রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৫ (২)
সিমরান মিমি
শেরে-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ, বরিশাল। হস্পিটাল চত্বরে
মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের বাইরে নির্জীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্পর্শীয়া। দৃষ্টি সম্মুখের গেটের দিকে। শত শত মানুষ এলোমেলো ভঙ্গিতে ছুটছে। কারো হাতে রিপোর্টের ফাইল, কারোর হাতে ওষুধের ব্যাগ, আবার কেউ বা খাবার কিনছেন খাওয়ার জন্য। কারো মুখশ্রীতে চিন্তার ছাঁপ, আবার কেউ বা প্রিয়জন হারিয়ে পাগলপ্রায় অবস্থায় বিদায় নিচ্ছেন। স্পর্শীয়া ঝিম মেরে দেখতে লাগলো সেসব। সে চিন্তিত, ঘটনার পর ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে তাকে। অথচ কোথাও নেই কোনো উত্তর। কাউকে জিজ্ঞেস করার মতোও সুযোগ নেই।
সময় গড়াচ্ছে তার নিজস্ব গতিতে। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় এগারোটা। অথচ সে এখনো বরিশালে। এতোক্ষণে তাকে খুঁজতে নিশ্চয়ই দিশেহারা হয়ে গেছে সোভাম। সকালের তাড়াহুড়োয় ফোন টাও আনা হয় নি। এদিকে নিজে থেকে যে সোভাম কে ফোন দিয়ে অবস্থান জানাবে সে সুযোগ টুকুও নেই। দিশার সাথে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পর পরই সিম পাল্টেছে । ফলস্বরূপ পূর্বের নাম্বার টাও অকেজো। এমন বিপদে পড়ে যাবে ভাবলে নতুন নাম্বার টা কবেই মুখস্ত করে ফেলতো।
খলিলুর সরদার রেগে আছেন। যেহেতু তার ভাই স্পর্শীয়াকে যেতে দিতে বারণ করেছেন, তার মানে কোনো না কোনো অঘটন স্পর্শী ঘটিয়েছে। সে জন্যই এক প্রকার জোর করে ধরে রেখেছেন। শামসুল সরদার সুস্থ হয়ে কারন না জানানো পর্যন্ত যেতে দেবেন না স্পর্শীকে। মেনে নিয়েছে স্পর্শী। তার ও জানা প্রয়োজন, কেনো তিনি এভাবে হাইপার হয়ে গেলেন নাম শুনে। আর মায়ের নাম ও বা কিভাবে জানলেন? কেনোই বা মৃত্যুপ্রায় অবস্থাতেও তাকে যেতে বারণ করেছেন। আর তাছাড়াও, মুমূর্ষু একজন লোক তাকে পাশে চাইছে, এই অবস্থায় স্পর্শী কিভাবেই বা যাবে? সব মিলিয়ে খলিলুর সরদারের কথা মেনে নিয়ে বসে আছে। সে যে তাদের সাথে আছে, এ কথা সোভাম কে জানিয়ে নিশ্চিন্ত করার জন্যেও অনুরোধ করেছে। সে সময় তাতে সম্মতি দিলেও এতো ছোটাছুটির মধ্যে আদৌ তা জানিয়েছে কি-না সে ব্যাপারে শঙ্কায় আছে স্পর্শী।
এই মুহুর্তে মেজাজ টা ভারী খারাপ হচ্ছে। এক মুহুর্ত ও থাকতে ইচ্ছে করছে না হস্পিটাল প্রাঙ্গনে। তাকে যেতেও দিচ্ছে না, অথচ কোনো আপ্যায়ন বা যত্নের ও ছিঁটেফোঁটা দেখাচ্ছে না। সেই সকালে বেরিয়েছে, অথচ এখন পর্যন্ত খায় নি। শামসুল সরদার কে নিয়ে হস্পিটালে আসা অবধি পাশে বসে ছিলো। এরপর আর তার পাত্তা নেই। তাদের নিজস্ব আত্মীয়, বাড়ির লোকেরা ক্রমে ক্রমে আসছেন, দেখছেন – শুধু অবহেলায় এক কোণে পড়ে আছে স্পর্শীয়া। হাতে একটা টাকাও নেই। অথচ ক্ষিধেয় পেট কামড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে আবারো দোতলায় গেলো। অচেনা, অপরিচিত লোক গুলোর কাছে টাকা চাওয়াটাও কতটা বিদঘুটে দেখায়!
