Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৭
রানী আমিনা

কোকোর কানে ফোন ধরা, মুখখানা পাংশুবর্ণ, অপরাধবোধে ছাওয়া। ফোনের ওপাশে মীরের তর্জন গর্জন শোনা যাচ্ছে বাইরে থেকেই৷ মীরের প্রচন্ড ধমকের উত্তরে কোকো আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
“ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমি আম্মাকে কত বার যে রিকুয়েষ্ট করেছি ব্রেকফাস্টের জন্য, কিন্তু উনি আমার কোনো অনুরোধই রাখেননি! গতরাতে আমার কাছে তিনি বাইক আর ফোন চেয়েছিলেন, আমিও কথা দিয়েছিলাম সব ম্যানেজ করে দিবো। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি নিজেও জানিনা তাঁর এই আকস্মিক ক্রোধের কারণ। গতরাতে কথা বলতে বলতে হঠাৎ তিনি কেন অভিমান করলেন, কেন খেলেন না, সে সম্পর্কে আমার বিন্দু মাত্র ধারণা নেই!”
“কোকো, শিনজোর ব্যাপারে আমি নিজের পর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতাম তোমাকে! অথচ তুমি তাকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় চলে যেতে দিলে! কিভাবে, কোন স্পর্ধায় তাকে অভুক্ত অবস্থায় যেতে দিলে! প্রয়োজনে কেন তার পায়ে পড়ে মিনতি করলে না? কেন তাকে খাবার খেতে কনভিন্স করতে পারলেনা? কিভাবে নিজেকে তার সন্তান হওয়ার যোগ্য মনে করো?”

বজ্র কন্ঠে চেচিয়ে চেচিয়ে প্রশ্ন গুলো করলো মীর। ক্রোধে বারংবার দাঁতে দাঁত পিষতে রইলো তার।
আনাবিয়াকে অভুক্ত অবস্থায় যেতে দেওয়ার গ্লানি, অপরাধবোধ আর মীরের প্রচন্ড ধমকে স্নায়ুচাপ বাড়লো কোকোর। মাথা ঘুরতে লাগলো তার, চোখের সামনে আঁধার ঘনিয়ে আসতে রইলো যেন। অস্ফুটে সে কোনো রকমে উচ্চারণ করলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আম্‌-আমার ভুল হয়েছে, আমাকে ক্ষ্‌-ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
“যাকে ‘আম্মা’ বলে সম্বোধন করো তাকে এতটুকু কনভিন্স করার ক্ষমতা নেই তোমার? কোন অধিকারে ‘আম্মা’ ডাকো তাকে? ফ্রম দিজ ভেরি মোমেন্ট, শিনজোর ওপর থেকে তোমার সব ধরণের দাবি আমি ফিরিয়ে নিলাম কোকো। তোমার মুখ থেকে যেন আর কখনো শিনজোকে ‘আম্মা’ ডাকতে না শুনতে পাই! অর আ’ল স্লিট ইয়্যোর থ্রট রাইট অন দ্যা স্পট! মাইন্ড ইট।”

গর্জানো স্বরে কথাগুলো বলেই খট করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো মীর৷ কোকো স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই, ক্ষণিকের জন্য সচল হতে অক্ষম হলো সে৷ এক ক্ষীণ শিহরণ বয়ে গেলো তারা শিরদাঁড়া বেয়ে! মনে পড়লো বহু বছর পূর্বে শেহজাদীকে প্রথমবার আম্মা ডাকার মুহুর্তটি। জানেনা কিভাবে ডেকে উঠেছিলো, কিন্তু এই শুভ্র মানবীটির গা থেকে কেমন যেন মা মা গন্ধ পেতো সে। আম্মা শব্দটি উচ্চারণ করে নিজেও হতভম্ব হয়ে গেছিলো সে।
প্রচন্ড খুশি হয়েছিলেন শেহজাদী, আনন্দে চোখ জোড়া চিকচিক করছিলো তাঁর। কিন্তু হিজ ম্যাজেস্টি রেগে গেছিলেন প্রচন্ড! শক্ত দু আঙুলে চেপে ধরেছিলেন ওর গাল, চোখে পানি এসে গেছিলো যন্ত্রণায়!

