Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৮

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৮

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৮
শানজানা আলম

একই সাথে নায়েব পাশার মনে হলো যেহেতু ট্রেস পাওয়া গেছে, অথৈ কে জানানো যেতে পারে। কিন্তু এই মুহুর্তে ঐশির সাথে তার এখনো কথা হয় নি এখনো। ঐশি ইন ডেনজার, ওর লাইফ রিস্ক আছে। ঠিক এই মুহুর্তে ঐশি কেমন আছে, সেটাও সন্দেহের বিষয়।
নাসিরের মা মোটেই সুবিধার মানুষ নয়, উপরে সুশীল মুখোশ পরে থাকেন ঠিকই, কিন্তু স্বামী ছেলের কুকীর্তি সব সময় ঢাকতে চেষ্টা করেন৷ নাসিরের স্ত্রী
আভার সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে, তবে মনে হয় না আভা এই বিষয়ে কিছু জানবে। ও নিজের মতন থাকে। বেটার হয়, আলী ভাইয়ের সাথে আগে যোগাযোগ করলে। তাই অথৈ কে নায়েব পাশা ফোন করল না।

আলী ভাইয়ের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার উপায় নেই। আলী ভাইয়ের আস্তানা ঢাকা শহরের ঠিক সেন্টার পয়েন্টে। যেখানে সে বসে, উপরে অনেক বিজনেস থাকলেও আসল ব্যবসা হলো অস্ত্র কেনা বেচার ব্যবসা। শহরের সব নামী দামী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আলী ভাইকে সমীহ করে চলে।
আলী ভাইকে সরাসরি ফোন করা যায় না। কেউ চাইলেই তার সাথে কথা বলতে পারে না। আগে কয়েক স্তরের লোক পার হতে হয়, পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তারপরও ভাগ্য ভালো হলে বার্তা পৌঁছায়। রাজনৈতিক কারনে নায়েব পাশার কোড নম্বর আছে, তাই যোগাযোগ হবে, তাও একটা সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হবে।
নায়েব কল দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম্বারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
একবার… দুইবার…
তৃতীয়বার রিং হতেই ওপাশে কর্কশ গলা।

“কোড?”
নায়েব শান্ত স্বরে বলল, — ড্রাই আইস!
ওপাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ।
তারপর আরেকজন লাইন নিল। — “কোথা থেকে বলছেন?”
— “নায়েব পাশা।”
ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা দুজন লোক অজান্তেই সোজা হয়ে দাঁড়াল।
ওপাশের গলাটা বদলে গেল। — “অপেক্ষা করুন।”
তারপর লাইন নিঃশব্দ।
কোনো মিউজিক নেই, কোনো শব্দ নেই। শুধু দূরে কোথাও ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ ভেসে এল। যেন ফোনটা পৃথিবীর অন্য কোনো অন্ধকার জায়গায় পৌঁছে গেছে।
নায়েব পাশা ধীরে ধীরে সিগারেট জ্বালাল, কিন্তু টান দিল না। প্রায় এক মিনিট পর খুব নিচু, ভারী একটা কণ্ঠ শোনা গেল।

— বলো নায়েব, ফোনের ওপাশের নিরবতা ভাঙলো।
নায়েব মাথা সামান্য নিচু করে বলল, —একটা মেয়েকে নিয়ে কথা আছে, আলী ভাই, দেখা করতে চাই।
ওপাশে নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে শব্দ এল, — তোমার মুখে মেয়ের কথা! কোন মেয়ের প্রেমে পড়লে?
— মশকরা করার সময় নয় আলী ভাই, নাসির একটা মেয়েকে প্রেগন্যান্ট করে ফেলেছে, ওই মেয়েটাকে মিসেস নওফেল আটকে রেখেছে, মেয়েটা আমাকে টেক্সট করেছে, জানেনই তো রাজনৈতিক অবস্থা, আমি কিভাবে কি করব বুঝতেছি না৷
-নাসিরের কেপ্ট তোমাকে কেন ফোন করবে নায়েব? নাসির তো তোমার বন্ধু ছিল, আলী ভাই ভণিতা না করে জিজ্ঞেস করলেন! সে তো রাজনীতিও করে না।
তার মানে তুমি আরো কিছু জানো।

