাভান এদিক দিয়ে আসছিলো নাভান আর তিতির কথায় মনোযোগ থাকার কারনে সামনে দেখতে পায় নি আর হেরা ঝিনুক আর তুষার ভাই কে দেখতে বেখায়ালি হয়, যার কারনে এই ধাক্কা।তিতির এর দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় তিতির কেমন রাগি চোখে তাকিয়ে আছে হেরার দিকে।তাই হেরার হাত ছেড়ে দেয়,কিন্তু হেরা পরে যাওয়ার আগে শক্ত একটা হাত তাকে আগলে নেয়,খুব আলতো ভাবে, মনে হচ্ছে একটা কাচের পুতুল হেরা পরে গেলেই ভেঙে যাবে।নিলয় অস্থির হয়ে বলে।

“উফফ হেরা ফুল দেখে হাটবে না,কোথাও ব্যাথা পাওনিতো।
হেরা রক্ত চক্ষু নিয়ে নাভান এর দিকে তাকিয়ে বলে।
” না নিলয় সামনে এক জোড়া হাতি ছিলো তো দেখতে পাই নি। যাই হোক ব্যাথা পাই নি তার আগেই আমার রক্ষা করার সুপার ম্যান এসেছে।ব্যাথা কি করে পাই বলুন।
হেরার কথায় নিলয় এর চোখ মুখে কেমন খুশির ঝলক দেখতে পায় নাভান।তিতির বিরক্ত নিয়ে বলে—
“বেবি চলো অযথা সময় নষ্ট করার দরকার নেই।
নিলয় হেরার হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, আর অন্য পাশে তিতির নাভানের হাত। চারজনই পাশাপাশি হাঁটছিল, কিন্তু তাদের চোখ যেন নিজের নিজের হাতে আটকে ছিল। কারো মুখে কোনো কথা নেই, কারো চোখে স্পষ্ট কোনো অনুভূতিও ধরা পড়ছে না।
তিতির আজ ইচ্ছে করেই নাভানের সঙ্গে মিলিয়ে একই রঙের টি-শার্ট পরেছে। দূর থেকে দেখলে যে কেউ বলত—মেড ফর ইচ আদার। কিন্তু মানুষের ভাবনা আর আল্লাহর লেখা কখনো এক হয় না। যা সবাই সহজ ভাবে, নিয়তি ঠিক তার উল্টো পথেই গল্প লিখে দেয়।

” অসভ্য গিটার ওয়ালা,যেমন তার গফ তেমন বফ।দুটাই এক।
মনে মনে বির বির করে বলে হেরা কথাখানা।
নিলয় হেরার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো! ফুলের তোরা পেয়েছিলে?
হেরার মনে পরে যায় ১৪ ফ্রেব্রুয়ারির দিন তাকে কিভাবে সারপ্রাইজ দিয়েছে নিলয়,এমিন ভাবে কাওকে ভালোবাসা যায় আদো? হেরা নিলয় এর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়।ছেলেটা সুন্দর কিন্তু তার মনে ফিলিংস কাজ করে না কেনো তা বুঝতে অক্ষম । হেরা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল হেরা—
“অনেক ধন্যবাদ । সত্যি বলতে আমি সারপ্রাইজ হয়েছি। আর এতো পাগলামি করার দরকার কি নিলয়?
নিলয় শুধু বিপরীতে হাসে আর মাথা চুলকায়।
“এই হচ্ছে টা কি কোমর চেপে ধরেছেন কেনো।( রোজ )
” ডান্স করছি চোখে দেখো না।( সৃজন )
“সভ্য ভাবে ডান্স করেন অসভ্য ভাবে করছেন কেন ?( রোজ )
” আমি সভ্য ছেলে সেটা রাস্তার পাগল ও জানে।( সৃজন )
“হুম জানে আপনি যে একটা চুমুর সাপ্লাই ম্যান। অসভ্য।আপনার নামে চুমুর কেস দিবো আমি দেইখেন,ছাড়ুন বলিছি। ( রোজ )

নাচের সময় পার্টনার অদল বদল হওয়ার কারনে, সৃজন রোজ এর সাথে দুষ্টমি করতে থাকে । মুলত তাকে সে জ্বালাচ্ছে,রেগে যখন মেয়েটা উলটা পালটা কথা বলে তখম মন চায় টুপ করে একটা কিস করতে । কিন্তু না,একই ভুল বাবার বার করলে সত্যি হিছার বাড়ি দিবে । না হলে গজারি চালান করবে,যে ডেঞ্জারেস মেয়ে বাপ রে বাপ।।সৃজন রোজ কে উদেশ্য করে বলে—
” তোকে প্রথম বার দেখে চোখে চোখ রেখে, কখন জানি না আমি কেস খেয়েছি। তোর সেক্সি হাসিতে মন দিতে নিতে কখন জানি না আমি কেস খেয়েছি।স্বপ্নেরি জ্বালে তোর হাই ভোল্টেজ গালে যেই হালকা ঠোঁট রেখেছি ও সেট সলিট কেস খেয়েছি।
রোজ চোখ বড় বড় করে তাকায়।
আমার সাথে ফ্লাটিং, আপনার এই কাউয়া সুরে ফান সুনলে কাকো পালাবে। কি গানের গলা মাইরি।

