ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২০
ছায়া
তালুকদার ভিলায় আজ সকালটা অন্যরকম ঝলমলে সকালের সোনালী আলোয় ছুঁয়ে গেছে গাছের পাতা, তবুও তালুকদার ভিলায় তখন থেকেই সাজসজ্জার মহা ব্যস্ততা।
চারপাশে ফুলের মালা, বেলুন, রঙিন ফিতা, আর গন্ধরাজের মিষ্টি সুবাসে ভরে গেছে। কারণ আজ পরির হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজন আসবে। আর রায়েদ তো সকাল থেকেই যেন পুরো বিয়ের ম্যানেজার মোডে আছে। ইলা ব্যালকনি থেকে নিচে তাকিয়ে দেখছে রায়েদ নিজ হাতে ফুল সাজাচ্ছে গেটের ওপরে আবার একটু পরেই কারিগরদের নির্দেশ দিচ্ছে,
রায়েদঃ- আরে ভাই লাইটগুলো সমান করে লাগাও এইদিকে ক্যামেরা ফোকাস পড়বে বুঝছো?
ইলা হালিমাকে নিয়ে নিচে গেলো রায়েদের কাছে হালিমা রায়েদকে হেসে বলল,
হালিমাঃ- ভাইয়া আপনি বোধহয় ওয়েডিং প্ল্যানার রায়েদ তালুকদার হয়ে গেছেন।
রায়েদঃ- অবশ্যই কারণ আমার কাজিনের বিয়ে মানে রাজকীয় আয়োজন হবে। আর হ্যাঁ আজ কিন্তু ‘গ্র্যান্ড ওয়েলকাম’ পারফরমেন্স আমি নিজে লিড করব।
ইলা হালিমাকে সরিয়ে দিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
ইলাঃ- মানে কি তুমি নাচবে নাকি?
রায়েদঃ- নাচবো গাইবো চাইলে মাইক্রোফোন ফাটিয়ে বক্তৃতাও দিবো আজ হবু জামাইকে ইমপ্রেস করতেই হবে।
হালিমা মুখ ঢেকে হেসে ফেলল ঠিক তখনই সাবিহা নিচ থেকে ডেকে উঠলেন
সাবিহাঃ- ইলা মা পরির ঘরে যা তো ওর সাজগোজ শেষ হলো কিনা দেখ,ছেলে পক্ষ সকাল দশটার মধ্যেই পৌঁছে যাবে
ইলা হালিমা চলে গেলো পরির রুমে রায়েদ সব কিছু দেখা শুনা করছে বাড়ির মহিলারা রান্নার কাজে ব্যস্ত।
Time skip:
সময় সকাল ৯:৩০ তালুকদার ভিলার সামনে রঙিন গেটের ওপরে বড় হরফে লেখা “WELCOME KHAN FAMILY”
রাস্তায় ফুল ছড়ানো দুপাশে সারিবদ্ধ করে দাঁড়ানো গ্রামের বাচ্চারা হাতে ফুলের ঝুড়ি।দরজার পাশে রায়েদ সাদা শার্ট হালকা নীল ওয়েস্টকোট, কালো সানগ্লাস পরে দাঁড়িয়ে আছে একদম সিনেমার হিরো মোডে।
ঠিক তখনই দূর থেকে শোনা গেল গাড়ির হর্ন। চারটি কালো গাড়ির কাফেলা ধীরে ধীরে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো।প্রথম গাড়ির দরজা খুলে নামলো এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক পরনে অফ-হোয়াইট পাঞ্জাবি,হাতে হালকা সোনার বেসলেট, মুখে গাম্ভীর্য। তিনি হলেন মোশাররফ খান পরির হবু শ্বশুর। তার পাশে নেমে এলেন মার্জিত হাসি মুখে এক পরিমিত সৌন্দর্যের নারী শায়লা খান পরির হবু শাশুড়ি।
সবাই সবাইকে সালাম অভ্যর্থনা হাসি দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে তবুও চোখ সবার এক জায়গাতেই আটকে গেল। শেষ গাড়ি থেকে নামলো লম্বা এক যুবক বয়স সর্বোচ্চ ২৮ পরনে সাদা শার্টের ওপর কালো ব্লেজার হাতে ঘড়ি,চোখে হালকা কালো সানগ্লাস। চুলগুলো একটু এলোমেলো কিন্তু সেই এলোমেলো তেই তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সামান্য দাড়ি মুখে ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস শরীরটা একদম জিমফিট হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে হেটে আসছে হাঁটার সময় তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মাটির সাথে আলাদা এক ছন্দে পড়ে সে হচ্ছে পরির হবু জামাই আদিব খান। রায়েদ মুখ নিচু করে দুষ্টুমি করে হেসে বলল,
রায়েদঃ- এইটা কি বর নাকি কানাডার কোনো মডেল?
