প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৬
রোজ ও রুশা
নিজের কেবিনে চুপচাপ বসে আছে কাজল খান। আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী। সময়টা কেমন করে যেন তাকে অতীত থেকে বর্তমানের অনেক দূরে টেনে নিয়ে যায়। চারপাশে এত কিছু থাকলেও আজ সে ভীষণ একা। স্মৃতিগুলোই শুধু নিঃশব্দে তার সঙ্গ দিচ্ছে।
নারীর মন আল্লাহ তাআলা নরম করেই সৃষ্টি করেছেন—সেই নরম মনেই থাকে সহ্য করার শক্তি, ভালোবাসার গভীরতা আর নিঃশব্দ ত্যাগের গল্প। কাজল খানও তেমনই এক নারী। জীবনের কঠিন সময় তাকে ভাঙতে পারেনি, বরং আরও দৃঢ় করেছে। নিজের পড়ালেখা শেষ করেছে, সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, সন্তানদের মানুষ করেছে একা হাতে। সমাজ কখনো প্রশ্ন তুলেছে, কখনো করুণা দেখিয়েছে—কিন্তু কাজল খান থেমে থাকেনি।
ধর্ম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সমাজ তাকে শিখিয়েছে লড়াই, আর ভালোবাসা তাকে শিখিয়েছে অপেক্ষা করতে। স্বামী দূরে থেকেও তার হৃদয়ে ছিল অটুট জায়গায়। কিশোরী বয়সের প্রেম—সেটা কি আর ভোলার মতো? সেও পারেনি এত মায়া কাটাতে। অভিমান ছিল, কষ্ট ছিল, তবু প্রিয় মানুষটার প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি।
স্বামী তাকে ভুল বুঝেছিল। তবু কাজল বারবার গেছে তার কাছে—অভিযোগ নিয়ে নয়, প্রমাণ দিতে নয়—সে গেছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে। সে বিশ্বাস করেছিল, একদিন সব ভুল ভেঙে সত্য ফিরে আসবে তার ভালোবাসার স্বামী।
কিন্তু একদিন যখন শুনল, তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে—তার একটি মেয়েও রয়েছে যাকে নিজের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে, আর বিন্দাস সংসার করছে বউ বাচ্চা নিয়ে —সে বিশ্বাস করেনি। কিছু সত্য চন্দ্র-সূর্যের মতো অটুট। নিজের চোখে দেখে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। সেদিন কাজলের বুকটা যেন পাথর হয়ে গেল। কান্না আসেনি, অভিযোগও না—শুধু নীরব একটা ভাঙন তাকে ভিতর থেকে বদলে দিল।
যে হৃদয় এতদিন অপেক্ষা করেছে, সেদিন সে শিখে গেল—ভালোবাসা কখনো কখনো নিজের ভেতরেই চাপা দিয়ে বাঁচতে হয়।
তবু কাজল থামেনি। সন্তানদের জন্য, নিজের সম্মানের জন্য, আর মনে লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার স্মৃতির জন্য সে এগিয়ে গেছে। নারী শুধু সংসার সামলায় না—সে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখে, ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগায়, আর নিজের না-বলা কষ্ট লুকিয়ে অন্যদের মুখে হাসি ফোটায়।
কাজল সেইসব নারীদের প্রতিচ্ছবি, যারা নীরবে যুদ্ধ করে—তবু ভালোবাসাকে অপমান করে না।
চোখ বন্ধ করে সে বিড়বিড় করে বলে—
“জাওয়াদ, তুমি আমায় কেন বিশ্বাস করতে পারলে না? আর বিয়ে করে নতুন সংসার করছো? কীভাবে পারলে তোমার ভালোবাসাকে অপমান করতে? কীভাবে পারলে নিজের জীবনে অন্য নারীকে ঠাঁই দিতে?”
“ও তার সংসার নিয়ে পড়ে আছে। তুমিও থাকো না, কেন এখনো পড়ে আছো? তার মেয়ে আছে, সে খুব ভালো আছে। তাও কেন এখনো মনে করো তাকে?” — (শামসুল)
আবার! এই লোক আবার এসেছে। শামসুল থেমে আবার বলে!
