Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ২৫

শেহেজাদার আদর পর্ব ২৫

শেহেজাদার আদর পর্ব ২৫
সুমাইয়া ইসলাম নূর

রাত অনেক হয়ে গেছে…
ইনায়ার চোখে ঘুম নেমে আসছে ধীরে ধীরে…
ইউভির রুমের বারান্দা থেকে সরে এসে—
ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল ইনায়া
কিন্তু রুমের সামনে এসে হঠাৎ থেমে গেল—
রেদোয়ান দাঁড়িয়ে আছে…
আর তার সামনে দুটো অচেনা ছেলে…
এত রাতে…? চৌধুরী বাড়িতে
বিষয়টা ইনায়াকে কেমন যেন ভাবিয়ে তুলল…
ঠিক তখনই রেদোয়ান ইনায়াকে দেখে বলল—
তোমরা এখন যাও ইন শা আল্লাহ পরে দেখা হবে।
ছেলে দুটো মাথা নাড়িয়ে বলল ঠিক আছে ভাইয়া…”
এই বলে চলে গেল তারা।
রেদোয়ান যখন ইনায়ার দিকে এগিয়ে আসলো—

ইনায়া কোনো কথা না বলে তার পাশ কাটিয়ে সোজা রুমে ঢুকে গেল বেচারা রেদোয়ান দাঁড়িয়ে রইল এখন আমি কার মান ভাঙাই…?
পিহুর নাকি বুনুর ভাইয়া কোই তুমি আমি তোমার বোন কে সামলাই তুমি আমার বোন কে সামলাও। ইনায়া দরজা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে শুতে গেল…
কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল—
পড়ার টেবিলের পাশে একটা ছোট্ট ফ্রিজ!
ইনায়া থমকে গেল এইটা এখানে কে আনলো…?
আর এত ছোট ফ্রিজ কেন…?
কৌতূহল আর সামলাতে পারল না…
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ফ্রিজটা খুলল—
আর খুলতেই ইনায়া যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না ভেতরটা ভর্তি—
আইসক্রিম চকলেট… পুরোটা ঠাসা!
ইনায়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠল কিহহহহ! এটা কীভাবে সম্ভব! দু’হাত দিয়ে নিজের গাল চাপড় দিল ইসস! আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি…?!”

পরক্ষণেই খুশিতে লাফাতে শুরু করল সে!
“ইইইইইই! আইসক্রিম!! চকলেট।
রুমের ভেতরেই ছোট ছোট করে নাচতে লাগল—
একটা আইসক্রিম হাতে নিয়ে—
ঘুরতে ঘুরতে বলল—
“আমার শেহেজাদা আমার সপ্নের শেহেজাদা
আমি জানি এই টা তোমার কাজ
কি রে ভাই! আমার কাছে যে আলাদিনের চেরাগ আছে—আমি তো ভুলেই গেছিলাম
খুশিতে নিজের সাথেই কথা বলতে বলতে এক দৌড়ে বের হয়ে গেল ইনায়া সোজা পিয়াসার রুমের দিকে। দরজাটা একটু ফাঁকাই ছিল ইনায়া উঁকি দিতেই যা দেখল তা একদমই আশা করেনি…
রেদোয়ান দাঁড়িয়ে দুই কান ধরে উঠবস করছে!
আর সামনে পিয়াসা হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে…
মুখে গম্ভীর ভাব, কিন্তু চোখে চাপা হাসি…
ইনায়ার চোখ কপালে—

“কিহহহ! আমার ভাইয়ার এই অবস্থা!
ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল ইনায়া ইসস ভাইয়া তো দেখি পিহুর প্রতি বেশ দুর্বল…
মানুষের ভালোবাসা দেখতে ও ভালো লাগে…
আবার নিজের কথাতেই মন খারাপ হয়ে গেল—
আমার কপালে এসব নাই।চুপচাপ সরে গেল সেখান থেকে আবার নিজের রুমে ফিরে গেল ইনায়া।
এদিকে—
রেদোয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
এইবার তো মাফ কর আর কত উঠবস করবো?”
পিয়াসা ভ্রু তুলে বললো
দেশে আসার পর একবারও জানাওনি কেন?
রেদোয়ান কান চুলকাতে চুলকাতে—

“সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম ওই সারপ্রাইজ আমার দরকার নেই। রেদোয়ান একটু কাছে এগিয়ে এল তাহলে কী দরকার? পিয়াসা মুখ ঘুরিয়ে বললো। সিম্পল—একটা ফোন কল…”
রেদোয়ান হালকা হেসে আস্তে করে পিয়াসার সামনে এসে দাঁড়াল ফোন কলের চেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়া ভালো না? পিয়াসা কিছু বলল না…
শুধু চোখ তুলে তাকাল রেদোয়ান ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরল রাগ করে না জান
তুই রাগ করলে আমার একদম ভালো লাগে না…”
পিয়াসা একটু নরম হয়ে সবসময় এমন করো কেন?রেদোয়ান মুচকি হেসে বললো
কারণ তোর এই রাগটা ভাঙানোর জন্য
আমার বারবার নতুন নতুন কারণ লাগে পিয়াসার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল অভিনয় কম করো।”
অভিনয় না সত্যি এই বলে
আস্তে করে পিয়াসাকে নিজের দিকে টেনে নিল রেদোয়ান পিয়াসা প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও—
পরক্ষণেই চুপচাপ মাথা রাখল তার বুকে…
রুমটা নিঃশব্দ শুধু দু’জনের নিঃশ্বাসের শব্দ…
রেদোয়ান ফিসফিস করে বলল মিস করেছি তোকে অনেক
পিয়াসা চোখ বন্ধ করে খুব আস্তে উত্তর দিল—
“আমিও

ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে চৌধুরী বাড়িটা আজ যেন অন্যরকম প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
আজ নতুন জামাই-মেয়ে আসবে—
কথাটা মাথায় রেখেই ভোর থেকেই পুরো বাড়িতে তোরজোড় আয়োজন চলছে। রান্নাঘরে ব্যস্ততা—
একদিকে রেসমা চৌধুরী আর কাজের লোকেরা নাস্তার আয়োজন করছে চারপাশে এক উৎসব উৎসব গন্ধ…
যেন পুরো চৌধুরী বাড়িটা আজ আনন্দে নিশ্বাস নিচ্ছে।
সকালে সবাই একসাথে নাস্তা করছে।
লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবুল চৌধুরী আর রেদোয়ান—
সবাই দুপুরের আগে অফিসে যাবে।
কারণ বিকেলের মধ্যেই রিমঝিমরা চলে আসবে আবার।
এইদিকে—
ইনায়া আর পিয়াসা সকাল থেকেই বায়না ধরেছে—

“আজ কলেজে যাবো না ফুপিমণি রা আসবে
কিন্তু কে শোনে তাদের কথা! ঠিক তখনই—
রেসমা চৌধুরী হাতে গরম খুন্তি নিয়ে হাজির হলেন
“কলেজে যাবি না মানে?
তুই যাবি সাথে তোর বাপও যাবে! লিখন চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন।আমি অফিসে যাবো মা!
তুই কলেজে যা… না হলে তোর সাথে আমাকেও যেতে হবে! এমনিতেও তোদের পড়ালেখায় অনেক গ্যাপ যাচ্ছে। ভালো মেয়েদের মতো খেয়ে-দেয়ে দুটায় কলেজে যাবি।
এই বলে হঠাৎ নিজের পকেট থেকে একটা বাইকের চাবি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন তিনি।
ইনায়া খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করল কার চাবি এইটা বড় চাচ্চু? লিখন চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন—
তোমার। ইনায়া প্রথমে “ওহ…” বলে আবার খেতে লাগল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই—