ইলা তো পুরা অবাক কারণ ছবির থেকেও বাস্তবে পরির জামাই বেশি সুদর্শন ইলা পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,
ইলাঃ- হুঁ পরির তো ভাগ্য খুলে গেলো একেবারে।
হালিমাঃ- এই লোকটার ঠান্ডা চোখে এমন কিছু আছে। যেন ভয়ও লাগে আবার তাকিয়ে থাকতে মনও চায়।
রায়েদঃ- আহা আপনি আবার প্রেমে পড়ে যাবেন না যেনো এটা আমার বোন জামাই।
ঠিক তখনই পরি উপর থেকে নিচে এলো মুখে হালকা মেকআপ,গায়ে মিষ্টি রঙের জামদানি শাড়ি কানে মুক্তোর দুল
চোখে কাজল মুখে হাসির ঝিলিক।
রায়েদ মৃদু হাসলো তারপর হঠাৎ গিটার হাতে নিয়ে গিটার বাজানো শুরু করলো বাতাসে সুর ছড়িয়ে গেলো টন বাজছে “Tere ghar aya main aaya tujhko lene” সবাই থমকে গেলো মুহূর্তেই সবার চোখ রায়েদের দিকে। আর অন্য দিকে আদিব হেসে সামনে এগিয়ে এলো রায়েদ গিটার বাজাচ্ছে বাজাচ্ছে আর আদিব গান ধরলো তার কণ্ঠে মিশে আছে লজ্জা ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসের সুর।
~~~~~~Tere ghar aaya
main aaya tujhko lene
Dil ke badle mein
dil ka nazrana dene
Meri har dhadkan
Kya bole hai
sun, sun, sun, sun
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে পরির গাল হালকা লজ্জার লাল আভা দেখা দিয়েছে।আদিব পরির কাছে চলে আসল।
আদিব পরিকে দেখে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো।তার ঠোঁটের কোণে হালকা এক হাসি ফুটে উঠলো।একটা বিনম্র অথচ গভীর দৃষ্টি যা আশেপাশের সবাই লক্ষ্য করলো।
অন্যদিকে এক মুহূর্তে সময় যেন থেমে গেল হালিমা আর ইলা দুজনেই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
ইলাঃ- পরির জামাই তো বেশ রোমান্টিক দেখছি।
হালিমাঃ- ইস আমার কপালেও যদি এমন কেউ আসতো।
ইলাঃ- তুই চাইলে হয়তো কেউ গিটার হাতে তোকে খুঁজে নেবে একদিন।
হালিমা চুপ করে গেল চোখ নামিয়ে নিচু স্বরে বলল,
হালিমাঃ- আমার জন্য এমন সুর হয়তো কারও ভেতর নেই।
তাসলিমা, রুকশানা,সাবিহা এসে অতিথিদের অভ্যর্থনা করলেন।
সাবিহাঃ- আসেন ভাই এতদিন পর অবশেষে দেখা হলো।
শায়লা খানঃ- আলহামদুলিল্লাহ আমার হবু বউমা কে দেখার জন্য আমি অস্থির হয়ে ছিলাম। পরির কথা শুনেই মন ভরে গেছে আমার।
ইলাঃ- আন্টি আপু আসলে পুরো বাড়ির লাডলি।
রায়েদঃ- এখন কিন্তু আমি দায়িত্ব নিচ্ছি হবু জামাইয়ের গ্র্যান্ড ওয়েলকামের সবাই তৈরি তো?
