শেহেজাদার আদর পর্ব ২৪
সুমাইয়া ইসলাম নূর
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নেমে এসেছে…
আকাশে কমলা আর নীলের মিশেলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত নীরবতা।
হাসপাতালের সামনে একে একে জ্বলে উঠছে লাইটগুলো সেই আলোতে চারপাশটা যেন আরও গম্ভীর, আরও ভারী লাগছে।
মাঝে মাঝে দূরের অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন এই নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে দিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই—
অফিস শেষ করে লিখন চৌধুরী, রতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী তিনজন তিনটি গাড়ি নিয়ে হাসপাতালের সামনে এসে থামলেন।
গাড়ির দরজা খুলে একে একে নামলেন তারা তিন ভাই চোখে ক্লান্তি, মুখে চিন্তার ছাপ…
কিন্তু পায়ের গতিতে কোনো ধীরতা নেই।
তিন ভাই সোজা এগিয়ে গেলেন ইনায়ার কেবিনের দিকে। এইদিকে
কেবিনের ভেতরে ইনায়া নুসরাত চৌধুরীর হাত ধরে বায়না করছে ও মা… আমি এখানে থাকবো না…
আমার জ্বর নেই আমি ভালো হয়ে গেছি…
মা প্লিজ… বাবাকে বলো না আমাকে নিয়ে যেত
ঠিক তখনই দরজা খুলে—
রতিব চৌধুরী ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন—
ডাক্তারের সাথে কথা বলে এসেছি মা তোমাকে এখনই নিয়ে যাবো। রবিউল চৌধুরী এগিয়ে এসে ইনায়ার মাথায় হাত রাখলেন—
তার কণ্ঠে নরম স্নেহ এনে বললেন এই তো… একদম ভালো হয়ে গেছে আমার নূর মা
চল, রেডি হয়ে নে বাসায় যেতে হবে।
লিখন চৌধুরী একটু সামনে এগিয়ে এলেন—
শোন মা… তোকে একটা কথা বলি
আজ থেকে বাড়িতে গিয়ে আবার আগের মতো হাসিখুশি থাকবি।তুই, পিয়াসা, রিদ, আয়াত, আতিকা—
তোদের মধ্যে কেউ যদি কষ্টে থাকিস আমরা কি ভালো থাকতে পারি বল
আমাদের জন্য হলেও তোদের ভালো থাকতে হবে।
আর মনে রাখিস।
চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা এত সহজে ভেঙে পড়ে না
ইনায়া চুপচাপ শুনছে—
মাথা নিচু করে আঙুলগুলো চাদরের কোণা মুচড়ে ধরে আছে। লিখন চৌধুরী এবার একদম কাছে এসে দাঁড়ালেন নিজের আত্মসম্মান নিজের মর্যাদা—
কখনো কারো সামনে দুর্বল করে দিবি না। জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল তখনই করবি—
যখন নিজের দুর্বলতার কথা অন্য কারো সামনে খুলে বলবি।
কারণ মানুষ ঠিক সেই জায়গাতেই বারবার আঘাত করে।
সে যদি আমার ছেলে শহেজাদা ইউভি চৌধুরী হয় তাহলে ও না
কথাটা শুনে ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল—
একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো চারপাশে…
ইনায়া ধীরে ধীরে মাথা বোঝালো সে
বুঝেছে সব বুঝেছে—
মনে মনে খুব আস্তে বলল।বড় চাচ্চু…
তুমিও বুঝে গেছো।তোমার এই মেয়েটা শহেজাদা ইউভি চৌধুরীর জন্য
কতটা দুর্বল শুধু আমার ওই বালের শহেজাদা টা বুঝলো না…
ভেন্ডির কপাল… মাইরি।
ইনায়াকে সেদিন সন্ধ্যাতেই বাসায় নিয়ে আসা হলো।
এখন সে নিজের রুমে…
বাড়ির বড়রা সবাই ডাইনিং রুমে বসে গল্প করছে—
হালকা হাসি, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দে পুরো পরিবেশটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
গিন্নিরা রান্নাঘরে ব্যস্ত—
আগামীকালের জন্য নানা প্রস্তুতি চলছে।
নুসরাত চৌধুরী একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন,
পিয়াসা নিজের রুমে বসে পড়াশোনা করছে,
আর আয়াত-আতিকা পুরো ডাইনিং হলজুড়ে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে—
বাড়িটা আবার আগের মতো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে…
আজ রিমঝিমদের আসার কথা থাকলেও—
হঠাৎ একটা কাজে আটকে গেছে তারা।
আগামীকাল সকালেই চলে আসবে সবাই।
ঠিক তখনই—
সদর গেট দিয়ে হঠাৎ করেই বাড়িতে প্রবেশ করলো রেদোয়ান।
রেদোয়ানকে দেখে তিন কর্তা একসাথে অবাক হয়ে তাকালেন।
রেদোয়ান এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে বলল—
“আসসালামু আলাইকুম।”
তিনজনই সালামের জবাব দিয়ে রতিব চৌধুরী বললেন—
“হঠাৎ করে চলে এলে? একদিনেই কী কাজ শেষ করলে?”
