Home বেলতুলি বেলতুলি পর্ব ৩৬

বেলতুলি পর্ব ৩৬

বেলতুলি পর্ব ৩৬
লাবিবা ওয়াহিদ

গ্রামের লোকেদের একটা প্রবাদবাক্য আছে, “সুন্দরীরা না পায় ঘর, না পায় বর।” আজকাল এই প্রবাদের বেশ চর্চা হচ্ছে বাড়িতে। বাহির থেকে অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসছে মৌনোর জন্য। তাও আবার বুড়ো, ডিভোর্সি, বিধবা কিংবা কয়েক বাচ্চা আছে এমন পুরুষের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে। ভালো প্রস্তাব আসলেও যখন জানতে পারে মৌনোকে এ(১)সি ড নিক্ষেপ করা হয়েছে, তখনই এরা মুখ বিকৃত করে কেটে পড়ে। নিশ্চয়ই ওই ছেলের সাথে মেয়ের ফষ্টিনষ্টি ছিল। নয়তো আজকাল ছেলেরা বেহুদা এ সি ড ছুঁড়বে নাকি? অবৈধ কিছু ছিল বলেই এমন করেছে। সাধে কি আজকাল সুন্দরী মেয়েদের মানুষ অবিশ্বাস করে? এদের তো গোড়াতেই সমস্যা। চরিত্রহীনা।
ইয়ামিন মামা এবং তার স্ত্রী দুজনেই মৌনোর বিয়ের বিপক্ষে। তাদের সঙ্গ দিচ্ছেন ইয়াসীন মামা। তিনি আপাতত ঢাকাতে শুটিং এ ব্যস্ত। কয়েকদিনের মধ্যে ফিরে আসবেন জানিয়েছেন। বড়ো মামাদেরও একই কথা, তারা মৌনোকে আরও পড়াবে। মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কিন্তু দুই মামী মানতে নারাজ। তাদেরও আজকাল মৌনোর চরিত্র নিয়ে বেশ সন্দেহ। তাই তো, মৌনো কিছু না করলে কেউ তাকে এ সি ড ছুঁড়বে কেন? এক হাতে কি তালি বাজে নাকি? মৌনো যে সত্যিই বলছে, তার-ই বা গ্যারান্টি কী?

মৌনো এসব বুঝেও এড়িয়ে চলে। তার ভেতরটা পুড়ে গেলেও সে কিছু বলে না। লোকের কথার ভয়ে ইতিমধ্যেই সে নিজের সবচেয়ে বড়ো বিপদটা ডেকে এনেছে। বরং ওদের কথা শুনলে তার পেছনে খরচ করা সবার ভালোবাসা, আকাঙ্খা সব ডাস্টবিনে চলে যাবে৷ রোকসানা আন্টি ইতিমধ্যেই ওকে অনেকখানি ফিরিয়ে এনেছে সেই ট্রমা থেকে। এখন মৌনো নিজেই আগ্রহ করে ভার্সিটি যায়। নিজেকে এখন কালো বোরকায় জড়িয়ে নিয়েছে, এজন্য এখন আর তার রূপ কেউ দেখেও না। তার হাতের দাগও কেউ দেখতে পায় না। ভার্সিটির থার্ড ইয়ারে এসে ট্রান্সফার হওয়া এত সহজ নয়। তবে ইয়ামিন মামা আর বড়ো মামা অনেক চেষ্টার পর পেরেছে। এই দুঃসময়ে মৌনোর সর্বোচ্চ সিজিপিএ-ও ওকে বেশ সঙ্গ দিয়েছে। এজন্যই হয়তো বলে, আমাদের জীবন থেকে বন্ধু হারায়, তবে শিক্ষা নয়। শিক্ষাই আমাদের প্রকৃত বন্ধু।