শামসুল সরদারের জ্ঞান ফিরেছে অনেক আগেই। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের উপর হুট করে প্রভাব পড়ায় স্ট্রোক করেছিলেন। এখন অবস্থা স্বাভাবিক এবং শঙ্কামুক্ত হলেও ডাক্তার একাকী থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। অতিরিক্ত মানুষ নিয়ে বারবার দেখতে যাওয়াও নিষিদ্ধ। সারা দিন শরীরের ক্লান্তি এবং ওষুধের প্রভাবে ঘুমিয়েছেন। সেই ঘুম ভেঙেছে ঠিক আট টার দিকে। তারপর থেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন এখন পর্যন্ত। একটা টু শব্দও করেননি পর্যন্ত। নিশ্চুপ হয়ে নিজের ধ্যানে শুয়ে আছেন। মস্তিষ্কে অনেক চিন্তা-ভাবনাই বিচরণ করলেও মুখে নেই কোনো শব্দ। চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে একের পর এক মুখ। প্রথমে পিপাসা, এরপর সোভাম, অবশেষে স্পর্শীয়া। ‘আমার বাবা আসলেই একটা অমানুষ ‘ — বাক্যটা তার হৃদয়কে নাড়িয়ে তুলছে। ভেতরে ভেতরে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। সোভাম তাকে এতো ঘৃণা করে? এতোটা! আচ্ছা, সে কি জানে বাবার পরিচয়। জেনে থাকবে নিশ্চয়ই! প্রথম পরিচয় পর্ব থেকেই সোভামের চোখে অপ্রকাশিতে এক ঘৃণা দেখে এসেছে নিজের প্রতি। বিগত কয়েক দিনের ঘটনা গুলো ভাবতেই হৃদয় বিষাদে ছেয়ে যাচ্ছে। ভয় হচ্ছে, করুণা হচ্ছে নিজের প্রতি। স্ত্রী তো সেই কবেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এখন ছেলেমেয়েরাও ঘৃণা করে? এতোটা ঘৃণ্য লোক তিনি? কিন্তু কি করেছেন ঘৃণার মতো? কেউ বুঝতে চেয়েছে কখনো? জানতে চেয়েছে কারন। অথচ না জেনেও ঘৃণা করছে, অপমান করছে, পরিচয় লুকাচ্ছে।
নিজেকে পরপর প্রশ্নবিদ্ধ করছেন শামসুল সরদার। বাইরেটা শান্ত, নিস্তেজ থাকলেও ভেতরে উথাল-পাতাল ঢেউ! কষ্টে, যন্ত্রণায় জীর্ণ শীর্ণ হয়ে পড়েছে কলিজা। চোখ দুটো জ্বলে উঠলো। কিছু গরম অশ্রু বেয়ে পড়লো দুপাশ থেকে।
এতোক্ষণে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলেন খলিলুর সরদারে। টুল টেনে বিমুর্ষ হয়ে পাশে বসলেন। বড় ভাইয়ের চোখ ভেঁজা দেখে পকেট থেকে টিসু বের করলেন। যত্ন নিয়ে মুছে দিলেন অবলীলায়। শীতল চাহনিতে তাকিয়ে ছোটো করে জিজ্ঞেস করলেন,
– ভাইজান, বুকে ব্যথা করছে? কথা বলতে কি কষ্ট লাগছে কোনো?
শামসুল চোখ ঘুরিয়ে খলিলের দিকে তাকালো। নিস্তেজ, নিস্তব্ধ দিঘির ন্যায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড… পার হওয়ার পর ক্ষীণ, অস্পষ্ট গলায় প্রশ্ন করলেন,
– কয়টা বাজে?
দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করলেন খলিল। একটানা দু-তিন সেকেন্ড সময়ের সংখ্যাটির দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিলেন। ঝরঝরে গলায় বললেন,
– বারোটা বাজতে সাত মিনিট বাকি।
লম্বা একটা সময়। সেই সকালে অসুস্থ হয়েছেন তিনি। আর এখন বাজে প্রায় বারোটা। এতোটা সময় কি মেয়েটা কাছে ছিলো তার? নাকি চলে গেছে। গেলেও কিভাবে গেছে? এতোটা পথ একা একা পার হতে পেরেছে কি আদৌ! ভেতরে চিন্তার রেশ জমা হতেই খলিলের দিকে তাকালো শামসুল। পুণরায় শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করলো স্পর্শীয়ার সম্পর্কে। বললো,
– মেয়েটা কি চলে গেছে?
– না, যেতে দেই নি। আপনিই তো ওকে যেতে দিতে বারণ করেছিলেন। তাই জোর করে রেখে দিয়েছি।
খলিলের কন্ঠে রাগ, ক্ষোভ স্পষ্টত। শামসুল চিন্তিত হলেন। বললেন,
– এতোটা সময় বসে আছে? কি খেয়েছে? নাকি না খেয়ে আছে এখনো?
তৎক্ষনাৎ ভ্রুঁ কুঁচকে ফেললো খলিল। ভাইজানের এমন চিন্তিত প্রশ্নে সে বিরক্ত। কন্ঠে একই ধারা বজায় রেখে বলে উঠলো,
– কি খাওয়াবো? আপনাকে নিয়েই তো চিন্তার শেষ নেই। আর তাছাড়া ওদের কে নিয়ে যখন হোটেলে খাইয়ে এসেছি, তখন মেয়েটাকে দেখি নি। চরকির মতো ঘুরছে চারদিকে। যেনো বড় সড় কোনো গোয়েন্দা। তবে আমি নিশ্চিত হাতে টাকা নেই, থাকলে এতোক্ষণে চলে যেতো।
হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন শামসুল। এই মুহুর্তে তার রাগ হচ্ছে না, বরং কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। সারাটা দিন না খেয়ে ছিলো মেয়েটা ভাবতেই হৃদয়টা দুমড়ে-মুচড়ে উঠছে। হাহাকার ভরা কন্ঠে বললো,
– অমানুষ! তোরা খেয়ে এসেছিস, আর মেয়েটা না খেয়ে বসে ছিলো।
– আপনার হুট করে ওই মেয়েটার জন্য এতো মায়া কেনো হচ্ছে, ভাইজান?
ভাইয়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না শামসুল। বিষাদে ভরা দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে নিলো। বললো,
– ওকে একটু ডেকে দিয়ে যা আমার কাছে।
পেটে ক্ষিধে থাকলে সবথেকে চড়াও হয় মেজাজ। সামনে থাকা বিরক্তিকর মানুষদের নাক ফাঁটিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। শরীর টা রাগে গিজগিজ করছে স্পর্শীয়ার। সারাদিন পর এই মাঝরাতে গিয়ে খলিলুর সরদার তার কাছে জানতে চাইছে, ক্ষিধে পেয়েছে কি-না? কি আহাম্মকের ন্যায় প্রশ্ন! সে উত্তর দেয় নি কোনো। চুপচাপ চলে এসেছে শামসুল সরদারের সাথে দেখা করতে।
কেবিনের সামনে এসে দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে রাগটা সংবরণ করার চেষ্টা করলো। আর যাই হোক, ভেতরের অসুস্থ লোকটার উপর রাগ দেখানো চলবে না। ধীর স্থির পায়ে শান্ত মেজাজে ভেতরে ঢুকলো। শামসুল সরদারের উন্মুখ হয়ে তাকে দেখছে। কাছে যেতেই ইশারায় টুল দেখিয়ে বসতে বললো। ইশশ! হুট করেই মায়া হলো স্পর্শীয়ার। যে লোকটা সকালেই তেজ দেখিয়ে স্পর্শীকে চেয়ারে বসতেও বলে নি, সেই লোকটাই কয়েক ঘন্টার পার্থক্যে নেতিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমনকি তার পাশে রাখা টুলে বসার জন্য তাড়া দিচ্ছে।
স্পর্শী মৃদু হেঁসে বসলো। জিজ্ঞেস করলো,
– এখন আপনার শরীর কেমন লাগছে, আংকেল?