ড্রাইভার থেকে শুরু করে কেয়ারটেকার পর্যন্ত সবাই তাকিয়ে আছে রায়েদের দিকে। রায়েদ হঠাৎ গিটার হাতে নিয়ে এক্সাইটেডভাবে গাইতে শুরু করল ” একটা ওয়েলকাম সং গাইলো ” গান শেষ হতেই বাচ্চারা ফুল ছিটালো চারপাশে করতালির শব্দ আর আদিব খান ঠান্ডা হেসে বলল,
আদিবঃ- I have never got such a royal welcome before impressive
রায়েদঃ- এটাই তালুকদার ভিলার স্টাইল ভাই
হালিমাঃ- ভাই নাকি হবু শ্যালক সেটা বোঝা মুশকিল।
ইলাঃ- এই লোকটা সত্যিই পরির জন্য পারফেক্ট।
ওয়েলকাম শেষ করে সবাই নাস্তা শেষ করে গেস্টহাউজে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে।তালুকদার বাড়ি এখন একেবারে নিঃস্তব্ধ শুধু দূরে পাখির ডাক আর ভেতরে রান্নাঘরে হাঁড়ির টুংটাং শব্দ। ইলা আর হালিমা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল
ইলাঃ- চল পরির রুমে যাই দেখি হবু কনে এখন কেমনে ঘুমায়।
হালিমাঃ- তুই কি বলিস ও এখন ঘুমায় আরে এখন তো উনি প্রেমে ভাসছেন ঘুম আসবে কই থেকে?
দুজনেই হেসে চুপিচুপি পরির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ভেতর থেকে পরির গলা শোনা গেল পরির তার মা কে বলছে
পরিঃ- কেউ আসলে বলবা আমি ঘুমাচ্ছি।
পরির মা বের হচ্ছিলো আর ইলা দরজা ঠেলে ঢুকেই বলল
ইলাঃ- এই যে ঘুমন্ত রাজকন্যা হবু জামাইর গান শুনে এখন ঘুমের দেশে যাচ্ছিস সেটা হতে দিবো না।
পরিঃ- আর লজ্জা দিস না এমনি তখন অনেক লজ্জা পাইছি সবাই কিভাবে দেখছিলো।
হালিমাঃ- দেখুক না আমিও চাই কেউ এভাবে এসে আমার জন্য গান গাক ‘Tere ghar aya…’
ইলাঃ- তোর জন্য কেউ গাইবে “Tere ghar gaya” গেট বন্ধ মিলা।
হালিমা বালিশ তুলে ছুঁড়ে মারলো ইলার দিকে আর পরি হাসতে হাসতে বিছানা থেকে গড়িয়ে পড়লো।
পরিঃ- তোরা দুইজন একটা ঝামেলা বিয়ের একটু ঘুমাতে দে না হলে সাজ সব কিছু নষ্ট হবে দেখতে ভালো লাগবে না।
ইলাঃ- তুই তো এমনিতেই হিরোইন আর বেশি সাজা লাগবে না কিন্তু একটু বল তো তোর জামাই যখন গান গাইল তোর হার্টবিট কত ছিল?
পরিঃ- সত্যি বলবো মনে হচ্ছিল আমি কোনো সিনেমার শুটিং এ আছি চারপাশে লাইট, সুর, আর আমি নায়িকা।
হালিমাঃ- তোর নায়কের নাম কী রাখবো তাহলে ‘গান-বাজা সেনগুপ্ত’
তিনজন হাসিতে ফেটে পড়লো হাসির মধ্যে হালিমা হঠাৎ বলল,
হালিমাঃ- ইস ইলা তোরও যদি এমন কেউ থাকতো তাহলে আমরা ডাবল কনফারেন্সে রোমান্স আলোচনা করতাম।
ইলাঃ- আমার জীবনে এখন কনফারেন্স না শুধু রহস্য চলছে।
পরিঃ- কিসের রহস্য রে??