বুশরার বিয়ে সন্নিকটে। ইতিমধ্যেই মৌনোর পরিবার চলে এসেছে। এতদিন পর নিজের পরিবারকে পেয়ে মৌনো যেন প্রাণ ফিরে পেল। সবাইকে জড়িয়ে ধরল, কাঁদল। এই কটা মাসে খুব অনুভব করেছে, পরিবারের চাইতে আপন কেউ নেই। সবাই ছুঁড়ে ফেললেও পরিবার কখনো ছুঁড়ে ফেলবে না। কিন্তু তার পরিবারের থেকেও বিয়োগ হওয়া প্রয়োজন ছিল। সে ধীরে ধীরে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে, উপলব্ধি করেছে তার একা বাঁচার জন্য নিজের শক্তি নিজের হতে হবে। নয়তো পরিবারের আহ্লাদে সে আরও নিজের শঙ্কাগুলো ছাড়াতে পারত না। উলটো সে এটা ভেবে দুশ্চিন্তায় থাকত, তার জন্য তার পরিবারের এত লোকসান হয়েছে। সবাই নিজেদের কাজের ব্যস্ততা ফেলে শুধু মৌনোর জন্য এখানে পড়ে থাকবে। এটা মৌনো কিছুতেই চায়নি। সময় কারো জন্য থেমে থাকে না, মৌনোও চাইত না তার জন্য তার পরিবার থেমে যাক। এখানে কষ্ট করে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ ছিল।
প্রণভ দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
–“আর কত কাঁদবে শালিকা? জাবির ধরা পড়েছে। এবার অন্তত হাসো।”
মৌনো চমকে গেল।
–“ধরা পড়েছে?”
রিমঝিম হেসে বলল,

–“হুঁ। ওকে এখন কোনো মন্ত্রীরাই বাঁচাতে পারবে না। জাবিরের মাথার ওপর সামান্য নেতার ছায়া ছিল। আর ও কী করে ভুলে গেছে যে আমাদের বড়ো চাচার মন্ত্রীর সাথে ওঠাবসা আছে। বুদ্ধু একটা, পালিয়েও লাভ হলো না। মশিউর আঙ্কেল বলেছেন তিনি ভাল লইয়্যারের ব্যবস্থা করে দিবেন। কেস ভালো মতো আগাচ্ছে মৌনো।”
মৌনো জানে না কেন, এই মুহূর্তে তার বেশ প্রশান্তি লাগছে। জাবির ধরা পড়েছে, জেলে আছে। মৌনো খুব করে চায়, জাবির তার যেই সর্বনাশটা করেছে, সেটা যেন অন্য কোনো নারীর সাথে না হয়। মৌনো জানে, বেঁচেও ম(১) রে যাওয়ার অনুভূতি।
রাজিয়া শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“মাঝখান দিয়ে আমার মেয়ের সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে ওই জা(১)নোয়ারটা। সবই আমার দোষ। জুনায়েদ, রিমঝিমকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে..”
রাজিয়ার চোখে পানি ছলছল করছে। আবারও মৌনোর মুখ ভার হয়ে গেল। সে তার পোড়া হাত চুলকাতে চুলকাতে বলল,

