বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৬
রানী আমিনা
আনাবিয়ার যখন ঘুম ভাঙলো তখন ঘড়ির কাটা রাতের বারোটা ছুয়েছে। চারদিকে আঁধার অনুভব করে একবার চোখ কচলে আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলো সে। পাশ বালিশটাকে আরেকটু ভালো ভাবে জড়িয়ে নিতে গিয়েই টের পাশবালিশটা বেশ শক্তপোক্ত, বিরক্ত হয়ে অন্য বালিশ খুঁজতে এদিক ওদিক হাতড়াতের টের পেলো হাত পা ছাড়াও বহু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গজিয়েছে তার কোলবালিশের! এমনকি ক্ষণে ক্ষণে শ্বাসও ছাড়ছে!
মুহুর্তেই ঘুম উড়লো আনাবিয়ার। হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো তৎক্ষনাৎ! মীর ঘুমোচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে তার ধীর গতিতে। বাহিরের পোশাকটাও ছাড়েনি সে।
সে এখানে কখন এসেছে, কিভাবে এসেছে, কি হয়েছে, কেন সে মীরের বুকে কিছুই মনে পড়লোনা আনাবিয়ার! মনে পড়লো না কতক্ষণ এভাবে মীরের ওপর ঘুমিয়েছে সে।
অস্থির হয়ে এদিক ওদিক হাতড়ে ফোনটা খুঁজে চাপতেই দেখলো রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে! তারিখের সংখ্যা দেখে বুঝলো দুইদিন কেটে গেছে ইতোমধ্যে। সেই মুহুর্তেই তার মনে পড়লো ফারিশের সেদিনের কর্মকাণ্ডের কথা, আচমকা শরীর শিউরে উঠলো তার!
পরক্ষণেই স্মরণে এলো কিভাবে মীর হঠাৎ ঢুকে পড়েছিলো কামরায়! তারপর….. তারপর আর কিছু মনে পড়ছে না!
মীর কি করেছে ফারিশের সাথে? ফারিশকে মেরে ফেলেছে? তবে ওর মেয়ে দুটোর কি হবে? বাচ্চা বাচ্চা দুটো মেয়ে! কিন্তু মীর এত রাতে তার বিছানায় কি করছে? ফ্যালকন কোথায় গেছে? লুসি, কোকো, চাচাজি! সবাই কোথায়? সে মীরের কাছে কিভাবে এলো?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মাথা চেপে ধরে বসে রইলো আনাবিয়া। মনে পড়লো সে স্বপ্নে দেখেছিলো সবাই আশেপাশে বসে ছিলো তার, চাচাজি তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছিলো। ডাক্তার এসেছিলো, ইনজেকশন পুশ করেছিলো তার হাতে।
তারপর….. তারপরের স্বপ্নে সে মীরের বুকে ঘুমিয়ে ছিলো, মীর তাকে নামিয়ে দিচ্ছিলো বোধ হয়, তাই সে কোবরাকে খামচি দিতে চেয়েছিলো!
স্বপ্নই তো ছিলো! নাকি…….!
আনাবিয়া তড়িঘড়ি বাহুর আবরণ সরিয়ে নিজের ইনজেকশন পুশ করার স্থানটা দেখলো।
সর্বনাশ…!
তবে সবই সত্যি ছিলো? আনাবিয়া মুখে হাত দিয়ে বেকুবের মতোন বসে রইলো চুপচাপ। এখন কি করবে সে? এখানে থাকলে ধরা খাবে নিশ্চিত, মীরের ঘুম ভাঙলেই সে আনাবিয়াকে ধরে বেধে নিয়ে যেতে চাইবে শিরো মিদোরিতে। তার চাইতেও ভয়ানক ব্যাপার সে যদি আনাবিয়াকে কোবরার ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করে তবে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মীরের সামনে গুছিয়ে মিথ্যা বলতে গেলে সে তুতলে যাবে! মীর টের পেয়ে যাবে আনাবিয়া মিথ্যা বলছে, এবং কোবরার আড়ালে গুরুতর কিছু আছে।
আনাবিয়া তড়িঘড়ি নামতে চাইলো বিছানা থেকে, তখুনি থেমে গেলো আবার। এভাবে নামলে মীর যদি জেগে যায় তবে ঘাড় ধরে আবার বিছানায় নিয়ে চলে আসবে। আনাবিয়া চুপচাপ বসলো আবার। মীরের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে রইলো কি করা যায়!