“শালা কোমর ছার বলছি নয়তো গজারি চালান দিব ।
রোজ এর মুখে এমন কথা শুনে সৃজন দেয় এক ধমক।
” চুপ দের বেটারি,এমন করলে একেবারে কোলে তুলে নিয়ে কাজি অফিস যাব ।বেশি ভাব দেখাস বেডি।
“বোঝ নাই মামা আমরা গাজীপুর এর মাইয়া ভাব তো একটু থাকবোই ভাইয়া।
” হবু জাইমাই রে কেউ মামা বলে শালি দের বেটারি।(সৃজন)
“গাজীপুর জেলার মেয়েদের দিকে থাকতে পারবে শুধু চাইয়া, বউ বানাইতে গাজীপুর এর মেয়েদের যোগ্যতা লাগে ভাইয়া।(রোজ)
” তা কি যোগ্যতা লাগবে শুনি।আমার কিন্তু সব আছে।(সৃজন)
“আপনার যোগ্যতা আপনার কাছেই রাখেন।

এই বলে পায়ে পারা দিয়ে ছুটে চলে যায় রোজ।ছেলেটা আজ বেশি বিরক্ত করছে তাকে।
সিয়াম নেন্সিকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে ডান্স করার জন্য কিন্তু মেয়েটার চোখে আগুন তার সামনে নিলয় হেরার সাথে মিষ্টি ভাষায় কথা বলছে,কিন্তু সে কিছু বলতে বা করতে পারছে না,একটাই প্রশ্ন সুন্দর্যর পুজারি সবাই।তাইতো এখন আরো প্রতিযোগিতা লেগেছে সুন্দর হবার প্রতিদিন মেয়েটা পাল্লারে যায়,চুল গুলো স্টাইল করে কাটা,পোশাকেও আকর্ষণ ধরা পরে।সিয়াম মন্ত্র মুগ্ধতা নিয়ে নেন্সিকে দেখে যাচ্ছে কিন্তু মেয়েটা হয়তো সিয়াম এর এমন চাহনি দেখেই নি কোনোদিন।তিতির নাম বাদ দিয়েছে তার কারন সে নাভান ছাড়া কারো সাথে ডান্স করবে না,কেউ তাকে স্পর্শ করবে তা যে কোনোদিন মানতে পারবে না,এই কথা যখন বলেছে সবার সামনে তখন নাভান শুধু তাকিয়ে ছিলো তিতির এর দিকে।আফসোস নাকি মুগ্ধ হলো তা কেবল নাভান জানে।সবার রিহার্সাল শেষে নিলয় আর হেরা জায় মঞ্চে।,মেয়েটাকে আজ একটু বেশি সুন্দর লাগছে মেরুন কালার চুরিদার এর সাথে মাথায় সাদা বেন্ডেজ কোমোর সমান চুল বেনুনি করা তাতে আবার কি ঝরকি জাতীয় ক্লিপ লাগিয়েছে তাতে যেনো আরো কিউট লাগছে,হেরার থেকে চোখ সরিয়ে তিতির এর দিকে তাকায় নাভান,গান প্লে হতে নিলয় হেরার হাতে হাত রাখে, সুন্দর ভাবে নাচ তুলতে থাকে তারা হটাৎ নিলয় এর পায়ে কিছু একটা বিধে সে বসে পরে নিলয় কে ধরতে এগিয়ে যায় হেরা,হেরা যেতে হেরার পায়ে ও কি একটা বিধে,ব্যাস দুজনি পরে যায় ফ্লোরে,সবার চোখ কপালে কি সুন্দর ডান্স হচ্ছিলো কিন্তু কি থেকে কি হলো।স্যার কেম্পাসের ডাক্তার ডেকে এনে কাচ বের করে বেন্ডেজ করে দেয়।

“নিলয় এর ক্ষত টা অনেক গভির,কিন্তু হেরার টা কম খুবি সামান্য ,আজ সকালে তিতির কে সাথে নিয়ে স্যার ডান্স খাতা থেকে নাম বাতিল করেছে নাভান ,নাভান ফোন দেখছে কার কি হলো তাতে তার কিছু জায় আসে না। কেটে রক্তের বন্যা হয়ে গেলেও তার কিছু জায় আসে না এমন একটা ভাব তার। তিতির বলে।
” একেবারে ঠিক হয়েছে। বেশি ভাব এই মেয়ের!
“স্যার নাভান এর সামনে এসে বলে।
” নাভান প্লিজ তুমি রাজি হয়ে যাও,এবারের মতো হেরার সাথে ডান্স করো,হেরা খুব মুটামুটি ডান্স পারে সবাই তাকে সিলেক্ট করেছে,যেহেতু ও শিল্পকলার প্রধান দায়িত্বে থাকবে সামনে থেকে তাই এবার তার পার্টিসিপেট করা খুব দরকার।
স্যার এর কথা শুনে তড়িৎ গতীতে তিতির বলে।

