Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪
সুমি চৌধুরী

চৌদ্দ বছর আগে যে ১৬ বছরের জেদি ছেলেটা অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিল, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিধ্বংসী সুন্দর পূর্ণ যুবক। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি দীর্ঘকায় এক সুঠাম দেহ,যা নিয়মিত জিম আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমে খোদাই করা। তার চওড়া বুকের ছাতি আর লোহার রডের মতো শক্ত পেশিবহুল হাতগুলো শার্টের হাতা ভেদ করে বীরত্ব জানান দিচ্ছে। গায়ের রঙ দুধে-আলতা ফর্সা, যাতে এক রাজকীয় আভা খেলা করছে।সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে তার বাম ভ্রুর ঠিক মাঝখানটা। আধুনিক স্টাইলে ভ্রুর সেই জায়গাটা নিখুঁতভাবে স্লিট করে কাটা যা তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক আদিম পৌরুষ আর রহস্যময়তা যোগ করেছে। তার ফর্সা বাম হাতের কবজিতে আঁকা ব্ল্যাক ট্যাটু যেন কোনো আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে আছে। তার তীক্ষ্ণ নাক আর গাম্ভীর্যমাখা পাতলা ঠোঁট যে কাউকে এক পলকে বুঝিয়ে দেয় যে, সে এখন আর সেই অবুঝ কিশোর নয়।

শিলা রহমান মুগ্ধ নয়নে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে প্রায় রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলেন।
“এটা কি আমাদের সেই বাঁধন! মাশাআল্লাহ, কত বড় হয়ে গেছিস তুই!”
বাঁধন তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতি শীতল হাসি ফুটিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল। “আসসালামু আলাইকুম কাকি। কেমন আছো?”
শিলা রহমান খুশিতে যেন কথা হারিয়ে ফেলছেন। তিনি গদগদ হয়ে বললেন। “ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি ভালো আছি রে, কিন্তু তুই তো কত বড় হয়ে গেছিস! বিশ্বাস কর, তোকে একদম চিনতেই পারছি না আমি।”
ঠিক তখন আকাশ একটা দামী শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে দোরগোড়া দিয়ে ভেতরে ঢুকল। মায়ের এমন অবাক হওয়া দেখে সে কিছুটা রসিকতা করে বলল।
“মা, ছোটবেলা থেকে তো মানুষ বড়ই হয়, এটাই তো স্বাভাবিক। তুমি এমন করছো যেন ও এখনো সেই বারো বছরের বাচ্চাই থাকবে।”

রজনী রহমান দরজার এক কোণে মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের ছেলেকে সামনে দেখেও তাঁর মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না। এদিকে আকাশ গিয়ে শোবার ঘর থেকে হাজি রহমানকে ডেকে আনল। তিনি সবেমাত্র তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন, কিন্তু দাদুর আসার খবর পেয়েই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। বাঁধনকে দেখা মাত্রই বৃদ্ধ মানুষটি ছোট বাচ্চার মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
“আমার দাদুভাই এসেছে! আমার সেই ছোট্ট বাঁধন দাদুভাই এসেছে।”
বাঁধনও তার মজবুত হাত দুটো দিয়ে বৃদ্ধ দাদুকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। তার দীর্ঘ শরীরে দাদুকে যেন একদম ছোট দেখাচ্ছিল। বাঁধন নিচু স্বরে বলল, “আসসালামু আলাইকুম দাদা। কেমন আছো তুমি?”
হাজি রহমানের চোখের কোণ বেয়ে তখন আনন্দের নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। তিনি ধরা গলায় বললেন।
“ওলাইকুম আসসালাম আলহামদুলিল্লাহ দাদুভাই। এতকাল বেঁচে তো ছিলাম, কিন্তু তোকে পেয়ে আজ মনে হচ্ছে আমি সত্যি সত্যি ভালো আছি।”