‘আংকেল- ডাকটা শুনে বুকটা হাহাকার করে উঠলো শামসুলের। তবে তিনি নিশ্চিত স্পর্শীয়া তাকে চেনে না। কিন্তু কেনো চেনায় নি পিপাসা? এতোটাই ঘৃণা করে তাকে।
– তোমার বাবা কি করেন?
না চাইতেও পুণরায় একই কথা তুললেন শামসুল। বাবা সম্পর্কে স্পর্শীর ধারণা টা পেতে চান তিনি। যে সন্তানেরা তাকে ঘৃণা করে তাদের সামনে হুট করেই কিভাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরবেন? স্পর্শী এই প্রশ্ন শুনে চমকালো। অসুস্থ একটা মানুষ জ্ঞান হারানোর পূর্বে তার মায়ের নাম জেনেছে। আবার সুস্থ হওয়ার পরপরই বাবার বিষয়ে জানতে চাইছেন। কিন্তু কেনো? তিনি কি চেনেন স্পর্শীয়াকে? কৌতূহল দমাতে পারলো না। ধীর স্থির কন্ঠে বললো,
– বাবা পোশাকের কোম্পানিতে চাকরি করতেন। আমার জন্মের পূর্বেই মারা গেছেন, এক্সিডেন্টে।
হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো শামসুল। মারা গেছে! সে মারা গেছে? পিপাসা ছেলেমেয়ে দের কাছে এভাবেই তাকে গোপন করেছে। তার পরিচয় লুকিয়েছে, পেশা লুকিয়েছে। এতোসব ভেবে পুরোনো অভিমান টা আরো গাঢ় হলো। জানতে চাইলেন,
– দাদা বাড়ি কোথায়? সেখানে যাও না কখনো?
– বাবা এতিম ছিলেন। তাছাড়া তার কোনো সঠিক পরিচয় ও মা জানতেন না।
– ওহহ!
ছোট্ট শব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শামসুল। কতটা সুক্ষ্মভাবে ছেলেমেয়েদের দূরে রেখেছে সেই ভয়ংকর মানবী। অথচ আজও শামসুল তাকে ভুলতে পারে না, রাতে ঘুমাতে পারে না। বুকে ব্যথা হয়। স্ত্রী – সন্তানের প্রতি টান অনুভব হয়।
– আপনি কি আমার মাকে চেনেন?
স্পর্শীর কন্ঠে সন্দেহ। খানিকটা নয়, পুরোটাই নিশ্চিত সে। তারপরেও শামসুল সরদারের মুখ থেকে উত্তর পেতে চাইছেন তিনি। সন্দেহ, আশংকা তার মনেও কম নেই। শুধু হিসাব মিলাতে পারছে না। এ অবধি বাবার নামে অজস্র লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে। তবে বংশপরিচয় মিলে যাওয়া বা মায়ের সাথে পূর্বপরিচিত থাকা এই প্রথম। মনের মধ্যে সুক্ষ্ম সন্দেহের দানা বাঁধা ঘটনা সম্পর্কে ভাবতেও হোঁচট খাচ্ছে। এমনটা হওয়ার তো কোনো কারনই নেই। কেনো মা অকারণে কাউকে মৃত দেখাতে চাইবে। তবে বাবা সম্পর্কে খুব একটা জানে না স্পর্শীয়া। এ ব্যাপারে মা বড্ড চাপিয়ে গেছে। খুব একটা বিস্তারিত ভাবে প্রশ্নও করে ওঠা হয় নি। তিনি রেগে যান। এমনকি একটা ছবিও দেখান নি। জিজ্ঞেস করলেই নানা ছল ছুতোতে এড়িয়ে গেছেন, যেনো নাম টা শুনতেই তার শরীর জ্বলে ওঠে। যতটুকু জানা- শোনা হয়েছে, তা ভাইয়াই বলেছে তাকে। কিন্তু সোভামই বা কেনো মিথ্যা বলবে?