ইলাঃ- বাদ দে কিছু না তুই ঘুমা।
Time Skip:
দুপুরের পরে সবাই বসলো বড় ডাইনিং হলে রাশেদ তালুকদার করিমদ্দিন তালুকদার রফিকুল তালুকদার আর মোশাররফ খান পাশাপাশি বসে গল্প করছেন। আলোচনার মাঝেই রাশেদ বললেন
রাশেদঃ- আদিব শুনলাম তুমি কানাডায় কোনো কোম্পানিতে কাজ করো?
আদিবঃ- জি আঙ্কেল আমি টরন্টোতে “Atlas Tech Innovations” এ সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।ছোটবেলা থেকেই টেক নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসতাম।
রায়েদঃ- মানে আপনি প্রোগ্রামার কিন্তু দেখতে পুরো হিরো টাইপ,এমন লোকেরা কোডিং করার সময়ও মেয়েদের হার্টবিট বাড়িয়ে দেয় নিশ্চয়??
সবাই হেসে উঠলো পরি মুখ নিচু করে হালকা লজ্জায় রঙিন হয়ে গেলো শায়লা খান হাসিমুখে বললেন,
শায়লাঃ- আমার ছেলেকে দেখলে মনে হয় খুব সিরিয়াস কিন্তু আসলে ভেতরে অনেক মজার মানুষ ও।
রায়েদঃ- ও তাহলে বউকে হাসিয়ে রাখার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে পারবে আলহামদুলিল্লাহ আমার বোন সুখী হবে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে তালুকদার ভিলার উঠোনে লাইট জ্বলে উঠেছে। চারপাশে সাজানো মোমবাতি পেছনে বাজছে হালকা মিউজিক। আদিব দাঁড়িয়ে আছে হালকা বাতাসে চুলগুলো উড়ছে। পরি একটু দূরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল প্রথম দেখা তবুও মনে হচ্ছে যেন বহুদিনের চেনা এক আত্মা।
আদিবের দৃষ্টি পরির চোখে গিয়ে থামলো দুজনের চোখে অদ্ভুত এক নীরবতা যেন অজানায় শুরু হয়ে গেলো এক নতুন অধ্যায় ভালোবাসার, লজ্জার, আর কিছু অচেনা অনুভূতির কেউ কিছু বলছে না শুধু দুজন তাকিয়ে আছে নিরবে।
পরের দিন সকাল ১০ টা শায়লা খান ব্যস্ত মুখে রান্নাঘরে এসে সাবিহাদের বলল
শায়লাঃ- আমার ভাই আসছে আজ কাল ছেলের জন্য আসতে পারেনি তাই আজ আসছে। কিন্তু বাড়িটা চিনবে না কেউ যদি গিয়ে নিয়ে আসতো।
তাসলিমা বললো ” মেঝো রায়েদ কে একটু পাঠা না বোন সাবিহা তখন পাশে থেকে বলল
সাবিহাঃ- রায়েদ এত সকালে উঠবে?