রেদোয়ান হালকা হেসে বলল—
“জি চাচ্চু… ভাইয়া আসতে বলেছে।
কাল মাটিথাদের সাথে একটা মিটিং আছে
রতিব চৌধুরী আবার জিজ্ঞেস করলেন—
“তোমার ভাইয়া কোথায় রেদোয়ান ?
রেদোয়ান একটু থেমে, হালকা অস্বস্তি নিয়ে বলল—
ভাইয়া লন্ডনেই আছে চাচ্চু… কবে আসবে, সেটা আমাকে বলেনি তারপর বলল—
আমি উপরে যাই, ফ্রেশ হয়ে এসে কথা বলছি
নুসরাত চৌধুরী এগিয়ে এসে বললেন—
যা বাবা, আগে ফ্রেশ হয়ে আয়
কিন্তু…
রেদোয়ান নিজের রুমে না গিয়ে—
সোজা চলে গেল ইনায়ার রুমের সামনে।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই—
ইনায়া ঠিক তখনই বারান্দা থেকে রুমে ঢুকছিল।
রেদোয়ানকে দেখেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল—
“ভাইয়া! তুমি এসেছো?”
তার কণ্ঠে এমন একটা স্বস্তি—
যেন অনেকদিন পর নিজের মানুষকে ফিরে পেয়েছে…
কিন্তু পরের মুহূর্তেই পড়ে গেল রেদোয়ান ও তাকে না বলে চলে গেছে
ইনায়া হঠাৎ রেদোয়ানকে ছেড়ে দিয়ে রাগে চোখ রাঙিয়ে বলল—
তুমি ও দিন দিন ওই অসভ্য লোকটার সাথে মিশে অসভ্য হয়ে যাচ্ছো ভাইয়া
তুমিও কিভাবে পারলে আমাকে না বলে চলে যেতে?”রেদোয়ান কিছু বলার আগেই—
ইনায়া আবার বলতে লাগলো
“আমি কি এখনো সেই ছোট্ট বাচ্চা আছি,
যে তোমার পিছু পিচু যেতে চাইবো
তুমি এখন আমাকে ভালোবাসো না…
তুমি তোমার একমাত্র বোনটাকে আর ভালোবাসো না।রিদ না হয় ভালোবাসে না আমাকে—
ও তো সবসময় আমার সাথে ঝগড়া করে…
ওকে তো মা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছে ও আমাকে ভালো নাই বাসতে পারে কিন্তু তুমি
তারপর ইনায়ার চোখ পানিতো ভিজে উঠলো কিন্তু তুমি ভাইয়া তুমি কিভাবে পারলে?
রেদোয়ান অসহায়ের মতো এগিয়ে এসে বলল—
বোনু… প্লিজ চুপ কর…
সব শুনছে ভাইয়া। আমি তোকে বুঝিয়ে বলছি
কিন্তু ইনায়া এবার আর কিছু শুনতে রাজি না—
সে দরজার দিকে ইশারা করে চিৎকার করে বলল—
যাও! তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই!
