Home বজ্রমেঘ বজ্রমেঘ পর্ব ২১

বজ্রমেঘ পর্ব ২১

বজ্রমেঘ পর্ব ২১
ফাবিয়াহ্ মমো

নিঃসীম নীরবতার পর শাওলিন বিদায় জানালো ইরাকে। চায়ের দাম, খুচরো মুহুর্ত সবকিছু জানালো নিজের থেকে। বুঝতেও দিল না কতখানি ক্লান্ত ওর দেহ-মন। কতটা ঘুমিয়ে আসছে ওর স্নায়ু ও চৈতন্য। অবস্থা বেগতিক বুঝেই বোধহয় ইরা গল্প, আলাপ, বাড়তি কথাবার্তা দীর্ঘ করল না। স্কুটিটা চালু দিয়েই একপলক শাওলিনের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল ইরা। কেমন অদ্ভুত রহস্য জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– রাস্তায় একা ঘুরাফেরা করো না। সঙ্গে বন্ধুবান্ধব রাখবে। আজ একা এসেছ এতে সমস্যা নেই। কিন্তু সাবধান, ঢাকার পথঘাটে একা একা নয়। ঠিক আছে?

কথাগুলো দারুণ প্রশ্ন উদ্রেকের সঞ্চার ঘটালো শাওলিনের বুকে। দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল ওর সদা ঠাণ্ডা চিত্ত। মনে হল খারাপ কিছুর পূর্বাভাস আগেভাগেই জানিয়ে যাচ্ছে ইরা। অথচ কথাগুলোর ভাঁজে ভাঁজে কেমন উদ্ভট ভীতির আশঙ্কা। দুম করে স্কুটিটা নিয়ে চলে গেল কর্ণেল কন্যা ইলহাম আজিজ। পিছু রেখে গেল একরাশ ধোঁয়াটে গন্ধ, স্কুটির চলন্ত শব্দ আর শেষ বিকেলের ডুবে যাওয়া সূর্যাস্তের প্রখরতা। বাঁ কাঁধে কাপড়ের টোটব্যাগটা ঝুলিয়ে নিয়ে রূপনগর ছেড়ে বাসামুখো গন্তব্যের দিকে পা বাড়াল শাওলিন। দিনের পিদিম নিভে চারপাশটা সন্ধ্যের গাঢ় আঁচে অন্ধকার বর্ণে ডুবে যাচ্ছে। যাত্রীতে ঠাসাঠাসি এক লোকাল বাসের ছোট্ট সিটে জানালা সংলগ্ন হয়ে বসেছে শাওলিন। কোলের ওপর ওর ব্যাগটা রাখা। বাসটা চলছে ঢিমে গতিতে। জ্যাম, কোলাহল, সিগন্যালে আঁটকে পড়া অজস্র গাড়ির শব্দ ওকে কেন জানি আজ স্পর্শ করছে না। চোখদুটো জানালার বাইরে বেগুণি রঙে ডোবা সন্ধ্যা লগ্ন মগ্ন। বুকের ভেতরটা কেমন এক জড়তাসম্পণ্ণ ভয়ে জড়োসড়ো। ভয়ের দলাটা যেন ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে পিষে ফেলছে প্রচণ্ড। প্রচণ্ড দমবন্ধ লাগছে ওর ছোট্ট বুকের মধ্যিখানে! মাকে প্রচণ্ডরূপে মনে পড়ছে আজ। ভীষণভাবে ইচ্ছে করছে দুহাতে সেই মা মা গন্ধ মাখানো মাতৃ দেহটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে।

ছোটোবেলার স্মৃতি খুব একটা ভোলেনি উনিশ বছর বয়সি শাওলিন। মনে আছে, মায়ের দুটো অপূর্ব সুন্দর চোখ ওর মনের কথা বেশ ধরতে পারতো। কোথায় ব্যথা, কোথায় যন্ত্রণা, কোথায় একটু অসামঞ্জস্য, কোথায় ওর সমস্যা – সব মায়ের মাতৃমন একহলফে বুঝে যেতো। মনে মনে অশান্ত বিশ্রান্ত বোবা চিত্তটা আজ কথা বলে উঠল ওর, তুমি পাশে থাকলে আমার না বলা কষ্টগুলো বেশ সহজ হয়ে যেতো মা। তুমি আজ কাছে থাকলে আমার বহু সমস্যা হয়ে যেতো সমাধান। সমাজের যন্ত্রণায়, মানুষের নোংরা কথাবার্তায়, ভণ্ড জোচ্চোরদের আচরণে তুমি আত্মহত্যাকেই ফুলের মতো মনে করেছ। আর দেখো, সেই সমাজ নিজের মতো আছে।পাশের বাড়ির মানুষগুলো দিব্যি দিন কাটাচ্ছে। মিথ্যেবাদী ভণ্ডরা আজ নরম গালিচায় সুখের দিন গুণতে বিভোর। ওদের কিছু হয়নি। ওদের কেউ বিচার করবে না। ওরা মানুষের সুখ হত্যা করে সবচেয়ে বেশি সুখের আমেজে আছে। বুকের ভেতরে ওদের এতটুকু লজ্জা নেই, এতটুকু চিন্তা নেই, সামান্যতম ভয় নেই কত বড়ো অন্যায় কাজগুলো ওরা করেছে।

অথচ ওরাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আরামে, স্বস্তিতে, স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাচ্ছে। থাকছে। এতো অন্যায়, এতো বিষাদ, এতো নির্মম ব্যবহার সহ্য করতে করতে তো মানুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলবে। মানুষ দিনকে দিন বড্ড নাজুক হয়ে পড়বে। কোথায় গেলে সত্যিকার একটা বিচার মজলিস পাওয়া যাবে? কোথায় গেলে মানুষ ভরসা পাবে ‘আমি একটা ন্যায়ের বিচার’ পাব? পৃথিবী আজ শক্তিশালীদের গোলামী করতে ব্যস্ত। যারা অর্থ, দম্ভ, ক্ষমতা, মুখোশ, মিথ্যে ভণ্ডামি দিয়ে সবকিছু ঢেকে রাখতে তৎপর। তাদের ওই রঙিন রাজ্যের আড়ালে খুব কুৎসিত একটা মুখ আছে, দূষিত একটা রূপ আছে। ওই মুখ কেউ কখনো দেখতে পারে না। সমাজের লোক ওই মুখ কোনোদিন দেখে না। তারা শুধু উপরি উপরি তাদের জাঁকজমক দেখে মুগ্ধ হয়। বিভোর হয়ে তাদের মিথ্যা ভাঁড়ামিতে ভক্ত অনুসারী হয়ে যায়।
কথাগুলো অজান্তে নিজের স্মৃতি তুল্য মায়ের কাছে অভিযোগ করে বলছিল শাওলিন। পাশে বসা মহিলা যে ওকে ‘অ্যাই শোনো, শোনো!’ বলে ডেকে যাচ্ছে সেদিকে ওর খেয়াল হয়নি বিন্দুমাত্র। হঠাৎ কোলের ওপর হাতের ঝাঁকুনি খেয়ে ঝট করে সচকিত হল ও। পাশে বাঁদিকে মুখ ঘুরিয়ে চাইলে একজন বোরখা বেশে মহিলা ওর দিকে ছোট্ট একটা জিনিস বাড়িয়ে বলল,

