Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৪

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৪

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৪
রানী আমিনা

কাক ডাকা ভোর।
লিও কাঞ্জি ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে বাইরে। মহসিন তাদের নাস্তার ব্যাবস্থা করতে ব্যাস্ত। গত কাল সন্ধায় শেহজাদা ইলহান আর কোকোকে বিদায় দিয়েই এসে ঘুমিয়েছে, উঠলো এখন। ঘুমের কারণে রাতে খাবার ফুরসত হয়নি।
শেহজাদীর সেডেটিভের প্রভাব কাটেনি এখনো। হেকিম গতকাল এসে বলে গিয়েছিলেন আগামী পনেরো থেকে চব্বিশ ঘন্টার ভেতর জেগে উঠবেন শেহজাদী। ইতোমধ্যে সতেরো ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। দু’দিন ধরে শিরো মিদোরির পানি নিষ্কাশনের কাজ করে চলেছে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। প্রায় শুকিয়ে এসেছে মাটি।

মহসিন চা দিয়ে গেলো ওদের। দূর সমুদ্রে তাকিয়ে চা খেতে খেতে চাপা স্বরে গল্প করতে লাগলো দুজনে। ক্ষণিক পরেই আচমকা খুলে গেলো রয়্যাল ফ্লোরের প্রবেশদ্বার, রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে একটি আর্টিফিশিয়াল ভয়েস ঘোষণা করলো তৎক্ষনাৎ— অ্যাটেনশন, অ্যাটেনশন, দ্যা মাইটি কিং নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান!
লিও কাঞ্জি প্রবল বিস্ময়ে, উত্তেজনায় তাকালো একে অপরের দিকে। পরক্ষণেই চায়ের পেয়ালা জোড়া টেবিলে প্রায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে দ্রুত বেগে দাঁড়িয়ে পড়লো আনুগত্যের ভঙ্গিতে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ক্রমে ক্রমে নিকটবর্তী হলো তার ধীর, ভারী, দৃঢ় পদশব্দ। ধীরে ধীরে প্রকট হলো তার সুউচ্চ, সুঠাম, পুরুষালি অবয়ব; কর্তৃত্ব পূর্ণ, ইস্পাত-দৃঢ় চেহারার ওপর আগ্নেয়গিরির মতোন ঝলসানো দু’চোখ!
লিও কাঞ্জি নুয়ে রইলো আনুগত্যে। মীর দৃঢ় পায়ে চলে গেলো তাদেরকে পেছনে ফেলে, ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলোনা। লিও কাঞ্জি এগোলো তার পেছন পেছন, তৎক্ষনাৎ মীরের সাঁড়াশীর ন্যায় আঙুলের নিঃশব্দ ইশারায় দাঁড়িয়ে গেলো স্ব স্ব স্থানে, নিষেধাজ্ঞা জারি হলো তাদের পা বাড়ানোয়! দুজন স্থির, স্তব্ধ হয়ে দেখলো মীরের বিশাল শরীররটি ক্রমে সম্মুখের আলো আঁধারিতে অদৃশ্য হয়ে যেতে!
সেই মুহুর্তেই ছুটতে ছুটতে বারান্দায় এসে হাজির হলো মহসিন, অবিশ্বাস্য স্বরে প্রশ্ন করলো,

“হিজ ম্যাজেস্টি ফিরেছেন?”
লিও মাথা নাড়লো ওপর নিচে। মুখখানা থমথমে তার, শঙ্কিত চেহারা! না জানি কি হয়— এ আশঙ্কায় শিরদাঁড়া ঠান্ডা হওয়ার উপক্রম। মহসিন ছুটলো মীরের কামরার দিকে, তার জন্য সকালের খাবারের ব্যাবস্থা করতে হবে যে!
দরজায় করাঘাত পড়তেই ভেসে এলো মীরের ভারিক্কি কন্ঠস্বর,
“এসো!”
মহসিন মৃদু পায়ে প্রবেশ করলো কামরায়, আনুগত্যের সুরে জিজ্ঞেস করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, সকালের খাবারে আপনি কি পছন্দ করবেন?”
“অ্যাভোকাডো টোস্ট, গ্রিল্ড চিকেন, সাথে ব্যানানা স্মুদি।
গায়ের পোশাক গুলো খুলে রাখতে রাখতে উত্তর করলো মীর। প্রচন্ড ঠান্ডা শোনালো তার কন্ঠ! মহসিনের গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলো তার শীতল স্বর! একটা শুকনো ঢোক গিলে সে আনুগত্য জানিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলো। মীর ডাকলো তাকে,

“মহসিন”
মহসিন দাঁড়িয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ, ঢোক গিলে উত্তর করলো,
“আদেশ করুন, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“আরমানকে ডেকে পাঠাও।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
মহসিন বেরিয়ে এলো, এরপর প্রায় দৌঁড়ে সে এগোলো আরমানকে ডাকতে। পথিমধ্যে লিও আটকালো তাকে, জিজ্ঞেস করলো,

“কই যাচ্ছো মহসিন?”
“হিজ ম্যাজেস্টি আরমান ফেরহানকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আমি তাকেই ডাকতে যাচ্ছি।”
পথ ছেড়ে দিলো লিও, মহসিন ছুটলো আবার। চিন্তিত মুখে সে তাকালো কাঞ্জির দিকে। বলল,
“হিজ ম্যাজেস্টি অন্যান্য সময়ে আমাদের দিয়েই আরমানকে ডাকান, আজ মহসিনকে পাঠালেন কেন? উনি কি কোনো কারণে আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট? আমরা কি কিছু করেছি?”

