বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৭
সুমি চৌধুরী
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, বাঁধন আর রূপা দুজনেই ক্লান্ত দেহে বাড়ি ফিরল। বাঁধন শাওয়ার নিয়ে একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে রূপার রুমে ঢুকল। ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এল রূপা। টি-শার্ট আর প্লাজু পরা রূপার ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে, জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে তার কপালে। বাঁধন এক পলক তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের জন্য তার চোখ দুটো আটকে গেল রূপার দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বলল,
—- “পড়তে বস রূপ। আমি একটু ঘুমাবো।”
রূপা কোনো কথা না বলে মৃদু মাথা নাড়ল। বাঁধন আর দ্বিতীয় কোনো কথা ব্যয় না করে নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। সারাদিনের ধকল তাকে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে দিল। রাত নয়টার দিকে বাঁধনের ঘুম ভাঙল। এলোমেলো দৃষ্টিতে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে স্টাডি রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা চাপা ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ তার কানে এল। একদম চেনা গলা, রূপার গলা! বাঁধনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, পাগলের মতো দৌড়ে সে স্টাডি রুমে ঢুকে পড়ল। দৃশ্যটা দেখে তার কলিজা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। রূপা টেবিলের চেয়ারে গুটিসুটি মেরে হাঁটু ভাঁজ করে পেট চেপে ধরে কাঁদছে। বাঁধন ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে রূপার দুই গাল দুহাতে আঁকড়ে ধরল, তার কণ্ঠস্বর তখন অস্থিরতায় কাঁপছে।
—- “কী হয়েছে রূপ? তুই কাঁদছিস কেন?”
রূপা কোনো জবাব দিল না, শুধু পেটে হাত চেপে ধরে গোঙাতে লাগল। বাঁধন দিশেহারা, সে দ্রুত পাশের চেয়ারে বসে রূপার আরও কাছে ঝুঁকে পড়ল।
—- “রূপ, আমাকে পাগল করে দেওয়ার আগে বল কী হয়েছে! কথা বল, না হলে আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলব!”
তবুও রূপা চুপচাপ, শুধু তার কান্নার শব্দ স্টাডি রুমের চারপাশ ভারী করে তুলছে। বাঁধনের মাথাটা যেন কাজ করছে না। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় কাঁপছে। সে রূপার গাল আরও আলতো করে চেপে ধরে ব্যাকুল হয়ে বলে উঠল,
—- “রূপ, কোকিল সোনা, টিয়া সোনা পাখি, কী হয়েছে বল! প্লিজ রূপ, তোর এই কান্না আমার বুকে ছু’রি ঢুকাচ্ছে আর বের করছে। এভাবে যন্ত্রণা আমাকে দিস না, এবার বল, না হলে আমি এখনই পাগল হয়ে যাবো।”
রূপা কাঁদতে কাঁদতে সব লজ্জা সরিয়ে যন্ত্রণার আতিশয্যে চাপা স্বরে বলল,
—- “পিরিয়ড হয়েছে, প্রচণ্ড পেট ব্যথা করছে।”
“ঠাসসস!”
মুহূর্তের মধ্যে এক জোরালো শব্দ স্টাডি রুমে ছড়িয়ে পড়ল। বাঁধন রাগের মাথায় রূপার গালে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। রূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঁধন তাকে দুই হাতে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস পাগলের মতো দ্রুত ওঠানামা করছে। রাগে উন্মাদ হয়ে সে ফিসফিস করে বলে উঠল,
—- “হারা’মির বা’চ্চা, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছিলি তুই!”
রূপার কান্নার শব্দে স্টাডি রুমের বাতাস ভারি হয়ে উঠল। সে ডুকরে কেঁদে উঠছে, বাঁধন তাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটা রূপার ঘাড়ে গুঁজে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বাঁধন বলতে লাগল,
—- “আই অ্যাম স’রি রূপ, আই অ্যাম রিয়েলি স’রি আমার কোকিল সোনা। বিশ্বাস কর, আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। রাগের মাথায় হাতটা উঠে গেছে, আমাকে ক্ষমা করে দে। ট্রা’স্ট মি রূপ, আমার দমটাই যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। এমন করে কষ্ট পাবি না তুই আমার সামনে, কখনো না।”
রূপার কান্নার স্বর যেন থামছেই না। পেটের অসহ্য যন্ত্রণায় সে কুঁকড়ে যাচ্ছে, যেন ভেতরে কেউ ছুরি চালাচ্ছে। বাঁধন তাকে ছেড়ে দুহাতে তার মুখটা উপরে তুলল। চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বাঁধন অস্থির গলায় জানতে চাইল,
—- “খুব বেশি ব্যথা করছে রূপ? ”
রূপা বাচ্চাদের মতো শুধু মাথা নাড়াল। বাঁধন অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,
—- “আমি তো এসব বিষয়ে তেমন একটা জানি না, অন্তত কী খেলে এই যন্ত্রণাটা একটু কমবে আমাকে বল, আমি এক্ষুনি সব নিয়ে আসছি।”
রূপা ভাঙা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,
—- “হট ব্যাগ।”
বাঁধন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেল,
—- “আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরছি। তুই জাস্ট একটু সহ্য কর, সোনা।”