ক্ষণিক ভাবনার পর আনাবিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো মীরের কাছে৷ মীরের ঘুমন্ত, শান্ত মুখশ্রীর সন্নিকটে নিজের মুখখানা নিয়ে মৃদুস্বরে গেয়ে উঠলো,
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে
তোমারে দেখিতে দেয় না
মোহমেঘে তোমারে
দেখিতে দেয় না
মোহমেঘে তোমারে
অন্ধ করে রাখে তোমারে
দেখিতে দেয় না
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাইনা?
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাইনা……?
আনাবিয়ার মুখনিঃসৃত মিষ্টি, মোহনীয় সুরের জাদুকরী প্রভাবে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো মীর৷ শ্বাস আরও গাঢ় হয়ে এলো তার! আনাবিয়া মৃদু হাসলো তাতে। অতঃপর সন্তর্পণে বিছানা থেকে নেমে নিঃশব্দে নিজের জিনিসপত্র গুলো দ্রুত হাতে গোছগাছ করে কামরার ব্যালকনি বেয়ে চুপিচুপি নেমে পড়লো নিচে।
সাদী ম্যানসন ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে মীরের গর্জনে! এত গুলো মেইড, গার্ড থাকতে একটা বাচ্চা মেয়ে কিভাবে সকলের নজর এড়িয়ে পালিয়ে যায় সেটা নিয়েই সে রাগারাগি শুরু করেছে ভীষণ রকম।
জায়ান চুপচাপ হজম করছে মীরের ভর্ৎসনা। এমনিতেই হিজ ম্যাজেস্টি তার ওপর বহুত ক্ষ্যাপা, এর ওপর যদি আনাবিয়ার ব্যাপারে কোনো সাফাই গাইতে যায় তবে তার মাথাটা এবার আর কোনোভাবেই বাঁচানো যাবে না!
ইলহান মাত্রই প্রবেশ করলো সাদী ম্যানসনে, বাহির থেকেই মীরের হুঙ্কার শুনে সে প্রথমে জাভেদের সাথে দেখা করতে চলে গেলো। আনাবিয়ার পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ শুনে সে লুকিয়ে চুরিয়ে মীরের অগোচরে বেরিয়ে যেতে নিলো সাদী ম্যানসন থেকে।
মীর তখুনি বড় বড় পা ফেলে নামছিলো ওপর তলা থেকে। ওকে দেখতে পেয়ে গমগমে স্বরে ডাকলো,
“ইলহান!”
ইলহান বেরিয়েই গেছিলো প্রায়, পেছন থেকে মীরের ডাক শুনে ফোস করে শ্বাস ছাড়লো সে। ঘুরে দাঁড়িয়ে দায়সারা ভাবে জিজ্ঞেস করলো,
“কি?”
“বেবি প্রিন্সেসটা কোথায় গেছে?”
“আমি জানিনা, আমাকে বলে যায়নি।”
“আর এ কথা আমি বিশ্বাস করবো?”
“করলে কর, না করলে নাই।”
“ভদ্রভাবে কথা বল। ভুলে যাসনা আমি শুধু তোর ভাই নই, আমি পঞ্চদ্বীপের বাদশাহ। আমাকে প্রোপার সম্মান প্রদর্শন করা তোর দায়িত্ব।”
“আমি তোর বড় ভাই৷”
“দুই মিনিটে কেউ বড় হয়ে যায় না৷”
“যায়৷”
মীর দাঁতে দাঁত চেপে চোখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকালো। ইলহান তা দেখে বলল,
“বড় ভাই আমি তোর, আমাকে দেখে আই রোল করবি না৷”
“প্রিন্সেস কোথায়?”