যাও—তোমার ওই বালের ইউভি ভাইয়ার কাছে যাও!
এই বলে—
ইনায়া এক প্রকার জোর করেই রেদোয়ানকে রুম থেকে বের করে দিল।
রেদোয়ান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে—
এখনও নরম গলায় বলেই যাচ্ছে—
বোনু প্লিজ শুন তো আমি সব বলবো…
কিন্তু ভেতর থেকে আর কোনো উত্তর এল না
রাতের খাবার খেতে গিয়ে—
পিয়াসা হঠাৎ খেয়াল করল, রেদোয়ান এসে গেছে।
মনে মনে একটু অভিমানও হলো পিয়াসার
দেশে এসেছে, অথচ একবারও জানালো না…
কি এমন হলো যে তাকে বলারও দরকার মনে করল না?
খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে এক এক করে সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেল।শুধু নুসরাত চৌধুরী ইনায়ার জন্য খাবার নিয়ে উপরে গেলেন। ইনায়ার রুমে ঢুকে নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিলেন।ইনায়া চুপচাপ খাচ্ছে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল মায়ের দিকে—
কিন্তু কিছু বলছিল না।
খাওয়ানো শেষ করে নুসরাত চৌধুরী বলে উঠলেন—
কাল থেকে নিয়ম করে কলেজে যাবি আর পড়ালেখায় মন দে। ইনায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল—
উফফ মা পড়ালেখা আমার ভালো লাগে না!
পড়ালেখার কথা বলো না তো নুসরাত চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেন যা ভালো লাগে না, সেটা তো করতে হবেই।সব কিছু কি মনের মতো চলে?
ইনায়া বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরে দুষ্টু গলায় বলল আমি পড়ালেখা করতে চাই না আমি বাইকার হবো!
বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়াবো।হাওয়া খেতে খেতে
নুসরাত চৌধুরী অবাক হয়ে তাকালেন মেয়ের দিকে
তারপর হালকা হেসে বললেন—
ওহ্ আচ্ছা! তাই নাকি?আর কি কি করবি শুনি?”
ইনায়া চোখে একরাশ জেদ নিয়ে বলল আমি দূরে দূরে চলে যাবো কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।
নিজের মতো করে বাঁচবো কারো কথা শুনবো না…
আর…”
একটু থেমে খুব আস্তে বলল কাউকে আর ভালোবাসবো না কথাটা বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল—
চোখের কোণে জমে থাকা পানি লুকানোর চেষ্টা করছে ইনায়া
নুসরাত চৌধুরী সবটাই বুঝলেন—
কিছু না বলে শুধু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
ঘুমিয়ে পড়…
অনেক রাত হয়েছে…
লাইটটা ডিম করে দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
আর ইনায়া—
অন্ধকারে চুপচাপ শুয়ে রইল…
বাইকার হওয়ার স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে রাখা এক ভাঙা মন
ইনায়ার কিছুতেই ঘুম আসছে না…
বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরেও শান্তি লাগছে না।
মনে মনে হাজারটা গালি দিল ইউভি কে।
“অসভ্য লোক!কি এক বালের অভ্যাস বানিয়ে দিয়ে গেছে চোখ বন্ধ করলেই—
একটাই অনুভূতি বারবার এসে ধাক্কা দিচ্ছে…
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বলল—
ইউভি ভাইয়া… আপনার বুকে আপনাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে চাই তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল ইউভির সেই কথা তোর কি ইচ্ছা করে না আমাকে জড়িয়ে ধরে রাতে ঘুমাতে?”
