Home বজ্রমেঘ বজ্রমেঘ পর্ব ২১ (২)

বজ্রমেঘ পর্ব ২১ (২)

বজ্রমেঘ পর্ব ২১ (২)
ফাবিয়াহ্ মমো

ব্যর্থতায় সারা মুখ কয়লা বর্ণ হয়ে আছে। চোখে হতাশার ছাপ সুদৃঢ়। ঠোঁটের কোণে জেদের আক্রোশ ফুটে ওঠেছে। হাতদুটো স্টিয়ারিংয়ের ওপর প্রচণ্ড রোষ ফোটাতে ব্যস্ত। পাশ থেকে অধঃস্তন এক কর্মকর্তা বসের রোষ কষায়িত চেহারাখানার দিকে ঢোক গিলে তাকিয়ে আছে। আস্তে করে কিছু বলার সুযোগ চাচ্ছিল, কিন্তু ওই চেহারা, ওই চোখ, ওই চোয়ালের অবস্থা দেখে সংযত রইল মুখ। সিগারেটখোর বৈশিষ্ট্যের দরুন কালো হয়ে যাওয়া ঠোঁটদুটোকে জিভে ভেজালো অধঃস্তন। এরপরই একটু রয়েসয়ে উদ্বেগ জড়ানো কণ্ঠে কথাটা পাড়ল অ্যান্টনি,
– আপনি একটু ঠাণ্ডা হোন তাহমিদ ভাই। এভাবে আপনাকে রাগলে চলবে না। আপনি যদি সামান্য একটা লোকের

পরবর্তী কথাটা আর বলতেই পারল না বেচারা। তীব্র আক্রোশে প্রায় ছিনিয়ে ফেলল শব্দটা। রাগে সমস্ত মুখ অন্ধকার করে জেদে কঠোর হয়ে বলল তাহমিদ,
– ওই লোক সামান্য কেউ ছিল না!
ফুঁসতে ফুঁসতে একটু থামলো রাগে অন্ধ তাহমিদ। প্রচণ্ড রাগটাকে মনে মনে শেকল দিয়ে বাঁধল। গভীর করে বুক ফুলাতে ফুলাতে রাগটাকে প্রশমন করে বলল,
– সামান্য কেউ না, সামান্য কেউ ছিল না। সে হালকা কেউ হতেই যাবে না অ্যান্টনি। এমন ভয়ানক ধুরন্ধর লোক আমি কক্ষণো দেখিনি। চোখের সামনে দিয়ে দিনকে সোজা রাত বানিয়ে দিচ্ছে। সবকিছু নিজের কন্ট্রোল এক্সেসে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। সে যেন আগে থেকেই জানে, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী ধরণের হতে পারে। অথচ এসব কাকপক্ষী পর্যন্ত কেউ জানে না! একমাত্র আমি জানি পরবর্তী ব্যাপারটা কোনদিকে আগাবে। বিষয়টা আমাকে একচুল স্বস্তি দিচ্ছে না। স্বাভাবিক লাগছে না ব্যাপারটা!

সমস্ত কথাই কর্ণ ইন্দ্রিয়ে টুকে নিচ্ছে অ্যান্টনি আজাদ। তার কোলের উপর চারকোণা আইপ্যাড। তাতে দিক নির্দেশনা দেখাচ্ছে, একটু আগে যে অভিযানটা পুরো মাঠে মারা গেছে সেটার। ছদ্মবেশী ভূমিকায় বেশ ক’জন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল নানান পয়েন্টে। কিন্তু কেউই সন্দেহজনক উপস্থিতির সিগন্যাল দেয়নি। প্রত্যেকেই জানিয়েছে আজ দুপুর একটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত একটানা সক্রিয় অবস্থানে থেকেছে তারা। কিন্তু চোখে পড়েনি কোনো সূত্র; ধরা পড়েনি কোনো কূলকিনারা। তবে হ্যাঁ, একটা দোকানদার বেশ খানিকটা উদ্বেগপূর্ণ তথ্য জানিয়েছে। যদিও সেটা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। উক্ত দোকানদার জানিয়েছে, আজ ঠিক সন্ধ্যা পৌণে আটটার দিকে এক লোক কালো বেশে এসেছিল। হাফ লিটারের একটা পানির বোতল কিনতে খানিকটা সময় অপেক্ষা করেছে। কিন্তু লোকটার ভাবভঙ্গিতে এমন কিছুই নেই, যা সন্দেহের তীরকে বিদ্ধ করবে। এটুকুই তথ্য। আইপ্যাড থেকে তথ্যটা শোনার পর থেকেই রাগে ফেটে পড়েছে তাহমিদ। থেকে থেকে ফণা তোলা গোখরার মতো ফুঁসে উঠছে ও। ডানপাশ থেকে অধঃস্তন অ্যান্টনি সুক্ষ্ম উদ্বেগে কপালে ভাঁজ ফেলতে ফেলতে বলল,