“তুমিও শুরু করো। যাও, তোমার জন্য আমি সব করতে রাজি। বলো, কী করতে হবে।” — (শামসুল)
কাজল সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—
“ওই যে দেখ, উপরে পাখা আছে। ওটাতে রশি নিয়ে গলায় পেচিয়ে ঝুলে পড়।”
কাজল খান এর কথায় শামসুল এর মনোভাব পরিবর্তন হলো না, সে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল!
“উফ! সুন্দরী কমলা, তোমার জন্য এত বছর অপেক্ষা করলাম, আর তুমি এখন আমায় ফাঁসিতে ঝুলতে বলছো? নট ফেয়ার, সুন্দরী!” — (শামসুল)
কাজল মাথা চেপে ধরে দাতে দাত চেপে বলল!
“আমায় বিরক্ত করবি না, শামসুল। এর ফল ভালো হবে না।” — (কাজল)
“আমি জানি আজ তোমার মন ভালো নেই, তাই সঙ্গ দিতে এসেছি।” — (শামসুল)
থেমে আবার বলে উঠে শামসুল!
“আচ্ছা, আমি যে ১০ বছর আগে জাওয়াদের সামনে বলেছিলাম—আমি আর তুমি এক হয়ে গেছি—এই কথাটা রাখো। সে তো আমাদের শুভেচ্ছাও দিয়েছিল। সেদিন তুমি কিছু বলোনি কেন? দেখো, যাকে ভালোবাসলে সে ছেড়ে দিল হাত, আর যাকে অপছন্দের তালিকার বাইরেও রাখো—আমি কিন্তু ছাড়িনি তোমায়। এখানেই বোঝা যায় ভালোবাসার গভীরতা।” — (শামসুল)
কাজলের চোখ দুটো হিমশীতল হয়ে উঠল। তেজি কন্ঠে বলল!
“যার ওপর আমার বিশ্বাস নেই, তাকে আমি কখনো সময় দেব না। যারা থেকে যায়, থাকুক। কিন্তু বিশ্বাসের খেলা ভাঙা আর অবিশ্বাসের বিষ ছড়ানো মানুষ—দুটোই আমার কাছে সমান ঘৃণার যোগ্য। একটাই কাতার, আর সেই কাতারে দাঁড়ানো দুজনই একই রকম নিকৃষ্ট মানুষ—দুজনই একই কাতারের নরকপুরুষ।” — (কাজল)
““আমি যেতে চাই না, ফারুখ। ওই দেশটা আমার জন্য বিষাক্ত। তুই তো জানিস—১০ বছর আগে গিয়ে কী দেখেছি। এত তাড়াতাড়ি কীভাবে ভুলে যাব? ও আমাকে খুব বাজে ভাবে ঠকিয়েছে, ফারুখ—একবার না, দু’দুবার। তুই এসব বাদ দে। আমার মেয়েটাকে এনে দে, ফারুখ… এনে দে।” — (জাওয়াদ)
দুই বন্ধু কথা বলছে।
হ্যাঁ, তারা একই কাতারের মানুষ।
ফারুখ সাহেবের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মেয়েদের নিয়ে তার সংসার। বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখায় বলে আর বিয়ে করেননি। কিন্তু তার সমবয়সী জাওয়াদ খানকে এখনো দেখলে বোঝাই যায় না—তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়ে আছে।
একবার নেপালে মেয়ের কলেজে গেলে স্যাররা ভেবেছিল—ভাইবোন! সেই লজ্জার পর থেকেই জাওয়াদ ক্লিন শেভ করা বন্ধ করেছে; ছোট দাড়ি রাখে এখন। ফারুখ সাহেব বন্ধুর পানে তাকিয়ে বলল!
