বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি
জিপটা যখন পোখরা সিটি হাসপাতালের এমার্জেন্সি গেটে এসে ব্রেক কষল, তখন সকাল নটা বেজে কয়েক মিনিট। হাসপাতালের সাদা দেয়ালে রোদের ঝিলিক পড়ছে। চাকাওয়ালা স্ট্রেচারের খটখট শব্দ আর রিসেপশনিস্টদের কর্মব্যস্ততায় চারপাশ মুখর। সৌভিক আর পরাগ জিপ থেকে লাফিয়ে নেমে চিৎকার করে স্ট্রেচার চাইল। হাসপাতালের কর্মীরা দ্রুত ছুটে এসে মারিশা আর আশফিকে যখন আলাদা আলাদা স্ট্রেচারে তুলছিল, তখন দৃশ্যটা ছিল বিভীষিকাময়। কাদা আর রক্তে মাখামাখি হয়ে থাকা দুজনেই প্রায় নিথর।
মারিশার অবস্থা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক দেখে ওকে সরাসরি নেওয়া হলো রেড জোনে। আর আশফির শরীরের জখমগুলোর জন্য ওকে ঠেলে নেওয়া হলো পাশের ট্রমা ইউনিটে। করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে পরাগ আর সৌভিক তখন হাঁপাচ্ছে। দুজনের জ্যাকেটেই রক্তের কালচে ছোপ।
ট্রমা ইউনিটে লোকাল অ্যানাস্থেশিয়ার প্রভাবে আশফির কাঁধের দিকটা কাঠের মতো অসাড় হয়ে গেছে। কোনো তীক্ষ্ণ ব্যথা নেই। কিন্তু ডাক্তার যখন সুঁই ফুঁড়ে মাংসপেশিগুলো জোড়া দিতে শুরু করলেন, তখন অ্যানেস্থেশিয়ার কারণে ওর কোনো যন্ত্রণা হলো না ঠিকই। তবে চামড়া আর মাংসের ভেতর দিয়ে সুতো টেনে নেওয়ার সেই টানটান অনুভূতিটা ও স্পষ্ট টের পেল। ওর মনে হলে, কেউ যেন কোনো ধারালো হুক দিয়ে ওর শরীরের ভেতরটা টেনে ধরছে। ব্যথার চেয়েও এই চামড়া টেনে ধরার জবরদস্তি অনুভূতিটা ওকে বেশি অস্থির করে দিল। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলেও প্রতিটি সেলাইয়ের সেই টান আর ঘর্ষণ ওর মগজে গিয়ে সরাসরি বিঁধতে লাগল। কিন্তু সেই অনুভূতিকে ভোঁতা করে দিল হঠাৎ একটা মুখ চোখের পর্দায় ভেসে উঠতেই।
হাসপাতাল পৌঁছানোর পর জিপের দরজাটা খোলার পরই আশফি আধবোজা চোখে কেবল একজনকেই খুঁজছিল। হাসপাতালের কর্মীরা যখন স্ট্রেচার নিয়ে এল, পরাগ আর সৌভিক মিলে ওকে একরকম জোর করেই তখন একটা স্ট্রেচারে শুইয়ে দেয়। কিন্তু ওর ঘাড় তখনো কাত হয়ে ছিল অন্যদিকের স্ট্রেচারটার দিকে। মারিশার নিথর শরীরটা কয়েকজন নার্স আর ডাক্তার মিলে হন্তদন্ত হয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল রেড জোনের দিকে। মেয়েটার একটা হাত স্ট্রেচারের পাশ দিয়ে ঝুলছিল, তাতে জমাট বাঁধা কালচে রক্ত। করিডোরের কড়া আলোয় ওই দৃশ্যটা আশফির মন থেকে সরছে না এখনো কোনোভাবেই।
শরীরটা পাথরের মতো ভারী হয়ে এলেও ওর মনের কোণে কোনো অবশকারী ইনজেকশন কাজ করছে না। সেলাই চলতে থাকলেও ওর স্থির, নির্বিকার দৃষ্টিজোড়া নিবদ্ধ সিলিঙের দিকে। মৃতের মতো পড়ে থেকে অন্তরাত্মার সমস্ত শক্তি দিয়ে কেবল মারিশাকে ভেবে যাচ্ছে। অথচ চোখের সামনে সবকিছু আবছা হয়ে আসতে চাইছে ওর। কিন্তু ওর অবচেতন মন তখনো রেড জোনের সেই বদ্ধ দরজার ওপাশে আটকে যেন। মারিশার শরীরের অনিয়ন্ত্রিত সুগার লেভেল আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মরণপণ লড়াই তাকে যে কোনো সময় কোমায় পাঠিয়ে দিতে পারে, এই ভয়টাই ওর ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে। অথচ ও এখন, এখানে, এই বিছানায় অসহায়ের মতো পড়ে আছে। আজও রক্ষা করতে পারল না মেয়েটাকে, চার বছর আগেও পারেনি৷ এই ব্যর্থতা বুকে পুষে ও বাঁচবে কী করে?
