Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৬

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৬

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৬
রানী আমিনা

কামরায় কালো রঙা পাথুরে সিংহাসনের ওপর বন্ধ চোখে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে মীর। সম্মুখের টেবিলের ওপর সযত্নে রাখা এক গোছা শুভ্র রেশমী চুল, সুসজ্জিত। এখনো ঝলমলে রশ্মি টিকরে বেরোচ্ছে তা থেকে; ক্ষীণ, ম্রিয়মাণ!
পেছনের বিরাট ব্যালকনিতে কারো ভারী পা ফেলার শব্দ হলো তখনি, কেউ আনুগত্যের সুরে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থী।”
“এসো, অ্যাবিসোরা।”

বন্ধ চোখেই বলল মীর। নেভি ব্লুর আলখেল্লায় মোড়া অ্যাবিসোরা মৃদু পায়ে এলো ভেতরে। দুহাতের ভেতর সসম্মানে ধরে রাখা এতক্ষণ ধরে সমস্ত খুঁজে কুড়িয়ে পাওয়া সফেদ রেশমি চুলের কয়েকটি। টেবিলের ওপর থাকা চুলের সমাহারের সাথে অত্যন্ত যত্নসহকারে সেগুলো রেখে দিয়ে আনত মস্তকে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, রেড জোনে আর একটি চুলও অবশিষ্ট নেই। আমি সমস্তটা খুঁজে দেখেছি।”
“ঠিক আছে, তুমি যেতে পারো এখন।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

গুরুগম্ভীর স্বরে বলল মীর। অ্যাবিসোরা আনুগত্য জানিয়ে প্রস্থান করলো তখুনি৷ মীর ক্ষণিক বন্ধ চোখে থেকে অতঃপর সোজা হয়ে বসলো। দৃষ্টি রাখলো কর্তিত সফেদ কেশগুচ্ছের ওপর।
কত যত্নেই না রাখতো সে এই চুলগুলোকে! রোজ নিয়ম করে চিরুনী দিয়ে, বেণী করে; প্রাসাদে তৈরি জোজোবা আমন্ড মিশিয়ে তৈরি করা কেশতৈল অল্প আঁচে গরম করে কত যত্নেই না দু’হাতে সে মিশিয়ে দিতো এই চুল গুলোতে! গোসলের সময় নিজের হাতে শ্যাম্পু দিয়ে মোলায়েম হাতে পরিষ্কার করতো সে এই চুল গুলোকে, যেন আনাবিয়া নিজে নিজে করতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় জোরজবরদস্তি শ্যাম্পু ঘঁষে চুল গুলোকে নষ্ট না করে ফেলে!
তবে কি আজ শুধু মীরের এত আদর এত যত্নকে পেছনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেলো সে? মীরের আদর, আহ্লাদ, খেয়াল এতটাই ফেলনা হয়ে গেলো তার কাছে? মীরের প্রতি তার ঘৃণা, অবজ্ঞা বুঝাতে এই অতি সাধের প্রিয় চুলগুলোকেই বিসর্জন দিতে হলো? আর কি কোনো উপায় ছিলোনা?

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মীর, হতাশ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সযত্নে গুছিয়ে রাখা চুল গুলোর দিকে, আঙুল বাড়িয়ে আলতো করে বুলিয়ে দিলো চুল গুলোর ওপর। এখনো সেগুলো পূর্বের মতোই রেশমী, পূর্বের মতোই নরম, পূর্বের মতোই সুন্দর! মীরের চোখে বাষ্প জমলো। বসে বসে, সময় নিয়ে খোলা চুল গুলোকে বেণীতে রুপান্তর করলো সে, অতঃপর পরম আদরে তাতে একটা চুম্বন করে উঠিয়ে রাখলো একটা নকশাদার কাঠের বাক্সের ভেতর।
দেয়ালে সেঁটে থাকা গিটারটি হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। স্বর্ণাভ, শিকারী দৃষ্টি দিয়ে একবার দেখে নিলো রেড জোনের সম্পুর্নটা, অন্ধকারে ডুবে আছে সমস্তই। আচমকা এক লাফে সুউচ্চ ব্যালকনি থেকে ঝড়ো বেগে নেমে পড়লো সে রেড জোনের মাটিতে। তড়িৎ বেগে বাতাসের সাথে মিশে ছুটে এগোলো কোনো এক দিকে। বিরাট বিরাট রেড উড, ইউক্যালিপটাস, পাইন, ক্রিস্টমাস, জ্ঞন ঝোপঝাড়, ভরা জঙ্গল সমস্ত ছিন্ন করে ছুটতে ছুটতে একসময় এসে পৌছোলো অর্কিড বাগানের ভেতর।