“বুঝতে পারছিনা এখনো কিছুই। আরমান আসুক, ওর থেকে জানা যাবে। আগে থেকে চিন্তা করিস না। তবে…. হিজ ম্যাজেস্টি আমাদের ওপর খুশি নন, এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। তার মুখখানা দেখেছিলি?”
“ভয় ধরাস না। এমনিতেই নানা উল্টোপাল্টা কাজ করে হিজ ম্যাজেস্টির চোখে নিজেদের বিশ্বস্ততা হারাতে বসেছি। আবার যদি কোনো কিছু করে বসে তবে হিজ ম্যাজেস্টি আমাদেরকে ক্ষমা করবেন না।”
চিন্তিত হয়ে পড়লো দুজনেই। বারান্দা জুড়ে পায়চারী শুরু করলো আরমানের অপেক্ষায়।
আরমান এলো কিছুক্ষণ পরেই। লিও কাঞ্জিকে এমন অস্থির চিত্তে পায়চারী করতে দেখে জিজ্ঞেস করতে চাইলো কিছু, কিন্তু তার আগেই লিও এসে ওর দুই বাহু ধরে মৃদু ঝাকি দিয়ে ব্যাস্ত স্বরে বলল,
“আরমান, ভাই আমার! হিজ ম্যাজেস্টি তোকে যা বলবেন তা যদি গোপনীয় কিছু না হয় তবে আমাদের জানাবি দয়া করে।”

আরমান প্রথমটায় হতচকিত হলো, পরক্ষণেই প্রশ্ন করলো,
“কিছু হয়েছে নাকি?”
“কিছু হয়েছে কিনা সেটাই জানার চেষ্টা করছি। প্লিজ ভাই, যদি সেটা অত্যন্ত গোপনীয় না হয়, বা আমাদের বলা যায় তবে বলবি!”
“ঠিক আছে, বলার মতো হলে বলবো। ছাড়ো আগে, শুনে আসি হিজ ম্যাজেস্টি কি বলেন।”
লিও ছেড়ে দিলো ওকে। আরমান শার্টের হাতা টান দিয়ে ঠিক করে এগোলো আবার মীরের কামরার দিকে। দরজায় করাঘাত করতেই ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলো মীর। আরমান দুরুদুরু বুকে প্রবেশ করলো সেখানে।
কাগজপত্রে সয়লাব মীরের টেবিলের উপরিভাগ, সশব্দে ড্রয়ার টেনে একে একে যাবতীয় ডকুমেন্টস বের করছে সে। শরীরের ঊর্ধ্বাংশ উন্মুক্ত, ঘাম ঝরছে তখনো। চঞ্চল পায়ে চারদিক থেকে জরুরি কাগজপত্র গুলো বের করে করে নিজের সামনে মেলে রাখছ সে।

আরমান ঢুকেই নত চোখে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমাকে ডেকেছিলেন?”
“হ্যাঁ। তৈরি হও, এখনি রামাদিসামা যাবে।”
দৃষ্টি না তুলেই গমগমে স্বরে বলল মীর। কাগজের ভিড় থেকে একটি নকশাদার পুরু এনভেলপ তুলে আরমানের হাতে দিয়ে বলল,
“আর্মি চিফ কোকোকে দিবে, এবং যত দ্রুত সম্ভব শিরো মিদোরিতে ফিরবে। সাথে অবশ্যই গাড়ি নিবে৷”
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
বলে আনুগত্য জানিয়ে আরমান বেরিয়ে এলো কামরা থেকে। লিওদের কাছাকাছি আসা মাত্রই ওরা ছুটে এলো আরমানের কাছে, আগ্রহী চোখে চেয়ে রইলো হিজ ম্যাজেস্টি আদেশ জানার জন্য। আরমান ওদেরকে হাতের এনভেলপ দেখিয়ে বলল,

“আর্মি চিফ কে পৌঁছে দিতে বলেছেন।”
লিও কাঞ্জি একে অপরের দিকে তাকালো। আরমান সন্দেহের চোখে চেয়ে বলল,
“কি ব্যাপার বলোতো! তোমাদের এত উদ্বিগ্ন লাগছে কেন? আর হিজ ম্যাজেস্টিই বা আজ আমাকে দিয়ে পত্র পাঠাচ্ছেন কেন? উনি তো সব সময় তোমাদের দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ পত্র প্রেরণ করেন!”
লিও ওকে ইশারায় চুপ করতে বলল, চাপা স্বরে বলল,
“পরে জানাবো তোকে। তোকে কখন যেতে বলেছেন রামাদিসামায়?”
“এখনি।”
“তো যা দ্রুত।”