– আচ্ছা তাহমিদ ভাই,
কথাটা বলেই তাহমিদের রোষস্পর্শী মুখে চোখ ছুঁড়ল অ্যান্টনি। কপালের কুঞ্চন আরো দৃঢ় করে শুধাল,
– শাওলিন ম্যাডাম ঠিক ওই সময়েই ফার্মগেটে কেন? উনি না সাভারের দিকে যাতায়াত করেন? সাভার লিমিটেড বাস তো আজ ভালোই ফাঁকা ছিল। অতো তো চাপাচাপি অবস্থা ছিল না।
চোখটা সাথে সাথে বাঁপাশে ঘুরে গেছে তাহমিদের। ড্রাইভের ফাঁকেই তাকাল একপলক। অ্যান্টনি চিন্তান্বিত মুখে কী যেন ভাবছে দেখে ফের চোখটা সামনের দিকে তাক করে তাহমিদ বলল,
– ওর ভেতরে সমস্যা আছে। ওর টপিক বাদ দাও অ্যান্টনি। মিথ্যা বলতে এক নাম্বার! যতবার ওকে জিজ্ঞেস করেছি ক্যাম্পাস কটায় শেষ হয়, কোনোদিনই সঠিক সময়টা আমাকে জানায়নি। অথচ রেবেকা আপুর কাছ থেকে জেনেছি ওর ক্লাস আমার ডিউটির আগেই শেষ হয়। আজও যে মিথ্যে বলেছে, শিয়োর থাকো!
হঠাৎ কুঁচকে গেল ভ্রুঁ। অ্যান্টনির চোখে দারুণ জিজ্ঞাসা। একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্নটা করবে কী করবে না এমন দ্বিধায় যখন ফেঁসেছে, তখন তাহমিদই বেজার সুরে বলতে লাগল অধঃস্তন কর্মীকে,

– মেয়েটার ভেতরে একটা অ্যাবনরমাল ফ্যাক্ট আছে। সমস্যাটা আসলে চোখে দেখা যায় না। যেখানে অন্য মেয়েরা স্পেসিফিক কিছু জিনিসপত্র পেলে খুশিতে ফেটে পড়ে, সেখানে ওর ব্যাপারে এসব একেবারেই আলাদা। আমার ফিগারটাই ধরো। আমি দেখতে যথেষ্ট পার্ফেক্ট আছি। ফেস, ফিগার সামহাউ মেয়েদের কাছে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ও আমাকে থোরাই কেয়ার করে! আমার চাকরিটাকে পর্যন্ত বিশেষ নজরে দেখে না। সেখানে তুমি বুঝতে পারছ, ও কী পদের মেয়ে? ধৈর্য ধরে আছি শুধু বড় বোনটার জন্য। রেবেকা আপু না থাকলে—
বিশেষ একটা বুভুক্ষু ইঙ্গিতে কথাটা অসমাপ্ত করল। সিগারেট খাওয়া কালচে হই হই ঠোঁটজোড়াতে আস্তে করে জিভটা কুৎসিত আভাসে ঘুরাল। দৃশ্যটা অসুস্থ। অ্যান্টনি নিজের পুরুষালি রক্তে আদিম নাচনটা টের পেল। ‘জাত’ না বলে ‘পদ’ বলেছে বস। সেও তেরছা ঠোঁটে হাসি দিয়ে ফেলল। ওই মেয়েটা কোনোদিক দিয়ে কম নয়। আগুনের মতো রূপ, হাত দিয়ে ধরবার সুযোগই নেই। নয়ত একবার ধরে দেখতো, ওই পাখির মতো পলকা দেহটা কেমন করে উঠে! কীভাবে ছটফটায় ওই সদ্য ফুটতে থাকা টাটকা কোমল ফুলটা! কল্পনার দৃশ্যে অস্বাভাবিক একটা ঢোক গিলল অ্যান্টনি। পাশে বসা বসের দিকে আড়নজরে তাকিয়ে দেখল। তার বস এখন নিচের ঠোঁটে দাঁত চেপে ধরেছে। ড্রাইভ করলেও অন্য মনে কী ভেবে চলেছে, তা অনুমান করে নিজেও বিশ্রী করে হাসলো অ্যান্টনি। এমন সময় কণ্ঠ একেবারে নিচু করে আস্তে করে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল সে,