সাদা রঙা অর্কিডে ছেয়ে আছে চতুর্দিক। আঁধারে মোড়া জঙ্গলের ভেতর যেন উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে ফুলগুলো, ঠিক তার শিনজোর মতোন! তার শিনজো যে এভাবেই উজ্জ্বলতা ছড়াতো তার নিস্তব্ধ কামরায়, তার নিকষ কালো বক্ষ পিঞ্জরের ভেতর, তার আঁধারে মোড়া জীবনে!
আদর করে ডাকতো সে তাকে, ‘হোয়াইট অর্কিড’!
সুন্দর, সুন্দর, অনেক অনেক সুন্দর; ঠিক এই শুভ্র বুনো ফুলের মতোন; বন্য, নজরকাড়া, নেশালো, অভিমানি!
মীর মৃদু পায়ে এগোলো বনের মধ্যিখানে থাকা ছোট্ট ঢিবি টির দিকে। মাটিতে প্রায় মিশে গেছে তা! ওপরে গজিয়েছে একঝাক বুনোফুল, নীল রঙা। এইখানে ঘুমিয়ে আছে তাদের দুজনের একাংশ, তার সত্তা!
মীরের মনে পড়লো, অপরিণত ভ্রুণটিকে দুহাতে ধরে সে কত আর্তনাদই না করেছিলো! রাগও হয়েছিলো তার ভীষণ! কত কষ্টই না দিয়েছিলো তার শিনজোকে এই ছোট্ট অংশটি। মরতে বসেছিলো তার আদরের শিনজো, নিষ্প্রাণের মতো পড়ে ছিলো বিছানায়!

দুইটি বৎসর, দুই দুইটি বৎসর তার প্রাণের বন্ধ চোখে তাকিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলো সে! শীর্ণ হাত জোড়া ধরে বসে থেকেছিলো কতশত ঘন্টা! যেন ছেড়ে দিলেই তাকে ফাঁকি দিয়ে উড়ে যাবে শিনজোর আত্মা! ওই হাত জোড়া ধরে রেখে যেন প্রাণপণে সে আঁকড়ে ধরতে চাইতো তার প্রাণের ছুটে পালিয়ে যেতে চাওয়া আত্মাটিকে!
শিনজো জেনেছে তার এই সন্তানটির কথা! যন্ত্রণা পেয়েছে সে, অনেক! অল্পেই যে বুক ফাটে তার! মীর থাকতে পারেনি তার পাশে, প্রশমিত কর‍তে পারেনি তার যন্ত্রণা! আদুরে চুম্বনে ভরিয়ে দিতে পারেনি ওই শুভ্র মুখমণ্ডল, একবার বুকে টেনে নিয়ে বলতে পারেনি সব ঠিক হয়ে যাবে, কোনো উপায় হবে, কিছু তো হবে!
কিন্তু….. সব ঠিক হয়ে যাবে বললেই কি সব ঠিক হয়ে যায়?

মীর হাত বুলালো বিলুপ্তপ্রায় ঢিবিটির ওপর, নরম হাসিতে বাঁকালো তার ঠোঁট জোড়া। বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে এখন হয়তো ছুটে বেড়াতো প্রাসাদময়, জ্বালিয়ে মারতো তার আম্মাকে! মিটিং রুম থেকে ফেরা মাত্রই শিনজো নিশ্চয় ছেলের নামে এক ঝাঁক অভিযোগ নিয়ে হাজির হতো তার নিকট! কার ঘাড় ভেঙেছে, কাকে ফেলে দিয়েছে, আজ কোন আলমিরাটা ভেঙেছে, আজ কার সাথে না জানিয়ে ঘুর‍তে চলে গেছে, আজ কোথায় আঁছাড় খেয়ে মাথা ফাটিয়ে এসেছে!

মা ভক্ত হতো বুঝি খুব, বাবাকে ভয় পেতো নিশ্চয়? বাবা বকা দিলে মায়ের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়তো নিশ্চয়! তখন কি করতো তার আম্মা? আদরে আদরে পর্যবসিত করতো ছেলেকে, তারপর নিশ্চয় মীরকে মিষ্টি আদরে ভুলিয়ে ভালিয়ে নরম গলায় বলতো— আজকের মতো ছেড়ে দাও, আমার ছেলে একদম ভালো ছেলেটি হয়ে দেখাবে, আর একটুও দুষ্টুমি করবেনা! মীর গলে যেতো তাতে, খুব গলে যেতো!
মীর হাসলো মৃদু শব্দে, উঠে দাঁড়ালো পরক্ষণেই। শিনজো, শিনজো, শিনজো….. তার প্রাণ, তার সত্তা, তার আত্মা, তার অর্ধাঙ্গিনী…. না, শিনজো তার পুরোটাই, তার সমস্ত কিছু! ওকে ছাড়া সে কিভাবে বাঁচবে, এত দুরত্ব রেখে সে কিভাবে বাঁচবে? কিভাবে এই বিচ্ছেদ যন্ত্রণা সহ্য করবে সে? এই ক্রোধ, এই অভিমান ভুলে কিভাবে তাকে কাছে আনবে আবার? আবার কবে ওই পাতলা শরীরটা নিজের বুকের ভেতর ফেলে পরম আদরে পিষবে সে? কবে আবার ওই নরম হাত দুটোর স্পর্শ পড়বে ওর রুক্ষ চোয়ালে? ভুলিয়ে দিবে তার সমস্ত যন্ত্রণা, অসহ্য বেদনা! কবে আবার ওই নরম ঠোঁট জোড়ায় চুম্বনের সৌভাগ্য হবে তার, কবে কবে কবে?