হঠাৎ পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল—
“কিহহহহহ!!! আমার বাইক। লিখন চৌধুরী হাসি চেপে বললেন জি আম্মাজান। ব্যাস!
ইনায়া দৌড় দিল গার্ডেনের দিকে!
পেছন থেকে নুসরাত চৌধুরী চিৎকার কর বললেন
হাত তো ধুয়ে যা! কিন্তু কে শোনে কার কথা!
ইনায়া নিজের জামায় হাত মুছতেই মুছতেই দৌড় দিল। তার অবস্থা দেখে পুরো বাড়ির সবাই হেসে উঠল।
লিখন চৌধুরী এবার পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললেন তো আম্মাজান, আপনার কোনো ইচ্ছা আছে?”
পিয়াসা মুচকি হেসে বলল একবার রেদোয়ান এর দিকে তাকিয়ে বললো আমার একটা ইচ্ছাই আছে বাবা সময় হলে চেয়ে নিবো। লিখন চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন ঠিক আছে। খাওয়া শেষ করে সবাই গার্ডেনে গেল।
গিয়ে দেখে—

ইনায়া বাইকের চারপাশে গোল গোল ঘুরছে!
খুশিতে যেন পাগল হয়ে গেছে মেয়েটা।
রেদোয়ান ইউভি কে ভিডিও কলে দেখাচ্ছে ঘুম ঘুম চোখে মন ভরে দেখছে তার আদর এর হাসি
ঠিক তখনই—
আয়াত আর আতিকা দৌড়ে এলো আপি! আমাকে নিয়ে চালাও! ইনায়া এক মুহূর্ত দেরি না করে—
দু’জনকে নিয়ে আস্তে আস্তে গার্ডেনেই বাইক চালাতে লাগল। এইদিকে রিদ মুখ ফুলিয়ে বলল—
আমাকেও একটু নেও আপি ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বাইক থামিয়ে বললমপারবো না রে !
এই বাইকে আমি কোনো ছেলে মানুষ বসাবো না!
সে আমার ভাই হলেও না!।তারপর চোখ ছোট করে বলল এমনিতেও তুই তো আমার ভাই না…
তোকে মা এতিমখানা থেকে কুড়িয়ে আনছে!
রিদ নাটকীয়ভাবে বুক চেপে ধরল আহ! মিথ্যাবাদি
রিধ রেগে বললো।

“আর তোমাকে তো তোমার প্রিয় মন্টুর দোকানের পেছনের ময়লার পুকুর থেকে তুলছে।
এইজন্যই সারাদিন ‘মন্টুর দোকান, মন্টুর দোকান’ করো!
সবাই আবার হেসে উঠল। রিদ এবার বুক ফুলিয়ে বলল যাই হোক! আমিও কিন্তু বাইক কিনবো।
তখন এই রিদ চৌধুরীও একজনকে নিয়ে ঘুরবো…
শুধু রাজি হয়ে যাক! পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে কান টেনে বলল ওই একজন কে শুনি?”
রিদ লজ্জা পেয়ে শাহরুখ খানের মতো চুলে হাত বুলিয়ে বলল সময় হলে বলবো আপু…
মাএ তো শুরু করছি ওর কথা শুনে বাড়ির সবাই হাসতে হাসতে শেষ। রবিুল চৌধুরী মজা করে বললেন বাহহ! চৌধুরী বাড়ির ছেলেরা তাহলে সবাই প্রেমিক পুরুষ! রাতিব চৌধুরী হেসে বললেন—
দেখতে দেখতে সবার জীবনেই প্রেম চলে আসছে…”
এইদিকে—