– আপনি কী একদিনও চান্স পাননি তাহমিদ ভাই? সুযোগ তো ছিল ঠিকই। আপনি চট্টগ্রামে যখন বিশেষ একটা কাজে ছিলেন, তখন তো শুনেছিলাম ম্যাডাম বন্ধুদের সাথে চট্টগ্রামে ঘুরতে গেছেন। আপনি চাইলে ম্যাডামের ওখান থেকে এক রাউণ্ড দিয়ে আসতে পারতেন ভাই। এতো বড়ো চান্সটা হাতছাড়া করলেন কী জন্য বলেন তো?
প্রসঙ্গটা ওঠাতে আবারও কিছুমাস আগের ঘটনাটা স্মরণে এল তাহমিদের। কিচ্ছুমাত্র ভোলেনি। এখানেও যে কত বড় মিথ্যেটা ঝেড়েছে, তা বুঝেও তাহমিদ কিচ্ছুটি করেনি। রেবেকার কাছে বলেছিল, পরীক্ষার পর ছুটি পেয়ে কিছুদিনের জন্য ঘুরতে যাবে ও। সঙ্গে যাবে ওর অসম বয়সি বন্ধুদল। যাদের সঙ্গে না মেলে বয়স, না মেলে কিছু, তবু ওদের সঙ্গে কীভাবে যেন বন্ধুত্ব হয়েছে ওর। ছয়জনের সেই দলবল মিলে পাড়ি দিয়েছে সুদূর গন্তব্য পার্বত্যাঞ্চল, রাঙামাটি জেলা, সাজেক খ্যাত খাগড়াছড়ি। তথ্যটা স্রেফ চেপে গিয়েছে শাওলিন। জানতে পর্যন্ত দেয়নি কোথায় গিয়েছে চট্টগ্রামের মাটিতে। তাহমিদ যে নিজেও চট্টগ্রামের পটিয়াতে ছিল, এরপর ছিল ভাঁটিয়ালীতে এ তথ্যটা আগে জেনে ফেলেছিল শাওলিন। প্রচণ্ড চালাকির সহিত গোপন করেছে নিজের খাগড়াছড়িতে অবস্থান। কিন্তু কী কারণে খাগড়াছড়িতে নিজের ফোন, লোকেশন, অন্যান্য মাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে ছিল, তা এখনো উদঘাটন করতে পারেনি তাহমিদ। নিজের আরেক ব্যর্থতার সুর কণ্ঠে বাজিয়ে সেটা দুঃখের মতো বলল অ্যান্টনিকে।

