ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৫৮
শানজানা আলম
অনেক রাত হয়েছে, এহসান অথৈ জেগে আছে। বালিশে হেলান দিয়ে অথৈকে কাছে আধশোয়া হয়ে বসে আছে এহসান। অথৈ নিশ্চিন্তে মাথা এলিয়ে দিয়েছে এহসানের কাঁধে। এই সময়টা ভীষণ সুন্দর, প্রিয় মানুষের সাথে একান্ত অনুভবের৷
এহসান বলল, অথৈ, কাল ভাইয়ার বাসায় যাব। মা আসতে চাইলে নিয়ে আসব।
আচ্ছা।
আমার সম্ভবত গ্রামে যেতে হবে দিন দুয়েকের জন্য। ভাইয়াকে জমিটা রেজিস্ট্রি করে দিতে। মা থাকলে তোমাকে একা রেখে যেতে হবে না।
অথৈ বলল, আন্টি মনে করবে, আমাকে পাহারা দিতে তাকে নিয়ে আসতেছ!
আন্টি আবার কি, মা বলো!
অথৈ এহসানের বুকে নাক ঘষে বলল, নিয়ে গেছ আমাকে? স্বীকৃতিও দেয়াতে পারো নি এখনো!
এহসান বলল, একটু সময় নিলাম নিজেদের। আমাদের তো হুলস্থুল ম্যারেজ, নিজেদের সময় দেওয়া জরুরি, তার উপর ঐশি কালপ্রিট তো আছেই!
আচ্ছা, আপুর কেন তোমার উপর এত রাগ, তুমি কি করেছ?
ওর ইগো হার্ট হইছে, আমি তোমাকে বিয়ে করায়, আর কিছুই না। ওহ, একটা ভালো প্রজেক্ট হাতে পেয়েছি, কাজ কমপ্লিট হলে, ভালো একটা ইনসেন্টিভ পাওয়া যাবে, তারপর আমরা নেপাল থেকে ঘুরে আসব। পাসপোর্ট করা আছে তোমার?
না তো!
আচ্ছা, কাল ফর্ম ফিলাপ করে এপ্লাই করে রাখব।
হয়ে যাবে এর মধ্যেই। তুমি কি তোমার সার্টিফিকেট গুলো এনেছিলে?
হুম, নিয়ে এসেছি ফাইল টা।
প্রাইমারি পরীক্ষার তো ডেট দিয়ে দিলো, যাবে পরীক্ষা দিতে?
নাহ, যাব না।
কেন, প্রিপারেশন নিয়েছ, চলো, পরীক্ষা দিইয়ে আনি।
নাহ।
কেন, নন্দীপুর যেতে হবে, তাই?
না না, এই চাকরি আমি করব না।
তাহলে? এখানে কোনো কোর্সে ভর্তি হবে? কম্পিউটার বা অন্যকিছু?
আপাতত কিছুই করব না।
আজব তো, একা একা বোর হয়ে যাবে তো- এহসান সিরিয়াস হয়ে বলল। আজেবাজে চিন্তা আসবে মাথায়।
আমি আপাতত সংসার করব… এটাই আমার চয়েজ!
এহসান বলল, সেটা করো কিন্তু কিছু একটা জব করলে ভালো হবে, বোর হবে না।
আচ্ছা আমি তোমাকে বুঝি না, আপুকেই তুমি সংসার করতে বলতে, আমাকে বলছ চাকরি করতে! – অথৈ বলল।
এহসান বলল, তোমার আপু সংসারী ছিল না, তুমি চাকরি করলেও আমার সংসার ভেসে যাবে না।
কিন্তু আমি ভাই চাকরি টাকরি করতে চাই না। বসেছিলাম তাই এপ্লাই করেছিলাম। অথৈ সরে গেল এহসানের থেকে। বালিশ ঠিক করে শুয়ে পড়তে পড়তে বলল, অফিস আছে না সকালে?
হুম, থাকবে না কেন!
ঘুমাও তাহলে।
হুম, এহসানও বালিশ ঠিক করে শুয়ে পড়ল।
নিজে ভাবতে লাগল, ঐশিকে জব করতে দিতে চাইতো না এহসান, অথৈকে দিতে চাইছে, অথৈ জব করবে না। দুজনের ক্ষেত্রে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গী কেন তার! অথৈ এর উপর বিশ্বাস বেশি? নাকি ঐশি সুন্দরী ছিল বলে সাহস হতো না বাইরে ছাড়তে!
ধুর, কি সব ভাবছে এহসান! হাত বাড়িয়ে অথৈকে কাছে টেনে ওর চুলে মুখ গুঁজে সুবাস নিলো এহসান।
অথৈ বলল, এখন একটু ঘুমাও!
ঘুমাব তো!
মনে হচ্ছে না!