এমন সময় আহসান রহমান আর আতিক রহমান ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। নিজের ছেলেকে সামনাসামনি দেখে আহসান রহমানের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি দীর্ঘ এক সুঠাম দেহ, যা কঠোর জিম আর পরিশ্রমে খোদাই করা এক জীবন্ত ভাস্কর্য। আহসান রহমান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এই সেই ছোট্ট বাঁধন।
আহসান রহমান খুব করে চাইলেন বাঁধন অন্তত একবার তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকুক, কিন্তু বাঁধন আহসান কিংবা রজনী কারোরই চোখের দিকে তাকাল না। তারা যেন সেখানে নেই, তাদের অস্তিত্ব যেন বাঁধনের কাছে অদৃশ্য। বাঁধন অন্যদের সাথে স্বাভাবিক কথা বলে নিজের ভারি সুটকেসটা নিয়ে গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেল।পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে এক অসহ্য নীরবতা নেমে এল। বাঁধনের এই মৌন উপেক্ষা সবার বুকে তীরের মতো বিঁধল। আহসান রহমান আর শরীর ধরে রাখতে পারলেন না, সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। আতিক রহমান তাঁর পাশে বসে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন।

“চিন্তা করো না ভাইয়া, সব ঠিক হয়ে যাবে। ও হয়তো এখনো তোমার ওপর অনেক অভিমান করে আছে।”
রজনী রহমান আর সইতে পারলেন না। আঁচলে মুখ চেপে কাঁদতে কাঁদতে নিজের রুমে চলে গেলেন। বাঁধনের সেই জ্বলন্ত রাগ যে আজও এক ফোঁটাও কমেনি, তা তিনি হাড়হাঁড়ি টের পেলেন। কিছুক্ষণ পর আহসান রহমান রুমে ঢুকলে রজনী ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন।
“আমার জন্যই আজ আপনার ছেলেটার সাথে আপনার সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেল। আমি নারী হিসেবে সত্যি কলঙ্কিত।”
আহসান রহমান ধমক দিয়ে বললেন।
“খবরদার! এই কথা যেন তোমার মুখে দ্বিতীয়বার না শুনি। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।”
রজনী রহমান চোখের জল মুছে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন।
“আমি কি কিছুদিনের জন্য রূপাকে ওর নানুর বাড়ি পাঠিয়ে দেব? বাঁধন যদি আবার ওর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে?”
আহসান রহমান গম্ভীর গলায় বললেন।
“না, পাঠানোর দরকার নেই। সামনে ওর ফাইনাল পরীক্ষা, পড়ার ক্ষতি হবে। তুমি শুধু রূপাকে কড়াভাবে বলে দিও ও যেন কোনোভাবেই বাঁধনের আশেপাশে না যায়। ও যেন সারাক্ষণ নিজের রুমেই থাকে। ওর সামনে গিয়ে লাফালাফি বা চপলতা করার কোনো দরকার নেই।”

দিনের রোদ কিছুটা কমে আসতেই বাঁধন আকাশের বাইকটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তার পরনে আজ কুচকুচে কালো টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি দীর্ঘ সুঠাম দেহের অধিকারী বাঁধন যখন মাথায় হেলমেট গলিয়ে বাইকটা স্টার্ট দিল, তখন তার পেশিবহুল হাতের টানে টি-শার্টের হাতাগুলো বাতাসের ঝাপটায় উড়তে লাগল। হেলমেটের কাঁচের ওপাশ দিয়ে তার স্লিট করা ভ্রু আর তীক্ষ্ণ মায়াবী চোখ দুটো যেন এক বিধ্বংসী সৌন্দর্যের জানান দিচ্ছে। বাইকের গতি বাড়িয়ে সে যখন রাস্তা দিয়ে ঝড়ো বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো এক রাজকীয় আগ্নেয়গিরি যেন ধেয়ে চলেছে।
এদিকে রূপার কলেজ ছুটি হলো। সব বান্ধবীদের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে সে ধীরপায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কিছুটা পথ যেতেই হঠাৎ আকাশের মুখ ভার হয়ে এল, মেঘের ঘনঘটা দেখে বোঝা যাচ্ছে এখনই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে।সত্যি সত্যি মুহূর্তে রিমঝিম বৃষ্টি নামা শুরু করে দিল।সে তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে নিজের ছোট্ট ছাতাটা বের করে মেলে ধরল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, বৃষ্টিতে একটু ভিজলেই তার ধুম জ্বর চলে আসে, আর একবার জ্বর বাধাতে পারলেই আম্মুর এক গাদা বকুনি নিশ্চিত।সাবধানে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রাস্তার এক জায়গায় জমে থাকা কাদায় রূপার পা হড়কে গেল। মুহূর্তে ঠাস করে আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল সে। হাতের ছাতাটা ছিটকে দূরে গড়িয়ে পড়ল, আর সুন্দর ধবধবে কলেজ ড্রেসটা কাদায় মাখামাখি হয়ে একাকার। রূপা বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে গর্জে উঠল।