“দোস্ত, আমি তোকে অনেক বছর ধরে দেখছি। তুই ভাবিকে ছাড়া ভালো নেই। একটা কথা বলি—ভালোবাসার মানুষ ভুল করলে তাকে ফিরিয়ে আনতে হয়। এভাবে ছেড়ে দিয়ে নয়।” — (ফারুখ)
জাওয়াদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“আমি কী করতাম? ও আমার দুনিয়া ছিল—ও সেটা জানে। ওই মহিলার জন্য আমি কী না করেছি! মদ, নেশা—কত কিছু করেছি একটু ভুলে থাকার জন্য। কিন্তু শেষে পারলাম কই? না পেরে আবার গেছি ওর কাছে। গিয়ে যা দেখেছি, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ও যদি পতিতাও হতো, তাও হয়তো মেনে নিতে পারতাম… কিন্তু ও বারবার আমার হৃদয় ভেঙেছে।” — (জাওয়াদ)
ফারুখ প্রসঙ্গ ঘোরায়।
“মেয়ের তো ভালোই বয়স হয়েছে। আজ হেরার মা বেঁচে থাকলে হয়তো বিয়ে দিয়ে দিত, বা অন্তত ভাবত। তোর মাথায় কিছু আছে এ বিষয়ে?”
জাওয়াদ একদম সোজা গলায় বলে—
“মেয়েকে বিয়ে দিলে আগে শর্ত—ঘরজামাই হলে বিয়ে দেব, নয়তো না।”
ফারুখ হেসে ওঠে।
“মেয়ের জামাই কি তোর শেষ বয়সে সেবা করবে নাকি, সালা?”
“আমায় জ্ঞান দিচ্ছিস? তুই কর আগে!” — (জাওয়াদ)
“আমি তোর মতো হ্যান্ডসাম থাকলে তিনটা বিয়ে করতাম! আমার মাথায় চুল নেই, আর তোকে দেখলে মনে হয় ৩৬-৩৮ বছরের বেশি না! তোর কথামতো যদি ওইসব অখাদ্য খেতাম, শহরে মেয়েদের লাইন লেগে যেত।” — (ফারুখ)
এবার জাওয়াদ খান হেসে ফেলে।
“সব মেয়ের জাদু। রুটিন না মানলে আমার খবর আছে! তাই তো এত ফিট।” — (জাওয়াদ)
“মেয়ে তোর ডুপ্লিকেট, ভাই।” — (ফারুখ)
দুই বন্ধু কথা বলতে থাকে।
আসলে জাওয়াদ খানের জন্য মেয়ের অভাব ছিল না কখনো। কিন্তু দুইবার ধাক্কা খাওয়ার পর সে হেরাকে নিয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন মেয়েটার এই অবস্থা দেখে মানুষটা প্রায় পাগল। মেয়ের জন্য সে সব করতে পারে।
“কী হচ্ছে, ঝিনুক? কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?” — (নাভান)
“আন্টি, আমরা ডাক্তার কাছে যাচ্ছি। তোমার এই একগুঁয়ে ছেলে যে ক্ষতের জায়গায় ড্রেসিং করাবে না, তা আমি জানি। তাই নিয়ে যাচ্ছি।” — (ঝিনুক)
কাজল খানের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ঝিনুক।
ছেলের এই অবস্থা দেখে কাজল ভয় পেয়েছিল।
দুই ছেলের গায়ে সে আজ পর্যন্ত একটা ফুলের টোকাও লাগতে দেয়নি। রাস্তা-ঘাটে কত ঝামেলা হয়েছে—নাভান ইচ্ছে মতো কত মানুষকে পিটিয়েছে—কিন্তু নাভানের গায়ে হাত তোলার সাহস কারও হয়নি। আড়ালে কাজল চৌধুরীর লোকজন তাদের প্রটেক্ট করে।
গত রাতের কথা—
“লোকটার সাথে তোমার কী সম্পর্ক? তোমার অফিসে বারবার কেন আসে সে? আর কেন আমাকে কিডন্যাপ করল? শামসুল লোকটার সাথে তোমার সম্পর্ক কী?”