– এই নাও, ধরো এটা। এটা তোমাকে ওই লোকটা দিতে বলল।
আশ্চর্যে হতবাক শাওলিন মহিলার নেকাবে ঢাকা চোখদুটোর দিকে চোখ রাখল। বিষ্ময়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় সাথে সাথে উচ্চারণ করল,
– কোন্ লোক! কে?
– আমি তো চিনি না। আমাকে বলল এটা তোমাকে দিতে। এই ভিড়বাট্টার মধ্যে আমি দেখিনি লোকটা কোনদিকে গিয়েছে।
হতবিহ্বল শাওলিন মহিলার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে তাকিয়েছে। নিজের হাতের মুঠোয় ধরা বস্তুটার দিকে চোখ পড়তেই চরম আশ্চর্যে অস্ফুট স্বরে শব্দ করে উঠে। সহসা আঁতকে উঠল নাকি চমকে উঠল তা বোঝা গেল না। ছোট্ট চিরকুট মতো একটা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে নীল কালিতে লেখা,

‘ভয় পাবার কারণ নেই। আমি।
আগামী স্টপেজে নামতে পারবে? নামো! দেরি করবে না।’
দু বাক্যের কথাটুকু পড়ে বুকের ভেতরটা কেমন গুড় গুড় মেঘের ডেকে উঠল। চিনচিন করে একটা তীক্ষ্ম ফলা কোথায় যেন ঢুকল ওর। আশেপাশে ব্যগ্র ব্যাকুল দৃষ্টিতে সেই রহস্যময় ব্যক্তিকে খুঁজতে লাগল ও। অনেকটা অস্থির ভঙ্গিতে বাসের প্রতিটি কোণা উদভ্রান্তের মতো খুঁজে দেখতে লাগল! কিন্তু কাউকেই আবিষ্কার করল না। গায়েবি ঘটনার মতো উধাও গেছে যেন অখ্যাত লোকটা। ঢোক গিলে আরেকবার হাতের চিরকুটে তাকাল শাওলিন। এরপর পাশে বসা মহিলার দিকে ব্যাকুলবিদ্ধ হয়ে প্রশ্নাতুর চোখে শুধাল,

– শুনুন, আপনি তাকে দেখেছেন না? সেই ব্যক্তি দেখতে কেমন ছিল? বেশভূষা, চেহারা . . কিছু তো লক্ষ করেছেন?
ভদ্রমহিলা এবার কপাল কুঁচকে সন্দেহের দৃষ্টি উঁচিয়ে দেখল ওকে। একবার ওর হাতে থাকা ছোট্ট চিরকুটের দিকে, আরেকবার ওর উদ্বিগ্ন ভরা লালবর্ণ ঘার্মাক্ত মুখখানায় চোখ ঘুরাচ্ছে। কী বুঝল জানা নেই, হঠাৎ শাওলিনের দিকে মুখ এগিয়ে একদম নিচুস্বরে বলল, যেন ভিড়বাট্টার কোলাহলে কথাটা যেন শাওলিনই শুধু শুনতে পাক,
– বাসায় ঝগড়া হয়েছে তোমার? রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছ? তুমি করেই বললাম। তুমি আমার ছোট মেয়ের বয়সি বলে মনে হচ্ছে। তোমার সাহেব তাহলে এই বাসেই উঠেছিল। কালো স্যূট, সাদা শার্ট আর চোখে চশমা পড়া। লম্বা মানুষ। খুব কষ্ট করেছে। লোকাল বাসের এমন নিচু ছাদের কারণে মাথা একটু পরপর নিচে নামিয়ে রাখতো। এদিকে কোথাও যেন নামল কিনা! দেখো।

বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস করে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে হৃৎপিণ্ডটা। গলার কাছে ওর আঁটকে পড়েছে একদলা চিন্তিত শ্বাস। ঢোক গিলতে গিয়ে তা গিলতে পারল না শেহজানা আলম শাওলিন। মুহুর্তের মধ্যে কী হল, অনুমান করা গেল না। সাথে সাথে মহিলাকে পাশ কাটিয়ে মারাত্মক সঙ্গিণ ভিড়টা অস্থির-দুরন্ত-ব্যগ্র ভঙ্গিতে ঠেলে ত্রস্তপায়ে পরবর্তী স্টপেজে নেমে গেল ও। বাইরে অন্ধকারের কালো পর্দা নামতে শুরু করেছে কেবল। পাখিদের দল ঢাকার আকাশ মাড়িয়ে একযোগে ছুটে চলেছে নীড়ের দিকে। চর্তুদিকে শব্দ আর শব্দ। হর্ণ, কোলাহল, হকারদের কান ফাটানো শব্দ। ডানহাতে ওড়না টেনে সেটা ঘামে ভেজা লালচে মুখে বুলিয়ে নিচ্ছে শাওলিন। বুকটা এখনো ধ্বক্ ধ্ব্ক করছে ওর। এপাশ ওপাশ চর্তুপাশে উন্মত্তের মতো চোখ ঘুরাচ্ছে শাওলিন। কিন্তু সেই বর্ণনার ব্যক্তির মতো কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। বাঁহাতের মুঠো থেকে আবারও ছোট্ট চিরকুটটা চোখের সামনে মেলল শাওলিন। চিরকুটে ‘আমি’ লেখাটার ওপর নিজের কম্পনরত বৃদ্ধাঙুল ছুঁয়ে দিল আরেকবার। হাতের লেখাটা চিনেছে। এই কালিটাও ধরতে পেরেছে। কালো স্যূট, সাদা শার্ট কাকে পড়তে দেখেছে তাও আঁচ করে ফেলেছে। কিন্তু ও যা অনুমান করছে সেটা কী নির্ভুল হয়েছে? যাকে ও ভাবছে এখানে, সে কী এমন মুহূর্তে এখানে থাকবে? এই ঢাকা শহরের ব্যস্ততায় ওরকম ব্যস্তজন এখানে আসবে? যৌক্তিক মন তো সায় দিচ্ছে না। কিন্তু অন্য মনটা যুক্তির ধার ধারছে না। এমন সময় নিজের নামটা দুকানে শুনতে পেল শাওলিন। কে যেন উচ্চস্বরে ডেকে উঠেছে।