নায়েব পাশা বলল, নাসির অপজিশনকে ফান্ড দিয়েছে আমার বিরুদ্ধে ইলেকশন করার জন্য।
আলী ভাই হেসে বললেন, তোমাদের অবস্থা তো ভালো না। জনগন ক্ষেপে আছে। নাসির ব্যবসায়ী, ওর তো সব দিক ঠিক রাখতে হবে, তোমরাও রেখেই চলো।
সেফ এক্সিটের সব ব্যবস্থা করে রাখা তোমার!
কাপুরুষের মতন নাসিরের রক্ষিতার সাথে লিয়াজো করতে গিয়েছ!
নায়েব পাশা বলল, এটা একটা বিজনেস ডিল আলী ভাই। মেয়েটা আমার পরিচিত। তবে আমি চাই কোনো কিছুতে আমাকে না জড়ানো হোক, আর মেয়েটা আদৌ বেঁচে আছে কিনা, সেটা নিশ্চিত নই। আর আমার কাছে ওদের কিছু প্রাইভেট মোমেন্টের ভিডিও আছে৷
আমি সেটা আপাতত হাইড করে রেখেছি। আমি চাইলে এটা দিয়ে নাসিরকে চাপে রাখতে পারি।
ভিডিও এর কথা শুনে আলী ভাই বললেন, আস্তানায় চলে এসো, এসে বিস্তারিত বলো।
ভিডিওটা হাতে পেলে নাসিরের কাছ থেকে কয়েকশ কোটি টাকা হাতানো যাবে, তবে নায়েব পাশাও দুর্বল না। পলিটিক্যাল কারনে নিজে দূরে থেকে ডিলটা তাকে দিতে চেয়েছে।
আলী ভাই ফোন রাখলেন। নায়েব পাশা আলী ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য তার আস্তানার উদ্দেশ্য বের হয়ে গেল।

ব্যস্ত শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ভবনটার বাইরের দিকটা সাধারণ মানুষের চোখে শুধু একটা বিলাসবহুল ব্যবসায়িক টাওয়ার। কালো কাঁচে ঢাকা দেয়াল, সামনে ফোয়ারা, আর সারি সারি বিদেশি গাড়ি। কেউ বুঝতেই পারে না— এই ঝকঝকে ভবনের উপরের কয়েকটা ফ্লোর পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষের দখলে। এটাই আলী ভাইয়ের আস্তানা।
ভবনের ভেতরে ঢুকলেই ঠান্ডা সুগন্ধি মেশানো বাতাস নাকে লাগে। সাদা মার্বেলের মেঝেতে ঝাড়বাতির আলো পড়ে চকচক করছে। রিসেপশনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো দেখতে কর্পোরেট কর্মচারীর মতো, কিন্তু তাদের চোখ সবসময় চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে।
প্রাইভেট লিফট ছাড়া উপরের ফ্লোরে ওঠা যায় না।
লিফটের দরজা খুলতেই অন্য এক জগৎ।

পুরো ফ্লোরজুড়ে নরম পার্সিয়ান কার্পেট, দেয়ালে দামি আর্টওয়ার্ক, সোনালি নকশা করা কাঠের দেয়াল। বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে নিচের শহরটাকে খেলনার মতো লাগে।
একপাশে লম্বা বার কাউন্টার, যেখানে ক্রিস্টালের বোতলে সাজানো বিদেশি পানীয়। অন্য পাশে কালো গ্র্যান্ড পিয়ানো, যদিও কেউ কখনও এটা বাজাতে দেখেনি। মাঝখানের বিশাল হলরুমে সবসময় অদ্ভুত নীরবতা। লোকজন নিচু স্বরে কথা বলে, যেন একটু জোরে বললেই বিপদ হবে। আর ভেতরের শেষ রুমটা— সেটা আলী ভাইয়ের ব্যক্তিগত কক্ষ।

দুই পাশে ভারী কাঠের দরজা। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে কালো স্যুট পরা দেহরক্ষীরা। ভেতরে আলো কম। ছাদের মাঝখানে বিশাল ঝাড়বাতি, কিন্তু তার অর্ধেক বাতি নিভিয়ে রাখা। ঘরের একপাশে বুকশেলফ, অন্য পাশে পুরোনো ধাঁচের দাবার টেবিল।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৭

জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে আলী ভাইয়ের কালো চেয়ার। চেয়ারটা ঘুরে না থাকলে কেউ তার মুখ দেখতে পায় না। লোকে বলে, আলী ভাই ক্ষমতা দেখাতে চিৎকার করেন না। তার আস্তানার অদ্ভুত নীরবতাই মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৯