এহসান অথৈ এর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, তুমিও ঘুমাও।
পরের দিন এহসান ভাইয়ের বাসায় গেল। ভাইয়া ভাবী মায়ের সাথে অথৈ এর বিষয়ে কথা বলবে। মাস ঘুরে এসেছে বিয়ে হয়েছে। এখন তাদের একত্রে বসা প্রয়োজন। অফিসের প্রোগ্রামটাও এহসান করে ফেলবে
সেখানেও আপনজন ছাড়া ভালো দেখাবে না।
এহসানকে দেখে ভাবী কথা বলল না। নাস্তা বানাতে গেল। মা আর ভাইয়া ড্রয়িংরুমে বসলেন।
এহসান বলল, ভাবী, আসেন, কথা আছে।
ভাইয়া বললেন, সামনের বৃহস্পতিবার যাব তাইলে।
এহসান বলল, বৃহস্পতিবার গেলে তো হবে না। শুক্রবার শনিবার সাবরেজিস্টার অফিস বন্ধ। অন ডে তে যেতে হবে। সাবরেজিস্টার নাকি তিন উপজেলার কাজ একলা সামলান, কবে আসবে সেটা শিওর হয়ে যেতে হবে।
ওহ, আমার তো খেয়াল ছিল না।
এহসান মা কে বলল, আমার সাথে চলো আজকে।
এহসানের মা বললেন, আজকে থাক, শরীরটা ভালো না আমার।
এহসান বুঝলো মা একটু রেগে আছেন।
এহসান বলল, ভাইয়া, আমি তাহলে খোঁজ নিয়ে গাড়ি করে ফেলি।
গাড়ি লাগবে কেন- কতগুলো টাকা বাড়তি যাবে, দশের নিচে প্রাইভেট কার পাবি না তো! মিশন এন্টারপ্রাইজে কল দিয়ে টিকেট করতে বল।
এহসান বলল, আমার সাথে অথৈ যাবে। ওকে প্রথমবার নিয়ে যাব, গাড়িই করি। সমস্যা নাই।
এহসানের ভাইয়া বললেন, এখন ও কে নিয়ে যাবি কেন? আমরা তো বেড়াতে যাচ্ছি না। কাজে যাচ্ছি।
এহসান বলল, ওকে একা বাসায় রেখে যাব না। ভেবেছিলাম মা যাবে, তাহলে তো আমার টেনশন থাকতো না।
এহসানের মা বললেন, ঠিক আছে, বাড়িতে অথৈকে নিয়ে চল, আমিও যাব বাড়িতে। এরকম লুকোছাপা করে আর কয়দিন চাপা যাবে, তার চাইতে সবাই জানুক।
এহসানের ভাবী এসে দাঁড়িয়েছে।
এহসান বলল, মা গেলে ভাবীকেও যেতে হবে। বাড়ির বড় বউ না গেলে হয় না।
এহসানের কথা শুনে ভাবীর রাগ একটু কমল, পুরোপুরি না।
ভাবী বলল, বড় ভাবী, মা সবাইকে বাদ দিয়ে তো বিয়েই করতে পারছ, এখন লাগবে কেন!
এহসান বলল, ভাবী কোন পরিস্থিতিতে বিয়ে করতে হইছে, সেটা তো জানেন। আর রাগ করে থাইকেন না, চলেন সবাই, অথৈ এর সামনে আমিও ছোট হয়ে যাই। ফ্যামিলি ছাড়া কি মানুষের দাম থাকে, আমার সবাই আছে, ভাই, ভাবী, বাচ্চারা, মা তাইলে আমি কেন একা
থাকব।
এহসানের ভাবী বললেন, ঠিক আছে, তুমি বড় গাড়ি ঠিক করো। অথৈ এর জন্য কিছু কেনাকাটাও তো করতে হবে আমাদের।
এহসান নিজের কেনাকাটার কথা চেপে গিয়ে বলল, আপনি যেভাবে ভালো মনে করেন, কেনা কাটা করেন ভাবী। সব স্বাভাবিক হলে তো আপনারই সব করার কথা ছিল। আমার কপাল খারাপ।
বড় বউকে একটু নরম হতে দেখে এহসানের মা বললেন, আমি তাইলে যাব এহসানের সাথে?
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৫৭
বড় ভাবী বললেন, আজকে না। যাওয়ার দুইদিন আগে আপনি যাইয়েন। আপনাদের নিয়ে আমরা রওনা হবো।
এখন আর অথৈকে আনব না। বাড়ি থেকে এসে আমাদের বাসায় একটা ছোট অনুষ্ঠান করে ওকে নিয়ে আসব।
মোটামুটি এহসান পারিবারিক সমস্যার একটা সমাধান করে বাসায় ফিরল আজ।