ছেলের প্রশ্নে এডভোকেট কাজল খান একটু হিমশীতল হয়ে যায়।
তিনি শুনেছিলেন নাভান কিডন্যাপ হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে নাভান বাসায় ফিরে এসেছে। নাভানের ধারণা—তার মা সব জানেন। তার মায়ের হাত যে কত লম্বা, সেটা সে জানে। এই ছোট বিষয় বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারবে না—সেটাও জানে।
কিন্তু কাজল জানেন না—তার ছেলে আড়াল থেকে তাকে নজরদারি করে।
তেমনি নাভানও জানে না—তার পেছনেও মা নজর রাখেন।
দু’জন দু’জনকে আড়াল থেকে প্রটেক্ট করে।
কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে দেয় না।
নাভান আবার জিজ্ঞেস করে—
“কী হলো? উত্তর না দিলে আমি নিজেই খুঁজে বের করব। অনেক দিন হাত রক্তাক্ত করিনি… এবার করব ভাবছি।”
এবার কাজল খান মুখ খোলে।
“না, নাভান। তুমি কিছু করবে না। এটা আমার ঝামেলা—আমি সামলাবো। তুমি এর পেছনে থাকবে না।”
“কেন জানতে পারি?” — (নাভান)
“না জানলেই ভালো।” — (কাজল)
আর কেউ কাউকে ঘাটায় না।
মাথার ব্যান্ডেজ পাল্টাতে বললেও নাভান সাথে সাথে না করে দেয়। কাজল ছেলেকে নিয়ে চিন্তিত। গত রাতের কথা মনে করে চায়ে চুমুক দেয়।
ঠিক তখনই ঝিনুকের কথায় সায় দেয় সে।
কারণ যদি কেউ তার ছেলেদের খেয়াল রাখে—সে এই মেয়েটা।
স্বীকার করতেই হবে—নাভানের বন্ধু মহলের মতো বন্ধু আজকাল পাওয়া যায় না।
মাদার বাংলাদেশ, তোমার এই ছেলে এমন একরোখা কেন? ফাদার বাংলাদেশের মতো হয়েছে নাকি?”
কথাটা বলেই অধীর চুপ হয়ে যায়। বুঝতে পারে—ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে। নিজের মুখ চেপে ধরে বিড়বিড় করে—
“দূর! বারুদ মার্কা মুখ থেকে কখন কী বের হয় আল্লাহই জানে। এমনিতেই মাদার বাংলাদেশের মন খারাপ, তার ওপর ফাদার বাংলাদেশের নাম নিয়ে ডালখিচুড়ি বানিয়ে ফেললাম মুডের!”
ঝিনুক এবার নাভানকে উদ্দেশ করে বলে—
“এখন তুই আমার কথা না শুনলে তোর দুলাভাইকে নিয়ে আসব বাসায়। বেচারা ডিউটি ছেড়ে আসবে কিন্তু! জানিস তো, হাসপাতালে থাকা কতটা দরকার। আমি বললে সব ছেড়ে চলে আসবে।”
নাভান ভ্রু কুঁচকে বলে—
“আমায় ব্ল্যাকমেল করছিস? তোর মতো শাকচুন্নি ফ্রেন্ড যেন কারও না হয়! আর বলি, বেচারা দুলাভাই এমন গুন্ডি মেয়েকে কীভাবে পছন্দ করে? কতটা তারছেঁড়া হলে হবু বউ একটা কল দিতেই হাজির হয়!”
ঝিনুক চোখ পাকায়—
“তুই বুঝবি না। যখন কাউকে সত্যিকারে ভালোবাসবি, তখন তাকে একবার দেখার জন্য কত পাগলামি করতে মরিয়া হয়ে যাবি।”
“বিশ্বপ্রেমিকা হয়ে গেলি নাকি?” — (নাভান)
কথা বলতে বলতে তারা হাসপাতালে পৌঁছে যায়। সঙ্গে অধীর আর সৃজনও।
সৃজনের বাসা নাভানদের পাশেই। সৃজনের বাবা নেই—মা আছে। আর ঝিনুকের মা নেই—বাবা আছে। অদ্ভুত এক সমতা। সবাই জীবনে কাউকে না কাউকে মিস করে। সবার বুকেই একটা না-পাওয়া হাহাকার লুকানো।
কেবিনে বসে আছে বন্ধুমহল।
ডাঃ তুষার হোসেন তাদের দেখে বেজায় খুশি। এরা তার ভাই-রূপে শালা।
বন্ধুদের দেখে সঙ্গে সঙ্গে খাবারের অর্ডার করে দেয় তুষার।
নাভানের ক্ষত পরিষ্কার করতে করতে বলে—
“তা সালা বাবু, নিজেই চলে এলে! না হলে তোমার গুন্ডি বান্ধবীর ডাকে আমায় ছুটতে হতো?”