ইনায়া আবার দৌড়ে এসে লিখন চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরল। থ্যাংক ইউ চাচ্চু!
লিখন চৌধুরী মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
আমার কিন্তু কিছু শর্ত আছে নূর ইনায়া চোখ বড় বড় করে কি শর্ত?”
এই বাইক তুমি কলেজে নিয়ে যেতে পারবে না।
বাইক জোরে চালাবে না।
আর সবসময় চোখ-কান খোলা রেখে চালাবে।
তারপর হঠাৎ গলা একটু ভারী হয়ে গেল তাঁর।শুনে রাখ মা এই বাইকের জন্য যদি তুই কোনোদিন আঘাত পাস—
তাহলে ওইদিনই হবে তোর বাইক চালানোর শেষ দিন।”
লিখন চৌধুরীর কথাগুলো শুনতেই—
হঠাৎ ইউভির বলা কথাগুলোও কানে ভেসে উঠল ইনায়ার—
শোন আদর…
তোর কোনো স্বপ্নে আমি বাধা দিবো না…
কিন্তু তোর স্বপ্নের জন্য যদি আমার আদর ব্যথা পায় তাহলে ওইদিন থেকেই তোর ওই স্বপ্নটা শেষ…”
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল…
তারপর ধীরে ধীরে বাইকের ওপর হাত রাখল…
ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল
মনে থাকবে।

আজ ইনায়াদের দেরি হয়ে গেছে খুশিতে ভুলেই গিয়েছিল আজ কলেজে যেতে হবে কলেজের সামনে এসে রিকশা থামতেই—
ইনায়া আর পিয়াসা তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়ল।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাত গুটিয়ে আগুন চোখে তাকিয়ে আছে তুবা।
মনে হচ্ছে একটু স্পর্শ দিলেই বোম ব্লাস্ট হবে
ইনায়া দূর থেকেই দাঁত বের করে হাসল—
“এ মা! অনেক দেরি হয়ে গেছে বুঝি?
পিয়াসা মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল সালা মাঠের দিকে তাকাইয়া দেখ কেউ নাই…
সবাই ক্লাসে ঢুকে গেছে! তুবা এখনো কিছু বলছে না দেখে ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে তুবার গাল টেনে বলল—
বিশ্বাস কর বেবি আমাদের কোনো দোষ নাই
তারপর নাটকীয়ভাবে রিকশার দিকে আঙুল তুলে বললো ওই রিকশাওয়ালা কাকু চালাইতে পারে না!”
তুবা রাগী গলায় বলল হ্যাঁ! সে দেখতেই তো পেলাম! চালাইতে পারে না বলেই পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে তোদের নিয়ে আসলো!

ব্যাস!পিয়াসা “হিহিহি” করে হেসে দিল।
ইনায়াও হাসতে হাসতে বলল—
“কাকুরে দোষ দিস না উনি জীবনে এত ভারী পাগল একসাথে বহন করে নাই! তাই ধীরে ধীরে চালিয়েছি।
আজ প্রথমেই টাকলা হেডুর ক্লাস আছে মনে আছে কী? ওরে বাবারে বলেই ইনায়া দুজনের হাত ধরে দিল এক দৌড় তিনজন দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লাসরুমের সামনে এসে থামল।
ভেতর থেকে টাকলা হেডু স্যারের গম্ভীর গলা ভেসে আসছে স্টুডেন্ট লাইফ ইজ নট এ জোক!
ইনায়া দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে ফিসফিস করে বলল কিন্তু স্যার নিজেই তো পুরো কমেডি শো।
তুবা হাসি চেপে দেয়ালে মাথা ঠুকল।পিয়াসা কাঁপা গলায় বলল তোরা প্লিজ আজকে একটু চুপ থাকিস বাল এমনিতেই পড়া যানি না।
ইনায়া বুক ফুলিয়ে বললো।
“আমরা অত্যন্ত ভদ্র তুই বালের চিন্তা বাদ দে ঠিক তখনই বাইরে কে?
তিনজন একসাথে লাফিয়ে উঠল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পুরো ক্লাসের সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর সামনে—