চোখের কোণ বেয়ে হঠাৎ এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে চুলে গিয়ে মিশল ওর। মুখ ফুটে একটা শব্দও করল না। কোনো কান্না নেই, শুধু বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় খাঁ খাঁ করতে লাগল। এই সুতো দিয়ে ওর শরীরের মাংস তো জোড়া লাগানো যাচ্ছে, কিন্তু চার বছর আগে যে সম্পর্কটা মাঝখান থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেই ক্ষতের সেলাই কোথায়?
মারিশার মুখটা ভাবতে ভাবতে ভাঙা স্বরে হঠাৎই বিড়বিড়িয়ে উঠল, “গুরাস… আমার লালিগুরাস‚ তোমাকে বুকে জড়িয়ে ব্যাস এতটুকু বলার আছে … আমি তোমার সঙ্গে পুরোটা জীবন কাটাতে চাই৷ আমার অন্তিম শয্যায় তোমার মুখে কালিমা শুনতে চাই। আমার গুরাস… আমার দুনিয়া, আর জখম কোরো না আমাকে। চারটা বছরের ক্ষতই এখনো সাড়েনি আমার। আমি এখনো চুরমার। বুকের ভেতরটা ঝাঁঝরা আমার। তুমি দেখতে পাওনি! কাউকে দেখাইনি আমি।”
ডাক্তার ভাবলেন মনে মনে হয়তো সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছে সে। তাই সান্ত্বনা দিলেন, “ডোন্ট ওয়ারি। ইউল বি ফাইন ভেরি সুন।”
কিন্তু আশফির কানে বোধ হয় কোনো শব্দই প্রবেশ করল না। সেলাই শেষ হওয়ার পর ডাক্তার যখন শেষবারের মতো ওর ব্যান্ডেজটা পরীক্ষা করতে লাগলেন, ও তখনো জ্বরের ঘোরে মারিশাকে নিয়ে বিড়বিড় করেই যাচ্ছিল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। গভীর জখম আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের পর শরীর এখন প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে ওর।
পেইন কিলার আর সেডেটিভ দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আশফির চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেও ওর অবচেতন মন কেবল রেড জোনের দরজায় করাঘাত করছিল। ও যেন অনুভব করছিল, ওর চামড়ার সাথে গেঁথে যাওয়া সুতোগুলো ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে ফেলছে, ও চাইলেও এখন মারিশার কাছে ছুটে যেতে পারছে না।
আর এদিকে জখম আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারিশার প্রেশার একদম তলানিতে। অনিয়ন্ত্রিত শর্করার প্রভাবে ওর রক্তে তৈরি হওয়া কিটো-অ্যাসিড রক্তকে ভেতরে ভেতরে বিষিয়ে তুলছে। ভেন্টিলেটরের যান্ত্রিক শব্দ আর মনিটরের অনিয়মিত গ্রাফ জানান দিচ্ছে, ওর হৃৎপিণ্ডটা তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। নীলচে হয়ে আসা ঠোঁট আর হাড়হিম করা স্থিরতা নিয়ে ও এখন জীবন-মৃত্যুর এক সরু সুতোয় ঝুলে আছে।
বাইরে করিডোরের পরিবেশে তখন পরাগ, সৌরিভ আর দিব্যর মাঝে চলছিল জটিল তর্কতিকর্ক। মাহবুব চৌধুরীকে পরাগ কল করে জানাতে গিয়েও দিব্যর বাঁধাতে এ মুহূর্তে সে বিভ্রান্ত বেশ। আপাতদৃষ্টিতে মাহবুব সাহেবকে যতটা শান্ত দেখায়, আদতে তিনি অত্যন্ত চড়া মেজাজের। দিব্যর দুশ্চিন্তা এখানেই৷ দেখা যাবে এই দুর্ঘটনার দায় কিছুটা ওকেই দিয়ে বসবেন তিনি৷ যখন জানবেন একসঙ্গে থেকেও কেন সে আশফিকে একা ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ, ছোটোবেলা থেকেই আশফিকে নানাভাবে আঘাত করেছে এসেছে