মরিয়া হয়ে উঠলো মীর, অসহায় দৃষ্টিতে চতুর্দিকে তাকিয়ে ছটফটিয়ে উঠলো সে, বুকের ভেতরে থাকা সুপ্ত অভিমান, ক্রোধ, যন্ত্রণা, আর তীব্র ভালোবাসা সমস্তই যেন একত্রে জেগে উঠে আক্রমণ করে বসলো তাকে! মীর অস্থির হয়ে উঠলো, অশান্ত হয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো অর্কিড বাগানের বাহিরে, পরক্ষণেই ছুটলো ঘন জঙ্গলের অভিমুখে!
মুহুর্তেই শরীর হারালো তার স্বাভাবিক রঙ, শ্যাম রঙ পরিবর্তিত হলো ভ্রমরকালোয়, চকচক করতে রইলো শরীরের জান্তব কুচকুচে কালো আবরণ! ক্ষুরধার হলো শকুনি চোখ জোড়ার স্বর্ণাভ দ্যুতি, সাঁড়াশির ন্যায় আঙুলের মাথায় বেরিয়ে এলো ধারালো নখর, সুসজ্জিত দন্ত পরিণত হলো হিংস্র, ধারালো শিকারি দাঁতে!

ঝড়ো বেগে ছুটে অত্যন্ত ঘন, নির্জন জঙ্গলের ভেতর গিয়ে আচমকা থামলো সে, শ্বাস পড়তে রইলো তার ঘন ঘন। মৃদু পায়ে এগিয়ে গিয়ে তরতরিয়ে উঠে পড়লো একটি বিরাট রেড উড গাছের মগডালে। বেছে বেছে একটি শক্তপোক্ত ডালের ওপর গিয়ে বসে চেয়ে রইলো সে সুদুর কিমালেবের দিকে, চেষ্টা করতে রইলো নিজেকে শান্ত করার!
অজান্তেই এক অসহায় দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে। সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করে গিটারটি পিঠ থেকে নামিয়ে সামনে আনলো সে, ধারালো নখরের স্পর্শে গিটারের তারে সুর তুলে ভেতরের সমস্ত ক্রোধ, ক্ষোভ, অভিমান মিশিয়ে গেয়ে উঠলো,

তুমি ক্রোধের আগুনে
জমে থাকা ব্যথা
আমার শেষ বিকেলের ধোঁকা
কোনো রোদেলা দুপুরে
তোমায় ফিরে পাবো বলে
অর্থহীন খোঁজা
আমি আঁকিনি তোমার ছবি
দেখিনি স্রোতের নদী
আকাশ ভরা তারা
যত সুখের স্মৃতি ঘিরে
আছো তুমি মেয়ে
এ পথের শেষ কোথা?
ছেঁড়া পালের গহীনে
লাগিয়ে ঝড়ো হাওয়া
তুমি ভাসাও সুরের ভেলা
তবু কাঁদো কেন বসে
একা নির্জনে
ভুলে যাও তুমি বাস্তবতা?
আমি পাইনি তোমার ছোঁয়া
শিশির মাখানো ধোঁয়া
জলের নিস্তব্ধতা
আজও চাঁদ ডুবে গেলে
তোমায় মনে পড়ে
সঙ্গী মোর নিঃসঙ্গতা….

ইয়টে করে যে মুহুর্তে আনাবিয়া রামাদি সামা পৌছোলো ততক্ষণে রাত নেমে এসেছে। গতকাল সন্ধ্যায় ইলহানের বাসা থেকে বেরিয়ে ইয়টেই কাটিয়েছে সারা রাত। ঝাড়াকাটা ঘুম দিয়ে সকাল বেলা রওনা দিয়েছে রামাদি সামার উদ্দ্যেশ্যে।
ইয়ট থেকে নেমে রামাদি সামার মাটিতে পা রাখতেই এক দমকা হাওয়া এসে ছুয়ে দিলো ওকে। ছোট চুল গুলো উড়লো তাতে। সম্মুখে অগ্রসর হতে হতে শিস বাজানোর ভঙ্গিতে মুখ থেকে পাখির মিষ্টি ডাকের ন্যায় অদ্ভুত এক সুর তুললো সে।

হাজার হাজার মাইল দুরত্বে থাকা বিরাট বিশাল খোলা চত্বরের লম্বা লম্বা সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোতে থাকা স্ত্রেলকা জেগে উঠলো তাতে, সবেই ঘুম এসেছিলো তার। মালকিনের তলব পেতেই তৎক্ষনাৎ ছুটতে ছুটতে নিজের জমকালো সফেদ ডানা মেলে আকাশে উড়াল দিলো সে। ঝড়ো গতিতে ছুটে এলো আনাবিয়ার নিকট।
আকাশ থেকে বিকট শব্দে লাফিয়ে মাটিতে নামলো সে, মাথা নিচু করে আনাবিয়ার দিকে এগিয়ে এসে আদুরে ভঙ্গিতে মাথা ছোঁয়ালো আনাবিয়ার পেটে। আনাবিয়া মিষ্টি হেসে দুহাতে দলাই মলাই করে দিলো ওর ফোলা ফোলা কেশর। পরমুহূর্তেই এক লাফে স্ত্রেলকার পিঠে উঠে, উচ্ছসিত ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
“চলোওওও, আমার বড় ছেলের কান মলে দিয়ে আসি!”
সোৎসাহে মাথা দুলিয়ে উচ্চস্বরে হ্রেষা ধ্বনি করলো স্ত্রেলকা। পরক্ষণেই ঝড়ো বেগে ছুট লাগিয়ে নিজের বিরাট বিরাট ডানা জোড়া মেলে উড়াল দিলো রামাদি সামার তারা খচিত কালো আকাশে!

