ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৩
ছায়া
ক্যান্টনমেন্টে তখন সকাল আটটা আরিয়ান অফিসে যাবার আগে আয়নার সামনে ইউনিফর্ম ঠিক করছিলো।টেবিলের ওপর রাখা ইলার সেই ছোট হেয়ার ক্লিপটা এখনও আছে হাত বাড়িয়ে সেটা একটু ছুঁয়ে দেখল।একটা নিঃশ্বাস ফেলল গভীর ভারী ঠিক তখনই দরজায় টোকা। ভেতরে ঢুকলো মেজর জয় হাতে কফির কাপ।
জয়ঃ- কাল খুব চুপচাপ ছিলে তাই কথা বলার সময় পাইনি সব ঠিক তো?
আরিয়ান একটু হাসলো “হ্যাঁ স্যার সব ঠিক”
জয়ঃ- তোমার চোখ বলছে অন্য কিছু।
আরিয়ান কিছু বলল না শুধু বলল “কাজ আছে কাজে মন দিতে হবে”
জয়ঃ- আরিয়ান দায়িত্ব মানুষকে শক্ত করে কিন্তু একসময় তা হৃদয়ের জায়গাটা শুকিয়ে দেয়। একটু হলেও বাঁচো নিজের মতো।
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না শুধু জানালার দিকে তাকাল সূর্যের আলোয় চোখে একফোঁটা জল চিকচিক করছে হয়তো ঘামের, হয়তো ব্যথার।
অন্যদিকে সকালের নরম আলোটা হোস্টেলের জানালা দিয়ে এসে ইলার মুখে পড়ছে সারারাত ঘুম আসেনি ইলার চোখে জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিরের বিন্দুগুলো যেন তার মনেরই প্রতিফলন ঝাপসা তবু গভীর। সকাল সকাল দরজায় টোকা পড়লো। “ইলা দরজা খোল” চেনা কণ্ঠ ইলা তাড়াতাড়ি দরজা খুলতেই হালিমা ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে হাসছে।
হালিমাঃ- তুই তো একদম শুকায় গেছিস রে এক দিনে কাল থেকে মনে হয় না কিছু খেয়েছিস।
ইলাঃ- তুই এসে গেছিস এখন মনে হয় একটু শান্তি পাবো।
হালিমাঃ- সব বল খুলে বল তুই ফোনে যা বলছিস সব বুঝলাম কিছু বুঝিনি, তুই আর ভাইয়া কি… মানে…
ইলা চুপ করে বসে থাকে কফির মগটা হাতে নিয়ে বলে,
ইলাঃ- ও আমাকে হোস্টেলে রেখে গেছে বলেছে এখন থেকে আমি মুক্ত।
হালিমা চোখ বড় বড় করে তাকায় রাগে ফুস্তে থাকে
হালিমাঃ- মানে কি তোরে এভাবে রেখে গেলো কেন? এখন মন চাচ্ছে ভাইয়ারে আমি একটা ধোলাই দেই।
ইলাঃ- ওর কিছু কারণ আছে হালিমা। ও অন্যকাউকে ভালোবাসে। তাই হয়তো চায় না আমার সাথে থাকতে।
হালিমাঃ- তুই কি আরিয়ান ভালোবাসিস ইলা?
ইলা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকায়
ইলাঃ- ভালোবাসা মানে কি জানি না আর আমার লাইফে ভালোবাসা বলতে কিছু নেই।
দুজনের মধ্যে নীরবতা নেমে আসে হালিমা হেসে ইলার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়,
হালিমাঃ- চল ক্যান্টিনে যাই সকাল থেকে তুই কিছু খাসনি।
ইলা হালকা মাথা নাড়ে দুইজনি ক্যান্টিনে চলে যায়, দুজনে বসে সকালের নাস্তা করছে। হালিমা দেখে ইলার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে হালিমা চুপ না থাকতে পেরে বলল
হালিমাঃ- কিরে তুই রাতে ঘুমাসনি?