অধীর বলে ওঠে—
“বুঝি না ভাই, আপনি কেন এই শাকচুন্নির কথা শোনেন!”
সৃজনও সায় দেয়—
“ঠিক ভাই, এমন গুন্ডি মেয়ে জীবনে দেখিনি।”
তুষার হেসে বলে—
“সালারা, বেশি বলো না। পরে আবার আমার ঘাড় মটকাবে!”
অধীর চোখ টিপে—
“দুলাভাই, এত মেয়ে থাকতে এই গুন্ডি শাকচুন্নিটাকেই কেন পছন্দ করলেন?”
তুষার গম্ভীর ভান করে—
“শান্ত মেয়েকে বিয়ে করলে জীবন শান্ত হয়ে যেত। আমি তো একটু অ্যাকশন চাই!”
সৃজন হাসে—
“এই শাকচুন্নি তো রাগলে পুরো থান্ডারস্টর্ম! ভয় লাগে না?”
“ভয় না, অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন চুপ থাকলে বরং চিন্তা লাগে!” — (তুষার)
“দুলাভাই, সামলান কীভাবে?” — (অধীর)
“সামলাই না, আত্মসমর্পণ করি! সংসার বাঁচানোর সেরা উপায়!” — (তুষার)
“লেডি গুন্ডি তো আপনাকে একদমই ভয় পায় না!” — (অধীর)
“ও আমাকে ভয় পাবে কেন? আমি তো ওর লাইফটাইম বডিগার্ড!” — (তুষার)
অধীর নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে—
“ভাই, আপ তো পুরে দেশ কি দামাদ হো! আপকে পাস বিবি সামহালনেকা কোর্স করনা পড়েগা!”
সবাই একসাথে হেসে ওঠে।
ঝিনুক তাদের ফিসফাস দেখে বলে—
“এই কুটনামির দল! কী ফিসফাস করছিস আমায় রেখে? এখন থেকেই আমার বিরুদ্ধে মিটিং বসিয়েছিস? যতই ঘুড়ি উড়াও, নাটাই কিন্তু আমার হাতে!”
আবার হাসির রোল।
ঝিনুক তুষারকে বলে—
“এই তুষার, নাভানের ক্ষত যদি দুই দিনের মধ্যে ভালো না হয়, তোমার ডাক্তার লাইসেন্স বাদ করে দেব!”
তুষার সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয় স্যালুট দেয়—
“যথা আজ্ঞা মহারানী! আপনি যা বলবেন, এই বান্দা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।”
ঝিনুক নাভানের চুল ঠিক করে দেয়।
তুষার পাশে এসে বলে—
“ভাই, ওষুধগুলো কিন্তু খাবেন। না হলে আমার লাইসেন্সই যাবে। এই হতভাগা দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হলেও খেয়ে নিন।”
দুষ্টু-মিষ্টি কথাবার্তায় সময় কেটে যায়।
এক এক করে সবাই চলে যায়—ঝিনুক বাদে। সে কিছু সময় প্রিয় মানুষটার সঙ্গে কাটাবে।
ঝিনুককে বিদায় দিয়ে কেবিনে ঢুকতেই তুষারের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফরিদের সাথে দেখা।
ফরিদ বলে—
“স্যার, ম্যাম যে এত ছেলেদের সাথে মিশে—আপনার খারাপ লাগে না? আর ওই নাভানের জন্য যে পাগল! সেদিন ক্ষত দেখে মনে হচ্ছিল ওষুধ ম্যামকেই দিতে হবে! সন্দেহ হয় না?”