নিজের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যালয়ে কলোনেল এবং মেজর দের সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ ব্যাস্ত কোকো। সম্প্রতি দ্বীপ গুলোর কোথায় কোথায় সেনা মোতায়েন করা অত্যাবশ্যক, নতুন সৈন্য দের কবে নাগাদ এবং কত জন নিয়োগ দেওয়া হবে সেগুলো নিয়েই বিস্তর আলোচনা৷
পরনে তার ফর্মাল পোশাক, চোখে রিমলেস আইগ্লাস, আজকাল দূরের জিনিস কম দেখা শুরু করেছে সে। রেক্সা মাঝে মাঝেই আজকাল সুগার ড্যাডি বলে উষ্কে দিচ্ছে তাকে।

সেনানিবাসের ভেতর বেশ নিরব, কোকোদের মিটিং শেষ হতেই তার আদেশে বাজিয়ে দেওয়া হলো বাগল। বাগলের তীব্র শব্দে ব্যারাকে থাকা সৌন্যরা দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে তৈরি হয়ে মিলিত পায়ে ছুটলো প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে।
মুহুর্তেই লাখো সৈন্য জড় হলো প্যারেড গ্রাউন্ডে, তাদের একত্রিত বুটের জোরালো শব্দে কেঁপে উঠতে রইলো রামাদি সামার মাটি। ক্ষণিক পর সৈন্যরা নিরব হতেই প্যারেড গ্রাউন্ডের সম্মুখের বিরাট প্লাটফর্মে একে একে এসে দাঁড়ালো জেনারেল এবং মেজর গণ। তার পরেই পেছন থেকে এগিয়ে এসে ডায়াসের সম্মুখে দাঁড়ালো কোকো।
সে উপস্থিত হওয়া মাত্রই সমস্ত সৈন্য একত্রে স্যালুট জানালো তাকে, তাদের বুটের তীব্র শব্দে আবারও কেঁপে উঠলো মাটি৷ বিশাল বিস্তৃত প্যারেড গ্রাউন্ডের চতুর্দিকে রাখা সাউন্ড সিস্টেমে সেই মুহুর্তেই ধ্বনিত হলো কোকোর গমগমে, কর্কশ কন্ঠস্বর।

“সোলজার্স..”
তৎক্ষনাৎ সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করলো সে। ক্ষণিক বিরতি দিয়েই সে আবার শুরু করলো,
“হেইল টু দ্যা মাইটি কিং নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান হুজ অর্ডার ইজ দ্যা ল’ টু আস। আমরা তার আস্থা, তার শক্তি, এবং তার সাম্রাজ্যের একনিষ্ঠ রক্ষাকারী। উই আর নট জাস্ট সোলজার্স, উই আর দ্যাট আর্মি হু অ্যাবাইডস্‌ বাই এভরি অর্ডার অব হিজ ম্যাজেস্টি অ্যান্ড হিজ অনারেবল বেগাম। হোক সীমান্ত বা শহর, জঙ্গল বা রণক্ষেত্র; উই আর ইউনাইটেড অ্যান্ড স্ট্রং। উই ভাও টু সার্ভ আওয়ার লাইফ টু দ্যা মাইটি কিং অ্যান্ড দ্যা স্টেট।

স্যো….. আগামীকাল থেকে তোমাদের সকলের নতুন জীবন শুরু হতে চলেছে, প্যারামিলিটারি কে সম্পুর্ন সক্রিয় হওয়ার আদেশ এসেছে শিরো মিদোরি থেকে। হিজ ম্যাজেস্টির আদেশ অনুযায়ী ছড়িয়ে পড়ার সময় এসেছে।
পঞ্চদ্বীপের সকল নাগরিককে একটি সুস্থ, নিরাপদ জীবন দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য এবং উদ্দ্যেশ্যে। আগামীকাল ভোরেই তোমাদেরকে যার যার নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে হবে, সেভাবেই ফিজিক্যালি এবং মেন্টালি প্রিপ নাও৷ তোমাদের প্রত্যেকের গন্তব্যস্থল আগামীকাল ভোরেই জানানো হবে। টিল দেন স্লিপ টাইট। বিগ ডে অ্যাহেড, থ্যাঙ্কিউ।”