– শাওলিন!
ডাকটা শুনতে দেরি, তার ন্যানো সেকেণ্ডের মধ্যেই ঝটিতি মাথাটা ঘুরিয়ে তাকায় শাওলিন। চোখে আগ্রহের দীপ্তি, ঠোঁটে দুরন্ত কাঁপন, হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছিল প্রায়, কিন্তু পেছনে যাকে দেখল, তাকে দেখে ওর সমস্ত পরিবর্তন দপ করে নেভা মোমের মতো অন্ধকারে ডুবো হল। এতটুকু পরিমাণ আগ্রহ উচ্ছ্বাস দেখা গেল না ওর পিপাসিত চোখে। যেন পিপাসাই মিটল না এই আগন্তক ব্যক্তিকে দেখে।

– তুমি এখানে কী করছ? কী আশ্চর্য ব্যাপার! এখানে এসেছ জানলে আমি গাড়িটা নিয়ে আসতাম।
বলতে বলতে স্বল্প দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে আনছিল উক্ত আগন্তক ব্যক্তি। পরনে সাদা টিশার্ট। বুকের উপর কালো রঙে Adidas লেখা। বাঁহাতে বেশ দামি একটি ব্রাণ্ডেড ঘড়ি, যা বতর্মানে রাস্তার আলোয় ঝিলিক দিয়ে আলোর প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। ফর্মাল কালো প্যান্ট পরা। প্যান্টের ডান পকেটে হাত গুঁজে দাম্ভিক ব্যক্তির মতো পদক্ষেপ ফেলে আসছে লোকটা। ব্যাপারটা কখনো সুদৃষ্টির মতো প্রভাব ফেলেনি শাওলিনের চোখে। সবসময়ই ওর মনে হয়েছে, এই লোক নিজের আশপাশের জগতকে বড়ো তুচ্ছ জ্ঞান করে। কেউ তার চেয়ে বেশি যোগ্য প্রমাণ হলে তাকে নিয়ে একপ্রকার জিঘাংসায় ভোগে। হিংসায় জ্বলেপুড়ে ওঠে তার মন। রাগে, ক্ষোভে, সুপ্ত জিদে তাকে মাটির সঙ্গে মেশাতে পারলে তার মনটা যেন শান্তি পায়। অথচ এই লোকটাই কিনা ওর আঙুলে আংটি পরানো বাগদত্ত। লোকটার পুরো নাম তাহমিদ মর্তুজা। মর্তুজা পরিবারের সবচেয়ে অসহ্য এক ছোকরা। যাকে শাওলিন ছোট থেকে তো দেখতে পারতোই না, এখন উনিশ বছরে এসে আরো আগে দেখতে পারে না। যদি রেবেকা মণির কলিজার টুকরা ভাই না হতো, তবে কবেই এই ঝামেলা থেকে নিস্তার পেতো শাওলিন। পকেট থেকে অ্যাপেল ব্রাণ্ডের লেটেস্ট আইফোনটা বের করে একবার সময়ের দিকটা লক্ষ করল তাহমিদ। চোখদুটো খানিক ছোটো ছোটো হয়ে গেল তার। কপালে সন্দেহের ভাঁজ। সন্দেহের উপর্যুপরি ছাপে ওর দিকে তাকাতেই চটান করে বলে উঠল তাহমিদ মর্তুজা,

– এখানে কী করছ শাওলিন? সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে তোমার এখানে থাকার কথা না। তোমার এখন বাসায় থাকার কথা। সেখানে এই এলাকায় তুমি কী কাজে এসেছ? দরকার কী?
প্রশ্নগুলো এমন ভঙ্গিতে করল তাহমিদ, প্রত্যেকটা সন্দেহের তীর ওর ওপরই ঠিকঠাক বিদ্ধ হল। শাওলিন যে যত্রতত্র ঘুরাফেরা করা মেয়ে নয়, বরং ক্যাম্পাস থেকে বাসা অবধিই ওর দৌরাত্ম, এর খাঁটি সত্যতা তাহমিদ ভালোভাবে জানতো। এদিকে শাওলিন চাচ্ছিল না এসব নিয়ে আবার মণির কানে কথা উঠুক। মণি নিশ্চয়ই এটা স্বাভাবিক নিবে না যে, এই সন্ধ্যার সময় বাড়ি না ফিরে ও এমন একটা জায়গায় নেমে পড়েছে। সঙ্গে আবার শ্রেষ্ঠা বা নাযীফ ওরা কেউ নেই। ওদের নাম ভাঙিয়ে কিছু একটা বলে দিবে, তারও কোনো সুযোগ রইল না। মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলেও নিজের ভাবে-ভঙ্গিতে তা প্রকাশ করল না শাওলিন। খুব স্বাভাবিক রইল। সাবধানে নিজের বাঁহাতটা ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে তাহমিদের সন্দেহের তীড়টা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল,
– আজ বাসের ভিড়টা ভালো ছিল না। প্রয়োজনের তুলনায় চাপাচাপি করে যাত্রী তুলেছে। তাই বাধ্য হয়ে এখানে নেমে পড়েছি। সামনে এগিয়ে একটা রিকশা নেব। বাকি পথ রিকশাতেই চলে যাব।
– ওহ, আচ্ছা।

