বেলতুলি পর্ব ৩৭
লাবিবা ওয়াহিদ
বহুদিন পর মাটির ঘ্রাণ পেল নিবিড়। মিশন থেকে ফিরেছে কয়েকঘণ্টা হয়েছে সবে। নিজের কোয়ার্টারে ফিরে আগে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়েছে সে। এরপর নিজের মোবাইল অন করেই দেখল তেমন কেউই কল করেনি। কী মনে করে কামরুলকেই সবার আগে কল দিল। এই ছেলেটা আস্ত এক রেডিয়ো। বেলতুলির সব খবরাখবর তার কাছে থাকে। কামরুল তো নিবিড়ের কল পেয়ে সেই খুশি। প্রথমেই এক লম্বা সালাম দিল নিবিড়কে।
–“বড়ো ভাই, সময় মতো কল দিছেন। জানেন, গতকাইল আপনের প্রাক্তন বাগদত্তা কার হাত ধইরা ভাগছে। এহনো খোঁজ-খবর নাই। বুঝলেন ভাই, আল্লায় আপনেরে বাঁচাইছে। পরে বিয়া হইয়া যাওনের আরেকজনের লগে ভাগলে মাইনষে আপনেরেই ছি ছি কইরা কইত বউ ধইরা রাখতে পারেন না।”
–“আমি তোকে ছয় মাস পর কল দিয়েছি কামরুল! মানুষ কেমন আছে, ভালো আছে কিনা জিজ্ঞেস করে।”
কামরুল জিভে কামড় দিয়ে বলল,
–“ভাই, আপনে কেমন আছেন? জাহাজে গিয়া কয়ডা হাঙর মারছেন?”
–“আবার ফাজলামো?”
কামরুল হো হো করে হাসল। কিন্তু কিছুতেই বলল না মৌনোর ব্যাপারে। যা ঘটেছে তা নিবিড় শুনলে এতক্ষণে কি যে করবে। তাই ওখানে জানানোটা ঠিক হবে না। যা জানার তা নাহয় বেলতুলি এসেই শুনবে।
কামরুল তাই একে একে বাড়ির সবার কী খবর তার সব নাট-বল্টু খুলে খুলে বলল। এতে নিবিড়ের মাথা ধরে গেল। সে কপালে আঙুলের বিচরণ চালিয়ে বলল,
–“আমার ভুল হয়েছে তোকে কল দিয়ে। এবার কলটা কেটে উদ্ধার কর।”
–“জো হুকুম বড়ো ভাই।”
কামরুল কাটার আগেই নিবিড় তার মুখের ওপর কল কেটে দিল। নিবিড় মৌনোর নাম্বারটা দেখল। কি অদ্ভুত, এই কয়েক মাসে একটা মেসেজও আসেনি এই নাম্বার থেকে? অবশ্য মেসেজ না করাটাই স্বাভাবিক। সবাই তো জানতই নিবিড় ফিরবে ছয় মাস পর। নিবিড় এবার খুব শান্তি পেল। বহুদিন পর নিজের জন্য সুন্দর করে রান্নাও করল। একজন কেয়ারটেকার তাকে নতুন বাজার দিয়ে গেছে।
বিকালের দিকে যখন আবারও কেনাকাটার জন্য বের হলো তার দেখা হয়ে গেল ইয়ামিনের সাথে। ইয়ামিন তো খুশিমনে নিবিড়কে রাস্তাতেই জড়িয়ে ধরল,
–“আরে নেভিসাব! কবে ফিরলে?”
–“এইতো মামা, আজই। আপনার কী অবস্থা? সব ঠিকঠাক?”
ইয়ামিন কিছু বলতে নিয়েও জিভের শেষ মাথায় এসে তার কথাগুলো আটকে গেল। বড়ো গলায় তার জানাতে ইচ্ছে করল,
–“তোমার অনুপস্থিতিতে অনেক কিছুই ঘটে গেছে নিবিড়।”
কিন্তু মুখে বলল,
–“আরে সবই ফাটাফাটি চলছে। ছুটিতে আছ না এখন?”
–“জি, বেশ অনেকদিনের ছুটিই পেয়েছি।”
–“বাহ! তাহলে তো হয়েই গেল। আজ আমার ভাগনি বুশরার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। সন্ধ্যার পর চলে আসবে কেমন? মৌনোরাও আছে। ভালো লাগবে তোমার। এতদিন একঘেয়েমিতে ছিলে। এখন সব ঝেড়ে ফেলবে, বুঝেছ?”