কোকোর কথা শেষ হওয়া মাত্রই দ্বিতীয় বার তাকে স্যালুট জানানোর প্রস্তুতি নিলো সৈন্যদল। সেই মুহুর্তেই সফেদ আলোর ঝলকানিতে আচমকা আলোকিত হয়ে উঠলো সেনানিবাসের প্রবেশ পথের উপরের আকাশ, পরক্ষণেই ওপর থেকে ভেসে এলো ঘোড়ার তীব্র, কান ফাটানো হ্রেষা ধ্বনি!
বিরাট বিরাট সফেদ ডানা জোড়া ঝমকিয়ে ঝড়ের বেগে প্যারেড গ্রাউন্ডের ভেতরে এসে লাফিয়ে পড়লো স্ত্রেলকা। তার সানন্দ হ্রেষা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো চারধার! সৈন্যরা আচমকা আতঙ্কিত হয়ে ছুটে পিছিয়ে গেলো স্ত্রেলকার নিকট থেকে। অবাক, ভীতসন্ত্রস্ত চোখে দেখতে রইলো বিরাট ডানা ওয়ালা সাদা ঘোড়াটিকে, শরীরে আলো পড়ে ঝিকিমিকি করছে তার!

কোকো প্লাটফর্মেই ছিলো, স্ত্রেলকাকে দেখা মাত্রই খুশিতে আত্মহারা হয়ে এক লাফে সুউচ্চ প্লাটফর্ম থেকে লাফিয়ে নামলো সে৷ তারপর ছুটে চলল স্ত্রেলকার দিকে। মঞ্চের ওপর বর্তমান থাকা অধস্তনেরা তাদের গুরুগম্ভীর ষণ্ডা মার্কা আর্মি চিফের এমন শিশুসুলভ আচরণে যারপরনাই অবাক হলো, বিস্ময় নিয়ে তাকালো একে অপরের দিকে! প্যারেড গ্রাউন্ডে থাকা সৈন্যরাও প্রচন্ড বিস্মিত হলো তাদের ভয়ানক স্ট্রিক্ট আর্মি চিফ কোকোকে এভাবে ছুটতে দেখে।
কোকোর ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে, সে সমানে ছুটতে ব্যাস্ত। স্ত্রেলকা কিয়ৎক্ষণ একই স্থানে ধীর গতিতে ঘুরপাক খেয়ে নামিয়ে ফেললো ডানা, তখুনি সকলের দৃষ্টিগোচর হলো ঘোড়ার পিঠের ওপর অধিষ্ঠ প্রচন্ড সুন্দরী রমণীটিকে! সেনানিবাসের রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে সেই মুহুর্তে ধ্বনিত হলো,

“অ্যালার্ট, অ্যালার্ট, লোয়ার ইয়োর গেইজ। দ্যা অনারেবল শেহজাদী অ্যান্ড বেগাম আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ান।”
চমকালো উপস্থিত সকলে, মুহুর্তেই নামিয়ে ফেললো দৃষ্টি। মাথা নত করে চেয়ে রইলো মাটির দিকে। আনাবিয়া কোকোর দিকে চেয়ে সহাস্যে লাফিয়ে নামলো মাটিতে, কোকো ছুটে এসেই দুহাতে আলতো করে জড়িয়ে নিলো আনাবিয়াকে, আদুরে গলায় ডাকলো,

“আম্মা, আমার আম্মা!”
“সরে যা, তোর গা থেকে শালিকের গন্ধ আসছে! ইয়াক!”
বলে কোকোকে এক হাতে ঠেলে সরিয়ে দিলো আনাবিয়া, কোকো সশব্দে হেসে আনাবিয়ার হাতের ওপর চুমু খেলো। নরম হাতখানা দুহাতের মুঠিতে ভরে আনাবিয়াকে ভেতরের দিকে টেনে নিয়ে যেতে বলল,
“কি খাবেন আম্মা? থাকবেন তো আজকে? আমার বাড়িতে থাকবেন কিন্তু, আপনার জন্য আমি এখনি কামরার ব্যাবস্থা করছি। না বলার কোনো সুযোগ নেই, আগেই বলে দিচ্ছি।”

“হাত ছাড়, আমি থাকতে আসিনি। তুই আমার কিছু কাজ করে দিবি। কাজ শেষ হওয়া মাত্রই আমি বেরিয়ে যাবো।”
“কাজ করিয়ে নিতে চাইলে থাকতে হবে, আমার কাছে। রেক্সা আছে এখানে, ও আপনার সব খেয়াল রাখবে আম্মা। আর আমি তো আছিই, প্লিজ আম্মা! না থাকলে কিন্তু আমি কিছুই করে দিবোনা! থাকুননা!”
আবদারের সুরে বলল কোকো, আনাবিয়া ওর কান টেনে বলল,
“হুমকি দেস তুই আমাকে? জানিস আমি কে?”
“জানিতো, আপনি আমার ওয়ান অ্যান্ড অনলি আম্মা। থাকুননা! একটা রাতই তো! এত রাতে আমি আপনাকে কোথাও যেতে দিবোনা। নট হ্যাপেনিং।”
সজোরে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল কোকো। আনাবিয়া হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওর বাহুতে চাপড় মেরে বলল,
“বেশি বকিস না, তোর নকশা দেখতে পাচ্ছে সবাই।”