আরমান চলে গেলো। লিও ব্যাস্ত ভঙ্গিতে ফোন লাগালো কোকোর কাছে, প্রথম দুবারে ফোন তুললো না কোকো। বার বার দিতেই রইলো ও, পরের বার কোকো ফোন তুলতেই লিও ঝাঝিয়ে উঠে বলল,
“ফোন রেখে কোথায় যাস তুই? কাজের সময় তোকে পাওয়া যায়না!”
“আমি এখানে তোদের মতো শুয়ে বসে থাকিনা, কাজ করে খাই। কি বলবি বল।”
“হিজ ম্যাজেস্টি ফিরে এসেছেন৷”
“কিহ্‌…. কখন?”
“কিছুক্ষণ আগেই। কিন্তু…..!
“কিন্তু কি? তাড়াতাড়ি বল, থেমে থেমে শোনার সময় নেই।”

“উনি আমাদের সাথে কোনো কথা বলছেন না, আমাদেরকে কোনো আদেশও দিচ্ছেননা। মাত্রই আরমানের হাত তোর জন্য চিঠি পাঠালেন, আমাদেরকে ডাকেননি! আবহাওয়া সুবিধার ঠেকছে না ভাই!”
“চিঠি…. আমার জন্য? আমি কি করেছি?”
“জানিনা ভাই, হিজ ম্যাজেস্টির মাথায় কি চলছে বুঝতে পারছিনা, আমার কেমন জানি ভয় ভয় করছে। মনে হচ্ছে ভালো কিছু হচ্ছে না। উনি যেন কিছুটা অস্বাভাবিক! চোখ মুখের ভাব অন্যরকম!”
“কেমন?”

“যেন তিনি প্রচন্ড ক্ষুব্ধ! কিন্তু প্রকাশ করতে চাইছেন না, তবুও প্রকাশ পেয়েই যাচ্ছে এমন! তুই ভাই চিঠি পেয়েই জানাস দয়া করে, যদি গোপনীয় কিছু না হয়! টেনশনে আমার অবস্থা খারাপ। আমার মনে হচ্ছে উনি আমাদের ওপর রেগে আছেন, উনি ফেরার পর আমি আর কাঞ্জি এগিয়েছিলাম, উনি মানা করে দিলেন! মুখেও বলেননি, জাস্ট ইশারা করলেন! এর মানে কি দাঁড়ায় তুই বল!”
“হুদাহুদি টেনশন করে মাথা খারাপ করিস না, আগে চিঠি এসে পৌঁছক আমার কাছে, আরমান বেরিয়েছে?”
“বেরোবে, হিজ ম্যাজেস্টি বলেছেন এখুনি রওনা দিতে।”
“ঠিক আছে, চিন্তার কিছু নেই। আমি জানাবো চিঠি পেয়ে।”
বলেই খট করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো কোকো।

আনাবিয়ার ঘুম ভাঙলো এক অদ্ভুত অনুভূতিতে। হৃৎপিণ্ডের গতি অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলো হঠাৎ, ঘুম ভাঙলো তার ছটফটানিতে! বুকে হাত চাপা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো সে। শ্বাস ছাড়তে রইলো ঘনঘন। গলা শুকিয়ে গেছে! কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? সময় দেখার উপায় নেই, ঘড়ি নেই তার ঘরে। ফোনটাও তো মীরের কাছে কয়েদ!
মীর….. মীর……! আচমকা হুশে এলো আনাবিয়া তড়িঘড়ি উঠে গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। আলুথালু সফেদ চুল এসে পড়লো ঘুম ফোলা লালাভ মুখের ওপর।
মহসিন দাঁড়িয়ে বাইরে, ওকে দেখে চমকালো কিঞ্চিৎ। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“শেহজাদী, আপনার খাবার তৈরি হচ্ছে। আপনার ক্ষুধা পেলে গরম দুধের ব্যাবস্থা করি?”