দশ মিনিটের মাথায় বাঁধন একটা হট ব্যাগ কিনে আনল। ফার্মেসি থেকে ব্যথা কমানোর ওষুধও নিয়ে এসেছে। রুমে ঢুকে দেখল রূপা তখনও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। বাঁধন রূপাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে নিজের রুমে বিছানায় বসাল। হট ব্যাগটা গরম করে রূপার পেটে চেপে ধরতেই সে আরামের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাঁধন শান্ত গলায় বলল,
—- “চুপচাপ শুয়ে থাক, আমি এক্ষুনি আসছি।”
বাঁধন সোজা রান্নাঘরে চলে গেল। রান্না করার জন্য বাঁধন একজন কাজের লোক রেখেছে, যে টাইম টু টাইম এসে শুধু রান্নাটা করেই চলে যায়। বাঁধন সেখান থেকে একটা প্লেটে খাবার বেড়ে নিল। এক গ্লাস পানি আর ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে সে যখন রুমে ফিরল, দেখল রূপা তখনও হট ব্যাগটা পেটে চেপে ধরে করুণ চোখে বসে আছে। বাঁধন রূপার সামনে বসে নিজের হাতে পরম মমতায় ভাত মাখিয়ে তার মুখের কাছে ধরল। রূপা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
—- “খাবো না। পেটে খুব ব্যথা।”
বাঁধন এবার কড়া ধমক দিয়ে বলল,
—- “আমার হাতে মা’র না খেতে চাইলে চুপচাপ হা কর। ওষুধ এনেছি, আগে খেয়ে নে, তারপর ট্যাবলেটটা খাবি। ব্যথা একদম কমে যাবে,।”
রূপা আর কোনো কথা বলল না, ছোট বাচ্চার মতো চুপচাপ ভাতগুলো গিলে নিল। বাঁধনও পরম মমতায় খাইয়ে দিতে থাকল। খাওয়া শেষ করে ওষুধটা খাইয়ে দিতে গিয়ে বাঁধনের চোখে পড়ল রূপার চেহারা। দীর্ঘক্ষণ কান্নাকাটি আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকার কারণে রূপার ভেজা চুলগুলো মাথার চারপাশে জট পাকিয়ে আছে, কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো তাকে আরও অসুস্থ আর বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে। মেয়েটার এই করুণ দশা বাঁধনের বুকের ভেতরটা মুচড়ে দিল। সে ভাবল, রূপার অস্বস্তি কমানোর জন্য চুলগুলো অন্তত একটু গুছিয়ে দেওয়া দরকার। সাথে সাথে সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে চটজলদি একটা সহজ বেণি করার টিউটোরিয়াল ভিডিও চালু করল। একবার দেখে নিয়ে, নিজের বড় বড় আঙুলে সে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রূপার এলোমেলো চুলগুলো টেনে টেনে সাধারণ একটা বেণি করে দিল। চুলগুলো গুছিয়ে দিতেই রূপার মুখটা যেন আগের চেয়ে অনেক হালকা আর স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে।রূপাকে বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দিয়ে বাঁধন কপালে হাত বুলিয়ে বলল,
—- “এখন চোখ বন্ধ করে চুপচাপ ঘুমা। দেখবি, ওষুধের জাদুতে একটু পরেই সব ব্যথা হাওয়া হয়ে যাবে।”
রূপা ঠোঁট উল্টে এক মায়াবী আবদার করে বসল,
—- “ঘুম আসবে না। আমাকে কোলে নিন।”
বাঁধন মৃদু হেসে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল,
—- “কোলে নিলে পেটে চাপ লাগবে রূপ, ব্যথাটা তো আরও বেড়ে যাবে। এখন শুয়ে থাকাই তোর জন্য ভালো।”
রূপা জেদ ধরে তার হাতটা চেপে ধরল,
—- “পাবো না! প্লিজ, শুধু একবার কোলে নিন।”
বাঁধন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রূপার এটা নতুন কিছু না।
গত কয়েকদিন ধরে রূপা এমন আবদার করছে,কোলে নিন,। রূপা আগে কখনো এমন করত না, কিন্তু ইদানীং সে যেন হঠাৎ করেই বাঁধনের কোলে ওঠার জন্য জেদ ধরাটা তার অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে। বাঁধন বুঝতে পারছে, রূপার ভেতরে কোনো এক অজানিত ব্যাকুলতা কাজ করছে, যা তাকে বাঁধনের আরও কাছে টেনে নিতে চায়। রূপার এই অবুঝ আবদারকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া বাঁধনের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। সে রূপার সামনে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়াল, তারপর শান্ত গলায় বলল,
—- “ওঠ।”
রূপার চোখে তখন একরাশ আনন্দ। নিমেষের মধ্যে সে বাঁধনের গলা জড়িয়ে ধরল এবং পিঠের ওপর ঝুলে পড়ে তাকে পিগি ব্যাক-হাগ করে ফেলল। রূপার উষ্ণ শরীরটা নিজের পিঠের ওপর অনুভব করতেই বাঁধন দুই হাত দিয়ে রূপার পা দুটো কোমরের কাছে শক্ত করে আটকে নিল। রূপা বাঁধনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—- “ছাদে যাবো। আকাশের নিচে, খোলা বাতাসে নিয়ে যান আমাকে।”
বাঁধন কোনো কথা না বলে রূপাকে পিঠে নিয়েই ছাদের সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এল। রাতের হালকা জ্যোৎস্নায় তাদের দুজনের অবয়ব ঝিলিক দিয়ে উঠল। অদ্ভুত এক মিল দুজনের পোশাকে দুজনেই আজ অ্যাশ রঙের টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার পরে আছে। ইদানীং বাঁধন আর রূপা অঘোষিতভাবে ম্যাচিং করে পোশাক পরতে শুরু করেছে। এই অভ্যেসটা যেন তাদের সম্পর্কের নীরব এক অঙ্গীকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাদে উঠে বাঁধন ধীর পায়ে হাঁটতে লাগল। রূপা তার পিঠের ওপর পিগি- ব্যাক হাগের বাঁধন আরও শক্ত করে বাঁধনের ঘাড়ে মুখ গুজে আবদার করল,
—- “একটা গান শোনান।”
বাঁধন হাঁটা থামাল না, মৃদু হেসে বলল,
—- “গান শুনবি?”
