Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১০

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১০

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১০
সুমি চৌধুরী

ফজরের স্নিগ্ধ আযান চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক পবিত্র আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সুরেই বাঁধনের ঘুম ভাঙল। প্রতিদিনের মতো আজও সে দ্রুত বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নিল। এটা নতুন কিছু নয়, বাঁধন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করে, এক ওয়াক্তও মিস দেয় না।মাথায় সাদা একটা টুপি পরে সে যখন সদর দরজায় পৌঁছাল, দেখল আহসান রহমান পাঞ্জাবি পরে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছেন। আহসান রহমান পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়েন, আর বাঁধন ফেরার পর থেকে তিনি সবসময় ছেলের অপেক্ষায় থাকেন যাতে একসাথে যাওয়া যায়। বাঁধন কোনো কথা না বলে গম্ভীর মুখে হাঁটতে শুরু করল, আহসান রহমানও নিঃশব্দে তার পাশে পা মেলালেন।

মসজিদের দিকে যাওয়ার পথে আহসান রহমান হঠাৎ খুব করুণ স্বরে বলে উঠলেন।
“আমি যদি কখনো মরে যাই , তখনও কি আমার ওপর এইভাবে রেগে থাকবি?”
বাঁধনের চলার গতি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কলিজার ভেতরে একটা মোচড় দিয়ে উঠলেও সে নিজের আবেগ প্রকাশ করল না। বাবার দিকে না তাকিয়েই সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“আল্লাহর অসীম ইবাদতের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে এসব অশুভ কথা আমি শুনতে চাইছি না।”
বলেই সে পা চালিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। তারা ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদে এসে পৌঁছাল। নামাজ শেষ করে মুসল্লিরা যখন বাড়ির দিকে ফিরছে, বাঁধন তখন উল্টো পথ ধরল। আহসান রহমান অবাক হয়ে ডাক দিলেন।
“ওই দিকে কোথায় যাস?”
বাঁধন না থেমে কেবল ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে বলল।
“আমার একটু কাজ আছে, আপনি বাড়ি চলে যান।”

বলেই সে দীর্ঘ পায়ে হেঁটে অনেক দূরে চলে গেল। আহসান রহমান বাড়ি ফিরলেন না, তিনি কৌতূহলী হয়ে দূর থেকে বাঁধনকে অনুসরণ করতে লাগলেন। দেখলেন বাঁধন এসে দাঁড়িয়েছে কালীবাড়ি গোরস্থানে। বাঁধন সোজা ভেতরে ঢুকে তার মায়ের কবরের শিয়রে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসের ঝাপটায় কবরের পাশের ছোট গাছগুলো দুলছে। বাঁধন দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরল। তার চোখের কোণ বেয়ে তখন তপ্ত জলের ধারা নামছে। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।
“হে আল্লাহ, আমার মা আজ তোমার মেহমান। তুমি তাকে তোমার রহমতের সবচেয়ে শীতল ছায়াতলে আশ্রয় দিও। ইয়া মাবুদ, মা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছে, তার সারাটা জীবন ছিল কেবল ত্যাগের গল্প। আজ আমি তোমার দেওয়া নেয়ামতে অনেক বড় পদে আসীন, কিন্তু মা পাশে নেই যে তার মাথায় আমার প্রথম স্যালারিটা তুলে দেব। মালিক, আমার মায়ের সব ভুল-ত্রুটি তুমি ক্ষমা করে দাও। কবরের জগতটাকে তার জন্য জান্নাতের বাগান বানিয়ে দাও। ওপারে মা যেন কারো কোনো অভাব বোধ না করে। আমার এই সামান্য নামাজ, ইবাদত আর নেক আমলগুলোর সওয়াব তুমি আমার মায়ের রুহে পৌঁছে দাও। হে দয়াময়, রোজ হাশরের ময়দানে আমাদের সবাইকে আবার মায়ের সাথে মিলিত হওয়ার তৌফিক দিও। মা যেখানে আছে, যেন অনেক সুখে থাকে আল্লাহ তুমি আমার মাকে খুব ভালো রেখো আমিন।”