টাকলা হেডু স্যার দুই হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে…
মাথার টাকের ওপর টিউবলাইটের আলো এমনভাবে পড়ছে মনে হচ্ছে full moon উঠছে।
ইনায়া নিচু গলায় বলল স্যারের মাথায় ডিরেক্ট সৌরবিদ্যুৎ জলে
পিয়াসা সাথে সাথে কনুই দিয়ে গুতা মারল—
চুপ কর। স্যার চোখ ছোট করে বললেন—
এত দেরি কেন?
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বুকের ওপর হাত রাখল স্যার রাস্তা ছিল ভয়ংকর।
“মানে?”
রিকশাওয়ালা কাকু আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আনছে ভাঙ্গাচুরা রাস্তা তো তাই। তুবা সাথে সাথে বললো
“জি স্যার!একসময় তো উনি নিজেই রিকশা ঠেলতেছিলেন। এই মেয়ে তুমি চুপ করবা চৌধুরী বাড়ি থেকে কলেজে আসতে ভাঙ্গা রাস্তা কোই পাইলে। ইনায়া বললো নাই বুঝি।
পুরো ক্লাসের সবাই ইনায়ার কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়লো স্যার টেবিলে স্কেল চাপড় দিলেন—
সাইলেন্স! স্যার এবার তুবার দিকে তাকালেন—
তুমি হাসছো কেন? তুবা সিরিয়াস মুখ করে—

“স্যার… দুঃখ লুকানোর চেষ্টা করছি
কিসের দুঃখ?
জীবন নিয়ে স্যার…
ইনায়া পেছন থেকে ফিসফিস করল আর আপনার ক্লাস নিয়ে। স্যার রেগে বললেন এই মেয়ে কিছু বললে। ইনায়া আমতা আমতা করে বললো না স্যার।
স্যার এবার খাতা খুলে বললেন ঠিক আছে। নেক্সট টাইম থেকে আর দেরি করবে না। যাও জায়গায় গিয়ে বসো পড়া ধরবো।
ব্যাস। তিনজনের আত্মা বের হয়ে গেল।
স্যার বললেন বলো ইনায়া চৌধুরি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ কী?
ইনায়া আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াল স্যার মূল কারণ ছিল মানসিক চাপ।
স্যার চশমা নামিয়ে বললেন—
কি???

ইনায়া যুক্তি দেখিয়ে বলল এত বড় সাম্রাজ্য সামলানো easy না স্যার চিন্তা টেনসনে মানসিক চাপে সে হেরে যাই।
ইবার পুরো ক্লাসের সবাউ বেঞ্চ চাপড়ে হাসতে লাগল। ইনায়ার কথাই
স্যার রাগে লাল হয়ে বললেন তুমি কি আমাকে ফাজলামি শিখাচ্ছ?
ইনায়া মাথা নেড়ে বললো
না স্যার আপনি তো অলরেডি এক্সপার্ট।
পিয়াসা ফিসফিস করে বললো এই লেওরার জন্য
আজকে আমরা বাঁচবো না।
ঠিক তখনই হঠাৎ সিলিং ফ্যান “কট কট” শব্দ করতে লাগল।
ইনায়া উপরে তাকিয়ে বলল স্যার… ফ্যানটাও আপনার উপর রেগে গেছে মনে হয়।
স্যার এবার সত্যি সত্যি চিৎকার করে উঠলেন—
গেট আউট! তিনজনই বের হও।
ব্যাস!
আবার তিনজন ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে
ইনায়া দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল—

আমি নিশ্চিত স্যার ছোটবেলায় প্রেমে ছ্যাঁকা খাইছিল তুবা গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল—
“হ্যাঁ… তারপর থেকেই মানবজাতির উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে।
পিয়াসা আর হাশি ধরে রাখতে না পেরে হো হো করে হেসে দিল।
তিনজন করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে।
ইনায়ার চোখে আগুন। তুবা দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে হবে
পিয়াসা ভয় পেয়ে বললো তোরা আবার কি বাল। করবি?
ইনায়া ধীরে ধীরে বলল অপারেশন টাকলা হেডু।
কলেজ ছুটি হওয়ার পর—