রূপা তার কাঁধে মাথাটা আরেকটু ঘষে অস্ফুট স্বরে বলল,
—- “হুম।”
বাঁধন গভীর একটা শ্বাস নিল। বুকের ভেতর থেকে সুরটা টেনে আনার আগে সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। তারপর শান্ত অথচ মায়াবী গলায় সে গুনগুন করে সুর ভাঁজতে শুরু করল।
…ও…ও…ও…
গভীর রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে, অষ্টাদশীর হৃদপিণ্ড কাঁপিয়ে বাঁধনের কণ্ঠস্বর ছাদের খোলা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।
‘স্বপ্নের বালুকায়
কেউ কি পা লুকায়
যদি না আসে ভেজা দিন
‘ইচ্ছের হিমালয়
হয়না কভু ক্ষয়
হৃদয়ে থাকে অমলিন’
‘কিছু স্বপ্ন কিছু ইচ্ছে
এই আমায় টেনে নিচ্ছে
তোমার কাছে বারে বার’
‘কেউ না জানুক আমি তো জানি আমি তোমার
কেউ না জানুক তুমি তো জানো তুমি আমার’
রূপা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। এই পুরুষের মায়ায় সে যেন অন্ধকারের গভীরেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাঁধন গান গাইতে গাইতেই ছাদের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে আকাশের অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রূপার হৃদয়ের গভীরে সুরের দোলা দিয়ে গেয়ে উঠল।
‘ভালোবাসা ফুরাই না
প্রেম কভু হারাই না
অনুভবে থাকে যার যার’
‘কেউ না জানুক আমি তো জানি আমি তোমার
কেউ না জানুক তুমি তো জানো তুমি আমার’
গানের শেষ রেশটুকু বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ছাদের চারপাশটা এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। বাঁধনের পিঠের ওপর রূপার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা যেন সুরের সাথে মিশে গিয়ে পুরো আকাশটাকে রাঙিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর, রূপার শরীরের টানটান ভাবটা আলগা হয়ে এল, ব্যথার তীব্রতা কমে সে যেন শান্তির ঘুমে ডুব দিতে চাইছে। বাঁধন তা বুঝতে পেরে গলা নামিয়ে আলতো করে জিজ্ঞেস করল,
—- “পেট ব্যথা কমেছে?”
রূপা তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে থাকা অবস্থাতেই ঘুমের অতল থেকে অস্ফুট স্বরে জবাব দিল,
—- “হুম।”
এরপর কেটে গেল আরও দুদিন। রূপাদের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে, জীবন আবার তার চেনা ছন্দে ফিরে এসেছে। সকালে রূপাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে বাঁধন সোজা চলে এল থানায়। থানার চত্বরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল অখিলকে, সে আগেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল। দুই বন্ধু এক পলক দৃষ্টি বিনিময় করল, এরপর তাদের নজর গেল লোকআপের দিকে।লোকাপের ভেতরে শান্তা চুপচাপ মেঝেতে বসে আছে। বাঁধন অখিলের দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্তকণ্ঠে নির্দেশ দিল,
—- “ওকে ছেড়ে দে।”
অখিল মুহূর্তমাত্র দেরি না করে পাশে থাকা কনস্টেবলকে ইশারা করল। কনস্টেবল দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে লোকআপের তালা খুলল এবং শান্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—- “বেরিয়ে আসুন। স্যার আপনাকে ছেড়ে দিয়েছেন।”
শান্তা লোকআপ থেকে বেরিয়ে এল, বাঁধনের ঠিক কয়েক হাত সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনো কথা বলতে পারল না, তার নীরবতা আর অবনত মস্তক যেন কোনো এক অদ্ভুত অপরাধবোধের সাক্ষী দিচ্ছে। অখিল কিছুটা কড়া গলায় সতর্ক করে দিল,
—- “এরকম ভুল নেক্সট টাইম যেন আর না হয়। এবার ছাড়া পেলে, আবার এমন কিছু করলে সোজা যাবজ্জীবন জেল খাটবে।”
শান্তা কোনো প্রতিউত্তর দিল না, শুধু মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। বাঁধন একজন কনস্টেবলকে ডেকে বলল,
—- “ওকে নিরাপদে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসুন।”
শান্তা পুলিশ ভ্যানে ওঠার জন্য বেরিয়ে গেল। শান্তার যাওয়ার পথের দিকে এক পলক তাকিয়ে বাঁধন অখিলকে নিয়ে থানার ভেতরের দিকে হাঁটা ধরল। তারা এসে থামল একদম শেষ প্রান্তে, যেখানে আলোর পৌঁছানো দায়। সেই অন্ধকার লোকআপের কোণে ধুলোমাখা মেঝেতে পড়ে আছে একটি লোক, শুকনো মুখ আর অগোছালো চুলে তাকে দেখে চেনার উপায় নেই। লোকটা আর কেউ নয় মারুফ হোসেন।বাঁধন একটা চেয়ার টেনে মারুফ হোসেনের সামনে এনে বসল। চেয়ারে পিঠ এলিয়ে, নিজের ডান পা বাঁ পায়ের ওপর তুলে সে শীতল দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। মারুফ হোসেন আড়চোখে বাঁধনের দিকে তাকাতেই তার মেরুদণ্ড দিয়ে যেন শীতল স্রোত বয়ে গেল। তিনি দ্রুত চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে ফেললেন। দীর্ঘ সময় নীরবতা বজায় রাখার পর, বাঁধন খুব হালকা করে গলা খাঁকারি দিল। তার গলার স্বর অদ্ভুত রকমের শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত স্বরের আড়ালে যে কী পরিমাণ ঝড় লুকিয়ে আছে, তা মারুফ হোসেনের বুঝতে বাকি রইল না।
—- “তো মিস্টার মারুফ হোসেন, কেমন আছেন আপনি?”
বাঁধনের প্রশ্ন শুনে মারুফ হোসেনের শরীরটা কেঁপে উঠল। তিনি কাঁপা গলায় নিচু স্বরে উত্তর দিলেন,
—- “ভালো।”
বাঁধন একটা বাঁকা হাসি দিল। তার চোখের দৃষ্টি এখন আরও ধারালো। সে বলল,
—- “আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ এনেছি। নেবেন কি?”
মারুফ হোসেন বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত চোখে বাঁধনের দিকে তাকালেন। তার কপালের দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—- “কিসের সারপ্রাইজ?”
বাঁধন কোনো উত্তর না দিয়ে অখিলের দিকে তাকাল। অখিল সাথে সাথে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ভিড়িও চালু করে স্ক্রিনটা মারুফ হোসেনের চোখের সামনে ধরল। ভিডিওর দৃশ্যের দিকে তাকাতেই মারুফ হোসেনের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অখিল একটা ১০ বছরের ফুটফুটে মেয়েকে পরম মমতায় চকলেট আর খেলনা কিনে দিচ্ছে। মেয়েটিকে দেখেই মারুফ হোসেনের গলা দিয়ে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
—- “আমার মেয়ে ইনায়া!”
মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত অহংকার আর শক্তপোক্ত ভাব ভেঙে পড়ল লোকটার। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে বাঁধনের পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়লেন। দুই হাতে বাঁধনের পা জড়িয়ে ধরে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।
—- “আল্লাহর দোহাই লাগে আমার মেয়েকে ছেড়ে দিন, যা করার আমাকে করুন কিন্তু আমার মেয়েকে ছেড়ে দিন! ওর কিছু হলে আমি বাঁচব না।”
বাঁধন অত্যন্ত শান্তভাবে নিজের পা মারুফ হোসেনের গ্রাস থেকে ছাড়িয়ে নিল। সে চেয়ার টেনে আরেকটু পিছিয়ে বসল, যেন লোকটার স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচাচ্ছে। কোনো বিরক্তি বা আবেগের চিহ্ন ছাড়া সে শীতল গলায় বলল,
—- “আরে রিলাক্স, শান্ত হোন। আগে আমার কথাটি শুনুন?”
মারুফ হোসেনের কণ্ঠস্বর ভাঙা, তবুও মেয়েকে বাঁচার তাগিদে তিনি দ্রুত বলতে লাগলেন।
—- “বলুন, আমি সব বলব! আপনি শুধু আমার মেয়েকে ছেড়ে দিন, দয়া করে ওকে কিছু করবেন না।”
বাঁধন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো দয়া নেই, আছে কেবল হিমশীতল ঘৃণা। সে মারুফ হোসেনের দিকে এক পা এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
—- “রূপা কে? ওর আসল পরিচয় কী?”
মারুফ হোসেনের মাথা সঙ্গে সঙ্গে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে।কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। বাঁধন এবার গর্জে উঠল,
—- “আন্সার মি, মিস্টার মারুফ হোসেন! দেরি করবেন না।”
মারুফ হোসেন পিছিয়ে যেতে যেতে আর্তনাদ করে উঠলেন,
—- “আমি জানি না রূপা কে! আমি কিছু জানি না!”
বাঁধন তার কথার কোনো তোয়াক্কা না করে চেয়ারটি টেনে সরিয়ে দিল। সে ঠান্ডা গলায় বলল,
—- “ওকে, ফাইন! তাহলে নিজের মেয়েকে হারানোর জন্য প্রস্তুত হোন। আপনার ইনায়াকে আর কখনোই দেখতে পাবেন না।”
মুহূর্তের মধ্যে মারুফ হোসেন চিৎকার করে উঠলেন,
—- “না, না, না! আমার মেয়ের কোনো ক্ষতি করবেন না! বলছি, সব বলছি আমি!”
বাঁধন বাঁকা হেসে আবার শান্ত হয়ে চেয়ারে বসল। অখিলের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই অখিল রেকর্ডিং অন করে দিল। বাঁধন মারুফের দিকে ঝুঁকে বসে বলল,
—- “বলুন, সময় কিন্তু আপনার হাতেই কম।”
মারুফ হোসেন মাথা নিচু করে, ভাঙা গলায় কাঁপতে কাঁপতে বলতে লাগলেন,
—- “রূপা কোনো সাধারণ ঘরের মেয়ে নয়, এমনকি সে বাংলাদেশিও না। রূপা আসলে কানাডার আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া ডন ‘ইথান রিচার্ডসন’-এর একমাত্র মেয়ে, ইথান প্রিসিয়া। খ্রিস্টান বংশে জন্ম তার।”
এক মুহূর্তে বাঁধনের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার সারা শরীর পাথরের মতো জমে গেল। অখিলও খবরটা শুনে হা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না কেউ। বাঁধন অস্বাভাবিক স্থবির গলায় প্রশ্ন করল,
—- “তাহলে আপনারা রূপাকে কোথায় পেলেন?”
মারুফ হোসেন বিষাদগ্রস্ত মনে বলতে শুরু করলেন,
—- “আমি তখন কানাডার এক হসপিটালে নার্সের জব করতাম। সেখানে রূপার জন্মদাতা মা ‘প্রিয়াসা জেন্সিল’ প্রিসিয়াকে জন্ম দিতে এসে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার স্বামী ইথান রিচার্ডসন স্ত্রীকে ভীষণ ভালোবাসতেন, প্রিয়াসার মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি তার সমস্ত সাম্রাজ্য, ধন-সম্পত্তি সব প্রিসিয়ার নামে লিখে দিয়ে নিজেও আত্মহত্যা করেন। ইথান রিচার্ডসনের পরিবারের তেমন কেউ ছিল না, শুধু মা ছিলেন যিনি প্রিসিয়াকে দেখাশোনা করার জন্য হসপিটালেই রেখেছিলেন। আমি এসব জানতে পারি। তারপর আমার প্রথম স্ত্রী রজনীকে সব বলি। সেই আমাকে বুদ্ধি দেয় যেভাবেই হোক প্রিসিয়াকে চুরি করে নিতে হবে। লোভের বশে এক রাতে অনেক কষ্টে প্রিসিয়াকে চুরি করি এবং দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসি। এরপর প্রিসিয়াকে রজনীর কাছে দিয়ে দেই। রজনী সবাইকে মিথ্যে পরিচয় দেয় যে ও আমাদেরই সন্তান এবং ওর নাম রাখে ‘রূপা’।”
মারুফ একটু থামলেন, বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন,
—- “শুরুতে রূপার চেহারা নিয়ে খুব ঝামেলা হতো। ওর চেহারা একদম বিদেশিদের মতো ছিল, তাই আমরা ইচ্ছা করে ওর গায়ে কালি মেখে কালো করে রাখতাম। যখন ওর বয়স পাঁচ বছর হলো, তখন দেখি ওর চেহারা কিছুটা বাংলাদেশিদের মতো হয়ে আসছে, তখন আর কালি মাখিনি।”
মারুফ হোসেনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু বাঁধনের মনে বিন্দুমাত্র দয়া নেই। মারুফ হোসেন আবার বলতে লাগলেন,
—- “তবে আমি এই কয়েক বছরের মধ্যে একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। গোপনে তাকে বিয়েও করি, আমাদের একটা মেয়ে হয়, যার নাম ইনায়া। এই সম্পর্কের কথা রজনী জেনে যায় এবং প্রচণ্ড অশান্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে রজনীও আমার এক কানাডার কাছের বন্ধুর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, যার সাথে তার ফোনে নিয়মিত কথা হতো। সব জানার পর আমি রজনীকে ডিভোর্স দিয়ে রূপাকে নিজের কব্জায় নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই বন্ধু আমার পেছনে ছুরি মারল। আমি যে রূপাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছি এই সত্যটা সে জানে এবং তার কাছে সেই ঘটনার ফুটেজও ছিল। সে আমাকে হুমকি দেয়, যদি আমি রূপাকে নিতে যাই, তবে সে সেই ভিডিও পুলিশের কাছে দিয়ে দিবে। বাধ্য হয়ে আমি তখন আর রূপাকে নিতে পারিনি। রজনী নিজেই আমাকে ডিভোর্স দিয়ে রূপাকে নিয়ে চলে যায়। এরপর আমি পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়ি, হাত চালানোর মতো খরচও ছিল না। ঠিক তখনই রজনী আমাকে নারী ব্যবসার লোভ দেখায়। বাংলাদেশ থেকে মেয়ে বিদেশে পাঠাতে পারলে ভালো টাকা পাওয়া যাবে। অভাবে পড়ে আমিও সেই নোংরা ব্যবসায় রাজি হয়ে যাই।”
পুরো ঘরটা তখন নিস্তব্ধ। মারুফ হোসেনের স্বীকারোক্তি বাঁধনের বুকের ভেতরটা যেন ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। রূপা, সে কোনো মাফিয়া ডনের সন্তান?অখিল এক ঢোক গিলে অস্থির কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—- “তাহলে আপনারা চাইলে তো আগেই রূপার কাছ থেকে সব সম্পত্তি লিখে নিতে পারতেন, কিন্তু এখনো কেন তা নেওয়া হচ্ছে না?”