–“তো-তোমার.. দ..দোষ নেই। আমি..”
রাজিয়া শেখ টের পেলেন তিনি আবারও আবেগী হয়ে পড়ছেন। তিনি ভুলেই বসেছেন ডাক্তার এবং রিমঝিমের কড়া নির্দেশ, মৌনোর সামনে সর্বদা শক্ত হতে হবে। রাজিয়া শেখ সব ঝেড়ে দিয়ে বললেন,
–“তোর জন্য পিঠা এনেছি। আয়, খাবি।”
পেছন থেকে বাচ্চারাও এলো। সাথে এলো সালমা এবং ইয়ামিন মামা। ইয়ামিন মামা আফসোস করে বলল,
–“ভালোই! মেয়েকে পাললাম আমরা, আর আমার আপা আমাকে গুরুত্বই দিচ্ছে না। দেখেছ সালমা! এভাবে মানুষ চিনতে হয়।”
এশা এটা শুনে খুবই ভাবনায় পড়ে গেল। চিন্তা-ভাবনা করে বলল,
–“মানুষ তো মানুষই হয় মামা। এইযে, দুই কান, একটা মাথা, দুই চোখ, হাত-পা।”
সবাই হো হো করে হেসে দিল। এশা কাউকে গুরুত্ব না দিয়ে মৌনোর হাতের দিকে তাকাল। যেই বাচ্চারা মৌনোর হাত দেখে ভয়ে পালাত, দুর্গন্ধ বলে বলে দূরে সরে যেত। সেখানে এশা সেই বোনের হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলল,
–“তোমার কি এখনো খুব কষ্ট হয় আপু? বড়ো আপা তো বলল তুমি সেরে গেছ। তাহলে এখনো দাগ আছে কেন? ব্যথা করে দেখেই এখন আর আমাকে বকো না আপা?”
মৌনোর চোখ-জোড়া ভিজে গেল ছোটো অবুঝ বোনটার প্রশ্নে। এশা জানে তার বোনের সাথে দূর্ঘটনা হয়েছে, হাত পুড়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে হয়েছে তা জানে না সে। রিমঝিম হেসে বলল,

–“চাঁদের গায়ে দাগ থাকে আমার ময়না পাখি! তাই বলে কি সে অসুন্দর?”
এশা বোনের হাতে চুমু দিয়ে বলল,
–“একদম না। আমার মৌ আপা সিনেমার নায়িকা। কিন্তু কার মতো..”
এশা নায়িকা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এশার কাজগুলো অন্যান্য বাচ্চারাও উৎসুক হয়ে দেখল। এই প্রথমবার ওরাও মৌনোর কাছে এগিয়ে এসে মৌনোর ক্ষত দেখল। এবার ওরা সেই সামান্য ক্ষততে ভয় পেল না। তারাও সেই ক্ষততে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
–“উহু, একটুও দুর্গন্ধ নেই।”
এটা দেখে মৌনো ফুঁপিয়ে উঠল, তার এতদিনের অবজ্ঞা, অবহেলা, ঘৃণা সব মনে পড়ে যাচ্ছে। যেই বাচ্চাগুলো তার থেকে দূরে পালাত সেই বাচ্চারা তার হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে, দুর্গন্ধ নেই বলছে। এশা রেগে একজনের মাথায় চাটি মেরে বলল,

–“কিসের দুর্গন্ধ? ব্যথা পেলে দুর্গন্ধ আসে নাকি বোকা? দুর্গন্ধ তো ডোবায় পাই। পচা মাছে পাই।”
বাকি বাচ্চারাও সহমত প্রকাশ করল। এই বাচ্চাদের মধ্যে একজন মৌনোর চোখের পানি দেখে অবুঝ সুরে বলল,
–“কাঁদছ কেন আপু? এটা কি খুব ব্যথা করে?”
মৌনো কোনো রকমে নিজেকে সামলে বলল,
–“এইযে, তোমরা ফুলেরা ছুঁয়ে দিচ্ছ। ব্যথা উড়ে গেছে।”
রাজিয়া শেখ, রিয়াজ সাহেব, ইয়ামিন, সালমা.. সবাই প্রাণ ভরে এই দৃশ্য দেখলেন। সালমা জানে এই বাচ্চাগুলোই কীভাবে মৌনোকে দেখে ভয়ে পালাত। সালমা শূন্য চোখে সিলিং এ তাকাল। যেন সে আল্লাহকে স্মরণ করছে। সত্যিই, ধৈর্যের ফল খুব সুন্দর হয়। সে নিজেও আশাবাদী, এই অসহায় মেয়েটাকে আল্লাহ নিজেই সারিয়ে তুলবেন— মানসিকভাবে।