“জানিনা বললাম তো! একই কথা একশবার জিজ্ঞেস করলে আসমান থেকে আমাকে জানিয়ে দেওয়া হবে নাকি? আশ্চর্য!”
“তুই ভালোভাবেই জানিস। ও যাওয়ার আগে তোর সাথে যোগাযোগ করে গেছে নিশ্চয়।”
“না করেনি। আর ও তো তোর সাথেই ছিলো। কেমন জলহস্তীর মতোন ঘুমিয়েছিস যে একটা মেয়ে বিছানা থেকে উঠে ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে গেছে আর তুই টেরই পাসনাই?”
মীর ওর দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ৷ পরমুহূর্তেই পেছনে ফিরে জায়ানকে জিজ্ঞেস করলো,
“কোকো, ফ্যালকন কোথায়?”
“কোকো তো গতকালই রামাদি সামার উদ্দ্যেশ্যে রওনা করেছিলো, ইয়োর ম্যাজেস্টি। আর ফ্যালকন কোথায় আছে আমি জানিনা।”
লিও কাঞ্জি মীরের সাথেই ছিলো। মীর লিওকে উদ্দ্যেশ্য করর বলল,
“কোকোকে ফোন লাগাও, প্রিন্সেসের ঠিকানার ব্যাপারে ইনফর্মেশন জোগাড় করো৷”
লিও তৎক্ষনাৎ কোকোর সাথে কথা বলতে লেগে গেলো। কিছুক্ষণ কথা বলার পর বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, কোকো ভাইজান বলেছেন তিনি জানেন শেহজাদী কোথায় থাকেন। কিন্তু তিনি শেহজাদীকে কথা দিয়েছিলেন কাউকে তার ঠিকানার ব্যাপারে বলবেন না কখনো। তার অপারগতার জন্য তিনি আপনার নিকট ক্ষমা চেয়েছেন। এ ছাড়া আর কোনো আদেশ থাকলে তিনি আপনার জন্য সদাসর্বদা প্রস্তুত আছেন।”
মীর লিওর কথা শুনে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ, অতঃপর তাচ্ছিল্য হেসে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে অবহেলার সাথে বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করলো,
“লয়্যালটি….!”
মধ্যরাত পেরিয়েছে অনেক আগেই। দেমিয়ান প্রাসাদের খোলা বারান্দায় বসন্তের ফুরফুরে বাতাস বইছে। মীর পায়চারী করে চলেছে বারান্দার এ মাথা হতে ও মাথা৷ রয়্যাল ফ্লোরে সে ছাড়া অন্য কোনো জনপ্রাণী নেই, সবাইকে সে ফ্লোর থেকে বের করে দিয়েছে।
আনাবিয়া পালিয়ে যাওয়ার রাতে তার অসম্ভব রকমের ভালো ঘুম হয়েছে, তারপর থেকে বেশ কিছু দিন তার বেশ ভালো ঘুম হচ্ছে৷ এর পূর্বে সামান্য পিন পতনের শব্দেও সে জেগে যেতো, তন্দ্রায় কাটতো রাত, গাঢ় ঘুমের বালাই ছিলোনা বললেই চলে!
মীরের কাছে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক ঠেকছে। কোনো কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। না চাইতেও তার মনে পড়ছে সেই রাতটির কথা, যে রাতে আনাবিয়া ঘুমিয়েছিলো তার বক্ষপরে। ঘুমের মাঝে হঠাৎ কাল নাগিনীর মতোন ফুসে উঠে তাকে খামচি দিতে চেয়েছিলো, তখন কতইনা মিষ্টি লাগছিলো তাকে দেখতে!