ইলাঃ- না গেম খেলছি সারারাত।
হালিমাঃ- তুই আবার গেমে ডুকেছিস আর কি একা খেলেছিস নাকি সাথে কেউ ছিলো।
ইলাঃ- আমার গেমের একজন পূরোনো টিমমেট ছিলো। জানিস কালকে আমি ওর নাম জেনেছি।
হালিমাঃ- তা শুনি তোর এই টিমটিমের নাম কি
ইলাঃ- লিয়ান চৌধুরী, এর থেকে বেশি কিছু জানি না।
দুইজন খাওয়া শেষ করে গল্প করছে অন্য দিকে তালুকদার বাড়িতে নিচতলায় রান্নাঘর থেকে গ্যাসের আওয়াজ, কাপড় ধোয়ার শব্দ, আর মেহেরু খালার মৃদু গুনগুন শোনা যাচ্ছে কিন্তু উপরের রুমে এখনো নিস্তব্ধতা। পরির রুমে জানালা দিয়ে রোদের আলোর রেখা এসে পড়েছে পরির গালে পরি নড়েচড়ে ওঠে। পাশে আদিব আধঘুমে হাসছে পরি চোখ মেলে দেখে ওর বুকের উপরেই হাত রেখে আদিব ঘুমোচ্ছে।
পরিঃ- আদিব উঠো অনেক সকাল হয়ে গেছে।
আদিব আধখোলা চোখে তাকিয়ে বলে,
আদিবঃ- তুমি উঠলে তো সকাল হয় তার আগে হয় না।
পরি ঠোঁট কামড়ে বলে,
পরিঃ- বেশি কথা না আমি উঠবো তুমিও উঠো।
পরি নিজের শাড়ি ঠিক করে উঠতে যাচ্ছিলো আদিব হালকা করে পরিকে টেনে নিজের বুকে ফেলে দেয়।
আদিবঃ- আমার স্পাইসি বউ এত তারা কেনো তোমার আমার থেকে ছাড়া পাওয়ার।
পরিঃ- একদম দুষ্টুমি না আমি ফ্রেশ হতে যাচ্ছি তুমিও উঠো।
আদিবঃ- অকে তুমি তো শাওয়ার নিতেই যাচ্ছো তাহলে আরেকবার শাওয়ারের কাজ শেরে নেই।
পরিঃ- এই না প্লিজ
আদিব কোনো কথা শুনে না পরিকে বেডে শুইয়ে দিয়ে নিজে পরির উপরে আধো শুয়া হয়ে থাকে। পরির নিশ্বাস নিচ্ছে দ্রুত আদিব কম্ফর্টার ঢাকা নিয়ে নেয় আর পরি আদিবের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য শক্তি করতে থাকে।
আর নিচতলায় রায়েদ এখন ব্যস্ত একদিকে কাজের লোকদের ডাকে অন্যদিকে বাড়ির লোকদের হাসানোর চেষ্টা করছে কিন্তু বুঝতে পারছে বাড়ির বাতাস ভারী। রাশেদ তালুকদার চুপচাপ বসে চা খাচ্ছেন চোখে একরাশ ক্লান্তি। রায়েদ রাশেদ তালুকদার এর কাছে গিয়ে বলে,
রায়েদঃ- চাচ্চু তুমি কিছু বলছেন না কেনো? ইলাকে মিস করছেন তাই না?
রাশেদ তালুকদার নিঃশব্দে মাথা নাড়েতারপর চা তে চুমুক দিচ্ছে হালকা চোখে রায়েদের দিকে তাকিয়ে বলল
রায়েদঃ- মেয়ে মানুষকে একদিন না একদিন শশুর বাড়ি যেতে হয় কিন্তু তবুও আমার মনে হয় আমি হয়তো ওর পাশে ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারিনি।
রায়েদঃ- ইলা খুব শক্ত মেয়ে তুমি দেখবে ও সব কিছু ঠিক সামলে নিচ্ছে তোমাকে টেনশন করতে হবে না।
রাশেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাশেদের ফোন বেজে উঠলো রাশেদ তালুকদার ফোনটা হাতে নেয় স্ক্রিনে ইলার নাম দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়।তারপর কল রিসিভ করলো কলের ওপাশে ইলা
ইলাঃ- হ্যালো, আব্বু?”