“দূর ছাই! ঠিক এখনই পড়তে হলো?”
বৃষ্টি ততক্ষণে আরও জোরে নামতে শুরু করেছে। পুরো ভিজে জবুথবু হয়ে যাওয়া রূপার গাল বেয়ে বৃষ্টির পানি মিষ্টির শিরার মতো গড়িয়ে পড়ছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে কাপড় থেকে কাদা ঝাড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে ছাতাটা হাতে তুলে নিল। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর চারপাশের শীতল হাওয়ায় রূপার মনটা হুট করেই নেচে উঠল। তার খুব ইচ্ছে হলো বৃষ্টির এই ধারায় একটু নাচতে।সে একবার ডানে-বামে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল ধারেকাছে কেউ নেই, শুধু দু-একটা গাড়ি সাঁ করে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে। ব্যাস, আর পায় কে! রূপা নিজের হাতের ছাতাটা একবার ডান দিকে আবার বাঁ দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে ছোট বাচ্চার মতো নেচে নেচে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার এই চপলতা আর বৃষ্টির আনন্দ যেন এক মুহূর্তের জন্য সব বিরক্তি ধুয়ে মুছে দিল।
রূপা বৃষ্টির তালে তালে নাচতে নাচতে খিলখিল করে হেসে গেয়ে উঠল সেই পরিচিত লোকগীতি।

~ মন বাগানটা রহিয়াছে খালি~
~হায় খালি~
~কোথায় পাবো সুজন মালি~
~হায়রে ভালোবাইসা ফুল ফোটানোর সুজন মালি কই~
গানটা গাইতে গাইতে সে নিজের মনেই মজা করে চিৎকার দিয়ে দুষ্টুমিভরা গলায় বলল।
“পাইবা সবি, আর কিছুদিন ধৈর্য ধর রূপা।”
সে জানে তার এই পাগলামি দেখার মতো কেউ নেই নির্জন রাস্তায়, তাই সে মনের আনন্দে বৃষ্টির জল গায়ে মেখে আর ছাতাটা মাথার ওপর বনবন করে ঘুরিয়ে নেচে নেচে বাড়ির দিকে এগোতে লাগল। বৃষ্টির ধারাগুলো তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত সতেজতা এনে দিচ্ছে।সৃষ্টিকর্তা যেন আজ তার গানের প্রতিটি কলি পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই অঝোর ধারায় এই বৃষ্টি নামিয়েছেন, আর রূপার এই নির্মল পাগলামি দেখার জন্য রাস্তার মোড়ে কাউকে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
রাস্তার ঠিক ধারেই বাইকটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন। মাথায় এখনো হেলমেট পরা থাকলেও তার গ্লাসটা তোলা। সে ইচ্ছে করেই বাইক থামিয়ে এই অঝোর বৃষ্টিতে ভিজছে, অনেক বছর দেশের বাইরে থাকার কারণে এমন ঝমঝমে বৃষ্টিতে ভেজা হয় না তার। আজ কেন জানি এই ভেজাটা খুব ভালো লাগছে বাঁধনের। বৃষ্টির তোড়ে তার কালো টি-শার্ট ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, যা তার জিম করা সুঠাম দেহের প্রতিটি পেশিকে আরও নিখুঁত আর বলিষ্ঠ করে ফুটিয়ে তুলেছে। বাঁধন চুপচাপ আকাশপানে মুখ তুলে বৃষ্টির স্পর্শ অনুভব করছিল।
হঠাৎ সে মুখ নামিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল তার শিরদাঁড়া দিয়ে। সামনেই এক কিশোরী মেয়ে, যার কাঁধে স্কুল ব্যাগ, শুভ্র কলেজ ড্রেসটা কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে, কিন্তু তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার মেঘের মতো কালো লম্বা দুটো বিনুনি দুই পাশে দোল খাচ্ছে। হাতে ধরা ছাতাটা ডানে-বামে দুলিয়ে সে কোনো এক রূপকথার রাজকন্যার মতো নেচে নেচে এগিয়ে আসছে।