দূর থেকে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সব দেখলেন আহসান রহমান। তার চোখ থেকেও দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই, তাই তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না; ভারী মন নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন। বাঁধন আরও কিছুক্ষণ কবরের পাশে নির্জনতায় বসে রইল, যেন মায়ের কবরের মাটির ঘ্রাণে নিজের সবটুকু হাহাকার বিলিয়ে দিচ্ছে।
একটু পর কবরস্থান থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসতেই তার পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল অখিল গন্ডগোল’। নামটা দেখেই বাঁধনের ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। এই নামটা বাঁধনই দিয়েছিল। পুলিশ ট্রেনিংয়ের সময় অখিল যেখানেই যেত, একটা না একটা ঝামেলা পাকিয়েই ছাড়ত। সেই থেকে সে বাঁধনের কাছে ‘অখিল গন্ডগোল’।ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে অখিল তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠল।

“কিরে ৩০ বছরের বুইড়্যা! তুই আছিস কই? এখনই ময়মনসিংহ জিলা স্কুল মাঠে আয়। সবাই ব্রেয়াম শেষ করে দৌড়ানো শুরু করছে, তুই এখনো নিখোঁজ।”
বাঁধন হাসতে হাসতে জিলা স্কুল মাঠের দিকে পা বাড়িয়েই বলল।
“হালার ঘরের হালা গন্ডগোল।আমারে কোন দিক দিয়া তোর বুইড়্যা মনে হয় রে?।”
অখিল ওপাশ থেকে দরাজ গলায় হাসল।
“তুই তো বুইড়্যাই রে হালা! এখনো বিয়ে করিস নাই, ৩০ বছর পার হয়ে গেল। আরে শালা, সময় থাকতে থাকতে বিয়েটা করে ফেল। নাহলে পরে যখন করবি, তখন তোর বউ তোরে স্বামী না ডেকে নির্ঘাত ‘দাদু’ বলে ডাকবে।”
বাঁধন চোখ পাকিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল।
“এক মিনিট, দাঁড়া। আমি আসতাছি তোর কাছে।”

মিনিট কয়েকের মধ্যেই লম্বা লম্বা পা ফেলে জিলা স্কুল মাঠে পৌঁছে গেল বাঁধন। দূর থেকেই দেখল অখিল একটা ঢিলেঢালা নীল টি-শার্ট আর হাফ ট্রাউজার পরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছে। বাঁধন ওর দিকে এমন এক দৃষ্টি দিয়ে এগোচ্ছে যেন সামনে পেলে আজ মেরেই ফেলবে।বাঁধনকে ওভাবে অগ্নিমূর্তিতে আসতে দেখেই অখিলের পিলে চমকে গেল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে জান হাতে নিয়ে ভোঁ দৌড় লাগাল। বাঁধনও পেছনে পেছনে ছুটতে শুরু করল। পুরো মাঠজুড়ে তখন চোর-পুলিশ খেলা শুরু হয়ে গেছে।অখিল দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপাতে হাঁপাতে চেঁচিয়ে বলল।
“কিরে ! আজ কি তুই আমাকে আসামি ধরার ট্রেনিং মনে করে ব্যায়াম করছিস নাকি? থাম শালা, আর পারছি না!”
বাঁধন পেছন থেকে গতি বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
“থামবো? তুই না বললি আমি বুইড়্যা? আজ এই বুইড়্যার দৌড় দেখবি তুই। আজ তোরে পাইলে জিলা স্কুল মাঠের মাটিতে পুঁতে ফেলব।”
অখিল এক চক্কর ঘুরে বাঁধনের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বলল।