অশান্তি অশান্তি অশান্তি! এই অশান্তির কারণ সে জানেনা, কিন্তু অসহ্য লাগছে তার সমস্তই! বারংবার মনে পড়ছে আনাবিয়ার তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করার কথা; কোমল হাতের স্পর্শ গুলো; নরম, স্ফীত বক্ষের আলতো স্পর্শ; শ্বাস প্রশ্বাসের সেই মৃদু মৃদু স্পন্দন, নিঃশ্বাসের মৃদু মৃদু শব্দ, হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি; আর…… আর আনাবিয়ার শরীরের সেই অদ্ভুত, মাতাল করা ঘ্রাণ!
ছিঃ ছিঃ! কাকে নিয়ে কি ভাবছে সে? সালিমের মেয়ে সে, ইলহানও তাকে নিজের মেয়ে ছাড়া কিছুই ভাবে না। আর সে?
নিজকে মনে মনে ধিক্কার জানালো মীর। নিজের এতটা অধঃপতন হবে সে ভাবতেও পারেনি। তার তো নারীদেহের প্রতি এতটা লোভ কখনোই ছিলোনা, দাসীদের সাথে কাটানো রাতগুলো নিছক নিজের ক্রোধ কমানোর জন্য কাটাতো সে, ওদেরকে কষ্ট দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পেতো সে। হ্যাঁ সে স্যাডিস্ট, এ নিয়ে তার কখনো কোনো মাথা ব্যাথা হয়নি। কেউ কেউ মৃত্যুকেও বরণ করে নিতো তার হাতেই, কিন্তু সেখানে নে*ক্রো*ফিলি*য়ার কোনো স্থান কখনোই ছিলোনা!
তবে এখন তার কি হলো? সে কিভাবে নিজের মেয়ের মতোন কারো প্রতি এতটা আকৃষ্ট হতে পারে?
অস্থির হয়ে উঠলো মীর, ট্রাউজারের পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালো সে সাথে সাথেই। বারান্দার এ মাথা থেকে ও মাথা হাটতে হাটতে শেষ করলো সিগারেটটি।
আনমনে নিজের কামরায় ঢুকে দেয়ালের দিকে তাকাতেই তার স্মরণে এলো সেদিনের ফাঁপা শব্দটার কথা। কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে গেলো মীর। টোকা দিলো দেয়ালে৷ ফাঁপা শব্দটা আবারও শুনলো।
আচমকা হাত মুঠি করে সশব্দে নিজের বজ্রমুষ্ঠি হানলো সে দেয়ালের ওপর। মুহুর্তেই দেয়াল ফুড়ে ওপাশে ঢুকলো তার হাত। হাতে কাঠ জাতীয় কিছু অনুভব করতেই মীর দুহাতে ভেঙে ছিড়ে সরিয়ে ফেললো দেয়ালের শক্ত পরত। অনতিবিলম্বে তার সম্মুখে উন্মোচিত হলো একটি নকশাদার কাঠের দরজা৷
বিস্মিত হলো মীর। এই প্রাসাদে সে নিজের শৈশব কৈশোর সব কাটিয়েছে, অথচ এই দরজাটির কথা তার স্মরণেই নেই! কিন্তু কেন? এটা কি প্রথম থেকেই এখানেই ছিলো? থাকলে সে দেখবে না কেন? নাকি এগুলো ইলহানের কোনো কারসাজি?
কিন্তু সেটা ঘটলে কামরা পুনঃসজ্জার সময়ে লিও তাকে জানালো না কেন?