ইনায়া চোখ বন্ধ করে মুচকি হেসে উত্তর দিল—
“করে খুব ইচ্ছা করে কল্পনার জগতে ডুবে গেল ইনায়া দেখতে লাগল।সারারাত ইউভি তাকে নিজের এক হাতের ওপর রেখে ঘুমিয়ে আছে
একটুও ঢিলা করছে না সেই বাঁধন…
ইনায়া একটু নড়লেই ইউভি আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তারপর খুব আলতো করে কপালে একটা চুমু দেয়…
ইনায়ার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল…
মনে মনে সেই অনুভূতিগুলো আঁকড়ে ধরে রইল—
“ইসস… এভাবে যদি সত্যি হতো।
হঠাৎ আবার মাথায় আরেকটা চিন্তা এলো—
এই সময় যদি একটা মন্টুর দোকানের আইসক্রিম খেতে পারতাম নিজেই বিরক্ত হয়ে বলল—
বাইক থাকলে এখনই চলে যেতাম!রাত হয়েছে তো কি হয়েছে?
বালিশে মুখ গুঁজে বিড়বিড় করে বললো
আইসক্রিম আমার কাছে সবথেকে আগে ভেন্ডির কপাল! এত টাকা দিয়ে কি করবো—
যদি এখন আইসক্রিমই না খেতে পারি!
হঠাৎ ফোনটা হাতে নিয়ে—
ফেসবুকে একটা আইসক্রিমের ছবি দিয়ে পোস্ট করল—
বিয়ের পর জামাই প্রতিদিন আইসক্রিম আর চকলেট না নিয়ে আসলে ঘরে ঢুকতে দিবো না।
পোস্ট দিয়ে আবার বালিশে মুখ গুঁজে হাসল
আমার বর তো তুমি হবা শুধু তুমি আমার শেহেজাদা।
ওই তিয়া আপু কে তোমার জীবন থেকে ফু মেরে উরিয়ে দিব
ইনায়ার হঠাৎই যেন অস্থির লাগতে শুরু করল…
ঘুম আসছে না, বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা কুরে কুরে খাচ্ছে।হঠাৎই কী মনে হলো—
চুপিচুপি দরজা খুলে করিডো দিয়ে বের হলো ইনায়া
চারপাশ নিস্তব্ধ সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। পা টিপে টিপে হাঁটতে লাগল ইনায়া সোজা ইউভির রুমের দিকে দরজার সামনে এসে একবার থেমে গেল। হাতটা কাঁপছে হালকা…
তবুও ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকল।
রুমে ঢুকেই থমকে গেল ইনায়া এই সেই রুম?
যেটা ইনায়া এলোমেলো করে ফেলেছিলো ?
না।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসল ইনায়া
হাত বুলালো বালিশে যেন এখনো ইউভির গায়ের গন্ধ লেগে আছে কিছু মুহূর্তের জন্য শুয়ে পড়ল বিছানায় চোখ বন্ধ করতেই সেই পুরনো অনুভূতিগুলো আবার জেগে উঠল। হঠাৎই উঠে বসল ইনায়া অস্থির লাগছে মনে হচ্ছে কিছু একটা মিসিং।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল রুমের ভেতরের আরেকটা দরজা। এইটা ইনাইয়া আগে ও লক্ষ্য করেছে ইউভির পার্সোনাল রুম…?