মুহুর্তের মধ্যে চেহারার প্রচ্ছন্ন সন্দেহ আড়াল করে ফেলল তাহমিদ মতুর্জা। ঠোঁটে হালকা হাসির রেশ দেখা দিল স্বস্তিকর ভাবে। মনে মনে একটা সুক্ষ্ম কিছু আঁচ করছিল তাহমিদ, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শাওলিনের কথাগুলোই ঠিক হচ্ছে। ওর ছোট্ট মুখটা যেভাবে ঘেমেনেয়ে গালদুটোতে আবির প্রলেপ ফুটে আছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে বাসের ভেতরটা একদম সুখকর ছিল না। পকেট থেকে টিস্যুর প্যাকেট নিয়ে কিছু টিস্যু ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল তাহমিদ। অনেকটা বাড়তি অধিকার ফলাতে গলা গরম করে বলল,
– এই গরমে ওসব বাস জার্নি করো কেন? বাসগুলোর অবস্থা তো ভালো না। লক্কর ঝক্কর টাইপ বাসগুলোতে কী ঝামেলা হয় জানো না? ড্রাইভারগুলো নেশা টেশা করে গাড়ি চালায়। এরপর দেখা যায় সিরিয়াস একটা দুর্ঘটনা করে একলাটে মানুষ মেরে বসে আছে।
এক কান দিয়ে কথাগুলো শুনছে শাওলিন, অপর কান দিয়ে বের করে দিচ্ছে। ওর মন ও মস্তিষ্ক তখনো চর্তুপাশটা ছেঁকে ছুঁকে খুঁজছে। ওড়নার আড়ালে ওর বাঁহাতের মুঠো। শক্ত, কঠোর, মুষ্টিবদ্ধ। চিরকুটের আকার দুমড়ে মুচড়ে এতটুকু হয়ে যাচ্ছে, সেই মানুষের দর্শন কই? তার অস্তিত্বের জানান কোথায়? ব্যাপারটা তাহমিদের নজরে পড়লে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে এপাশ ওপাশ দেখল। কপালে গাঢ় কুঞ্চন নিয়ে ফের বলে উঠল,

– ফার্মগেটে খুঁজোটা কী! এদিকে তো ফুলের দোকান ছাড়া কিচ্ছু দেখার মতো পাচ্ছি না শাওলিন। তুমি কী আমাকে বলবে? কী দেখছ তোমার ওই বড় বড় চোখদুটো দিয়ে?
ঝট করে মাথাটা সামনে ঘুরিয়ে আনে শাওলিন। তাহমিদের কুঞ্চিত কপাল দেখে দ্রুত সাবধান হয়ে যায় ওর চিত্ত। একটা বিশ্বাসযোগ্য জবাব ঝটপট সাজিয়ে গুছিয়ে সেটাই শান্তস্বরে বলে উঠল,
– কিছু না। শাহবাগের দিকে যায় এমন বাসগুলো দেখছি। ফাঁকা বাস পেলে উঠে যেতাম। কিন্তু রাশ টাইমে কোনো বাস ফাঁকা নেই। আমি রিকশা —

– রিকশা আমি ঠিক করে দিচ্ছি। আর শোনো, রাতে তোমাদের বাসায় একবার দেখা করতে যাব। ঢাকায় এসেছি, কিন্তু এখনো টাইম ম্যানেজ করতে পারছি না। দেখি, আজ যাবই যাব। রেবেকা আপুকে ইনফর্ম করে দিয়ো।
মুখের কথাটা একপ্রকার ছিনিয়ে বলল তাহমিদ। এতটুকু খেয়াল করল না তার এই জোরপূর্বক হম্বিতম্বি কিছু মেয়েরা ‘বোল্ড অ্যাটিটিউড’ ভেবে খুশি হলেও শাওলিনের কাছে এটা গুরুত্বই পাচ্ছিল না। তাহমিদ ওর চুপচাপ নীরবতাকে নিজের জন্য ‘প্রভুত্ব’ ভেবে দাম্ভিক ভাবে হাসলো। পা চালিয়ে ক’হাত দূরে রিকশার স্ট্যাণ্ডে রিকশা ঠিক করতে থাকলে শাওলিন দুহাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল। চামড়া পোড়া অসহ্যকর গরম। গরমে সমস্ত মুখ পাংশুবর্ণ। বোতলের পানিটুকু রূপনগরেই শেষ, নয়ত এক ঢোক পানি ওর গলা ভেজাতে পারতো। কপালের দুপাশে চুল ভিজে অস্বস্তিকর একটা খারাপ লাগছে। উজ্জ্বল ত্বকের গালদুটোতে টকটক করা লালচে ছোপ। তবু উৎকট গরমকে মন থেকে ভুলিয়ে একজোড়া অশান্ত বিহ্বল চোখ খুঁজছে সেই চিরকুটদাতাকে। কিন্তু চিরকুটদাতা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া জাদুকর। সে জাদুকর এখানে কোথাও নেই। এমন সময় তাহমিদের আরেক ডাকে ভ্রম ভেঙে টুকরো হল শাওলিনের। পা সচল করে রিকশায় উঠে হুড তুলতে তুলতে শেষবারের মতো আরেকবার চোখদুটো সবদিকে বুলিয়ে দেখল। ওর সন্ধানীসুলভ চাহনি তাহমিদের তীক্ষ্ম নজর থেকে এবারও বাঁচলো না। ভ্রুঁ কুঁচকে সবদিক নজর ঘুরিয়ে ওর উদ্দেশ্যে এবার বলে বসলো,

– আবারও বাস খুঁজছ?
অমন প্রশ্নে আরেকটু হলে ফিক করে হেসে দিতো শাওলিন। কিন্তু নিজের অভিব্যক্তি ভীষণ নির্বিকারই রাখল। বুঝতে দিতে চাইল না ওর ক্লান্ত চোখ, ঘর্মাক্ত লাল মুখ এই জায়গার প্রতিটি কোণ তন্ন তন্ন করে ‘জাদুকর’ খুঁজছে; কোনো বাস না। তাহমিদের দিকে মাথাটা ডানে-বাঁয়ে ধীরভাবে নাড়িয়ে একটা অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
– কিছু খুঁজছি না। সন্ধ্যায় এ জায়গাটা কেমন অদ্ভুত দেখায় সেটাই লক্ষ করছিলাম। ওদিকে একটা ফুলের দোকান আছে দেখলাম . . ছোটো। ঢাকায় যে কাঠগোলাপের অমন বিশাল, বড়ো, বেশ ভারি ভারি কিছু তোড়া বিক্রি হয় সেটা এই প্রথমবার দেখলাম। ঠিক আছে, আসি।
– যাও তাহলে। সাবধানে ধরে বসো।

রিকশাটা বেশ জোর গতিতে মসৃণভাবে বহুদূর চলে গেল। যে পর্যন্ত রিকশাটার শেষ চিহ্ন দৃষ্টিসীমা থেকে দূর না হলো, সে পর্যন্ত তাকিয়ে থাকল কেউ একজন। সেই হিম, সেই অবিচল, সেই শীতল দৃষ্টিজোড়া আজ অদ্ভুত নীরব চোখে তাকিয়ে আছে। সেই নীরব চাহনির অতলে কী পরিমাণ ব্যর্থতা, খারাপ লাগা, শূণ্যতা ছেয়ে আছে, তা রাতের আকাশও যেন বুঝে উঠতে পারল না। সুগন্ধি কাঠগোলাপের মিষ্টি খুশবু তার হাতে লেগে আছে। তার প্যান্টের বাঁ পকেটে ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স আছে। তার বুকের পাঁজরে খাঁচাবন্দি একটা অস্থির হৃৎপিণ্ড আছে। সবই থেকে ব্যর্থতার গ্লানি মেখে। কাঠগোলাপের গোল গোল বিশাল তোড়াগুলো দোকানেই পড়ে থাকল। ফুল বিক্রেতা তিনগুণ দাম বহু আগেই পেয়ে গেছে। ফুলগুলো পচলেও কী!
তাহমিদ আশেপাশে শেষবারের মতো নজর বুলাল নিজের পর্যবেক্ষণ দৃষ্টিতে। কিন্তু ফলাফল নেতিবাচক। কানে ছোট্ট একটা ব্লুটুথ ডিভাইস গোঁজা ছিল এতোক্ষণ যাবৎ। নীল আলোতে সেটা সক্রিয় হলে তাহমিদ হতাশকণ্ঠে ভারিশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগল,