বাঁধন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যখন রূপার হাসিখুশি মুখে এসে পড়ছে, তখন তাকে কোনো অপার্থিব পরীর মতো লাগছে। রূপার গালের টোল আর হাসির সময় উঁকি দেওয়া সেই ছোট্ট ঘ্যাঁচ দাঁতটি যেন এক অদ্ভুত সারল্য ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। তার দুলে ওঠা বিনুনি, বৃষ্টির ঝাপটায় চোখ বুজে আসা আর আপনমনে গেয়ে ওঠা সেই গানের সুর সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রূপা যখন বৃষ্টির তালে পা ফেলে ছাতাটা মাথার ওপর বনবন করে ঘোরাচ্ছে, তখন তার চারপাশের কাদা আর বৃষ্টিও যেন এক ছন্দময় উৎসবে মেতে উঠেছে।
বাঁধন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সেই পাথুরে গম্ভীর হৃদয়ে যেন প্রথমবার কোনো এক চপল হাওয়ার দোলা লাগল। এই প্রথম কোনো এক অজানা মেয়ে তার সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে যাকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন এই বৃষ্টির ধারায় মিশে থাকা এক জীবন্ত কবিতা। বাঁধনের তীক্ষ্ণ মায়াবী চোখ দুটো হেলমেটের গ্লাসের ওপাশ থেকে অপলক ভাবে এই বিধ্বংসী সুন্দরের সাক্ষী হয়ে রইল।
কথায় আছে না, ভাগ্য খারাপ থাকলে যেকোনো জায়গায় তার ফলাফল দেয়। রূপার বেলাতেও ঠিক তাই হলো। সে যখন আনন্দের আতিশয্যে ছাতাটা গোল করে ঘোরাচ্ছিল, ঠিক তখনই কাদা পিছলে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ধপাস করে আছাড় খেল সে।

বাঁধন অজান্তেই নিজের বাইক ছেড়ে এগিয়ে এল। সে নিজেও জানে না কেন সে এগিয়ে আসছে, কিন্তু এই মেয়েটির চপলতা আর আকস্মিক পড়ে যাওয়া যেন তাকে চুম্বকের মতো টেনে নিল। রূপা এবার হাঁটুতে বেশ ভালোই চোট পেয়েছে। সে ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে কঁকিয়ে উঠতে উঠতে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই বাঁধন তার সামনে এসে দাঁড়াল। কালো টি-শার্টে ভেজা পেশিবহুল শরীরের দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে সে গম্ভীর গলায় বলল।
“বেশি লাফালাফি করলে এমনই হয়।”

