Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৭
রানী আমিনা

লিওর গলায় চাপ বাড়লো। প্রাণপণে দম নেওয়ার চেষ্টায় হাঁসফাঁস করতে করতে বলে উঠলো,
“আ-আমি এসবের ক্‌-কিছুই জানিনা, ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি! শেহ্‌-শেহজাদী ব্‌-বলতে পারবেন!”
মীর কিয়ৎক্ষণ লিওর ফ্যাকাসে, শ্বাসরোধে স্ফিত হয়ে আসা চেহারাটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আচমকা শিথিল করলো মুষ্টি। লিও ছাড়া পেয়ে বুক ভরে দম নিলো জোরে! বসে পড়লো মেঝেতে তৎক্ষনাৎ!
মীর জোর কদমে হেটে চলে গেলো নিজের কামরায়। লিও কিছুক্ষণ সেখানেই বসে থেকে অতঃপর উঠে দুর্বল পায়ে বেরিয়ে গেলো রয়্যাল ফ্লোর থেকে।

রাত শেষ হতে চললেও অদ্ভুত সব চিন্তার প্রভাবে যখন মীরের ঘুম ধরলো না তখন বিরক্ত হয়ে সে উঠে পড়লো বিছানা থেকে। একটা সিগারেট ধরিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে৷ বাহিরের শীতল বাতাসে গরম ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে সে পা বাড়ালো রয়্যাল ফ্লোরের বাহিরের দিকে।
কাঞ্জি একাই ছিলো বাহিরে, লিওকে অস্বাভাবিক ঠেকায় তখুনি ওকে মেডিক্যাল জোনে পাঠিয়ে দিয়েছিলো সে৷ এখনো সেখানেই আছে৷ হেকিম খুব সম্ভবত সকালে ছাড়বেন তাকে।
মীর দরজা খুলে বের হয়েই এগোলো লিফটের উদ্দ্যেশ্যে। কাঞ্জি তাকে অনুসরণ করলে মীর হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো তাকে। গমগমে স্বরে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ঘুমিয়ে পড়ো, জেগে থাকার প্রয়োজোন নেই৷”
পরক্ষণেই লিফটে ঢুকে উধাও হয়ে গেলো চোখের সামনে থেকে৷ কাঞ্জি ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে এগোলো রয়্যাল ফ্লোরে, তাদের নির্ধারিত কামরার দিকে।
লিফট এসে থামলো বেজমেন্টের নিকট। মীর বের হতেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুতে থাকা প্রহরীরা সম্পুর্ন সজাগ হয়ে আনুগত্য জানাতে সটান দাঁড়িয়ে গেলো। মীর কোনো দিকে না চেয়ে এগোলো বেজমেন্টের দিকে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে সোজা হেটে চলল ভেতরের দিকে। সব স্থানের প্রহরীরা মীরের এই হঠাৎ আগমনে তটস্থ হয়ে উঠলো। অলসতা ঝেড়ে লেগে পড়লো যার যার কাজে।

বেসমেন্টে পেরিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডের দিকে এগোলো মীর। সেখানের অতি গোপনীয় সেলে গুলো থেকে ভেসে আসা বন্দীদের ব্যাথাতুর আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো করিডোরময়।
সেখানের উন্মুক্ত ঘুরে বেড়ানো হিংস্র প্রাণীগুলোকে খাওয়ানোর জন্য কয়েকজন গার্ড সেইফটি পোশাকে, বড় বড় মাংস টুকরো ভর্তি বালতি নিয়ে ফিরছিলো। মীরকে দেখতেই আনুগত্য জানিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো তারা। মীর ওদের থেকে বালতিটা নিয়ে নিঃশব্দ আদেশে তাদের পাঠিয়ে দিলো ওপরে। জড়সড় ভঙ্গিতে ওরা বেরিয়ে এলো আন্ডারগ্রাউন্ড হতে৷