মারুফ হোসেন মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় উত্তর দিলেন,
—- “কারণ রূপা সেই সম্পত্তি তখনই লিখে দিতে পারবে যখন সে প্রাপ্তবয়স্ক হবে। অন্তত উনিশ-বিশ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত তার দেওয়া দলিলে আইনগত কোনো বৈধতা থাকবে না। ওই বয়সের আগে সে কোনো কিছু হস্তান্তর করলেও তা আইনত গণ্য হবে না।”
বাঁধন তার কপালের দুই পাশে বুড়ো আঙুল চেপে ধরে মাথা নিচু করে বসল। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। রূপা খ্রিস্টান বংশের মেয়ে এই সত্যটা তাকে অস্থির করে তুলছে, তার ওপর আবার একটা মাফিয়া ডনের বংশধর! সব মিলিয়ে বাঁধনের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর, এক গভীর শ্বাস নিয়ে বাঁধন মারুফ হোসেনের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন তীক্ষ্ণ এক অনুসন্ধিৎসু ভাব।
—- “তাহলে সেই রজনী রহমান আমার বাবাকে কেন বিয়ে করল?”
মারুফ হোসেন কাঁচুমাচু হয়ে বললেন,
—- “সত্যি বলছি, এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। রজনী কেন আপনার বাবাকে বেছে নিয়েছে, তার কোনো কিছুই আমার জানা নেই।”
বাঁধন প্রশ্ন করল,
—- “আপনার সেই বন্ধুর নাম কী, যে আপনাদের সব ফুটেজ গিলে রেখেছে?”
মারুফ হোসেন বললেন,
—- “তার নাম মুভিন।”
বাঁধন তৎক্ষণাৎ জানতে চাইল,
—- “বর্তমানে সে কোথায় আছে?”
মারুফ হোসেন একটু ইতস্তত করে বললেন,
—- “এইটা আমি নিশ্চিত জানি না। আগে সে কানাডায় কাজ করত, কিন্তু এখন সঠিক কোথায় আছে সেটা একমাত্র রজনীই জানে।”
বাঁধন এবার শেষ প্রশ্নটি করল, যা রূপার অস্তিত্বের চাবিকাঠি।
—- “রূপার আসল জন্মনিবন্ধন বা অরিজিনাল বার্থ সার্টিফিকেটটা কোথায়?”
মারুফ হোসেনের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত ও আতঙ্কিত,
—- “সব ডকুমেন্টস মুভিনের কাছে।”
বাঁধন বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল, যেন তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। তার গলার স্বর এখন নিচু কিন্তু ভীষণ তীক্ষ্ণ, সে মারুফ হোসেনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
—- “ওদের প্ল্যান কী ?”
মারুফ হোসেন ভয়ে কুকড়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
—- “প্ল্যান অনুযায়ী রূপা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার কাছ থেকে সব সই নিয়ে তাকে মেরে ফেলা। ”
—- “এইইই…!”
মুহূর্তের মধ্যে বাঁধনের ভেতরকার সব বাঁধ ভেঙে গেল। সে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে মারুফ হোসেনের গলাটা দুই হাতে চেপে ধরল। তার শরীরের প্রতিটি শিরা তখন রাগে ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। বাঁধন চিৎকার করে উঠল,
—- ” আমার রূপের গায়ে যদি একটা আঁচড়ও লাগে, তাহলে তোদের সব কটাকে আমি নিজের হাতে খুন করবো।”
গলা টিপে ধরায় মারুফ হোসেনের দম বন্ধ হয়ে আসছে, তিনি নিথর হয়ে হাত-পা ছুড়ছেন। অখিল দ্রুত এগিয়ে এসে বাঁধনের পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কোনোমতে তাকে টেনে সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
—- “বাঁধন! ছাড়! কী করছিস তুই? এ তো এখন আর কিছু করছে না, সব তো স্বীকারই করে নিল! ছাড় ভাই, শান্ত হ!”