অচেনা এক পুরুষের গম্ভীর আর পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠস্বর শুনে রূপা চমকে উঠল। সে ব্যথায় কুঁচকানো মুখটা তুলে সামনে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালদেহী পুরুষ যেন এক তালগাছ! যেমন লম্বা, তেমন তার শরীরের গঠন আর রাজকীয় গেটআপ। তবে মাথায় হেলমেট থাকায় রূপা বাঁধনের মুখটা দেখতে পাচ্ছে না শুধু হেলমেটের কাঁচের ওপাশ থেকে একজোড়া তীক্ষ্ণ আর মায়াবী চোখ তার নজরে এল। সেই চোখজোড়া দেখামাত্রই রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। হেলমেটের গ্লাসের ওপাশে একজোড়া গভীর কালো কুচকুচে চোখের মণি, যা মখমলের মতো মসৃণ অথচ আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত। ঘন কালো পাপড়িগুলো বৃষ্টির ছোঁয়ায় ভিজে একে অপরের সাথে লেপ্টে আছে, আর তার ওপর একজোড়া ঘন ভ্রু যেন শিল্পীর নিখুঁত তুলিতে আঁকা। এক মুহূর্তের জন্য রূপার হৃদস্পন্দন থেমে গিয়ে আবার দ্বিগুণ বেগে ধুকপুক করতে লাগল। এই পুরুষটির চোখের মণি আর সেই স্লিট করা ভ্রুর রহস্যময় চাহনি রূপাকে যেন সম্মোহিত করে ফেলল। রূপা অজান্তেই সব ব্যথা ভুলে গিয়ে হা করে বাঁধনের সেই গভীর আর মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে যেন ভুলেই গেল যে সে কাদায় মাখামাখি হয়ে মাঝরাস্তায় পড়ে আছে।
বাঁধন এই অচেনা মেয়েটিকে এইভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার বাম ভ্রুর সেই নিখুঁত স্লিট করা বা কাটা দাগটি কুঁচকে যাওয়ায় তাকে আরও বেশি গম্ভীর আর রহস্যময় দেখাচ্ছে। সে তার পকেট থেকে হাত বের না করেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় শুধাল।
“ডু ইউ নো মি?”

মুহূর্তে রূপার হুঁশ ফিরল। সামনে এত সুন্দর, হ্যান্ডসাম একটা ছেলেকে দেখে সে চট করে চারদিকে তাকাল। আশেপাশে জনমানবহীন নিস্তব্ধ রাস্তা, শুধু বৃষ্টির শব্দ। রূপার মনে সন্দেহের দানা বাঁধল এই ভরদুপুরে জনশূন্য রাস্তায় এমন নায়ক সুপুরুষ হুট করে কোত্থেকে উদয় হলো? তার মনে হলো, এ নির্ঘাত কোনো ভূত! নিশ্চিত তাকে একা পেয়ে এত সুন্দর পুরুষের রূপ নিয়ে তার ঘাড় মটকাতে এসেছে।ভয়ে রূপার শরীর হিম হয়ে এল। সে আবারও চারদিকে তাকাল, কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সামনে তাকিয়ে সে আবারও ভাবল, পুরুষটি আসলেই অনেক সুন্দর, যার ঘন পাপড়ি ঘেরা সেই চোখ আর স্লিট করা ভ্রু এই সামান্য চোখ জোড়াই যে কোনো মেয়ের মন কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মনের কোণ থেকে কুডাক দিয়ে উঠল।এ তো মানুষ না, ভূত।ভাবতেই রূপা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। বাঁধন কিছু বুঝে ওঠার আগেই রূপা নিজের ছাতাটা তুলে নিয়ে দিল এক দৌড়। তবে যাওয়ার আগে সে বড় করে এক চিৎকার দিল আর ভূতের মন্ত্র পড়ার মতো করে ছুড়ে দিল।
“ভূত আমার পুত, পেত্নি আমার জি”