মীর কে দেখা মাত্রই গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলো প্রাণীগুলো। মীর বালতি হতে কাঁচা মাংসের টুকরো গুলো ছুড়ে দিলে লুফে নিয়ে খেলো সকলে।
খাওয়ানো শেষ হলে মীর এগোলো আন্ডারগ্রাউন্ডের আরও নিচের ভূগর্ভস্থ স্তরে, তার অস্ত্রাগারে। সিঁড়ির শেষ ধাপটি পেরিয়ে ভেতরের দিকে অগ্রসর হতেই সামনে পড়লো একটা শক্ত, নিশ্ছিদ্র পাথুরে দেয়াল।
মীর সেটির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেয়ালের মসৃণ পিঠে ভেসে উঠলো একটি স্বচ্ছ স্ক্রিণ। মীর হাত রাখলো সেখানে, অচিরেই গুরুগম্ভীর শব্দে দুদিকে সরে গেলো পাথুরে দরজাটি। উন্মোচিত হলো ডিম্বাকৃতির এক বিরাট, বিশাল হলরুম৷

নিকেল টাইটানিয়ামের সংকর ধাতুতে তৈরি মেঝের ওপর মৃদু নীল রঙের ফ্লুরোসেন্ট আলো পড়ে তৈরি করে তুলেছে এক রহস্যময় পরিবেশ৷ অসংখ্য ফাইবার অপটিক ক্যাবল ঝুলছে সিলিং থেকে। প্রতিটি ক্যাবল মিলে সম্পুর্ন কামরাটিকে সংযুক্ত করে রেখেছে এক স্বয়ংক্রিয় এ.আই. সিস্টেমের সাথে৷ অস্ত্রাগারের প্রতিটি কোণের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করাই তাদের কাজ।
বাইরের তাপমাত্রার সামান্য তারতম্যও যদি তাতে লক্ষিত হয় তাৎক্ষণিক সজাগ হয়ে উঠে অস্ত্রাগারের ডিফেন্স সিস্টেম। কোনো অননুমোদিত প্রবেশকারীকে ডিটেক্ট করা মাত্রই আঁটকে যায় দরজা, অতঃপর সিলিং থেকে বের হয়ে আসে এক ভয়ানক ক্যামিক্যাল গ্যাস। টার্গেটকে মুহুর্তেই প্যারালাইজড করে দেয় তা। ধীরে ধীরে করাল বিষের মতোন দখল করে নেয় অনুপ্রবেশকারীর সমস্ত শরীর, আর তারপর সময় পেরোনোর সাথে সাথে তীব্র মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে৷

মীর ঢুকতেই আলোকিত হয়ে উঠলো সমস্ত কামরা। হলরুমের একপাশের দেয়াল জুড়ে পুরু ইলেক্ট্রো-ক্রিস্টাল কাঁচের আবরণে সুরক্ষিত মীরের সংগ্রহের সমস্ত সামরিক সরঞ্জামাদি। লেজার রাইফেল গুলো থেকে কয়েকটা মিসিং, আবারও নতুন করে আনাতে হবে সেগুলো। সাইলেন্ট ড্রোন গুলোর কয়েকটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে, যুদ্ধের পর সেগুলো আর সারানো হয়নি।
মীর সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তেই ধোয়াটুকু সম্পুর্ন শুষে নিলো সেখানের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম। ঘুরে ঘুরে দেখতে রইলো ওর অস্ত্রের সমাহার। এতক্ষণের গুমোট অশান্তি একটু একটু করে কেটে যেতে রইলো তার৷ মেজাজ শান্ত হয়ে এলো পূর্বের চেয়ে।

ফুরফুরে মনে অস্ত্রগুলো দেখে চলল মীর, কয়েকটিকে হাতে নিয়ে সচল করে দেখলো, শ্যুট প্রাকটিস করলো টার্গেট বোর্ডে। কয়েকটি লকার খুলে দেখলো নিজের গুরুত্বপূর্ণ দলিল আর জিনিসপত্র গুলো৷ সবকিছু পর্যবেক্ষণ শেষে অস্ত্রাগারের অন্য কোণে থাকা ভল্ট খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো সে।
দুপাশে সারি সারি লকার। সবগুলো খুলে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে রইলো। সময়ের অভাবে এই স্থানে আসা হয়নি তার এতদিন। অনেক দিন পর শখের জিনিসপত্রের ভেতর এসে ভালো লাগছে তার বেশ৷

