Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৪

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৪

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৪
ছায়া

দুইদিন পরে:
এই দুইদিনে ইলা হল থেকে বের হয়নি,আর নাম গেমে ডুকেছে।ইলা লিয়ানের কথা পরিকে বলে সব শুনে পরি আর হালিমা ইলাকে বলে এই লিয়ান নামের ছেলেটার থেকে যত দূরে থাকবে তত ইলার জন্য মঙ্গল কারণ আরিয়ান যদি এই সব কিছু জানে তাহলে নিশ্চিত থাপড় খেতে হবে। এই ভেবে ইলা দুইদিন হল থেকে বের হয়নি। আর ঐদিকে আরিয়ান বুঝতে পারেনা কেনো বার বার ইলার কথা মনে পড়ছে। আরিয়ানের মনে হচ্ছে দুটিদেহ একটি আত্মা হয়ে গেছে।খেতে, উঠতে, বসতে সব জায়গায় ইলাফুল কে দেখতে পায়।
আর অন্য দিকে লিয়ান বুঝতে পারছে না হঠাৎ করে ইলার কি হলো গেমে আসছে না ভার্সিটিতে আসছে না। আর এদিকে লিয়ান যে ৬ মাসে ১ দিন ক্লাস করতো কি না সন্দেহ সে তিন দিন ধরে কন্টিনিউ ক্লাস করতিছে। এতে কিছু মেয়ে অনেক হ্যাপি যে তারা লিয়ান কে প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছে। আর লিয়ান সে ক্ষুদার্ত বাঘের মত ইলাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।

আজকের সকালের রোদটা আজ একটু অন্যরকম চকচকে তীব্র, কিন্তু তবুও মন কেমন করা এক শান্ত ভাব নিয়ে ছড়িয়ে আছে বাতাসে।ঢাকার রাস্তায় হালকা ভিড় রিকশার ঘণ্টাধ্বনি আর পাশের দোকান থেকে ভেসে আসা চায়ের গন্ধে যেন শহরটা নতুন করে জেগে উঠছে।ইলা আর হালিমা রিকশায় বসে যাচ্ছে ইলার হালকা পিঙ্ক কামিজ চুলগুলো খোলা চোখে ক্লান্তি কিন্তু মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি।হালিমা চঞ্চল তার হাসি কথা সবকিছুতেই একধরনের মিষ্টি উচ্ছ্বাস রিকশা চলতে শুরু করলো। ঠিক তখনই রাস্তার অন্য পাশে চোখে পড়লো এক দৃশ্য রাস্তার পাশে অনেক গুলো আর্মি দারিয়ে আছে।

সেখানে আরিয়ান ও ছিলো (আরিয়ান সেনাবাহিনীর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স শাখায় আছে বেশিরভাগ সময় গোপনে কাজ করলেও কিছু বিশেষ অপারেশনে তাকে ইউনিফর্ম পরে মাঠে নামতে হয় আর ইউনিফর্ম পরলে তার চোখে অন্যরকম এক কর্তৃত্ব ফুটে ওঠে) আর আজ আরিয়ান পরেছে তার অফিসিয়াল ইউনিফর্ম ব্যাজগুলো রোদের আলোয় ঝলমল করছে। চোখে কালো সানগ্লাস পায়ে পালিশ করা বুট, কাঁধের ভাঁজে দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাসের ছাপ। আরিয়ান হাত ঘড়ি ঠিক করে নিচ্ছে পাশে দাঁড়ানো এক জিপে কিছু সহকর্মী।তার মুখটা শান্ত কিন্তু সেই শান্তির ভেতর লুকিয়ে আছে এমন এক কঠিনতা যেটা দেখলেই বোঝা যায় এই মানুষটা নিজের দায়িত্বকে ভালোবাসে প্রাণের মতো।হালিমার চোখ পড়ে গেলো সেদিকে সে হঠাৎ রিকশা থেকে আধা উঠে চমকে বললো,
হালিমাঃ- ইলাআআ রেরেরেররে এ কিরে আমি কি দিনে স্বপ্ন দেখতেছি নাকি?
ইলা হালিমার এমন চিতকার শুনে হালিমার দিকে তাকায় হালিমা অবাকের শেষ প্রান্তে ইলা একটু অবাক হয়ে বলল
ইলাঃ- কেনো কি হলো তোর।