সেদিন হিজ ম্যাজেস্টির হাত থেকে তাকে কত অনুনয় করেই না ছাড়িয়েছিলেন তার আম্মা! তারপর কত কাঠখড় পুড়িয়ে হিজ ম্যাজেস্টিকে রাজি করিয়েছিলেন যেন কোকো তাকে আম্মা বলে ডাকার অনুমতি টুকু পায়। হিজ ম্যাজেস্টি দিবেন না, কোনো ভাবেই দিবেন না! শেহজাদীকে আম্মা ডাকবে শুধু তার সন্তানেরা!
কিন্তু শেহজাদী সেদিন অনশনে বসে গেছিলেন, কোকোকে আম্মা ডাকার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত তিনি জলস্পর্শ করবেন না! বাধ্য হয়ে কোকোকে অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি, শেহজাদীকে আম্মা ডাকার!
সদ্য কৈশরে পদার্পণ করা কোকোকে সেদিন হিজ ম্যাজেস্টি আড়ালে নিয়ে গিয়ে শাসিয়েছিলেন, তার দেওয়া এই অনুমতির যেন কখনো কোনো অশ্রদ্ধা না হয়, তবে তিনি সেদিনই তা ফিরিয়ে নিবেন!
কোকো মাথা তুলে তাকালো আকাশপানে, বুক চিরে বেরিয়ে এলো একটি দীর্ঘশ্বাস, সাথে ধূসর চোখ জোড়া থেকে গড়িয়ে পড়লো দুফোটা লোনা জল।

মধ্যরাত।
কুরো আহমারের লুমিরা নদীর মধ্যিখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সেতুটির রেলিং ঘেঁষে হেটে চলেছে আনাবিয়া। চলনে ধীরতা, ক্লান্তি চোখে। পিঠের ওপর ব্যাকপ্যাক, হাতে ট্রলি। ঘুম আসছে তার, মন চাইছে এই রাস্তার ওপরেই শুয়ে পড়তে।
কিছুদূর হাটতেই একটি ধবধবে সাদা গাড়ি নজরে এলো তার, পার্ক করা রেলিং ঘেঁষে। দুজন স্যুটেড ব্যুটেড সুউচ্চ, সুঠাম পুরুষ দাঁড়িয়ে গাড়িটির ঠিক পাশেই। আনাবিয়াকে দেখা মাত্রই দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো তারা। আনত মস্তকে আনুগত্য জানিয়ে সম্বোধন করলো,

“শেহজাদী।”
আনাবিয়া অপ্রস্তুত হলো, দ্বিধান্বিত চোখে তাকিয়ে রইলো ছেলে দুটোর দিকে। কিছুটা কোকোর মতোন, বিশাল দেহবিশিষ্ট, বেশ হৃষ্টপুষ্ট! আনাবিয়ার দ্বিধা ঠাহর করে ওদের ভেতরের একজন ব্যাস্ত স্বরে বলে উঠলো,
“মাই অ্যাপোলজিস, শেহজাদী। ক্ষমা করবেন, পরিচয় দিতে ভুলে গেছি, আমরা হিজ ম্যাজেস্টির ব্যাক্তিগত দেহরক্ষী।”
আনাবিয়া ভালোভাবে পরখ করলো দুজনকে। মার্জিত ভঙ্গি, আনত চোখে মাটির দিকে চেয়ে, চিবুক বুকে ঠেকছে দুজনেরই। ভুলেও দৃষ্টি নড়ছে না।
ভালোই! খারাপ নয়, ভাবলো আনাবিয়া৷ পরক্ষণেই ওদেরকে পাশ কাটিয়ে এগোতে নিলো সামনে। দুজনে অপ্রস্তুত হয়ে একে অপরের দিকে চাইলো, তারপরেই একজন ব্যাস্ত স্বরে আনুগত্যের সাথে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি আপনাকে প্রাসাদে ফিরতে আদেশ করেছেন। আমরা আপনাকে প্রাসাদে ফিরিয়ে নিতে এসেছি। আপনি আমাদের সাথে কোঅপারেট করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।”