ভল্টের দরজা স্বয়ংক্রিয় ভাবে বন্ধ হয়ে গেলো তখুনি।সেদিকে বিশেষ নজর দিলোনা মীর। লকার গুলোর ভেতর নিজের সংগ্রহের দামী পাথর গুলো দেখে বেশ আপ্লুত হলো। হঠাৎ একটি অন্য শেডের লকারের দিকে চোখ পড়তেই মীর এগিয়ে গেলো সেখানে৷ লকার খুলতেই উন্মোচিত হলো একটি মোটাসোটা ফটো অ্যালবাম।
এট্ব এখানে কবে রেখেছে মনে পড়লোনা। বেশ আগ্রহ নিয়ে সেটাকে বের করলো মীর৷ কয়েকটি পাতা একত্রে ধরে উল্টোলে আচমকা অপ্রত্যাশিত কিছুর দিকে দৃষ্টি পড়তেই চোখ কপালে উঠলো তার! সাথে সাথেই আবার সশব্দে বন্ধ করে ফেললো অ্যালবামটি৷ কিছুক্ষণ বিস্মিত, স্তব্ধ হয়ে সে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো নিজের স্থানে।
এসব কি দেখছে সে? পিচ্চিটার এমন অতিমাত্রার খোলামেলা ফটোগ্রাফ তার ভল্টে কিভাবে এলো? সেটাও অ্যালবামে! এমন অতি যত্নসহকারে সাজানো গোছানো!

একটা ঢোক গিলে মীর পুনরায় মেললো অ্যালবামের পাতা। একেকটা পাতা উল্টাতে মীরের গলা শুকিয়ে এলো, মাথার ভেতর চক্কর দিতে শুরু করলো যেন, শ্বাস পড়তে রইলো জোরে, গা গরম হয়ে এলো মুহুর্তেই। সশব্দে আবার ডায়েরি টা বন্ধ করে শরীর ঠেকালো ভল্টের ধাতব দেয়ালে। কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম হাতে মুছে নিয়ে সে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়লো একটা, চোখ বন্ধ করে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“কাম ডাউন আসওয়াদ, কাম ডাউন। অনেক অধঃপতন হয়েছে তোর!”
কিন্তু এবার গম্ভীর হলো মীর। সামনে আবারও মেলে ধরলো অ্যালবামের পাতা গুলো, এবার আর আনাবিয়ার প্রতি সামান্যতম দৃকপাতও করলোনা সে। দাঁত মুখ শক্ত করে পর্যবেক্ষণ করে চলল ফটোগ্রাফের ব্যাকগ্রাউন্ড গুলো।
প্রতিটা ফটো তারই বেডরুমে তোলা, তারই বিছানা! কিছু কিছু পাশের কামরাটির ঝিনুক সদৃশ বিছানার ওপর তোলা। তবে….?

তবে কি সে ওই বাচ্চা মেয়েটির সাথে বাজে কিছু করেছে? নিজের কামরার পাশেই তার কামরা কি সে এ কারণেই তৈরি করিয়েছে? সে কি….. সে কি ওই মেয়েটিকে জোর জবরদস্তি করেছে? এই কারণেই কি মীরের থেকে সে পালিয়ে বেড়ায়?
কিন্তু মীর এমনটা কিভাবে করতে পারে? সে সজ্ঞানে তো কখনোই এমন করার ব্যাপারে চিন্তাও করবে না! কিন্তু এই ফটো যে গুলো তারই তোলা, তারই ভল্টের লকারে সংরক্ষিত!
মীর থামলো আচমকা, মেয়েটি কি তাকে ঘৃণা করে? তাকে ভয় পায়? মীরের এমন বিশ্রী আচরণের কারণে সে কি নিজের দেমিয়ান পদবী পর্যন্ত ত্যাগ করতে চাইছে। কিন্তু তার এমন অধঃপতন কবে, কখন….. কিভাবে হলো? সে কিভাবে……!