সত্যিই ঘড়িতে তখনো ১০ টা বাজে কিন্তু রায়েদ এত সকালে উঠে না আর বাড়ির বড়রা সবাই বাজারে গেছে। ঘরে শুধু মহিলারা। ঠিক তখনই ইলা স্কুটি নিয়ে বের হচ্ছিলো বাইরে কিছু কাজে সাবিহা তাড়াহুড়ো করে ডেকে বলল,
সাবিহাঃ- ইলা মা এক কাজ কর তো আদিবের মামারা আসছে তার পরিবারও সাথে আসছে তুই একটু গিয়ে নিয়ে আয় তো ওদের তোর শায়লা আন্টির কাছ থেকে নাম্বারটা নিয়ে নিস।
ইলা কিছু না বলে মাথা ঝাঁকালো শায়লা খানের কাছ থেকে ফোন নম্বরটা নিয়ে স্কুটিতে উঠে চলে গেলো। রাস্তায় বেরিয়ে ফোন দিলো নম্বরটিতে ওপাশ থেকে ভদ্র এক পুরুষ কণ্ঠ
আদিবের মামা। ইলা লোকেশন শুনে ড্রাইভারকে বললেন,
ইলাঃ- এই দিকেই চলো চাচা তারা বাজারের ঐখানে আছে।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা নিয়ে ইলারা আদিবের মামাদের সামনে এসে থামলো। ভদ্রভাবে সবাইকে সালাম দিলো ইলা আদিবের মামা, মামি, আর তাদের দুই মেয়ে দাড়িয়ে আছে সবাই বেশ পরিপাটি শান্ত স্বভাবের। কিছু পর আদিবের মামা তার ছেলেকে ফোন দিলেন
“তুই কোথায় রে”
ফোনের ওপাশ থেকে ছেলেটা জানালো,
“একটা সুন্দর জায়গায় দেখে থেমেছি আব্বু একটু ঘুরে তার পরে যাচ্ছি একটু দেরি হবে। তোমরা চলে যাও আমি খুজে চলে যাবো
আদিবের মামা তখন হেসে বললেন,
“ঠিক আছে আমরা আগে যাচ্ছি তুই পরে আয়।
ফোন কেটে তিনি গাড়িতে উঠে পড়লেন পরিবারের সঙ্গে।ইলা তাদের বিদায় জানিয়ে তাদের গাড়ি চলে যেতে দেখলো তার পর ধীরে ধীরে স্কুটিটা ঘুরিয়ে নিজের পথে রওনা দিলো যেমন শান্ত সকালটা ছিল তেমনই নিঃশব্দে মিশে গেলো সে নিজের কাজে।
দুই ঘণ্টা পরে রোদটা তখন একটু নরম হয়েছে হালকা বাতাস বইছে গ্রামের পাকা রাস্তা জুড়ে ইলা স্কুটিতে চুপচাপ বাড়ির পথে ফিরছিলো। রাস্তার দু’পাশে ধানক্ষেতের মিষ্টি গন্ধ দূরে গরুর ঘণ্টাধ্বনি সবকিছুই শান্ত স্নিগ্ধ। হঠাৎ দূর থেকে একটা চেনা অবয়ব চোখে পড়লো। একটা ছেলে কারও সঙ্গে কথা বলছে যেন কিছু জিজ্ঞেস করছে। ইলার চোখ সরু হয়ে গেলো।
স্কুটি একটু ধীরে চালিয়ে কাছে যেতে না যেতেই বুকটা ধক করে উঠলো এটা আরিয়ান রাক্ষস টা না আরিয়ানের পরনে কালো শার্ট, চোখে সানগ্লাস, এক হাতে ঘড়ি অন্য হাতে বেসলেট আর সেই আগের মতো অহংকারে ভরা মুখ। সে কার ও দিক থেকে ঠিকানা জেনে নিচ্ছে মুখে হালকা হাসি চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ইলার ভেতরে বিরক্তি আর ভয় মিশে গেলো একসাথে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
ইলাঃ- এই রাক্ষসটা আবার আমাকে খুঁজতে খুঁজতে আমার গ্রামেও চলে এলো নাকি শেষ পর্যন্ত শান্তি দিলো না একটুও।
ইলার মুখের কোণে হালকা রাগী হাসি ফুটে উঠলো স্কুটিটা পাশ দিয়ে ঘুরিয়ে নিতে চাইলেও মনের ভেতর এক অদ্ভুত টান কাজ করলো সে জানে আরিয়ানের সঙ্গে দেখা মানে কোনো না কোনো ঝড় আসবেই। আবার থাপড় ও খেতে পারে কিন্তু তবুও ইলা সাহস করে আরিয়ান এর দিকে এগিয়ে গেলো।
ইলা স্কুটি থামিয়ে নামলো হৃদপিণ্ড ধপধপ করছে কিন্তু সে নিজেকে শান্ত করল আরিয়ান তো কখনও ওকে দেখেনি শুধু চোখ দেখেছে মুখ নয়।
এই ভেবে মুখটা শক্ত করল ইলা চুল গুলো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে উড়ছে লম্বা কালো চুলগুলো। চোখে সেই সহজ বিনয়ী দৃষ্টি ঠোঁটে সামান্য হাসি নিয়ে এগিয়ে গেলো আরিয়ান এর দিকে।
ইলাঃ- এক্সকিউজ মি ভাইয়া কিছু হয়েছে?