রাশেদঃ- কেমন আছিস মা?
ইলাঃ- ভালো আছি আব্বু তুমি কেমন আছো?
রাশেদঃ- আমি ভালো আছি, তুই ভালো আছিস শুনেই শান্তি পেলাম তুই এখনো ঠিক মতো খাসনি তাই না?
ইলাঃ- না আব্বু হালিমা সহ একটু আগেই খাওয়া শেষ করলাম।
রাশেদঃ- আরিয়ান তোকে হোস্টেলে রেখে গেছে বলেছে। আমি জানি ওর মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরছে। কিন্তু তুই ভয় পাস না ও ভালো ছেলে তুই ওর উপর ভরসা রাখ।
ইলাঃ- আব্বু আমি ভয় পাই না শুধু মাঝে মাঝে একা লাগে।
রাশেদঃ- একাকীত্ব তো মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক মা একদিন দেখবি তুই এই একাকীত্ব থেকেই শক্তি পাবি।
ইলাঃ- আব্বু তোমাকে অনেক মিস করতেছি।
রাশেদঃ- আমিও মা তবে আজকে সকালটা খুব সুন্দর কারণ তুই ফোন করেছিস।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকে তারপর রাশেদ বলেন,
রাশেদঃ- তুই ভালো করে খাবি, নিয়ম মতো ক্লাসে যাবি আর হালিমাকে বলিস আমার স্নেহ নিতে।
ইলাঃ- আচ্ছা আব্বু।
কল কেটে গেলে ইলা কিছুক্ষণ ফাঁকা দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।তার মনে হয় বাবার কণ্ঠের প্রতিটা শব্দ যেন বুকের ভেতর একটা শান্ত বাতাসের মতো ছুঁয়ে গেলো। দুই বান্ধবী ক্লাস করতে চলে গেলো।
বিকেলটা তখন ঝিম ধরা রোদে ভরে গেছে ক্লাসের ঘণ্টা শেষ হতেই চারপাশে কোলাহল হাসাহাসি আর ব্যাগ গুছানোর শব্দ ছেলে মেয়েদের দলবেঁধে বেরিয়ে যাওয়া।ইলা নিঃশব্দে ব্যাগ কাঁধে তুলে হালিমার সাথে বের হলো দুজনেই ধীরে ধীরে হলের পথে হাঁটছে গাছের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে রাস্তায় হালিমা মোবাইল হাতে ব্যস্ত আর ইলা নিরব ঠিক তখনই “মিস ইলা” একটা দৃঢ় কণ্ঠে ডাকে কেউ ইলা থেমে পিছনে তাকালো কেউ নেই। চারপাশে শুধু কয়েকটা ছেলে মেয়ে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে।ইলা ভুরু কুঁচকে হালিমার দিকে তাকায় “তুই শুনলি?” হালিমা অবাক হয়ে বলে “না রে” কে ডাকবে তোরে? ইলা মাথা নাড়ে “ভুল শুনছি হয়তো” তারপর আবার সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে ঠিক তখনই আরেকটা ডাক “সিজুকা” এইবার শব্দটা একদম পরিষ্কার ইলা চমকে উঠে পেছনে তাকায়। দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের পাশে একটা পুরনো বটগাছের নিচে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেটার গায়ে কালো লেদারের জ্যাকেট, ভিতরে সাদা শার্ট। কাঁধে একটা গিটার ঝুলছে। চুলগুলো অগোছালো কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত স্টাইল। কপালের চুলের ফাঁক দিয়ে চোখদুটো ঝলসে উঠছে বিকেলের আলোয় তীক্ষ্ণ আর রহস্যময়। তার মুখে একটা হালকা হাসি যেন জানে সে কাকে ডাকছে।ঠোঁটের কোণে সেই আত্মবিশ্বাসী হালকা বিদ্রূপের ছোঁয়া।
“সিজুকা চিনতে পারছো আমাকে?