–“জি, আচ্ছা। মৌনোরা কেমন আছে?” মৌনোর কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে তার জিভ জড়িয়ে এলো। অস্বস্তি হচ্ছে বেশ।
ইয়ামিন সত্যি কথাই বলল,
–“ভালো আছে সবাই। বাকিটা এসে দেখে নিয়ো। এখন যাই, আমার আবার তাড়া আছে।”
বুশরার গায়ে হলুদ উপলক্ষ্যে মৌনো খুব সুন্দর এক লেহেঙ্গা পরেছে। এটা বুশরার বাবা কিনে দিয়েছে ওকে। মৌনো চায়নি এত গর্জিয়াছ কিছু পরতে। বারবার হাতের বাহানা দিচ্ছিল। এজন্য বুশরা কাপড়ে তার হাত বেঁধে দিয়ে বলল,
–“বেশ, এবার তো হাতও দেখা যাচ্ছে না। এবার কাকে বাহানা দিবি তুই?”
অগত্যা, মৌনোর সাজতেই হলো। তার ডান হাতে মেহেদিও দিয়েছে সে। সব মিলিয়ে যখন নিজেকে আয়নায় দেখল, সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। চাপা কিছুটা ভেঙেছে, তবে মেকআপের জন্য তার চোখের নিচের কালো গর্ত একদমই বোঝা যাচ্ছে না। সে অবাক হয়ে ভাবল, আসলেই তাকে এত সুন্দর লাগছে নাকি তার ভ্রম?
আজকাল বড়ো মামী আবারও মৌনোকে মাথায় চড়িয়ে রেখেছেন। তিনি এত বেশি প্রশংসা করেন মৌনোকে নিয়ে। মৌনোর যত্ন-আত্তির কোনো প্রকার ত্রুটি হতে দেন না। মৌনোর সব দিক খেয়াল রাখেন। কিন্তু মৌনো আর এসবে ভুলে না। সে ভালো করেই জানে বড়ো মামীর ধান্দা। ধান্দার চেয়েও বড়ো কথা, সে ইতিমধ্যেই মামীর আসল রূপ দেখে নিয়েছে। তাই তাকে ভুলানো এত সোজা নয়। মৌনো এখনো তার সিদ্ধান্তে অটল। বেঁচে থাকতে সে কখনোই শরীফকে বিয়ে করবে না। এতে যদি তার চিরকুমারী থাকতে হয়, সে থাকবে। শরীফ চাইলেও এখন তার ধার ঘেঁষতে পারে না। সত্যি বলতে ঘেঁষতে চায়ও না। সে তো পুরো দমে ধরেই নিয়েছে মৌনো তার বউ হবে। নয়তো কে নিবে এই এ সি ড ছোঁড়া মেয়েকে? সে যে দয়ামায়া করে বউ করতে চাচ্ছে এই ঢের!
রাজিয়া শেখ মৌনোকে নিচে থেকে এশাকে ধরে আনার আদেশ দিলেন। মৌনো কিছুটা ভয় পেল, অস্বস্তি অনুভব করল। সে এই লেহেঙ্গা পড়ে মানুষের সামনে যেতে চাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই তার অনেক ব(১)দনাম রটে গিয়েছে। কিন্তু রাজিয়া শেখও নিজ সিদ্ধান্তে অটল। যে করেই হোক মেয়েকে আগের স্বাভাবিক জীবনটা অনুভব করানো জরুরি। অগত্যা, মৌনো তার হাতের কাপড়টা পুণরায় বেঁধে লেহেঙ্গার গের ঠিক করতে করতে সিঁড়ির দিকে এসে নিচে তাকাল। আচমকাই সে অবাক হয়ে গেল। নিচে ইয়ামিন মামা এবং ইয়াসীন মামার সাথে কোলাকুলি করছে নিবিড়। সাদা পাঞ্জাবি পড়েছে মানুষটা। উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ বদলে কিছুটা চাপা হয়ে এসেছে। সানট্যানের প্রভাব আর কি।
নিবিড়ও এমন সময়ে তাকাল উপরে। মুহূর্তেই দুজনের চোখাচোখি হলো। মৌনোর বুকটা মুঁচড়ে উঠল নিবিড়ের সেই শান্ত চাহনিতে। নিবিড় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল মৌনোর পরিবর্তনগুলো। মেয়েটা কেমন যেন মিইয়ে গেছে। আগের সেই উজ্জ্বলতা খুঁজে পাচ্ছে না সে। দেখে মনে হচ্ছে কতদিনের দুঃখী সে। নিবিড়ের ভ্রু হঠাৎ-ই কুঁচকে গেল। আপনমনে ভাবল,
–“মৌনো, তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে যেন তুই ঠিক নেই। ঠিক আছিস?”