“মীর…..? সে ফিরেছে?”
মহসিনের উদ্বেগ উপেক্ষা করে প্রশ্ন করলো আনাবিয়া। মহসিনের মুখখানা চিমসে গেলো। মাথা নত করে সে মৃদু স্বরে বলল,
“জ্বি শেহজাদী, ভোরেই ফিরেছেন!”
মহসিন বোধ হয় আরও কিছু বলতে গেলো তাকে, কিন্তু তার পূর্বেই আনাবিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলো মীরের কামরায়! চাদরটা খসে পড়লো মেঝেতে। উন্মুক্ত হলো তার সফেদ চুল, পাতলা গাউনের ওপর দিয়ে দৃষ্টিগোচর হতে রইলো তার মোলায়েম শরীরের অপরূপ, শ্বাস কাড়া ভাজ গুলো।
মহসিন চোখ নামিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ, ফিলোমেলা চাদরটা উঠিয়ে নিয়ে ছুটে চলল আনাবিয়ার পিছু পিছু।
সজোর ধাক্কায় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো সে। ফিলোমেলা দাঁড়িয়ে গেলো দরজায়, হাতে রইলো চাদর খানা! সেটি যেন নুইয়ে পড়লো অভিমানে— কেন শেহজাদী তাকে ত্যাজ্য করে চলল বিবাগি প্রেমিককে দেখে চক্ষু তৃষ্ণা নিবারণে!

মীর টেবিলে হাতের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে চলেছিলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি। দরজা খোলার শব্দে পেছন ফিরে তাকালো সে, তৎক্ষনাৎ ভেসে এলো আনাবিয়ার উৎকন্ঠিত জিজ্ঞাসা,
“এতদিন কোথায় ছিলেন আপনি?”
মীর উত্তর দিলোনা এ প্রশ্নের। ক্ষণিক স্থির, নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার শঙ্কিত, অস্থির, সংশয়ী মুখপানে। ঘুরে দাঁড়ালো সে এবার সম্পুর্ন, মুখশ্রী কঠিন হয়ে এলো তার! দৃঢ় চোয়ালের ওপর দিয়েই দৃষ্টি গোচর হলো তার দাঁতে দাঁত পেষার দৃশ্য!

ধীর, ভারিক্কি পায়ে এগিয়ে এলো সে আনাবিয়ার দিকে। ভয়ে দুরুদুরু কাঁপলো আনাবিয়ার বক্ষপিঞ্জর! পিছিয়েও গেলো বোধ হয় সামান্য! মীর এসে দাঁড়ালো ওর সামনে, একেবারেই সামনে, যেন দু’ ইঞ্চি দুরত্বও আর রইলো না।
আনাবিয়া আতঙ্কিত হলেও আর এক চুল নড়লোনা! ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। চোখ রাখলো স্বর্ণাভ শকুনি চোখ জোড়ায়; যা এখন পরিপূর্ণ ক্রোধ, ক্ষোভ আর হিংস্রতায়! মীরের দৃষ্টি ঘুরে ফিরলো আনাবিয়ার হীরকখণ্ডের ন্যায় ঝলমলে চোখে, টেরাকোটা রঙা পাতলা অধরে, অ্যালবাট্রসের ডানার মতোন বিস্তৃত ভ্রুদ্বয়ে, শুভ্র ললাটে।
ক্রমে ক্রমে তার ক্রুদ্ধ, বিক্ষুব্ধ দৃষ্টি পরিবর্তিত হয়ে রূপ নিলো এক তৃষ্ণার্ত, ব্যাথাতুর চাহনিতে! যেন এই মুখখানি দেখার হাজার বছরের তৃষ্ণা ছিলো তার! পরক্ষণেই কিঞ্চিৎ অবিশ্বাস এসে ভর করলো তার দৃষ্টিতে! কপালে পড়লো এক ক্ষীণ বেদনাতুর ভাজ, যেন সমস্ত অবিশ্বাস, সমস্ত অভিযোগ, সকল অভিমানকে রুদ্ধ করে রাখার প্রচেষ্টা প্রকট হলো ওই প্রসস্থ ললাটের একটি মাত্র ক্ষুদ্র ভাজে!

ঝুলে থাকা হাত জোড়ায় সম্মুখের রমণীর মোলায়েম মুখখানা একবার স্পর্শ করার এক তীব্র বাসনা উথলে উঠলো তার বুকের মধ্যিখানে, মনে চাইলো তার মোলায়েম শরীরটি বক্ষমাঝে ফেলে দু’বাহুর শক্ত আলিঙ্গনে পিষে ফেলতে!
আচমকাই হাত মুঠো করে ফেললো মীর, চোখ জোড়া বন্ধ করে বুক ভরে দম নিয়ে পিছিয়ে এলো দুকদম, পরক্ষণেই বিছানায় মহসিনের রেখে যাওয়া পোশাক গুলো হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঢুকে পড়লো চেঞ্জিং রুমে।
পেছনে রেখে গেলো আহত চোখে তার প্রস্থানের দিকে চেয়ে থাকা কিংকর্তব্যবিমুঢ় আনাবিয়াকে!