তিনজন চুপিচুপি পার্কিং এরিয়ার দিকে গেল।
চারপাশ একদম ফাঁকা দূরে শুধু ফ্যানের ঘররর শব্দ আর কাকের ডাক শোনা যাচ্ছে।
ইনায়া চোখ ছোট করে সামনে তাকাল—
টার্গেট সামনে দূরে দাঁড়িয়ে আছে টাকলা হেডু স্যারের সেই প্রিয় বাইক। তুবা হাত কচলাতে কচলাতে বলল আজকের অপমানের প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বো! পিয়াসা কাঁপা গলায় বললো
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আজকে আমরা ধরা খাবো।
ইনায়া কপাল চাপড়াতে চাপরাতে বলল ভেন্ডির কপাল না হলে কি তোর মত বোন প্লাস ননদ আবার বান্ধবী আমার কপালে জোটে।
ইনায়া ব্যাগ থেকে সুইংগামের প্যাকেট বের করল।
তুবা আবেগ নিয়ে বলল জাতি আজ তোকে মনে রাখবে বেবি।
তারপর তিনজন হাঁটু গেড়ে বসল বাইকের পাশে।
ইনায়া মন দিয়ে সুইংগাম লাগাচ্ছে তুবা একের পর এক খুলে দিচ্ছে আর পিয়াসা পাহারা দিচ্ছে।
তাড়াতাড়ি কর! কেউ আসলে কিন্তু আমি একাই দৌড় দিবো! ঠিক তখনই—
তুবা হঠাৎ ভুল করে বাইকের হর্নে চাপ দিয়ে ফেলল।
“পিপিপিপিপিপি!!!!”

তিনজন জমে গেল যেন ইনায়া ফিসফিস করে বললো তুই কি মানুষ?
পিয়াসা প্রায় কেঁদে ফেললো বলেছিলাম আমি ওরে আমার ময়েন রে তোমার পিহু আজ শেষ
শেষ… আজকে আমাদের জীবন শেষ।
ঠিক তখনই—
দূর থেকে দারোয়ানের গলা ভেসে এলো—
এইই! কে ওখানে? ব্যাস।
তিনজন একসাথে লাফ দিল পাশের গাড়ির আড়ালে লুকাতে। কিন্তু তাড়াহুড়োতে ইনায়া গিয়ে পড়ল তুবার আর পিয়াসা পড়ল ইনায়ার উপর
তিনজন একটার ওপর একটা স্যান্ডউইচ হয়ে পড়ে আছে।
তুবা চাপা গলায় বললো আমার পাঁজর গেল
ইনায়া নিচ থেকে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো
আমার মনে হয় আমি মরে গেছি
পিয়াসা উপরে পড়ে থেকেও ফিসফিস করে বলল—

চুপ!
দেশের জন্য কষ্ট সহ্য করতে হয়।
দারোয়ান এদিক ওদিক তাকিয়ে এগিয়ে আসছে…
তিনজন নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে আছে।
ঠিক তখনই তুবার নাকে সুইংগামের গন্ধ ঢুকে হাঁচি চলে এলো।
হাঁচ্ছশশশু।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে তুবার মুখ চেপে ধরল—
চুপ! তুই পুরো জাতির সর্বনাশ!
দারোয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করল—
“বিড়াল হবে মনে হয়।এই বলে চলে গেল।
ব্যাস!
তিনজন একসাথে “হুহহ করে নিঃশ্বাস ছাড়ল।
তুবা নিচ থেকে বলল।আগে আমার ওপর থেকে নাম তারপর দেশ বাঁচাইস দারোয়ান চলে যেতেই—
তিনজন ধীরে ধীরে গাড়ির আড়াল থেকে বের হলো। তুবা নিজের জামা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল।
“আজকে আমি বুঝছি… অপরাধ জগত আমার জন্য না ইনায়া গম্ভীর হয়ে বললো
মহান মানুষদের শুরুতে কষ্ট সহ্য করতে হয়।
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে বললো। তুই আর মহান?
তুই তো সুইংগাম সন্ত্রাসী!
ঠিক তখনই—