আর ভাবতে পারলোনা মীর৷ অ্যালবাম বন্ধ করে আবার পূর্বের স্থানে রেখে, ভল্ট বন্ধ করে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো অস্ত্রাগার থেকে৷ রয়্যাল ফ্লোরে এসে কাঞ্জিকে ডাকলো গলা চড়িয়ে।
কাঞ্জির সবে চোখ লেগে এসেছিলো, মীরের গলা শুনে তড়াক করে উঠে পড়লো সে। দ্রুত পায়ে বাহিরে এলে মীর বলল,
“আজ কালের ভেতর বেবি প্রিন্সেসকে কোনো মাধ্যমে সংবাদ পাঠাও, আমি তার সাথে কথা বলতে চাই। ইমারজেন্সি।”

মুনহল্যো আজ সেজেছে নতুন সাজে। চারদিকের গাছগাছালির শরীর ভর্তি ছোট্ট ছোট্ট মরিচ বাতি। পিট পিট করে জ্বলছে সেগুলো। বাচ্চারা সকলে হুটোপুটি করে চলেছে সমস্ত এলাকা জুড়ে৷
কোকো এখনো এসে পৌছেনি, নিজের দায়িত্ব শেষ করে সময় বের করা তার জন্য বর্তমানে বেশ কঠিন। তবুও আজ আনাবিয়ার অনুরোধে কোনো ক্রমে কিছু সময় সে ম্যানেজ করে নিয়েছে। আজ আর আগামীকালের রাতটুকু তার জন্য বরাদ্দ।
ফ্যালকন, কাঞ্জি আর আলফাদ মিলে মহাসমারোহে সাজিয়ে তুলছে মুনহল্যোর চতুর্দিক। আজকের দিনের জন্য পিকনিকের কথা বলে ছুটি নিয়েছে ওরা মীরের থেকে। মীর যদিও কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখেছে ওদের, কিন্তু কিছুই বলেনি। অবলীলায় ডে অফ দিয়েছে৷

ওকামি, হাইনা আর ব্রায়ান মিলে খাবারের বন্দোবস্ত করছে। জোভির ছেলেটা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সে আসতে পারেনি। বেচারা সংসার মুখী হওয়ার পর থেকে সব কিছু থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে৷
মেয়েরা সকলেই ভেতরে৷ শার্লট, ফাতমা আর রেক্সা এই প্রথম বার আনাবিয়ার মুনহল্যো তে এসে অবাক চোখে দেখে চলেছে সম্পুর্ন ম্যানরটি। শার্লট এক একটা জিনিস পর্যবেক্ষণ করে ফাতমার নিকট মন্তব্য করছে, “রাজা বাদশাহ দের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা! আর আমাকে দ্যাখ, দারিদ্রসীমার নিচে কোনো লেভেল থাকলে সেখানে আমাকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।”

ওর বারংবার একই মন্তব্যে অতিষ্ঠ হয়ে ফাতমা মাঝে মাঝেই মুখ বন্ধ করার জন্য কয়েকটি চটকানা লাগিয়ে দিচ্ছে ওকে৷ কিন্তু তাতেও চুপ থাকছে না শার্লট।
আনাবিয়ার কামরার ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে লিন্ডা। গায়ে তার শুভ্র পোশাক, মাথার ওপর টিউলের পাতলা আবরণ। আনাবিয়ার হাতে মেক আপ ব্রাশ। অত্যন্ত যত্নসহকারে লিন্ডাকে সাজিয়ে তুলছে সে। লিন্ডা কারণে অকারণে লজ্জা পাচ্ছে। আনাবিয়ার হাসিমুখ দেখে আরও লজ্জা পাচ্ছে যেন!