“তোরা কি কিছু করেছিস? হিজ ম্যাজেস্টি কি কোনোভাবে তোদের ওপর রেগে আছেন?”
ফোনের অপর পাশ থেকে প্রশ্ন করলো কোকো। লিও অস্থির স্বরে বলল,
“কিছুই করিনি ভাই! হিজ ম্যাজেস্টি সেদিন চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তো সব ঠিকই ছিলো! কেন? হিজ ম্যাজেস্টি চিঠিতে কি লিখেছেন? আমাদের ব্যাপারে কিছু লিখেছেন?”
“উনি আর্মি পারেসোনেজ দের ভেতর থেকে দুজন সুদক্ষ আর্মি কে বেছে দিতে বলেছেন আমাকে, পার্সোনাল বডিগার্ড এর জন্য। স্পষ্টতই তোদের বাদ দিতে চাইছেন উনি।”
লিও আকাশ থেকে পড়লো যেন, অসহায় চোখে তাকালো একবার কাঞ্জির দিকে। কাঞ্জি অধীর আগ্রহে চেয়ে ওপাশে কোকো কি বলছে শোনার জন্য। লিও শুধোলো,

“আমাদের কি অপরাধ সে সম্পর্কে কিছু জানিয়েছেন উনি?”
“না, শুধু ওটুকুই।”
“ভাই আমরা কিছুই করিনি, আমার আর লুনার বিয়ের সময় যেটুকু ওলোট পালোট করেছি, তার পর তো আর কিছুই করিনি! হিজ ম্যাজেস্টি তখন তো কিছুই বলেননি! তবে এখন কেন?”
লিওর গলার স্বর জড়িয়ে যেতে চাইলো। কোকো শ্বাস ছাড়লো ওপাশে, বলল,
“জানিনা কি কারণ। আপাতত আমি দুজনকে পাঠাচ্ছি, আরমানের সাথেই ওদের পাঠিয়ে দেওয়ার আদেশ জানিয়েছেন হিজ ম্যাজেস্টি। এই মুহুর্তে এই বিষয় নিয়ে তার কাছে কিছু জানতে চাওয়া বিপদজনক হবে, উনি যেভাবে চায় যেভাবেই চল। পরিস্থিতি খুব একটা ভালো বলে মনে হচ্ছে না। তোদের কে যদি সরিয়ে দিতে পারে তবে নেক্সট টার্গেট হয়তো আমি হবো। আম্মার সাথে কথা বলা প্রয়োজন।”
“শেহজাদী যদি জানতে পারেন আমরা হিজ ম্যাজেস্টির সাথে থাকছিনা, অন্য কেউ থাকছে তবে উনি দুশ্চিন্তা করবেন অনেক। তাঁকে জানাবো কিনা ভাবছি।”

“আম্মাকে না জানিয়ে এক পা-ও মাড়াবি না, আম্মা ছাড়া এসব পরিস্থিতি কেউ সামলাতে পারবে না। তুই সরাসরি আম্মার সাথেই কথা বল।”
লিও আচ্ছা’ বলে বিচ্ছিন্ন করলো সংযোগ৷ হিজ ম্যাজেস্টি বেরিয়ে গেছেন বেশ কিছুক্ষণ আগেই। লিও কাঞ্জি তার সাথে যেতে নিলে ভোরের মতোনই নিঃশব্দ আদেশে থামিয়ে দিয়েছেন ওদের।
আনাবিয়া কামরা থেকে বেরিয়ে সেখানে এলো তখুনি। লিও কাঞ্জি দাঁড়িয়ে পড়লো তৎক্ষনাৎ। আনাবিয়া শুধোলো,
“তোরা এখানে কেন? মীর তো বেরিয়ে গেছে অনেক আগেই!”
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো দুজনেই, ক্ষণিক নিরবতার পর লিও মৃদু স্বরে উত্তর করলো,
“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি আমাদের কে আর তাঁর সাথে দেখতে চান না। তিনি নতুন করে দেহরক্ষী নিযুক্ত করছেন। কোকো ভাইজানকে চিঠি পাঠিয়েছেন দুজন আর্মি পার্সোনেজকে পাঠিয়ে দিতে।”

আনাবিয়া চুপ রইলো, ভাবলো কিছুক্ষণ। মীর হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ কেন করছে? লিও কাঞ্জিকে বাদ দিতে চাইছে! ওর এত বছরের বিশ্বস্ত দেহরক্ষী, আনাবিয়ার নিজের হাতে গড়া দুই সন্তান! কি অপরাধ করেছে ওরা? ওদেরকে বরখাস্ত করে কোন বিশ্বস্ত মানুষকে নিজের পাশে রাখতে চাইছে সে?
“ও যা-ই করুক, যা-ই বলুক তোরা তোদের দায়িত্ব পালন করে যাবি। ও বরখাস্ত করলেও আমি করিনি। তোরা এখনো ওর দেহরক্ষী। এখনি যাবি মিটিং রুমে, ও যেখানে যাবে তোরাও সেখানে যাবি। আমি তোরা ছাড়া অন্য কারো ওপর ভরসা করিনা। ওকে এক মুহুর্তের জন্যেও চোখের আড়াল করবিনা। ও কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, কি খাচ্ছে, কোথায় থাকছে, কোথায় ঘুমোচ্ছে সব আমার জানা প্রয়োজন।”
দৃঢ় স্বরে বলল আনাবিয়া। লিও কাঞ্জি দুজনে কি করবে বুঝতে পারলো না। কাঞ্জি মৃদু স্বরে শুধোলো,