– রেজাল্ট নেগেটিভ। প্রাইম সাসপেক্ট এখানে আসেনি। এলে তাহমিদ মর্তুজার চোখ ফাঁকি দেবার সুযোগই পেতো না। বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে পৌণে সাতটা পর্যন্ত স্ট্যাণ্ডবায় আছি। রাস্তার খুঁটিনাটি সব আমার নখদর্পণে। কেউ নেই, কিচ্ছু নেই! সে যেন অবসিডিয়ান ভেইন। যে ডাটাগুলো পাঠানো হয়েছে, সেগুলো ফোর্থ টাইম ভুল। ফার্মগেট এরিয়ায় তো আসেইনি, উলটো আমরাই ধাপ্পা খেয়ে বসে আছি।
কথাগুলো যখন তীব্র চোটপাট থেকে ফুঁসে ওঠে বলছিল তাহমিদ মর্তুজা, তখন তারই কয়েক হাত সামনে একটা দোকান থেকে হাফ লিটার পানির বোতল কিনল কেউ একজন। সমস্ত বেশভূষা যেন অন্ধকারকে জাগিয়ে দিচ্ছে। তার মজবুত ভারি দেহ কালো টিশার্টে ঢাকা। কালো ফর্মাল ট্রাউজার প্যান্ট পরা। মাথায় কালো সানক্যাপ, বাঁহাতে বড়ো ডায়ালের কালো চামড়ার ঘড়ি। মুখের অর্ধেকটা কালো রঙের সার্জিক্যাল মাষ্কে ঢেকে আছে। চোখের চশমাটা এবার খানিকটা বদলানো। রিমলেস ফ্রেম, একদম চিকন ডাঁটের চশমা নেই। চোখে শোভা পাচ্ছে কালো ফ্রেম, চারকোণা কাঁচের চশমা। এমন সময় তিন-চারটে তরুণী হৈচৈ হট্টগোল করতে করতে দোকানটার সামনে জড়ো হল। কিছু চকলেট ও আইসক্রিম কিনতে দাঁড়িয়েছিল। একঝলক বাঁয়ে থাকা সেই সুদীর্ঘদেহী সৌষ্ঠব্য পুরুষের দিকে তাকাল একজন। দোকানের উজ্জ্বল আলোয় যেটুকু সেই দেখতে পাচ্ছে লোকটার, তাতে মনের অজান্তে শুকনো ঢোক গিলল এক তরুণী। কনুই গুঁতা দিয়ে পাশেরজনকে তাকানোর ইঙ্গিত বোঝাল দ্রুত। দ্বিতীয় তরুণী ব্যথা পেয়ে কটমট দৃষ্টিতে তাকালে এবার ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যাপারটা ধরতে পারল। বাঁয়ে দাঁড়ানো সেই লোকটার দিকে তাকালে বেশ অভিভূত চোখে জোরে নিশ্বাস আঁটকালো। চকিতে প্রথমজনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে একদম ফিসফিস স্বরে বলল,

– ভয়ংকর! পুরো আপাদমস্তক ভয়ংকর! একদম কোল্ড ব্লাডেড হিউম্যান মনে হচ্ছে। মুখটা পর্যন্ত কালো মাষ্কে কভার। এই এলাকায় আগে কখনো দেখেছিস? হু ইজ হি?
প্রথমজন নৈর্ব্যক্তিক সুরে তেমনি ফিসফিস কণ্ঠে বলল,
– না দেখিনি। ভাগ্যিস সিনথিয়ারা আজ আমাদের সাথে আসেনি। নাহলে ও একটা যা অবস্থা করে ফেলতো ভাই!
– নাম্বারটা জোগাড় করব নাকি?
দুষ্টুমির ইঙ্গিতে বাঁ চোখটা টিপলো প্রথম তরুণী। সাথে সাথে বেমক্কা ব্যথায় চোখ কুঁচকে ঠোঁট মুদিয়ে ফেলল সে। পেটের বাঁদিকে দ্বিতীয় তরুণীর আগ্রাসে কনুই খোঁচাতে ভালো ব্যথা পেয়েছে। দু সেকেণ্ড হজম করার পর তীক্ষ্মকণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
– হোয়াট দ্য ফা- ! কেন মারলি? এরকম করলি কেন তুই? তোর যে জেলাসি বাটন অন হয়ে যাচ্ছে তা কী বুঝিনি মনে করেছিস!

– একদম কানের নিচে লাগাব। যদি ইনি পুলিশের কেউ হয়? দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা দেখেছিস? ধরা খেলে সোজা বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে। শুনেছি ডিফেন্স ইউনিট এরকম ব্ল্যাক সিভিল ফর্মে ঘোরাঘুরি করে। ওদের পেশাই ওসব। ওদের কেউ হলে তখন কী করবি?
মুখে চুন পড়ার পর চুপসে গেল তরুণী। আর কোনো কথা বলল না। আড়নজরে আরেকবার তাকাল বাঁদিকে। দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা সত্যিই চোখ স্থির করে দেয়ার মতো। পেশিবহুল পিঠের শিরদাঁড়াটা যেন পুরোপুরি সটান। কোথাও এতটুকু ঢিলে ভাব দৃশ্যমান নয়। তরুণী গলায় শুষ্ক ঢোক গিলে সায় জানিয়ে বলল,
– তোর কথা শুনে আমারও তাই মনে হচ্ছে। এতোক্ষণ এটা খেয়াল করিনি। যেটা বলছিস সেটাই হাণ্ড্রেড পার্শেন্ট হতে পারে। সামনেই তো রাজারবাগ। আর তাছাড়া—
বাকিটুকু বলার পূর্বেই মুখের কথা ছিনিয়ে নিল তৃতীয়জন। সে যেন আরো উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে দ্বিতীয়জনের কানের কাছে মুখ এনে বলল,