– বিয়ের আগ পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার সুযোগ নেই অ্যান্টনি। একলা পেয়ে যে জুত করে ধরব, সেই চান্সটা রেবেকা আপুর জন্য নেই। এই মহিলা কড়া ধাঁচের। সিলেটের নামকরা কলেজের প্রফেসর।হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট। একটা কিছু এদিক ওদিক করতে দেবে না এই মহিলা। জীবনে কোনোদিন শুনেছ কেউ ননদকে আঁচলে বেঁধে বড়ো করে? এই মহিলা করেছে। এটাই রেয়ার ঘটনা।
আশ্চর্যে চোখের দশা বড়ো বড়ো করে ফেলেছে অ্যান্টনি। ভাবী হয়ে ননদকে পালন? কী শুনছে কী? এই জমানায় সম্ভব নাকি? আদৌ ঠিক শুনছে সে? মানুষ লৌকিক নিয়মে নিজের বুড়ো বাপ-মাকে পালন করে না, এদিকে অলৌকিক নিয়মে ভাবী দেখেছে ননদকে? অ্যান্টনি এক অদম্য কৌতুহলে টানটান হয়ে উঠেছে। জানার দুর্বিনীত আকাঙ্ক্ষায় তাহমিদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল। ঝোঁকটা আর একটুও চাপতে না পেরে অবাক কণ্ঠে বলল,
– বলেন কী আপনি? এটা কী করে সম্ভব ভাই? আজকালকার দিনে নিজের মা-বাপকেই পোলাপান চোখে দেখে না! আর এদিকে আপনি বলছেন —
– প্রেমের বিয়ে বললামই তো। যেনতেন জায়গায় অবশ্য বিয়ে করেনি। যে পরিবারটায় বিয়ে করেছে সেখানে ঝামেলা আছে। এসব জেনেশুনে কেউই ওই পরিবার থেকে পাঠানো প্রস্তাব মেনে নিবে না।চাচাও মেনে নেয়নি। সোজা না করেন। কিন্তু মেয়ে ছিল নাছোড়বান্দা। বিয়েটা নিজের মনের মানুষের সাথেই করেছে। এখন সেই রেবেকা নেওয়াজের ননদ হচ্ছে শেহজানা আলম শাওলিন। রেবেকা নেওয়াজ ওর ঢাল তরবারি। সিলেটে চাকরি করলেও ঢাকায় সপ্তাহে দুই-তিনবার ঘুরে যান। এবার বুঝছ, কেন এতো তেজ এই ছুকরির?

বুকের ভেতর প্রচণ্ড অস্থিরতা ছুঁয়ে আছে। স্বস্তি, শান্তি, প্রসন্নতা অনুভব করছে না ও। এখনো স্থির হতে পারেনি ব্যাপারটা থেকে। কর্পূরের মতো দূর হচ্ছে না ঘটনাটার আঁচড়। বুকের মধ্যে কী যেন একটা সর্বক্ষণ বিষদাঁত বসিয়ে রেখেছে। সেটার সুতীব্র ব্যথায় নিঃশ্বাস নিতেও যন্ত্রণা হচ্ছে ওর। দুহাতের মাঝে চায়ের গরম পেয়ালা আবদ্ধ করে মাথাটা নিচু করে নিচ্ছে শাওলিন। ফুটফুটে ফুলের মতো ওর কবোষ্ণ ঠোঁটদুটি পোর্সেনিলের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছে। একটু করে পান করছে চায়ের ছোট্ট চুমুক। ব্যালকনির পরিচ্ছন্ন মেঝের উপর চুপ করে বসে আছে, দেয়ালে স্পর্শ রেখেছে নিজের পিঠ। সামনে ফুটে আছে রাতের নক্ষত্র জ্বলজ্বল করা আকাশ। থেমে থেমে মন জুড়িয়ে দেয়া বাতাস আসছে, সেই শীতল বাতাসে বিভোর হচ্ছে চিত্ত। আরেকবার চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিবে, এমন সময় বিকট আর্তনাদ জুড়ে কলিংবেলটা বেজে উঠল। আরেকটু হলে ঠোঁটদুটো বেকায়দায় পুড়ে যেতো শাওলিনের, ভাগ্যিস পেয়ালাটা সরিয়ে নিতে পেরেছে। বসা থেকে উঠতে উঠতেই একজোড়া কণ্ঠের হাসি-তর্ক শুনতে পেল শাওলিন। রুমের দরজায় ভারি পর্দা দেয়া। মেঝে স্পর্শ করা গাঢ় মেরুন রঙা পর্দাগুলো ফ্যানের বাতাসে তখনো উড়ছে। উড়াউড়ির ফাঁক দিয়েই বাইরেটা এক ঝলক দেখল শাওলিন। তাহমিদ! তাড়াতাড়ি চায়ের পেয়ালাটা রেখে নিজেকে ব্যস্ত করে তুলল। সর্বনাশ! সত্যি সত্যিই দেখা করতে চলে এসেছে! এখন না আবার এই ঘরে আসন গাড়ে! টোটব্যাগটা পরবর্তী ক্লাসের জন্য গুছিয়ে রেখেছিল, সেটাই টেবিলের উপর উপুড় করে দিল শাওলিন। একটা কোর্সের অ্যাসাইমেন্ট তখনো অফসেট পেপারে আলগা ছিল। স্ট্র‍্যাপল করেনি। সেগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করে দিল। এমন সময় কানে এল সেই অপ্রীতিকর কণ্ঠ,