ও। কখনো খেলতে গিয়ে, কখনোবা স্কুল থেকে মারামারি বাঁধিয়ে। এর মাঝে বেশ ক’বার বড়ো বড়ো চোটও পেয়েছিল আশফি ওর থেকে। সেসব নিয়ে কতবার যে মাহবুব সাহেব ওর বাবার কাছে নালিশ করে ওকে উত্তম-মধ্যমও খাইয়ে ছেড়েছেন, তার হিসেব নেই৷ সেসবের জেরেই রগচটা ভদ্রলোক আজও ওকে বাঁকা নজরেই দেখেন৷ ভাতিজা হিসেবে স্নেহও কম করেন না ওকে৷ তবে এ পরিস্থিতিতে তিনি কী বিচার-বিবেচনা করবেন, তার ঠিক নেই৷ আশফি কিছুটা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাই তাকে খবর দেওয়ার ঝুঁকিটা দিব্য নিতে রাজি না। তার বদলে দিশানের কাছে খবর পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিল ওরা।
চিন্তিত গলায় তখন সৌভিক বলে উঠল, “আশফির সিচুয়েশন তো স্টেবল। ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন তো মারিশার। আশফির বাড়িতে খবর পৌঁছানোর চেয়ে বরং বেশি জরুরি মারিশার বাড়ির লোকজনকে জানানো।”
“ওদের কীভাবে জানাব?” পরাগ অসহায় গলায় বলল, “আশফি ছাড়া তো মিরানের সাথে কমিউনিকেশন নেই আমাদের। না-কি আশফির ফুপুকেই জানাবি?”
“আমার সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ কথা হত মিরানে। কিন্তু…” দিব্য এবারেও বাধা দিল, “আমি চাচ্ছি না ওকে জানাতে। আশফির ওপরই ছেড়ে দে। আর সোহানা ফুপুকে জানানোটাও ঝামেলার। মহিলা মানুষ এসব খবরে বেশি হাইপার হয়ে যায়।”
কথাটা ঠিক ভেবে মাথা ওপর-নিচ করে সম্মতি দিল সৌভিক।
তারপরই করিডোরের দেয়ালের একপাশে রাখা মারিশার আর আশফির ব্যাগপ্যাকের দিকে তাকিয়ে বলল পরাগ, “কিন্তু ওর ভাই তো মনে হয় আশফিকে কল করে করে পাগল হয়ে যাচ্ছে৷ রিং বাজতে শুনছি অনেকক্ষণ ধরে।”
“আশফি আরেকটু স্টেবল হোক। ও-ই জানাবে”, দিব্য বলল।
এর মাঝেই অপারেশন থিয়েটারের দরজা ঠেলে একজন নার্স হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটা ব্লাড রিকুইজিশন স্লিপ। পরাগকে বাড়িয়ে দিয়ে অগোছালো ইংরেজিতে বললেন, “পেশেন্টের প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমাদের ইমিডিয়েটলি ও-পজিটিভ রক্ত লাগবে। ব্লাড ব্যাংকে এই মুহূর্তে স্টক নেই। আপনাদের কারো গ্রুপ কি ম্যাচ করে?”
পরাগ আর সৌভিক একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। ওদের কারও সঙ্গেই গ্রুপ মিলছে না। ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের শেষ মাথা থেকে ছুটে এল হৃদয়। ওর সাথে দিলিশাও৷ দুজনকেই দেখাল বেশ উদ্বিগ্ন।
এদিকে নার্সের কথা শুনে দিব্য এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের হাতা গুটিয়ে ফেলল, “আরে আমারই তো ও-পজিটিভ। তাহলে আমারটাই নিন।”
হৃদয় বড়ো একটা শ্বাস ফেলে এসে দাঁড়াল ওদের পাশে। দিব্যর কথাটা শুনেই ও বলল, “কার লাগবে ব্লাড? আমারও তো ও-পজিটিভ। দিব্যর পর যদি আরও লাগে, আমিও রেডি আছি।”
সৌভিক জানাল, “মারিশার লাগবে। আশফি তো বিপদমুক্ত। মেয়েটার অবস্থায় ভালো না। কোমাতে যাওয়ার মতো আশঙ্কা আছে নাকি ওর।”
চমকাল পরাগ, “আয় হায় কী বলিস! ওর বাড়িতে তো তাহলে খবর জানানো ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানিয়েছিস?”