ইলার বুকের ভেতর কেমন এক ধাক্কা লাগে ওর ঠোঁট শুকিয়ে যায় গলার কাছে শব্দ আটকে আসে হালিমা অবাক হয়ে বলে,
হালিমাঃ- ইলা তোরে এই ছেলে সিজুকা বলে ডাকলো?
ইলাঃ- ও… ও লিয়ান।
“লিয়ান চৌধুরী” যেন ভার্চুয়াল গেমের নবিতা নয় আজ বাস্তবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এক রহস্যময় রকস্টার ইলা হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে, যেন হঠাৎ করে এক অজানা ঝড় এসে সব ওলটপালট করে দিচ্ছে।ইলার কানে তখনও বাজছে সেই একটা শব্দ “সিজুকা” ইলা এক পা দুই পা করে এগিয়ে গেলো তার পর গলায় কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,
ইলাঃ- আপনি… এখানে কিভাবে? তাও আমার ভার্সিটিতে? আর আমাকেই বা চিনলেন কিভাবে?
লিয়ান এর ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরো গভীর হলো চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস যেন পুরো দুনিয়ার রহস্য ওর চোখে লুকিয়ে আছে।লিয়ান এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে বললো “সারপ্রাইজ” আর কোনো কথা নয় শুধু একটা শব্দ কিন্তু সেই শব্দের ভেতর ছিলো ঝড়ের মতো তীব্রতা ইলা স্তব্ধ তার চোখ চলে গেলো লিয়ানের দিকে আর তখনই যেন প্রথমবার সত্যি করে তাকালো লিয়ানের দিকে।
লিয়ান চৌধুরী ২৪ বছর বয়স উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট চওড়া বুক, ঘন কালো চুল কপাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে। চোখ দুটো ধূসর আর গভীর যেন আলো-ছায়ার খেলা চলে তাতে। ত্বক উজ্জ্বল ঠোঁটের কোণে সবসময় এক হালকা দুষ্টুমি-মেশানো হাসি। কালো জিন্স, সাদা শার্টের বোতাম দুটো খোলা, কালো লেদারের জ্যাকেট গলায় একটা সিলভার চেইন ঝুলছে যার নিচে একটা ছোট্ট গিটার পেন্ডেন্ট। আর সবচেয়ে নজরকাড়া তার গলার ডান পাশে একটা ছোট্ট বাটারফ্লাই ট্যাটু,যেটা বিকেলের আলোয় ঝলমল করছে যেন জীবন্ত হয়ে উড়বে যেকোনো মুহূর্তে। ইলার চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখানে আটকে গেলো লিয়ান হালকা হেসে গলা ছুঁয়ে বললো,
লিয়ানঃ- তুমিও দেখছি সবার মত আমার ট্যাটুর ফ্যান হয়ে গেলা।
তার কণ্ঠ গভীর, ভারী, কিন্তু এক অদ্ভুত সুর আছে তাতে যেন প্রতিটা শব্দ মিউজিকের তালে তালে বের হচ্ছে হালিমা পাশে দাঁড়িয়ে হতভম্ব ওর কানে কানে বললো,
হালিমাঃ- ইলা এই লোকটা কি সত্যিই তোর গেমের বন্ধু লিয়ান?
ইলাঃ- আমি ভাবছিলাম ও শুধু গেমার কিন্তু ওর এই লুক এই আত্মবিশ্বাস দেখে…….