– সব শোনা যাচ্ছে গাঁধাগুলা। এভাবে যদি ফিসফিসিয়ে কথা বলিস তোদের কাছে মাফ চাচ্ছি, আর কথাই বলিস না। তোদের কাকের মতো গলা দিয়ে জীবনেও ফিসফিস বের হবে না।
প্রতিটি কথাই মনোযোগ সহকারে শুনছিল সেই কালো পোশাকধারী। বাঁ পকেটের ভেতর ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স। পকেটে হাত পুড়ে সেটাই নাড়াচাড়া করছে সে। বৃদ্ধাঙুল বারবার স্পর্শ করছে কাঠের উপর খোদাইকৃত অক্ষরগুলো, F –A –R –S –H –A –D । তার মন ও ইন্দ্রিয় দুটোই বেশ সজাগ। দোকানে খদ্দেরের ভীড় তুলনামূলক বেশি থাকায় একটু পেছনের দিকে অপেক্ষা করছে সে। কিন্তু তার মতো আরো একদল অপেক্ষারত তরুণী যে তাকে নিয়েই গরম আলাপ করছে, তা বুঝতে একটুও কসরত করতে হয় না। চতুর্থ তরুণীটি তখন টাকা মিল করতে নিজের ব্যাগ খুলে হিসেব নিকেশ করছিল। এমন সময় চারপাশ সচকিত করে ফোনের রিংটোন বাজতে শুরু করল। মেয়েটা তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হঠাৎ হাত ফসকে চোখের অলক্ষ্যে একটা নোট গড়িয়ে দেয়। সেটা যে মাটিতে পরে অন্ধকার ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছে, সেটা পথচারী ও মেয়েটার চোখে পড়ল না। আড়নজরে নোটের ওপর তাকালে ধূর্ত বুদ্ধির মালিক হঠাৎ একটা বুদ্ধি ঠাওরে ফেলল। নীল চোখজোড়া একবার চতুর্থ তরুণীর দিকে ফেলল, এরপর ঘুরিয়ে আনল রাস্তার ওপর ধূলোয় শোয়া নোটের দিকে। এককদম ধীরগতিতে পিছিয়ে গেল ধূর্ত ব্যক্তি। কেউ দেখল না তার ভাবভঙ্গি। সকলেই নিজ নিজ স্থলে ব্যস্ত, মগ্ন, বেখেয়াল। বেখেয়ালিপণার সুযোগ নিয়ে আরো দু কদম একইভাবে ধীরেসুস্থে পেছালো শোয়েব ফারশাদ। পৌঁছে গেছে নির্দিষ্ট জায়গাটার কাছে। সেই তরুণী ব্যস্তভঙ্গিতে অন্যপাশে মুখ ফিরিয়ে কথা বলছে। ব্যস, চট করে ডানহাত নিচে নামিয়ে নোটটা গায়েব করে ফেলল ধূর্ত ব্যক্তি। বিশাল এক থাবার মুঠিতে মুচড়ে ফেলল নোটটা। কেউ দেখল না, কেউ বুঝল না, এবার শোয়েব দোকানদারের দিকে তাগাদার উদ্দেশ্যে গলা বাড়াল,

– হাফ লিটার পানি দিতে যদি একঘণ্টা লাগান, তাহলে অন্য দোকানে রাউণ্ড দিতে হয় দেখছি। থাকব নাকি যাব? সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন একটা।
কথার চাপা কৌশলে সঙ্গে সঙ্গে ফাঁদে পড়ল তরুণীর দল। চারজনই মুহুর্তের ওই গমগমে ভরাট কণ্ঠ শুনে পূর্ণমাত্রায় সচকিত। ফোনে কথা বলা বাদ দিয়ে সেই তরুণী বিরক্তিতে গলা বাজিয়ে বলল,
– আঙ্কেল! আমরা তো সেই কখন থেকে আইসক্রিম আর চকলেটের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। আমাদেরগুলো দিয়ে দেন, চলে যাই। যারা ভাঙতির জন্য দাঁড়িয়ে আছে, তাদের নাহয় একসাইড করুন। আমরা আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব?
এরপরই দোকানদারের ভেতর ত্রস্তভঙ্গিতে হাত চালানো দেখা গেল। হাফ লিটার বোতল যখন শোয়েব পেল, তখন খেয়াল করল চতুর্থ তরুণী অস্থিরচিত্তে পুরো ব্যাগ হাতড়ে চলেছে। দোকানদার বিরক্ত সুরে বলছে,
– ইট্টু আগে আফনেই না চিল্লায়া মার্কেট কাঁপাইলেন? এহন আফনের কাছেই দুইশো ট্যাকার ভাঙতি ট্যাকা নাই? আজকে আমার ক্যাশে ভাঙতি নাই আফা। যান, অন্য দোকানে ভাঙতি আছেনি দ্যাখেন।
চারটে মুখ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেছে। ওদের কারো কাছেই এক হাজার টাকার ভাঙতি নোট নেই। নাজিফার কাছে দুশো টাকার একটা নোট ছিল। মিনিট দুয়েক আগে ব্যাগেই দেখল। ওটা নাকি আর ব্যাগে নেই! নোটটা কোথায় গেল? কোথায় হারালো! এমন সময় ওদের দিকে কেউ একজন একটি পলিথিন ব্যাগ বাড়িয়ে ধরল। তাতে আইসক্রিম ও চকলেট শোভা পাচ্ছিল। চারজোড়া চোখই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলে প্রথম তরুণী আমতা আমতা কণ্ঠে বলে উঠল,

– আপনি এ-এগুলো কী করলেন? এগুলো কিনে আনলেন কেন? আমাদের কাছে তো ভাঙতি নেই।
ঢাকার পশ সোসাইটির চার তরুণীর ব্যাকগ্রাউণ্ড চিনতে দেরি হয়নি শোয়েবের। বুঝতে পেরেছে এদের মধ্যে চিকন বুদ্ধির আধিক্য কম আছে। নয়ত বুঝে যাবার কথা একটু আগে কী কাণ্ডটা ঘটিয়েছে সে। আবেগবর্জিত ভঙ্গিটা অটুট রেখে হিম স্থিরতা বজায় রেখে বলল,
– বিপদে পড়লে সাহায্য করাই তো নিয়ম। ধরে নিন সামান্য সাহায্য করেছি। বাইরে বেরোলে ভাঙতি নিয়ে বেরোবেন। নয়ত কখন কে বিপদে ফেলে দিবে, বলা যায় না।
কথাটা বলেই পা ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল শোয়েব ফারশাদ, এমন সময় পেছন থেকে ডাক দিয়ে উঠল আরেক তরুণী। মুখটা কালো মাষ্কে ঢাকা বলে শোয়েবের ঠোঁটে তেরছা হাসিটা দৃশ্যত হল না। “কাজ হয়েছে!” মনে মনে নিজেকেই প্রবোধ দিল ধূর্ত শীতল বন কর্মকর্তা। শোয়েব ফের ঘুরে দাঁড়াতেই দ্বিতীয় তরুণী সামনে এগিয়ে বলল,
– যদি কিছু মনে না করেন, তবে আমরা টাকাটা আজই ফেরত দিতে চাই। আমাদের কাছে তো টাকা আছেই, শুধু ভাঙতি নেই। আপনি এক কাজ করুন, আপনার একটা বিকাশ নাম্বার দিন। বাকিটা আমি দেখে নিতে পারব। প্লিজ, মানা করবেন না। রিকুয়েস্ট করছি!