“আরে ভাই, আমি তো তোর ভালোর জন্যই বলছি! ৩০ বছর তো কম হলো না। এখন বিয়া না করলে তোর বাচ্চার যখন স্কুলে যাওয়ার বয়স হবে, তখন লোকে তোকে বাবা না ভেবে বলবে ‘দাদুভাই, নাতিরে নিয়া কই যান?’ ওই অপমান কি সহ্য করতে পারবি?”
কথাটা শুনেই বাঁধন হাত থেকে একটা কাল্পনিক জুতো ছোঁড়ার ভঙ্গি করল। সে এক লাফে অখিলের কাছে পৌঁছে ওর কলার চেপে ধরল।
” হালার ঘরে হা’লা আজ তোর সব দাঁত খুলে হাতে ধরিয়ে দেব, তারপর দেখবো কাকে তখন দাদু ডাকে।”
অখিল হাসতে হাসতে বাঁধনের হাত থেকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল।
“আরে ছাড় ছাড়! এসপি সাহেবের এই গুন্ডামি দেখলে ময়মনসিংহের মানুষ তো ভয়ে শহর ছেড়ে পালাবে। আমি তো তোর ফ্রেন্ড, একটু সত্য কথা বলছি বলে কি মারবি?”
বাঁধন একটা হালকা লাথি বসিয়ে দিল অখিলের পায়ে। তারপর নিজেও হাসতে হাসতে বলল।
“গন্ডগোল নামটা তোরে এমনি এমনি দেই নাই শা’লা। সকালে নামাজ পড়ে আসলাম একটু শান্তি খুঁজতে, আর তুই আইসা বিয়ার ভূত মাথায় ঢুকাচ্ছিস। চল, এখন পাঁচ চক্কর দৌড় দিবি আমার সাথে, এক চুল কম হলে আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!”

অখিল কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল।
“হায়রে কপাল! বন্ধুর ভালো চাইতে গিয়া এখন নিজের জানটাই খোয়াতে হচ্ছে!”
দুই বন্ধু তখন জিলা স্কুল মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে দৌড়ানো শুরু করল। অনেকক্ষণ ঘাম ঝরানো ব্যায়াম আর দৌড়াদৌড়ির পর দুজনেই হাঁপাতে হাঁপাতে মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। বাঁধনের শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে, গরমে সে টি-শার্টটা খুলে কাঁধের ওপর ফেলে দিল। সকালের কাঁচা রোদে তার সুঠাম পেশিবহুল শরীরটা চকচক করছে। অখিল এক পলক বাঁধনের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল।
“শালা, তোরে দেখলে মাঝে মাঝে আমার নিজেরই হিংসা হয়। একটা পুরুষ মানুষ এত সুন্দর হয় কেমনে রে? তবে যাই বলিস, তোর কপালে যে-ই থাকুক, ভাগ্যগুণে ৩০ বছরের একটা জাঁদরেল বুইড়্যাই পাবে সে।”
কথাটা কানে যেতেই বাঁধন মুহূর্তের মধ্যে দাঁতে দাঁত চেপে অখিলের পায়ে কষে এক লাথি মারল। অখিল ওরে বাবা বলে লাফিয়ে উঠে হাসতে হাসতে পা ডলতে লাগল। হাসাহাসি থামিয়ে হঠাৎ অখিল কিছুটা সিরিয়াস হয়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল।

“ভালো কথা মনে পড়ল। কিরে, তোর যে একটা বোন আছে সেটা তো আগে বলিস নাই আমাক?”
বাঁধন পানির বোতলের মুখ খুলে ঢকঢক করে কিছুটা পানি খেয়ে একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল।
“আমার কোনো বোন নেই।”
অখিল ভ্রু কুঁচকে পালটা প্রশ্ন করল।
“বোন নেই মানে? তাহলে কাল যে একটা মেয়ে এসপি অফিসে এসে দাবি করল তুই নাকি ওর ভাই হোস!”
বাঁধনের পানির বোতল ধরা হাতটা স্থির হয়ে গেল। সে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল।
“কোন মেয়ে? কার কথা বলছিস?”
“ওই যে কাল সুপার কার্যালয়ে একটা মেয়ে আসল না? অ্যাশ রঙের থ্রি-পিস পরা ছিল, গায়ের রঙটা বেশ ফর্সা।”
অখিলের বর্ণনা শুনে বাঁধনের সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল কাল তো শান্তা গিয়েছিল ওর সাথে দেখা করতে। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল।