কোকো তাকিয়ে দেখলো চারদিকে, আড়চোখে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে সকলে। কেউ কেউ কোকোর এমন শিশুসুলভ আচরণে ঠোঁট টিপে হাসছে। কোকো অপ্রস্তুত হয়ে গলা খাকারি দিলো।
প্লাটফর্মের ওপর থাকা এক কলোনেলকে ইশারায় বলে দিলো সৈন্যদেরকে বিদায় জানিয়ে ছেড়ে দিতে। তারপর আনাবিয়াকে থাকার জন্য সাধাসাধি করতে করতে এগোলো তার বাসভবনের দিকে।
তখনি সেনানিবাসের বাহিরে, নির্জনে আকাশ হতে তীক্ষ্ণ আওয়াজে ডেকে, সজোরে উড়ে মাটিতে নামলো একটি বিশালাকার শিকারী বাজ পাখি, নিমিষেই পরিণত হলো একজন পূর্ণবয়স্ক লম্বাচওড়া পুরুষে। কানে থাকা ইয়ারপিসে সে বলে উঠলো,

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী এই মুহুর্তে সেনানিবাসে আছেন। আর্মি চিফ কোকোর বাসভবনের দিকে এগোচ্ছেন। খুব সম্ভবত আজ এখানেই থাকবেন, উনি বের হলেই আমি আপনাকে জানাবো৷”
অপর পাশ হতে মীর গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“তাকে একটি মুহুর্তের জন্যেও চোখের আড়াল করবেনা, লিয়াম। তার প্রতিমুহূর্তের আপডেট আমার চাই।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”

“আমার আম্মা এসব কখনোই খাবেন না লিউক! তাজা মাছ চাই, একদম মাত্র পানি থেকে তোলা। যেভাবে পারো জোগাড় করো। হিজ ম্যাজেস্টি যদি জানেন আমি আম্মাকে ফ্রোজেন মাছ খেতে দিয়েছি আমাকে লাথি মেরে আর্মি চিফ থেকে আবার রেড জোনের স্থায়ী বাসিন্দায় পরিণত করবেন। আর হ্যাঁ, একদম তাজা গরুর মাংসের ব্যাবস্থা করবে, একটু আগেই জবাই হয়েছে এমন। ফাস্ট ফাস্ট।”
নিজের ব্যাক্তিগত পাচকের হাতে ধরা বরফে আচ্ছাদিত, শক্ত হয়ে যাওয়া স্যামন দেখে বলল কোকো। শেফ ওর দিকে অসহায় চোখে চেয়ে বলল,

“এই রাতে আমি তাজা স্যামন কিভাবে জোগাড় করবো, চিফ।”
“সেটা আমার দেখার বিষয় নয় লিউক, যেভাবে পারো জোগাড় করো, উনি স্যামনই খাবেন।”
বলেই কোকো গটগটয়ে হেটে এগোলো নিজের বিরাট আলিশান ভবনের তৃতীয় তলায়। সেখানের একটি বড়সড় কামরা আনাবিয়ার জন্য মাত্রই সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করিয়েছে সে।
তৃতীয় তলায় পৌছোনো মাত্রই ভেসে এলো আনাবিয়া আর রেক্সার উচ্চস্বরে হাসির শব্দ। কোকোর ভালো লাগলো খুব, ওর আম্মা আজকাল প্রাণখুলে হাসার মতোন কারণই পাচ্ছেন না, রেক্সাটাও বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে শেহজাদীকে পেয়ে। কি যে জাদু করে তার আম্মা, সবগুলো জোঁকের মতো লেগে থাকে তার আম্মার সাথে। একদমই ভালো লাগেনা ওর!
কোকো দরজায় নক করে বলল,

“আম্মা, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলে কৃতার্থ হতাম।”
“হু, আয় দ্রুত। তোর জন্যই বসে আছি তখন থেকে।”
ভেতর থেকে উত্তর দিলো আনাবিয়া। কোকো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। আনাবিয়া বসে আছে বিছানায়, বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে। ছোট চুল গুলো কাঁধের ওপর ছুয়ে আছে আলতো করে, ঠিক গোছালো নয়, এলোমেলো। কোকো গিয়ে বসলো বেড সাইড সোফায়, রেক্সার পাশে।
আনাবিয়া ওর দিকে ফিরে বলল,
“আমার ফোন চাই, নতুন। আমারটা মীরের কাছে আঁটকা পড়ে গেছে। সাথে বাইক চাই একটা। তাড়াহুড়োয় সাথে কোনো টাকা পয়সা নিয়ে আসতে পারিনি। কিন্তু এগুলো এখন আমার খুব প্রয়োজন।”
কোকো গলা খাকারি দিলো, ইতস্তত করে বলল,

“আম্মা, বাইকের ব্যাবস্থা আমি করে দিতে পারবো, কিন্তু ফোন….. হিজ ম্যাজেস্টি জানলে জানে মেরে ফেলবেন আমাকে! জানেনই তো, তিনি অ্যাপ্রুভ না করা পর্যন্ত… উনি জানতে পারলে আমাকে মেরেই ফেলবেন।”
অসহায় স্বরে বলল কোকো। আনাবিয়া ফোস করে শ্বাস ছাড়লো, বলল,
“তবে আমার ফোনটা যেভাবেই পারিস ওর থেকে উদ্ধার করে দে। একটা ফোনের অভাবে আমি কারো সাথে কম্যুনিকেট করতে পারছিনা।”
“আম্মা, কোথায় যাবেন আপনি এরপর? মানে, আগামীকাল?”
“কুরো আহমার যাবো।”
“হঠাৎ সেখানে?”