বুশরা মৌনোকে জোর করে রূপচর্চা করাচ্ছে আজকাল। এই কয়েক মাসে মৌনো নিজের ঠিক মতো যত্নই নেয়নি। জোর না করলে সামনেও যত্ন নেওয়ার কোনো প্রকার ভাব তার মধ্যে দেখা যাচ্ছিল না। মৌনোর খালারাও এ বাড়িতে এসেছেন। মামাদের শখ আরেক বোনের মেয়ে বুশরাকে তারা এই বাড়ি থেকেই বিদায় দিবেন। এজন্য এই বাড়িটাকেই বিয়ে-বাড়ির মতো সাজানো হবে। বুশরাও খুব খুশি এই সিদ্ধান্তে, তাই বুশরার বাবা-মা না করেননি। বুশরার বাবা দু’হাত ঢেলে এই বাড়িটাকেই সাজাবেন।
রূপচর্চার পর দেখা গেল মৌনোর মুখের গ্লো ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে, এতে বুশরা বেশ খুশি হলো। বুশরা বলল,
–“আমার বিয়ে নিয়ে তোদের এত এত পরিকল্পনা ছিল। খবরদার যদি আমার বিয়েতে মুখ কালো করে রেখেছিস। বরং আমার বোনদের সবচেয়ে সুন্দর দেখানো চাই।”
মৌনো ইতঃস্তত অনুভব করল। তার বেশ অস্বস্তিও হলো। মনে পড়ে গেল ইয়ামিন মামার বিয়ের কথা। কতশত ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবার। বুশরা তা ধরতে পেরে মৌনোকে চড় লাগিয়ে দিল। রেগেমেগে বলল,
–“আবার উলটো পালটা ভাবছিস? তোকে আমি খতম করে দিব আবার যদি আগের চিন্তা মাথায় আসে। তোর জীবন তোর মৌনো, তুই নিজের মতো করে বাঁচবি, তুই ডিজার্ভ করিস! অন্য কারো কথা ভেবে খবরদার ঘরবন্দী থাকার চেষ্টা করবি না!”
মৌনো হাসার চেষ্টা করল, বুঝল নতুন বউকে রাগিয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। রিমঝিম ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,

–“এ কি! শুধু মৌনোই কী রূপচর্চা করবে? আমি কী দোষ করেছি? বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলে পর করে দিবি?”
বুশরা হো হো করে হেসে দিল। তার রূপচর্চার জিনিসগুলো শেষ হয়েছে দেখতেই মৌনো সাহস করে বলল,
–“আমি গিয়ে নিয়ে আসি উপকরণ?”
বুশরা, রিমঝিম দুজনেই অবাক হলো মৌনোর নিজ থেকে এগিয়ে আসা। এই ঘটনা ঠিক বেশ বিরল তাদের জন্য। অনেকদিন পর মৌনো ধীরে ধীরে নিজ থেকে আগ্রহী হচ্ছে। বুশরা হেসে বলল,
–“যা। আমার মা রান্নাঘরেই আছে। মামীদের কিছু বলা লাগবে না। আম্মাই যা করার করবেন।”
মৌনো মেনে নিল। সে ঘর থেকে বের হতেই বুশরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলল,
–“আপা, এর মানে কি মৌনোর মানসিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে?”
–“হুঁ! অন্তত দুই মাস আগে যা দেখে গেছিলাম তার থেকে তো অনেকটাই ঠিক হয়েছে। দোয়া কর যাতে সেই দূর্ঘটনা ওকে আর হন্ট না করে। আমরা জানি এসব দূর্ঘটনা কখনো জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারব না। কিন্তু সেটাকে খারাপ অতীত ভেবে তা ভুলে সামনে তো এগিয়ে যেতেই পারি।”
মৌনো উপকরণ নিয়ে আসার সময় বেশ বিপদে পড়ল। তার পথ আটকে দাঁড়াল বড়ো মামার বড়ো ছেলে শরীফ। লোকটা সৌদি প্রবাসী ছিল, বিয়ে করেনি। কিছুদিন আগেই ফিরে এসেছে। তাও যেনতেন ফেরত নয়। একদম জেল খেটে। ওদেশে জুয়া খেলতে গিয়ে ধরা খেয়ে জেলে ছিল। বড়ো মামা কতকিছু করে অবশেষে ছেলেকে দেশে এনেছেন। ভেবেছিলেন দেশে এলে ছেলে বদলে যাবে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এখনো সে সি/গারেট, লাল পানিতে আসক্ত। মাঝেমধ্যে এদিক সেদিক জুয়া খেলতেও চলে যায়। এ নিয়ে ভদ্রলোক বেশ চিন্তিত।
মৌনোকে উপরনিচ দেখে শরীফ অন্যসুরে হেসে বলল,