ইয়ামিন আর ইয়াসীন দুজনেই মৌনোর সাথে নিবিড়ের চোখাচোখি দেখল। সাথে এও দেখল, মৌনো নিবিড়কে দেখে ভয় পেয়ে দ্রুত উলটো দিকে ছুটে পালাল। যেন মৌনো চায় না নিবিড় তাকে দেখুক, তাদের সাক্ষাৎ হোক। এতে নিবিড়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল আরও। সরাসরি ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“কী হয়েছে মৌনোর? ও ঠিক আছে?”
দুই ভাই একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করলেন। দুজনই ধরতে পারলেন নিবিড়ের চাপা চিন্তা। দুই ভাই নিবিড়ের দুই হাত ধরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,
–“অনেকদিন তোমার সাথে বসে আড্ডা হয় না নিবিড়। চলো পেছন দিয়ে চায়ের আড্ডা দিই।”
নিবিড়ও মেনে নিল, কিন্তু মৌনোর দুশ্চিন্তা তাতেও কাটল না। ওরা বাগান থেকে কিছুটা দূরে চেয়ার পেতে বসল। সর্বপ্রথম প্রশ্নটা ইয়ামিনই করল,
–“নিবিড়, আজকে যা যা জিজ্ঞেস করব তার সত্যি উত্তর দিবে। যদিও আমি জানি তুমি মিথ্যে বলো না। তবুও আমি আবারও ওয়ার্ন করছি। সত্যি বলবে।”
নিবিড় মেনে নিল, যদিও সে বুঝতে পারছে না ইয়ামিনের উদ্দেশ কি।
ইয়াসীন প্রশ্ন করলেন,
–“তুমি কী মৌনোকে ভালোবাসো?”
নিবিড় এই প্রশ্নে চমকে গেল। ইয়ামিন তাকে সময় না দিয়ে বলল,
–“জলদি জলদি উত্তর দাও। আমাদের তাড়া আছে।”
–“কিন্তু এই প্রশ্ন কেন হঠাৎ?”
–“যা প্রশ্ন করেছি তার কুইক উত্তর দাও। বড়োদের অপেক্ষা করাতে নেই।”
নিবিড় থেমে কিছু ভাবল। কপালের কোণ চুলকে বলল,
–“সেভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। তবে ওর জন্য একটা সফট কর্ণার আছে আমার। এরকমটা কখনো কোনো মেয়ের প্রতিই আসেনি।”
–“ভেরি গুড! যদি দেখো মৌনোর কোনো বিপদ হলো, ওকে বিয়ে করবে?”
–“বিয়ে?”
নিবিড় চিন্তায় পড়ে গেল। ইতঃস্তত হয়ে বলল,
–“মৌনো আমার থেকেও ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে ইয়াসীন মামা। ওর সাথে আমার অতীতের রেকর্ড খারাপ আছে। আমার মনে হয় না আমার সামান্য পছন্দের বোঝাপড়া না করে বিয়ের কথা ভাবা উচিত।”
ইয়াসীন মামা বললেন,
–“প্রেক্টিক্যালি চিন্তা করে দেখো। যদি কখনো সেই পরিস্থিতি হয়?”
–“সরি মামা। আমি সত্যিই এরকম কিছু ভাবতে পারছি না। মৌনো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে, ওর টাইপের। আমি পারি না বিয়ের ব্যাপারটা ওর ওপর চাপিয়ে দিতে।”
–“তোমার কেন মনে হয় মৌনো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে? তুমি কেন নও? নিঃসন্দেহে তুমি ভালো একজন মানুষ।”
–“ওইযে বললাম, পাস্ট রেকর্ড ভালো নয়। আর ওকে বিয়ের কথা বললে ও কী ভাববে?”