মাথা নাড়ল সৌভিক। এর মাঝেই দিব্য চলে গেছে মারিশাকে রক্ত দিতে। আর দিলিশা তখন পাগলের মতো আশফির অবজারভেশন বেডের দিকে ছুটল। কিন্তু দরজার কাছে থাকা একজন নার্স ওকে আটকে দিলেন, “প্লিজ, পেশেন্ট এখন কড়া সিডেটিভের ঘোরে। ভেতরে ডিস্টার্ব করবেন না।”
দিলিশা চোখে পানি আর বিধ্বস্ত চেহারাটা নিয়ে বারবার অনুরোধ করলে তা দেখে নার্সের মন কিছুটা নরম হলো। তখন হঠাৎ হৃদয় এসে নার্সকে বলল, “সিস্টার, ও পেশেন্টের বোন। জাস্ট দূর থেকে একবার দেখে আসবে। কোনো শব্দ করবে না।”
বোন পরিচয়টা যদিও দিলিশা কারও মুখে শুনতে পছন্দ করে না। কিন্তু এমন মুহূর্তে তা নিয়ে সে কোনো প্রতিক্রিয়ায় দেখাল না৷
নার্স একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে দাঁড়ালেন, “ঠিক আছে, শুধু দুই মিনিট। বেশি ভিড় করবেন না।”
তারপর ভেতরে ঢুকল দিলিশা। ওষুধের ঘোরে আশফির মুখটা একদম শান্ত, বিবর্ণ। ঘুমাচ্ছে অচেতনের মতে। ওর ডান কাঁধ থেকে বুক পর্যন্ত চওড়া সাদা ব্যান্ডেজ। স্যালাইনের নলটা হাতে বিঁধে আছে৷ কাঁদতে কাঁদতে বেডের পাশে গিয়ে বসে পড়ল দিলিশা। আশফির নিথর হাতটা ছুঁতে চেয়েও পারল না, নার্সের নিষেধাজ্ঞাতে।
সেডেটিভের ঘোর কাটিয়ে আশফির চেতনা ফিরল পরদিন সকাল দশটায়। পুরো চৌদ্দ ঘণ্টা পর ও পৃথিবীর আলো দেখল। ডান কাঁধটা তখনো পাথরের মতো শক্ত, ব্যথার তীব্রতায় মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তবু টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই পরাগ দ্রুত ওকে চেপে ধরে থামাল। কিন্তু ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে আশফি ফ্যাসফ্যাসে গলায় প্রথম কথাটা বলল তখন, “মাহি… ও কোথায়? ওর কী কন্ডিশন?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরাগ জানাল, দিব্য আর হৃদয় রক্ত দেওয়ার পর মারিশার অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা স্থিতিশীল হলেও কিন্তু সে এখনো গভীর ঘুমে। ডাক্তাররা বলেছেন, তাকে বিপদমুক্ত বলতে আরও অন্তত ছয় থেকে সাত দিন সময় লাগবে। কারণ, তার শরীরের সেই বিষাক্ত শর্করা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এতটুকু শোনার পরই আশফি দেয়াল ধরে পা টেনে টেনে করিডোরের দিকে এগোতে লাগল। ডাক্তার, নার্স, কারও বাধা-নিষেধই তোয়াক্কা করল না।
কাঁচের ওপারে আইসিইউয়ের নিয়ন আলোর নিচে মারিশাকে যখন দেখতে পেল সে, বুকটা প্রচণ্ডভাবে মোচড় দিয়ে উঠল ওর। ব্যান্ডেজ আর অসংখ্য নলের ভিড়ে রোগা-সোগা শরীরটা যেন ঢাকা পড়ে আছে ছিটিয়ালটার।
কতক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নার্স আর ডাক্তারদের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে পোখরার এই হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা ওর অভিজ্ঞ চোখ এড়াল না। ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকের হয়ে পৃথিবীর দুর্গম সব প্রান্তে ওয়াইল্ড লাইফ ডকুমেন্টারি করতে গিয়ে ও বহুবার মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। তাই অনায়াসেই বুঝে গেল, মারিশার শরীরে যে মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস আর রক্তক্ষরণের তাণ্ডব চলছে, তার চিকিৎসার জন্য এখানে প্রতিটি সেকেন্ড নষ্ট করা মানে ওকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা।