–“ঢাকাইয়া বইন যে বড়ো সড়ো হয়ে গেছে দেখছি। বয়স কত?”
মৌনো আমতা আমতা করে বলল,
–“বিশ।”
মৌনোর গা গুলাচ্ছে, সে ভালো করেই বুঝতে পারছে শরীফের নজর ভালো না। সে ভেতরে ভেতরে বেশ ভয়ও পেয়ে গেল। তবে রোকসানা আন্টি বলেছেন, বিপরীত লিঙ্গের সামনে ভয় প্রকাশ করা যাবে না। যত ভয় প্রকাশ করবে তত এরা লাই পাবে। মৌনো তাই মুখভঙ্গি যথেষ্ট স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করল। নিজেকে বুঝ দিল, কাজিনই তো। শরীফ মৌনোর গা ঘিনঘিন আরও বাড়িয়ে বলল,
–“কচি দেখছি। এতদিন দেখি নাই কেন? ঘরে বন্দী ছিলা নাকি?”
মৌনো বুঝল সে আর দাঁড়াতে পারবে না। কোনো মতে বলল,
–“বুশরা ডাকছে ভাইয়া।”
বলেই দ্রুত সে কেটে পড়ল। ঘরে গিয়ে উপকরণ বুঝিয়ে দিল। তার আবারও পুরানো ঘটনা মাথা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছে। জাবিরের কথা বারবার মাথায় ঘুরছে। এটা রিমঝিমও লক্ষ্য করল। মৌনো যতটা স্বচ্ছল অবস্থায় গিয়েছিল এখন ঠিক ততটাই চিন্তিত লাগছে। রিমঝিম দ্রুত বোনের পাশে এসে বসল।
–“কী হয়েছে? এমন লাগছে কেন তোকে, গেলি তো ঠিকঠাক। কেউ কিছু বলেছে?”
মৌনো বোনের দিকে তাকাল। এবার সে আগের মতো নিজের মধ্যে কথা চেপে রাখার ভুল করল না। রিমঝিমকে বলে দিল,

–“শরীফ ভাইয়া পথ আটকেছিল। তার নজর ভালো লাগেনি আমার। আমার বয়স জিজ্ঞেস করছিল। এতদিন দেখেনি আমাকে। আজ দেখল।”
বুশরা এ কথা শুনে চিন্তিত হলো। পরবর্তীতে আবারও বলল,
–“ভয় পাস না। হ্যাঁ, শরীফ ভাই একটু লম্পট আছে। তবে আমাদের কারো সাথেই কখনো খারাপ আচরণ করেনি। শুনেছি বড়ো মামী ভাইয়ার জন্য মেয়েও দেখছে ঘরবন্দী করার জন্য।”
কিন্তু দেখা গেল মৌনোর ভয়কেই সত্য প্রমাণিত করলেন বড়ো মামী। সেই সময়ে মৌনোর বাবা-মা ছিলেন বুশরাদের বাড়িতে। ফিরবেন রাতে। বড়ো মামী ইয়ামিনদের সাথে বলাবলি করলেন মৌনোকে শরীফের বউ করবেন। শরীফের নাকি মৌনোকে পছন্দ হয়েছে। তার চাইতেও ভয়াবহ ব্যাপার বড়ো মামাও এই প্রস্তাবে স্ত্রীর সঙ্গ দিচ্ছেন। সালমা এতে অস্ফুট স্বরে বলল,
–“মৌনোর এই সময়ে বিয়ের কী দরকার? ওকে ওর মতো করে ছেড়ে দিন না। ওর মতামত ছাড়া বিয়ের কথা আগানো কী খুব দরকার?”
মৌনোও এই মুহূর্তে সেখানে আসল। শুনল সবার কথা। বড়ো মামী এবার নিজের ক্ষোভ ঝাড়লেন,