– হয়তো চিনি।
এই দায়সারা উত্তর স্পর্শীর পছন্দ হলো না। এমনিতেও হুট করে এসব ভেবে তার বুক ভার হয়ে গেছে। এই অসুস্থ লোকটার দিকে তাকালে মায়া হয়, ভীষণ! কারন গুলো ধোঁয়াশা, সন্দেহ গুলো অযৌক্তিক। তবুও কান্না পাচ্ছে। সে রেগে গেলো আকস্মিক। কিছুটা চিৎকারের সাথে বলে উঠলো,
– এটা কোনো উত্তর হতে পারে না। আপনি সরাসরি জবাব দিন। চেনেন আমার মাকে? কি করে নাম জানেন? পিরোজপুরে আমাদের কোনো সংযোগ নেই। তাহলে আমার মায়ের নামই বা কিভাবে জানলেন?
বাইরে থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কন্ঠগুলো অতি পরিচিত স্পর্শীর। সে চুপ হয়ে কান পাতলো। একে একে বুঝতে লাগলো মানুষগুলোকে – সোভাম, পাভেল, আর রিহান। হ্যাঁ, এই ছেলেটা শামসুল সরদারের ভাইপো। খলিলুর সরদারের বড় ছেলে। কিন্তু এতো রাতে সোভাম কি করে এখানে পৌঁছালো? তবে সে কি জানতে পেরেছে স্পর্শীর অবস্থান! জানলেও এভাবে চেঁচামেচি কেনো করছে? প্রশ্নপর্ব বাদ দিয়ে দ্রুত পায়ে বাইরে বের হলো স্পর্শী। রিহান পাভেল কে দেখে বেজায় ক্ষেপেছে। কিছুতেই ঢুকতে দেবে না ভেতরে।
দরজায় সামনে ঠায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্পর্শীকে দেখে ক্ষুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো সোভাম। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। ঢোক গিলে গলা ভেঁজালো স্পর্শী। সোভাম যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে, তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সে ভীত কদমে সাহস নিয়ে দু-পা এগিয়ে এলো। নরম, কোমল চাহনিতে ভাইয়ের হাত ছুয়ে শীতল কন্ঠে ডাকলো,
– ভাইয়া, ইচ্ছে করে আসিনি। উনি এতোটাই অসুস্থ ছিলেন যে ফেলে আসতে পারি নি। তাছাড়া আংকেল আমার হাত ধরে বসে ছিলেন, যেতে দিচ্ছিলেন না।
সোভাম স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। ভাবনা গুলো ওলোট-পালোট হয়ে যাচ্ছে। চিন্তায় কপালের শিরা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। শামসুল সরদার কেনো স্পর্শীর হাত ধরেছিলেন, কেনো যেতে দিচ্ছিলেন না অসুস্থ হওয়ার পরেও? ভাবতেই প্রবল ভাবে সন্দেহ হলো। ক্রোধে জর্জরিত শরীর টা মুহুর্তে’ই ভয়ে শীতল হয়ে এলো। তবে কি তিনি স্পর্শীকে চিনে ফেলেছেন? তাহলে এবারে কি হবে? সোভাম কি করে স্পর্শীকে এখান থেকে দূরে পাঠাবে? মা তো সম্পুর্ন ভাবে তাকে দোষারোপ করবে।
সোভামের আকস্মিক পরিবর্তনে স্পর্শীর সন্দেহ আরো দৃঢ় হলো। সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইকে আলতো ঝাঁকালো। কিছুটা কঠিন কন্ঠে জানতে চাইলো,
– ভাইয়া, উনি মাকে চেনেন। কিন্তু কিভাবে?