করিডোরের দেয়ালটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল আশফি। যদিও শরীরটা তখনো ওর সিডেটিভের নিরেট প্রভাবে পাথরের মতো ভারী। ওষুদের সেই অবশ করা ঘোর ওকে বারবার অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল, কিন্তু কাঁচের ওপারে মারিশার ওই বিবর্ণ মুখটা দেখে ওর ভেতরের সমস্ত স্নায়ু বিদ্রোহ করে উঠল বারবার। আপন মানুষকে হারানোর এক চরম ভয় থেকে শরীরে তখন প্রচণ্ড অ্যাড্রেনালিন রাশ শুরু হলো ওর। সেই তীব্র উত্তেজনা মুহূর্তের জন্য ওর শরীরের সমস্ত শারীরিক দুর্বলতা আর ওষুধের ঘোরকে ছাপিয়ে গেল।
পরাগ এসে পাশে দাঁড়াতেই অস্থির হয়ে উঠে ওকে বলল, “এই পরাগ, ওকে এখান থেকে সরাতে হবে। এখানে থাকলে ও তো বাঁচবে না! ওর ডায়ালাইসিস আর উন্নত এন্ডোক্রাইনোলজি সাপোর্ট দরকার। এখনই ওকে কাঠমান্ডু শিফট করতে হবে… এখনই।”
পরাগ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কিন্তু এই কন্ডিশনে পাহাড়ের রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স নিতে গেলে তো আরও ঝুঁকি!”
“আরে রাস্তায় নয়, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে”, আশফির স্বরে এক মরিয়া জেদ আর অস্বাভাবিক উদ্বিগ্নতা, “এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে এক্ষুনি।”
“কিন্তু… ক্যামনে কী?” চিন্তাতে পরাগের মাথায় কাজ করল না।
এর জবাব দিল আশফি নিজের ফোনটা ওর থেকে চেয়ে নেওয়ার পরই।
আশফি আনজার — যে সাধারণত নিজের ক্ষমতা বা আন্তর্জাতিক পরিচিতি জাহির করা মানুষ নয়। সে নিভৃতচারী, একাকী লড়তে অভ্যস্ত এক বোহিমিয়ান। কিন্তু আজ যে ওর নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বড়ো এক সত্তা মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে। কেবল মারিশার জন্যই ও আজ নিজের সেই পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল। সরাসরি কল দিল সে নেপালের ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকের লোকাল লিয়াজোঁ অফিসার পাসাং শেরপাকে।
পাসাংয়ের কাছে আশফি শুধু একজন ফিল্মমেকার নয়, একজন কিংবদন্তি। কলটা রিসিভ হতেই ওপাশে পাসাংয়ের হাসিখুশি নেপালি টানে ইংরেজি ভেসে এল, “আশফি ভাই! নমস্তে। আপনি নেপালে ঢুকলেন কবে? একটা কলও তো দিলেন না! সব ঠিকঠাক তো?”
আশফি কোনো ভণিতা না করে অত্যন্ত ক্ষীণ কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “পাসাং, আমার একটা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। ইমিডিয়েটলি। পোখরা টু কাঠমান্ডু মেডিসিটি। পেপারওয়ার্ক আর পেমেন্ট সব পরে হবে, জাস্ট গেট ইট ডান।”
পাসাং ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে থাকল। আশফির ভাঙা আর ফ্যাসফ্যাসে গলা শুনে ও উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আশফি ভাই, আপনার গলার আওয়াজ এমন শোনাচ্ছে কেন? চোট কি আপনিই চোট পেয়েছেন? আর ইউ ইনজারড? আপনি কোথায় আছেন এখন?”