আনাবিয়া প্রতিউত্তরে চুপ করে রইলো। কোকো আগ্রহী চোখে চেয়ে রইলো তার দিকে উত্তরের অপেক্ষায়। আচমকা কিছু টের পেয়ে পাশে থাকা রেক্সাকে বলল খাবার কতদূর হয়েছে খোঁজ নিয়ে আসতে। রেক্সা বেরিয়ে গেলে ক্ষণিক নিরব থেকে আনাবিয়া মৃদু স্বরে বলল,
“মীরের মেমোরি ফিরেছে। নিশ্চয় লাইফট্রি করেছে এসব, অটোম্যাটিক্যালি ওর মেমোরি ফিরে আসার কথা কখনোই ছিলোনা কোকো। লাইফট্রি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আমার সাথে। নিশ্চয় মীরের মেমোরি সম্পুর্ন ডিলিট করেনি সে সেদিন, বা ঠিক কি করেছে আমি জানিনা। কিন্তু সে আমার কথা রাখেনি।”
“হিজ ম্যাজেস্টি কিছু বলেছেন আপনাকে? বকাবকি করেছেন? রাগারাগি করেছেন আপনার সাথে?”
কোকোর স্বর উদ্বিগ্ন। আনাবিয়া ওর দিকে চেয়ে ঠোঁট বেকিয়ে মৃদু হাসলো, ব্যাথাতুর স্বরে বলল,

“সেটা করলেও এক রকম হতো, কিন্তু সে সেসব করছে না। সব জেনে সে চুপ হয়ে গেছে। আমিও ভেবেছিলাম সে হয়তো আমার এমন স্পর্ধা দেখানোর কারণে রাগ দেখাবে, চিৎকার চেচামেচি করবে বা সর্বোচ্চ হলে আমাকে আঘাত করবে। কিন্তু সে সেসবের কিছুই করেনি।
আমাকে অপমান করেছে, কিছু বিশ্রী কথা বলেছে। নিজেকে হয়তো সে আমার থেকে সরিয়ে নিতে চাইছে, বা জানিনা সে আসলেই কি চাইছে। হয়তো আমি সেখানে উপস্থিত থাকলে তার অনেক অসুবিধা হবে, সে হয়তো ঠিকঠাক নিজের কাজে মনোযোগী হতে পারবেনা।
আমাকে নিয়ে শুধু শুধু ওভার থিংকিং করবে, বা পাশাপাশি থাকলে না চাইতেও দুজনের ঝগড়া হবে, আমিও ফ্রিলি চলাফেরা করতে পারবোনা, অস্বস্তি হবে আমার।

আমি তা চাইনা। আ’ম গিভিং হিম স্পেস। আমি তাকে নতুন ভাবে সব শুরু করার সুযোগ দিচ্ছি। আমি আর কখনো কারো অসুবিধার কারণ হতে চাইনা কোকো। আ’ ওয়ান্ট ফ্রিডাম, আ’ ওয়ান্ট টু গিভ ফ্রিফাম।”
কোকো চুপচাপ শুনলো। কি বলবে বুঝতে পেলোনা। ক্ষণিক নিরব থেকে আনাবিয়া আবার বলল,
“কিছুদিন আগে যা ছিলো সেটা একরকম ছিলো, মানানসই। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা মোটেও ঠিক হচ্ছেনা। হয়তো এখানে আমার দোষেরও ভাগ আছে। কিন্তু যা হচ্ছে তা ঠিক হচ্ছেনা৷ এভাবে চলতে পারে না। মীর শুধু আমারই, অন্য কারো নয়। আমি ওকে কখনো অন্য কারো হতে দিবোনা, যেদিন ও অন্য কারো হবে সেদিন হয়তো ওই দৃশ্য দেখার জন্য আমি আর জীবিত থাকবো না। কিন্তু….. আমার প্রাণ থাকতে নয়। ওর যদি আমাকে প্রয়োজন হয় তবে ও আমাকে খুঁজবে, আর যদি না খুঁজে তবে আমি হয়তো ওর জীবন জাহান্নাম করে দিবো, নয়তো নিজেকে শেষ করে দিবো। কি করবো জানিনা, তবে করবো। আমি কাউকে শান্তি দিবোনা, নিজেকেও নয়। ওর কোনো অধিকার নেই আমার থেকে দূরে থাকার, ওকে আমার কাছে আসতেই হবে, আজ হোক বা কাল। নইলে আমি ধ্বংস করে দিবো সব, সাথে নিজেকেও।”