সেকেন্ডের গতিতে হাত ছাড়িয়ে নিলো সোভাম। প্রশ্নগুলো এড়িয়ে স্পর্শীর উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
– রাতেই ঢাকার গাড়িতে উঠতে হবে। আমিও যাবো। মা যেতে বললো। পাভেল, ও মনে হয় না খেয়ে আছে। কিছু খাইয়ে আনো, আমি আসছি।
কোনোমতে স্পর্শীর হাত ছাড়িয়ে কেবিনের মধ্যে ঢুকে পড়লো সোভাম। এক দৃষ্টে বাবার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলো। শামসুল সরদার মৃদু হাসলেন। জানতে চাইলেন,
– বাবাকে ঘৃণা করতে কি মা শিখিয়েছে?
কেঁপে উঠলো সোভাম। তার ধারণা কোনোটাই ভুল নয়। সব শেষ! এবারে স্পর্শীকে কি করে সামলাবে? শঙ্কায় হাত -পা ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। তবু বাবার সামনে কিছুই প্রকাশ করলো না। পাহাড়ের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
– চেষ্টা করেছিল, শিখতে পারি নি। তবে পিরোজপুরে আসার পর থেকে আর চেষ্টা করতে হয় নি। ঘৃণার পাহাড় জমে গেছে।
আহ! কতটা সাবলীল উত্তর। তবে এই দু লাইনের উত্তর টুকু যে বাবার পাজর গুলো ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে তা কি সোভাম জানে? শামসুল সরদার তারপরেও মলিন হাসলেন। বললেন,
– পরে আফসোস করো না। নিজেকে প্রশ্ন করো না – কেনো বাবার থেকে কিছু জানতে চাইলাম না। একতরফা ভাবে ঘৃণা কেনো করলাম?
উত্তর টা বড্ড ভারী। সোভাম নিতে পারলো না। এমনিতেও সময়টা থমকে গেছে। মনে হচ্ছে এসব কিছু দুঃস্বপ্ন।
কেনো এসেছিলো সে পিরোজপুরে? কেনো চাকরির থেকেও নিজের এলাকা, বাবাকে দেখার সাধ জেগেছিলো মনে? সোভাম জিভের ঢগা দিয়ে ঠোঁট ভেঁজালো। নিচু আওয়াজে জানতে চাইলো,
– স্পর্শীয়া কি জানে? কি বলেছেন ওকে?
সোভামের চোখে মুখে স্পষ্ট ভয়। পরিচয় লুকিয়ে রাখা দাম্ভিক মুখটা আজ চুপসে গেছে। শামসুল সরদার ছেলের কান্ডে হেসে দিলেন। কিছুটা তাচ্ছিল্য এবং অভিমান নিয়ে বললেন,
– আমার মেয়ে তোমার মতো বোকা নাকি?
‘আমার মেয়ে’ – শব্দ দুটোতে পূর্ণ অধিকারবোধ। যেটা সহ্য হলো না সোভামের। চেঁচিয়ে উঠলো অবিলম্বে। ক্রোধ নিয়ে বললো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৫
– এসব অধিকার ফলানো বন্ধ করুন। আপনাকে প্রয়োজন নেই আমার বা আমার বোনের। পরিচয় টুকু দিতেও অসস্তি হয়। কি করে চিনলেন ওকে? আদৌ কি চড়ুই জানে?
-“আমি কি জানবো?”
স্পর্শীর অভিমান মিশ্রিত কন্ঠের আওয়াজে পুরো রুম কেঁপে উঠলো। সোভাম থমকে গেলো পুরোপুরি। তার বোনের মুখটা কঠিন থাকলেও চোখ দুটো বারিধারায় ভেঁসেছে। স্পর্শী কাঁদছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে। সহ্য হলো না সোভামের। সকল উত্তেজনা দমিয়ে, সকলের প্রশ্নোক্ত দৃষ্টিকে মারিয়ে স্পর্শীর হাত ধরলো। কঠোর কন্ঠে বললো,
– এই লোকটার জন্য কাঁদবি না চড়ুই।