আনাবিয়া থামলো, ওদের দিকে না চেয়েই বলে উঠলো,
“আমার যেখানে মন চাইবে আমি সেখানে যাবো, যা করতে মন চাইবে তাই করবো। যা মনে চাইবেনা, করবোনা। তোমরা ফিরে যেতে পারো।”
তরুণ দুজন দ্রুত পায়ে এগিয়ে আনাবিয়ার সামনে গিয়ে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে পড়লো, একজন শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“শেহজাদী, আপনি অনেক ক্লান্ত। দয়া করে আমাদের কথা শুনুন।”
“আমি তোমাদের সাথে কোথাও যাচ্ছিনা, রাস্তা ছাড়ো।”
দুজনে তবুও ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলো তাদের। মুখখানা ভীতিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো মুহুর্তেই। অন্যজন কাঁপা স্বরে বলে উঠলো,

“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি আপনার পছন্দের বাইক এবং সেলফোনটি পাঠিয়ে দিয়েছেন। আপনি যদি আমাদের সাথে ফিরতে একান্তই অসম্মত হন তবে সেগুলো আপনাকে গ্রহণ করতে হবে।”
আনাবিয়া ফোস করে শ্বাস ছাড়লো একটা, কাঠকাঠ স্বরে বলল,
“ঠিক আছে, গ্রহণ করবো। কোথায় সেগুলো?”
“তার পূর্বে আপনাকে খাবার খেতে হবে এবং অন্ততপক্ষে সাত ঘন্টা ঘুমোতে হবে, একটানা।”
শুকনো ঢোক গিলে বলল একজন। আনাবিয়ার ভ্রুদ্বয় কুচকে এলো, সে কিছুটা রুষ্ট স্বরে শুধোলো,
“বাইক নেওয়ার সাথে খাবারের কি সম্পর্ক?
“নইলে বাইক হস্তান্তর করার অনুমতি নেই, শেহজাদী।”
আনাবিয়া ট্রলি হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে নিয়ে বলে উঠলো,
“তবে প্রয়োজোন নেই আমার।”

সেই মুহুর্তেই দেহরক্ষী দুজনের কণ্ঠদেশে বিপ বিপ শব্দে বেজে উঠলো কিছু৷ আনাবিয়া চমকে তাকালো ওদের দিকে৷ দেহরক্ষী দুজনের ভয়ার্ত পাংশু মুখজোড়া দেখে কপালে ভাজ পড়লো তার। দেহরক্ষী দুজন কাঁপা স্বরে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, দয়া করুন। আপনি খাবার গ্রহণ ব্যাতিত এই স্থান থেকে প্রস্থান করলে হিজ ম্যাজেস্টি আমাদেরকে জীবিত রাখবেন না।”
বলে দুজনেই শার্টের কলার সরিয়ে নিজেদের গলদেশ দেখালো। এক্সপ্লোসিভ ধাতব কলার আঁটকানো দুজনের গলাতেই। লাল রঙা আলো থেমে থেমে জ্বলছে সেখানে৷
আনাবিয়া ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়লো। দরদ দেখানোর কি আর লোকটা জায়গা পাচ্ছে না? গলা চেপে ধরার সময় কি এসব তার স্বরণে ছিলোনা? এখন এসব নাটকের কি প্রয়োজন? সেটাও দুজন নিরপরাধ মানুষকে বাজিতে রেখে? পারেই শুধু আনাবিয়াকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, তার দুর্বলতায় খোচা মেরে জিতে যেতে৷
আনাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ঠিক আছে, নিয়ে এসো।”
দেহরক্ষী দুজনের প্রাণে যেন পানি ফিরে এলো। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এগোলো একজন গাড়ির নিকট, অন্যজন ছুটলো রাস্তার আরও সামনের দিকে। গাড়ির দরজা খুলতেই ভেতর থেকে এক লাফে বেরিয়ে এলো ফিলোমেলা, দেহরক্ষীটি দ্রুত হাতে একটি ফোল্ডেবল চেয়ার আর টেবিল নিয়ে এসে রাখলো রাস্তার ওপর৷ ফিলোমেলা দ্রুত হাতে টেবিলের ওপর বিছিয়ে দিলো একটি টেবিল ক্লথ। আনাবিয়া চেয়ে দেখলো ফিলোমেলার গলাতেও আটকানো কলারবম্ব, মেয়েটি কাঁপছে থরথরিয়ে। কাঁপা হাতে কাজ চালিয়ে নিতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে৷
মনে মনে মীরের উদ্দ্যেশ্যে কিছুক্ষণ বকাবকি করে আনাবিয়া গিয়ে বসলো চেয়ারে। ফিলোমেলা আর দেহরক্ষীটি মিলে দ্রুত হাতে খাবার সাজাতে ব্যাস্ত। ধোঁয়া উড়ছে তা থেকে৷ আনাবিয়া ফিলোমেলার দিকে ফিরে শুধোলো,
“কখন রান্না হয়েছে?”