লিও…. লিওকেই সে দায়িত্ব দিয়েছিলো এই কামরাকে পুনরায় পূর্বের মতো করে তুলতে। মীর কামরা থেকে বেরিয়ে আসতে নিলো লিওর সাথে কথা বলার উদ্দ্যেশ্যে।
কিন্তু কি মনে করে আবারও ফিরে গেলো সে দরজাটির সামনে। নব ঘুরিয়ে ওপাশে যেতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠলো আলো! মীর চোখ বুলালো চতুর্দিকে।
মেঝের শ্বেতপাথরে বিরাট এক পাহাড়ি ঝরণার দৃশ্য অঙ্কিত, যেন জীবন্ত! পা বাড়ালেই ঝর্ণার পানি টেনে নিয়ে যাবে তাকে বহুদূরে! কামরার মধ্যিখানে ঝিনুক আকৃতির এক বিরাট বিছানা, লাল চন্দন আর ইবোনি কাঠের আসবাবপত্র গুলোতে ক্রিস্টালের নকশা।
মীর বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইলো সেসবের দিকে। এ পাথর গুলো তো তার সংগ্রহের পাথর! এত দামী পাথর সে কোন আনন্দে আসবাবে বসানোর অনুমতি দিয়েছিলো? আর এই কামরাই বা কার? সে কেন এই কামরার ব্যাপারে কিছুই জানে না?
মীর কপালে ভাজ ফেলে চতুর্দিকে দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলো ক্লজেটের দিকে৷ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখ কপালে উঠলো তার। ভুল করে কোনো শপিং মলে চলে এলো কিনা ভেবে পেছন ফিরে আরেকবার কামরাটি দেখলো।
বিস্ময় কাটিয়ে ধীর পদক্ষেপে মীর এগোলো ক্লজেটের ভেতর। এত্ত এত্ত মেয়েলি পোশাক, অ্যাক্সেসরিজ আর প্রসাধন সামগ্রী দেখে যারপরনাই অবাক হলো সে৷ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে রইলো একেকটা জিনিস! প্রতিটি নকশা পর্যবেক্ষণ করে তার স্পষ্ট ধারণা হলো, এগুলো প্রাসাদের দক্ষ দর্জি, জুয়েলরি মেকার দের হাতেই তৈরি!
তবে….?
আরও কিছুদূর অগ্রসর হতেই দেখলো কয়েকটি পোশাক আলগোছে ঝুলে আছে, জমকালো কাঁচের আড়ালে বন্দি নেই৷ মীর সেগুলো সামনে ধরতেই আবিষ্কার করলো এগুলো কারো রাতের পরিধেয়। কিন্তু তখুনি স্যাটিনের মেয়েলি পোশাক গুলোর ভেতর নিজের পাতলা শার্ট গুলোর একটি দেখতে পেয়ে চমকালো মীর।
তার শার্ট এখানে কেন? এই স্থানে তার পরিধেয় পোশাক কি করছে? কিভাবেই বা এলো? শার্ট টা হাতে নিয়ে থমথমে মুখে, বড় বড় পা ফেলে ক্লজেট থেকে বেরিয়ে এলো সে। নিজের কামরায় এসে শার্টটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে পরম বারান্দায় এসে লিওর নাম ধরে গর্জানো স্বরে ডাকতে শুরু করলো,
লিও কাঞ্জি ভেতর থেকে বিতাড়িত হয়ে রয়্যাল ফ্লোরের বাইরেই অপেক্ষা করছিলো। কাঞ্জি এদিক ওদিক হাটছিলো, লিও ফোনে প্রেমালাপ করছিলো লিন্ডার সাথে৷ মীরের কন্ঠে নিজের নাম শুনে লাফিয়ে উঠে কল কাটলো সে, কাঞ্জি হাটা থামিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলো,
“আজ আবার কি পাপ করেছিস?”
“আমার কিছু করা লাগেনারে ভাই! আমি সবসময় হুদাই ফেসে যাই। গেলাম টি রেক্সের মুখোমুখি হতে, বেঁচে থাকলে দেখা হবে। লিন্ডাকে আমার হয়ে একটা চুমা দেস৷”
বলে প্রবেশ পথের বিরাট দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো লিও। মীরকে দেখতে পেলো খাস কামরার সম্মুখে থাকা কাউচের পাশে। দাঁড়িয়ে আছে সে, পরণে শুধুই একটা ট্রাউজার, ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট৷
লিও গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়ালো মীরের পেছনে। মীর কিমালেবের সুউচ্চ পর্বতশ্রেণীর শৃঙ্গের দিকে চেয়ে থমথমে স্বরে প্রশ্ন করলো,
“পাশের কামরা টি কার?”