“উনি যদি রেগে যান?”
“রাগলে রাগবে, কিন্তু ওকে একা ছাড়বিনা। ওর কিছু একটা হয়েছে, ও ঠিক নেই, একদম ঠিক নেই। ওর কি হয়েছে আমার জানা প্রয়োজন। অন্তত কিছুদিন তোরা কষ্ট করে হলেও তার আশেপাশে থাকবি! পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমি নিজেই তোদের বলবো ফিরে আসতে। কিন্তু এখন নয়।”
আনাবিয়া দৃঢ় চোখে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে, ক্ষণিক বিরতি দিয়ে আবার বলল,
“এই মুহুর্তে তৈরি হয়ে মিটিং রুমে যাবি, আশা করি ও কিছুই বলবে না তোদের। বললেও ফিরে আসবিনা।”
“আপনার যেমন আদেশ, শেহজাদী।”
লিও কাঞ্জি তৎক্ষনাৎ তৈরি হয়ে এগোলো মিটিং রুমের উদ্দ্যেশ্যে।

প্রায় সপ্তাহ পেরোতে চলল, অথচ মীর একটিবারের জন্যও রয়্যাল ফ্লোরে ফেরেনি। রোজ মিটিং রুম থেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে কোথাও, রাত গুলো তার কাটছে প্রাসাদের বাইরে। লিও কাঞ্জিও লাপাত্তা, হয়তো তার সাথেই। আনাবিয়ার উপায় নেই কারো সাথে যোগাযোগ করার। কাউকে বলে অন্য একটি ফোনের ব্যাবস্থা করবে তার সুযোগ নেই, মীরের কড়া নিষেধ, ভুলেও যেন সে কখনো অন্য কারো বা সম্পুর্ন নতুন সেট ব্যাবহার না করে। তার সব যান্ত্রিক বস্তু গুলো সর্বপ্রথম মীরের হাতে যায়, সেগুলো নানা প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে তবেই আনাবিয়ার হাতে আসে। মীরের অনুমোদন ছাড়া কোনো ডিভাইস ব্যাবহার করা তার জন্য নিরাপদ হবে না।
আনাবিয়া ছটফটিয়ে বেড়িয়েছে বিগত দুটি দিন ধরে। লিও কাঞ্জির কিছু হলো কিনা সে সংবাদ টুকুও পাওয়ার উপায় নেই। ফ্যালকনের সাথে কোনোভাবে যোগাযোগ করতে পারলে সব চিন্তার অবসান ঘটতো। কিন্তু এই মুহুর্তে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে মীরের ক্রোধ আর বাড়াতে চায় না সে। পরিস্থিতি শান্ত হওয়া পর্যন্ত সব রকমের অশান্তি মূলক কাজ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

আনাবিয়া তবুও অপেক্ষায়, অন্তত ভবঘুরের মতোন যত্রতত্র ঘুরে না বেড়িয়ে প্রাসাদে ফিরুক সে, নিজের বিছানায় বিশ্রাম করুক! তার রাগ হলে সে দেখাক, কেন রাগ হয়েছে খুলে বলুক, আনাবিয়াকে বকুক, কিন্তু এভাবে কেন? এভাবে চুপ থেকে কেন? আনাবিয়ার থেকে দুরত্ব বজায় রেখে কেন?

পশ্চিমে সূর্য অস্ত যেতে চলেছে। পাখিরা তারস্বরে চিৎকার চেচামেচি করে ফিরছে খড়কুটোর বাসায়। আনাবিয়া বারান্দা হতে কামরায় গেলো, গোসল করলো সময় নিয়ে। অফ হোয়াইট আর কালোর মিশেলের একটি নজর কাড়া গাউনে জড়ালো নিজেকে, সফেদ চুলগুলো ছড়িয়ে দিলো পিঠের ওপর, নিতম্ব ছাড়ালো ভেজা চুলের বহর।
আয়নার সম্মুখ থেকে উঠে আসতে নিতেই কি ভেবে বসে পড়লো আবার৷ ড্রয়ার টেনে বের করলো কাজল, চোখ জোড়া সুসজ্জিত করার প্রসাধনী। ঝকমকে চোখ জোড়া স্মোকি কাজলে সাজিয়ে নিলো দক্ষ হাতে। ঠোঁটে লেপন করলো ব্লাড রেড লিপস্টিক। শুভ্র দুগালে আঙুলের জোরালো ঘষা দিতেই রক্তিম হয়ে উঠলো চোয়াল জোড়া।
মনোযোগ দিয়ে একবার আয়নায় দেখলো সে নিজেকে, চোখ ফেরানোই দুষ্কর হলো তার! খুব করে চাইলো আজ মীর ফিরে আসুক প্রাসাদে, তাকে এভাবে দেখুক একবার, একবার নিয়ন্ত্রক হারিয়ে কাছে টানুক তাকে, মাতাল করা পাগলাটে আদরের ঝড় তুলুক আনাবিয়ার শরীরে, আবারও রাতের পর রাত তাকে মধুর যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত করে মিশিয়ে দিক বিছানায়, শেষ হয়ে যাক ওদের সব ভুল বোঝাবুঝি, সকল মান অভিমান!