“এ-একটু আগেই, শেহজাদী। প্রাসাদের শেফও এসেছিলেন আমাদের সাথে। উনি রান্না শেষ করেই আবার ফিরে গেছেন প্রাসাদে।”
“এখানে কখন এসেছো তোমরা?”
“সন্ধ্যায়, শেহজাদী।”
ফিলোমেলা জগ থেকে পানি ঢালতে নিলো, কম্পিত হাতে পানি ঢালতে গিয়ে ছলকে পড়লো বাইরে কিছুটা। আনাবিয়া ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
“গাড়ির ভেতর গিয়ে বিশ্রাম নাও। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই।”
“ক্ষমা করবেন, শেহজাদী। আপনি পুরোটা খেয়েছেন নিশ্চিত না হয়ে প্রস্থানের অনুমতি নেই।”
নত মুখে বলল ফিলোমেলা। আনাবিয়া হতাশ ভঙ্গিতে তাকালো তার দিকে। তারপর খাওয়া শুরু করতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো ওরা কজন।

খাওয়ার মাঝেই একটি বিলাসবহুল আরভি ভ্যান এসে দাঁড়ালো ওদের পাশে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো অন্য দেহরক্ষীটি। আনাবিয়ার নিকট এসে আনুগত্য জানিয়ে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, খাবার শেষ করে আপনার ওপর ঘুমানোর আদেশ এসেছে। আরভি তে আপনার উপযুক্ত বিছানা এবং আসবাবের ব্যাবস্থা করে হয়েছে। আপনি সেখানে ঘুমাবেন। আপনি চাইলে আরভিটা সাথে রাখতে পারেন৷”
“প্রয়োজন নেই।”

উত্তর দিলো আনাবিয়া। খাওয়া শেষ হতেই ঘুমে চোখ ভেঙে আসার উপক্রম হলো আনাবিয়ার। সারাদিনের ক্লান্তি যেন ঝাপিয়ে পড়লো তার ওপর৷ ফিলোমেলা দ্রুত ছুটলো আরভিতে সব ঠিকঠাক আছে কিনা পরখ করতে। আনাবিয়া ক্লান্ত পায়ে আরভিতে ঢুকে পোশাক না ছেড়েই আঁছড়ে পড়লো বিছানায়। ফিলোমেলা বসে রইলো এক কোণের সোফায়। আনাবিয়া ঘুম জড়ানো গলায় বলে উঠলো,
“এখানে থাকার প্রয়োজ নেই, বাইরে যাও। নইলে আমি ঘুমোতে পারবোনা।”
ফিলোমেলা ইতস্তত করলো কিয়ৎক্ষণ, তারপর ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে।

আরভির পেছনের দরজায় বসে স্নিকার্সের ফিতা বাঁধতে ব্যাস্ত আনাবিয়া। গায়ে কালো রঙা রাইডিং স্যুট। এলোমেলো চুলগুলো সামনে এসে পড়ছে বারবার৷ বেঁধে রাখার মতোন দৈর্ঘ সে রাখেনি।
ফিলোমেলা সামনে দাঁড়িয়ে, হাতে ধরা একটি হেলমেট। দেহরক্ষী দুজন দাঁড়িয়ে দূরে৷ ফিতা বাঁধা হলে উঠে দাঁড়ালো আনাবিয়া, ফিলোমেলা এগিয়ে দিলো হেলমটিটি। সেটি মাথায় গলিয়ে দিতে দিতে রাস্তায় রাখা দুইটা ট্রলি ব্যাগের দিকে নির্দেশ করে আনাবিয়া শুধোলো,
“এত জিনিসপত্র এনেছো কেন?”
“হিজ ম্যাজেস্টির আদেশ, শেহিজাদী। ওনারা দুজন আপনার গন্তব্যে সব পৌঁছে দিয়ে আসবেন। আপনি তো প্রায় কিছুই আনেননি সাথে, হিজ ম্যাজেস্টি নিজেই ট্রলি দুটো গুছিয়েছেন।”
আনাবিয়া তৈরি হতেই এগিয়ে এলো দেহরক্ষী দুজন। নত চোখে বলে উঠলো,