কৌতূহলটা আর চেপে রাখতে পারল না ইনায়া।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলল দরজাটা পুরো খুলতেই ইনায়া যেন অন্য একটা দুনিয়ায় ঢুকে পড়ল এটা শুধু একটা রুম না এটা যেন ইউভির ব্যক্তিগত রাজ্য।
মেঝেতে সফট, ডার্ক গ্রে কার্পেট পা রাখতেই যেন শব্দ গিলে ফেলে। চারপাশের দেয়ালগুলো গ্লাস আর ম্যাট ব্ল্যাক কাঠের মিশ্রণ—
লুকানো লাইটিং এমনভাবে সেট করা—
যেন প্রতিটা জিনিস নিজে থেকেই আলো ছড়াচ্ছে…
ডান পাশে পুরো ওয়াল জুড়ে ওয়াক-ইন ওয়ারড্রোব। ইনায়া ঢুকতেই অটোমেটিক লাইট জ্বলে উঠল সাজানো ইতালিয়ান স্যুট, লিমিটেড এডিশন জ্যাকেট ডিজাইনার শার্ট সব রঙ আর ব্র্যান্ড অনুযায়ী সাজানো। নিচে—দামী জুতোর সারি কিছু এখনো একদম নতুন।
বাম পাশে গ্লাস কেবিনেটে ঘড়ির কালেকশন একেকটা যেন আলাদা সম্পদ আরেক কোণে—
মিনিমালিস্ট বারের সেটআপ।ক্রিস্টাল গ্লাস, বিরল কালেকশনের বোতল সবকিছু এত নিখুঁত যেন মিউজতার পাশেই—
হাই-এন্ড গেমিং আর ওয়ার্ক স্টেশন—
তিনটা কার্ভড স্কিন পুরো সাউন্ডপ্রুফ সেটআপ…
আর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো স্পটলাইটে রাখা বাইকার গিয়ার ম্যাট ব্ল্যাক হেলমেট,
কার্বন ফাইবার জ্যাকেট সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে—
শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী শুধু শখে না, প্যাশন নিয়ে বাঁচে ইনায়া ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।চোখে বিস্ময়… সাথে অদ্ভুত একটা ভয়…
আমি… আসলে কাকে ভালোবেসেছি…?”
ঠিক তখনই।তার চোখ পড়ল এক ছোট্ট কর্নারে…
এই জায়গাটা পুরো রুম থেকে আলাদা—
এখানে কোনো দামি জিনিস নেই।শুধু।কিছু ছবি…
কিছু হাতের লেখা কাগজ…
ইনায়া এগিয়ে গিয়ে একটা ছবি হাতে নিল—
আর সাথে সাথেই তার বুক কেঁপে উঠল…
ছবিটাতে সে নিজেই অজান্তে তোলা কিছু মুহূর্ত—
হাসছে, রাগ করছে, দূরে তাকিয়ে আছে…
হাত কাঁপতে লাগল ইনায়ার এইগুলো… সে কবে তুলল…? চোখ ভিজে উঠল আর ঠিক তখনই—
তার চোখে পড়ল একটা স্কার্ফ…
তার নিজের যেটা সে অনেক আগে হারিয়ে ফেলেছিল ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠল—
এই বিশাল, বিলাসবহুল দুনিয়ার মাঝেও একটা ছোট্ট জায়গা শুধু তার জন্য…
চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল—
তার মানে আমার শেহেজাদা আমাকে ভালোবাসে অনেক আগে থেকেই বাহহ বেশ তো আমি ও এতো।সহজে ধরা দিব না
ইউভির একটা শার্ট গায়ে জড়িয়ে—
ইউভির রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।হালকা বাতাসে শার্টটা উড়ছে চুলগুলো এলোমেলো…
মনে হচ্ছে—
এই শার্টটাই যেন ইউভির আলতো ছোঁয়া…
ওদিকে ইউভি গাড়ি ড্রাইভ করছে, ফোন কানে—
“হ্যাঁ রেদোয়ান, ঠিক মতো সেটআপ করে দিস… দ্রুত কর।
ততক্ষণ তোর বোন কে আমি ব্যস্ত রাখি ওকে সালা বাবু এই বলে কল কেটে দিল ইউভি।
বেচারা রেদোয়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে বললো
এইটা গালি দিল নাকি সম্মান করল…? সম্মান ই হবে
ইউভি এবার ইনায়ার ফোনে কল দিল।
ফোনটা বাজতেই ইনায়া খুশিতে লাফাতে শুরু করল! ইইইইই ইউভি ভাইয়া ফোন দিছে।
নাচতে নাচতে ফোন ধরতে গিয়ে—
কল কেটে গেল!
ইনায়া থেমে গেল এই রে… কেটে গেল! এখন কি করি!” ওদিকে—
ইউভি ল্যাপটপের স্ক্রিনে সব দেখছে ইনায়ার এই কাণ্ড দেখে হাসতে শুরু করল এইরকম হাসি—
সে অনেকদিন হাসে না আবার কল দিল ইউভি।
এইবার ইনায়া খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে ফোন ধরল—
“হুম… আছি… বলেন… শুনছি…”
ইউভি হালকা হেসে পড়তে বসিস নাই? আমার রুমে কি করিস? ইনায়া নাটকীয় গলায় বললো।
আমি অসুস্থ ইউভি ভাইয়া… আমি কেমনে পড়বো”
“তুই আমার রুমে গেলি কেমনে?”