চোখে বাষ্প জমলো আচমকা। বারংবার পলক ফেলে সেগুলোকে মিলিয়ে দিলো আনাবিয়া। কত বছর হলো মীরকে স্পর্শ করেনি সে, মীর আদর করেনি তাকে! অথচ এক সময় একটি রাতও নিঃসঙ্গ কাটতো না তার! মীর ছিটে আসতো তার কাছে তৃষ্ণার্তের মতোন, আকণ্ঠ পান করতো আনাবিয়ার প্রেমসুধা!
বুকের ভেতর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস হাহাকার হয়ে বেরিয়ে এলো আনাবিয়ার। তখুনি বাহিরে পদশব্দ শুনলো কারো, আনাবিয়া কান পেতে রইলো মনোযোগের সাথে। পদশব্দটি এসে থামলো তার দরজার সম্মুখে, আওয়াজ এলো,
“শেহজাদী, লিও আর কাঞ্জি ভাই ফিরেছেন।”
মহসিনের গলা, আনাবিয়া উঠে দাঁড়ালো তৎক্ষনাৎ। এই সাজগোজ নিয়ে ওদের সামনে কিভাবে যাবে ভেবে পেলোনা। এপাশ থেকেই বলে উঠলো,

“ওদেরকে এখানে আসতে বলো, এখুনি।”
প্রস্থান করলো মহসিন। আনাবিয়া এগিয়ে দাঁড়ালো দরজার কাছাকাছি। ক্ষণিক পর লিও এসে দাঁড়ালো দরজার ওপাশে। আনাবিয়া বাহিরে বেরুলো না। দরজার আড়ালে থেকে প্রশ্ন করলো,
“কোথায় ছিলি তোরা এতো গুলো দিন? মীর প্রাসাদে ফেরেনি কেন? কোথায় রাত কাটিয়েছে ও? তোদেরকে বকাবকি করেছে? মারধোর করেনি তো?”
আনাবিয়ার একের পর এক অস্থির প্রশ্নে লিও কোনটার উত্তর আগে দিবে বুঝতে পেলোনা। গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি এত গুলো দিন তার গাড়িতেই ঘুমিয়েছেন। ঘুমিয়েছেন বললে ভুল হবে, গাড়িতেই থেকেছেন। বেশিরভাগ রাত ঘুমাননি, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন শুধু। একবার কুরো আহমার তো আরেকবার কিমালেবে বা ওয়ারদিচাতে গিয়েছেন।”

“খেয়েছে কি এতগুলো দিন? খাওয়া দাওয়া ঠিক ঠাক করেছে? নাকি না খেয়ে শুধু ঘুরেছে? তোরা সাথে ছিলি ওর?”
“জ্বি শেহজাদী, আমরা হিজ ম্যাজেস্টির সাথেই ছিলাম। তবে তার গাড়িতে নয়, বাইকে। উনি দেখেছেন, কিন্তু কিছু বলেননি, মানাও করেননি। আর খাওয়া বলতে….. উনি এ কদিন প্রায় কিছুই খাননি, দুদিন আগে সমুদ্র পাড়ে গিয়ে কিং ক্রাব ধরেছিলেন কতকগুলো, ওগুলো গ্রিল করে খেয়েছিলেন। এ ছাড়া কিছু না….. এখনো পর্যন্ত।”
আনাবিয়া শঙ্কিত হলো, দুশ্চিন্তা এসে ভর করলো তার মস্তিষ্কে। পরক্ষণেই লিওর ডাকে মাথা তুললো সে,
“শেহজাদী…..!”
“বল, শুনছি।”

“হয়তো কোথাও কোনো গরমিল হয়েছে।”
লিওর কন্ঠস্বর অস্বাভাবিক আর্দ্র শোনালো। আনাবিয়া উদ্বিগ্ন স্বরে শুধোলো,
“কেন? কিছু হয়েছে? ও তোদের কিছু বলেছে?”
লিও ক্ষণিক নিরব থেকে উত্তর দিলো,
“গত রাতে উনি কুরো আহমারে ছিলেন। লুমিরা নদীর ব্রিজের ওপর গাড়ি থামিয়ে ব্রিজের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন দীর্ঘক্ষণ! আমরা তাঁর সাথেই ছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদেরকে শিরো মিদোরিতে ফিরে যেতে আদেশ করলেন। তার আদেশ অমান্য করতে পারিনি, অবাধ্য হওয়ার সাহস ছিলোনা, তাই…. ফিরতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু মন মানলোনা, কিছু পথ এসেই ফিরে গেছিলাম আবারও…!”
আনাবিয়ার বুকের ভেতর প্রবল বেগে ঢিপ ঢিপ শুরু হলো. আতঙ্কিত, কাঁপা গলায় শুধোলো,
“ত্‌-তারপর?”