“শেহজাদী, আপনি যদি ডডরমিটরিতে থাকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তবে হিজ ম্যাজেস্টি আপনার জন্য ভার্সিটির কাছেই ব্যাক্তিগত আবাসের ব্যাবস্থা করবেন৷ তিনি চাননা আপনার প্রাইভেসিতে কোনো অসুবিধা হোক।”
“প্রয়োজোন নেই। আমাকে তিনি একা ছেড়ে দিলেই আমি খুশি হবো। আমার জীবন যাপন নিয়ে তার এই অতি উদ্বেগ এবং মাত্রাতিরিক্ত নাক গলানো আমি পছন্দ করবোনা৷”
ছেলে দুটো নিরবে দাঁড়িয়ে রইলো। ওপাশ থেকে হিজ ম্যাজেস্টি সবই শুনছেন। শেহজাদীও তা জানেন, তবুও তিনি এভাবেই কথা বলছেন দেখে ওরা দুজন বিস্মিত হলো, ভয়ও পেলো। মৃদু ভঙ্গিতে ওদের একজন একটি নকশাদার খাম এগিয়ে দিলো আনাবিয়ার দিকে। বলে উঠলো,
“শেহজাদী, এখানে আপনার ডর্মের অবস্থান, রুম নম্বর এবং রুমমেটের যাবতীয় ইনফর্মেশন আছে। আপনার কখনো কোনো অসুবিধা হলে ভার্সিটির বর্তমান চ্যান্সেলরকে ইনফর্ম করবেন, উনি আপনার সম্পর্কে সম্পুর্ণ অবগত।”

“বর্তমান চ্যান্সেলর কে?”
“হিজ ম্যাজেস্টি কুরো আহমারের বর্তমান কন্ট্রোলার মুরসালিন জাবিনকে চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। নওয়াস জাবিন রিটায়ার্ড হওয়ার পর বিগত চার বছর ধরে তিনিই এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন, শেহজাদী।”
আনাবিয়া মনে মনে আওড়ালো নামটি। মুরসালিন জাবিন, নওয়াস জাবিনের সৎ ভাই৷ বয়সে ফারিশের বছর বিশের সিনিয়র। নওয়াস চাচাজানের বাবা দুইটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন একা থেকেছেন তিনি। পরবর্তীতে নওয়াস চাচাজানের জোরাজুরিতেই দ্বিতীয় বার বিয়ে করেন। মুরসালিন সে ঘরেরই ছেলে।
নওয়াস চাচাজানের স্ত্রী দুইজন। প্রথম স্ত্রীর একটিই সন্তান, ফারিশ জাবিন। দ্বিতীয় স্ত্রীর দুইটি মেয়ে। দুজনেই হয়তো এখন বেশ বয়স্ক হয়ে গেছে, আনাবিয়া ওদের প্রথম আর শেষ বার দেখেছিলো ফারিশের প্রথম বিয়েতে। সে অনেক বছর আগের কথা!

আনাবিয়া বাইকের উদ্দ্যেশ্যে এগোতেই দেহরক্ষী দের একজন ব্যাস্ত পায়ে এসে আনাবিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলো একটি প্রিপেইড কার্ড৷ আনাবিয়া সেটার দিকে তাকিয়ে থাকলে সে আনুগত্যের স্বরে বলে উঠলো,
“হিজ ম্যাজেস্টির আদেশ, শেহজাদী।”
আনাবিয়া দেখলো; কালো রঙা কার্ডের ওপর সোনালী লিপিতে খোদাই করে লেখা, ‘দ্যা দেমিয়ানস’।
“দেমিয়ান কার্ড চাইনা আমার। নরমাল কার্ড হলে কনসিডার করতাম, কিন্তু এটা আমি কোনোভাবেই নিজের কাছে রাখবোনা।”
বলল আনাবিয়া৷ ছেলেটি ভয়ার্ত স্বরে বলল,