“ও আচ্ছা, শান্তার কথা বলছিস? হ্যাঁ, ও আমার কাকাতো বোন।”
অখিল এবার বাঁকা একটা হাসি দিয়ে বলল।
“ওহ্! আমি ভাবছিলাম তোর নিজের বোন। যাই হোক, তোর কাকাতো বোনটা কিন্তু বেশ সুন্দরী। তা তার লগে কি তোর কোনো তলে তলে চক্কর টক্কর চলছে নাকি?”
কথাটা শোনা মাত্রই বাঁধন ঝট করে উঠে দাঁড়াল। কোমরে দুই হাত দিয়ে অখিলের দিকে এমন ভাবে তাকাল যেন এখনই ওকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। সে বিরক্তি মেশানো গলায় বলল।
“তুই নিজে যেমন আস্ত একটা গন্ডগোল, তোর মাইন্ডটাও একদম ওই গন্ডগোল মার্কা নোংরা। তোর নাম অখিল না দিয়ে আসলে ‘গন্ডগোল’ রাখা উচিত ছিল।”

বাঁধন ঘামে ভেজা টি-শার্টটা কাঁধে ফেলে খালি গায়ে দরাজ ভঙ্গিতে বাড়িতে ফিরল। ড্রয়িং রুমে তখন হাজি রহমান আয়েশ করে বসে চা খাচ্ছিলেন আর চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। বাঁধন দাদুকে দেখে হালকা হেসে সালাম দিল।
“আসসালামু আলাইকুম দাদু, শুভ সকাল।”
হাজি রহমান পেপারটা সরিয়ে চশমার ওপর দিয়ে প্রিয় দাদু ভাইয়ের দিকে তাকালেন। বাঁধনের সুঠাম শরীর আর ঘাম দেখে তিনি সস্নেহে বললেন।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। শুভ সকাল দাদু ভাই। তুই তো একদম ভিজে গেছিস রে, যা তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। এই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকিস না, ঠান্ডা লেগে যাবে।”

বাঁধন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। ঠিক সেই সময় ওপর থেকে নামছিল শান্তা। বাঁধনকে ওপরে উঠতে দেখে শান্তার মাথায় মুহূর্তেই হিন্দি সিনেমার রোমান্টিক ভূত সওয়ার হলো। সে ভাবল এখনই তো সুযোগ! সিনেমায় যেমন দেখেছে নায়িকা সিঁড়ি দিয়ে ধপাস করে পড়বে আর হিরো ঠিক শেষ মুহূর্তে তাকে কোমর জড়িয়ে ধরে ফেলবে। তারপর স্লো মোশনে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবে আর ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বাজবে।শান্তা নিজের মনেই একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট সাজিয়ে ফেলল। যেই ভাবা সেই কাজ! বাঁধন যখন ওর কাছাকাছি আসলো, শান্তা ঠিক তখনই একটা নাটকীয় ভঙ্গি করে ‘ওহ মা’ বলে পা পিছলে যাওয়ার ভান করল। সে চোখ বন্ধ করে একদম প্রস্তুত হয়ে আছে যে, এখনই বাঁধনের শক্ত হাত তাকে আগলে ধরবে।
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল তা সিনেমার ধারেকাছেও নেই। বাঁধন বড় বড় পা ফেলে শান্তাকে পাত্তাই না দিয়ে পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠে গেল। শান্তা যখন বুঝল কেউ তাকে ধরেনি, তখন তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজ শুরু করে দিয়েছে। সে কোনো অবলম্বন না পেয়ে একদম ধপাস করে সিঁড়িতে আছড়ে পড়ল। কোমরের হাড়ে একটা বিশ্রী শব্দ হতেই শান্তার মুখ দিয়ে সিনেমাটিক ডায়ালগের বদলে বেরোলো এক বিকট চিৎকার।