ওমনেই…
কেমনে ‘ওমনেই’?
এই তো চলে আসলাম…
কি করছিস আমার রুমে?”
এমনিই আসছি ভালো লাগতেছে না তাই
ইউভি একটু থেমে আবার বললো।
আমার রুমে আসলে ভালো লাগে বুঝি?
ইনায়া আস্তে হ্যাঁ লাগে কেন লাগে শুনি?
জানি না… তবে লাগে
ইউভি হালকা গম্ভীর হয়ে বললো
বাড়িতে কি বলবো? মেয়ে বড় হয়ে গেছে, বিয়ে দিয়ে দাও? ইনায়া হঠাৎ ইউভি কে বাজিয়ে দেখার জন্য দুষ্টুমি করে বলল হ্যাঁ, দিতে বলেন আমি রাজি
পড়ালেখা ভালো লাগে না বিয়ে করবো।
বরের বুকে ঘুমাবো না হলে ঘুম হয় না।
যেমন তেমন হলেও চলবে আপনি আজই বলেন—আমি রাজি!”
ইউভি গাড়ি ব্রেক কষে বললো।কি বললি তুই…? আবার বল আমি রাজি… রাজি… রাজি
ইউভি হাসতে হাসতে বললো।আরবি তে বল…
ইনায়া মজা করে বললো কবুল… কবুল… কবুল…
ওপাশ থেকে হঠাৎ ইউভির কণ্ঠে শোনা গেল।
“আলহামদুলিল্লাহ! কবুল… কবুল… কবুল!
আল্লাহ ওই আল্লাহ শুনছো? আমার আদর আবার আমাকে কবুল বলে গ্রহণ করে নিয়েছে
ইনায়া হতভম্ব এই এই! পাগল হয়েছেন নাকি!
এই কবুল ওই কবুল না! আমি ওইটা বলিনি!”
ইউভি হেসে—
“বউ রেডি হও… বিয়ে শেস বাসর শুরু হবে
ইনায়া রেগে বললো।আপনি ঠকাচ্ছেন আমাকে! ঠকবাজ! আমি মানি না এই বিয়ে!
তালাক! তালাক! তালাক!”
ইউভির কণ্ঠ হঠাৎ ভারী হয়ে গেল
চাচির বেটি ভালো করে শোন—
তুই শুধু আমার… শুধু আমারই থাকবি…
আসলেও… মূলত… তাত্ত্বিকভাবে… বাস্তবেও…
স্বাভাবিকভাবে… শারীরিকভাবে… মানসিকভাবে…
একজনই ওয়ান অ্যান্ড অনলি আমার অসভ্য বউ…
আমার শুধু তোকেই লাগবে…
তোর মতো কার্বন কপি হলেও চলবে না
ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে বললো।
এইসব বন্ধ করুন! আমি চাই না আপনাকে!
ইউভি শান্ত গলায় বললো।
“তুই চাইলে ও আমার… না চাইলে ও আমার।
ভালোবাসি না আপনাকে!
তুই ভালোবাসলে ও আমার… না বাসলেও আমার।
আমি আপনার সাথে কথা বলবো না!
আমি তবুও তোকে ভালোবাসবো।
ইনায়া রাগে আবার বললো
শেহেজাদার আদর পর্ব ২৩
আপনি সবসময় আমাকে রাগিয়ে দেন!”
ইউভি ধীরে বলল কারণ আমি চাই—
তুই যেন রাগের উর্দে আমাকে ভালোবাসিস।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া—
চুপ হয়ে গেল হাওয়ায় উড়তে থাকা শার্টটা বুকের কাছে চেপে ধরল সে চোখে পানি মুছে
ঠোঁটে একটুকরো হাসি এনে বললো
আমার শেহেজাদা