ওর বাক্য শেষ হবার আগেই লিয়ান হাত বাড়িয়ে দিলো হালিমার দিকে
লিয়ানঃ- হাই আমি ” লিয়ান চৌধুরী” মিউজিশিয়ান, গিটারিস্ট, আর তোমার বন্ধুর পুরনো টিমমেট।
ইলার কণ্ঠ আটকে গেলো ওর ঠোঁট কাঁপছে চোখে বিস্ময় লিয়ান গিটারটা একটু কাঁধ থেকে নামিয়ে বললো,
লিয়ানঃ- আমি এই ভার্সিটির “সংগীত বিভাগের অনিয়মিত স্টুডেন্ট।
ইলাঃ- কি আপনি আমাদের ভার্সিটির স্টুডেন্ট।
লিয়ানঃ- হ্যাঁ, তবে আমি তেমন ভার্সিটিতে আসিনা। কালকে তোমার সাথে কথা বলার পড়ে আমি তোমার খোজ নেই ভেবেছিলাম তোমাকে খুজে পাওয়াটা অনেক কঠিন হবে বাট তুমি তো অনেক পপুলার ভার্সিটিতে।
ইলা হালিমা কিছু বলল না চুপচাপ দারিয়ে আছে, লিয়ান কে এভাবে ইলাদের সাথে কথা বলতে দেখে অনেক মেয়ে জেলাস। কারণ লিয়ান হচ্ছে ভার্সিটির ক্রাস বয় যার গিটারের শব্দ শুনলেই মেয়েরা প্রেমে পড়ে যায়। লিয়ান এর পিছনে মেয়েরা ঘুর ঘুর করে কিন্তু লিয়ান কোনো মেয়ের সাথে তেমন কথা বলে না। আর আজ লিয়ান নিজে থেকে ইলার সাথে কথা বলছে এটা দেখে সবাই অনেকটা অভাক হয়। কেউ কেউ আবার ভাবে আমার ” ঐ সেদিনের ছেলেটা এসে মারা না শুরু করে দেয়” ইলা কিছুটা অস্বস্তি তে পড়ে গেছে লিয়ান ইলার এই চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
লিয়ানঃ- সিজুকা তুমি আমার কল্পনার থেকেও বেশি সুন্দর দেখতে।
ইলার গাল হালকা লাল হয়ে উঠলো ওর বুকের ভেতর টা কেমন কেঁপে উঠছে আর মন বলছে এই মানুষটা হয়তো শুধু গেমের চরিত্র না বাস্তবেও একটা ঝড় হতে যাচ্ছে তার জীবনে।
লিয়ান ইলার এই অবস্থা দেখে কিছুটা হাসলো তারপর ইলা কে বলল
লিয়ানঃ- তুমি হয়তো আমাকে হঠাৎ এভাবে দেখে অনেকটা ঘাবড়ে গেছো। অকে এখন তুমি যেতে পারো রাতে গেমে এসো কিন্তু আমি অপেক্ষায় থাকবো।
ইলাঃ- ঠিক আছে..!!
ইলা হালিমার হাত ধরে দৌড়ে চলে যায় লিয়ান ইলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। ৫ বছরের না দেখা প্রেম আজ সারপ্রাইজলি দেখেই নিলো।
Time Skip….
রাত তখন প্রায় ১১ টা ক্যান্টনমেন্টের লাইটগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে,বাতাসে ঠান্ডা ধুলো আর গাছের পাতার হালকা দুলুনি।বাইরে নিস্তব্ধতা কিন্তু আরিয়ানের ভেতরটা অস্থির যেন কোথাও একটা অজানা টান তাকে টেনে নিচ্ছে নিঃশব্দে, গভীরভাবে।
ও টেবিলের উপর বসে ফাইলগুলো খুলে বসেছে,কিন্তু চোখ যাচ্ছে না সেই রিপোর্টে কলমটা হাত থেকে কয়েকবার পড়ে গেছে মনটা যেন একদম এলোমেলো হয়ে গেছে। হাতে ঘড়ির দিকে তাকালো রাত ১১:০৮ চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই মেয়েটার মুখ “ইলা” চোখে সেই লজ্জাভরা দ্বিধা আর ওর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমানোর সময়ের সেই শান্ত মুখটা সব কিছু বারবার মনে পড়ছে একটার পর একটা দৃশ্য যেন ভেতর থেকে বের হয়ে আসছে। আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করলো।”কেন মনে পড়ছে ওকে” নিজেকেই প্রশ্ন করলো ধীরে ধীরে।“আমি তো ওকে ফেলে এসেছি নিজের ভালো চিন্তা করেই”তাহলে কেন মনে হচ্ছে কিছু একটা অপূর্ণ রয়ে গেছে? আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন চেপে আসছে।