–“তুমি একটু অভিনয় কম করে করবে সালমা। আমরা জানি যে তুমিই সেদিন মৌনোকে বাজে কথা বলেছিলে তাই মৌনোরা তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। আলিয়া সব দেখেছে।”
আলিয়া অর্থাৎ মৌনোর মেঝো মামী। মৌনো অবাক হলো মামীর এই ক্ষোভ প্রকাশ। তিনি চাইলেই এটা একান্তে সালমাকে বলতে পারত কিন্তু এই মুহূর্তে ছোটো মামীকে তিনি সবার সামনে ছোটো করলেন। সালমা মামীর চোখ ছলছল করে ওঠে। মৌনো ভয়ে ইয়ামিনের দিকে তাকাল। যা ভেবেছিল তাই, ইয়ামিন মামা রাগী চোখে তার স্ত্রীর দিকে তাকানো। কিন্তু সবার সামনে ইয়ামিন কিছু বলল না। ইতিমধ্যেই বড়ো মামী পরিস্থিতি গড়মিল করে দিয়েছেন। তিনি যে যেকোনো মূল্যে মৌনোকে শরীফের বউ করে ছাড়বেন সেটা বোঝা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে ইয়ামিন মুখ খোলা মানে পারিবারিক দ্বন্দ্ব শুরু হবে। এটা সে মোটেও চায় না। বড়ো মামা স্ত্রীর সাথে তাল মিলিয়ে বললেন,
–“মৌনোর ওপর দিয়ে যা ঝড় গেছে, এতে ওর একটা ব্যবস্থা করাই উত্তম। বুড়ো টুড়োর প্রস্তবাএর চেয়ে ভালো নয় কি মৌনো আমাদের ঘরেরই হয়ে থাকল।”
ইয়ামিন এবার মুখ খুলল,

–“ঘরের মেয়ে ঘরেই আছে। তবে সেটা বউ হয়ে থাকুক তা মৌনো নিজেও চায় না ভাইজান। আপারা আসুক আর বুশরার বিয়েটা যাক। এরপর নাহয় এসব নিয়ে আলাপ হবে।”
ইয়ামিন খুব কৌশলে এই ব্যাপারটা ঘুরিয়ে দিল। বড়ো মামী মেনে নিলেন। মৌনো ইয়ামিনের দিকে তাকাতেই ইয়ামিন তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলল। মৌনোরও বুঝতে বাকি রইলো না, ইয়ামিন কখনোই শরীফের মতো লম্পটের হাতে মৌনোকে তুলে দিবে না। সে শুধু আপাতত মন রক্ষা করছে। মৌনো মেনে নিল, তবে আলাদা করে মামাকে ডেকে বলল,

বেলতুলি পর্ব ৩৫

–“মামা, মামীর কোনো দোষ নেই। তুমি এই কয়েক মাসে ভালো করেই দেখেছ ছোটো মামী আমার জন্য কতটা লড়েছে। বড়ো হয়ে ছোটোজনকে কিছু বলতেই পারে। তাই বলে এই না যে তুমি আবার মামীর ওপর চড়াও হবে। তুমি ওই মুহূর্তটায় মামীর জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে চিন্তা করো। কোন মেয়ে নিজের বিয়েতে এতকিছু মেনে নিবে? খবরদার তুমি তোমার ভুয়া রাগ দেখাবে না। আজকে যেভাবে সুন্দর করে পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করেছ। সামনেও এভাবেই থাকবে। মামী দোষ করলেও ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। জানো না, ক্ষমা মহৎ গুণ।”
ইয়ামিন কিছু বলতে পারে না মৌনোর কথার বিপরীতে। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“দেখি।”

বেলতুলি পর্ব ৩৭