“আল্লাহ আমার সাথে আছে, ভূত পুরুষ করবি তুই আমার কী”
বাঁধন রাস্তার মাঝখানে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার তীক্ষ্ণ মায়াবী চোখ জোড়ায় একরাশ বিস্ময়। কী হলো ঠিক এইমাত্র? এই মেয়েটা তাকে দেখে এভাবে ঝড়ের বেগে দৌড় দিল কেন? আর যাওয়ার আগে ওসব কী বলে গেল ভূত দেখার মতো অদ্ভুত সব মন্ত্র! তার মানে কি মেয়েটা তাকে কোনো অতৃপ্ত আত্মা বা ভূত ভেবে বসেছে।ভাবতেই বাঁধনের পাথুরে গাম্ভীর্য ভেঙে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। তার মতো এমন বিধ্বংসী ও প্রভাবশালী পুরুষ, যাকে এক পলক দেখার জন্য মেয়েরা রীতিমতো পাগল হয়ে থাকে, সেখানে এই কাদা মাখা মেয়েটা তাকে ভূত ভেবে ভয়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে পালালো! নিজের অজান্তেই বাঁধনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।
“স্টুপিড গার্ল।”
সে মাথা থেকে হেলমেটটা খুলে বাইকের ওপর রাখল। বৃষ্টির অবাধ্য ফোঁটাগুলো তার ফর্সা মুখে আছড়ে পড়ছে, আর সেই স্লিট করা ভ্রু বেয়ে পানি গড়িয়ে নামছে। সে দূর থেকে রূপার দৌড়ে পালানো পথের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে আবারও বিড়বিড় করল।
“বোকা মেয়ে।”

“ওস্তাদ, অনেক কষ্টে সব খোঁজ নিয়েছি। মেয়েটার নাম রূপা। আমাদের আনন্দমোহন কলেজেই পড়ে। শুনলাম মেয়েটা তার সৎ বাবার বাড়িতে থাকে, তার সৎ বাবার নাম আহসান রহমান।”
ব্রিজের রেলিংয়ের ওপর আয়েশ করে বসে ইশতিয়াক আপন গতিতে সিগারেট টানছিল। রনির কথা শুনে তার ঠোঁটে এক চিলতে পৈশাচিক অথচ শুকনো হাসি ফুটে ওঠে। ঠোঁটের কোণে সিগারেটটা চেপে রেখেই সে বিড়বিড় করল।
“রূপা! নামের মতোই রূপবতী?”
রনি কিছুটা অবাক হয়ে শুধাল।
“বস, আপনি কি ওই পিচ্চি মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেলেন?”
ইশতিয়াক হাসল। তারপর ধোঁয়া ছেড়ে বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে ইশারায় বোঝাল।
“পাগল হয়ে গেছি রে রনি। ওই মেয়ে আমার এই পাষাণ হৃদয়ে তুফান তুলে দিয়েছে।”
“ও মায়াগো ওস্তাদ! আপনি তাহলে সতি-সত্যিই দিওয়ানা হয়ে গেছেন?”
“হ্যাঁ,”

ইশতিয়াক শক্ত গলায় বলল।
“এতদিন আমার কাজ ছিল যারা আমার সামনে বড় আঙুল তুলত, তাদের আঙুল কেটে ছোট করে দেওয়া। আর এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য হলো ওই মেয়েটাকে নিজের জীবনসঙ্গিনী করা।”
রনি ইতস্তত করল।
“কিন্তু বস, ওর চোখে তো আপনি অলরেডি সকালে খারাপ হয়ে গেলেন। এখন সে কি আপনাকে আদৌও পছন্দ করবে?”
ইশতিয়াক নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে কপাল চুলকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। “সেটা আমার দেখার বিষয় না। ওরে ভালো লেগেছে, ওরে চাই মানে আমার চাই-ই চাই! সেইটা আদর দিয়ে হোক বা জোর করে।”
রনি পুনরায় কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ইশতিয়াক হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। সে দুই হাত ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে মুখটা আকাশের দিকে তুলে চোখ বন্ধ করল। অঝোর বৃষ্টির সেই আবহে মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল রূপার সেই মায়াবী হাসিমাখা মুখ। ইশতিয়াক চোখ বন্ধ রেখেই নেশাগ্রস্তের মতো গেয়ে উঠল।

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩

~পরীর মুখে মিষ্টি হাসি দেখতে চমৎকার~
~ এক নিমিষে কাইড়া নিল মনটা যে আমার~
~তার গালেতে আছে হায়রে ছোট্ট একটা তিল~
~পলক পড়ার আগেই বুকে মারল প্রেমের ডিল~
~নাইরে নাইরে নাইরে আমার বাঁচার উপায় নাই~
~চাইরে চাইরে চাইরে আমার পরী টারে চাই~

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৫