যেন প্রতিটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে একটা নাম ঘুরে ফিরে আসছে “ইলা” ডেস্কের উপরে রাখা পানির বোতল হাতে নিয়ে চুমুক দিলো।কিন্তু পানিটাও আজ তেতো লাগছে কোনো কিছুতেই মন বসছে না।বাইরে টহলদারি সৈনিকদের পদচারণার শব্দও আজ কেমন দূরের অপরিচিত মনে হচ্ছে। আরিয়ান চোখ বন্ধ করলো সেই সময় একটা মৃদু ফিসফিস আওয়াজ যেন কানে বাজলো “আপনি কি আর ভার্সিটিতে আসবেন না” চোখ খুলে চমকে গেলো। চারপাশে কেউ নেই কিন্তু কানে বাজছে ইলার কণ্ঠস্বর।ওর সেই কণ্ঠে এক অদ্ভুত টান ছিলো না ছিলো অভিযোগ, না ছিলো রাগ ছিলো শুধু একটা নরম অজানা টান যা বুকের গভীর থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আরিয়ান নিজেকে সামলাতে চাইলেও পারছে না ওর ভিতরে যুদ্ধ শুরু হয়েছে একদিকে দায়িত্ব অন্যদিকে অনুভূতি। “কিসের এই টান” নিজেকে প্রশ্ন করলো আবার।
“ও তো এখন মুক্ত আমি ওর জীবনে কিছুই না তাহলে কেন এই এক অদ্ভুত অশান্তি যেন কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে? বাইরের আকাশে চাঁদ আধো আলোয় ঢাকা আরিয়ানের চোখে সেই আলো এসে পড়লো মনে হলো যেন দূরের কোথাও কেউ তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চারদিকে হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক আকাশজোড়া তারা। আরিয়ান ধীরে ধীরে ছাদে উঠে এলো হাতে কফির কাপ মুখে ক্লান্তির ছাপ। ছাদের এক কোণে গিয়ে বসলো আরিয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললো
“ইলাফুল… কেনো তুমি আমার লাইফে আসলে” কথা টা শেষ করেই একটু থেমে রইলো। হাওয়ার ঝাপটায় তার চুল উড়তে লাগলো। “সবকিছু তো ঠিকঠাক চলছিল… আমি আমার ডিউটিতে মন দিচ্ছিলাম, দায়িত্ব, শৃঙ্খলা সব ঠিক ছিল। কিন্তু তুমি এসেই কেনো সবকিছু গুলিয়ে দিলে? আরিয়ানের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেলো “আমার বুকের ভেতর এমন অস্থিরতা আগে কখনো অনুভব করিনি। এটা কি শুধুই আমার মনের দুর্বলতা নাকি আল্লাহর কোনো লীলাখেলা”চোখ তুলে তাকালো তারাভরা আকাশের দিকে আরিয়ান
“তুমি জানো ইলাফুল তোমার একটুখানি হাসি এখন আমার অশান্তির কারণ, তোমার নীরবতাই আমার ভয়। তুমি দূরে থাকলেই মনে হয় শ্বাসটা আটকে যাচ্ছে”
কফির কাপ ঠোঁটে নিতে নিতে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো আরিয়ান। “আমি তো আর প্রেমে বিশ্বাস করি না এখন আবেগ মানে দুর্বলতা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোমার নামটা মনের ভেতর এমনভাবে গেঁথে গেছে যেন মুছে ফেলতে গেলেও নিজেকেই হারাতে হবে”
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩২
চাঁদের আলো এসে আরিয়ানের মুখে পড়লো চোখে হালকা এক ঝিলিক “ইলাফুল… তুমি বুঝতে পারছো না আমার জীবনটা এখন তোমার নামেই গাঁথা। আমি যত দূরেই যাই তোমার টানটা যেন আমাকে টেনে ফিরিয়ে আনে” তারপর ফিসফিস করে বলে “হয়তো এটাই প্রেম যেটা আল্লাহ নিজের হাতে লিখে দিয়েছেন, আমার ভাগ্যের পাতায় ইলাফুল নামে”