তুষার মৃদু হেসে বলে—
“ভালোবাসার মানুষ তো নাভান—সেটা আমি জানি। তাকে অনেক ভালোবাসে ঝিনুক, সেটাও জানি। অধীর, সৃজন—তাদেরও ভালোবাসে। কিন্তু ভাইয়ের চোখে, বন্ধুর চোখে, বড় বোন হয়ে। সেখানে আমি কী বলব?”
ফরিদ থেমে যায়—
“কিন্তু স্যার…”
তুষার শান্ত গলায় বলে—
“আমি তাদের খুব ভালো করে চিনি। জানো, তারা একসাথে রাত কাটালেও আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হবে না। আমি জানি—তারা একে অপরের ভালোবাসাকে সম্মান করে। আর আমার ভালোবাসার মানুষ যাদের ভালোবাসে, তাদের আমিও ভালোবাসি।”
“যাও ফরিদ, রোগীদের আসতে বলো। অনেক লেট হয়ে গেছে।”
তুষার চলে যায়।
ফরিদ বিড়বিড় করে—
“খাইয়ে কাজ নাই! নিজের বউ-পরিবার ছাড়ি আবার অন্যজনদের ভালোবাসা দিমু!”(ফরিদ)
“আপন মানুষ” বলতে আমরা অনেক সময় শুধু রক্তের সম্পর্ক বা সংসারের সম্পর্ক বুঝি। অথচ বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বড়।
ভালোবাসা বা বিশ্বাস—এগুলো কোনো সম্পর্কের নাম দেখে জন্মায় না; জন্মায় আচরণ, সময়, দায়িত্ব আর আন্তরিকতা থেকে। অনেক সময় রক্তের সম্পর্কের মানুষই পাশে থাকে না, অথচ কোনো বন্ধু, সহপাঠী বা কলেজের বেস্ট ফ্রেন্ড কঠিন সময়ে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তখন প্রশ্ন আসে—তাকে কি ভালোবাসা বা বিশ্বাস করা যাবে না শুধু সে ‘আপন’ নয় বলে?
আসলে ভালোবাসা দুই ধরনের—
একটা জন্মসূত্রে পাওয়া, আরেকটা জীবনের পথে অর্জন করা।
কলেজের বন্ধু, বেস্ট ফ্রেন্ড, সহযোদ্ধা—এরা অনেক সময় আমাদের জীবনের এমন কিছু মুহূর্তের সাক্ষী থাকে, যা পরিবারের কেউও জানে না। হাসি, কষ্ট, স্বপ্ন ভাগাভাগি করতে করতে একটা গভীর বিশ্বাস তৈরি হয়। সেই বিশ্বাসকে ছোট করে দেখা বা অবমূল্যায়ন করা ঠিক নয়।
তবে এখানেও সীমারেখা জরুরি। বন্ধুত্বের ভালোবাসা মানে অন্ধ বিশ্বাস নয়, আবার অকারণ সন্দেহও নয়। মানুষকে তার কাজ দিয়ে চিনতে হয়—
কে সম্মান দেয়,
কে পাশে থাকে,
কে স্বার্থের জন্য নয়—মানুষ হিসেবে ভালোবাসে।
সমাজের শেখার জায়গাটা হলো—
ভালোবাসা শুধু “আপন” মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না।
কিন্তু বিশ্বাস করার আগে মানুষকে সময় দিয়ে চিনতে হয়। সম্পর্কের নাম নয়—আচরণই আসল পরিচয়।
শেষ পর্যন্ত, আপন হয়ে যায় সেই মানুষটিই—যে প্রয়োজনের সময় হাত ছাড়ে না।
তুষার ছেলেটাও তাদের পাঁচ বছর ধরে কাছ থেকে দেখছে। হয়তো বয়সে সমবয়সী না, কিন্তু আজ সে দাঁড়িয়ে আছে কেবল ওই মানুষগুলোর জন্য। বিপদে তারা ঢাল হয়ে তার পাশে ছিল। ঝিনুকের প্রতি তাদের ভালোবাসা তাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। তাই তো এই বন্ধুত্ব তার চোখে সেরা এক দল। প্রত্যেকের জীবনে কারও না কারও অভাব আছে—আর সেই অভাবগুলো একে অপরের ভরসা হয়ে পূরণ করছে তারা।
টুংটাং শব্দে ফোনে নোটিফিকেশন আসে।
হেরা হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে দেখে—অসভ্য গিটারওয়ালা একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। হয়তো কিছু লিখছে। হেরা অপেক্ষা করে। মেসেজ আসতেই চোখ রাখে সে।
“এই এটম বোম! এটা দেখে শিখো। যদি উলটা-পালটা শিখো, আমার থেকে কেউ খারাপ হবে না—বলে দিলাম।”
মেসেজ দেখে বিরক্ত হয় হেরা।
“সালা ফায়ার বক্স! না, একটা বারুদ। কথায় কথায় আগুনের মতো জ্বলে ওঠে। ভালো করে বললে কি তোর পাছায় আগুন লাগত?”