অনেক ধস্তাধস্তির পর অখিল কোনোমতে বাঁধনকে ছাড়াতে সক্ষম হলো। মারুফ হোসেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে হড়হড় করে কাশতে লাগলেন। বাঁধনের সারা শরীর তখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপছে। রূপাকে হারানোর ভয়টা মুহূর্তের জন্য তার ভেতরটাকে হিম করে দিল। অখিল বাঁধনের কাঁধে শক্ত করে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
—- “তুই শান্ত হ, কিচ্ছু হবে না। রূপার কোনো ক্ষতি আমরা হতে দেবো না। কিন্তু এখন যা করতে হবে, খুব ঠান্ডা মাথায় সাবধানে করতে হবে। রূপার পরীক্ষা চলছে, এই অবস্থায় ও যেন কিচ্ছু না বুঝতে পারে। তুই একদম অস্থির হস না, চুপচাপ ওর পরীক্ষাটা শেষ হতে দে। তারপর রজনী রহমানের মুখোশ আমি আর তুই মিলে এমনভাবে টেনে ছিঁড়ে ফেলব যে, তিনি আর কোথাও পালানোর জায়গা পাবে না।”
বাঁধনের অস্থিরতা কোনোভাবেই কমছে না, তার সারা শরীর যেন বরফের মতো হিম হয়ে আসছে। রূপার প্রতি তার এই তীব্র আসক্তি আর দুর্বলতা তাকে এক মুহূর্তের জন্য স্থির থাকতে দিচ্ছে না। লোকআপ থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে অখিলকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—- “আমার এখনই কলেজে যেতে হবে। এই মুহূর্তে রূপকে একবার না দেখলে আমি পাগল হয়ে যাব।”
অখিল তাকে থামানোর জন্য পিছু পিছু ছুটল, কিন্তু বাঁধন তখন ঝড়ের গতিতে থানার গেট দিয়ে বেরিয়ে বাইকের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। ইঞ্জিনের প্রচণ্ড গর্জন তুলে অখিল কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইকটি বিদ্যুতের গতিতে কলেজের দিকে ছুটল। বাঁধনের মাথার ভেতর তখন কেবল একটাই চিন্তা রূপা। রূপার মুখটা একবার না দেখলে তার বেঁচে থাকাটাই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছে।মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় বাঁধনের বাইকটি আনন্দ মোহন কলেজের সামনে এসে থামল। পরীক্ষার সময় বলে পুরো ক্যাম্পাস অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। বাঁধন বাইক থেকে নেমেই গেটের দিকে এগিয়ে গেল। পুলিশের ইউনিফর্মে একজন এসপিকে দেখে দারোয়ানের আটকানোর সাহস হলো না, সে ভয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
বাঁধন কলেজের ভেতর দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে ফোন বের করল। সে আকাশকে কল দিল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে আকাশ রিসিভ করে বলল,
—- “হ্যালো বাঁধন, বল?”
বাঁধন অস্থির কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—- “রূপের সিট কোন ভবনে পড়েছে?”
আকাশ কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
—- ” এবার সায়েন্সের নিউ বিল্ডিংয়ে পড়েছে, কেন?”
বাঁধন জানতে চাইল,
—- “তুই কোথায়?”
আকাশ উত্তর দিল,
—- “আমি ওদের ক্লাসেই আছি।”
বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলল,
—- “আমি আসছি, তুই দাঁড়া।”
ফোনের লাইনটা তুলেই বাঁধন নিউ বিল্ডিংয়ের দিকে দৌড় দিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি ধড়ফড়ানি, হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা ভয় আর রূপাকে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে পাগলের মতো ধাবিত করছে।বাঁধন সোজা ক্লাসরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। অনেক ছাত্র-ছাত্রীর ভিড়ের মাঝে সে অধীর হয়ে রূপাকে খুঁজতে লাগল। ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে পড়ল এক পাশের কিনারে, প্রথম বেঞ্চে। রূপা সেখানে একাগ্রচিত্তে মাথা নিচু করে লিখে যাচ্ছে। রূপার সেই শান্ত, স্নিগ্ধ মুখটা দেখামাত্রই বাঁধনের বুকের ভেতরকার যাবতীয় অস্থিরতা আর ঝড়ের দাপট মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে গেল। যেন এই মেয়েটার মাঝেই তার অস্তিত্বের সমস্ত শান্তি লুকিয়ে আছে। বাঁধন দুই হাত বুকে ভাঁজ করে দরজায় হেলান দিয়ে এক ধ্যানে সেই অষ্টাদশীর দিকে তাকিয়ে রইল।ঠিক সেই সময় আকাশ বাঁধনকে খেয়াল করল। সে মৃদু পায়ে এগিয়ে এসে বাঁধনের পাশে দাঁড়াল। বাঁধনের দৃষ্টি অনুসরণ করে আকাশ কৌতুকের স্বরে বলল,
—- “কী দেখছিস?”
বাঁধন যেন কোনো এক ঘোরের মাঝে আছে, মৃদুস্বরে উত্তর দিল,
—- “নিজেকে দেখছি।”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে, অবাক হয়ে বলল,
—- “হোয়াট? তুই তো রূপাকে দেখছিস, তাহলে নিজেকে কীভাবে দেখছিস?”
বাঁধন তার দৃষ্টি রূপার ওপর থেকে না সরিয়েই গভীর স্বরে বলল,
—- “কারণ এই মেয়েটার মাঝেই আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি, আকাশ। এই মেয়েটার মাঝেই আমি আমার পুরো পৃথিবী দেখতে পাই, আমার হাসির কারণ দেখতে পাই, আমার পুরো জীবন দেখতে পাই। ওকে দেখা মানেই নিজেকে দেখা।”
আকাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাঁধনের মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
—- “হঠাৎ কলেজে কিছু দরকার ছিল? নাকি অন্য কোনো ব্যাপার?”
বাঁধন শান্তভাবে উত্তর দিল,
—- “না, তেমন কিছু না। ছুটির পর রূপাকে ফ্ল্যাটের সামনে নামিয়ে দিয়ে আসিস।”
এতটুকুই বলে বাঁধন আরেকবার রূপার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি। এরপর আর কোনো কথা না বলে সে উল্টো ঘুরে নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়াল। বেচারা অষ্টাদশী পরীক্ষার খাতায় এতই মগ্ন ছিল যে, কেউ যে একটু আগে তাকে প্রাণ ভরে দেখে গেল, তা সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না।
পরীক্ষা শেষে রূপা বৃষ্টি, কেয়া আর নাদিয়ার সাথে গল্প করতে করতে করিডোর পেরিয়ে বাইরে এল। গেটের কাছে আসতেই সীমার সাথে দেখা। সীমা রূপাকে দেখেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
—- “তোমার পরীক্ষা কেমন হলো রূপা?”
রূপা মিষ্টি হেসে জবাব দিল,
—- “আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো। তোমার কেমন হলো?”
সীমাও হাসল,
—- “আমারটাও আলহামদুলিল্লাহ।”
কিছুক্ষণ কুশল বিনিময় করে সবাই কলেজ থেকে বেরিয়ে এল। মেইন গেটের কাছে আকাশ দাঁড়িয়ে ছিল। রূপা আর বৃষ্টিকে দেখেই সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
—- “তোদের পরীক্ষা কেমন হলো?”