– কী খবর শাওলিন?
প্রশ্নটা শুনেও পিছু ফিরে তাকায়নি শাওলিন। নিজের মতো আপন ব্যস্ততায় বিভোর হয়েছে ও। একটা একটা করে লুজ শীট ঠিকঠাক করতেই ভারি ব্যস্ততার সুরে জবাব দিল,
– ভালো আছি। আলহামদুলিল্লাহ। আপনি ভালো আছেন?
– ভালোই আছি। বাসায় পৌঁছলে কটায়?
কথাগুলো বলতে বলতে একদম ঘরে ঢুকে পড়েছে তাহমিদ। ঘরের এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে শেষপর্যন্ত শাওলিনের ওপর চোখ থেমেছে। হালকা গোলাপি বর্ণের বেশ ঢিলে একটি জামা। জামাটার হাতাদুটো এতোটাই লম্বা যে ওর হাতের তালুর অর্ধেকটা প্রায় ঢেকে ফেলেছে। জামার হাতাদুটো ভীষণ ঢোলা। ও এরকম ওভার সাইজ পোশাক পরে কেন? একটু স্মার্ট ভূমিকায় টাইট টিশার্ট পড়তে পারে না? মনে মনে খেদোক্তির সাথে উচ্চারণ করছিল তাহমিদ। এদিকে তীব্র অস্বস্তিতে কাঠ হয়ে আছে শাওলিন। লুজ শীটগুলো গোছাতেই হঠাৎ একনজর সেই ছোট্ট বস্তুটায় আঁটকে গেল ওর। নীল কালিতে লেখা সেই কথাটুকু —
“ভয়ে পেয়ো না। আমি।”

এটুকু সবে মনে মনে উচ্চারণ সেরেছে শাওলিন, এমন সময় হঠাৎ কেমন একটা উদ্ভট অনুভূতি হল ওর। বুঝতে পারল না তেমন। দু সেকেণ্ড নিঃশ্বাস আঁটকে ব্যাপারটা বুঝতে চাইল ও, ঠিক তখনই টের পেল ওর পেছনে কারো গরম শ্বাস। পেছন থেকে একটা হাত ওর কোমরের বাঁপাশ দিয়ে সাপের মতো এগোচ্ছে। আস্তে করে ওর পেটের ওপর সর্বোচ্চ শক্তিতে খামচাতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ওর শীট গুছানো ডানহাতটা আরেক হাতের থাবাতে চেপে ধরছে তাহমিদ। ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক সেকেণ্ড লাগল ওর; অমনেই সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে কেঁপে উঠল! চিৎকার করতে যাচ্ছিল শাওলিন, গলা ফাটিয়ে তীব্র ঝংকার ফোটাতে যাচ্ছিল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ কোনোদিকে না তাকিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে ধাক্কাটা মারল শাওলিন! শরীরের সবটুকু শক্তি একত্র করেই কাজটা করল। মুহুর্তের ভেতর কী হল বোঝা গেল না, হঠাৎ রেবেকা নেওয়াজ অবর্ণনীয় একটা শব্দ পেলেন! কলে কথা বলাটা থমকে গেছে উনার। বিস্মিত নয়নে শাওলিনের রুমের দিকে তাকালেন তিনি। তখনি দেখতে পেলেন রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছে জোহরা। অস্থির বিকারগ্রস্ত কণ্ঠে চ্যাঁচাচ্ছেন,