হালিমা সামনের দিকে আঙুল তুলে ইলাকে দেখিয়ে
হালিমাঃ- ঐযে দেখ… ঐটা… আরিয়ান ভাইয়ার মত না? ঐ যে ইউনিফর্ম পড়ে আছে, কালো সানগ্লাস, বুক সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে… হুবহু আরিয়ান ভাইয়ার মত লাগছে।
ইলা হালিমার কথা শুনে থমকে যায় রিকশার চাকাটা তখনও টকটক শব্দে ঘুরছে, কিন্তু তার কানে যেন সব শব্দ মিলিয়ে গেল।চোখ দুটো অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুরে গেল সেই দিকে। আরিয়ান তখন ফোনে কথা বলছে তার গলার স্বর নিচু দূর থেকে কিছু শুনা যাচ্ছে না বাট বুঝা যাচ্ছে কথা বলছে ঠোঁট নরছে। রোদে তার ত্বকে একরকম উজ্জ্বলতা চোখের নিচে হালকা ছায়া ঠোঁটের কোণে কঠোরতার রেখা। ইলার মনে হল এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেছে।ইলা নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে যেন নিজের মনকেই বোঝাতে চাইছে “না এটা কাকতালীয় এটা আরিয়ান না” কিন্তু হৃদয়ের কোথাও যেন একটা চাপা শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়।

রিকশা সামনে এগিয়ে যায় হালিমা তখনও পেছন ফিরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
হালিমাঃ- ইউনিফর্ম পরে ছেলেটা কী যে হ্যান্ডসাম লাগতেছে রে ইলা… যদি একবার কাছে গিয়ে দেখতে পারতাম।
ইলা চুপ থাকে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক দমে নামা দীর্ঘশ্বাস।দূরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান ঠিক তখনই মাথা তুলে তাকায় দূর থেকে রিকশাটা হারিয়ে যাচ্ছে ভিড়ে।আরিয়ানের মনে এক ঝটকা লাগে যেন বুকের গভীরে কেউ ফিসফিস করে বলে এইযে তোর “ইলাফুল”
আরিয়ান তখনও স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। রিকশাটা ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেলেও তার চোখ সেই দিকেই আটকে আছে। তার ঠোঁটে ক্লান্ত এক হাসি চোখে বিভ্রান্তি নিজের চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে বিড়বিড় করে বলল

“আমার মাথা সত্যি খারাপ হয়ে গেছে মনে হয়,সব জায়গায় এখন ইলাফুলকেই দেখি। রাস্তায়,স্বপ্নে, রুমে ঘুমেয়ে এমনকি নিজের ছায়ার সাথেও হাটতে দেখছি।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো তারপর ধীরে ধীরে নিচু স্বরে নিজের মনেই বলল
“শাওন মাথা ঠিক কর না হলে খুব শিগগিরই তোকে পাবনা যেতে হবে”
আরিয়ানের হাসিটা কষ্টের ছিল তবুও বলার সময় তার গলার স্বরে অদ্ভুত এক মায়া মিশে ছিল যেন কারো নামের মধ্যেই সে হারিয়ে গেছে। রিকশার দিক থেকে তখন ভেসে আসছে হালিমার চিৎকারমিশ্রিত কথাগুলো
হালিমাঃ- আমি বলতেছি এটা আরিয়ান ভাইয়া আমি দেখে চিনেছি।
ইলাঃ- তুই ভুল দেখছিস হালিমা ওটা ও না।
হালিমাঃ- ভুল দেখি নাই আমি ঐ হাঁটার স্টাইল দেখেই আমি বুঝেছি ওটা আরিয়ান ভাইয়া ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।