“হিজ ম্যাজেস্টি কাঁদছিলেন, এক ভয়ানক কান্না, কান্নার চাইতে বোধ হয় রাগ আর হাহাকারই বেশি ছিলো! তার কান্নার তীব্রতা টের পেয়েছিলাম অনেক দূর থেকেই, তাই….. সাহস হয়নি আর সামনে এগোনোর। সারা রাত সেখানেই পাহারায় ছিলাম দুজনে। কাঞ্জি বাইক রেখেই এগিয়ে গিয়েছিলো আরও কিছুদূর। আমরা…. আমরা ভয় পাচ্ছিলাম উনি যদি…. যদি কিছু করে বসেন আবেগের বশবর্তী হয়ে….. তাই…!”
আনাবিয়া স্থির হয়ে রইলো শুনে, চোখ ফেটে এলো লোনা জল। মনে ভেবে পেলোনা কি হলো তার মীরের, কোন যন্ত্রণায় আনাবিয়ার থেকে হাজার মাইল দুরত্বের নির্জনে বুক ফাটিয়ে কাঁদতে হলো তার!

গভীর রাতে মীর ফিরলো প্রাসাদে। সারা প্রাসাদ ঘুমে, শুধুমাত্র রয়্যাল ফ্লোরের একটি কামরায় তখনো জ্বলছিলো মৃদু আলো, ভেসে আসছিলো মৃদুমন্দ শব্দ, আনাবিয়ার পায়ের মোলায়েম রিনরিনে আওয়াজ।
রয়্যাল ফ্লোরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরটি সশব্দে ঘোষণা দিতে শুরু করলো মীরের উপস্থিতির সংবাদ। এই শান্তিপূর্ণ নিরবতার ভেতর, উচ্চশব্দ পছন্দ হলোনা মীরের, ‘অ্যাটেনশন’ শব্দটা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই দৃঢ়, পেশিবহুল হাতের এক আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়লো তা।

আনাবিয়া মীরের অপেক্ষায় মেঝেতে বসে বিছানায় মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো কখন, পায়ের স্পর্শে অনবরত রিনরিনে শব্দ হচ্ছে মেঝেতে! গায়ে এখনো জড়ানো সাজ পোশাক। বাহিরে কোনো কিছু ভাঙার আওয়াজ পেতেই ভাঙলো তার কাঁচা ঘুম। তৎক্ষনাৎ হৃৎপিণ্ডটি অস্বাভাবিক ভাবে লাফিয়ে উঠে জানান দিলো তাকে মীরের উপস্থিতি।
চোখ মেলে চাইলো সে। স্মোকি কাজল লেপ্টে গেছে, সুদীর্ঘ অশ্রুরেখা আঁকিয়েছে একটিতে। চুলগুলো আলুথালু, ঠোঁটের লালিমা এখনো তেমনি বিদ্যমান। সাজ অগোছালো হওয়া সত্ত্বেও সৌন্দর্যে এতটুকু ভাটা পড়েনি তার!
উঠে দাঁড়ালো আনাবিয়া! মীরের পদশব্দ তার কামরা পেরিয়ে মিলিয়ে গেলো ওপাশের কামরায়৷ আনাবিয়া হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাস নিলো, মীরের মুখোমুখি হওয়ার চিন্তাতেই গলা শুকিয়ে আসছে তার। সশব্দে পানি খেয়ে বেরিয়ে এলো সে কামরা থেকে।

বারান্দা শুণ্য। মহসিন নেই এদিকে, কেউই নেই। লিও কাঞ্জি ঘুমিয়ে গেছে হয়তো! নাকি তারাও নেই? আনাবিয়ার গায়ে কাটা দিলো, সমুদ্রের ভেসে আসা শীতল হাওয়ায় নাকি ভয়ে সেটা ঠাহর করতে পারলোনা আনাবিয়া। দ্রুত পায়ে এগোলো মীরের কামরার উদ্দ্যেশ্যে।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৩

দরজার সামনে গিয়ে থামলো সে, কোন অজানা আতঙ্কে বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম করছে তার, হৃৎপিণ্ডটি যেন বক্ষপিঞ্জর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়! কোনো ভাবেই তাকে শান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে না! আনাবিয়া শ্বাস নিলো বুক ভরে, যেন অস্থির হৃদপিণ্ডটি একটু স্বস্তি পায়! কিন্তু শান্ত হলোনা তার হৃদযন্ত্র!
ঢোক গিললো সে একটা, তারপর দম আঁটকে আচমকাই দুহাতে সজোরে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো ভেতরে।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৫