“ও মাহহহহ গো! মরে গেলাম রে!”
শান্তার গগণবিদারী চিৎকারে শিল্পী রহমান আর রজনী রহমান রান্নাঘর থেকে হাতা-খুন্তি হাতে নিয়েই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। সিঁড়িতে শান্তাকে ওভাবে কুঁকড়ে বসে থাকতে দেখে শিল্পী রহমান অবাক হয়ে বললেন।
“কী হয়েছে? ওইভাবে সিঁড়িতে বসে কোঁকাচ্ছিস কেন? আর অমন করে চিৎকারই বা দিলি কেন?”
শান্তা ব্যথায় এক হাত দিয়ে কোমর চেপে ধরে করুণ মুখে বলল।
“পড়ে গিয়েছি গো মা!”
রজনী রহমান শান্তার হাত ধরে টেনে তুলতে তুলতে বিরক্তি নিয়ে বললেন।
“চোখ থাকতে পড়িস কীভাবে শুনি? বড় হয়েছিস, একটু দেখে হাঁটতে পারলি না?”

শান্তা মুখে কিছু না বললেও মনে মনে তখন বাঁধনের গুষ্টি উদ্ধার করছে। সে মনে মনে গজগজ করে বলতে লাগল।
“আমি তো দেখেই হাঁটছিলাম গো, শুধু পড়ার নাটক করছিলাম যাতে তোমার ওই পাষাণ ছেলেটা একটু আমার কোমর ধরে জাপটে ধরে! কিন্তু হালার ঘরের জিরো আমাকে পাত্তাই না দিয়ে জ্যান্ত লাশটার মতো পাশ কাটিয়ে চলে গেল। কেন রে ভাই, একটু ধরলে কি এমন জাত যেত? আমার তো হাড়গোড় ভেঙে ইজ্জত পাংচার করে দিল! যা বুঝলাম সিনেমার নায়ক আর এই এসপি আসলে কোনো মিল নেই।”
সে দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে দাঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। মনে মনে ঠিক করল, পরের বার আর সিনেমার বুদ্ধি খাটাতে যাবে না, নাহলে নির্ঘাত পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হবে।

লাল টকটকা বেনারসি শাড়ি পরে নতুন বউ সেজে বাসর ঘরের বিছানায় বসে আছে রূপা। পুরো ঘর রজনীগন্ধার গন্ধে ম ম করছে। দরজা খুলে ঘরে ঢুকল ইশতিয়াক, পরনে জমকালো বিয়ের পাঞ্জাবি আর মাথায় রাজকীয় পাগড়ি। সে খুব সাবধানে দরজাটা আটকে দিয়ে ধীর পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এল। রূপা লজ্জায় নিজের নখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে।ইশতিয়াক পাগড়িটা সাইডে রেখে রূপার একদম কাছে বসল। রূপার থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে মায়াবী গলায় বলল।
“মাশাআল্লাহ! আমার বউকে তো একদম আসমানের পরীর মতো লাগছে। আজ থেকে তুমি শুধু আমার।”
রূপা লজ্জায় লাল হয়ে আবারও মাথা নিচু করে ফেলল। ইশতিয়াক আরেকটু ঘনিষ্ট হয়ে রূপার কানে ফিসফিস করে বলল।

“বাহ্! আমার বউয়ের দেখি মারাত্মক লজ্জা! তোমার এই টমেটোর মতো লাল মুখটা দেখে তো আমার পাগলামি বেড়ে যাচ্ছে। আজ এই শুভ রাতে আদর করার অধিকারটুকু কি আমায় দিবে?”
রূপা নিরুত্তর, আর এই নিস্তব্ধতাকেই ইশতিয়াক সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরে নিল। সে যেন প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। আবেগ আর উত্তেজনায় পাগল হয়ে সে রূপার কাঁধ ধরে বিছানায় শুইয়ে দিল এবং নিজে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রূপার গাল, গলা আর ঘাড়ের আশেপাশে পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করল সে। ইশতিয়াক যেন রোমান্টিকতার এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছে গেছে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার ‘সুখের নদীতে’ এক বিশাল সুনামি আঘাত হানল!
হঠাৎ তার পাছায় কেউ সপাং করে একটা শক্ত কঞ্চির বাড়ি বসিয়ে দিল। ব্যথায় ইশতিয়াকের কলিজা শুকিয়ে নীল হয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ রেখেই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে চিৎকার করে উঠল।