“দয়া করুন শেহজাদী। আপনি এটা গ্রহণ না করলে…”
আনাবিয়ার নাকের পাটা ফুলে উঠলো রাগে৷ কার্ডটি ছো মেরে নিয়ে পকেটে রাখলো সে। পরক্ষণেই ছেলেটি ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো ওর সেলফোন। আনাবিয়া সেটার দিকে এক পলক চেয়ে বলে উঠলো,
“ফোনের সব অ্যাক্সেস নিশ্চয় তার কাছে!”
দেহরক্ষীটি মাথা নিচু করে রইলো। আনাবিয়া বাইকের সেল্ফ স্টার্ট চেপে বলে উঠলো,
“আ’ নিড সাম প্রাইভেসি। নিবোনা আমি ওটা, এতে তোমাদের প্রাণ চলে গেলেও আমার কিছু করার নেই৷”
পরমুহূর্তেই বাইকে তুমুল গর্জন তুলে সে ঝড়ো বেগে এগোলো শহরের দিকে। ওরা ক’জন ওর যাওয়ার পানে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই।

ভার্সিটির অভিজাত বিশাল ক্যাফেটেরিয়ার সম্মুখে বিরাট জটলা। ভিড়ের ভেতর থেকে ভেসে আসছে একটি কুকুরের হিংস্র ঘেউ ঘেউ শব্দ, একই সাথে কানে আসছে কোনো মেয়ের অসহায় আর্তনাদ৷ বুলডগ কুকুরটি আঁচড়ে কামড়ে মেয়েটিকে আহত করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। আহত মেয়েটি মাটিতে পড়ে ভয়ে কুকড়ে আছে, রক্ত ঝরছে শরীরের নানা স্থান থেকে। চোখ জোড়া ভয়ে খিচে বন্ধ করা।
বুলডগের গলায় আঁটকানো কলারের লিশখানা ধরা অন্য একটি মেয়ের হাতে। মুখে তার পৈশাচিক হাসি, বারংবার কুকুরটিকে লেলিয়ে দিচ্ছে মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটিকে আক্রমণ করতে। আশেপাশের সকলে চেয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু এগিয়ে আসছে না কেউ। পাছে না আবার বুলডগটি মেয়েটিকে ছেড়ে তাদেরকে আক্রমণ করে বসে!
বুলডগের মালকিন এবার হাত থেকে ছেড়ে দিলো লিশ, উচ্ছসিত স্বরে কুকুরের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“ওকে ছিড়ে ফেলো হান্টার! তোমাকে আজ ডিনারে দুইটা ড্রাম স্টিক বেশি দিবো!”
চিকেন শব্দটা শোনা মাত্রই বিশালাকৃতির কুকুরটি সানন্দে লাফিয়ে ছুটলো মেয়েটিকে আক্রমণ করতে। মেয়েটি কান্না জড়ানো অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখলো একবার, কুকুরটিকে ছুটে আসতে দেখে ভয়ে আর্তনাদ করে উঠে, নিজেকে দুহাতে গুটিয়ে নিলো আরও।

সেই মুহুর্তেই ঝড়ো বেগে ভিড় ঠেলে এসে ছো মেরে কেউ ধরে ফেললো হান্টার নামক কুকুরটার গলায় বাঁধা কলার। দুই আঙুলে কলার ধরে কুকুরটিকে উঁচু করে আছড়ে ফেললো কোনো এক দিকে। ভীতসন্ত্রস্ত ভিড় পিছিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ, হান্টারের রাস্তায় পড়তে চায়না কেউই!
হান্টার আছাড় খেয়ে কুই কুই করে উঠলো ব্যাথায়। হান্টারের মালকিন ক্রুদ্ধ চোখে তাকালো অপরিচিতার দিকে; ঘাড় ছোঁয়া সফেদ চুল, সুউচ্চ মেদহীন শরীরে স্কিন টাইট রাইডিং স্যুট জড়ানো। মুখখানা দৃষ্টি গোচর না হলেও মেয়েটি স্পষ্ট বুঝলো অপরিচিতার সৌন্দর্যের ধার, উপস্থিত সকলে তার দিকেই চেয়ে; বিস্মিত, অপলক!
ক্রোধে তাকালো মেয়েটি হান্টারের দিকে, কুকুরটি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্যাস্ত। মেয়েটি কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,
“হান্টার, অ্যাটাক হার!”