দুজনেই উৎফুল্ল হয়ে জানাল,
—- “আলহামদুলিল্লাহ!”
আকাশ তখন রূপার দিকে তাকিয়ে বলল,
—- “রূপা, তুই গাড়িতে ওঠ। আমি তোকে ফ্ল্যাটের সামনে নামিয়ে দিয়ে আসব।”
বৃষ্টি রূপার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল,
—- “তাহলে তুই যা। কাল দেখা হচ্ছে।”
রূপা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। বৃষ্টি একটা রিকশা নিয়ে চলে গেল। আকাশ রূপাকে নিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে নামিয়ে দিয়ে দ্রুত বিদায় নিল। বাসায় ফিরে রূপা দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল। এরপর কিচেনে গিয়ে পরম মমতায় ‘ক্যান্ডি’কে খাবার খাওয়ানো শুরু করল। সারা দিনের ক্লান্তি তখন তার শরীরজুড়ে বাসা বেঁধেছে। ক্যান্ডিকে খাইয়ে সে বিছানায় এল, আর মাথা বালিশে ছোঁয়ানো মাত্রই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ রূপার ঘুম ভাঙল। উঠে ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল এত লম্বা সময় সে ঘুমিয়েছে যে নিজেই টেরই পায়নি। পাশে তাকিয়ে দেখল ক্যান্ডি চুপচাপ বসে আছে। রূপা আলতো করে ক্যান্ডির মাথায় হাত বুলিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। এরপর সরাসরি চলে গেল স্টাডি রুমে। পড়ার টেবিলে ডুবে থাকতে থাকতে রাত দশটা বেজে গেল। ক্লান্তিতে শরীর এলিয়ে দিতে গিয়েই তার হঠাৎ মনে পড়ল বাঁধনের কথা। এতক্ষণে তো বাঁধনের চলে আসার কথা, কই সে তো এখনো আসেনি!রূপা দ্রুত স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে এল। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই তার কপাল কুঁচকে উঠল। ঘরজুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু টিভির আবছা নীল আলোয় দেখা যাচ্ছে সোফায় বসে আছে বাঁধন। তার পরনে আজ রূপার সাথে ম্যাচিং করা কালো টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার। বাঁধন পাথরের মূর্তির মতো টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। রূপা বেশ অবাক হলো আজ বাঁধন এমন নীরব কেন? সে স্টাডি রুমে গেল না কেন? রূপা ধীরে ধীরে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে এক গ্লাস পানি খেলো, ভাবল হয়তো বাঁধন তাকে ডাকবে। কিন্তু না, বাঁধন ডাকার তো প্রশ্নই আসে না, সে রূপার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। কী হচ্ছে এসব? রূপা কিছুই বুঝতে পারছে না।দ্বিধাভরা পায়ে রূপা সোফার কাছে এগিয়ে এল। বাঁধন নির্বাক।
রূপা ছোট করে একটা গলা খাঁকারি দিল, তাও বাঁধন কোনো সাড়া দিল না, এমনকি তাকালও না। রূপার জেদ চড়ে গেল। গাল ফুলিয়ে সে জেদের বশেই বাঁধনের পাশেই গিয়ে বসল। দুজনেই টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই বাঁধন রিমোট টিপে চ্যানেল পরিবর্তন করতে করতে একটি হিন্দি মিউজিক চ্যানেলে থামল। হঠাৎ স্ক্রিনে ভেসে ওঠা দৃশ্যটিতে দুজনেরই নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। ‘আশিক বানায়া আপনে’ গানটি চলছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মেয়েটি সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে এসে ছেলেটিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চেপে ধরল, তারপর সরাসরি তার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল। এরপর দুজনের মধ্যে শুরু হলো এক তীব্র আবেগ। রূপা লজ্জায় দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু কেন জানি তার দৃষ্টি বারবার টিভির সেই দৃশ্যের দিকেই ছুটে যাচ্ছে। হঠাৎ যা দেখল, তাতে মুহূর্তের মধ্যে তার গাল দুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল, সারা শরীরে বয়ে গেল এক অদ্ভুত শিহরণ। সে আড়চোখে বাঁধনের দিকে তাকাতেই দেখল, বাঁধনের দৃষ্টি টিভির পর্দায় নয়, বরং তার দিকেই নিবদ্ধ। রূপা চমকে উঠল, পালানোর জন্য সোফা থেকে উঠতেই বাঁধন ঝড়ের গতিতে তার হাত চেপে ধরল।
—- “রূপ!”
বাঁধনের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে রূপার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। বাঁধন এক হেঁচকা টানে রূপাকে নিজের বুকের ওপর টেনে আনল। নিমেষেই রূপা আছড়ে পড়ল বাঁধনের সুঠাম বুকের খাঁজে। ভয়ে আর লজ্জায় তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। বাঁধন রূপার ঘাড় থেকে চুলগুলো সরিয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
—- “চল না, টিভিতে ওরা যা করছে আমরাও একটু করি। আমাদের বিয়ের পর এতদিন পেরিয়ে গেল, অথচ তোকে একটা চুমু পর্যন্ত খেতে পারিনি। আজ কি দিবি তোর ওই গোলাপি ওষ্ঠে গভীর একটা চুমু খেতে?”