আশফি নিজের শরীরের অসহ্য যন্ত্রণাকে একপাশে সরিয়ে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমার কথা ছাড়ো পাসাং। আমার ওয়াই…”
‘ওয়াইফ’ শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকাল আশফি৷ শেষ দুটো বছরে কোনোদিনও সে ভাবেনি, তুরস্কের ওই আনাতোলিয়ান জাতির নিষ্ঠুর মেয়েটা আর কখনো ফিরে আসবে ওর কাছে। পিছুটানকে দমিয়ে রেখেই জীবনটাকে তাই এগিয়ে নিচ্ছিল, কত ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কেও জড়িয়েছিল। কত আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনগুলোর পাতাতে বহুবার বহু নারী উঠে এসেছে ওর প্রেমিকা হিসেবে। কেবল ম্যাগাজিনের পাতাতেই নয় শুধু, সেসব নারী ওর কাজের বহু স্থানেও ওর প্রেমিকা বলে পরিচিত পেয়েছে৷ তাদের মাঝে একজন বিখ্যাত নেপালি মডেল তারকাও ছিল৷ দুজনের সেই সম্পর্কের ব্যাপারে পাসাংও এক সময় অবগত ছিল৷ তাই আজ হঠাৎ করে নিজেকে বিবাহিত বলে পরিচয় দিলে পাসাঙের মতো দীর্ঘদিনের বন্ধু মানুষ অনেকরকম প্রশ্নও করে বসতে পারে। যার জবাব দেওয়ার মতো শক্তি আর সময় কোনোটাই ওর ছিল না। জবাব দিল তাই কাতরতা নিয়ে, “আমার ফিয়ঁসে লাইফ-ডেথ সিচুয়েশনে আছে, পাসাং। ওর জন্য একটা সেকেন্ডও ইম্পর্ট্যান্ট। প্লিজ… হেল্প মি।”
ওপাশে তখস ‘ফিয়ান্সে’ শব্দটা শুনে পাসাং কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। আশফির ভাঙা আর যন্ত্রণাকাতর গলার স্বর শুনে সে মুহূর্তেই বুঝতে পারল, ও নিজে কতটা অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও নিজের যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে আজ এই প্রথম কারও জন্য নিজের প্রভাব আর পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। অথচ এই মানুষটা পাহাড়ের চূড়ায় হাড়ভাঙা বিপদে পড়লেও সহজে কারও কাছে মাথা নত করে না, পাসাং তা জানে। কিন্তু আজ সে মরিয়া। তার মানে মেয়েটি ওর জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হারে হারে উপলব্ধি হলো তার।
তাই আর সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত গম্ভীর ও তৎপর গলায় সে বলল, “গট ইট, ব্রাদার। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি এখনই পোখরা এয়ারপোর্টে কন্টাক্ট করছি। দশ মিনিটের ভেতর হেলিকপ্টার রেডি হবে। আমি নিজে মেডিসিটির ইমার্জেন্সি হেডকে কল দিয়ে ওদের বেস্ট মেডিকেল টিম রেডি রাখতে বলছি। আপনি শুধু ম্যাডামকে নিয়ে হেলিপ্যাডে আসেন। আই অ্যাম অন ইট!”
আশফির দীর্ঘদিনের কাজের সুবাদে তৈরি হওয়া এই বিশ্বাস আর পাসাংয়ের তৎপরতায় সব প্রশাসনিক জটিলতা মুহূর্তেই তুড়ি মেরে উড়ে গেল।
ঘণ্টাখানেকের মাথায় হাসপাতালের হেলিপ্যাডে যখন হেলিকপ্টারের পাখার প্রচণ্ড শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, তখন করিডোরে এক অন্যরকম চাঞ্চল্য। আশফি নিজে এক হাতে ব্যান্ডেজ আর অন্য হাতে নিজের ড্রিপের স্ট্যান্ড নিয়ে মারিশার স্ট্রেচারের পাশে পাশে থাকল। শরীর ভেঙে আসছিল ওর, মাথা ঝিমঝিম করছিল — যে-কোনো মুহূর্তে পড়ে যাবে যেন। তবু ও শক্ত হয়েছিল পুরোটা সময়।
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৪ (২)
মারিশাকে যখন হেলিকপ্টারে তোলা হলো, হেলিকপ্টারের ওই সংকীর্ণ জায়গায় মারিশার বরফশীতল হাতটা সারাটাক্ষণ নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখল আশফি, আর স্থবিরের মতো নির্নিমেষ চেয়ে রইল মারিশার ফ্যাকাসে মুখপানে।
বিকেলের সূর্য পাহাড়ের গায়ে শেষ লাল আভা ছড়াচ্ছে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটা তখন মেঘের বুক চিরে কাঠমান্ডুর দিকে উড়াল দিল।