আনাবিয়া দেখা করেনি মীরের সাথে। কাঞ্জি সহ অনেকেই যোগাযোগ করেছিলো তার সাথে৷ কিন্তু আনাবিয়া ঠিক জানে, এবার দেখা হলে মীর তাকে ছেড়ে দিবে না, বগলদাবা করে ওকে প্রাসাদে নিয়েই ছাড়বে৷ তাই সে কোনো ভাবেই মীরের ছায়াও মাড়াবে না। সেদিনই কাঞ্জিকে হুমকি দিয়েছে, ওরা যদি মীরের সাথে দেখা করতে জোরাজোরি করে তবে এই মুনহল্যো ছেড়েও সে চলে যাবে, কোথায় যাবে কাউকে বলবে না৷
ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক আর চোখের জমকালো সাজে অপ্সরা লাগছে লিন্ডাকে। আনাবিয়া কিছুক্ষণ পর পর থেমে দাঁড়িয়ে দেখছে তাকে। এই বিল্লু টাকে সেদিন সে সমুদ্র থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এলো! আর আজ সে কিনা নববধূবেশে!
আনাবিয়া ওর গাল টিপে দিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“কি মিষ্টি লাগছে আমার বিল্লুকে!”
লিন্ডা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেললো। দরজায় নক করে রেক্সা ঢুকলো তখন, লিন্ডাকে দেখে কিয়ৎক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে মিষ্টি করে হাসলো। আনাবিয়া তা খেয়াল করে বলল,
“এরপর তোমার পালা, তৈরি থেকো।”
লজ্জা পেলো রেক্সা, লাজুক হেসে মাথা নিচু করলো। ক্ষণিক পর ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলো,
“লায়রা কে দেখছিনা, শেহজাদী!”
“ও গত চারদিন ধরে বের হয়নি কামরা থেকে, হয়তো ওর চেঞ্জিং ফেজ চলছে।”
“তবে তো আজ কালের ভেতরেই ওর বের হবার কথা, শেহজাদী!”
“হ্যাঁ, আজ কাজের চাপে চেক দিতে পারিনি, সে কারো সামনে আসছে না। কামরায় ঘাপটি মেরে পড়ে আছে, প্রথম দু দিন যা একটু মুখে দিয়েছিলো তার পর থেকে কিছুই খাওয়ানো যায়নি তাকে৷”
শার্লট আর ফাতমা এমন সময়ে ঢুকলো কামরায়। লিন্ডাকে দেখে শার্লট হৈহৈ করে উঠলো, ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বলল,

“ওমাআআআআআআ! কি সুন্দর লাগছে রে! লিও ভাইজানের আজকে তোকে দেখে হার্ট ফেইল করবে দেখে নিস!”
লিন্ডা শব্দ করে লাজুক হাসলো। ফাতমা শার্লটকে লিন্ডার থেকে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“চাপাচাপি করিস না, বেচারি এমনিতেই আজ ম্যালা চাপা খাবে৷”
শার্লট ঠোঁট টিপে হাসলো, লিন্ডা কপট রাগ দেখিয়ে একটা চাটি মারলো ফাতমার গায়ে। রেক্সা লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে তাকালো। আনাবিয়া গলা খাকারি দিয়ে বুঝিয়ে দিলো এখানেও সেও উপস্থিত আছে।
আনাবিয়া হাতের জিনিসপত্র গুলো রাখতে অন্যদিকে গেলো। এই সুযোগে শার্লট নিচু স্বরে বলে উঠলো,
“চাপা খেতে আর বাকি আছে নাকি? দেখতাম তো দুজনে একবার আড়ালে গেলে ঘন্টা পেরোলেও আর ফিরতো না! এবার অফিসিয়ালি চাপা খাবে৷ হি হি!”
লিন্ডা লজ্জা পেয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢাকলো। ফাতমা শার্লটকে বলল,

“থাক, বেচারীকে আর লজ্জা দিস না৷ এতদিন লাজ লজ্জা সব শিকেয় তুলে এখন এসে লজ্জা পাওয়ার নাটক করছে! আমরা যেন কানা, কিছু দেখিনি!”
“ভালো হয়েছে দেখেছো, আগে আড়ালে করতাম এখন সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে করবো৷ প্রয়োজনে লাইভ করবো! আমিও দেখবো কে কি বলে!”
কপট তেজ দেখিয়ে বলল লিন্ডা। শার্লট চুপিচুপি বলল,
“তাহলে একটা চ্যাট গ্রুপ খুলি? রাতে ভিডিও কল দিবোনে৷ সবাই মিলে একসাথে দেখা যাবে।”