ভিডিওটা প্লে করে মন দিয়ে দেখে।
একা কীভাবে নাচবে? দুইজন লাগবে প্র্যাকটিস করতে। এখন কী করবে সে বুঝে উঠতে পারে না। এদিকে রোজ আর শুশা কী সুন্দর প্র্যাকটিস করছে! আল্লাহ বেছে বেছে ওই ফায়ার বক্সটার সাথেই মিলাল তাকে! কপাল খারাপ হলে যা হয়!
আর ওই নিলয়ের পা কাটার সময় হলো না—যতসব ঝামেলা তার সাথেই!
নাচের পার্টনার দরকার। হেরা জোর করে রোজকে টেনে নিয়ে আসে। রোজ ভেবেছিল শান্তভাবে স্টেপ প্র্যাকটিস করবে। কিন্তু হেরা নাচের সময় একটু বেশি রোমান্টিক ভঙ্গিতে ধরতে গিয়ে—
হঠাৎ রোজের অপ্রস্তুত জায়গায় হাত লেগে যায়!
রোজ লাফ দিয়ে উঠে—
“এইইই! তোর মাথা ঠিক আছে? প্র্যাকটিস করবি নাচের না প্রেমের?”
হেরা চোখ গোল করে—
“আরেহ! স্টেপটা এমনই! আমি কি জানতাম তুই এত ড্রামা কুইন!”
রোজ গম্ভীর হয়ে—
“শুন, ওই ফায়ার বক্সটার সাথে যা খুশি করিস। আমার সাথে না! আমি শান্তিতে বাঁচতে চাই।”
হেরা ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে।
“আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করিস না। কিন্তু সত্যি বল—স্টেপটা কেমন হলো?”
রোজ এবার সিরিয়াস হয়ে স্টেপ ঠিক করে দেয়।
দুজন আবার প্র্যাকটিস শুরু করে।
হাসাহাসি, ঠাট্টা, ভুলভাল স্টেপ—সব মিলিয়ে ঘর ভরে ওঠে।
হেরা মাঝেমাঝে ভিডিওটা দেখে নেয়।
মনে মনে ভাবে—
“ফায়ার বক্স, তুই আগুন হোস—কিন্তু আমি তো বারুদ না। আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করতেও জানি।”
—“এই! নাচ প্র্যাকটিস করছিস, নাকি আমাকে হার্ট অ্যাটাক দেওয়ার প্ল্যান?”
হেরা মলিন মুখে তাকায়। সে কী করবে? স্টেপটাই এমন—কাঁধে হাত দিতে হবে, পেটে হাত রাখতে হবে।
শেষে রোজ বলে—
— “আমি না, রুশাকে নিয়ে নাচ। আমি দূর থেকে দেখি। নিরাপদ দূরত্বে থাকি—তোদের হাত বেশি চলে!”