হঠাৎ কলেজের ভেতর থেকে টাকলা হেডু স্যারের গলা ভেসে এলো আমার বাইক কে সরাইছে?
তিনজন জমে গেল ভয়ে ইনায়া ধীরে ধীরে বলল—
আমরা কি বাইক সরাইছিলাম?
তুবা কাঁপা গলায় বললো না তো পিয়াসা চোখ বড় বড় করে বললো ওরে ল্যাওড়া রে তাহলে বাইক গেল কোথায়?
তিনজন ধীরে ধীরে উঁকি দিল—
আর তারপর—
হাহাহাহাহাহাহা!
টাকলা হেডু স্যারের বাইকটা কয় একটা ছাগল চাটছে! পুরো সিট ভর্তি সুইংগাম দেখে—
ছাগলগুলো মজা করে চিবাচ্ছে। তুবা দেয়ালে মাথা ঠুকে বলল।ইয়া আল্লাহ ছাগলও আজকে রিভেঞ্জ নিচ্ছে।
ঠিক তখনই—
ছাগলটা হঠাৎ বাইকের হ্যান্ডেলে মাথা ঠুকল।
পিপিপিপিপি! পুরো কলেজ আবার কেঁপে উঠল।
আর ছাগলগুলো ভয় পেয়ে
সোজা বাইক ফেলে দৌড় দিল বাইক একদিকে…
ছাগলগুলো আরেকদিকে টাকলা হেডু স্যার দূর থেকে দৌড়াচ্ছেন—
“আমার বাইইইক!!!
ইনায়া হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল।
আমি আমি আর পারতেছি না তুবা পেট চেপে হাসছে
“ছাগলগুলো পর্যন্ত স্যারকে সহ্য করতে পারে নাই।
ছাগলগুলো আবার ফিরে এসে—

সোজা টাকলা হেডু স্যারের পেছনে দাঁড়াল।
স্যার ঘুরে তাকাতেই—
“ম্যাঁআআ!”
স্যার এমন লাফ দিলেন চশমা উড়ে গিয়ে ঝোপে পড়ল।
ব্যাস!
তিন সয়তান এবার সত্যি সত্যি মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল হাসতে হাসতে।
টাকলা হেডু স্যার নিজের চশমা ঝাড়তে ঝাড়তে রাগে ফুঁসছেন। পেছনে ছাগলটা আবার “ম্যাঁআআ” করে ডাক দিল।
স্যার রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন এত নামকরা একটা কলেজ!।কিনা কোনো দায়িত্ববোধ নাই!
চারপাশে সবাই চুপ হয়ে গেল যেন
স্যার আরও রেগে বললেন—

“ছাগল আসলো কেমনে কলেজে?।
কলেজের দারোয়ান মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল
“স্যার… ছাগলটা সম্ভবত গেট দিয়া ঢুকছে।
স্যার চিৎকার করে উঠলেন গেট দিয়া ঢুকছে মানে?
আমি কি বলছি ছাগল দেয়াল টপকাইয়া আসছে?দাঁড়াও তোমাদের ব্যবস্থা করতেছি।
চল আমাদের যা করার হয়ে গেছে।
“চল, আজ আমরা হেঁটে হেঁটেই বাড়ি যাব বৃষ্টিতে ভিজবো।
ঠিক তখনই পিয়াসার ফোনে কল এলো।
পিয়াসা একটু পাশে গিয়ে ভিডিও কল রিসিভ করল স্ক্রিনে মুখটা শান্ত, কিন্তু চোখে অস্থিরতা কাও কে দেখার অস্থিরতা।
কিন্তু কেউই বুঝতে পারলো না
ইনায়া তুবা আর পিয়াসা কলেজ থেকে বের হয়ে রাস্তায় হেঁটে চলছে। পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরল ফিসফিস করে বলল—
“বেবি কি যে শান্তি লাগছে এই হেডুর অবস্থা দেখে।
এই আনন্দের মাঝেই পিয়াসা হঠাৎ রেগে বলল—
“বৃষ্টিতে ভিজো।তারপর দুইদিন পর পর আপনাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াই।
তোর চিন্তায় বাড়ির সবাই পাগল হয়ে যায়!