“স্যার আমি নাভান এর সাথে পার্টিসিপেট করবো।
” তিতির সবাই হেরাকে চাচ্ছে,সামনেবার থেকে শিল্পকলা তার দায়িত্বে থাকবে তাই তার এটেন্ট করা অত্যবশ্যক,তাছাড়া আমরা কিন্তু জুনিয়র সিনিয়ির এক সাথে নিচ্ছি,সেম ক্লাসের নিচ্ছি না।
স্যার এর কথায় তিতির চুপ হয়ে যায়।নিলয় রাগে ফুস ফুস করছে,সবার সামনে কথা বলায় কেউ আর কিছু বলতে পারে নি। স্যার যেতে নাভান উঠে হেরার কাছে যায়।
“শোনো মেয়ে তোমার সাথে ডান্স করার কোনো ইচ্ছে নেই আমার আর না আছে কিউরিসিটি বাট ভার্সিটির সম্মার রক্ষার্থে আমাকে এটেন্ড করতে হবে,আমি তোমার সাথে ডান্স করতে পারবো না একটা ভিডিও পাঠিয়ে দিবো সেটা দেখে শিখে নিবে।
নাভান এর দাম্ভিকতা দেখে গা জ্বলে যায় হেরার রাগে রনচন্ডি রুপ তার,নিলয় এর ক্ষত স্থায় সাদা বেন্ডেজ থেকে চোখ সরিয়ে বলে উঠলো রাগি ভাব নিয়ে।

” নিজেকে কি ভাবেন অহংকারী গিটার ওয়ালা,আমিও আপনার মতো লোকের সাথে মোটেও ডান্স করতে আগ্রহী নই।আর না আছে কিউরোছিটি।সো নিজেকে এতো বড়ো মনে করার কোনো প্রয়োজন নেই।
“আর শোনো আমি যেখানে যাই বিজয়ী হই,তোমার কারনে যদি হেরে যাই তো ফল ভালো হবে না।
” আমিও কম না ওকে,আপনার জন্য যাতে আমি হেরে যাই তো আপনার খবর আছে।
“নিন্মবিত্ত চিন্তা ভাবনা আমি শেহতাজ খান নাভান করি না,আমি আমায় বিজয়,
” আমিও হেরে যাবার মতো নিন্মবিত্ত চিন্তা ভাবনা করি না ওকে। হেরা মানেই বিজয়।
আমার সাথে টক্কর

“টক্কর নাকি জানি না বাট এতো দিন সবাই নাভান বলতো আর এখন হেরার নাম থাকবে,সেটা,গান,নাচ,অভিনয়,গিটার বাজানো,পড়ালেখা,বির্তক,এমন কি দলের লিডার ছাত্র দলের নেত্রী। সব জায়গা থেকে আপনার নামের ধন্নি আমি হেরা বন্ধ করে দিবো?
” বাজি লাগছো আমার সাথে।
“বাজি নাকি জানি না,বাট এটাই হবে।
” ওকে তাহলে শেষ বাজিমাত টা নাহয় আমিও দেখাবো।মিস মেহরিমা ইসলাম হেরা।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৪

নিলয় আর তিতির তাদের ঝামেলা দেখে খুশি দুইজন যে দুইজনের বীপরিত এটাই তাদের খুশি হবার কারন।
সেদিন এর মতো সবাই চলে যায়।
স্যার সকালে তাদের দুজনের থেকে সেদিনের ঘঠনা সব শুনে অবাক হয়েছে। লিস্ট এসে পরেছে এর মধ্যে এমন কাহিনি দুজন অসুস্থ হলে কি ভাবে কি হবে । এই ভার্সিটির জন্য বর্তমানে দুজন সবার উপরে আছে । হয়তো তাদের মাঝে কাওকে স্কলারসিপ দিবে। আর এবার যেহেতু বাহিরে দেশ থেকে তাদের ভার্সিটির পরিদর্শন করতে আসবে ,তাই তাদের এ্যাটেন্ট করা খুব দরকার। স্যার চিন্তায় পরে গিয়েছিলো । কিন্তু নাভান আর হেরা আলাদা ভাবে বলেছে তারা সুস্থ্য আছে কোনো সমস্যা হবে না। তাইতো স্যার এতোটা জোর দিচ্ছে তাদের প্রতি।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৬