ইলার কণ্ঠ নরম সুরেলা বাতাসের সঙ্গে মিলেমিশে যেন হালকা সঙ্গীতের মতো বেজে উঠলো। আরিয়ান তখন একটা বৃদ্ধকে কিছু জিজ্ঞেস করছিলো।
কিন্তু কণ্ঠটা শুনেই ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালো। চোখের দৃষ্টি থেমে গেলো এক জায়গায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল। কালো চুলে রোদের ঝিলিক চোখে অচেনা শান্তি, ঠোঁটে অচেনা হাসি। তার চোখে যেন রোদের নিচে লুকানো এক জ্যোৎস্না।
আরিয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত কিছু খেলে গেলো কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ পেলো না। চেহারায় এখনও সেই আগের মতো কঠিন ভাব ঠোঁট শক্ত চোখে মাপা দৃষ্টি। আরিয়ান শুধু ধীরে বলল
আরিয়ানঃ- কিছু না রাস্তা খুঁজছি।
ইলাঃ- আপনি যদি বলেন আমি সাহায্য করতে পারি তো কোন জায়গায় যেতে চান?
আরিয়ান একবার মাথা তুললো আবার তাকালো ওর দিকে।চোখের কোণ দিয়ে এক সেকেন্ডের বেশি তাকাতে চায়নি তবু অজান্তেই দৃষ্টি আটকে গেলো মেয়েটার চোখে।
আরিয়ানঃ- না দরকার নেই।
শব্দটা ছিল ঠান্ডা কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন উষ্ণতার রেখা ছুঁয়ে গেলো ইলা হালকা মাথা নেড়ে হেসে বললো
ইলাঃ- ঠিক আছে ভাইয়া সাবধানে যাবেন সেভ জার্নি।
বলেই স্কুটির স্টাট দিলো চুলগুলো আবার বাতাসে উড়লো।আর আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইলো চোখে অনিচ্ছুক দৃষ্টি নিয়ে যেন কিছু খুঁজে পেলো কিন্তু বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক কী। তার ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা হাসি ফুটে উঠলো খুব অল্প খুব অচেনা। তারপর আরিয়ান আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো কিন্তু বাড়ি খুজে না পাওয়ায় আরিয়ান একটু বিরক্তি নিয়ে চিল্লায় বলল,
আরিয়ানঃ- তালুকদার বাড়ি কোন দিকে বলতে পারবেন?
ইলা একথা শুনে অচেতনভরে একধাক্কা মারে মুখে একটু ছলে ছলে হেসে বলল
ইলাঃ- বেডা এইবার লাইনে আয় এবার আমার এলাকায় এসেছিস এবার থাপর এর প্রতিশোধ নিবো।
আরিয়ানঃ- এই যে চিনেন আপনি তালুকদার বাড়ি??