আনাবিয়ার মুখভঙ্গি কঠিন হয়ে এলো। কোকো ভয় পেলো, কিন্তু প্রকাশ করলোনা। শুকনো ঢোক গিললো নিঃশব্দে। আনাবিয়ার মুখভঙ্গি স্বাভাবিক হয়ে এলো পরক্ষণেই। পূর্বের ন্যায় নরম সুরে সে বলল,
“তোকে আরেকটা কাজ দিবো। নওয়াস চাচাজির সাথে একটু কথা বলতে হবে।”
“নওয়াস জাবিন? কিন্তু উনি তো রিটায়ারে গেছেন শুনেছিলাম। মানে, তার কাছে…. মানে, ক্ষমা করবেন, কিন্তু আপনার তাকে কি প্রয়োজন আম্মা?”
কোকোর গলায় শঙ্কা, কিসের শঙ্কা জানেনা সে, কিন্তু ভয় হচ্ছে তার। আনাবিয়া ওর শঙ্কিত মুখে চেয়ে শান্ত স্বরে বলল,

“সেখানের একটা প্রাইভেট ভার্সিটি আছে, মীরই ফাউন্ডার সেটার, ওখানে যাবো। এই মুহুর্তে আমার কোনো কাজ নেই, কোথাও। কেউ আমাকে এই মুহুর্তে চাইছেও না। শুধু শুধু বসে থেকে হেলায় সময় নষ্ট না করে কোথাও কাজে লাগাতে চাই, নিজেকে ভয়ানক ব্যাস্ত রাখতে চাই। দম ফেলার সুযোগ যেন না থাকে আমার!
নওয়াস চাচাজানকে বলে আমার অ্যাডমিশনের যাবতীয় কাগজ পত্র রেডি করে সেখানে জমা দেওয়ার ব্যাবস্থা করবি, যেভাবেই হোক আমাকে সেখানে ঢুকিয়ে দিতে বলবি। জ্যুলোজী তে।”
“কাগজপত্রের কাজ আমিই করে দেই আম্মা?”
“উহুম, তোকে ঝামেলায় জড়াতে হবে না৷ পূর্বে যতবার যেখানে ভর্তি হয়েছি সব কিছুর অ্যারেঞ্জ তিনিই করেছেন। আচ্ছা, ফারিশের কি খবর? জানিস কিছু?”

কোকো যেন অসন্তুষ্ট হলো কিছুটা, মুখটা কিঞ্চিৎ থমথমে হয়ে এলো তার, সেটুকু লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,
“জ্বি আম্মা, উনি এখন বাড়িতেই আছেন। কথা বলতে পারেন না, ভোকাল কর্ড ছিড়ে গেছিলো সেবার। এই মুহুর্তে কিছুই করছেন না, কিছু ব্যাবসাপাতি ছিলো সেগুলো লোকজন লাগিয়ে দেখাশোনা করছেন, এই আর কি।”
কোকোর কথার অসন্তোষ স্পষ্ট টের পেলো আনাবিয়া। ফারিশের নামোচ্চারণেই এত অসন্তোষ! কেন? ওরা কি অবিশ্বাস করে আনাবিয়াকে? কোকো ফারিশকে অপছন্দ করে, অথচ সে-ই একদিন মীরের অবর্তমানে চেয়েছিলো ফারিশ আনাবিয়ার পাশে থাকুক। আনাবিয়া কি জানেনি তা?

মীরের উপস্থিতিতে আবারও পূর্বের রূপে ফিরে এসেছে কোকো। মীরের অসন্তোষ তারও অসন্তোষ! ওদের মুখরা ভালোবাসা সব মীরের কড়া শাসনের সম্মুখে এসে ফিকে হয়ে যায়। আনাবিয়া তাদের সকলের এই সুখময় জীবন যাপনের মাঝে একটা উৎসব সদৃশ মাত্র, তার বেশি কিছু নয়!
শান্ত, স্থির মুখে আনাবিয়া পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো, ক্লান্ত স্বরে বলল,
“আমি এখন ঘুমাবো, আগামীকালই আমার জিনিসপত্র গুলো চাই। আমি এখানে থাকতে চাইনা।”
কোকো ব্যাস্ত হয়ে বলল,

“খাবার তৈরি হচ্ছে আম্মা, এখুনি হয়ে যাবে। আপনি কষ্ট করে আর একটু জেগে থাকবেন, প্লিজ আম্মা!”
“উহুম, ঘুমাবো। এখান থেকে যা তুই, আমার কাউকে চাইনা।”
আনাবিয়া গলায় স্পষ্ট অভিমানের ছাপ, কোকো আহত হলো। এগিয়ে এসে শুধোলো,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৫

“আম্মা, এমন কেন বলছেন? না খেয়ে ঘুমোলে শরীর খারাপ করবে। আম্মা…. আপনি কি আমার কোনো কথায় কষ্ট পেয়েছেন? আম্মা! আম্মা!”
আনাবিয়া নিঃশব্দে মাথা নাড়লো দুদিকে, হাতের ইশারায় কোকোকে কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে বলল। এরপর হাজার সাধাসাধি করেও আর জলস্পর্শ করানো গেলোনা তাকে দিয়ে।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৭