ইলাঃ- তুই সব জায়গায় এখন আরিয়ানকে দেখতে পাচ্ছিস।এটা ঢাকার রাস্তা আর আর্মিরা ইউনিফর্ম পড়লে পরিচিত লাগে।
হালিমাঃ- তুই সত্যিটা বলবি না আমি জানি, কিন্তু আমি জানি তুইও বুঝতে পারছিস এটা আরিয়ান ভাইয়া।
ইলা আর কিছু বলে না চুপচাপ বসে থাকে।রিকশার চাকা ঘুরতে থাকে কিন্তু তার মন কোথায় যেন হারিয়ে যায় একটা কালো সানগ্লাস, একটা ইউনিফর্ম।
আর অন্যদিকে আরিয়ান তখন জিপে চড়ে বসেছে কিন্তু মন তার কাছে নেই ডিউটিতেও না মন পড়ে আছে এক নামের ভেতর “ইলাফুল”
ইলা রিকশায় বসে একরাশ বিরক্তিতে চোখ মেলল হালিমা তখনও নিজের কথায় অটল।
হালিমাঃ- তুই না বুঝিস ইলা ওটা আরিয়ান ভাইয়া ছাড়া কেউ না আমি ঠিক চিনেছি
ইলাঃ- আচ্ছা ঝগড়া বাদ দে পরিকে ফোন দেই আদিব ভাইয়া নিশ্চয়ই জানে আরিয়ান কী করে।
হালিমাঃ- রাইট এটা ভালো আইডিয়া।
ইলা ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে ডায়াল করল পরির নাম্বারে ওপাশে কিছুক্ষণ রিং বাজলো হালিমা ফিসফিস হাসির শব্দ করছে।

অন্যদিকে পরি তখন নিজের রুমে হালকা আলো জ্বলছে।আদিব পরির চুলে মুখ গুজে নেশালো স্বরে বলছে
আদিবঃ- স্পাইসি বউ তুমি জানো তুমি যখন হাসো আমার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়?
পরি আদিবের কথায় লজ্জায় গাল লাল করে ফিসফিসিয়ে বলল “চুপ করো কেউ শুনলে কি বলবে”
আদিবঃ- কেউ শুনলে শুনবে আমি তো আমার বউ এর প্রশংসা করছি আর আমি তোমার হাসিটা মিস করতে চাই না।
তারপর পরির কপালে একটা চুমু খেয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে নেশালো কন্ঠে বলল
আদিবঃ- তুমি এভাবে হাসি খুশি থাকলে এইভাবে আমি সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারব।
ঠিক সেই সময় ফোনটা কাঁপতে শুরু করল”ইলা কলিং”
পরি আদিবকে ঠেলে সরিয়ে দিলো “ছাড়ো না ইলার ফোন করেছে”
আদিব ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল “এই শালি সব সময় ভুল টাইমে ফোন দেয়” পরি হেসে বলল
“তোমার শালি কাউকে দরকার ছাড়া ফোন দেয় না চুপ করো এখন” পরি ফোনটা কানে ধরতেই ইলার তাড়া গলা “পরি আদিব ভাইয়াকে বল তো আরিয়ান কিসে জব করে?
পরি একটু চমকে উঠল “কেনো রে কি হয়েছে? ইলা বলে উঠল হাসতে হাসতে,
ইলাঃ- আর বলিস না এই হালুর বাচ্চা হালিমা কাকে না কাকে আর্মির ইউনিফর্ম এ দেখেছে এখন বলছে ঐ লোকটা নাকি ঐ রাক্ষস আরিয়ান।

ওপাশ থেকে পরির হাসির শব্দ ভেসে আসে “তুই থাম আমি এখনই আদিবকে জিগ্যেস করছি” আদিব তখনও পরির সাথে দুষ্টুমি করছে পরি না পারছে কিছু বলতে না পারছে কিছু করতে পরির সাথে দুষ্টুমি করতে করতে আদিব বলল
আদিবঃ- আরে আবার কী হয়েছে আমার ছোট শালীর।
পরিঃ- ওরা মনে হয় আরিয়ান ভাইয়াকে কোথাও দেখেছে আর্মির ইউনিফর্ম এ তুমি বলতো আসলে ভাইয়া কিসে জব করে?
আদিব একটু থেমে চোখ মেলে পরির দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন তারপর গম্ভীর মুখে বলল,
আদিবঃ- আরিয়ান ভাইয়া এখন আর্মিতে মেজর পদে আছে।
পরিঃ- কি সত্যি আরিয়ান ভাইয়াও আর্মি??
আদিবঃ- হ্যাঁ ও এখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পোস্টেড। কিন্তু আরো কে আছে আর্মিতে?
পরিঃ- ইয়ে না মানে… ইলাকে একটা ছেলে দেখতে এসেছিলো সেই ছেলেও আর্মি ছিলো তাই বললাম।
আদিবঃ- বাদ তাহলে আমার শালির আর্মি পিছু ছারছে না।
পরি মনে মনে বিরবির করছে( তোমার শালির পিছু ছারছে না নাকি তোমার শালি ঐ তাসকিনের জন্য দেবদাস হয়ে আছে)