ইয়ামিন বুঝল নিবিড় এখনো তার মনের ভাব নিয়ে বেশ চিন্তিত, নার্ভাস এবং কনফিউজড। মানুষ ধাক্কা না খেলে পথে আসে না। তাই এবার ইয়ামিন সেই ধাক্কাটাই দিল নিবিড়কে।
–“নিবিড়, তুমি কী জানো? তোমার অনুপস্থিতিতে মৌনোকে এ সি ড ছোঁড়া হয়েছে। জাবির নামের এক ছেলে এই কাজ করেছে কয়েক মাস আগে। মুখ বাঁচলেও ওর হাত বাঁচেনি।”
দুই ভাই একই সাথে নিবিড়ের দিকে তাকাল। নিবিড়ের গলা দিয়ে শব্দ বেরুলো না। সে শক্ত হয়ে বসা। চোখ-মুখ বিমূঢ়। চোয়াল শক্ত কিন্তু দৃষ্টি শূন্য। ইয়াসীন বাকি সব ধীরে ধীরে নিবিড়কে বলল। ইয়ামিন ততক্ষণে সূক্ষ্ম নজরে নিবিড়ের মুখের পরিবর্তন দেখছে। ধীরে ধীরে ছেলেটার মুখ লাল হয়ে গেছে। নিবিড় হাতের মুঠো শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
–“শু*য়ের বাচ্চাটা এখন কোথায় আছে?”
–“কেস চলছে। যতদূর দেখলাম কেস অনেকটা আমাদের হাতেই আছে। এত দ্রুত ছাড় দিব না ওটাকে।”
ইয়ামিন নিবিড়ের ধ্বংসাত্মক রাগ অনুভব করতে পারছে। অতিরিক্ত ক্ষেপলে যেমন মানুষ চুপসে যায় নিবিড়েরও একই পরিস্থিতি। সে নিতেই পারছে না তার অনুপস্থিতিতে এতকিছু হয়ে গেছে। নিবিড় টের পেল সূক্ষ্ম এক সুঁইয়ের মতো কিছু একটা তার বুকের বা পাশটায় বিঁধছে। এই অনুভূতি নতুন তার জন্য। বড্ড নতুন। কেমন হাসফাস লাগছে, দম বন্ধ লাগছে। ইচ্ছে করছে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে। সব কিছু তছনছ করে দেওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে তার— প্রথমবারের মতো। নিবিড় ঘাসের দিকে নজর স্থির করে রাখল। চোখে ভেসে উঠল নিবিড়কে দেখে মৌনোর ভয় পাওয়া, তাকে দেখে পালিয়ে যাওয়া। সঙ্গে খেয়াল করেছিল মৌনোর বাম হাতটা কাপড়ের মাঝে লুকিয়ে রাখা।
নিবিড় খুব বড়োসড়ো কিছু একটা উপলব্ধি করল আজ। এই উপলব্ধি না হলে হয়তো বুঝতেই পারত না নিবিড়ের ভেতরের কোথাও কিছু একটা লম্বা সময় ধরে বন্দী হয়ে ছিল।
–“এজন্যই বুঝি তুমি আমাকে দেখে ওভাবে পালিয়েছ, মৌনো?”
নিবিড়ের উপস্থিতি পেয়ে মৌনো আবারও ঘরবন্দী হলো। সে নিজ মনে জপছে, কিছুতেই নিবিড়ের সামনে যাওয়া যাবে না। নিবিড় তাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নিবে, ছি ছি করবে। নাহ, সে ঘর থেকেই বের হবে না। কিছুতেই না।
এর মাঝে হঠাৎ দরজা খুলে জুনায়েদ এলো।
বেলতুলি পর্ব ৩৬
–“নিবিড় ভাইয়া ডাকছে তোমায় আপা। বলেছে তুমি যদি না আসতে চাও তাহলে যেন আমি তোমার ঘাড় ধরে নিয়ে যাই। এটা নাকি একজন লেফট্যানান্ট কমান্ডারের আদেশ। এখন আমি ভাইয়াকে বোঝাই কেমন করে, তুমি আমার কত বড়ো হও। আমার এই অসম্মান হতে দিয়ো না আপা।”