ফাতমা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো সাথে সাথে৷ লিন্ডার নাকের পাটা ফুলে উঠলো তাতে, আনাবিয়া এলো তখন। সবগুলোকে তৈরি হতে বলে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে সে লিন্ডার সাজুগুজুর ফাইনাল টাচ দিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।
বাহিরে তখন ওদের দুষ্টু আলোচনা তুঙ্গে৷ লিও কিছুক্ষণ আগেই এসে পৌছেছে, হঠাৎ গোলাপ শর্ট পড়ায় তাকেই যেতে হয়েছিলো বাইরে৷ সাদা শার্টের সাথে অফ হোয়াইটের স্যুটে তাকে আজ অত্যন্ত সুদর্শন দেখাচ্ছে। বিয়ের খুশিতে সৌন্দর্য যেন বেড়ে গিয়েছে খানিকটা৷ সে পৌছোনোর পর থেকেই সকলে তাকে দুষ্টু দুষ্টু কথা বলে চলেছে। লিও পারেনা এখান থেকে পালিয়ে যায়৷

ফ্যালকন নিজের ভাই দের এমন বিশ্রী আলোচনা শুনে কানে হাত দিয়ে বসে আছে। কোকো ভাইজান থাকলে আজ এদের উত্তেজনা এক থাপ্পিড়ে মাটিতে নামিয়ে দিতো।
কোকো মুনহল্যো তে প্রবেশ করলো ঠিক তখুনি। প্রবেশ পথ দিয়ে গাড়ি না ঢোকায় বাহিরে পার্ক করে হাতে চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে এলো সে৷ ওকে দেখে কাঞ্জি আলফাদ সমস্বরে বলে উঠলো,
“এর পর কোকো ভাইজানের বিয়ে খাবো!”
“খাওয়াচ্ছি, এগিয়ে আয়।”
ওর বলার ভঙ্গি দেখে হেসে উঠলো ওরা৷ কোকো কাজে হাত লাগালো ওদের সাথে। বিয়ের স্টেজ তৈরি করলো দ্রুত হাতে। লিও বর সেজে বসে ছিলো, ওকেও লাগিয়ে দিলো কাজে।
.
সন্ধ্যা নেমে গেছে, বাহিরে স্যুট বুটে বাবু সেজে দাঁড়িয়ে আছে ছেলে গুলো। কনে এখনো এসে উপস্থিত হয়নি। লিও বারংবার তাকাচ্ছে ম্যানরের প্রবেশ পথের দিকে। কোকো বিরক্ত হচ্ছে, তার ভাতের হোটেল এখনো একবার বাইরে বের হলোনা! কিসের এত সাজুগুজু করে মেয়েগুলো বোঝে না কোকো। সেই তো দু ঘন্টা পর ডলে ডলে আবার সব ধুয়েই ফেলবে, শুধু শুধু পয়সা নষ্ট।
লিওর দিকে ফিরে কোকো জিজ্ঞেস করলো,
“জিনিস এনেছিস?”
“হু৷”
বাকিরা ভ্রু কুচকে তাকালো লিওর দিকে, আলফাদ দুষ্টু হেসে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি জিনিস এনেছো ভাই? দেখি!”
“মানে…..! অসভ্য হতে হতে মাথা মুথা সব পঁচে গেছে তোদের, বুঝছিস!”
তেজি গলায় বলল লিও৷ বাকিরা খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠলো তাতে। লিও কোকোর দিকে ফিরে রাগ দেখিয়ে বলল,
“ভাই, তুই ওদের কিছু বলবি?”
কোকো ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকানোর চেষ্টা করে বাকিদের বলল,
“ওদের ভেতর রীতি আছে বিয়ের সময় পুরুষ সিংহকে তার শৌর্যবীর্যের প্রমাণ দিতে তার এ যাবৎকাল শিকার করা সব প্রানীর কোনো না কোনো চিহ্ন রাখতে হয়, এবং বিয়ের সময় ব্রাইডকে তা অফার করতে হয়। ব্রাইড সন্তুষ্ট হলে তবেই বিয়ে হবে, নইলে না৷”
হাইনা ওপাশ থেকে ঘাড় উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কই সে জিনিস, দেখা!”
আলফাদ শব্দ করে হেসে উঠলো আবারও। লিও ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে উঠে গেলো পেছনের দিকে। দুহাতে দুটো বিশাল বিশাল ব্যাগ নিয়ে ধপ করে রাখলো সে ওদের সামনে। ফ্যালকন আর ওকামি গিয়ে ব্যাগ খুলে দেখলো ব্যাগ ভর্তি শুধুই প্রানীদের দাঁত আর হাড়।
কাঞ্জি জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলল,
“যা জোগাড় করেছিস তা দিয়ে আরও পাঁচটা বিয়ে করতে পারতি লিও। হুদাই একটা বউয়ের পেছনে এত জিনিস নষ্ট করছিস!”