আদিবঃ- কি বলছো মনে মনে
পরিঃ- কই না তো কিছু না।
ইলাঃ- এই পরি মরলি নাকি মুডে আছিস তাই কথা বলতে পারছিস না। আচ্ছা ঠিক আছে আমি পরে ফোন দিবো।
পরিঃ- আদিব বলছে আরিয়ান ভাইয়া এখন আর্মিতে মেজর পদে আছে ঢাকা ক্যান্টরমেন্টে।
ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা ইলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল বুকের ভেতর হালকা একটা কাঁপুনি যেন সত্যিই যাকে একটু আগেই হালিমা চিনেছিল সে মানুষটা আর কেউ নয় আরিয়ানই।
পরির কথা শুনে ইলা চুপ হয়ে যায় আর কোনো কথা বলে না ইলা আর হালিমা রিকশা থেকে নেমে হেঁটে হোস্টেলের দিকে ফিরছে। দুইজনের মুখে চুপচাপ ভাব বাতাসে হালকা ধুলোর গন্ধ হালিমা হঠাৎ থেমে বলল,
হালিমাঃ- এখন বল আমি ভুল বলেছিলাম নাকি আমি তো বলছিলাম ঐ লোকটা আরিয়ান ভাইয়া দেখ আমি ঠিকই ছিলাম উনি আসলেই আর্মি।

ইলা কিছু না বলে হাঁটতে লাগল মুখটা একটু ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তারপর হঠাৎই ওর চোখে পানি এসে গেলো ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ঢং করে করে কান্না করা শুরু করলো
ইলাঃ- ভাই এই আর্মি বেটাগুলা আমার পিছন ছারে না কেনো?কোন জীবনের পাপে যে শাওন নামের পাগলাটারে ভালোবাসতে গেছিলাম। এখন সেই পাপের ফল এভাবে পাচ্ছি মনে হয়। চারপাশে সব আর্মি আমি চাইলেও পালাতে পারি না। কিন্তু যাকে সত্যি ভালোবেসেছিলাম তাকে তো পাইলাম না।
ইলার গলাটা কেঁপে উঠলো চোখের কোণ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। হালিমা পাশে দাঁড়িয়ে মুখে হালকা হাসি এনে মুখ ভেংচিয়ে বলল

হালিমাঃ- এএএএএ আইছে তোর কপাল যে ফাটা কপাল আরে গান্ডু আরিয়ান ভাইয়ার মতো হ্যান্ডসাম, স্টাইলিশ স্মার্ট জামাই পাইছিস তুই এইটা তোর কপাল এখন কষ্ট পাইস না একটু ধন্যবাদ দে ভাগ্যরে।
ইলা এবার হালিমার দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল,
ইলাঃ- এই হালু আমার জামাইর দিকে একদম নজর দিবি না বুঝছিস?
হালিমাঃ- আচ্ছা তাই নাকি তুই তো বলতিস বিয়ে মানিস না এখন হঠাৎ এত দরদ কেন?
ইলা নিঃশ্বাস ফেলে থেমে গেলো তারপর মৃদু স্বরে বলল,
ইলাঃ- কে বলছে আমি মানি না…আমি বিয়ে মানি আর আরিয়ানকে আমার স্বামী হিসেবে মেনেও নিয়েছি। আমার আব্বুর শেষ ইচ্ছা ছিলো আমি যেনো এই বিয়েটা করে সুখে থাকি।
তিনি বলেছিলেন “ইলা মা একদিন তুই বুঝবি ভালোবাসা মানে শুধু নাম নয় মনের শান্তি”
আমি বিয়ের দিন কবুল বলার পরে প্রতিজ্ঞা করেছি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি এই সম্পর্কটা রক্ষা করবো। যত কষ্টই হোক আমি ভাঙবো না এই বাঁধনটা।
ইলার গলাটা কেঁপে উঠলো চোখে পানি জমে উঠলো।হালিমা এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেলো তারপর ধীরে ধীরে বলল