বাঁধনের তপ্ত নিঃশ্বাস রূপার কানে আছড়ে পড়তেই তার শরীর হিমশীতল হয়ে গেল। সে কোনো কথা বলতে পারছে না, তার এই স্তব্ধতা যেন বাঁধনকে আরও বেসামাল করে তুলল। পুরুষটির আবেগের ঢেউয়ে ভেসে রূপার কোনো প্রতিরক্ষা আর টিকল। ধীরে ধীরে ভেজা ওষ্ঠজোড়া রূপার ফর্সা ঘাড়ের ওপর চেপে ধরল বাঁধন।ঘাড়ের কাছে ভেজা স্পর্শ পেতেই সারা শরীরে যেন বিদ্যুতের ঝিলিক বয়ে গেল রূপার। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল বাঁধনের টি-শার্ট। তীব্র উত্তেজনায় নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আছড়ে পড়ছে বুকের ওপর, আর প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে শরীরের দুলুনি যেন বাঁধনের শরীরকেও অস্থির করে তুলছে।ঠোঁট নিয়ে কানের লতিতে উষ্ণ ও আর্দ্র ছোঁয়া দিয়ে শিহরণ জাগিয়ে তুলল বাঁধন। শরীরের প্রতিটা ভাঁজে তখন এক আদিম অস্থিরতা, মনে হচ্ছে কোনো উত্তাল সমুদ্রে খাবি খাচ্ছে মেয়েটি। পুরুষটির নেশাতুর চোখ গিয়ে পড়ল রমণীর কাঁধে।টি শার্টটা কাঁধ থেকে কিছুটা নিচে নেমে যাওয়ায় ইনারটি কিছুটা উন্মুক্ত হয়ে আছে। টিভির আবছা নীলচে আলোয় রঙটা যেমন রহস্যময় লাগছে, তেমনি শরীরের মসৃণ ভাঁজগুলো স্পষ্ট ধরা দিচ্ছে তার দৃষ্টিতে। এক মুহূর্তে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নেশাময় হাসি ফুটে উঠল বাঁধনের। কানের কাছে উষ্ণ মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে।
—- “ইট লুকস সো বিউটিফুল।”
ছটফট করে উঠল রূপা। নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে, কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে ক্ষীণ সুরে জিজ্ঞেস করে।
—- “কিসের?”
রমণীর চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় শরীরের দিকে ইঙ্গিত করল বাঁধন। দৃষ্টি নামিয়ে কাঁধের কাছে নিজের উন্মুক্ত ইনার ওপর নজর পড়তেই চোখের পাতা কাঁপতে লাগল রূপার। লজ্জায় আর আবেশে রক্তিম হয়ে উঠল গাল, আর শরীরের উত্তাপ যেন বহুগুণ বেড়ে গেল।ঠোঁট কেঁপে বিড়বিড় করল রূপা।
—- “অসভ্য।”
রমণীর প্রতিটি বিড়বিড়ানি স্পষ্ট শুনতে পেল বাঁধন। সহসা কোমর জড়িয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল । যেন মাংসপেশিতে মাংসপেশি মিশিয়ে নিজের শরীরের অস্তিত্বে বন্দি করে ফেলতে চায়। উত্তেজনায় গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করে উঠল রূপা। প্রতিটা ছটফটানি পুরুষটির পুরুষালি অহংকারে এক আদিম তৃপ্তির জন্ম দেয়। পুরুষটির স্পর্শে সারা শরীর ঠান্ডা বরফ হয়ে জমে আসছে রূপার। তীরের ফলার মতো কাঁপতে থাকে ওষ্ঠজোড়া। সেই কম্পমান ঠোঁটের দিকে স্থির হয়ে রইল বাঁধনের নেশালো জোড়া চোখ । রূপার কানের কাছে তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে নেশালো গলায় আওড়াল সে।
—- “ডোন্ট স্টপ মি রূপ। জাস্ট একটা চুমু খাবো।”
বলেই রমণীর তিরতির করে কাঁপা ঠোঁটে নিজের ওষ্ঠজোড়া ডুবিয়ে দিতে উদ্যত হলো বাঁধন। মুহূর্তে নিস্তেজ ও অবশ হয়ে এল রূপা। যতো কাছে আসছে উন্মাদ পুরুষটি, ততোই নেশার ঘোরে ঢলে পড়ছে রমণীটি। পারছে না এই আদিম ছোঁয়া থেকে নিজেকে দূরে সরাতে। মনে হচ্ছে পুরুষটিকে থামানো মানে নিজেকেই মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত রাখা, যা সে চায় না। পুরুষালি উত্তপ্ত নিশ্বাস এখন অনুভব করছে রূপা। নিমিষে চোখ বন্ধ করে নিল রমণী। দুহাতে খামচে ধরে রাখল বাঁধনের টি-শার্ট। রমণীর ঠোঁটের ঠিক এক চুল দূরত্বে নিজের তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে থামল বাঁধন। প্রতিটি স্নায়ু তখন উত্তেজনায় টানটান, যেই রমণীর ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিতে যাবে ঠিক তখনি।
—- “টুন টুন টুন টুন।”
সহসা দরজার কলিং বেলে দুজনে চমকে যায়। এক মুহূর্তে দূরে সরে যায় রূপা। সারা শরীর তখনো থরথর করে কেঁপে চলছে তার। রাগে ও বিরক্তির চোটে রক্তবর্ণ হয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল বাঁধন । মেজাজ হারিয়ে গর্জে উঠল সে।
—- “কোন খানকির পোলারে, গুয়া মারবার আইছে এই সময়।”
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল বাঁধন। হাতের কড়া চাপে দরজার নবটা যেন পিষ্ট হচ্ছে, কপালে দপদপ করা শিরাগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল বাঁধনের মেজাজ তখন তুঙ্গে। এক ঝটকায় দরজাটা খুলে সে যেই না গর্জে ওঠার জন্য মুখ খুলেছে, অমনি পারফিউমের তীব্র গন্ধে চারপাশটা মাতাল করে দিয়ে এক সুন্দরী মেয়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে পড়ল। বাঁধন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটি তার গলায় দুহাত জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ল, আর সিল্কের স্পর্শে বাঁধনের শরীরটা মুহূর্তের জন্য যেন স্থবির হয়ে গেল। মেয়েটি হেসে বাঁধনের চোখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৬
—- “হেই সুইটহার্ট, হাউ আর ইউ?”
মুহূর্তে রূপার মাথায় যেন আস্ত পাহাড় ভেঙে পড়ল। কলিজাটা ছ্যাত করে উঠল। মনে হলো কলিজার ভেতর কেউ ছ্যাত করে জ্যান্ত ছুরি ঢুকিয়ে দিল। সমস্ত শিরা-উপশিরায় রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। চোখের সামনে দুলতে লাগল চারপাশ, আর বুকের ভেতরটা শূন্য এক যন্ত্রণায় এমনভাবে দুমড়ে-মুচড়ে গেল যে রূপা নিজের অস্তিত্বটুকুও যেন হারিয়ে ফেলল। প্রতিটি নিশ্বাস তার বুকের ভেতর পাথরের মতো ভারী হয়ে বসতে লাগল, আর সেই ছুরির ফলায় বিদ্ধ হৃদপিণ্ড থেকে যেন টপ টপ করে ঝরতে লাগল রক্তক্ষরণ, যা তাকে জীবন্ত দাহ করতে শুরু করল।