“বকিস না, এ কথা লিন্ডা শুনলে আমার …… ফাটিয়ে দিবে৷”
লিওর কথায় হাসির রোল পড়লো আবার৷ এমন সময় মুনহল্যো থেকে নাচতে নাচতে বেরিয়ে এলো শার্লট আর ফাতমা। খুব সেজেছে দুজন, মুখে হাসি ধরছেনা তাদের। শার্লট এসে বলল কোকোকে লিন্ডা ডাকে।
কোকো উঠে এগোলো ম্যানরের ভেতর। বাকিরা লিওকে নিয়ে নেচে-কুঁদে স্টেজের দিকে এগোলো।
লিন্ডা দাঁড়িয়ে আছে ভেতরে চুপচাপ। রেক্সা ওর পাশে, চুলগুলো আরেকবার ঠিক করে দিচ্ছে৷ কোকো এসেই লিন্ডাকে দেখে বলল,

“যাক, আজকে শাকচুন্নিকে একটু মানুষের মতোন লাগছে।”
রেক্সা ফিক করে হেসে দিলো। লিন্ডা পা দাপিয়ে তেজি গলায় বলল,
“একদম উল্টাপাল্টা নামে ডাকবেনা কোকো ভাইজান! আমি কিন্তু বিয়ে করবো না!”
কোকো হাসলো, লিন্ডার তেজ কমলে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“তুমি…. তুমি তো আমাদের বড় ভাই! আমার বড় ভাই। তুমি আমাকে লিওর হাতে দিবে!”
কোকো মিষ্টি করে হেসে লিন্ডার কপালে ঠোঁট ছুইয়ে দিলো। ওকে বুকের সাথে আগলে নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, বড় ভাই আমি তোদের। তোদের সব গুলোর বিয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়ে দিবো, চিন্তা করিস না।”
আনাবিয়াকে আশেপাশে না দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“আম্মা কই?”
“লায়রাকে দেখতে গেছেন, ওর সম্ভবত শরীর খারাপ।”
বলল রেক্সা। কোকো তাকালো ওর দিকে, দৃষ্টি নরম হয়ে এলো তার। রেক্সার মুখখানা শুকনো দেখালো। কোকো ওর গাল টিপে দিয়ে বলল,
“হাসছোনা কেন?”
“তুমি এসে থেকে আমার সাথে কথাই বলোনি, কথা বলা তো দূর আমাকে খোঁজোইনি!”
গাল ফোলালো রেক্সা। কোকো মৃদু হেসে ঝুঁকলো রেক্সার দিকে, ফিসফিসিয়ে বলল,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৬

“মন খারাপ কোরোনা, রাতে পুষিয়ে দিবো৷”
“আমি কিন্তু সব শুনতে পেয়েছি।”
নির্বিকার গলায় বলল লিন্ডা। কোকো ওর মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,
“বদের হাড্ডি, চল বাইরে৷”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৮