হালিমাঃ- তাহলে তোর শাওনেরর কী হবে যার জন্য এত কষ্ট করলি এত কাদলি?
ইলা চোখের জ্বল মুছে হাসলো হালিমার দিকে তাকিয়ে বলল
ইলাঃ- শাওন কে আমি তিনবার ‘কবুল’ বলার আগেই আমার মনে কবর দিয়ে দিয়েছি।ও ছিলো একটা গল্প যার শেষ আমি নিজেই লিখে ফেলেছি। এখন নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে আরিয়ানকে নিয়ে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলো দুইজনেই বাতাসে কেমন এক বিষণ্ণ শান্তি নেমে এসেছে। হালিমা হঠাৎ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
হালিমাঃ- সেটা না হয় বুঝলাম কিন্তু এই নতুন ছেলে, লিয়ান… আমার কিন্তু একে সুবিধার মনে হচ্ছে না। চোখে এক রকম রহস্য হাসিতেও কেমন গোপন আগুন আছে।
ইলাঃ- তুই বেশি চিন্তা করিস না হালু কেউ আমার জীবনে ঢুকতে পারবে না যতক্ষণ না আমি নিজে দরজা খুলি।
তার গলাটা ভারী হয়ে গেলো ইলার মাথার ভেতর শুধু একটাই নাম প্রতিধ্বনি হয়ে বাজতে লাগল আরিয়ান।একদিকে মনের কষ্ট অন্যদিকে না বলা আকর্ষণ।আর এই দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইলা একটা অজানা ভালোবাসা বন্ধনে ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাচ্ছে।

ইলা আর হালিমা হাঁটতে হাঁটতে গেটের কাছে এল।দূর থেকে দেখা গেলো কেউ একজন দেয়ালের পাশে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, গিটার ঝুলানো,কালো শার্টের হাতা গোটানো মুখে হালকা হাসি।নইলা একটু চোখ কুঁচকে তাকালো “লিয়ান” ইলাদের দেখামাত্র লিয়ান গিটারটা পেছনে ঠিক করে দ্রুত পায়ে হেঁটে ইলার কাছে এসে দাঁড়াল। চোখে কেমন একটা অভিমান মিশ্রিত কোমল দৃষ্টি কিছুটা নরম স্বরে
লিয়ানঃ- হ্যালো ইলা।
ইলা শুধু মাথা নেড়ে ‘হুম’ বলল লিয়ান এক মুহূর্ত থেমে হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
লিয়ানঃ- তোমার দুই দিন ধরে কোনো খবর নেই।গেমে ও দেখছিলাম তুমি অনলাইন হচ্ছো না।তারপর দেখি তুমি আমাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছো। কেনো ইলা আমি এমন কী ভুল করেছিলাম?
ইলা চুপ করে তাকিয়ে রইল মুখের ভেতর কেমন যেনো জমে থাকা একটা ভারী নিঃশ্বাস। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
ইলাঃ- শুনুন আপনি দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করবেন না আমার এখন আর এসব ভালো লাগে না। আর হ্যাঁ আমার মনে হয় আপনি সেই ‘নবিতা ভাইয়া’ নন যাকে আমি চিনতাম। আপনি অন্য কেউ আমি যাকে চিনি আপনি সে নন। আর দয়া করে এভাবে আমরা সামনে আসবেন না আমার বিয়ে হয়ে গেছে।

শেষ কথাটা যেনো ঝড় তুলে দিলো লিয়ান মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।ঠোঁটে জমে থাকা হাসিটা মিলিয়ে গেলো চোখের ভেতর হালকা বিস্ময় আর কষ্ট সে কণ্ঠ নিচু করে বলল
লিয়ানঃ- কি বললে ইলা তোমার বিয়ে…? এটা কেমন প্রাংক??
ইলাঃ- কোনো প্রাংক না আজ থেকে পাঁচ দিন আগে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
লিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ইলার দিকে তারপর মৃদু হাসল যে হাসিতে হয়তো কিছুটা হারের বেদনা ছিলো আবার ছিলো মেনে নেওয়ার শক্তিও।
লিয়ানঃ- আচ্ছা ঠিক আছে বুঝেছি তোমার বিয়ে হয়েছে। তাই বলে আনফ্রেন্ড করে দিবে আরে পিচ্ছি তুমি তো আমার বন্ধু। এর থেকে বেশি কিছু ভাবার কিছু নাই।