আর আমার ভাইটা…সে তো দূরে থেকেও তোর চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে! শুধু পেশার দাও আমার ভাইকে।
ইনায়া চোখ ছোট করে বললো এই বালের ননদ, চুপ কর! আমি তো তোর ভাইকে কখনো পেসার দিইনি!
সালা তো ধরাই দিচ্ছে না আইছে ভাইয়ের হয়ে শালিস করতে
ঠিক তখনই হঠাৎ ইনায়ার ফোনে ম্যাসেজ এলো।
সে ফোন হাতে নিয়ে দেখে লাগবে নাকি সুইটহার্ট
ইনায়া একটু থেমে গেল নামটা দেখে চোখ নরম হয়ে এলো বালের সেইহজাদা।
ইনায়া রাস্তায় একটা বেঞ্চে বসে পড়ল।
পিয়াসা পাশে দাঁড়িয় বললো কি হলো ইনায়া বললো
একটু অপেক্ষা কর… আমার একটা ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে।
ইনায়া চুপচাপ ম্যাসেজটা পড়েতে।লাগলো
কিন্তু এবার আর ধৈর্য রাখতে পারল না।
ইনায়া লিখল
যদি বলি লাগবে চলে আসবেন এখনি ।
ইউভির উত্তর দিলে না।

সেইটা এই মূহুর্তে পারবো না। I’m really sorry, আদর একটা important কাজে আটকে গেছি… আমার লাইফের সবচেয়ে বড় important কাজ।”
ইউভি ভাইয়া, আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?
ইউভির উত্তর এলো না বাসি না।
ইনায়া আবার লিখল—
“ভালো না বাসলে এত যত্ন কেন করেন কেন ?
আমার সব ইচ্ছা প্রকাশ করার সাথে সাথে পূরণ করেন কেন?
বরের দায়িত্ব পালন করি বউটা যতই বেয়াদব হোক অসভ্য হোক বউটা তো আমারি। আমি যত্ন করব না তো কে করবে।
ঠিক আছে বলা লাগবে না কিছু শুধুই দূরত্বটা কমিয়ে দিন।
“এই দূরত্বটা কমিয়ে দেন না ইউভি ভাইয়া…”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইউভি রিপ্লাই দিল—
“আদর…

তোর আর আমার দূরত্ব সূরা বাকারার মতো দীর্ঘ…
কিন্তু আল্লাহ চাইলে একদিন এই দূরত্ব সূরা কাউসারের মতো ছোট হয়ে যাবে…
সূরা আর-রহমানের মতো মধুর হবে…
সূরা ইয়াসিনের মতো শক্তিশালী হবে…
সূরা আদ-দুহার মতো উজ্জ্বল হবে…
ইনশাআল্লাহ…

শেহেজাদার আদর পর্ব ২৪

কিছুদিন ধৈর্য ধর… আমি আসছি আদর।”
ইনায়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল…
ঠোঁট কাঁপছে… চোখ বন্ধ করে সে ফোনে হালকা চুমু দিল।
এইদিকে ইউভি পিয়াসার পোনে ভিডিও কলে সব দেখছে সে মুগ্ধ হয়ে দেখছে

শেহেজাদার আদর পর্ব ২৬