মুখে কালো মাষ্কটা না থাকলে নিচের অধরে দাঁত চেপে হাসার ভঙ্গিটা দেখতে পেতো তরুণীটা। কিন্তু বাইরে থেকে চোখদুটো অভিব্যক্তিহীন নিষ্ঠুর দেখাল। যেন কিছুই হচ্ছে না লোকটার ভেতর। লোকটা দু সেকেণ্ড নিশ্চুপ থেকে ভাবনাচিন্তা করছে, এমন একটা বুদ্ধিদীপ্ত ভাব ফোটাল। এরপরই ধীর গলায় নাম্বারটা একটানে বলে গেল। তরুণীটা নাম্বারটা পেয়ে এমন হাসিটাই দিল, তাতে মনে হচ্ছিল এভারেস্টের চূড়োয় বাংলাদেশি পতাকা গেঁড়ে এসেছে। এদিকে মোচড়ানো নোটটা এক ফাঁকে টানটান করে ওদের কাছেই ফেলে এল শোয়েব। কাজ শেষ। জায়গাটা নির্ভীক চিত্তে ছেড়ে দিতেই বেচারা তাহমিদকে দূর থেকে একঝলক দেখতে পেল। গরমে ঘেমে কাউকে ফোনের ভেতর গালাগাল করতে ব্যস্ত। চতুর্থবার এক নৃশংস ঘাতককে খুঁজতে ব্যর্থ মর্তুজা। আর দাঁড়াল না শোয়েব, পা দুটো সচল করে তাহমিদের চোখের সামনে দিয়েই প্রস্থান করল ফার্মগেট।

বাসায় ফিরে সামান্য কিছু খেয়ে গোসলটা সেরে নিয়েছে শাওলিন। শীতল পানিতে স্বস্তি পেয়েছে গরমে অতিষ্ঠ মন। সরু কোমরটাকে ছুঁয়ে আরো একটু নিচে নেমেছে ঢেউ খেলানো কেশের দৈর্ঘ্য। পিঠের হালকা গোলাপি জামাটা ভিজে গেছে তার জন্য। একটা শুকনো টাওয়েল নিয়ে লম্বা, বেশ ঘন, টুপ টুপ করে পানি গড়ানো চুলগুলোকে প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে মাথায় উঁচু করে তুলে রাখল। শাওলিনের রুম থেকে বেরুলেই বেশ বড়ো ডাইনিং এরিয়া, এরপর দুটো পাশাপাশি বেডরুম। সেখানকার একটি বেডরুম থেকে রেবেকা ও জোহরার সান্ধ্যকালীন কথোপকথন ভেসে আসছে। সবটাই রেবেকার কর্মজীবনের ঝুট ঝামেলা ও শিক্ষার্থীদের সাথে নানা ঘটনার আবহ নিয়ে। গল্পগুচ্ছ বইটা তুলে আসমানি রঙের চাদর বিছানো শয্যায় উঠে বসলো শাওলিন। পিঠটা দেয়ালের বুকে হেলান দিয়ে কোলে একটা নরম কুশন তুলে নিল। বইটা সবে খুলেছে ও, একপাতা থেকে এক বাক্য পড়েছে, এমন সময় বিছানার এক কোণা থেকে টুং শব্দ বেজে উঠল। নোটিফিকেশনের মৃদু শব্দযুক্ত আগমন। ফ্যানের বাতাসে খসমস করে বইটার পাতা উড়তে থাকলে এক হাত দিয়ে ফোনটা টেনে আনলো শাওলিন। ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই কপালে সহস্র কুঞ্চন জমা হল। এ কী! বিকাশে টাকা? কে দিল টাকা? ওর নম্বরে কীসের টাকা এসেছে? কী ভূতুড়ে ব্যাপার! টাকার পরিমাণ দেখতে পেল দুশো টাকা। একটা সেণ্ডার নাম্বার দেখতে পেল এক কোণে। ভাবল কল একটা দিবে কিনা। অন্তত জানা দরকার এটা কীসের টাকা। ভুলক্রমে এসে থাকলে টাকাটা অবশ্য ফেরতযোগ্য। যেই ভাবা সেই কাজ বলে দ্রুত নাম্বারটায় কল দিল ও। ওপাশ থেকে দুবার রিং হতে না হতেই এক মেয়েলি কণ্ঠ ভীষণ রসপূর্ণ আমেজ নিয়ে মিষ্টি করে বলল,

– হ্যালো, টাকাটা কী পেয়েছেন? আমি আপনার টাকাটা বেশ যত্ন করে পাঠিয়ে দিয়েছি। দেখুন এমাউন্টটা ঠিক আছে কিনা।
সর্বোচ্চ সীমায় উজবুক বনে গেল শাওলিন। শুধু হা হয়ে থাকল কিয়ৎক্ষণ। ঠোঁটজোড়া এমন ভঙ্গিতে ফাঁক হল যে, কয়েক সেকেণ্ড বুঝতেই পারল না কী ঘটছে! শাওলিন তৎক্ষণাৎ নিজের তেজি মেজাজে টানটান হয়ে প্রশ্ন করে উঠল,
– কে আপনি? আপনি কীসের টাকা পাঠিয়েছেন? আপনাকে কে বলেছে দুশো পাঁচ টাকা পাঠাতে? আশ্চর্য তো! হ্যালো, হ্যালো!
ওপাশ থেকে হঠাৎ করেই সুনশান অবস্থা শুনতে পেল। একবার মনে হল কলটা বুঝি কেটে গেছে। তাই কান থেকে ফোনটা নামিয়ে দেখল শাওলিন, কিন্তু না। কল তো কাটেনি। দিব্যি কলের ডিউরেশন দেখাচ্ছে। শাওলিন এবার ফোন কানে চেপে এক ধমক দিয়ে বলল,
– কী হলো! কথা বলছেন না কেন? কে আপনি? কী জন্যে আপনি টাকা পাঠিয়েছেন?
এবার যেন ওপাশ থেকে সাড়াশব্দ ভেসে এল। হিমজমাট নীরবতার পর রসপূর্ণ আমুদে গলাটা এবার ফ্যাসফ্যাসে সুরে তোতলার মতো শোনাল,