একটু থেকে তারপর হালকা গলায় যোগ করল
লিয়ানঃ- কাল প্রোগ্রামের পিপারেশন কেমন??
ইলাঃ- এই তো সেটার কেনাকাটা করতে গেছিলাম।
লিয়ানঃ- কাল আমি আমার ব্যান্ড নিয়ে পারফর্ম করবো।
হালিমাঃ- আপনি গান ও গান, আমি তো ভেবেছি আপনি সারাদিন গিটার নিয়েই ঘুরে বেড়ান।
লিয়ানঃ- কখনো কখনো শুধু ভালো লাগার জন্য গান গাই কাল দেখতে পাবে।
তারপর ইলার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল। গিটারটা কাঁধে বাতাসে উড়তে থাকা কালো চুল পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেলো দূরত্বে।ইলা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়া পথের দিকে।মনে হলো বুকের ভেতর কোথাও যেনো হালকা একটা চাপা ধাক্কা লাগছে কিন্তু সে কিছু বলল না।
হালিমা পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

হালিমাঃ- কি কে রে তুই না বলছিলি ওকে চিনিস তাহলে আজ কেনো বললি চিনিস না।
ইলাঃ- চিনি কিন্তু তার এন্ট্রি এখন ভয় লাগছে মনে হচ্ছে নতুন কোনো ঝড় আসছে।
Time skip…
রাত তখন প্রায় ১১ টা পেরিয়ে গেছে আকাশে আধ খানা চাঁদ পাশে মৃদু মেঘের ছায়া। আর্মি ক্যান্টরমেন্টে বাইরে নরম আলোয় ভিজে থাকা রাস্তা ধরে হাঁটছে আরিয়ান আজ সারাদিন ডিউটি শেষে মাথা টা ভারী হয়ে আছে কিন্তু মনে একটাই প্রশ্ন “ইলাফুল এখন কী করছে” দুইদিন হয়ে গেলো কোনো খবর নেয়া হলো না। তার পরে ইউনিফর্মের পকেট হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করল ফোনটার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে উঠলো আরিয়ান (নিজের মনে বলল) “ইলাফুল” এর নাম্বার তো নেই। তার পরে নিজের মাথায় বারি মেরে

“তুই সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস শাওন সব জায়গায় কেনো ওই মেয়েটাকেই দেখিস? গাছের ছায়ায়, বাতাসে, এমনকি টর্চের আলোয়ও মনে হয় ইলাফুল দাঁড়িয়ে আছে হালকা হাসছে তোকে দেখে।
আকাশে তাকিয়ে তারাদের দিকে তাকিয়ে আরিয়ান ও তার দুই বন্ধু সাজিদ আর রাফায়েল তখন পাশেই বসে আছে
সাজিদঃ- ভাই আজকে তোর মনটা খুব ঘুরে বেড়াচ্ছে মনে হয় কারে খুঁজতেছিস বল?
আরিয়ানঃ- ওরে সাজিদ খুঁজতেছি না বরং কেউ আমার ভেতরে ঘুরে বেড়ায় আমি যেখানেই যাই ও যায়।
রাফায়েল নামটা বল তুই শুধু কে সে এখনি তুলে নিয়ে আসছি আমরা।
আরিয়ানঃ- নামটা বললেই বুক ধক করে ওঠে হার্টবিট বেড়ে যায়।
আরিয়ানের কথা শুনে সাজিদ আর রাফায়েল এক সাথে হেসে ওঠে কিন্তু হাসির ফাঁকেও আরিয়ানের চোখের কোণে অদ্ভুত এক নরম আলো। আরিয়ান চুপচাপ তারাদের দিকে তাকিয়ে
“এই আকাশে যত তারা ওর হাসির একটাও সমান না। আমি যদি ভুলে যেতে চাই কিন্তু পারব না মনে হয় আমার ইউনিফর্মের ব্যাজে ওর নামই লেখা হয়ে গেছে।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৩

রাফায়েলঃ- ভাই তুই প্রেমে পড়ছিস ভয়ানক ভাবে। এখন আর্মির ক্যাম্পেও এই রোমান্স ভাইবস?
আরিয়ানঃ- প্রেমে পড়িনি রাফায়েল আমি প্রেমের মধ্যে বন্দি হয়ে গেছি।
রাফায়েলঃ- মানে কি দোস্ত কিছুই তো বুঝতেছি না।
আরিয়ানঃ- বুঝবি না কিছু কথা না বুঝাই ভালো।
তারপরে চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নেয় আরিয়ান ঠান্ডা হাওয়ায় ভেসে আসে ইলার পারফিউমের মতো এক স্মেল যেন ইলাফুল তার অনেক কাছে দাঁড়িয়ে আছে আর ডাক দিচ্ছে “আরিয়ান”

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৫