“জ্-জ্বি….. কোন পাশের… কামরা, ইয়োর ম্যাজেস্টি?”
“আমার কামরার৷”
লিও চুপ হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। শুকনো ঢোক গিলে ভাবতে রইলো কি উত্তর দিবে সে৷ আজ কদিন যত রকমের বাঁশ সব ওদের পিছেই যাচ্ছে, যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই কোনো না কোনো ভাবে ধরা খাচ্ছে সকলে মিলে। আর না চাইতেও হিজ ম্যাজেস্টির বিশ্বাস ভাঙছে ওরা, বিশ্বাসঘাতকতার তকমা লাগছে ওদের গায়ে প্রতিনিয়ত!
এখন সে কি বলবে? সত্যি বলে দিবে?
লিওর ভাবনা ছুটলো মীরের বজ্রকন্ঠের হুঙ্কারে,
“উত্তর দাও! কামরাটা কার? আমার থেকে কেন আড়াল করেছো?”
লিও তোতলাতে শুরু করলো তৎক্ষনাৎ, কি বলবে বুঝতে পারলো না সে৷ কিভাবে কি বলবে কোন দিক থেকে শুরু করবে ভাবতে ভাবতেই মীর আচমকা এসে খামচে ধরলো তার গলা, এক ধাক্কায় নিয়ে ফেললো পেছনের দেয়ালের ওপর! দেয়ালের সাথে লিওকে উঁচু করে ঠেসে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
“দু’ সেকেন্ডের ভেতর উত্তর না করলে তোমার মাথা আমি ছিড়ে ফেলবো লিও!
“শেহ্-শেহজাদীর, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
আতঙ্কিত গলায় হাঁফাতে হাঁফাতে বলে উঠলো লিও।
“আড়াল কেন করেছো?”
“তিহ্-তিনি আদেশ করেছিলেন…. তাই!”
মীর শকুনি চোখে তাকিয়ে রইলো লিওর চোখের ভেতর। লিও হাঁফাতে রইলো তখনো। মীর গলা ছাড়লোনা তবুও, শক্ত স্বরে প্রশ্ন করলো,
“ওর কামরা আমার কামরার পাশে কেন? আমি সজ্ঞানে কখনোই চাইবোনা আমার মেয়ের মতোন কেউ আমার কামরার পাশে অবস্থান করুক, যেখানে কিনা আমি দাসীদের সাথে রাত কাটাবো! তবে তার কামরা আমার কামরার পাশে কেন?”
লিও ঢোক গেলার চেষ্টা করলো, অতি কষ্টে বলল,
“আপনি তাকে অনেক ভ্-ভালো বাসতেন, ত্-তাই… নিজের কাছাকাছি রাখতে চাইতেন সবসময়!”
“এটা আমি বিশ্বাস করছিনা লিও। আমি সেদিনই আমার খাস কামরার পাশে কোনো বয়োঃপ্রাপ্ত মেয়েকে রাখবো যেদিন আমার মাথা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। আমার সাথে সত্য বলো, লিও! কি সম্পর্ক আমার তার সাথে? সে কেন আমার কামরার পাশে থাকতো? আমি কেন তাকে আমার কামরার পাশে রেখেছি? এমনকি আমার কামরার সাথে তার কামরার সংযোগ অব্দি রেখেছি, হোয়াই?”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৫
“আপনি তাকে মাত্রাছাড়া ভালোবাসতেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি, তাকে চোখের আড়াল করতে চাইতেন না! এ কারণে!”
মীর চোয়াল শক্ত করে শ্বাস টানলো জোরে। দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলো,
“তাই যদি হবে তবে তার ক্লজেটে, তার রাত পোশাকের সাথে আমার শার্ট কি করছে?”