হান্টার দ্বিগুণ ক্রোধে ছুটে এলো তৎক্ষনাৎ অপরিচিতার দিকে, কিন্তু কাছাকাছি আসা মাত্র অপরিচিতার মুখদর্শন লাভ করতেই আচমকা থেমে যাওয়ার প্রচেষ্টায় নখ দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরলো সে, গতি জড়তার কারণে মাটি চিরে এগিয়ে এলো আরও কিছুটা, ঠিক অপরিচিতার সম্মুখে।বিস্মিত, আদুরে দৃষ্টি তার অপরিচিতার পানে।
বিশাল দেহের পেছনের ছোট্ট লেজটি নাড়াতে রইলো দ্রুত বেগে, জিভ বের করে শ্বাস নিতে রইলো জোরে জোরে।
অপরিচিতা হাটু মুড়ে বসলো তার সম্মুখে, তার দেখাদেখি ভদ্র, শান্ত প্রাণীটির মতোন বসে পড়লো কুকুরটিও। অপরিচিতা বাড়িয়ে দিলো তার শ্বেত শুভ্র হাত জোড়া, কুকুরটির মাথাটা দলাই মলাই করে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“ইউ নটি নটি বয়!”

কুকুরটি গলে গেলো তাতে, মুহুর্তে শুয়ে পড়লো অপরিচিতার পায়ের কাছে, জিভ বের করে গড়াগড়ি দিতে রইলো সেখানে। হান্টারের মালকিন বারংবার ক্রুদ্ধ স্বরে আদেশ দিতে রইলো তার কুকুরটিকে, এই অচেনা আগন্তুককে আক্রমণ করার জন্য। কিন্তু হান্টার কানেও নিলোনা, ব্যাস্ত হয়ে পড়লো এই শুভ্র রমণীটির আদর নিতে৷ অপরিচিতা হান্টারের পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আর কখনো এমন করবে না, ঠিক আছে? ভদ্র ভাবে চলবে হান্টার।”
ক্ষণিক থেমে সে হান্টারকে সোজা করে বসিয়ে দিয়ে বলল,
“দেখি, তোমাকে ঠিকঠাক ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে?”

কুকুরটির মাথার ওপর হাত রাখলো সে। কিয়ৎক্ষণ ওভাবেই হাত রেখে কিছু পরখ করেই বলে উঠলো,
“হুম, সব ঠিক আছে। কি বলেছি মনে থাকবে? নো হাঙ্কি পাঙ্কি, ওকে?”
হান্টার লেজ নাড়ালো আবারও, আদুরে ভঙ্গিতে চাটতে শুরু করলো অপরিচিতার হাত। হান্টারকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে, এগিয়ে গেলো মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে। উপস্থিত ছেলে মেয়ে গুলো অদ্ভুত, অবাক চোখে দেখতে রইলো তাকে।

তাদের চোখ গেলো মাটিতে ভালো ছেলেটির মতোন এখনো বসে থাকা হান্টারের দিকে। এতদিন যাবৎ যার হিংস্র রূপই শুধু দেখে গেছে আজ তার এমন শান্ত রূপ বড়ই আজব ঠেকলো তাদের কাছে। হান্টারের মালকিন নিজেও আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে।
অপরিচিতা মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
“নূরিয়া তাজদিন। উঠে এসো।”
মেয়েটি দুর্বল চিত্তে আনাবিয়ার হাত ধরলো, মুখে সামান্য সাহসের হাসি ফুটে উঠলো তার। অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,
“সেলিন৷”
আনাবিয়া টেনে উঠালো ওকে, জিজ্ঞেস করলো,
“মেডিক্যাল সেন্টারটি কোন দিকে?”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৬

আহত মেয়েটি হাতের আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলো ওকে। আনাবিয়া মেয়েটিকে ধরে সেদিকে এগোতে রইলো, শিকারী দৃষ্টিতে একবার তাকালো হান্টারের মালকিনের দিকে। হতভম্ব জনতার ভিড় সরে গেলো তার সামনে থেকে। তখুনি একটি বিরাট আকৃতির বাজ পাখি তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে উড়ে চলল নীল আকাশে। আনাবিয়া মাথা তুলে তাকালো একবার সেদিকে। চোখাচোখি হলো তার পাখিটির সাথে, লিয়াম দৃষ্টি সরিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। উড়ে গিয়ে বসলো মেডিক্যাল সেন্টারের সম্মুখে থাকা বিরাট পাইন গাছটির মগডালে।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৮