“আহহহ! কোন খা*নকি*র পোলা রে? বাসর ঘরে হামলা চালায়?”
মুহূর্তেই এক ভারী আর অত্যন্ত রাগী মহিলা কণ্ঠস্বর ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল।
“বেয়াদব! আমি কোনো খা*নকি*র পোলা না, আমি তোর মা!”
ইশতিয়াক তখনো ঘোরের মধ্যে, সে চোখ না খুলেই আধো-ঘুমন্ত স্বরে বলল।
“ও মা তুমি? ছিঃ মা! তুমি তোমার জোয়ান ছেলের বাসর ঘরে এইভাবে ঢুকে পড়লে? লাজলজ্জা সব কি বিসর্জন দিয়ে দিলে? যাও মা, জলদি রুম থেকে বের হও, তোমার বউমা তো লজ্জায় জ্ঞান হারাবে।”
মা ওপাশ থেকে এবার দাঁতে দাঁত চিপে হুঙ্কার দিলেন,
“তা বলি কি বাপ, আমার ছেলে কি এখন কোলবালিশের সাথে বাসর করছে?”
“কোলবালিশ!”

শব্দটা কানে যেতেই ইশতিয়াকের চটকা ভাঙল। সে ঝট করে চোখ খুলে দেখল সামনে কোনো লাল শাড়ি পরা অপ্সরী নেই, বরং সে তার পুরনো একটা কোলবালিশের ওপর উঠে আছে! সেই বেচারা কোলবালিশের অবস্থা একদম শোচনীয়, ইশতিয়াকের ‘ভালোবাসার’ চোটে সেটার তুলা বের হওয়ার উপক্রম। বিছানার চাদর দুমড়েমুচড়ে একাকার, আর জানালার পাশ দিয়ে আসা এক চিলতে রোদ ইশতিয়াককে বিদ্রূপ করছে।সে ফ্যালফ্যাল করে নিজের দু-হাতের মাঝখানে ধরা কোলবালিশটার দিকে তাকাল। তার মানে এতক্ষণের সেই ড্রিমি রোমান্স, সেই রজনীগন্ধার ঘ্রাণ আর রূপার মায়াবী রূপ সবই ছিল একটা খতরনাক স্বপ্ন! সে স্বপ্নদোষের চেয়েও ভয়াবহ এক ‘স্বপ্নে-বাসর’ করছিল কোলবালিশের সাথে।পেছনে তাকিয়ে দেখল তার মা হাতে একটা ঝাড়ু নিয়ে অগ্নিমূর্তিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ইশতিয়াক তখন বুঝতে পারল বাসর তো দূরের কথা, আজ তার কপালে ঝাড়ুর নাস্তা লেখা আছে। সে কোলবালিশটা জাপটে ধরে বিছানায় একদম কাঁচুমাচু মুখ করে বসে রইল, কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই মা ঝাড়ু উঁচিয়ে হুঙ্কার দিলেন।

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৯

“এখনই বিছানা ছাড়! বেলা দশটা বাজে, আর উনি স্বপ্নে কোলবালিশ বিয়া কইরা সংসার করতেছেন! হারামজাদা, মুখ ধুইয়া নিচে আয়, তোর বাসর করার শখ আজ আমি ঝাড়ু দিয়া মিটাইতাছি!”
ইশতিয়াক বিড়বিড় করে বলল।
” সপ্ন টা সুন্দর হলেও মারাত্মক বাজে।ছ্যাহঃ আরেকটু হলেই তো কোলবালিশ কে প্রেগনেন্ট করে দিতাম।”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১১