তার ভাঁজ কণ্ঠে আগের মতোই একচেটিয়া ঠাণ্ডা ছিল কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক লুকিয়ে ছিল ইলা চট করে বলল,
ইলাঃ- আমার স্কুটিতে উঠুন।
আরিয়ান ইলার কথা শুনে অবাক হয়ে অর্ধচোখে তাকিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আপনি এড্রেস দিন আমি নিজেই চলে যাবো।
ইলাঃ- আরে বাবা কিডন্যাপ করবো না উঠুন তো আমি তালুকদার বাড়ি চিনি ঐ রাস্তায় আমিও যাচ্ছি।
আরিয়ান একবার স্তব্ধ হয়ে, তারপর কোনো রকম ভঙ্গিতে বলল,
আরিয়ানঃ- ঠিক আছে তাহলে পিছনে বসুন আমি চালাচ্ছি।
ইলাঃ- না না আমি আমার পাগলুকে কাউকে চালাতে দেই না। সে অনেক রাগ করে। উঠার হলে উঠুন আর না হলে থাকুন আমি গেলাম।
আরিয়ান আর কোনো উপায় না দেখে খাস্তা চেহারা করে হালকা করে হাঁটতে হাঁটতে ইলার পিছনে উঠে বসলো। আরিয়ান মাঝখানে কাধের ব্যাগটা রেখে অনেকটা গ্যাপ রেখে বসলো।
ইলা স্কুটির হ্যান্ডেল ধরে ধীরে ধীরে গাড়ি ছুটাতে লাগল গ্রামীন রাস্তা উচু-নিচু, খালের ধারে ধাননদীর ঢেউ ইলা একটু দ্রুত চালালে ইচ্ছে করেই গতি বাড়িয়ে দিলো যেন আরিয়ান একটু ভয় পায় একটু ক্ষুব্ধ হয়। গ্রামের পথখানা বারবার কাছাকাছি মনে হচ্ছিল স্কুটিটা দু’বার এমন জায়গায় এলো যেখানে খালের ধারে উচু স্থান আরিয়ান একটু চেয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- এই আস্তে আস্তে পড়ে যাবো
ইলাঃ- ভিতুর ডিম কিছু হবে না ভালো করে বসুন।
আরিয়ান এর এটিটউট আগের মতোই রাখলো প্রায় চার কিলোমিটার যাওয়ার পর ইলা এক ফাকা জায়গায় থামালো। দুপাশে পাকা ধানখেত সামনে দূরে ছোট্ট একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে গ্রামটির ঠিক সামনে পথ আছে।আর সেই পথটা যদি ধীরে ধীরে এগোই তবে তালুকদার বাড়ির দিকে পৌঁছে যায়।
ইলা আরিয়ানকে এভাবে বলে বুঝাল কথাগুলো শান্ত কিন্তু কণ্ঠে এক আচ্ছন্নতা ছিল,
ইলাঃ- ওই গ্রামেই গিয়ে যে কাউকে জিগ্যেস করলে তালুকদার বাড়ি দেখিয়ে দিবে। আমার একটু তারা আছে তাই আর যেতে পারলাম না আপনি সেখানে গেলে ঠিক পথ পেয়ে যাবেন।
আরিয়ান নীরবে একটা সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল,
আরিয়ানঃ- ধন্যবাদ উপকার করার জন্য।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৯
তার কণ্ঠে ছিল অল্প কৃতজ্ঞতা মুখে তার ঠাণ্ডা ভাব বজায় ছিল কিন্তু চোখটা কিছুটা নরম হয়ে উঠেছিল। সে বক্রভঙ্গিতে হালকা নড়চড় করে স্কুটির পেছন থেকে নামল একটা নম্র করে বলল,
আরিয়ানঃ- ভালো থাকবেন।
ইলা স্কুটিতে বসে তাকে দেখছিল আরিয়ান ধীরে ধীরে গ্রামটা লক্ষ্য করে চলে গেলো। তার পেছনে থাকা আচ্ছন্ন ছায়া টবদলে গিয়েছে চলার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে গায়েব।
ইলা দাঁড়িয়ে রইল হাওয়ার সঙ্গে লম্বা কেশের কোনো কিছু কান ঝাপটাতে লাগলো। সে নিজের কণ্ঠে লুকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
ইলাঃ- আজ বুঝতেই পারবে মি: রাক্ষস ইলার সাথে লাগতে আসলে কি হয়।