– কী হলো? কী হলো রেবেকা! ভারি শব্দটা কীসের ছিল? শব্দটা শাওলিনের ঘর থেকে এল না?
রেবেকা আর একসেকেণ্ডও সেখানে দাঁড়ান না। কলটা কেটে ফোনটা ফেলে দ্রুতগতিতে ছুট লাগিয়েছেন তিনি। ডাইনিং স্পেস পেরিয়ে শাওলিনের ঘরে ঢুকতেই আঁতকে উঠেন রেবেকা! চোখে বিস্ময়ের প্রলেপ মাখিয়ে তাকান শাওলিনের দিকে। জোহরা খালেক কিছুই বুঝতে না পেরে কপালে কুঞ্চন নিয়ে তাকিয়ে আছেন। শাওলিন মেঝের উপর ঝুঁকে বসে অনেকগুলো লুজ শীট তুলছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অ্যাসাইমেন্ট পেপার ওগুলো। কিন্তু আশ্চর্যজনক, চুলের বহরে ঢাকা পরেছে মুখের এপাশটা। দেখে যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিছানার উপর চিত হয়ে পরে আছে তাহমিদ। ব্যাপারটা কিছুই বোধগম্য না। তবু তাহমিদ দুটো মহিলাকে ভ্যাবাচ্যাকা ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে একগাল হাসি দিয়ে বলল,

– কিছু না। ভুলে শরীরের ভর ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাই অমন দড়াম করে শব্দ! বুঝিনি তোমার ননদের বিছানা এতো তুলতুল। এমন তুলার মতো বিছানায় মানুষ ঘুমায়? এই বিছানায় কোনো পুরুষ মানুষ ঘুমাতেই পারবে না। বিয়ের পরপরই এটা চেঞ্জ করা দরকার।
জেঠাতো ভাইয়ের কথাবার্তায় হাসা উচিত রেবেকার। কিন্তু হাসিটা কেন যেন ফোটাতে পারলেন না। গম্ভীর তেজটা সরেজমিনে ফুটিয়ে এক ধমক দিয়ে উঠেন,
– তোকে বলেছিলাম না এই ঘরে ঢুকবি না? তো এখানে এসেছিস কেন? বিয়ের আগে অতো মাখামাখির দরকার দেখি না! বের হ তাহমিদ। উঠে পড় এই দণ্ডে!
– আরে, উঠছি। অতো রাগারাগী কীসের! আমি তো এখানে থাকতে আসিনি। দেখা করতে এলাম, আর খোঁজখবর নিতে এলাম কিছু প্রয়োজন আছে কিনা।
– সেসব দেখার জন্য অবশ্যই আমি আছি। তোর মার কথায় কথা পাকাপাকি করেছি, তার মানে এই নয়, এখুনি ওর দায়ভার তোর ওপর চাপিয়ে দেব। এখন কথা না বাড়িয়ে এই ঘর থেকে বের হ। যা কথা বলার ড্রয়িং রুম পর্যন্ত। বেডরুম পর্যন্ত কোনো আলাপ না। আমি এটা পছন্দ করি না তাহমিদ। শেষবারের মতো বলে দিলাম; আর বলব না আমি।

বজ্রমেঘ পর্ব ২১

শেষ জোরালো ভঙ্গিতেই শেষ ছবকটা দিয়ে দেন রেবেকা। এরপর আর কোনো তর্ক, বাক্য, কথা বিনিময়ের সুযোগ থাকে না। শাওলিনের দিকে ‘অ্যাই আসি শাওলিন’ বলে ঘরটা থেকে বেরোল তাহমিদ। সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন রেবেকা। জোহরা বেরোতে গিয়েও কী যেন মনে করে পা থমকে পিছু ফিরলেন। সোজা ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন জোহরা। কী যেন বুঝলেন মনে মনে। ঠিক তখনি একজোড়া লাল অশ্রুপূর্ণ চোখের সাথে চোখচোখি হলো উনার। শুধু চোখদুটোই লালবর্ণে টলোমলো করছে। সমস্ত মুখই যেন নির্বিকার! ভিজে উঠেছে চোখের ঘন পল্লব, নাকের ডগায় কেবল লালচে ছাপ। অ্যাসাইনমেন্ট পেপারগুলো তুলে দাঁড়িয়ে গেল শাওলিন। টেবিলে টপ টপ গড়িয়ে পরল দুচোখের শিশিরফোঁটা। অবিরাম ফোটায় ফোটায় ঝরেই যাচ্ছে। তবু ওর হাত চলছে। কাগজ গোছাচ্ছে। স্ট্রাপলার করছে। সব করছে সব!

বজ্রমেঘ পর্ব ২২