– আপ-প-পনি কে আপু? ক-ককে?
– এটা তো আমিও জানতে চাই। আপনি কে? কেন অচেনা নাম্বারে সমস্যা করেছেন?
ওপাশ থেকে আরো একস্তর কণ্ঠ খাদে নামলো। তোতলানো কণ্ঠটা একটু ধাতস্থ হয়ে বলল,
– আপনি কী ওই পুলিশের বউ হন আপু?
আকাশ থেকে কড়কড় করে একটা বাজ ওর মাথায় ভাঙলো। বলে কী! পুলিশ এল কোথা থেকে? কীসের বউ? চড়চড় করে মেজাজের পারদ উচ্চেই চড়ে যাচ্ছে! শাওলিন বেশ কসরত করে রাগটাকে সামাল নিয়ে দুবার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
– দেখুন, আমি একদমই ঠাট্টা করার অবস্থাতে নেই। আপনি কে প্লিজ এটা বলুন। আপনি কী করে নাম্বার পেয়েছেন হেঁয়ালি বন্ধ করে সরাসরি জানান।
ওপাশ থেকে ঢকঢক করে কিছু পানের আওয়াজ পেল। বোধহয় একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি মেয়েটা এক চুমুকে খেয়েছে। একটু সুস্থির হয়ে আবারও বলে উঠল মেয়েটা,

– আপু, প্লিজ রাগ করবেন না। একটু আগে এই নাম্বারে বিকাশ করা হয়েছে। এই নাম্বারটা কী আপনার? আপনার নামটা কাইণ্ডলি জানা যাবে প্লিজ? প্লিজ মানা করবেন না! অনেক জরুরি এটা!
মেয়েটার কথা শুনে অস্বাভাবিক কিছুর হাবভাব পেল শাওলিন। একটু আগের বিরক্তিটা জলবৎ তরলং করে ভীষণ শান্তভাবে বলল,
– আমি শাওলিন। কলাবাগান থেকে বলছি। আপনি কোথা থেকে বলছেন আপু? আমার নাম্বারটা আপনি কী করে পেয়েছেন?
এবার যেন পুরো ঘটনা পানির মতো স্বচ্ছ হতে শুরু করল। ওপাশ থেকে অচেনা অদ্ভুত মেয়েটা নিজের পরিচয়, যাবতীয় ঘটনা, সন্ধ্যার সেই দেবদূত ব্যক্তির সাহায্য, সমস্তই একে একে খুলে বলতে লাগল।

– আমি মোনা। আমি ফার্মগেট থেকে বলছিলাম আপু। সন্ধ্যার দিকে একটা লোক, যিনি বেশ ভীষণ অদ্ভুতই বলা চলে, ওসময় আমাদের হেল্প করেছিলেন। ভাঙতি টাকা ছিল না, তাই তিনি আমাদের অবস্থা দেখে এগিয়ে আসেন। আমরা তাকে বলেছিলাম একটা বিকাশ কন্টাক্ট দিতে। পরে যদিও আমার বান্ধবি ওর হারানো নোটটা রাস্তাতেই খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু যিনি আমাদের হেল্পটা করলেন, তাকে তার পাওনাটা ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম। তাই উনি আমাদের এই নাম্বারটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এই নাম্বারটা নাকি একপ্রকার উনারই। সবসময় মুখস্ত থাকে। তাই এটাই দিলেন। আমি ভেবেছিলাম এটা মেবি উনার পার্সনাল নাম্বার।
সম্পূর্ণ ঘটনা শোনার পর মাথার উপর সশব্দে একটা বজ্রঘাত হল। কোনো কথা বলতে পারল না শেহজানা আলম। কান থেকে আস্তে আস্তে ফোন নামিয়ে হতবাক মুখে স্তব্ধ অবস্থায় বসে রইল। বুঝতে আর একবিন্দুও বাকি রইল না, আজ সন্ধ্যায় কার পদচারণা ফার্মগেটে ছিল। চিরকুটটা একবিন্দু মিথ্যে ছিল না! কথাগুলো ফাঁকা বুলিও ছিল না! ফোনটা পুনরায় কানে ঠেকাল শাওলিন। কণ্ঠের স্তব্ধতাটুকু ঢাকা দিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– পরনে কালো স্যূট, সাদা শার্ট এরকম কিছু ছিল?
– না আপু। পরনে কালো টিশার্ট, কালো গেটআপ, পুরোপুরি ব্ল্যাক আউটফিটে ছিল।
এবার যেন স্বস্তি মাখানো শ্বাসটা ছাড়তে লাগল শেহজানা আলম। যাক, বাসে যে ব্যক্তি ছিল তার সঙ্গে মিলেনি এটা। কালো স্যূট, সাদা শার্ট পরা ছিল। আর এখানে বলছে কালো টিশার্ট, কালো গেটআপ, কালো আউটফিট। মাথাটা ঝাঁকা দিয়ে প্রসন্নবোধক স্বস্তির আভাসে একটু একটু ঠাণ্ডা হয় শাওলিন। কিন্তু ঠিক তখনি ওপাশ থেকে শেষ বোমাটা যেন বিস্ফোরণ ঘটালো,

বজ্রমেঘ পর্ব ২০

– ওহ হ্যাঁ, আরেকটা কথা আপু। উনি চশমা পরা ছিলেন। আর উনার চোখের রঙটা ছিল নীল।
কান থেকে পুরোপুরি ফোনটা এবার নামিয়ে ফেলে শাওলিন। ব্যাপক পরিমাণ স্তব্ধতা গ্রাস করেছে ওকে। বুকের ওঠা-নামা ভয়ংকর গতিতে বেড়েই চলেছে। নিঃশ্বাসের ছন্দ প্রচণ্ড অস্থির অশান্ত বেগতিক হচ্ছে। শাওলিন বুঝতে পারছে না, কেন ওর ফোনে একটা কল করছে না? বাসার ঠিকানা নিখুঁত জানা থাকা থাকলে, এখানে কেন আসছে না? ওই চিরকুট তবে মিথ্যে ছিল না!

বজ্রমেঘ পর্ব ২১ (২)