হেরা চোখ বড় করে—
“দেখ, এমন করিস না প্লিজ! ওই অসভ্য গিটারওয়ালার থেকে ভালো পারফর্ম করতে হবে।”
কথাটা খুব বিশ্বাসের সাথে বলে হেরা।
রোজের শরীর এমনিতেই কাতুকুতু-প্রবণ। একটু কেউ ছুলে লাফিয়ে ওঠে। আজ সৃজন এ নিয়ে কম খোঁটা দেয়নি। তাই আপাতত সে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চায়। হাসিনা মার্কা হাসি দিয়ে বলে রোজ—
“বইন, আমার থেকে রুশা ভালো পারবে। তুই তাকে নিয়ে কর, জানু। এই হাত আমি খুব ভয় পাই!”
ব্যাস! রোজ নিজেকে বাঁচিয়ে রুশার ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়।
এবার রুশার কপাল খারাপ।
হেরা তাকে এমনভাবে টেনে আনে, যেন রুশা না নাচলে অনুষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যাবে।
মিউজিক শুরু।
হেরা ঘোরাতে গেল—কিন্তু নিজের স্পিড নিজেই কন্ট্রোল করতে পারল না। একটা টার্ন দিতে গিয়ে পুরো ওজন রুশার ওপর ছেড়ে দিল।
রুশা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে—
“ধীরে! আমি মানুষ, লাটিম না! বইন, একটু আস্তে ঘোর!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই—
রুশা একবার টান দিয়ে ব্যালান্স বাঁচাতে গেল…
হেরা পুরো ভর ছেড়ে দিল তার ওপর…
ধপাস!
দুজন একসাথে মেঝেতে পড়ে গেল।
রোজ পাশ থেকে চিৎকার করে—
“এইটা নাচ না, লাইভ শো! সেই করা ভাই, সেই করা!”
মেঝেতে পড়ে হেরা মুখ মলিন করে থাকে।
সে নাচ পারে মোটামুটি। কিন্তু আজ কেন এমন হচ্ছে?
মনে মনে ভাবে—
“ওই অহংকারী গিটারওয়ালা ইচ্ছে করে এই গান দিয়েছে। আমাকে হেনস্তা করার প্ল্যান! বড় হুমকি দিলো—এবার যদি আমি পারফর্ম না করতে পারি?”
একটু ভয় ঢুকে যায় মনে।
টক্কর নিতে গিয়ে যদি নিজের মান-সম্মান খোয়ায়?
কিন্তু না।
যেভাবেই হোক—এই ডান্স সে শিখবেই।
রুশা উঠে বসে হাঁটুতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে—
“আগে ওজন কমাও, তারপর আমাকে পার্টনার বানাও! আমি তোর ভার নিতে পারব না। তোর ভার যদি কেউ নিতে পারে—সে চুইংগাম হিরো আর চকলেট হিরো!”
হেরা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গোমড়া করে বলে—
“আমি পারফেক্ট আছি! ওজন বেশি না আমার—ভালোবাসা বেশি! আর সেই ভর তুই নিতে পারিস নি, রসুন রানি!”
রোজ হেসে গড়িয়ে পড়ে।
রুশা দাঁত কিঁচিয়ে বলে—
“দেখিস, ওই গিটারওয়ালা যদি তোকে লাইভে লিফট করতে বলে, তখন বুঝবি ভালোবাসার ওজন কাকে বলে!”
হেরা চোখ উল্টায়—
“সে লিফট করবে? আগে নিজে ব্যালান্স শিখুক, তারপর আমাকে তুলবে!”
কিন্তু মনে মনে সে জানে—
চ্যালেঞ্জটা কঠিন।
সে ফোনটা তুলে আবার ভিডিও চালায়।
চোখে এবার জেদ। বির বির করে বলে!
“শেহতাজ খান নাভান আপনি “ফায়ার বক্স বা আগুন যাই হন ?আমি ও কিন্তু ঝড়,কালবৈশাখীর, ঝড়,। আমি আগুনকে উড়িয়ে দিতে জানি।”
রোজ আর রুশা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ফিসফাস করে—
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৫
“এই আগুন-ঝড়ের মধ্যে আমরা দুইজন পুড়ে শেষ না হয়ে যাই!!
রোজ আর রুশার হাসিতে রুম হাসে যেনো, ।
কিন্তু হেরার চোখে এখন খেলা না—চ্যালেঞ্জ।
